Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৯

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৯

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৯
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

কৃশান আপাতত তিন মাসের জন্য ক্যাফে যাওয়া স্থগিত করে রেখেছে। বাড়ির সবার সাথে হুমায়রার নিষেধাজ্ঞা অব্দি মানে নি সে। প্রত্যেকে হুমায়রার খেয়াল রাখলেও কৃশানের ওখানে গিয়ে এক দন্ড মন টিকে না। অস্থির লাগে ছেলেটার, তাই সে নিজের সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছে। এইদিকে স্বামীর উপস্থিতি তে রমণী সামান্য তম এদিক সেদিক ও যেতে পারেনা। সারাক্ষণ চোখে চোখে থাকতে হয় তাকে। আর খাবারের কথা কি বলবে ওঁ? দিনে বোধ হয় এখন পাঁচ ছয়বেলা খেতে হয় তাকে। অবশ্য প্রত্যেক বেলাতেই তিন চার/ লোকমার বেশি খেতে পারেনা। খেলেই বমি করে সব বের করে দেয়। বেশিরভাগ খাবারেই বৃতিষ্ণা আসে তার। হাতে গনা কিছু পদের খাবার মুখে নিতে পারে, আর সেগুলো সদা ঘরে বরাদ্দ থাকে। মুখে খাবারের নাম উচ্চারণ করতে দেরী অথচ সে খাবার তার সামনে হাজির করতে দেরী করে না কৃশান মির্জা। মানুষটার কান্ড কারখানা দেখে হুমায়রা মাঝে মাঝে হাসে আবার মাঝে মাঝে রাগও হয়।
এইযে এখনো তার সামনে খাবার নিয়ে বসে আছে মানব। সে যে বলছে খেতে ইচ্ছে করছে না- এতে বিন্দুমাত্র মনযোগ নেই।

“ কিরে খাচ্ছিস না কেন? সেই যে সকালে একটু খেয়েছিস এখনো কিন্তু খাবারের ধারে কাছেও যাসনি। ”
এইবার না পারতে গোমড়া মুখে খাবারের প্লেট হাতে নিল মেয়েটা। ঝালঝাল গরু মাংসের ভুনা, দেখলেই জিভে জল আসার কথা অথচ ঘ্রাণ টা নাকে যেতেই পাল্টে গেল রমণীর স্বাভাবিক মুখশ্রী। বহু কষ্টে স্বামীর কথা রাখতে লোকমা তুলে মুখে নিল। দু তিনটে লোকমা ভালোই খেল, চার নম্বর লোকমা চিবুতে গিয়েই বিপত্তি বাধল। নাড়ি ভুঁড়ি গুলিয়ে পেটের সবটুকু বেরিয়ে আসতে চাইল। তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে উদ্যত হলো সে। তবে শেষ রক্ষে আর হলো না, এর আগেই মেয়েটার মুখ হতে সদ্য গলাধঃকরণ খাদ্য গলগল করে বেরিয়ে এলো। সাথে সাথেই ওর লতানো দেহ পুরু হাতের আঁজলায় নিয়ে বেসিনে ছুটল কৃশান। একেবারে পেট খালি করেই থামল হুমায়রা। ক্লান্ত আঁখি তুলে অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল কৃশানের পানে। তখন একেবারে নিকটে থাকায় নিজের সাথে সাথে কৃশানের গায়েও বমি পড়েছে। বুকের কাছটা ভরে আছে মানুষটার। হুমায়রা দুর্বল হাত বাড়িয়ে সেখানটা মুছতে নিল। ওমনিই তার ছোট্ট হাত মুঠোয় পুরে নিল মানব। খানেক ঝুঁকে শীতল কন্ঠে শুধাল,

“ খারাপ লাগছে? বমি আসছে এখনো? ”
দুপাশে না সূচক মাথা নাড়াল হুমায়রা। মানুষটা এবার আস্তে ধীরে তার ময়লা হিজাবটা খুলে এক পাশে রাখল। পরপর পানি ছেড়ে স্ত্রীর মুখ ধুয়ে দিল। অতএব একই ভাবে আবারও কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তির ঘুমে হারিয়ে গেল রমণী। আর সেই ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিক তাকিয়ে দুশ্চিন্তার সাগরে ডুবে গেল মানব।
সেই দুশ্চিন্তার ভার এক পর্যায়ে কমে আসে। ততদিনে হুমায়রা স্বাভাবিক হলেও কৃশানের শরীরের গঠন খানেক পাল্টে যায়। লম্বা চওড়া, মাংসল দেহটা শুকিয়ে যায় অনেকটা, চোখের নিচে জমে কালো দাগ। একেবারে নীরব হয়ে যায় সে।

তিন মাস শেষ হয়ে চার মাস পড়েছে হুমায়রার। পেট উঁকি দিয়েছে অল্প স্বল্প। শরীরও খানেক ভার হয়েছে। এখন তার আগের মতো খাবারে অনিহা বা শরীরে দুর্বলতা নেই। বেশ ভালোভাবেই দিন কাটে আজকাল। কৃশানেরও পুনরায় আগের রোটিন অনুযায়ী কর্মময় দিন কাটতে শুরু করে।
মিঠুকে নিয়ে শূন্য বাড়িতে বসে আছে হুমায়রা। আপাতত মির্জা নিবাসে সে ও কৃশান ব্যতীত কেউ নেই। ইকরা শ্বশুর বাড়িতে চলে গিয়েছে, জিনিয়া গিয়েছে বাবার বাড়ি, আর ইয়াসমিন বেগম ও নাজমিন বেগম গিয়েছেন নাজমিন বেগমের অসুস্থ মাকে দেখতে। আগামীকালই এসে পড়বেন। হুমায়রার পরনে টকটকে খয়েরী জমিনের গোল্ডেন পাড় বিশিষ্ট একটা কাতান শাড়ি। গতকাল রাতেই তার জন্য এটা এনেছে কৃশান। আজকে ক্যাফেতে যায়নি সে। এখন মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়েছে। সেই সুযোগেই স্বামীর ইচ্ছে মোতাবেক তৈরি হয়ে নিয়েছে রমণী।
কৃশান বাড়ি ফেরে প্রায় দেড়টার দিকে। কক্ষে প্রবেশ করতেই ক্ষণিকের জন্য থমকে যায় সে। শাড়ি পরিহিত টুকটুকে খয়েরী পরীকে দেখেই বরাবরের ন্যায় বুকে বেসামাল ঝড় উঠল। ওয়ারড্রপের কাছে কৃশানের শার্ট ভাঁজ করছিল হুমায়রা। দরজা খুলার শব্দে চোখ ঘুরিয়ে এদিকটায় তাকাল সে। মানুষটার গভীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলতেই খানেক ছেৎ করে উঠল বুক। কৃশান ধীর পায়ে ওঁর নিকট এগিয়ে এলো। পরপর ড্রয়ার খুলে কিছু একটা খুঁজতে লাগল।

“ কি খুঁজছেন? ”
মেয়েটার প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মানুষটাকে দেখার আগেই তার উপরে একটা টকটকে খয়েরি দুপাট্টা স্থান পেল। বিস্মিত পল্লব ঘন ঘন ঝাপটে দুপাট্টার দিক তাকাল হুমায়রা। এর মাঝেই দুপাশে দুটো পুরুষালী হাত রেখে তাকে অস্পর্শ বাহুবন্ধনে আবদ্ধ কৃশান। মেয়েটার পিঠ ঠেকল ওয়ারড্রপের শক্ত কাঠে। অকস্মাৎ স্বামীর এমন অদ্ভুত কান্ড কারখানায় চোখ বড় বড় হয়ে যায় রমণীর। চোখের সামনে আসা দুপাট্টা টা সরাতে চায়। ওমনিই কোনোরূপ বিলম্বিহীন তাকে বাঁধা দেয় কৃশান। অসন্তুষ্ট গলায় উচ্চারণ করে,
“ উহ…! ”
পৃষ্ঠে হুমায়রা অবাক কণ্ঠে শুধায়,
“ কি করছেন? ”
“ বউ দেখছি…! ”
মোহগ্রস্ত স্বর কৃশানের। হুমায়রা খানেক শিউরে উঠে। অনেকদিন যাবৎ স্বামীর এই বেপরোয়া সত্তাটার দেখা পায়নি সে। গত তিনটা মাস প্রতিটা পদে পদে মানুষটার যত্নশীল আর ধৈর্য্যশীল সত্তা টাকেই দেখে এসেছে। আজকে হঠাৎ কি হলো মানুষটার? কৃশানের ওমন গভীর দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারেনা হুমায়রা। এলোমেলো দৃষ্টি লুকাতে চিবুক নামায়। ফের শুনতে পায় একই কণ্ঠ,
“ সেদিন কতটা নির্বোধ ছিলাম আমি…! যেদিন এই টুকটুকে বউটা আমার সামনে বসে ছিল অথচ আমি তার দিকে ফিরেও তাকায়নি! যদি একটা পলক দেখতাম তাহলে নিশ্চিত সেই নেশাগ্রস্ত আমি সেদিনই তোর নেশায় মত্ত হতাম!”

পৃষ্ঠে হুমায়রা কিছু বলতে সক্ষম হয়না। কৃশান ঘোমটা টেনে তুলে, দেখে ওর লালাভ মুখশ্রী। হুট করেই গভীর চুমু খায় স্ত্রীর কপালে। এরপর গালে, নাকে, চোখের পাতায় একে একে পুরো মুখমন্ডল জুড়ে। স্বামীর উষ্ণ পরশে রমণীর ভিতরে প্রকাণ্ড ঝড় শুরু হয়। তবে টিকে না বেশিক্ষণ। এর মধ্যেই কৃশান ওর ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলে উঠে,
“ একেবারে আমার ক্ষেতের দেশি টমেটো! ”
হুমায়রা হতভম্ব হয়, সরু চোখে চেয়ে বলে,
“ কি…? ”
“ দেশি টমেটো। ”
মুহূর্তেই মেয়েটার লজ্জা রাঙা মুখশ্রী পাল্টে যায়। ওর কুঁচকানো মুখের দিক তাকিয়ে কৃশান প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“ কি হলো? গালমুখ এমন ফুলিয়েছিস কেন? একটু আগেই তো ঠিক ছিল। পরে কিন্তু দেশি টমেটো থেকে হাইব্রিড হয়ে যাবি। ”
হুমায়রার মেজাজ খারাপ হয়। সে শাড়ি পরেছে কই একটু প্রশংসা করবে মানুষটা তা না! কি আজগুবি কথাবার্তা বলছে! আজ অব্দি কোনোদিনও তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছে বলে তো মনে পড়ছে না। সবসময় শুধু দেশি টমেটো, দেশি টমেটো লাগিয়ে রাখে। মেয়েটার ভালো মুডটাই টমেটোময় হয়ে গেল! সে বিরক্তি নিয়ে বলল,

“ ধেৎ, দেখি ছাড়ুন তো আমাকে। সবসময় শুধু আজগুবি কথাবার্তা আপনার! ”
“ আজগুবি কি বললাম? ঠিকি তো বললাম। ”
“ আচ্ছা ঠিকি বলেছেন আপনি, আমি টমেটোই। এখন ছাড়ুন আমায়। ”
কৃশানের বাহু বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালায় সে। ব্যার্থ হয়ে মাথা নুইয়ে হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ধপ করে শুয় গিয়ে বিছানায়। কৃশান ভ্রূ কুঁচকে ওর কান্ড কারখানা দেখে। পরপর নিজেও এগিয়ে আসে। গা ঘেঁষে শুয় স্ত্রীর পাশে। তৎক্ষনাৎ সরে যায় রমণী। ঝাঁঝাল গলায় বলে,
“ কাছে ঘেঁষবেন না একদম। ”
বলতে দেরি অথচ ওঁকে এক টানে নিজের সাথে মিশাতে দেরি হলো না মানুষটার। ছটফট করে উঠল মেয়েটা। ছাড়ানোর চেষ্টা করলেই শুনতে পায় মানুষটার শক্ত কণ্ঠ,
“ সমস্যা কি? বাইন মাছের মতো এভাবে মুচড়া মুচড়ি হচ্ছে কেন? ”
“ ছাড়ুন আমাকে তাহলেই তো হয়না! ”
“ ছাড়ব না, কি করবি? ”
“ বউয়ের প্রশংসা করতে পারেন না আবার কাছে আসেন কেন বখাটে পুরুষ! ”
বহুদিন পর চিরপরিচিত নামটা কর্ণপাত হতেই হেসে ফেলল কৃশান। ওভাবেই মেয়েটাকে আরেকটু কাছে টেনে বলল,

“ প্রশংসা লাগবে? ”
“ লাগবে না আপনার প্রশংসা! ”
মেয়েটা ছটফট করে ছুটার জন্য তখনি আচল ভেদ করে ওর গলায় মুখ গুঁজে দেয় কৃশান। ওমনিই সকল নড়চড় বন্ধ হয়ে যায় রমণীর। সহসা ওর গলার নরম বাকে কামড় বসিয়ে দেয় মানুষটা। অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠে হুমায়রা। কানের কাছে শুনতে পায় একটা ফিসফিসে স্বর,
“ যে সৌন্দর্যের বর্ণনা হয়না সেই সৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসা কীভাবে করব? শুধু এটুকু জেনে রাখ- তোর সৌন্দর্য আমার পুরুষ সত্তাটাকে ভীষণ ভাবে মোহিত করে। ”
বলেই কামড় দেয়া স্থান টায় ঠোঁট ছুঁয়ায় কৃশান। হুমায়রার সব রাগ অভিমান ঝড়ে যায় নিমিষেই। মানুষটার ভালোবাসার কাছে ফিকে হয় প্রশংসারা।

নানা বাড়ি থেকে আসার পরপরই উবায়দুল্লাহ খুব অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। একশো প্লাস জ্বর ছেলেটির। ঔষুধ খাওয়াতে গেলে সে কি কান্নাকাটি ছেলের সাথে সাথে ইকরার অবস্থাও নাজেহাল দশা হচ্ছে। সারারাত এক পলের জন্যও চোখ বন্ধ করা দুষ্কর। মা-ছেলের এই অবস্থা দেখে উমরের মন মস্তিস্ক অস্থির। তবে উপরে উপরে নিজের শান্ত সত্তাকে প্রদর্শন করার চেষ্টায় অব্যাহত।
রাত তখন বারোটা কি একটা মাত্রই ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে একটু চোখটা লেগেছিল ইকরার। ওমনিই শিশুটি জেগে ওঠে ফের কান্না জুড়ে দিল। মেয়েটার মাথা পুরো ধরে আসলো, ছেলেকে থামানোর জন্য শরীর কোনোভাবেই সায় দিচ্ছে না। রমণী সামান্য অস্ফুট স্বরে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করল। উমরেরও ঘুম ভেঙে গেছে। সে স্ত্রী-ছেলেকে একবার পরখ করে বিলম্বহীন উঠে বসে। হাত বাড়িয়ে ছেলেকে আলতো হাতে কোলে নেয়। তৎক্ষনাৎ শিশুটির শরীরের উত্তপ্ততায় চমকে উঠল মানব। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে মোলায়েম কণ্ঠে বলে,
“ ইকরা..? একটু কষ্ট করে ওকে খাইয়ে দাও। জ্বর আবার বেড়েছে ঔষুধ খাওয়াতে হবে। ”
সময় নিয়ে লালিত চোখ মেলে ইকরা। সিক্ত নয়নে চায় ছেলেকে। উমর ওর পাশে শুইয়ে দেয় ছেলেকে। অতঃপর খাওয়ানো শুরু করে ইকরা।

“ তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে? ”
স্বামীর শীতল কন্ঠের পৃষ্ঠে ইকরা দুর্বল গলায় জবাব দিল,
“ উহু, তবে মাথাটা অনেক ব্যথা করছে। ”
ইকরা চোখ বুঁজে রাখে। উমর গিয়ে টেবিলের উপর হতে মাথা ধরার মলম নিয়ে আসে। স্ত্রীর শিয়রে বসে হাত রাখে কপালে। ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেয়ে নিভু নিভু চোখ স্বামীর পানে। শুনতে পায় তার শান্ত স্বর,
“ ঘুমাও তুমি, আমি মলম লাগিয়ে দিচ্ছি। ”
“ ওকে ঔষুধ খাওয়াতে হবে তো। ”
“ আমি আছি তো? সামলে নিব আমি। তুমি ঘুমাও। ”
“ আপনিও তো ও বাড়ি থেকে আসার পর একদিনও ঘুমাতে পারেননি? ”
“ আমার নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে। আমার ঘুম, জাগরণ সব জায়গাতেই আমার স্ত্রী- সন্তানের রাজত্ব চলে। সুতরাং তাদের নিয়ে আমার সবটুকু। ”
ইকরা দুর্বল হাসে, চোখ জোড়া বন্ধ হয় নিশ্চিন্তে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইকরার ঘুমিয়ে পড়ে। উবায়দুল্লাহর খাওয়া শেষ হতেই ওকে সযত্নে ঔষুধ খাইয়ে দিল উমর। পরপর ছেলেকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াল। নিজের ঘুমকে তোয়াক্কা করল না। অতঃপর আরো একটি নির্ঘুম রাত কাটাল মানব।

পরদিন সকালে,
ফজরের পরপরই ইয়াসমিন বেগমের কল এলো। হুমায়রা কল ধরতেই তিনি জানালেন,
“ আমরা রওনা হচ্ছি। ”
উত্তরে বরাবরই শুনতে পেলেন পুত্রবধূর বিনয়ী স্বর,
“ আচ্ছা আম্মু, সাবধানে রওনা হবেন। ”
“ আচ্ছা। কৃশান কোথায়? ”
শাশুড়ির কথায় ফোন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর পানে তাকাল হুমায়রা। তারা এখন হাঁটতে বেরোবে। তার জন্য সে তৈরি হচ্ছে। তখনি ইয়াসমিন বেগম কল দিয়েছেন তাই কল ধরে ফোন ওঁর সামনে ধরে রেখেছে কৃশান আর ওঁ রেডি হচ্ছে।

“ এখানেই আছে আম্মু। ”
সন্তুষ্টজনক উত্তর পেয়ে আর কথা বাড়ালেন না ইয়াসমিন বেগম। এখানেই কথার সমাপ্তি টানলেন।
শুনশান নীরবতায় ঘেরা একটি চেনা ভোর। রাস্তায় হাতের ভাঁজে হাত রেখে হাঁটছে এক জোড়া কপোত কপোতী। হঠাৎই রমণী হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে। হুমায়রা কে থামতে দেখে কৃশান তৎক্ষনাৎ নজর আবদ্ধ করল ওঁকে। মেয়েটার চোখে ক্লান্তির ছাপ, সবসময় বাইক রাইডিং এ অভ্যস্ত হয়ে এখন বেশি হাঁটলে পা ধরে আসে তার। প্রেগন্যান্সির আগ অব্দি প্রতিটা সকালই বাইক নিয়ে বেরিয়েছি তারা কিন্তু প্রেগন্যান্সির পর থেকে বাইকের ধারে কাছেও তাকে ঘেঁষতে দেয়নি কৃশান। হাঁটতে বেরোলে এভাবেই আসতে হয়। এতদিন শরীরের দুর্বলতার জন্য তেমন হাঁটতে বের হয়নি। তবে এখন থেকে আবার শুরু হবে এই সুন্দর মুহূর্তটা। হুমায়রার কাছে খুব ভাল্লাগে এই মুহূর্ত টা। প্রতিদিন ফজরের পর মানবশূণ্য রাস্তায়, আবছা আলোয় স্বামীর হাত ধরে হাঁটা- এটাই যেন জীবনের অন্যরকম সুখময় অধ্যায়।

“ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে? ”
“ হুম, একটু জিরিয়ে নেই তারপর……”
কথাটুকু মুখেই রয়ে যায় রমণীর। বাকি শব্দ নির্গত হওয়ার আগেই তাকে শূন্যে তুলে নিল কৃশান। কানের কাছে ঠান্ডা গলায় জানান দিল,
“ ক্লান্তি নিয়ে হাঁটতে হবে কেন? এই হাত গুলো তো তার প্রাণপাখির ক্লান্তি দূর করতেই বরাদ্দ রয়েছে! ”
হতবিহ্বল হস্ত যুগল দিয়ে তড়িৎ মানুষটার গলা পেঁচিয়ে ধরল হুমায়রা। পরপর বাতাসের সাথে আসা লাইনগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই খানেক স্তব্ধ হলো। তার সব স্তব্ধতার উর্ধ্বে গিয়ে ফের শোনা গেল একই স্বর,

“ তোমাকে নিয়ে আজ অব্দি বিকেলের শহর দেখতে বের হয়নি কখনো অভিযোগ করোনা। বিকেলে ঐ মানবপূর্ণ শহর আমার একান্ত শহরের প্রতি নজর দিবে যা শহরের মালিকের মোটেও সহ্য হবে না। তাই যখন পুরো শহর নিদ্রারাজ্যে হারিয়ে থাকবে আমি ঠিক তখনি আমার শহর নিয়ে ভোরের এই ঘুমন্ত শহরে রাজত্ব চালাব। আমাদের প্রতিটা সকাল এভাবেই কেটে যাবে। তোমার এতে আপত্তি হবে না তো? ”
হতবাক হুমায়রার চোখের পলক যেন পড়ছেই না। একেকটা শব্দ আর কৃশানের করা তুমি সম্বোধন একেবারে থমকে আছে সে। কৃশান এই অব্দি যতবার তুমি বলার চেষ্টা করেছে আগে, পিছে একবার না একবার তুই লাগিয়ে দিয়েছে। এই নিয়ে মতোই না হেসেছে হুমায়রা। এই প্রথম পুরো কথোপকথন তুমিময় হলো মানুষটার। সে কিয়ৎক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকে। অতঃপর সময় নিয়ে উত্তর দেয়,

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৮

“ আমার মানবপূর্ণ শহরের প্রয়োজন নেই। আমারতো মানবশূন্য ভোরের ভিড়ে রাজত্ব চালানো নীরব শহরের এই মালিককেই খুব করে প্রয়োজন। ”
কৃশান মৃদু হাসে স্ত্রীর সরাসরি স্বীকারোক্তি পেয়ে। অতঃপর নির্দ্বিধায় পা চালায় সামনে।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here