Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৭ (২)

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৭ (২)

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৭ (২)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

কৃশানের এখন দুটো ক্যাফে। দুটোই বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। একটাকে সামলায় সে ও অভি। আর অপরটাকে রবি ও সাইফুল। পাশাপাশি দুটো তেই গুটিকয়েক ছেলে রাখা হয়েছে। তবে আজ কৃশান না থাকায় তার কথা মতোই একটা অফ রেখে তিন বন্ধু মিলে অপরটাকে সামাল দিচ্ছে। তিন বন্ধু যখন কর্মে ব্যস্ত তখনি হুট করে সেখানে আগমণ ঘটল কৃশানের। তিনজনেই বেশ অবাক হলো। কারণ রবি যে কান্ড ঘটিয়েছে এরপরও আজকে ক্যাফেতে কৃশানের আগমণ মোটেও আশা করেনি তারা। কৃশান সামনে এসেই সরাসরি রবির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল,

“ তুই-ই আম্মুকে এখান অব্দি নিয়ে এসেছিস না? ”
বেচারার মুখটা এইটুকুনে হয়ে গেল। অসহায় স্বরে স্বীকারোক্তি দিল,
“ মামা আমি ইচ্ছেকৃত কিছুই করি নাই। আমি বাসায় গেছি পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি তোর আম্মু আমাদের এখানে হাজির। কিভাবে আমার যাওয়ার খবর পেয়েছে তাও জানিনা। ওখানে গিয়ে যেই আহাজারি শুরু করল আমার সামনে। আমি আর সহ্য করতে পারি নাই। তাই বাধ্য হয়েই নিয়ে এসেছি। ”
“ ওসব বাদ, এখন তোকে কথা খেলাপের জন্য শাস্তি হিসেবে কি দেয়া যায় সেটা হচ্ছে ব্যাপার। ”
ভাবুক চিত্তে উত্তর করল কৃশান। রবি অসহায় ফেস নিয়ে চাইল বাকিদের পানে। যেন তার হয়ে একটু সাফাই গায়। বন্ধুর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে সাইফুল বলল,

“ থাক না মামা, এখন…..”
“ তোরা কোনো কথা বলবি না। আমার সব বুঝাপড়া ওর সাথে। ”
বলেই শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে রবির নিকট এগোতে লাগল সে।
“ দেখ মামা এটা কিন্তু ঠিক না? এখানে আমার কি দো……”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না রবি। এর আগেই সকলকে চারশ আশি ভোল্টেজের ঝটকা খাইয়ে রবিকে জড়িয়ে ধরল কৃশান। মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল দুটো অপ্রত্যাশিত শব্দ,
“ শুকরিয়া দোস্ত…..! ”
একে তো কৃশানের কার্যকলাপ সাথে এই প্রথম ‘দোস্ত’ শব্দটা শুনতেই তব্দা খেল উপস্থিত সকলে। রবি তো বিপরীতে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরতেই ভুলে গিয়েছে। এর মাঝেই তাকে ছেড়ে দিল কৃশান। পরপর দুহাত বাড়িয়ে বাকি দুই বন্ধুর গলা জড়িয়ে ধরল। বলল,
“ তোদের মতো বন্ধু পাওয়া পুরোটাই ভাগ্যবান দের ব্যাপার। কখনো ভাবিনি আমার মতো বখাটের নসিব এতটা সুন্দর লিখে রেখেছিল খোদা! সবসময় আমার এতটা পাশে থাকার জন্য শুকরিয়া। চিরজীবন তোরা এই অধমের পাশে এভাবেই থাকিস। ”
“ তুই আমাদের জন্য শুরু থেকে যা যা করে এসেছিস এর পরিবর্তে আমরা যেটুকু পাশে থেকেছি তা খুবই নগণ্য দোস্ত। ”

“ উহু, আমি তোদের জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি। ”
“ আচ্ছা, তাহলে মামির মতো একটা বউ খুঁজে দিয়ে কিছু করে দেখা! ”
রবির কথায় ভ্রূ কুঁচকে চাইল কৃশান। উত্তর করতে সময় নিল না,
“ পুরো ধরণীর বুকে খুঁজেও ওঁর মতো কারো সন্ধান মিলবে না। হুজুরনী অনেক আছে তবে কৃশানের হুজুরনীর মতো কেউ হতে পারবে না। ওটা ওয়ান পিসই আছে, আর সেটা একান্তই কৃশান মির্জার। ”
হাসল রবি। এ ব্যাপারে আর কথা বাড়াল না। নয়তো মির্জার এই বংশধর তাকে নির্বংশ করে দিবে।
“ আচ্ছা এসব বাদ, এখন বল ওদিকে সব মিটমাট হয়েছে? আর তোর বোন বাসায় ফিরেছে..? ”
“ আমার বোনের খবর দিয়ে তুই কি করবি? ”
কপাল চাপড়ায় বেচারা। অতিষ্ট কণ্ঠে বলে,
“ লাফাঙ্গা কোথাকার, তোর বোন বিবাহিত আমি জানি তো রে! আন্টি বলল তুই বাসা থেকে বের হওয়ার পর তোর বোনও নাকি ও বাড়িতে পা রাখেনি। আর নাতো তোর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে! তাই জিজ্ঞেস করলাম। ”

বাক্যগুলো কর্ণপাত হতেই কিছু পলের জন্য থ হয়ে রইল কৃশান। এজন্যই তাহলে তখন বাড়ির সবাই ইকরার বাচ্চা দেখে এমন রিয়েক্ট করেছিল! যেন অষ্টম আশ্চর্যের ব্যাপার। সে তো এতকিছু ভেবেই দেখেনি। ভাগিনা কে কোলে নিয়ে রুমে চলে গিয়েছিল। ইকরাই গিয়ে তার কাছ থেকে উবায়দুল্লাহ কে নিয়ে এসেছিল। কই তখনো তো কিছু বলল না?
“ কিরে কিছু বলছিস না যে? ”
ধ্যান ভাঙল মানবের। শান্ত কণ্ঠে জানাল,
“ হুম, আমরা বাড়ি যাওয়ার পর পরই ইকরা এসেছে। ”
“ আলহামদুলিল্লাহ, ফাইনালি মির্জার গুষ্টি আবার এক হলো ! ”

রজনীর তিমিরতা ঘিরে ধরেছে ধরণীকে। পথে পান্তরে আঁকা হয়েছে নীরবতার নিপুণ চিত্র। কেবল মৃদু মন্দ বাতাসে পাতা দের সংঘর্ষের শব্দ ভেসে আসছে বারান্দার ফাঁক গলে। বই ভর্তি বুক সেল্ফের সাথে হেলান দিয়ে হাদিসের বই পড়ছে হুমায়রা। কখনো বা তৃষ্ণার্থ চোখ জোড়া বইয়ের পৃষ্ঠা হতে সরে গিয়ে চাইছে দরজার পানে। অপেক্ষিত মন কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির আগমনের প্রহর গুনছে। তখনি শব্দ করে বাড়ির মেইন গেইট পেড়িয়ে একটা বাইক প্রবেশ করল। রমণীর পদযুগল তৎক্ষনাৎ ছুটল বারান্দার দিকে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইক থেকে নামতে দেখল মানুষটাকে। কৃশানের মস্তিস্ক জানান দিল বারান্দা দিয়ে এক জোড়া নয়ন তাকেই দেখছে। তবে সে চোখ তুলে তাকাল না সেদিকে। নিচের দিক তাকিয়ে সরাসরি কক্ষের সামনে এসে থামল। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে দরজা খুলে দৃশ্যমান হলো হুমায়রার শান্ত বদন। সেদিকে তেমন মনযোগ দিল না মানব। অভ্যাস মোতাবেক পাঁচটি বই আর ফুল হুমায়রার হাতে ধরিয়ে, কপালে শব্দহীন চুমু খেল। মেয়েটার মন প্রফুল্ল হলো। ভাবল মানুষটা হয়তো তার উপর অতোটাও রেগে নেই। হাসি মুখে কিছু বলতে নিচ্ছিল সে। ওমনিই তাকে হতভম্ব করে দিল মানুষটার পরবর্তী কান্ড কারখানা।

“ তিন মাইল দূরে থাক.! ”
হুমায়রার প্রফুল্ল মুখের উপর বাক্যটি ছুঁড়ে দিয়ে সম্পুর্ণ লাপাত্তা ভাবে রুমে ঢুকে গেল কৃশান। মেয়েটার চোখ কপালে, ভ্যাবাচেকা খেয়ে হা হয়ে আছে মুখশ্রী! কিছুক্ষণ আহাম্মকের ন্যায় তাকিয়ে রইল সে। পরক্ষণেই পূর্বের সেই নিয়মিত বাক্য খানা একবার নিজ মুখে উচ্চারণ করল ভরকানো কণ্ঠে,
“ তিন মাইল দূরে থাক……? ”
ততক্ষণে বিলম্বহীন ওয়াশরুমে ঢুকে গেছে কৃশান। কুঁচকানো আঁখিতে ওয়াশরুমের দরজার দিক চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই বলার সুযোগ পেল না হুমায়রা। হাতের বই গুলো নিয়ে ঠেসে দিল বুক সেল্ফে। ফুলগুলো স্থান পেল বইয়ের পাতার ভাঁজে। অতঃপর সময় নিয়ে যখনি বইগুলো মেলা হয় প্রত্যেকটিতে খুঁজে পাওয়া যায় একটি শুকনো টিউলিপ। যার ঝরা দলমন্ডলের আড়ালে জীবিত থাকে এক প্রেমিক পুরুষের পবিত্র ভালোবাসার অনুভূতি!
পাক্কা মিনিট দশেক পর তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরোলো কৃশান। পরনে কেবল কালো ট্রাউজার প্যান্ট, খালি গা তার। ঘন লোমশ যুক্ত বুকে চিকচিক করছে বিন্দু বিন্দু জল। সে এগিয়ে এসে ভণিতা হীন তোয়ালে টা খাটের মাথায় রাখল। পরপর হুট করেই রুমের লাইট অফ করে দিয়ে শুয়ে পড়ল। পাশে যে কেউ বসে আছে তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করল না। ডিম লাইটের মৃদু আলোয় সটান দেহে শুয়ে থাকা স্বামীর পানে তাকিয়ে রইল হুমায়রা। সময় নিয়ে ক্ষীণ স্বরে ডাকল,

“ শুনছেন…? ”
চোখের উপর হাত দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে রইল মানব। ফের শোনা গেল একই স্বর,
“ এইযে শুনছেন….? আপনি কি তখনকার মিথ্যে টা নিয়ে আমার উপর রেগে আছেন? আসলে তখন সত্যি টা বললে তো আপনি আসতেন না। আর ওমন অসময়ে অন্য কিছু বলারও………..”
“ কারো সাফাই শুনতে ইচ্ছুক নই আমি! ”
“ আর কখনো এমন…….”
“ আরেকটা শব্দও যেন না শুনতে হয়! ”
এবেলায় খানেক উচ্চ স্বরেই বলল কৃশান। মানুষটার এমন চড়া গলার বিপরীতে আর কিছু বলার সাহস পেল না হুমায়রা। গোমড়া মুখে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। অর্ধেক রাত এপাশ ওপাশ করেই নিদ্রাহীন কাটল রমণীর। আড়চোখে সেই দৃশ্য পরখ করল কৃশান। তবে টলল না একটুও। অসুস্থতা নিয়ে মিথ্যে বলা না? তার দুর্বলতার সুযোগ নেয়া? এইটুকু শাস্তি তো পাওনাই ওর।

ফজরের দিকে উমরের সাথে মসজিদে গিয়ে সালাত শেষ করে এলো কৃশান। বাসায় ফিরেই দিব্যি একটা ঘুম দিল। পুরোরাত ঘুম না হওয়ায় বেশ লম্বা সময় পরেই ঘুম ভাঙল তার। ঘড়িতে তখন আটটা ত্রিশ মিনিট, বিছানা ছেড়ে তাড়াহুড়য় রেডি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।
ড্রয়িং রুমে উবায়দুল্লাহ কে নিয়ে বসে আছেন ইয়াসমিন বেগম ও নাজমিন বেগম। রান্নাঘরে তখন সকালের নাস্তা তৈরি করছে জিনিয়া ও হুমায়রা। ছেলেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরুতে দেখে ইয়াসমিন বেগম ব্যস্ত হয়ে বললেন,
“ কিরে খাবার না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস? ”
“ আজকে লেট হয়ে গিয়েছে আম্মু। যেতে হবে এখন। বাইরে খেয়ে নেব চিন্তা করোনা। ”
“ নাস্তা তো হয়েই গিয়েছে খেতে আর কতক্ষণ লাগবে? খেয়ে যা? ”
কে শুনে কার কথা? ততক্ষণে বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে চলে গিয়েছে কৃশান। ভদ্রমহিলা ফুস করে নিশ্বাস ফেললেন ছেলের কাণ্ডে। বড় জায়ের নিকট নালিশ করে বললেন,
“ খেয়ে যেতে আর কতক্ষণ লাগতো? ”
“ বেশি লেট হয়ে গিয়েছে হয়তো। চিন্তা করোনা বাইরে খেয়ে নেবে। ও তো এখন আগের মতো আর বেপরোয়া নেই এখন। ”
বিপরিতে কিছু বললেন না ইয়াসমিন বেগম। এর মাঝেই নাস্তা হাতে ড্রয়িং রুমে এলো জিনিয়া। খাবার টেবিলে রেখে শ্বাশুড়ি দের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ল,

“ আম্মু, ছোট আম্মু নাস্তা তৈরি হয়ে গিয়েছে। উমর ভাইয়ার নাস্তাও রেডি করা আছে ইকরাকে বলুন এসে নিয়ে যেতে! ”
কথা শেষে আবারও রান্নাঘরে ফিরে এলো সে। হুমায়রা উদ্দেশ্যে বলল,
“ চলো খেতে চলো। বাকি কাজ খাওয়ার পর করব নে। ”
“ আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না ভাবি। পরে ইচ্ছে হলে খেয়ে নিব। আপনারা খেয়ে নিন। ”
“ ওমা কেন? ”
“ এমনিতেই। ”
জিনিয়া কিছুক্ষণ হুমায়রার মলিন মুখ খানা পরখ করল। সকাল থেকেই লক্ষ্য করছে মেয়েটাকে। মনে হচ্ছে কোনোকিছু নিয়ে মন খারাপ। সে মোলায়েম কণ্ঠে শুধাল,

“ তোমার কি কোনো কিছু নিয়ে মন খারাপ হুমায়রা? কৃশানের সাথে মন মালিন্য হয়েছে বুঝি? ”
সরাসরি প্রশ্নে হুমায়রা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। বিষয়টা বুঝতে পারে জিনিয়া।
“ আমাকে নিজের বড় বোন ভাবতে পারো। যদিও আমি তার অযোগ্য। কিন্তু আমি আমার ভুলের জন্য সত্যিই অনুতপ্ত হুমায়রা। আমার তো কোনো ভাই বোন নেই তাই ছোট দের প্রতি আমার সহজে সফট করনার তৈরি হয়না। প্রথম প্রথম তোমাকে আমার মোটেও সহ্য হতো না এটা ঠিক। বাট বিলিভ মি, এখন আমি তোমাকে নিজের বোন বানাতে চাই। বড় হিসেবে মেনে নিবে আমায়? ”
হুমায়রা এবার চোখ তুলে তাকায় জিনিয়ার পানে। সামনের রমণী এই অব্দি কতবার তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে জানা নেই। সে স্নিগ্ধ হেসে জবাব দেয়,
“ নতুন করে আবার মেনে নিতে হবে কেন? আপনিতো এমনিতেই আমার বড় বোন। ”
জিনিয়ার ঠোঁট প্রসারিত হয়। হুমায়রার হাত ধরে বলে,

“ আচ্ছা এবার তাহলে খেতে চলো। ”
“ না ভাবি আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না! ”
“ ভাবি না, আপু বলবে। আর হ্যাঁ আমি জানিনা কৃশানের সাথে কি নিয়ে মন মালিন্য তোমার। তবে এসব নিয়ে খাবারের সাথে অনিহা করলে হবে না। মন মালিন্যতা আবার একটু পরই ঠিক হয়ে যাবে। তোমার ভাইয়ার সাথেও তো মাসের ঊনত্রিশ দিনই রাগারাগি করে কাটে আমার। ”
“ না ভা…স্যরি আপু, ওসবের জন্য না। আমার এমনিতেই খেতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে হলে খেয়ে নিব আপনি চিন্তা করবেন না। ”
এবেলায় এসে আর জোড় করল না জিনিয়া। হুমায়রার কথাই মনে নিয়ে বলল,
“ আচ্ছা, পরে খেয়ে নিও কিন্তু। ”

দুপুরের দিকে, একসাথে সালাত আদায় করে নামাজঘর থেকে বেরোলো হুমায়রা, ইকরা ও জিনিয়া। ইকরা নানান কথা বলে যাচ্ছে। সেসব মনযোগ দিয়ে শুনছে জিনিয়া। হুমায়রা তাতে মনযোগ দিতে পারছে না। তার মাথা ঘুরাচ্ছে। অবশ্য ইদানিং এই বিষয়টা বেশ সাধারণই তার জন্যে। খাওয়ায় অনিহা, শরীরের দুর্বলতা, মাথা ঘুরানো দুয়েকদিন যাবৎ একটু বেশিই হচ্ছে তার। সকাল থেকে এখনো কিচ্ছুটি মুখে নেয়নি সে। খাবারের সামনে গেলেই পেট গুলিয়ে উঠে কেমন। কিন্তু শরীর তো এত কিছু বুঝেনা। তার দরকার শক্তি, আর খাবার না খেলে শক্তি আসবে কোথা থেকে? এইযে এখন শশীর অসার হয়ে আসছে তার। হঠাৎ করেই সামনের সবকিছু ঘোলাটে হয়ে যেতে লাগল। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না মেয়েটার। পাশে থাকা ইকরাকে খামচে ধরল সে। সাথেই সাথেই ভরকানো চোখে তার দিকে ফিরল রমণী। কিছু বুঝে উঠার আগেই নিজের প্রিয় বান্ধবীর দেহ ঢলে পড়তে লাগল মেঝেতে। ইকরা আঁতকে উঠল। হুমায়রার মাথাটা শক্ত ফ্লোর ছুঁয়ার আগেই তা আঁকড়ে ধরল নিজ হাতে। চিৎকার করে ডাকল,

“ হুমায়রা…..! ”
মেয়ের চিৎকার শুনে ড্রয়িং রুমে থাকা দুই কর্তির বুক কেঁপে উঠল। দুজন একবার চোখাচোখি করে ছুট লাগালেন সেদিকে। বাড়িতে তখন পুরুষ সদস্যের কেউই উপস্থিত নেই। কৃশান ঢাকায় আর উমর মসজিদে গিয়েছে নামাজ পড়তে। ইয়াসমিন বেগম পুত্রবধূর লতানো অবস্থা দেখে দিশেহারা প্রায়। তার কোলেই ঘুমিয়ে আছে পাঁচ মাসের উবায়দুল্লাহ। নাতিকে নিয়ে কোনকিছুতে সুবিধা করে উঠতে পারছেন না।
“ একি কি হয়েছে ওর….! ”
“ তেমন কিছু হয়নি ছোট আম্মু, চিন্তা করবেন না। আম্মু আপনি একটু হুমায়রা কে ধরুন আমি পানি নিয়ে আসছি। ”
জিনিয়ার কথায় নাজমিন বেগম নিজেই ছুটলেন পানির জন্য। ইকরা ততক্ষণে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে। জিনিয়া ওঁকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেও থামছে না। এর মাঝেই নাজমিন বেগম পানি নিয়ে ফিরে আসলেন। হুমায়রার চোখে মুখে পানি ছিটানো হলো। চোখে মুখে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেতেই পিটপিট করে চোখ খুলল হুমায়রা। সকলে খানেক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। নিভু নিভু চোখে সবগুলো চিন্তিত মুখ পরখ করল হুমায়রা। জিনিয়া ওর মুখের সামনে পানি ধরল। দু ঢোক পানিও পান করতে পারল না মেয়েটা। এর আগেই পেট গুলিয়ে উঠল। পেটে কিচ্ছু না থাকায় পানিগুলোই বেরিয়ে এলো। ইয়াসমিন বেগম আর দেরি করলেন না। তড়িঘড়ি হাতে কল লাগালেন নিজের পরিচিত মহিলা চিকিৎসক এর নম্বরে। অতঃপর হুমায়রা কে ধরে রুম অব্দি নেয়া হলো।

পরিবেশ যতটা থমথমে হওয়ার কথা ছিল ঠিক ততটাই স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। উল্টো সকলের চোখে মুখেই খুশির ঝিলিক। হুমায়রার হাতে স্যালাইন লাগানো। বিছানায় নেতিয়ে আছে সে। সামনেই বসা মধ্য বয়স্ক এক মহিলা। ইয়াসমিন বেগমের বয়সীই হবেন। পরনে ডাক্তারি পোশাক। ডা. নাছিমা বেগম, মির্জা বাড়ির সদস্য দের নিয়মিত ডাক্তার তিনি। যে কারো কিছু হলেই সবার আগে তার ডাক পরে এখানে।
“ তাহলে এখন তো আর কোনো চিন্তার বিষয় নেই নাছিমা? সবকিছু ঠিকঠাক? ”
ইয়াসমিন বেগমের কথায় হাসি মুখে ফিরে চাইলেন তিনি। জবাবে বললেন,
“ হুম আল্লাহর রহমতে সবি ঠিকঠাক। তবে এখন থেকে ভালো যত্ন নিতে হবে কিন্তু। শরীরে কিচ্ছু নেই দেখি মেয়ের? এমন বয়সে মেয়েদের শরীর কত টসটসে থাকে। তুমি কি না খাইয়ে রাখো নাকি ছেলের বউকে? ”

“ আর বলো না নাছিমা, হাজার বলেও খাওয়াতে পারিনা ছেলে মেয়েদের। খাওয়ার প্রতি এতো অনিহা ওদের! ”
“ অনিহা হলেও খেতে নবে। নয়তো পরবর্তীতে অনেক প্রবলেম হবে। আর ছেলে কোথায়? বউয়ের প্রতিআদৌ ধ্যান জ্ঞান আছে কিনা তার? ”
ইয়াসমিন বেগম কেবল উত্তর করতেই নিচ্ছিলেন। তখনি শব্দ করে রুমের দরজাটা খুলে গেল। সেদিকে তাকাতেই আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি,
“ কৃশান….! এ… একি অবস্থা হয়েছে তোর? ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৭

কৃশানের হৃদয়ে ছুঁতে সক্ষম হলো না মায়ের সেই আর্ত চিৎকার। তার অশান্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ বিছানায় নেতিয়ে থাকা রমণীর পানে। শ্বাশুড়ির মুখে কৃশানের নাম শুনতেই চোখ মেলে তাকায় সে। ওমনিই বুক সুদ্ধ ছেৎ করে উঠে এক লহমায়। মানুষটার শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত লেগে আছে, হাত পায়ে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে , পরনের শার্ট অবিন্যস্ত, এলোমেলো, কিছু জায়গায় ছেঁড়া, ধুলোবালি তে মাখমাখি শরীর। জেল করা বাবরি চুল গুলো বড্ডো অবহেলায় এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ছেলের নিকট ব্যস্ত পায়ে ছুটলেন ইয়াসমিন বেগম। গা ছুঁয়ে আহাজারি করার আগেই কর্ণপাত হলো ছেলের ক্লান্ত আবদার,
“সবাইকে নিয়ে একটু বাইরে যাও আম্মু, আমার ওঁকে লাগবে এই মুহূর্তে….! ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here