Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩১

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩১

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩১
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

রাতের তৃতীয় প্রহর, সহসা তন্দ্রাচ্ছন্ন ধরণীর বুক চিরে প্রতিটি মসজিদের মাইকে ভেসে আসলো জাগরণের আহ্বান। একে একে প্রতিটা ঘর কৃত্রিম আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল, জেগে উঠল পুরো শহর- এটাই যেন রমাদানের সবচেয়ে অমায়িক দৃশ্য।
তাহাজ্জুদ এর নামাজ আদায় করে রুমে প্রবেশ করল হুমায়রা। নামাজে যাওয়ার আগেও কৃশানকে একবার ডেকে গেছে। তবে কোনো সাড়া মেলেনি। এবার যেভাবেই হোক মানুষটাকে জাগাতে হবে। ধীর পায়ে বিছানার দিক এগিয়ে গেল সে। ঘুমন্ত স্বামীর উদ্দেশ্যে মিহি স্বরে ডাক ছুঁড়ল,

“ শুনছেন..? ”
“……….”
কোনোরূপ সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না কৃশানের তরফ হতে। এবার খানেক ঝুঁকে মানুষটার বাহু আলতো হাতে ঝাঁকিয়ে বলল,
“ শুনছেন? সাহরীর সময় হয়ে গেছে তো উঠুন ন.. ”
কথা খানা সম্পূর্ণ করতে পারল না রমণী। এর আগেই তার পেলব হাত খানার কব্জি চেপে ধরল কৃশান। কিছু বুঝে উঠার আগেই মানুষটার শক্ত হাতের টানে তাল সামলাতে না পেরে আছড়ে পড়ল তার উপর। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিত, হতভম্ব হয়ে চোখ বড় বড় করে হাতের মালিকের পানে তাকাল হুমায়রা। কৃশানের চোখ বন্ধ, ভ্রু জোড়া কুঁচকানো। ওভাবেই ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,
“ রাত বিরাতে এই ‘শুনছেন’ ‘শুনছেন’ বলে মাথা খাচ্ছিস কেন আমার? জেগে থেকেও শান্তি পাইনা এখন ঘুমের রাজ্যেও চলে এসেছিস! এই আমিটাকে আর আমার হয়ে থাকতে দিবি না তুই..? ”
স্তব্ধ হলো মেয়েটা। বিমোঢ় চিত্তে তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত পুরুষটির পানে। শুষ্ক ঢোক গিলে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

“ আপনি না বললেন রোজা রাখবেন? ”
কথার মাঝেই নড়েচড়ে উঠল। শরীরে কারো নড়চড় উপলব্ধি করতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন আঁখি যুগল মেলে তাকাল কৃশান। সন্নিকটে আবিষ্কার করল একটি মায়াবী মুখ। যে মুখটি আজকাল তার কল্প রাজ্যেও রাজ করা শুরু করেছে। ছেলেটা হুট করেই বলে উঠল,
“ এতো অবাধ্য কেন তুই? এতো এতো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে টুপ করে আমার নিষিদ্ধ রাজ্যে ঢুকে গেলি। বের করতে চাইলেও বের হচ্ছিস না! এখন কি করি বল তো? ”
রমণীর টানা টানা ঘন কালো ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ল। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ কোন রাজ্যের কথা বলছেন? আপনার নিষেধাজ্ঞা কখন প্রত্যাহার করলাম? ”
উত্তর করল না কৃশান। কিয়ৎক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হুমায়রাকে হাতের বাঁধন থেকে মুক্ত করে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“ কিছুনা, সর এখান থেকে। ”
সাথে সাথেই কৃশানের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে চলে এলো হুমায়রা। ফ্লোরের দিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনার খাবার কি এখানে এনে দিব? ”
“ হুম। ”
বলেই শুয়া থেকে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো কৃশান।

নাজমিন বেগম ও ইয়াসমিন বেগম একসাথে ড্রয়িং রুমের দিকে আসছিলেন। তখনি দেখতে পেলেন হুমায়রা খাবার হাতে নিজ কক্ষের দিকে যাচ্ছে। নাজমিন বেগম বললেন,
“ হুমায়রা কি আমাদের সাথে খাবে না? ”
বড় শাশুড়ির কথায় পিছন ঘুরল হুমায়রা। উত্তরে বলল,
“ জ্বি বড় আম্মু, আমি আপনাদের সাথেই খাবো। এগুলো উনার খাবার। ”
“ কৃশান উঠেছে নাকি! রোজা রাখবে? ”
অবিশ্বাস্য কণ্ঠ ভদ্রমহিলার। যেন আকাশ থেকে পড়েছেন তিনি। পৃষ্ঠে শুনা গেল হুমায়রার বিশ্বাসী স্বর,
“ হুম। ”
এক পশলা খুশির জোয়ারে ঠোঁট প্রসারিত হলো নাজমিন বেগমের। তিনি ছোট জা এর দিক তাকিয়ে উচ্ছাসিত গলায় বললেন,
“ দেখছো ইয়াসমিন, আমাদের ছেলের কিন্তু ভালো উন্নতি হচ্ছে। ”
“ উন্নতি হলেই ভালো। ”
চোখে মুখে গাম্ভীর্যতা বজায় রেখেই জবাব দিলেন ইয়াসমিন বেগম। ভিতরে ভিতরে বেশ খুশি হলেও সেটা প্রকাশ করলেন না। হুমায়রার উদ্দেশ্যে বললেন,
“ তাকে খাবার দিয়ে তাড়াতাড়ি এসো। ”
সেখানে আর দাঁড়াল না হুমায়রা। শাশুড়ির কথায় মাথা দুলিয়ে রুমে চলে গেল সে। অতঃপর কৃশানের খাবার রেখে আবারও ড্রয়িং রুমে ফিরে এলো।

উমর দের বাসা থেকে মসজিদের দূরত্ব মাত্র মিনিট খানেকের রাস্তা। যার দরুণ খুব সহজেই, কোনোরূপ অসুবিধা হীন আসা যাওয়া করতে পারে সে। প্রথমে একবার গিয়ে সবাইকে সাহরীর জন্য আহ্বান জানিয়ে বাড়িতে এসে খেয়ে গেছে। পরপর ইমামতি করে আবারও বাসায় ফিরেছে। যদিও এই রুটিন টা নতুন যোগ হয়েছে। গত রমজান গুলোতে সে একেবারে খাবার নিয়েই মসজিদে চলে যেত। কিন্তু এখন খাওয়ার সময় তার পরিবারের কেউ যদি ইকরার সাথে কোনোরূপ ঝামেলা করে- সেই ভয়ে স্ত্রীর সঙ্গ দিতে একাধিক বার আসা যাওয়ার এই নিয়ম অবলম্বন করতে হচ্ছে তাকে।
ফজরের নামাজ আদায় করে রান্নাঘরে পড়ে থাকা এঁটো থালা বাসন গুলো ধুচ্ছে ইকরা। প্রথম প্রথম ফরিদা বেগম তাকে কাজে হাতও লাগাতে দিতেন না। আশেপাশে দেখলেই চটে যেতেন। কিন্তু নূরনাহার বেগমের কথায় এখন ইকরাকে কাজ করতে দিয়েছে ঠিকই তবে এখন কাজের ধারে কাছেও আসেন না ভদ্রমহিলা। ইকরাই ঘরের সব কাজ একা হাতে সামলায়। আর তিনি আরামসে বসে থাকেন। যেন ছেলের বউকে কাজ দিয়েই শায়েস্তা করার পণ করেছেন।
ইকরা যখন কাজ করতে ব্যস্ত তখনি নিঃশব্দে রান্নাঘরে প্রবেশ করল উমর। কিছুটা এগিয়ে এসে ইকরার পিছনে দাঁড়াল। কর্মরত স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলল,

“ এইগুলো তো সকালে ঘুম থেকে উঠে ধুলেও পারতেন? ”
আকস্মিক কণ্ঠে কিছুটা ভরকাল ইকরা। চকিত ঘুরে তাকাল সে। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে দেখতেই শান্ত হলো। নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,
“ কাজগুলো শেষ করেই একেবারে শান্তিতে ঘুমাবো। আপনি কখন এলেন ইমাম সাহেব? ”
“ এইতো মাত্রই আসলাম। ”
“ ওহ। ”
বলেই আবারও কাজে হাত লাগাল ইকরা। একটা একটা করে বাসন ধুয়ে পাশে রাখল। সহসা সেগুলো হাতে নিয়ে নিল উমর। তা দেখে ইকরা অবাক কণ্ঠে বলল,

“ একি আপনি এগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন! ”
“ আপনি ধুয়ে দিন আমি নিয়ে র‍্যাক এ রেখে দিচ্ছি। ”
“ আরে না দরকার নেই! এইগুলা আপনার কাজ নয়। আপনি রুমে যান তো ইমাম সাহেব। ”
“ শুনুন প্রিয় ইকরাবিবি, আপনার আমার বলতে কিছু নেই এখন যা আছে সব আমাদের। আপনি বরং তাড়াতাড়ি করুন। ”
স্বামী নামক এই পুরুষটির প্রতিটা কথায় মুগ্ধ হয় ইকরা। উত্তর দেয়ার মতো শব্দ খুঁজে পায় না শব্দভাণ্ডারে। মেয়েটা ভেবে পায়না এতো ভালো একটা মানুষ হয় কি করে। সে আনমনেই প্রশ্ন করে বসল,
“ আপনি এতো ভালো কেন? ”
ইকরার এহেন কথায় কিছুক্ষন চুপ রইল উমর। পরপরই ইকরার দিক খানিক ঝুঁকে দুষ্টু স্বরে বলল,
“ এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না ইকরাবিবি, আপনার সরল চাহনি আমার অন্তঃসত্ত্বাকে গরল করে দেয়। এখন কিন্তু রমাদান মাস! ”
মানুষটার বলা অপ্রত্যাশিত বাক্যগুলো কর্ণপাত হতেই থতমত খেলো ইকরা। মুগ্ধ দৃষ্টি পরিণত হলো কুণ্ঠিত দৃষ্টিতে। মাথা নিচু করে তড়িৎ কাজে লেগে পড়ল মেয়েটা। কপোল দ্বয় লালিত হলো লজ্জায়। তার কান্ড দেখে মুচকি হাসলো উমর। পরপর স্ত্রীর কাজে সেও হাত লাগাল। এবেলায় আর কিছু বলার সাহস করল না ইকরা।

ঘড়ির কাটা যখন টিকটিক করে সকাল এগারোটায় পৌঁছেছে ঠিক তখন ঘুম ভাঙলো কৃশানের। সাহরীর পর লম্বা একটা ঘুম দিয়েছে সে। নিত্যদিনের তুলনায় আজকে একটু বেশিই ঘুমিয়েছে। যার দরুণ শরীর কেমন ভার ভার লাগছে। মাথা ঝাঁকিয়ে অলস ভঙ্গিতে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো। পরপর গায়ে শার্ট জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল।
আজ ভার্সিটি নেই, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়েই দুপুর অব্দি কাটাল কৃশান। তন্মধ্যে একমাত্র সেই রোজাদার ছিল। বাকিরা সবাই যে যার মতো সিগারেট ও অন্যান্য হাবিজাবি জিনিস খেয়েছে। তবে আড্ডার পুরোটা সময়ই কৃশান কিছু মুখে দেয়নি। কারণ হিসেবে বলেছে- তার ভালো লাগছে না। রোজার কথা কাউকেই বলেনি।

বিকেলের দিকে রুমে বসে পায়চারি করছে কৃশান। ক্ষুধায় পেটের ইদুর দৌড়াদৌড়ি করছে তার। আর তৃষ্ণায় তো আরেকটু হলে গলা ফেটে যাবে বলে মনে হচ্ছে। সকাল টা ভালোই কেটেছে, দুপুরের পর থেকে ক্রমে ক্রমে হাল বেগতিক হতে যাচ্ছে। যাই একটু ঘুমিয়েছিল সময় অতিক্রমের জন্য। তবে সেটাও ক্ষুধার জ্বালায় বেশিক্ষণ টিকেনি। হাতে থাকা মোবাইলে আবারও সময় চেক করল ছেলেটা। স্ক্রিনে জানান দিচ্ছে এখন সময় ৪.৫০। বিরক্তিতে ভ্রু গুটিয়ে নিল। রাগ নিয়ে মোবাইলটা বিছানায় ছুঁড়ে বলল,
“ গজবের ঘড়িতে আজকে কি কাটা চলেই না নাকি! কৃশান মির্জার সাথে জাত শত্রুতা আছে মনে হয় এর! ”
বলেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল সে।
রান্নাঘরে দক্ষ হাতে ইফতার তৈরি করছে হুমায়রা। পাশে কেউ নেই। ইয়াসমিন বেগম ও নাজমিন বেগম তাকে সব বলে কয়ে দিয়ে, যে যার রুমে চলে গেছেন। অবশ্য হুমায়রাই বলেছে চলে যেতে। মেয়েটা যখন কাজে ব্যস্ত তখনি কর্নগোচর হলো স্বামীর অধৈর্য্য স্বর,
“ এই হুজুরনী আজান দিবে কখন রে! ”
কি বাচ্চাদের মতো কথাবার্তা! তৎক্ষনাৎ মানুষটার দিকে চাইল হুমায়রা। বলল,
“ আপনার কি বেশি কষ্ট হচ্ছে? ”
কষ্ট তো হচ্ছেই! সে কি আর কখনো রোজা রেখেছে নাকি? রোজার মধ্যে তিন বেলা খেয়েই তো কূল পায়নি। তবে ভিতরের অবস্থা বুঝতে দিলো না কৃশান। বলল,

“ আজান কয়টা বাজে দিবে সেটা বল! ”
“ প্রায় ছয়টার দিকে। ”
“ ওহ। ”
ছোট করে উত্তর দিয়ে হুমায়রার দিক খানেক এগিয়ে এলো কৃশান। কিছুক্ষন মেয়েটার ঘর্মাক্তক মুখপানে চেয়ে বলে উঠল,
“ তোর কষ্ট হচ্ছে না? রোজা রেখে এভাবে কাজ করছিস কিভাবে? ”
” অভ্যাস হয়ে গেছে। আপনি আজকে প্রথম তো তাই আপনার এমন লাগছে। আগামীকাল থেকেই দেখবেন তেমন একটা খারাপ লাগবে না। ধীরে ধীরে আপনিও অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। ”
“ আমি আর রাখতে পারবো না। আমার দ্বারা এসব হবে না। ”
কর্মরত হাতটা থেমে গেল রমণীর। মুখ কালো করে তাকাল স্বামীর পানে। বলল,
“ এই আপনার কৃতজ্ঞতা? ”
“ আমি পারিনা এখানে আমার কি করার? ”
“ আমি বললাম তো আজকে প্রথম দেখে এরকম লাগছে। ”

তাদের কথার মাঝেই রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন নাজমিন বেগম। এসেই কৃশানের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ এক কাজ কর কৃশান, বেশি কষ্ট হলে হুমায়রার দিক তাকিয়ে থাক। সওয়াব ও হবে সাথে সময়ও কেটে যাবে। ”
তার কণ্ঠ শুনতেই নিজেকে গুটিয়ে নিল হুমায়রা। হৃদ কোটরে উঁকি দিল অস্বস্তি নামক অনুভূতিরা। এইদিকে বড় আম্মুর কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকাল কৃশান। কোনোরূপ উত্তর না দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বিড়বিড় করে বলল,
“ ব্রেকলেস পিছলে পড়ার ধান্দা! এমনিতেই তো আজকাল একবার তাকালে চোখ সরানো দায় হয়ে ওঠে! ”
কৃশান যেতেই হুমায়রার কাছে এলেন নাজমিন বেগম। রান্না পর্যবেক্ষণ করে বললেন,
“ সবকিছু ঠিকঠাক পারবে তো? নাকি……”
“ ইনশাআল্লাহ পারবো। আপনি চিন্তা করবেন না বড় আম্মু। ”
সন্তুষ্টিময় হাসলেন তিনি। পরপর যেভাবে এলেন ঠিক সেভাবেই চলে গেলেন।

সূর্যের শেষ রক্তিম আভা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার কালচে মেঘে মিশে যাচ্ছে। প্রকৃতিতে শুরু হচ্ছে এক মায়াবী আলো-ছায়ার খেলা।
নকোলাহল থেমে গিয়ে চারিদিকে নেমে এসেছে এক অপূর্ব নীরবতা। ক্লান্ত পাখির দল তখন নীড়ে ফেরার জন্যে ডানা ঝাপটে আকাশপথে উড়ে যাচ্ছে।
কৃশানের জন্য আলাদা করে ইফতার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল হুমায়রা। তাকে দেখতেই সোজা হয়ে বসল কৃশান। বলল,
“ আর কয় মিনিট আছে আজান দেয়ার? ”
“ বেশি নেই হবে বোধ হয় চার পাঁচ মিনিট। ”
যাবতীয় সবকিছু কৃশানের সামনে রাখা হতেই চলে যেতে নিচ্ছিল হুমায়রা। ওমনিই পিছু ডাকল মানুষটা,
“ তুই কোথায় যাচ্ছিস? ”
“ ড্রয়িং রুমে। ”
“ কেন? ”
“ ইফতার করতে। ”
“ এখানেই কর। ”
অপ্রত্যাশিত শব্দদ্বয় কর্ণপাত হতেই অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছাল হুমায়রা। নিশ্চিত হতে সুধাল,

“ আপনার সাথে ইফতার করবো? ”
“ কেন আমার সাথে ইফতার করলে কি তোর জাত যাবে! ”
মেয়েটা বলল কি আর সে বুঝল কি! মানে কি পরিমাণ ত্যাড়া মানুষটা! আর কিছু বলল না হুমায়রা। চুপচাপ এসে বসে পড়ল কৃশানের বরাবর অপর পাশের খালি জায়গায়। এভাবেই কিছুক্ষণ নীরব রইল পরিবেশ। পরপর আবারও শুনা গেল কৃশানের অতিষ্ট কণ্ঠ,
“ কিরে আজান দিচ্ছে না কেন? ৫:৫৮ বাজে তো! ”
“ এক্ষুনি দিয়ে দিবে আরেকটু অপেক্ষা করুন। ”
ছেলেটার ধৈর্য্যের বাদ যেন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। প্রতিটা মিনিট তার কাছে ঘণ্টার সমতুল্য মনে হচ্ছে। মিনিট পেরোতেই সে রেগে গিয়ে বলল,
“ এবার আজান না দিলে একেবারে মসজিদে গিয়ে পিটিয়ে আসবো……
শেষে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। মনে পড়ল সে এখন রোজা। অগত্যা নিজেকে সামলে নিল। এইদিকে মানুষটার কান্ড দেখে হুমায়রা হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না। সে নীরব দর্শক হয়ে তার বখাটে স্বামীর কান্ড দেখতে লাগল।
এক পর্যায়ে সকল রোজাদারের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মসজিদের মাইকে মাগরিবের আজান পড়ল। সাথে সাথেই রোজা ভাঙার নিয়ত পড়ে খেজুর মুখে দিলো কৃশান। পরপর এক চুমুকে শরবতের গ্লাস খালি করল। মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বলল,

“ এইবার শান্তি! ”
এবেলায় এসে হেসে ফেলল হুমায়রা। তবে টা টিকল না বেশিক্ষণ। এর আগেই তার হাসিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়ে কৃশান বলে উঠল,
“ এখন বল, আমাকে দেখলে তোর ভয় কাজ করে না বরং কি কাজ করে? ”
গলায় খাবার আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো মেয়েটার। সে তো ভেবেছিল কৃশান হয়তো ওকথা ভুলে গেছে। গতকাল রাতেও তো বলেছিল খবর করে ছাড়বে কিন্তু কিছুই করেনি। স্বাভাবিক ভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিল দিনেও তো এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। যার দরুণ তার নিজেরই মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে কথাটা। মেয়েটা তড়িঘড়ি করে মুখের খাবারটা শেষ করল। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামতে লাগল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকা মানবের উদ্দেশ্যে বলল,

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩০

“ নামাজের সময় শেষ হয়ে যাবে। ”
“ আগে কথা সম্পূর্ণ করে যা তুই। ”
বলেই মেয়েটার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল কৃশান। সংকীর্ণ চেহারায় মানুষটার পানে চাইল হুমায়রা। মনে মনে কথা খুঁজতে লাগল।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩২

2 COMMENTS

Comments are closed.