হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (৩)
সাবা খান
বিকেলের আকাশটা অদ্ভুত রকমের থমথমে হয়ে আছে। সূর্যের আলো যেন ঠিকমতো মাটিতে নামতেই চাইছে না মাঝ আকাশেই আটকে আছে, এক চাপা অস্বস্তি নিয়ে। সেই আলো এসে পড়েছে জাওয়ান ম্যানশনের বিশাল লোহার গেটের উপর, যেখানে আজ মানুষের ঢল নেমেছে। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে হাজার হাজার মানুষ কেউ ব্যানার হাতে, কেউ মুঠো উঁচু করে স্লোগান দিচ্ছে, কেউ আবার চোখে আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
“সোফিয়া জাওয়ান ডাউন , ডাউন”
“খুনি, প্রতারক, বিচার চাই”
“মানবতার মুখোশ খুলে ফেলো”
কাল পর্যন্ত যারা তার নাম শুনে মাথা নত করত, আজ তারাই দাঁত চেপে গালি দিচ্ছে। কাল যাদের চোখে ছিল অগাধ শ্রদ্ধা আজ তাদের চোখে ঘৃণা। যেই কণ্ঠে একটু আগে তাকে ‘মা’ বলছিল এখন সেই কণ্ঠে বিষ মিশিয়ে তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে আবার কেউ কেউ বলাবলি করছে, সামনের জাওয়ান ম্যানশনটা কোনো প্রাসাদ নয় একটা অভিশপ্ত কারাগার, যার ভিতরে লুকিয়ে আছে সব পাপের উৎস।কেউ কেউ মাথা নাড়িয়ে তাদের কথায় সায় জানাচ্ছে।
এদিকে ম্যানশনের ভেতরে, উপরের তলায় নিজের বিশাল কক্ষে পায়চারি করছেন সোফিয়া জাওয়ান। তার হাই হিলের শব্দ ঠক ঠক করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো রুমে। তার মুখের সেই চিরচেনা ঠান্ডা স্থিরতা নেই আজ বরং তার জায়গায় অস্থিরতা, বিরক্তি আর একরাশ দমবন্ধ করা রাগ। তিনি বারবার জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাচ্ছেন। জনতার ঢেউ যেন থামছেই না, বরং আরও বাড়ছে। সোফিয়া দন্ত চেপে আওড়ায়
–“এই নোংরা লোকগুলো এত সাহস পায় কোথা থেকে?”
তিনি ভেবেছিলেন এই ঝড় ওখানেই থেমে যাবে সাথে এটাও ভেবেছিলেন সবকিছু আগের মতোই সামলে নেওয়া যাবে। যেমনটা আগেও হয়েছে একবার নয়, বহুবার। তিনি পাকিস্তান থেকে এদেশে আসার পর ব্যবসা ও রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে অনেক বার তার ভিডিও ফাঁস হয়েছে, বহু ফাইল ফাঁস হয়েছে। আরজে এক কলেই সব মিটিয়ে দিয়েছে। মিডিয়ার সামনে ঠান্ডা মাথায় দাঁড়িয়ে সবকিছুকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ ‘এআই’ বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ…সেই আরজে নেই, কোথাও নেই। সোফিয়ার হাত মুষ্টি বদ্ধ হয়ে আসে। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“আব্বাস, রনো কোথায়?”
রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আব্বাস কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
–“লেডি স্যার… আমরা ট্রাই করছি… কিন্তু কোনভাবেই কন্টাক্ট হচ্ছে না। স্যারের লোকেশনও ট্রেস করা যাচ্ছে না…”
এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে কক্ষে। তারপর সোফিয়া চিৎকার করে বিরক্তি সূচক শব্দ বের হয়,
–“ড্যাম ইট, শিট”
পর মুহূর্তে সে সামনে থাকা কাঁচের টেবিলটা এক লাথিতে উল্টে ফেলে দেয়। টেবিলের উপর রাখা ক্রিস্টালের শোপিসগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। অতিরিক্ত রাগে সোফিয়ার সারা শরীর কাঁপছে। সে গর্জে উঠে,
–“সব অকেজো, কেউ কাজের না”
সে একে একে সবকিছু ছুঁড়ে মারতে থাকে ফাইল, ল্যাম্প যা সামনে পাচ্ছে সব। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ ঘটছে। সে বিড়বিড় করতে থাকে,
–“রনো কোথায়… কোথায় গেল ওই ছেলেটা”
তার সারা আদলে এখন রাগের সাথে মিশে গেছে ভয়, নিজের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার ভয়।
এদিকে ম্যানশনের বাইরে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। জনতা এখন শুধু স্লোগানেই থেমে নেই তারা সামনে এগিয়ে আসছে, গেটের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে,
“গেট খোল”
“বের করে আন খুনিকে”
ভিড়ের মাঝখানে কয়েকজন আলাদা করে চোখে পড়ে, যারা বাকিদের তুলনায় বেশি সক্রিয়, বেশি উত্তেজিত। তারা বাকিদের কেও আরও বেশি করে উসকে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে একজনের ফোনে কল আসে। সে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। নাম ভেসে উঠে “সারহাদ চৌধুরী”
সে একটু সরে গিয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে ফোনটা কানে তোলে। নিচু গলায় বলে,
–“হ্যাঁ স্যার… আপনার কথামতোই কাজ হচ্ছে”
ওপাশ থেকে কি বলা হচ্ছে, সেটা শোনা যায় না। কিন্তু লোকটা মাথা নাড়িয়ে ফের বলে,
–“জি স্যার, হ্যাঁ… আর একটু পর যদি ওরা গেট না খোলে, আমরা গেট ভেঙে ফেলবো।
ওকে স্যার… ওকে”
ওপাশ থেকে কল কেটে দেওয়া হয়। এপাশের ব্যক্তির ঠোঁটে এক চিলতে অদ্ভুত হাসি ফুটে ওঠে। তারপর আবার জনতার ভেতরে ঢুকে পড়ে,
–“কি দাঁড়িয়ে আছো মিয়া, আজকেই হিসাব চাই”
সে চিৎকার করে সবাইকে উসকে দেয়। তার কথা শুনে জনতা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তাদের মুষ্টি উঁচু হয়, গেটের উপর আঘাত বাড়ে।
ঢাকার ব্যস্ত সড়কটা আজ যেন অন্য এক রূপ নিয়েছে। চারদিক থেকে মানুষের ঢল নেমে এসেছে চিৎকার, শ্লোগান, উত্তেজনায় কাঁপছে বাতাস। সেই উত্তাল জনতার মাঝখানে আটকে আছে একটি সাদা বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়িটার চারপাশে জনতা বৃত্ত করে দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ হাত দিয়ে, কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ পাথর ছুঁড়ে যেভাবে পারছে আঘাত করছে কাঁচের ওপর। ভেতরে বসে থাকা আলী মির্জার মুখে এখন আর সেই অহংকার নেই এখন ঘাম জমে কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। তিনি কড়া গলায় চিৎকার করে,
–“ড্রাইভ,ড্রাইভ ফাস্ট”
বিপরীতে ড্রাইভার কাঁপা কণ্ঠে বলে,
–“স্যার… সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই, পেছনেও না”
জনতা চারদিক থেকে গাড়িটাকে ঘিরে ফেলেছে। বাইরে থেকে গালাগালির ঝড় উঠছে,
–“চোর, খুনি, মানুষের টাকা খেয়ে পেট ভরেছিস”
–“আজকে ছাড়ব না”
প্রথমে গাড়ির শক্ত কাঁচে আঘাতগুলো তেমন প্রভাব ফেলছিল না। কিন্তু জনতার রাগ, ঘৃণা আর ক্ষোভ যেন একসাথে বিস্ফোরিত হলো। একটা বড় পাথর এসে সজোরে আঘাত করতেই কাঁচে ফাটল ধরে যায়। আরেকটা আঘাতে গ্লাসের এক কোণ ভেঙে যায়।এইটুকুই যথেষ্ট ছিল, সারহাদের ভাড়া করা লোকগুলো সুযোগ বুঝে সামনে এগিয়ে এসে তারা দ্রুত দরজা খুলে ফেলে,
–“টেনে বের কর”
মুহূর্তের মধ্যে আলী মির্জাকে গাড়ি থেকে টেনে নামানো হলো। তিনি বারবার বলছে,
–‘না না, প্লিজ”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই জনতা তাকে ঘিরে ফেলে। সারহাদের লোক গুলো টানাটানি শুরু করে ফলে তার জামা ছিঁড়ে যায়, বোতাম ছিটকে পড়ে, কেউ টানছে, কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল সবার সামনে। চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল,
–“এই হচ্ছে সমাজসেবক”
–“এদের এভাবেই শাস্তি দেওয়া উচিত”
কেউ কেউ চিৎকার করে উঠছে, মারো, আরও শাস্তি দাও আরও এটা সেটা বলে।ঠিক তখনই দূর থেকে কয়েকটা কালো গাড়ি দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসে। গাড়ি থামতেই বেরিয়ে আসে রানা মির্জা। সে রক্তচক্ষুতে জনতার দিকে তাকিয়ে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে,
–“কভার ফায়ার”
মুহূর্তেই গার্ডরা জনতার ওপর হামলা চালায়।ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার, বিশৃঙ্খলা সবকিছু মিলে এক ভয়ংকর দৃশ্য হয়ে ওঠেছে। সুযোগ বুঝে তারা আলী মির্জাকে গাড়িতে তোলে।গাড়িগুলো দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কালো গাড়ির ভেতরে সারহাদ চৌধুরী বসে সবটাই দেখছে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠে পৈশাচিক এক হাসি। ধীরে ধীরে সে চোখ বন্ধ করে আর সেই মুহূর্তেই তার সামনে ভেসে উঠে আঠারো বছর আগের রাত
“জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্টে”
একটা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে সেলের মেঝেতে বসে আছে তার বাবা ফাহাদ চৌধুরী। তার শরীর থেকে সব কাপড় খুলে নেওয়া হয়েছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মানুষ, না না, মানুষ রূপী জানোয়ার। তারা তার এমন অবস্থা দেখে হাসছে, বিদ্রূপ করছে। চারপাশে থাকা গার্ডদের হাতে বন্দুক, আর সেই বন্দুকের নল ঠেকানো সারহাদের মাথায়। ফাহাদ চৌধুরীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে লজ্জা, অপমান, অসহায়ত্ব। সারহাদ জীবনে কখনো তার বাবাকে কাঁপতে দেখেনি।
কিন্তু সেদিন প্রথমবার এবং শেষবারের মতো সে তার বাবাকে কাঁদতে দেখেছিল। একজন বাবা নিজের সন্তানের জন্য নিজের সম্মানও বিসর্জন দিতে পারে, সেদিন সে সেটা নিজের চোখে দেখেছিল। আর চারপাশে দাঁড়িয়ে যারা হাসছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল আলী মির্জা।
হঠাৎ সারহাদ চোখ খুলে ফেলে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে রাগে, হাত মুষ্টিবদ্ধ, চোখে জ্বলছে আগুন। দূরে মিলিয়ে যাওয়া আলী মির্জার গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
ধীরে ধীরে তার ঠোঁট ফুটে ওঠে একটা ঠান্ডা, ভয়ংকর হাসি। সারহাদ নিচু স্বরে ফিসফিস করে,
–“আজকের রাত শেষ রাত তোদের জন্য”
সন্ধ্যা গড়িয়ে গভীর রাত। সমুদ্রের বুক জুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত অন্ধকার যেন আকাশ আর জল এক হয়ে গেছে। সেই অন্ধকারের মাঝখানে দানবের মতো ভেসে আছে বিশাল ‘ড্যাসেল’ জাহাজটা। ড্যাসেলর চারদিকে সশস্ত্র পাহারা, লাল-নীল আলো ঝলকাচ্ছে, আর ভেতরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছে।
আর ড্যাসেলের ভেতরের বিশাল কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সানা। তার চোখে একরাশ বিস্ময়, আর হাতে বন্দুক। দৃষ্টি আটকে আছে সামনে কেননা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা মার্কান স্টিফেন, না না, এটা অসম্ভব। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসপিও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রমণীর কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“ফিরোজ জাওয়ান”
ফিরোজ জাওয়ান ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। তার ঠোঁটে খেলে যায় ঠান্ডা, ভয়ংকর হাসি। আর ঠিক তখনই সানার মাথার ভেতর যেন একসাথে বিস্ফোরিত হতে শুরু করে, ডক্টর সাইয়েদার বলা প্রতিটা কথা। এজন্যই তিনি সানাকে বারবার বলেছেন,
তোমার চারপাশে সবাই মুখোশধারী, জাওয়ান ম্যানশনের কেউই আসলে যেরকম দেখায়, সেরকম না। সবার আলাদা আরেক টা চেহারা আছে।
তার মানে, ডক্টর সাইয়েদা জানতেন মার্কানই ফিরোজ জাওয়ান, আরজের নিজের চাচা। মুহূর্তে যেন পুরো পৃথিবীটা ভেঙে পড়ে সানার চোখের সামনে। তার মাথায় ঝড়ের মতো ভেসে উঠতে লাগল একের পর এক ঘটনা। সেদিন হসপিটালে জাওয়ানদের থেকে যে কল এসেছিল ডক্টর সাইয়েদার ফোনে সেটা ফিরোজ জাওয়ানের নাম্বার ছিল। যিনি সানার বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দিতে বলেছিল। আর এয়ারপোর্টের বাইরে ডক্টর সাইয়েদার এক্সিডেন্ট, সেটাও করেছিল ফিরোজ জাওয়ান ও রওনাক। গাড়িতে বসে তিনি মৃত্যুর আগে ফিরোজ জাওয়ানের সাথেই কথা বলছিলেন এবং তাকে আরজে কে বলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিছিলেন। ডক্টর সাইয়েদা সেদিন ফিরোজের কারণেই এত ভয় পাচ্ছিলেন আর বারবার সানাকে বলছিলেন,
“তুমি জাওয়ান ম্যানশনে নিরাপদ না”
তবে হ্যাঁ, তিনি ফিরোজ জাওয়ানের ব্যাপারে জানলেও রওনাকের ব্যাপারে জানতেন না সেজন্যই তিনি আগে সানাকে সরাতে চেয়েছেন পরে থমাস কে খুঁজে বের করতেন।
রমণীর দৃষ্টি পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। তার মাথায় আবারও একের পর এক ছবি ভেসে উঠতে শুরু করে,
রিয়ানার বিয়ের দিন, ডক্টর সাইয়েদার অস্থিরতা, তারপর হঠাৎ সানাকে চায়নায় পাঠিয়ে দেওয়া কারণ যদি মার্কান জানতে পারত সে প্রেগন্যান্ট তাহলে শুধু বাচ্চা না সানাকেও মেরে ফেলত। আর তাই তিনি সানাকে আরজের কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তাকে বলতে দেননি সত্যটা। কারণ, মার্কানের ছেলে ছিল আরজের একদম কাছের। তাই আরজে জানলে মার্কানও জেনে যেত। এই কারণেই সানাকে সবকিছু থেকে দূরে রাখতে, বাঁচিয়ে রাখতে ডক্টর সাইয়েদা তাকে পাঠিয়েছিল মিসেস দিলরুবা খানমের কাছে। সবকিছু ছিল এক বিশাল খেলা। মার্কান জাওয়ান দের টাকা, ক্ষমতা ব্যবহার করে গোপনে তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ সাজিয়েছে। এই মার্কানই আফগানী মুসাবকে বাংলাদেশে এনেছে। সে-ই তাকে শক্তি, অস্ত্র, সৈন্য দিয়েছে, সে-ই জাওয়ানদের বিরুদ্ধে আরেকটা সেনা গড়ে তুলেছে, মুখোশধারী, একরকম চেহারা, যেন কেউ কাউকে চিনতেই না পারে। ঐদিন মার্কান যেই ম্যানশনে বসে থমাসের সাথে কথা বলেছে সেটা জাওয়ান ম্যানশনই ছিল। সানার কাছে সবকিছু এখন পরিষ্কার। সবকিছুর পেছনে একটাই নাম,
‘মার্কান স্টিফেন’ অথবা ফিরোজ জাওয়ান।
সানার দৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে আসে মার্কানের মুখ থেকে নিচে তার কোলে থাকা ছোট্ট শরীরটার দিকে “আরভি” মুহূর্তেই তার বুকটা কেঁপে ওঠে। কেননা তার ছেলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে মার্কানের কাঁধে। বাদামী চোখজোড়া আধখোলা, শরীর ঢলে পড়া, কোনো নড়াচড়া নেই। আরভির এমন অবস্থা দেখে সানার ভেতরটা যেন চিৎকার করে ওঠে। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। যেন তার বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ধরেছে। সানা অনুভব করতে পারছে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মায়ের মনে হাজার টা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে,
–“ভীর, ঠিক আছে তো?”
–“ওর কি করেছে এরা?”
–“ও কেন এভাবে নিস্তেজ?”
মুহূর্তেই রমণীর চোখ ভিজে ওঠে, তার আঙুলগুলো কাঁপছে, বন্দুক ধরা হাতটা ভারী হয়ে আসে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, চোখের জল শুকিয়ে যায় আগুনে। সে কদম ফেলে আরভিট দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই মার্কান বাঁকা হেসে বলে,
–“নট সো ফাস্ট, বৌমা”
সে অনায়াসে আরভিকে পাশের এক গার্ডের হাতে তুলে দেয়। পরের মুহূর্তেই আরেকজন গার্ড এসে বন্দুক ঠেকিয়ে দেয় আরভির মাথায়। সানার বুকটা যেন হঠাৎ থেমে যায়। সে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে হাত উপরে ওঠিয়ে বারবার নেড়ে না বুঝিয়ে আরও দু’কদম পিছিয়ে যায়। বারবার বিড়বিড়ায়,
–“না… প্লিজ, না”
তার হাত পা কাঁপছে, মস্তিষ্কে এলোমেলো ভাবনারা এসে হানা দিচ্ছে কিন্তু রমণী নিজেকে সামলে নিচ্ছে কেননা একটা ভুল পদক্ষেপ আর তার ছেলের…না…না সে আর কিছু ভাবতে যায় না।
এদিকে হ্যান্ডকাফে বাঁধা আরজে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার শরীরের প্রতিটা পেশি টানটান হয়ে আছে। তার চোখ গেঁথে আছে তার নিস্তেজ, বন্দুকের মুখে থাকা ছেলের ওপর। তার বুকের ভেতরটা যেন বিস্ফোরিত হচ্ছে, মুষ্টিবদ্ধ হাত বারবার শক্ত হচ্ছে, আবার খুলছে। রাগে শিরাগুলো সহ ফুলে উঠেছে। এক সেকেন্ড, শুধু এক সেকেন্ড হাত ছাড়লে, সে এদের টুকরো টুকরো করে ফেলবে। এদের কলিজা গুলো নিজ হাতে টেনে বের করবে কত বড় সাহস তার ছেলের দিকে বন্দুক তাক করে।
কিন্তু তার ছেলের মাথায় বন্দুক ঠেকানো এটা নজরে আসতেই সে থেমে যায়। আরজে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে থামিয়ে রাখে। তার বুক উঠানামা করছে দ্রুত। ভেতরে যেই আগুনটা জ্বলছে সেই আগুনকে সে জোর করে আটকে রেখেছে আরজে। কেননা এই মুহূর্তে সে শুধু একজন মাফিয়া না, সে একজন বাবা। আর তার সামনে, তার সন্তানের জীবন ঝুলে আছে একটুকরো ট্রিগারের উপর।
হঠাৎ ফিরোজ জাওয়ান ধীরে ধীরে সানার দিকে এগিয়ে আসে। ঠোঁটে একটা নির্মম হাসি দিয়ে ঠান্ডা স্বরে শুধায়,
–“বৌমা, আমাকে দেখে এতটা চমকানোর কি আছে? অবাক হয়েছো বুঝি?”
সে মাথা কাত করে তাকায় সানার দিকে। কণ্ঠে তীব্র বিদ্রূপ নিয়ে আওড়ায়,
–“বাই দ্য ওয়ে… তোমার ওই কাকা শশুর ফিরোজ জাওয়ান..”
সে একটু থেমে ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও চওড়া করে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
–“তাকে তোমার শ্বশুরের সাথেই পরকালে পাঠিয়ে দিয়েছি আমি আরও অনেক আগেই। তার জায়গায় ছিল,
সে হাত দুদিকে বাড়িয়ে গর্বের সঙ্গে বলে,
–“আমি, মার্কান স্টিফেন”
এক মুহূর্তে যেন পুরো ঘরটা থমকে যায়। সানার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। তারা শুধু আরজেকে ধোঁকা দেয়নি, তারা আসল ফিরোজ জাওয়ানকেও মেরে ফেলেছে রওনাকের মতো। তার ভাবনার মধ্যেই মার্কান আবার বলে,
–“ডক্টর সাইয়েদা খুব বেশি জানত… তাই ওকে সরাতে হয়েছে। আর তুমিও যদি সময়মতো না সরতে…তাহলে”
কক্ষের সবার চেহারায় বিস্ময় থাকলেও একজন সম্পূর্ণ নির্বিকার ভাবে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মার্কানের দিকে, যেন সে আগে থেকেই এই ব্যাপারে জানত। সেটা আর কেউ না আরজে।
মার্কান ধীরে ধীরে হেঁটে যায় তার সামনে। আরজে দাঁড়িয়ে আছে, হাত হ্যান্ডকাফে বাঁধা, তবুও তার চোখে ভয় নেই, আছে শুধু আ*গুন। মার্কান তার কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে আওড়ায়,
–“তুই জানতিস তাই না?
কিভাবে জানলি বল তো?”
আরজে ঠোঁট বাঁকিয়ে ঠান্ডা, কাঁপন ধরানো হাসি টেনে আওড়ায়,
–“আমার আক্কি অন্য মেয়েদের দিকে তাকানো তো দূরের কথা, কাকির নামটাও উল্টে উচ্চারণ করেনি কোনোদিন”
সে এক সেকেন্ড থেমে চোখ সরাসরি মার্কানের চোখে গেঁথে ফের বলে,
–“আর তুই? তোর চোখে সেই নোংরা ক্ষুধা আমি অনেক আগেই দেখেছি”
মার্কান হঠাৎ কর্কশ, বিকৃত হেসে ওঠে,
–“কিন্তু… তোর কাকি তো তোর বাপের সাথেই চক্কর চালাচ্ছিল, তাই না?”
তার বলা বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই এক মুহূর্তে বিপরীত পাশের মানবের চোখ ঝলসে ওঠে, তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। শব্দগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধে যায়। তার শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে আসে যেন এখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে কিন্তু ঠিক তখনই তার দৃষ্টি চলে যায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের কোলে তার ছেলে রিশ।
আরজে থেমে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে রাগটাকে গিলে ফেলে কেননা এই মুহূর্তে তার রাগের চেয়েও বড় তার ছেলে।
ঠিক তখনই থমাস এগিয়ে আসে। তার চোখে পাগলামির ঝিলিক, ঠোঁটে বিকৃত হাসি ঝুলিয়ে সানার কাছে এসে ঝুঁকে ফিসফিস করে,
–“ভাবি সাহেবা, জাস্ট রিমেম্বার,
ইউ হ্যাভ ওয়ান অপশন”
সে আঙুল তুলে ইশারা করে একবার আরজের দিকে, একবার আরভির দিকে। তারপর ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে,
–“হয় হাজব্যান্ড, না হয় ছেলে। কাকে চাই, বলুন?”
বিপরীতে রমণীর চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সে এতক্ষণ সুযোগ খুঁজছিল আরভির কাছে পৌঁছানোর। একবার তার ছেলে টাকে ছুঁয়ে দেখার। কিন্তু গার্ড গুলো এক মুহূর্তের জন্যও দৃষ্টি হটায় নি যেন তারা যান্ত্রিক। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসপিও সেই সুযোগ খুঁজছিল। কিন্তু এখন থমাসে কথায় সানার আঙুল ট্রিগারের উপর শক্ত হয়ে আছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“তোদের দুই বাপ-ছেলের রক্ত চাই আমি।
একজনকে না… দুজনকেই মাটিতে ফেলে রক্তে ভাসাবো আমি”
বিপরীতে থমাস হেসে ওঠে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে সানার রাগের মজা নিচ্ছে। সে হাততালি দিয়ে বলে,
–“ওহ… আই লাইক দ্যাট। এই আগুনটাই তো দেখতে চেয়েছিলাম আমি”
এই বলে থমাড হঠাৎ বন্দুক তুলে সানার দিকে তাক করে। ঠিক সেই মুহূর্তে আরজের গর্জন যেন বজ্রপাতের মতো ফেটে পড়ে পুরো ঘরে,
–“কুত্তার বাচ্চা…ওর দিকে বন্দুক তুললে….”
আরজে এক পা এগিয়ে আসে। সাথে সাথে তার চারপাশে থাকা মার্কানের গার্ড গুলো তাকে ঘিরে ধরে। আরজে তাদের তোয়াক্কা না করে ফের বলে,
–“তোর মৃত্যু এতটা কঠিন হবে, তুই নিজেও কল্পনা করতে পারবি না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটা সেকেন্ডে তুই মৃত্যুর জন্য ভিক্ষা করবি ঈশানের মতো”
থমাস তার বিপরীতে কিছু বলার আগেই হঠাৎ করেই গার্ডদের সারি ভেদ করে ঝড়ের মতো ভেতরে ঢুকে পড়ে এক রমণী। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটার পর একটা ঘুষি এসে পড়ে থমাসের বুকে। থমাস বুকের দিকে তাকাতেই নজরে আসে, “ঈশানী”।
ঐরাতে থমাস জ্যাকের ঘাড়ে ইনজেকশন পুশ করার সাথে জ্যাক ইনজেকশনটা টেনে বের করে রওনাকের দিকে তাকায়। রওনাকের ঠোঁটে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে যেটা দেখা মাত্রই জ্যাক বুঝে যায় তার উদ্দেশ্য।আর এক মুহূর্ত দেরি না করে জ্যাক ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। দুই হাতে রওনাকের গলা চেপে ধরে। রওনাকের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, সে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। কিন্তু তবুও পকেট থেকে আরেকটা ইনজেকশন বের করে।জ্যাকের ঘাড়ে আবার পুশ করতে যায় ঠিক তখনই জ্যাক কষ্ট করে চোখ তুলে বলে,
–“লিভ… ঈশানী”
ঈশানী স্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে রওনাকের দিকে। তার চোখের সামনে সবকিছু ভেঙে পড়ছে। সে লাইফেও কল্পনা করে নি রওনাক এমন কিছু করবে। রমণী আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। আরভিকে বুকে চেপে গাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড় দেয়। পেছনে গাড়ির ভেতর ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। জ্যাকের শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। দুইটা ইনজেকশনের কারণে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। অবশেষে যন্ত্রমানব ঢলে পড়ে। রওনাক হাপরের মতো শ্বাস নিচ্ছে। মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে বিরক্তিকর শব্দ,
–“শিট”
সে মাথা তুলে তাকায় নজরে আসে পিছনের সিট খালি, ঈশানী নেই আর না আরভি। সে তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে ফোন করে,
-“ড্যাড, লোক কোথায়?”
ওপাশ থেকে আসে ঠান্ডা কণ্ঠ,
–“থমাস, জ্যাক কি করছে?”
রওনাক দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“জ্যাক আউট… কিন্তু বাচ্চাটা নিয়ে ঈশানী জঙ্গলের দিকে গেছে”
–“ওদের দুজনকেই শেষ করে দাও”
হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে রওনাক। তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠেছে,
–“ড্যাড….ওর গায়ে একটা আঁচড় লাগলে… আমি সব জ্বালিয়ে দেব। শুধু ওকে আটকে রাখো, আমি আসছি”
এই বলেই কল কেটে দেয় সে। এদিকে অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দৌড়াচ্ছে ঈশানী। তার শ্বাস কাঁপছে। কোলে থাকা আরভি কেঁদে উঠেছে। ঈশানী কাঁপা কাঁপা গলায় সান্ত্বনার সুরে বলে,
–“চুপ… প্লিজ চুপ…”
হঠাৎ তার পা থেমে যায়। চারদিক থেকে একই মুখের মানুষ গুলো বেরিয়ে এসে তাকে ঘিরে ফেলে। ঈশানী আরভিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। পিছনে ফিরতেই দেখে রওনাক এগিয়ে আসছে। মুহূর্তে ঈশানীর চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। সে এক মুহূর্ত না ভেবে থুতু ছুঁড়ে মারে তার মুখে,
–“তোকে আমি জানোয়ারও বলবো না, তুই তার থেকেও নিচে। আমার বাচ্চাকে ছুঁবি না”
রওনাক থেমে ধীরে ধীরে মুখ মুছে তারপর এক ঝটকায় আরভিকে টেনে নেয় তার কোলে। চিৎকার করে ওঠে ঈশানী,
–“না, ওকে এদিকে দেয়…..”
এদিকে আরভি কাঁদছে আন্না আন্না বলে। তার চিৎকারের পরোয়া না করে চারপাশে লোকগুলো এসে আরভিকে নিয়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যায়। ঈশানী ছুটতে যাবে তার আগেই রওনাক তার হাত চেপে ধরে। ঈশানী ফিরে তাকিয়ে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পর পর দুটো চড় বসায় তার গালে। চোখে ঘৃণা নিয়ে কলার চেপে ধরে,
–“তুই মানুষ না, তুই একটা জানোয়ার”
রওনাক কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে।তারপর ধীরে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে ঈশানীর মুখের সামনে ঘুরায়। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ঈশানীর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শরীর ঢলে পড়ে সামনে সাথে সাথে রওনাক তাকে ধরে কোলের মধ্যে তুলে নেয়।তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে সেই ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে,
–“সুইটহার্ট…আজ থেকে তুমি বন্দী”
এই মুহূর্তে কক্ষের মধ্যে থাকা ঈশানীর চুল এলোমেলো, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, নিঃশ্বাস ভারী। যেন পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে থমাসের ওপর। সে একের পর এক কিল-ঘুষি মারছে, বুক, কাঁধ, মুখ যেখানে পারছে আর একের পর এক গালি ছুঁড়ছে,
–“কুত্তা, জানোয়ার, আমার বাচ্চাটাকে ছুঁয়েছিস তুই?”
তার কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছে চিৎকারে। তাকে এতক্ষণ পাশের একটা বড় রুমে আটকে রেখেছে থমাস, গত দুদিন ধরেই সে ঐ রুমে আটক। এই মুহূর্তে ঈশানী চারপাশে কে কি আছে কিছুর দিকেই তাকাচ্ছে না। সে থমাসের উপর নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হাত চালিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে কয়েকজন গার্ড দৌড়ে আসছে তাকে আটকাতে। কিন্তু তারা কাছে পৌঁছানোর আগেই থমাস এক হাত তুলে ইশারা করে,
–“স্টে ব্যাক, ডোন্ট টাচ হার”
গার্ডরা থেমে যায়। মার্কান বিরক্ত হয়ে তাকায় ছেলের দিকে। এই মেয়েটার জন্য তাকে তার প্ল্যান আরও পিছাতে হয়েছে। নাহলে তারা এতদিনে দেশের বাইরে থাকত। কিন্তু কি করবে তার একমাত্র ছেলে যে এই মেয়ে টাকে ছাড়া কিছুই বুঝে না। সে গার্ড দের আবার আদেশ করে,
–“এই পাগলটাকে সরাও এখান থেকে”
গার্ডরা তার আদেশ মতো আবার এগোতে যাবে ঠিক তখনই থমাস হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তর্জনী তুলে চিৎকার করে উঠে,
–“ডোন্ট ডেয়ার, ড্যাড। আমি আগেও বলেছি… এখনো বলছি, ওর দিকে কেউ চোখ তুলেও তাকাবে না”
থমাস এক পা এগিয়ে এসে দন্ত খিঁচিয়ে বলে,
–“আর নেক্সট টাইম…তুমি ওকে ‘পাগল’ বললে ভালো হবে না, ও… আমার ঈশা রানী”
কিন্তু তার এমন কথায়ও বিপরীতে রমণী গললো না আর না থামলো। সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে থমাসের ওপর। তার হাত, নখ, ঘুষি সবকিছু দিয়ে আঘাত করছে আর বলছে,
–“আরভি কোথায়? আমার বাচ্চাটাকে দে।কু*ত্তার বাচ্চা এক্ষুনি দিবি”
সে থমাসের কলার চেপে ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলতে থাকে,
–“কি করেছিস ওর সাথে? বল, শয়তান! জানোয়ার। আমি তোকে মেরেই ফেলবো”
তার চোখ দিয়ে গরগর করে পানি ঝরছে, থমাস একসময় বাধ্য হয়ে তার দুই হাত চেপে ধরে। অন্য হাতে তাকে নিজের বুকের সাথে আটকে ফেলে। সে নিচু গলায় আওড়ায়,
–“রিল্যাক্স, ঈশা রানী..”
কিন্তু ঈশানী হাত ছাড়িয়ে আবার আঘাত করতে থাকে,
–“ছাড়, আমাকে ছাড়, আমার বাচ্চা দে”
সে তার বুক, কাঁধে আছাড় মারছে, মাথা ঝাঁকাচ্ছে একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে। মার্কান এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিরক্ত, ক্লান্ত দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে নেয় সে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আরজের সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে এসপির দিকে তাকিয়ে ইশারা করে। এসপি তার ইশারা বুঝে ধীরে ধীরে সে নিজের পকেটে হাত ঢুকায়। একটা ছোট সাইলেন্সার বের করে নিঃশব্দে সেটা বন্দুকে লাগায়। কেউ খেয়াল করছে না তাদের কেননা সবাই এখনো তাকিয়ে আছে ঈশানীর পাগলামির দিকে। এসপি বন্দুকটা একটু নিচু করে ধরে টার্গেট, আরজের হ্যান্ডকাফ। এক সেকেন্ডে ফুসস করে একটা গুলি বের হয় আর সাথে সাথে আরজের হ্যান্ডকাফ খুলে যায়। আরজের ধীরে ধীরে কব্জিটা নাড়ায়… যেন এতক্ষণ ধরে জমে থাকা শিকল ভেঙে গেছে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটা বাঁকা, ভয়ংকর হাসি। সে প্রথমেই তার হাতে থাকা ইলেকট্রনিক ঘড়িতে কাইলিন কে সিগনাল পাঠিয়ে দেয়।
কিন্তু এদিকে সানার কোন দিকে খেয়াল নেই। চারপাশে কে কী বলছে, কে দাঁড়িয়ে আছে, কে তাকিয়ে আছে এসব যেন তার কাছে অস্তিত্বহীন। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে, তার ভীরের দিকে। তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে এক অদৃশ্য শূন্যতা জমে উঠতে থাকে। আজ দুদিন হয়ে গেছে, সে নিজের কলিজার টুকরো ছেলেকে দেখেনি। এই দুটো দিন যেন তার কাছে দুই বছর। যে ছেলের থেকে দুই মিনিট দূরে থাকলেই তার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে, মাথার ভেতর হাজারটা আশঙ্কা ঘুরতে থাকে, সেই ছেলের কোনো খোঁজ নেই দুদিন।
সে জানতো না, কেমন আছে তার ছেলেটা?
খেয়েছে কি না?
কেঁদেছে কি না?
কেউ তাকে মারছে কি না?
এই চিন্তাগুলো তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছিল প্রতিটা মুহূর্তে। আর আজ সে তাকে সামনে দেখছে। কিন্তু এই কি সেই আরভি?
ছেলেটার চেহারা দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কেননা আরভির চোখ নিচু, মাথাটা ঝুঁকে আছে গার্ডের কাঁধে, শরীর দেখেই বুঝা যাচ্ছে একদম নিস্তেজ। যেন তার ভেতর থেকে সব শক্তি শুষে নেওয়া হয়েছে।যেন সে আর সেই আগের চঞ্চল, প্রাণবন্ত বাচ্চাটা নেই।
সানার গলা শুকিয়ে আসছে, তার মনে হচ্ছে কেউ যেন তার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তার হৃদপিণ্ডটা মুঠো করে চেপে ধরেছে। না হলে, এভাবে নেতিয়ে আছে কেন তার ছেলে?
কেন সে মাথা তুলছে না?
কেন তার চোখে সেই চেনা দীপ্তি নেই?
মুহূর্তেই তার মাথার ভেতর হাজারটা ভয়ংকর সম্ভাবনা ঘুরে ওঠে। তার নিষ্পাপ ছোট বাচ্চাটাকে, এই জানোয়ার গুলো কি করেছে তার সাথে?
কতটা কষ্ট দিয়েছে?
কতটা ভয় দেখিয়েছে, যে সে মাথাটাও তুলতে পারছে না?
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (২)
এই চিন্তা আসতেই তার শ্বাস আটকে আসে।তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে অশ্রুতে। তার মায়ের মনটা হাহাকার করে ওঠে। সে অজান্তে এক পা এগোতে গিয়েও থেমে যায় ছেলের মাথায় বন্দুক ঠেকানো দেখে। ঠিক তখনই আরভিকে এক গার্ডের কোল থেকে আরেক গার্ড নেয় আর সে সময়ে সানার চোখ গিয়ে আটকে যায় আরভির কোমরের দিকে।আর পরের মুহূর্তেই, তার বুকের ভেতরটা যেন থেমে যায়। কেননা আরভির কোমরে লাগানো একটা টাইমার। ডিজিটাল ডিসপ্লেতে সংখ্যা চলছে। সময় কমছে টিক… টিক… টিক করে। প্রতিটা সেকেন্ড যেন তার বুকের উপর হাতুড়ির মতো আঘাত করছে। সানার চোখ বড় হয়ে যায়। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় সেই টাইমারের উপর। মস্তিষ্ক যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তারপর এক ঝটকায় বাস্তবতা তাকে আঘাত করে। সে নিঃশ্বাস আটকে দু’কদম পিছিয়ে যায়। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস বের হয়,
–“টা..টাইমার”
