Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শেষ পর্ব 

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শেষ পর্ব 

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শেষ পর্ব 
সাবা খান

পাঁচটি দীর্ঘ বছর যেন ঋতুচক্রের মতোই নিঃশব্দে গড়িয়ে গেছে। সময় তার নিজস্ব গতিতে অনেক ক্ষতকে শুকিয়ে দিয়েছে, আবার কিছু শূন্যতাকে আরও গভীর করেছে। ব্ল্যাক ম্যানশনে নিজের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সানা সেগুলোই ভাবছে। সদ্য গোসল করে এসেছে রমণী। ভেজা চুলের ডগা থেকে এখনো টুপটাপ করে পানি ঝরছে। এক হাতে তোয়ালে ধরে ধীরে ধীরে চুল মুছতে মুছতে সে নিচের বিশাল বাগানের দিকে তাকিয়ে রইল। পাঁচ বছর আগের সেই দুঃস্বপ্নময় রাতের কথা আজও মনে পড়ে, আজও তার মনে হয় তার মেয়েটা বেঁচে আছে। তবে আজ আর সেগুলো তাকে ভেঙে দিতে পারে না। কারণ তার পাশে এখনো আছে তার পরিবার। আর আছে সেই মানুষটা…যার জন্য সমস্ত ঝড়ের মধ্যেও সে বারবার বাঁচতে শিখেছে।

কিছুক্ষণ পর সানা ব্যালকনি থেকে ফিরে কক্ষে প্রবেশ করল। আর ভেতরে ঢুকেই তার দৃষ্টি আটকে গেল বেডের দিকে। এ যেন প্রতিদিন দেখা একই দৃশ্য, অথচ প্রতিদিনই নতুন লাগে। আরজে এখনো ঘুমিয়ে আছে। বিশাল কিং সাইজ বেডে উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে। ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে ললাটের উপর। তার বলিষ্ঠ দেহটা সম্পূর্ণ দৃশ্যমান শুধু নিচটা চাদরে ঢাকা।সকালের সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে এসে পড়েছে তার উপর, ফলে মুখের তীক্ষ্ণ অবয়ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সানার মনে হলো, এই মানুষটাকে যতবারই দেখে, ততবারই যেন নতুন করে মুগ্ধ হয়। কী অদ্ভুত সুন্দর এই মানুষটা, লম্বা চোখের পাপড়ি, নিখুঁত নাকের গঠন, হালকা গোলাপি ঠোঁট, আর সেই বলিষ্ঠ শরীর যেন কোনো শিল্পী অসীম যত্নে গড়ে তুলেছে। কাউকে কেন এতটা আকর্ষণীয় হতে হবে, সানা বুঝতে পারে না। এক মুহূর্তের জন্য সানা শুধু চুপচাপ বসে তাকে দেখতেই থাকল। তারপর হঠাৎ মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ভেজা চুলগুলো ঝাঁকিয়ে দিল আরজের ঠিক উপর। ঠান্ডা পানির ফোঁটা গিয়ে পড়ল ঘুমন্ত মানুষটার গলায় আর মুখে। সঙ্গে সঙ্গে আরজের ভ্রু কুঁচকে উঠল। কিছুক্ষণ পর আধখোলা চোখে সামনে তাকিয়ে সানাকে দেখতেই তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা অলস হাসি ফুটে উঠল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে শুধালো,

—”আমার ওয়াইফির যদি ঘুমের মধ্যে আমাকে দেখার এত শখ থাকে, তাহলে আগে বললেই তো হতো। সারারাত জাগিয়ে রাখার বদলে ঘুমিয়েই দেখাতাম”
মুহূর্তে রমণী থমকে গেল। তার মানে লোকটা জেগেই ছিল। লজ্জায় তার কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল,
—”আপনি জেগে ছিলেন?”
—”অনেকক্ষণ ধরে”
—”তাহলে কিছু বললেন না কেন?”
—”কারণ কেউ যখন এত মন দিয়ে আমাকে দেখে, তখন তাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে না”
সানা সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে দৌড় লাগাবে কিন্তু তার আগেই আরজের হাত তার কব্জি ধরে ফেলল। পরের মুহূর্তেই এক হেচকা সানাকে ফেলে দিল তার নিচে। রমণী তব্দা খেয়ে তাকে সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,

—”রানভীর, ছাড়ুন”
—”নোপ”
—”রানভীর…”
—”হুম..”
সানা এভাবে বারবার তাকে ছাড়তে বলছে কিন্তু আরজে ছাড়া তো দূর বরং তার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল। রমণী হঠাৎ কি ভেবে জানি বলল,
—”আরে বাচ্চারা এসে পড়বে তো, ছাড়ো”
রমণীর মুখে ‘তুমি’ শুনে হঠাৎ আরজে থমকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে সানার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসের সুরে আওড়ায়,

—”কি বললে?”
—”কি?”
—”আবার বলো”
সানা ভান করল যেন কিছুই বোঝেনি,
—”আমি কি বলেছি?”
—”যেটা একটু আগে বললে”
—”আমি কিছু বলিনি”
আরজে চোখ সরু করে আদেশের ন্যায় বাক্য ছুঁড়ে,
—”একদম কথা ঘোরাবে না, ওয়াইফি। তাড়াতাড়ি বলো”
সানা আবারও তাকে দুই হাতে ঠেলে সরাতে সরাতে বিরক্ত হয়ে বলল,
—”কি হচ্ছেটা কি ছাড়ুন। দরজা খোলা, বাচ্ছারা যেকোনো মুহূর্তে চলে আসবে”
বিপরীতে মানব তার কথা মানলো না বরং রমণীর দুই হাত বন্দি করে মাথার উপরে শক্ত করে চেপে ধরে কঠিন সুরে আওড়ায়,
—”আগে বলো”
সানা মুখ আরেক দিকে ফিরিয়ে বলে,
—”আমার লজ্জা লাগছে”
আরজে তার দুই হাত এক হাতে ধরে আরেক হাতে তার মুখটাকে আবারো ফিরিয়ে এনে ঘোর লাগা কণ্ঠে শুধালো,
—”প্রতি রাতে এতবার করে লজ্জা ভাঙছি, তারপরেও লজ্জা পাচ্ছো কেন?”
সানার গাল এবার সত্যি সত্যি লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। সে কটমট করে বলে,

—”অসভ্য লোক ছাড়ুন”
আরজে না ছেড়ে তার থুতনি চেপে ধরে বলে,
—”আগে ‘তুমি’ বলো। তোমার মুখে তুমি শোনার ইচ্ছা আমার বহুদিনের”
—”আচ্ছা ঠিক আছে ‘তুমি’ বলছি, ছাড়ো এখন”
শব্দটা উচ্চারণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরজের চোখে এমন এক ঝলক আনন্দ ফুটে উঠল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কিছু পেয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে সানার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে নেশালো স্বরে ফিসফিস করল,
—”আবার বলো”
—”পারব না, ছাড়তে বলছি তোমাকে। বাচ্চাদের এসে পড়বে”
আরজে হঠাৎ নিজের কোমরের নিচে থাকা চাদরটা একটানে উপরে তোলে রমণীকে ঢেকে দিল। সানাকে প্রতিক্রিয়া জানানোর ফুরসৎ দিল না তার আগেই গ্রীবাদেশে অনুভব করল তীব্র যন্ত্রণা। কানে এলো পুরুষালী হাস্কিস্বর,
—”এখন আর কোন ছাড়াছাড়ি নেই”
—”অসভ্য, কুত্তা, দরজা”
—”ওটা ইলেকট্রনিক ডোর। তোমার ওটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমাকে সামলানোর চিন্তা করো, বেইবি”

বিছানার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জ্যাক। কোমর পর্যন্ত টেনে দেওয়া সাদা চাদরের আড়ালে নিম্নাংশ ঢাকা, আর তার বলিষ্ঠ দেহের প্রশস্ত কাঁধ ও সুগঠিত অবয়ব আধো আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মানুষটার কক্ষে তখন নেমে আছে এক প্রশান্ত নীরবতা। ঠিক সেই সময় দরজাটা অল্প ফাঁক করে ভেতরে প্রবেশ করল তার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য রত্নটি। ছোট ছোট পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো ইউবিকা। পরমুহূর্তেই জ্যাকের কর্ণকুহরে ভেসে এলো শিশুসুলভ মিষ্টি এক ডাক,
—”পাপা… পাপা… পাপা… পাপা…”
একনাগাড়ে ডেকেই চলল সে। নিজের আদরের মেয়ের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই জ্যাকের ঘুমের ঘোর কিছুটা কেটে গেল। আধখোলা চোখে তাকিয়ে সে মৃদু স্বরে বলল,
—”ইয়েস, মাই পার্ল?”
বিপরীতে অনামিকা মাথা নিচু করে আবারও একইভাবে ডেকে উঠল,
—”পাপা… পাপা…”

জ্যাক এবার পুরোপুরি চোখ মেলে মেয়ের দিকে তাকাল। তারপর দৃষ্টি নেমে এলো তার খালি পায়ের দিকে। মুহূর্তের জন্য তার ভ্রু কুঁচকে উঠল। ঠান্ডা মেঝেতে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউবিকা। এমন অসাবধানতা তার একদমই পছন্দ নয়। মুহূর্তে না চাওয়া সত্ত্বেও রাগটা তিরতিরিয়ে চড়ে বসে মস্তিষ্কে। কিন্তু পরক্ষণেই মেয়ের নিষ্পাপ মুখ আর স্নিগ্ধ ডাক শুনে তার সমস্ত বিরক্তি গলে গেল। কিছু না বলে সে হাত বাড়িয়ে ইউবিকা কে তুলে নিল বিছানায়। বিছানায় উঠতেই অনামিকা খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর দু’হাত ভরে জ্যাকের হালক বাদামি রঙের সিল্কি চুলে আঙুল চালাতে লাগল। মাঝে মাঝেই মুখটা জ্যাকের একদম সামনে এনে মিষ্টি স্বরে ডেকে উঠছে,
—”পাপা… পাপা…”
আর জ্যাক নীরব হাসি নিয়ে নিজের ছোট্ট পৃথিবীটাকে দেখেই চলল। ইউবিকার সাথে খুনসুটির মাঝেই জ্যাকের ঘুম সম্পূর্ণ কেটে গেল। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা আধো ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, এখন সে সম্পূর্ণ জেগে উঠে নিজের ছোট্ট রাজকন্যার সাথে মেতে উঠেছে। ইউবিকা কখনো তার চুল টেনে দিচ্ছে, কখনো দুই গাল চেপে ধরে নিজের মতো করে মুখ বাঁকিয়ে বলছে,

—”পাপা”
আর জ্যাক হেসে তাকে এক টানে বুকে জড়িয়ে নিল। ঠিক তখনই কক্ষের দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল ইবেলিনা। তার এক হাতে পাঁচ বছরের ইউহান বরং বলা ভালো, ইউহানকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। ছেলেটার দুষ্টুমির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভোর থেকে পুরো ম্যানশন মাথায় তুলে রেখেছে। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
—”জ্যাক, আপনার ছেলেকে আমি আর সামলাতে পারছি না”
ইউহান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
—”পাপা, আমি কিছুই করি নাই”
—”ওহ! তাই নাকি? তাহলে গার্ডদের ওয়াকিটকি নিয়ে কে পালিয়েছিল?”
—”আমি চেক করছিলাম”
—”আর সাত সকালে বাগানের পাইপ খুলে সবাইকে ভিজিয়েছে কে?”
—”আমি তো গাছে পানি দিচ্ছিলাম। এখন ওরা সামনে আসলে আমি কী করব”
জ্যাক ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। ইবেলিনা সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠে,
—”আপনি হাসছেন, আর আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি এই ছেলের জন্য”
জ্যাক তৎক্ষণাৎ গম্ভীর মুখ করে ছেলের দিকে তাকায়,

—”ইউহান, তুমি এসব করেছো?”
ইউহান ‘নো পাপা’ বলে এক দৌড়ে বিছানায় উঠে সোজা জ্যাকের পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে উঠল,
—”অ্যাটাক…”
ইউবিকাও ভাইয়ের সঙ্গে যোগ দিল। মুহূর্তেই দুই সন্তানকে নিয়ে জ্যাক মেতে উঠলো। ইবেলিনা দৃশ্যটা দেখে হেসে ফেলল। কিছুক্ষণ আগের সমস্ত বিরক্তি যেন মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে পড়ল। তার চোখ দুটো নিবদ্ধ হলো নিজের ছোট্ট পরিবারটার দিকে। একদিকে দুষ্টুমির কারখানা ইউহান, অন্যদিকে আদুরে ইউবিকা। আর মাঝখানে যন্ত্রমানব, যে পৃথিবীর সব যুদ্ধ জিততে পারলেও নিজের সন্তানদের কাছে প্রতিদিন আনন্দের সঙ্গে পরাজিত হয়।

ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল জিমরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সিয়া। আজও তার মিশন একটাই, ‘লম্বা হওয়া’ গত কয়েক মাস ধরে ইউটিউব ঘেঁটে ঘেঁটে যত ধরনের যোগব্যায়ামের ভিডিও পাওয়া যায়, সবই সে দেখে ফেলেছে। এই মুহূর্তে সে একটা জটিল যোগাসনে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে আর নিজেকে মানসিকভাবে বোঝাচ্ছে,
“হবে… একদিন না একদিন হবেই”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল একটি ছোট্ট কণ্ঠস্বর,
—”মাম্মাম…”
শব্দটা শুনতেই সিয়ার মুখের গাম্ভীর্য মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। চোখ খুলে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল আড়াই বছরের ছোট্ট কায়াস গুটিগুটি পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার পেছনেই হাঁটছে কাইলিন তবে স্বাভাবিকভাবে নয়। একদম ইচ্ছে করেই বুক ফুলিয়ে, কাঁধ সোজা করে, নিজের বিশাল লম্বা শরীরটা আরও বেশি করে প্রদর্শন করতে করতে। সিয়া একটানে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
—”আমার বাবু উঠেছে?”

কায়াস খিলখিল করে হেসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। অন্যদিকে কাইলিন সিয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়েই স্ট্রেচিং শুরু করে দিল। কখনো দুই হাত মাথার উপরে তুলছে, কখনো কোমর বাঁকাচ্ছে, কখনো আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের উচ্চতাটা যেন আরও বেশি করে প্রদর্শন করছে। সিয়া দাঁত চেপে সব দেখল। সে জানে, এই লোকটা তার উচ্চতা নিয়ে খোঁচাচ্ছে। কিন্তু আজ সে কিছুই বলবে না। কাইলিন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই দেখে সে এবার নতুন অস্ত্র বের করল। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—”কায়াস, বল তো তোমার মাম্মামের নাম কী?”
কায়াস উৎসাহ নিয়ে হাত নাড়ল। তারপর গর্বিত ভঙ্গিতে ঘোষণা করল,
—”পিচি, পিচি, পিত্তি, পিচ্ছি”
মুহূর্তেই সিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। রমণী নিজের ছেলের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে রইল। তার নিজের সন্তান, তাকেই পিচ্চি বলছে। কাইলিন মুখ ঘুরিয়ে হাসি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিন্তু সিয়া এত সহজে হার মানার মেয়ে নয়। তার ঠোঁটের কোণেও ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে ছেলের চুল এলোমেলো করে বলল,
—”ঠিক আছে বাবু। এবার তোমার ড্যাডের নাম বলো তো?”
কায়াস আনন্দে হাততালি দিল।
—”তাগাছ, তাগাছ, তাগাছ”

কায়াস স্পষ্টভাবে ‘তালগাছ’ বলতে পারছে না কিন্তু তার ‘তাগাছ’ শুনেই মুহূর্তেই কাইলিনের মুখের হাসি উধাও। আর সিয়ার মুখে ফুটল বিজয়ীর হাসি। সিয়া এবার আরও উসকে দিল,
—”আরেকটা বলো বাবু, যেটা এসপি আঙ্কেল বলেছে”
কায়াস কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—”সান্দা… সান্দা… সান্ডা…আ..”
কাইলিনের মুখের রং এক লহমায় মুহূর্তে পাল্টে গেল। কায়াস বাকিটা বের করার আগেই কাইলিন তাড়াতাড়ি করে তাকে এক টানে কোলে নিয়ে মলিন স্বরে বলল,
—”থাম আমার বাপ। আর বাকিটা বের করিস না। ‘সা’ এর জায়গায় ‘আ’ বলে তো সবার সামনে তোর বাপের মানইজ্জত সব খেয়ে বসবি”
সিয়া হো হো করে হেসে উঠল। কাইলিন তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে শুধালো,
—”তুমি ওকে ভালো কিছু শিখাতে পারোনি?”
—”আপনি ভালো কিছু শিখাতে পারেননি?”
—”আমার ছেলে খুব ভদ্র”
—”তাহলে ওকে পিচ্চি কে শিখিয়েছে?”
—”সত্য কথা বলা অপরাধ না।”
—”তাহলে আপনাকে তালগাছ বলা অপরাধ কেন?”
এদিকে ছোট্ট কায়াস অবাক হয়ে মা বাবার তর্ক বিতর্ক দেখল। তারপর হঠাৎ নিজেই খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর হাসি শুনে দুজনেই থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো। তারপর অদ্ভুতভাবে দুজনেই হেসে ফেলল। সব ঝগড়া, সব খুনসুটি যেন মুহূর্তেই উবে গেল। সিয়া ছেলেটার পেটে কাতুকুতু দিয়ে বলল,
—”আরে, আমার বাবু হাসছে কেন?”
কায়াস হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। কাইলিনও তার গলায় কাতুকুতু দিতে শুরু করল। জিমরুম ভরে উঠল তিনজনের হাসিতে। কিছু সম্পর্কের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই, যেখানে ঝগড়া আছে, খোঁচাখুঁচি আছে, অভিমান আছে, কিন্তু দিনের শেষে হাসিটাই জিতে যায়।

ব্ল্যাক ম্যানশনের আরেক কোণে এসপির কক্ষে বড় সোফাটায় বসে আছে এসপি। তার দৃষ্টি স্থির হাতে থাকা মুঠোফোনের স্ক্রিনে যেখানে ভাসছে পাঁচ বছর আগের সেই একমাত্র মেসেজ, কিংবা সারহাদের পাঠানো শেষ মেসেজ। পাঁচ বছরে এটা সে হাজারবার পড়েছে,
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। নিজের মতো বাঁচতে চাই। কোম্পানিটা দেখিস। মায়ের খেয়াল রাখিস”
এরপর আর কিছুই না, না কোন কল, না কোন মেসেজ, না কোন খোঁজখবর। যেন মানুষটা পৃথিবী থেকেই মুছে গেছে। এসপি তাকে খুঁজার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু ফলাফল বরাবরই শূন্য। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে। যে ছেলেটা অফিসের নাম শুনলেই পালাত, আজ সেই পুরো গিনি গ্রুপ সামলাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মিটিং, ক্লায়েন্ট, ইনভেস্টর, প্রেজেন্টেশন, মাল্টি মিলিয়ন ডলারের ডিল সবকিছু এখন তার কাঁধে। আর আশ্চর্যজনকভাবে সে পারছেও।
এমনকি খুশদিল ফারুকী পর্যন্ত আজকাল প্রকাশ্যে তার প্রশংসা করে। আর সেই পথটা সহজ হয়নি। তার সবচেয়ে বড় সহায় ছিল সানা। পুরো ডিজাইনিং ডিপার্টমেন্ট একা হাতে সামলেছে মেয়েটা। দুজন মিলে প্রায় মৃত একটা কোম্পানিকে আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে। এসপি যখন এসব ভাবছিল ঠিক তখনই পাশ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এলো,

—”হুহুহুহুহু…”
এসপি চোখ বন্ধ করে বিরক্ত সূচক শব্দ উচ্চারণ করে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। নজরে আসে, সানিতা তার পাশে বসে আবার কাঁদছে। রমণী হাতে টিস্যু, নাকে টিস্যু, চোখে পানি আর সামনে টিভিতে চলছে কোনো স্যাড মুভি। এসপি নিচে তাকিয়ে দেখল, তার কোলে রাখা এক বক্স টিস্যু ইতিমধ্যেই শেষ। সে মাথা চুলকে বিড়বিড় করল,
—”হায় উপরঅলা, এই মেয়েটা একদিন দেশের টিস্যু শিল্প ধ্বংস করে ফেলবে”
ঠিক তখনই সানিতা আবার হাত বাড়িয়ে টিস্যু নিতে গিয়ে আবিষ্কার করল, টিস্যু শেষ। রমণী দুই সেকেন্ড ভেবে সোজা এসপির শার্টে নাক মুছে দিল। এসপি লাফিয়ে উঠল,
—”সানির বাচ্চা”
সানিতা কাঁদতে কাঁদতেই তাকাল,
—”কী?”
—”আমার মুখে গালি আসতে যত সময় লাগে, তোর চোখের পানি তার আগেই চলে আসে। এখন কি মোটর লাগাতে হবে তোর চোখে?”
সানিতা আবার নাক টেনে বলল,

—”তুমি বুঝবে না”
—”কী বুঝব না?”
—”ওর সাথে কি কি হয়েছে”
—”কার?”
—”মুভির নায়িকার, ওরা মেয়েটাকে দুই বেলা খেতে দেয়নি। তুমি জানো দুই বেলা না খেয়ে থাকা কেমন?”
এসপি নিজের কপাল চাপড়ে নির্বিকার গলায় বলল,
—”আবে গাধী, ও না খেয়ে কাঁদছে না আর তুই খেয়ে ধেয়ে ওর জন্য কাঁদছিস। আর আমি তিন দিন না খেয়ে থাকতে পারি”
—”কিন্তু ও তোমার মতো বুড়ো না, ওরা একটা বাচ্চা মেয়েকে কিভাবে খাবার দেয়নি?”
সানিতার মুখে ‘বুড়ো’ শব্দটা এসপির কর্ণকুহরে যেতেই তার চোখে অদৃশ্য আগুন জ্বলে ওঠল। সে দন্ত চেপে আওড়ায়,
—”সানির বাচ্চা, আজ রাতে তোকে বুঝাব, কে বুড়ো?”
সানিতা এসপির কথার মানে বুঝতেই তার কান্না থেমে গেল। সে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করল নির্লজ্জ পুরুষ টার দিকে। বলল,
—”আমি আজ বিকালে সত্যি সত্যি চলে যাব”
—”ঠিক আছে, যা যা, দু-চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই চলে যা। কিন্তু পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আমার কাছে ফিরে না এলে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব”
সানিতা তার বিপরীতে কিছু বলবে ঠিক তখনই দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকল ছোট্ট সিরাত। ছয় বছরের গোলগাল পুতুলটা যেন সকালবেলার রোদের টুকরো, ফর্সা নরম মুখ, গোলাপি ঠোঁট, কোমর পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুল। আর সেই চোখ…গভীর কালো, একদম সারহাদের মতো। যেন ছোট্ট দুইটা কৃষ্ণগহ্বর মায়ায় ভরা, রহস্যে ভরা। মেয়েটা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বলল,
—”মাম্মাম? তুমি কাঁদছো কেন?”
সানিতা এক সেকেন্ডও সময় নিল না। আঙুল তুলে এসপির দিকে ইশারা করে বলল,
—”তোমার পাপা আমাকে বকেছে”
এসপি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল।
—”এই, আমার মেয়েকে মিথ্যা কথা বলবি না”
কিন্তু ততক্ষণে সিরাত গিয়ে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। দুই হাত কোমরে ছোট্ট ভ্রু জোড়া একটু নাছিয়ে জিজ্ঞেস করে,
—”পাপা? তুমি মাম্মামকে কেন বকেছ?”
এসপি হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তারপর দ্রুত মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
—”অ্যাঞ্জেল, তুমি সত্যি বিশ্বাস করো তোমার পাপা কাউকে বকতে পারে?”
সিরাত থমকে গেল। একবার মায়ের দিকে তাকাল, আরেকবার বাবার দিকে। তার ছোট্ট মাথায় যেন ভয়াবহ বিচারসভা বসেছে। কাকে বিশ্বাস করবে?
কয়েক সেকেন্ড গভীর চিন্তা করে সে হঠাৎ এসপির বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে দিয়ে পুরো শরীর গুটিয়ে ফেলল। অর্থাৎ, সে পাপার পক্ষ নিয়েছে। এসপি সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর হাসি হাসল সানিতার দিকে তাকিয়ে। বিপরীতে রমণী কটমট করে তাকাল,

—”বাপ-মেয়ে দুইজনই বিশ্বাসঘাতক”
সানিতা আর কিছু না বলে নতুন একটা টিস্যুর প্যাকেট খুলে আবার মুভির দিকে মন দিল। দশ সেকেন্ড পর আবারও কান্না শুরু করে দিল। এসপি মাথা নেড়ে হেসে ফেলল। তারপর সিরাতকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে উঠে দাঁড়াল,
—”লেটস গো, অ্যাঞ্জেল। আমরা ব্রেকফাস্ট করব”
—”মাম্মাম আসবে না?”
—”না, মাম্মাম আজকে সিনেমার মানুষদের জন্য শোক পালন করছে”
সিরাত অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। আর সানিতা আবারও টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
—”তোমার পাপা খুব খারাপ”
এসপি হেসে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—”আর তোমার মাম্মাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছিচকাঁদুনে”
পরমুহূর্তেই একটা কুশন উড়ে এসে তার পিঠে লাগল। করিডোর জুড়ে ভেসে উঠল এসপির হাসির শব্দ। আর তার বুকের মধ্যে মাথা রেখে ছোট্ট সিরাতও খিলখিল করে হেসে উঠল।

সকালের কোমল রোদ্দুর ধীরে ধীরে ব্যালকনির কাঁচের দরজা পেরিয়ে প্রবেশ করছে ব্ল্যাক ম্যানশনের সবচেয়ে আদুরে কক্ষটিতে। এমন এক কক্ষ, যেখানে প্রবেশ করলেই মনে হতো যেন নিষ্পাপ শৈশবের কোনো রূপকথার রাজ্যে এসে পড়েছে কেউ। চারপাশে শুধুই পিংক আর সাদা রঙের মিশেল। দেওয়ালের গায়ে আঁকা ছোট ছোট প্রজাপতি, রঙিন মেঘ আর হাসিমুখ সূর্য। এক কোণায় সারি সারি সাজানো নরম টেডি বিয়ার, খরগোশ আর নানা রকম পুতুল। জানালার পাশে ছোট্ট একটা বুকশেলফ, যেখানে রূপকথার গল্পের বইগুলো সুন্দর করে সাজানো। কক্ষের মাঝখানে বিশাল এক আরামদায়ক বেড। সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের নরম কম্বলের নিচে ঘুমিয়ে আছে পাঁচ বছরের ছোট্ট এক পরী,
“সানভী জাওয়ান”

আরজের হৃদয়ের সবচেয়ে কোমল অংশ। তার মুখটা ঘুমের মধ্যেও শান্ত। গোলগাল নরম গাল দুটো হালকা লালচে। ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে বালিশের উপর। আর তার চোখ…যদিও এই মুহূর্তে বন্ধ, তবুও সেই চোখ দুটো সম্পূর্ণ তার বাবার মতো, গভীর বাদামী। কিন্তু গায়ের রঙটা পেয়েছে তার মায়ের কাছ থেকে, একদম স্নিগ্ধ শ্যামল আভা। যেটা তাকে আরো মায়াবী করে তুলেছে।
ধীরে ধীরে কক্ষের দরজাটা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল আরজে। এই মুহূর্তে তার চোখে নেই কোনো হিংস্রতা, নেই কোনো কঠোরতা শুধু ভাসছে এক বাবার নিখাদ ভালোবাসা। সে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে পড়ল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিজের মেয়ের দিকে, যেন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য এসে জমা হয়েছে এই ছোট্ট মুখটাতে। আরজে আলতো করে সানভীর কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। তারপর ঝুঁকে এসে সেখানে খুব কোমল একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,

—”প্রিন্সেস হার্ট…”
ছোট্ট মেয়েটা কুঁকড়ে উঠল। আরজে আবারও ডাকল,
—”মাই হার্ট…”
সানভীর নেত্রপল্লব কয়েক সেকেন্ড পরে আধো ঘুমন্ত অবস্থায় খুলল। আর বাবাকে সামনে দেখতে না দেখতেই তার ঠোঁটে ফুটে উঠল সবচেয়ে মিষ্টি হাসিটা,
—”গুড মর্নিং ড্যাডি…”
আরজের বুকটা অদ্ভুত এক শান্তিতে ভরে গেল। সে মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে কোমলভাবে বলল,
—”গুড মর্নিং, মাই হার্ট, আজকে সুইট ড্রিমগুলো দেখেছো?”
সানভী সাথে সাথে মাথা উপর-নিচ নাড়ল,
—”হুম, দেখেছি। অনেক গুলো”
—”ড্যাডিকে বলা যাবে?”
ছোট্ট মাথাটা এবার দুই দিকে নাড়িয়ে বলল,
—”নোপ। মাম্মাম না করেছে। মাম্মাম বলে ড্রিম কাউকে বলতে নেই। নাহয় সবাই ড্রিম চুরি করে নিবে”
—”ওকে, মাম্মাম ড্রিম বলতে নিষেধ করেছে। কিন্তু ড্রিমের মধ্যে কী কী দেখেছো সেটা তো বলতে নিষেধ করেনি, তাই না?”
সানভী থমকে গেল। মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল গণিত করছে। কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—”হুমমম….ওটা তো মাম্মাম বলেনি”
আরজে তার ছোট্ট নাকটায় আঙুল ছুঁইয়ে বলল,
—”দ্যান টেলমি প্রিন্সেস, স্বপ্নে কী দেখেছো। কজ ইন ড্যাডি’জ ওয়ার্ল্ড, ড্রিমস ডোন্ট স্টে ড্রিমস। টেল মি ইয়োর্স অ্যান্ড আই উইল বিং দেম টু লাইফ”
সানভীর চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে উচ্ছ্বাস নিয়ে একে একে বলতে শুরু করল আর বিপরীতে আরজে খুবই মনোযোগের সহিত তার প্রতিটা বাক্য শ্রবণ ইন্দ্রিয় করছে। কথা শেষে আরজে তাকে কোলে তুলে নিল,
—”লেটস গো, হার্ট। আমরা ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করব”
সানভী বাবার গলায় হাত জড়িয়ে দিল,
—”ওকে ড্যাডি”
ওয়াশরুমে গিয়ে আরজে নিজ হাতে মেয়ের ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে দিল। তারপর বলল,
—”ওপেন”
সানভী সঙ্গে সঙ্গে মুখ বড় করে খুলে বলল,
—”আআআআ…”
আরজে অত্যন্ত যত্নে তার দাঁত ব্রাশ করে দিল, মুখ ধুইয়ে দিল, হাত ধুইয়ে দিল। তারপর তাকে নিয়ে আবার রুমে ফিরে এল। নরম তোয়ালে দিয়ে মাথার ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে বলল,

—”হোয়াট ইউ ওয়ান্ট টু ইট ইন ব্রেকফাস্ট?”
সানভী আঙুল মুখে দিয়ে ভাবল। খুব গভীরভাবে ভেবে বলল,
—”প্যানকেক, উইথ হানি, উইথ চকোলেট”
—”ওকে, মাই হার্ট। এনিথিং এল’স?”
—”আর আইসক্রিম”
সাথে সাথে আরজের কপালে ভাঁজ পড়ে। ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল,
—”ব্রেকফাস্টে আইসক্রিম?”
—”লিটল আইসক্রিম”
—”মাম্মাম যদি জানে?”
সানভী ফিসফিস করে বলল,
—”আমরা বলব না”
আরজে হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল,
—”ডিল”
কিছুক্ষণ পরে সে মেয়েকে নিয়ে দাঁড়াল কক্ষের সবচেয়ে বড় আয়নার সামনে। সানভী চুপচাপ বসে রইল। আরজে ধীরে ধীরে তার চুলগুলো আঁচড়ে দিল। প্রতিটা গোছা অত্যন্ত যত্নে গুছিয়ে দিল। তারপর ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা ছোট্ট পিংক রঙের বেবি ক্লিপ নিয়ে চুলের পাশে লাগিয়ে দিল। সানভী আয়নায় নিজেকে দেখে উচ্ছ্বাসে বলে উঠল,
—”আই লুক প্রিটি”
আরজে ঝুঁকে এসে তার গালে চুমু খেয়ে আওড়ায়,
—”নোপ, ইউ লুক প্রিন্সেস”
ছোট্ট মেয়েটা হাত তালি দিয়ে হেসে ফেলল। আরজে তাকে আবারও কোলে তুলে নিল। তারপর বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। সকালের রোদ তখন কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই আলোয় এক বাবার কোলে তার ছোট্ট পৃথিবীটা নিরাপদে মাথা রেখে দিয়েছে যেন পৃথিবীর কোনো অন্ধকারই কখনো তার কাছে পৌঁছাতে পারবে না।

সকালের সোনালি রোদ ধীরে ধীরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধ কবরস্থান জুড়ে। বিশাল কালো লোহার গেট দিয়ে ঘেরা একটি কবর, যেখানে সাদা মার্বেলের ফলকে খোদাই করা,
“রিয়ানা জাওয়ান”
পাঁচ বছর হয়ে গেছে, সময় এগিয়েছে, ঋতু বদলেছে, মানুষ বদলেছে শুধু কিছু অপেক্ষা বদলায় না, কিছু ভালোবাসা ফুরায় না। সেই কবরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান, তার দুই পাশে দশ বছর বয়সী কিয়ান ও কিয়ারা।
আয়ান…এই পাঁচ বছরে তার চারপাশের পৃথিবী হাজারবার বদলালেও তার একটা অভ্যাস আজও বদলায়নি তা হলো, রোজ সকালে একবার এখানে আসা। মন খারাপ হলে এখানে আসা, ভালো লাগলে এখানে আসা, কোনো ব্যর্থতা হলে এসে অভিযোগ করা। মনে হতো এই কবরের নিচে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটা এখনো তার সব কথা শুনছে। আর আজও ঠিক তেমনই দাঁড়িয়ে আছে সে নীরবে। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ততক্ষণে হাজারো শব্দে ভরে উঠেছে। আয়ানের চোখ ধীরে ধীরে নামল মার্বেলের ফলকের দিকে। মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
—”জানেন কল্পবাসিনী,আজও আমি আপনাকে খুঁজে বেড়াই। পুরো দশটা বছর হয়ে গেছে। অথচ আমার কাছে এখনো মনে হয় আপনি বুঝি কালই আমার হাত ছেড়ে গেছেন। আমি এখনো মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলল আমার পাশটা খুঁজি। তারপর মনে পড়ে… সেখানে কেউ নেই, আপনি নেই”
ধীরে ধীরে চোখের কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল সাথে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে,

—”আমি ক্লান্ত হয়ে গেলে এখনো আপনার কাছেই আসি। মনে হয় আপনি যদি একবার বলতেন, ‘আয়ান, সব ঠিক হয়ে যাবে’, তাহলে সত্যিই সব ঠিক হয়ে যেত। আমি অনেক শক্ত থাকার চেষ্টা করি রিয়া। বাচ্চাদের সামনে হাসি। সবার সামনে স্বাভাবিক থাকি। কিন্তু আপনি তো জানেন… আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে গেছি। আমি আপনাকে ভীষণ মিস করি রিয়া, ভীষণ। এই পৃথিবীতে যতটা সম্ভব কাউকে মিস করা যায়, তার থেকেও বেশি”
সে বাচ্চারা দেখার আগেই দ্রুত চোখ মুছে ফেলল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ানও চুপচাপ কবরটার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে ধীরে ধীরে মনে মনে বলল,
—”মাম্মাম…আজকে আমি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছি, তুমি থাকলে খুব খুশি হতে। তুমি কি আমাকে দেখতে পাও?
যদি দেখতে পাও, তাহলে প্লিজ একবার হাসবে? আমি তোমার হাসিটা অনেক মিস করি মাম্মাম…”
অন্যদিকে কিয়ারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখদুটো ইতিমধ্যেই ভিজে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে মার্বেলের ফলকটাকে ছুঁয়ে মনে মনে আওড়ায়,
“মাম্মাম… আমার আমার মনে হয়, আমি ছোটই ভালো ছিলাম। যখন মৃত্যুর মানে বুঝতাম না। ভাবতাম তুমি একদিন ফিরে আসবে। এখন বড় হয়ে মৃত্যুর মানে শিখেছি, জেনেছি তুমি আর আসবে না। তবুও আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করি। রাতে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটাকে দেখি আর ভাবি ওটাই তুমি। তুমি যদি একবার আমাকে জড়িয়ে ধরতে মাম্মাম, শুধু একবার…”

কথাগুলো আর শেষ করতে পারল না সে, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ঠিক তখনই আয়ান ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত রাখল। কিয়ানও মুখ ফিরিয়ে নিল।তিনজনেরই চোখ ভিজে গেছে। কিন্তু কেউ কাউকে দেখাতে চাইছে না। কেউ কারো সামনে ভাঙতে চাইছে না। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা শেষে আয়ান নিচু হয়ে কবরের উপর রাখা শুকিয়ে যাওয়া একটা পাপড়ি সরিয়ে দিয়ে খুব আস্তে বলল,
—”আমি আবার আসব রিয়া, হয়তো ওরা আসবে না কিন্তু আমি রোজ আসব। সারা জীবন আপনার মনে জায়গা হয়নি তো কি হয়েছে, আপনার পাশের কবর টুকু কিন্তু আমার হবে। সেটা আমি কাউকে নিতে দিব না। আর সেই কবরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আসবো, চিরকাল। প্রতিজ্ঞা”
তারপর সে কিয়ান আর কিয়ারার হাত ধরে
তিনজনই শেষবারের মতো কবরটার দিকে তাকিয়ে নীরব বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র হাতিরঝিল আজ যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। চারদিকে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। কারো হাতে ব্যানার, পোস্টার, ফুলের তোড়া, কেউ আবার নিজের হাতে আঁকা পোর্ট্রেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও ভেসে আসছে গান, কোথাও আবার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে স্লোগান,
—”ঈশানী..”
—”হ্যাপি বার্থডে কুইন”
—”উই লাভ ইউ”
শত শত নয়, হাজার হাজার ভক্তে আজ পুরো এলাকাটা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে। সবাই একনজর দেখার অপেক্ষায় আছে তাদের প্রিয় অভিনেত্রীকে। মঞ্চের মতো করে তৈরি করা একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে বসে আছে দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঈশানী তুৎমিশ।
দশ বছর আগে সে অভিনয় জগত থেকে সাময়িক বিদায় নিয়েছিল, কিন্তু ছেলে মিরাজের জন্মের পর আবারও ফিরে এসেছে নিজের ভালোবাসার জগতে। শুরুর পথটা সহজ ছিল না। নতুন প্রজন্ম, নতুন প্রতিযোগিতা, নতুন বাস্তবতা, সবকিছুর সাথে তাল মিলিয়ে আবার নিজের জায়গা ফিরে পেতে হয়েছে। কিন্তু আজ?
আজ সে আগের থেকেও বেশি সফল। ঈশানী মুচকি হেসে চারপাশে হাত নাড়তেই জনতার উচ্ছ্বাস যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা উপস্থাপক মাইক্রোফোন হাতে বললেন,
—”ম্যাম, দশ বছর আগে আপনি পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য অভিনয় ছেড়েছিলেন। এখন আবার অভিনয়ে ফিরে এসেছেন। কখনো কি মনে হয় অভিনয়ের জন্য পরিবারকে সময় কম দিতে হচ্ছে?”
ঈশানী ভদ্রভাবে তার কথা থামিয়ে ঠোঁটে কোমল হাসি টেনে বলল,

—”এক সেকেন্ড। আমি মনে করি প্রশ্নটার মধ্যেই একটা ভুল আছে”
সাংবাদিক অবাক হয়ে তাকালেন। ঈশানী মাইক্রোফোনটা একটু নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললেন,
—”আমি কখনো পরিবার ছাড়িনি। আর কখনো ছাড়বও না। আমার কাছে পরিবার কোনো অপশন না। পরিবার আমার প্রথম দায়িত্ব। ফ্যামিলি ইজ মাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি। ফর মি, পরিবার ফুল-টাইম জবের মতো। আর অভিনয়? সেটা পার্ট-টাইম জব।”
ভিড়ের মধ্যে আবারও হাততালি বেজে উঠল।
উপস্থাপক হেসে বললেন,
—”তাহলে একজন সফল অভিনেত্রী আর একজন সফল মা দুইটা ভূমিকা কীভাবে সামলান?”
—”আমি অভিনেত্রী হওয়ার আগে একজন মা। ক্যামেরা বন্ধ হলে কেউ আমাকে স্টার বলে ডাকে না। ওখানে আমি শুধু মিরাজের মাম্মাম, রুহির মাম্মাম আর রিজভীর স্ত্রী।আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ার্ড কোনো ট্রফি না, আমার ছেলে যখন দৌড়ে এসে বলে, ‘মাম্মাম আমি তোমাকে মিস করেছি’ ওটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার”
আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন,
—”তাহলে আপনার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট সিস্টেম কে?”
—”আমার স্বামী, রিজভী না থাকলে আমি কখনো এই জায়গায় ফিরতে পারতাম না। আমার প্রতিটা সাফল্যের পিছনে ওর অবদান আছে”
ইন্টারভিউ চলল আরও কিছুক্ষণ। যত প্রশ্নই আসুক না কেন, প্রতিটি উত্তরে ঈশানী একটাই বিষয় পরিষ্কার করে দিল, খ্যাতি তার জীবনের অংশ। কিন্তু পরিবার তার জীবনের কেন্দ্র। অবশেষে অনুষ্ঠান শেষ হলো। মঞ্চ থেকে নামার সাথে সাথেই চারদিক থেকে ফ্যানরা এগিয়ে এল,

—”ম্যাম একটা সেলফি”
—”একটা অটোগ্রাফ প্লিজ”
পরিস্থিতি সামলাতে তার চারজন প্রশিক্ষিত বডিগার্ড দ্রুত তাকে ঘিরে ফেলল। ঈশানী ধীরে ধীরে গাড়ির সামনে এসে পিছনে ফিরে আবারও হাত নাড়ালো। জনতা আরও একবার চিৎকার করে উঠল,
—”হ্যাপি বার্থডে”
—”উই লাভ ইউ”
ঈশানী হেসে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই হঠাৎ থমকে গেলেন। পরমুহূর্তেই বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল। কেননা গাড়ির ভেতরে বসে আছে রিজভী। হাতে বিশাল এক গোলাপের তোড়া। সে তোড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—”হ্যাপি বার্থডে, মেরি ঈশু জান”
ঈশানীর চোখের বিস্ময় আরও বেড়ে গেল।
কারণ রিজভীর কোলে বসে আছে তাদের চার মাসের ছোট্ট মেয়ে, রুহি। গোলাপি কম্বলের মধ্যে জড়ানো ছোট্ট পরীটা। ঈশানী সাথে সাথে চোখ রাঙিয়ে বলল,
—”রিজভী, তুমি আমার মেয়েকে বাইরে নিয়ে এসেছ?”
রিজভী দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধায়,
—”কি করব বলো? আমরা বাবা-মেয়ে দুজনেই তো মাম্মামকে ভীষণ মিস করছিলাম”
ঠিক তখন সামনের সিট থেকে ছোট্ট একটা মাথা উঁকি দিয়ে বের করে মুখভর্তি হাসি নিয়ে বলল,
—”মাম্মাম, হ্যাপি বার্থডে। আমিও ড্যাডুর মতো তোমাকে খুব মিস করছিলাম”
মুহূর্তেই ঈশানীর পুরো চেহারা বদলে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগেও সে ছিল দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কিন্তু এখন সে শুধু একজন মা, একজন স্ত্রী। সে মিরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে তারপর রুহিকে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
—”আমার বাবুগুলো আমাকে এত মিস করেছে?”
মিরাজ দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে,

—”খুবববববব”
ঈশানী হেসে ফেললেন। তারপর হঠাৎ রুহির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
—”রিজভী, তুমি ওকে খাইয়েছ?”
রিজভী কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল,
—”ঈশু, আমি ওকে কিভাবে খাওয়াব?”
ঈশানীও সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পেরে
ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বলল,
—”ওহ…তোমার তো কিছুই নেই। দাও, আমি খাওয়াই”
কয়েক পলকের নীরবতা ভেঙে রিজভী হঠাৎ হেসে উঠল। ঈশানীও হেসে ফেলল। মিরাজ কিছুই না বুঝে মা-বাবার সাথে তাল মিলিয়ে হেসে উঠল। আর ছোট্ট রুহি তাদের হাসি দেখে হাত-পা নেড়ে অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল। গাড়ির ভেতরটা মুহূর্তেই হাসিতে ভরে গেল। আর গাড়িটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল এয়ারপোর্টের দিকে।

সভ্যতার ইতিহাসে মোড়া, শিল্প-সংস্কৃতির দীপ্তিতে ভরা, পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ ইতালি। এখানে দিনের আলোয় ঝলমল করে রাজপ্রাসাদ, শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্য আর আধুনিক নগরীর চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি ইতালি, একটি অন্ধকার ইতালি।যেখানে আইনের চেয়েও শক্তিশালী কিছু নাম আছে। যেখানে সরকারের ক্ষমতা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ, অথচ ছায়ার আড়ালে কিছু মানুষ পুরো দেশটাকে দাবার বোর্ডের ঘুঁটির মতো পরিচালনা করে। সেই ছায়া সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ সিংহাসনে বসে আছে এক নাম,
“ড্যানিয়েল, ইতালিয়ান মাফিয়াদের গডফাদার”
কিন্তু আজ অদ্ভুতভাবে সেই ড্যানিয়েল নিজেই অস্থির। কেননা পৃথিবীতে আরো একজন মানুষ আছে, যার নাম শুনলে এমনকি তারও কপালে ভাঁজ পড়ে। সে আর কেউ না, “ব্ল্যাক হান্টার”
ইতালির সবচেয়ে জনমানবহীন অঞ্চলের গভীর জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে স্টার প্যালেস। এটাকে প্রাসাদ বললে ভুল হবে বরং দুর্গ বললে মানানসই হবে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত জঙ্গল ঘিরে রাখা হয়েছে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা, সেন্সর এবং নজরদারি প্রযুক্তি দিয়ে। আকাশপথে প্রবেশ করাও প্রায় অসম্ভব। স্যাটেলাইট সিগন্যাল পর্যন্ত এখানে বিকৃত হয়ে যায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, রেডিও সিগন্যাল নেই। মোটকথা, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক রাজত্ব। যেখানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে চাইলে জীবিত অবস্থায় নয় লাশ হিসেবেই প্রবেশ করতে হবে তাও অনুমতি নিয়ে।

এই দুর্গের চারপাশে এত এত নিরাপত্তা কার জন্য? শুধুমাত্র একটা পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ের জন্য, যে নিকোলাস কিলারের নিজের অংশও নয়। এই ব্যাপারটাই ড্যানিয়েলের মাথায় ঢোকে না। স্টার প্যালেসের সামনের বিশাল খোলা প্রান্তরে বসে ড্যানিয়েল সেই গুলোই ভাবছে। তার দৃষ্টি আটকে আছে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির উপর যে এই মুহূর্তে রাইফেল হাতে পাখি শিকার করছে একের পর এক।
তার মুখে কোনো অনুভূতি নেই আর না চোখে কোনো মমতা, নিষ্ঠুরতা আর মৃত্যুর মতো নীরব এক স্থিরতা। ড্যানিয়েল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—”নিকো… তুমি জানো আরজের লোকেরা কালকেও ইতালিতে এসেছিল”
বিপরীতে মানবের থেকে কোনো উত্তর এল না। সে নিশানা ঠিক করছে। ড্যানিয়েল আবার বলল,
—”পাঁচ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু ও এখনো খোঁজা বন্ধ করেনি। আর আমার মনে হচ্ছে তুমি যতই ওকে নেটওয়ার্কের বাইরে রাখো, যতই এই নিরাপত্তা দাও…একদিন ও খুঁজে পেয়ে যাবে”
কথা শেষ হতে না হতেই ‘ঠাস’ করে আরেকটি গুলি ছুটে গেল। আকাশে উড়তে থাকা পাখিটি মুহূর্তেই নিচে পড়ে গেল। সারহাদ ধীরে ধীরে বন্দুক নামিয়ে সোজা ড্যানিয়েলের চোখে চোখ রেখে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
—”আমি তো জানতাম, ইতালিয়ান গডফাদার ড্যানিয়েলের অনুমতি ছাড়া ইতালিতে একটা পাখি মারাও নিষেধ। তাহলে কেউ কিভাবে প্রবেশ করতে পারে?”
কথাটার মধ্যে থাকা বিদ্রূপ ড্যানিয়েল স্পষ্ট বুঝতে পারল। তার ক্ষমতাকে উপহাস করা হচ্ছে। তবুও সে নিজেকে শান্ত রাখল। কারণ সে জানে, এই মানুষটাকে রাগানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই অন্ধকার টাকে নিজের হাতে গড়ে তোলে এখন তাকেই যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে,
—”নিকো…তুমি জানো ওটা কে। পাঁচ বছর আগে তুমি নিজেও মরতে মরতে ফিরে এসেছ। ও ব্ল্যাক হান্টার, ওকে আটকানোর ক্ষমতা আমার নেই”
সারহাদের ঠোঁটটা ধীরে ধীরে ভয়ংকর ভাবে বাঁকিয়ে গেল। সে বলল,

—”তাহলে মনে হচ্ছে…ইতালির গডফাদার চেঞ্জ করার সময় হয়েছে”
মুহূর্তেই ড্যানিয়েলের মুখ লাল হয়ে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে,
—”নিকো, একটা বাচ্চার জন্য আমি আর কোনো ঝুঁকি নিতে পারব না। তুমি চাইলে পৃথিবীর সব বাচ্চা তোমার সামনে এনে দেব।কিন্তু ওর বাচ্চাটাকে ওর কাছে ফিরিয়ে দাও।ও পাগলা কুকুরের মতো খুঁজছে। একবার যদি সত্যিটা জেনে যায়…তোমাকে জীবন্ত মেরে ফেলবে। আমাকেও মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে”
ড্যানিয়েল বলতে দেরি সারহাদের চোখ জ্বলে উঠতে দেরি হয়নি, যেন অন্ধকারে আগুন জ্বলে উঠেছে। পরমুহূর্তে রাইফেলের নল সোজা ড্যানিয়েলের বুকের সামনে ঠেকল। গার্ডরা নড়ে উঠলেও সারহাদের অগ্নিমূর্তি দেখে কেউ সাহস করল না অস্ত্র তুলতে। সারহাদের কণ্ঠ বজ্রের মতো গর্জে উঠল,
—”ডোন্ট ইউ ডেয়ার, ড্যানিয়েল। ওই বাচ্চাটা শুধুমাত্র আমার। শুধুমাত্র আমার লিটল স্টার। পৃথিবীর কোনো মানুষ কোনো মাফিয়া, গ্যাংস্টার কেউ ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না”
ড্যালিয়েলের চোখ বিস্ফোরিত। সে কখনো সারহাদের মুখে নিজের নাম শুনেনি। আর এত উন্মাদনার ছাপও দেখেনি। তার ভ্রম কাটিয়ে আবারও আসে সারহাদের কণ্ঠ,
—”আমি ওকে বড় করেছি, ওর প্রথম হাঁটা আমি দেখেছি, ওর প্রথম হাসি আমি দেখেছি, ওর দুঃস্বপ্নে আমি পাশে ছিলাম, ও কাঁদলে আমার নাম ডাকে, ও আমার লিটল স্টার। আর যে আমার স্টারের দিকে হাত বাড়াবে, আমি তার হাত নয়। তার পুরো অস্তিত্ব কেটে ফেলব”
ড্যানিয়েলের গলায় শুকনো ঢোক নামল। সারহাদ আবার বলল,

—”ফাদার, আপনি আমাকে বড় করেছেন। এই একমাত্র কারণে আজ বেঁচে আছেন। অন্য কেউ এই কথা বললে…”
হঠাৎ পরপর চারটি গুলি তীব্র শব্দে ছুটে গেল। ড্যানিয়েল ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সব শেষ। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে বুঝল, তার গাঁয়ে রক্ত নেই মানে সে বেঁচে আছে। ঘাড় বাঁকিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল আরও কয়েকটি পাখি মাটিতে পড়ে আছে, একদম নির্ভুল শিকার। সারহাদ তখন ঘুরে স্টার প্যালেসের দিকে এগোচ্ছে। সে পেছন ফিরে না তাকিয়েই বলল,
—”আরজের লোকেরা যেন আর কখনো ইতালিতে না আসে। এটা আপনার সমস্যা, আমার না। যদি আবার ওদের কাউকে আমার সীমান্তের ভেতর দেখি, তাহলে আমি সীমান্ত সরিয়ে দেব, পুরো ইতালিসহ”
সারহাদ নিজের চলন্ত পা থামিয়ে শেষবারের মতো বলল,
—”জাস্ট রিমেম্বার ইট, ফাদার। আরেকবার আমার লিটল স্টারের দিকে যে তাকাবে, আমি তার পৃথিবীটাই পুড়িয়ে দেব”
তারপর চলে গেল ভিতরে। আর ড্যানিয়েল সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, শেষ কথাটা তাকেই বলা হয়েছে। আর সেই কারণেই প্রথমবারের মতো ইতালির গডফাদারের মনে হলো, হয়তো আরজে আর নিকোলাস যুদ্ধ শুরু হলে পুরো পৃথিবীই তাদের জন্য যথেষ্ট বড় হবে না।
“স্টার প্যালেস” বিশাল প্রাসাদসম অট্টালিকার প্রতিটি দেয়াল যেন নীরব বিলাসিতার সাক্ষ্য বহন করছে। সেই প্রাসাদের সদর দরজায় ডক্টর লুনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি এখানে সানায়ার দেখাশোনা করেন। আর তার স্বামী এখানের কেয়ারটেকার। একসময় তার স্বামীর জুয়া খেলার অভ্যাস ছিল। সেজন্য তিনি কিছু মাফিয়াদের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং তারা তাকে টাকার জন্য তাকে আটকে ফেলে। আর সেই সুযোগটা তুলেছিল সারহাদ পাঁচ বছর আগে। তাকে তার বাচ্চা ও স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে তাকে দিয়ে ঐ কাজটা করিয়েছিল। ছয় মাস পর্যন্ত তারা শুধু প্ল্যানই করেছিল। আরজে পৌঁছাতে পারে এমন সব পথ আগেই বন্ধ করে দিয়েছিল।
পাঁচ বছর হয়ে গেছে, তবুও সেই রাতের স্মৃতি আজও লুনাকে তাড়া করে বেড়ায়। সেই রাত…যেদিন একটা শিশুকে তার প্রকৃত বাবা মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল, যেদিন মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল তারা সবাই, যেদিন আরজে প্রায় তাদের ধরে ফেলেছিল। লুনা এখনো মনে করতে পারে সেই, অন্ধকার আকাশ, জ্বলতে থাকা হেলিকপ্টারের আগুন, কানে বাজতে থাকা বিস্ফোরণের শব্দ। আর সেই রক্তাক্ত মানুষটা…সারহাদ।
তার পুরো শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। তবুও হেলিকপ্টারের ভেতরে বসেও তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক উন্মাদনা। যেন সে মরতে রাজি, কিন্তু কোলে থাকা ছোট্ট শিশুটাকে ছাড়তে রাজি নয়। সেদিন চারটি হেলিকপ্টার মধ্যে তিনটি মাঝ আকাশেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আরজের আক্রমণে। লুনা আজও বুঝতে পারছে না, আরজে কীভাবে এত দ্রুত সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্ব ছিল, আর পাঁচ মিনিট পরেই হয়তো সবকিছু শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ভাগ্য সেদিন সারহাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আর সেই ভাগ্যই আজ পাঁচ বছর ধরে তাকে এই স্টার প্যালেসে বন্দি করে রেখেছে। তবুও ঐ দিনের পর সারহাদ টানা তিনমাস কোমায় ছিল সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় এতটা ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল সে।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারহাদ কে দেখে বললেন,

—”স্যার, সানায়ার ব্রেকফাস্ট রেডি”
সারহাদ কেবল মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে সোজা উপরে চলে গেল। তার মুখে এখনো হিংস্রতা স্পষ্ট আর চোখে তীব্র ক্রোধ। কিন্তু উপরের তলার সেই বিশাল কক্ষটার সামনে দাঁড়াতেই সবকিছু বদলে গেল। যেন মুহূর্তের মধ্যে অন্য একজন মানুষ হয়ে গেল সে। সেই ভয়ংকর মানুষটার মুখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক কোমলতা।
দরজাটা আস্তে করে খুলে ভেতরে ঢুকল সে। এবং সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ আটকে গেল বিছানার দিকে। বিশাল সাদা বিছানার মাঝখানে ছোট্ট একটা পুতুলের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে সানায়া। তার এলোমেলো কালো চুল, ফোলা ফোলা গাল গুলো দেখতে দেখতে সারহাদের বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল। এই শিশুটার জন্যই তো সে বেঁচে আছে। এই শিশুটাই তার অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো।
প্রথমে সে তাকে এনেছিল প্রতিশোধের জন্য, নিজের জেদের জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পেরেছ, এই ছোট্ট মানুষটার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। আজ যদি কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে, তার পৃথিবী কী?
সে নির্দ্বিধায় বলবে,
“সানায়া, শুধু সানায়া তার লিটল স্টার”

সে হাঁটু গেড়ে বিছানার পাশে বসে পড়ল। আস্তে করে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে,
—”মাই লিটল স্টার… ওয়েক আপ”
বিপরীতে কোনো সাড়া নেই। সানায়া উল্টো আরো গুটিসুটি মেরে গেল। সারহাদের সিগারেটে পোড়া অধর জুড়ে কোমল হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সে আবার ডাকল,
—”স্টার…পাপার সাথে ব্রেকফাস্ট করবে না?”
ছোট্ট সানায়া আধো আধো চোখ খুলে বলল,
—”ঘুমাবো…”
—”আগে আমরা ব্রেকফাস্ট করব, তারপর ঘুমাবো, ওকে”
—”হুমমম,,,ওকে…”

সানায়া চোখ কচলাতে কচলাতে দুই হাত বাড়িয়ে দিল কোলে ওঠার জন্য। সারহাদ তার কপালে হালকা একটা চুমু এঁকে তাকে কোলে তুলে নিল। সানায়া সঙ্গে সঙ্গে গলা জড়িয়ে ধরল। যেন এটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। ব্যালকনিতে পৌঁছাতেই সকালের আলো এসে পড়ল তাদের ওপর। সানায়া গলা বাড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখল, জঙ্গল দেখল, উড়ন্ত পাখি দেখল। এটা তার রোজকার অভ্যাস, ঘুম থেকে উঠেই পাপার কোলে করে প্রত্যুষ দেখা। আর সারহাদ আঙুল তুলে একটার পর একটা দেখাতে লাগল। হঠাৎ সে সারহাদের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
—”পাপা?”
—”হুম?”
—”আই লাভ ইউ”
সারহাদ থমকে গেল। মাত্র তিনটা শব্দ, কিন্তু এই তিনটা শব্দই যেন তার ভেতরের সমস্ত অন্ধকারকে মুহূর্তে থামিয়ে দিল। সে চোখ বন্ধ করে আরো শক্ত করে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করল,
—”লাভ ইউ টু, মাই স্টার। মোর দ্যান এনিথিং ইন মাই লাইফ”
কিছুক্ষণ পর সে সানায়ার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল। আর তাকিয়ে রইল সেই মায়াবী কালো চোখ দুটির দিকে যেগুলো একদম সানার চোখ, হুবহু। প্রতিবার এই চোখ দেখলেই বুকের ভেতর অপরাধবোধ আর ভালোবাসা একসাথে লড়াই শুরু করে। সে মনে মনে বলল,

—”আম সরি, সানাম। আই নো, আমি ভুল করেছি, আমি তোমার কাছ থেকে তোমার পৃথিবী ছিনিয়ে নিয়েছি। বাট আই ক্যান্ট, আই রিয়েলি ক্যান্ট, সানাম। স্টারকে আমি আর কাউকে দিতে পারব না, এমন কি তোমাকেও না। ও আমার বেঁচে থাকার কারণ। আমার লিটল স্টার শুধু আমারই থাকবে”
চোখের পলকে সে আবার সানায়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। আর সানায়াও ছোট্ট বিড়ালছানার মতো তার পাপার বুকে মুখ গুঁজে দিল। সারহাদ মৃদু হেসে বলল,
—”আমার লিটল স্টার এখন ব্রেকফাস্ট করবে না?”
সানায়া মুখ তুলে বলল,
—”ওকে, বাট তোমার হাতের চকলেট প্যানকেক লাগবে”
—”ওকে, যেমনটা রাজকুমারীর আদেশ”
সে সানায়ার নাকে আলতো টোকা দিয়ে বলে,

—”লেটস গো”
সানায়া হাততালি দিয়ে উঠল,
—”ইয়াহু, মাই পাপা ইজ সুপারম্যান। হি ক্যান ডু এনিথিং”
সারহাদ হেসে উঠল তার কথায়। তারপর ফোলা ফোলা গালে আরেকটা চুমু খেয়ে তাকে কোলে নিয়েই রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আর বহু দূরে, কেউ একজন এখনো তার হারিয়ে যাওয়া প্রিন্সেসকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। অথচ সেই প্রিন্সেস এই মুহূর্তে তার ‘পাপা’র কাঁধে মাথা রেখে হাসছে। সারহাদ শেষবারের মতো ফিসফিস করে,
—”পৃথিবীতে সবাই সবটা পায় না সানাম, কিছুটা অপূর্ণতা নাহয় তোমারও রয়ে গেল, আমার সারাজীবনের ভালোবাসার খাতিরে”

সন্ধ্যার ব্যস্ততা তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জুড়ে। তবে আজ বিমানবন্দরের একটি নির্দিষ্ট ভিআইপি টার্মিনাল জুড়ে কড়া নিরাপত্তা ঘেরা। টার্মিনালের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই শুধু মাত্র আরজে, সানা ছাড়া। এসপি বিরক্ত মুখে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল,
—”শালা, ঐ জাওরাই, পৃথিবীর একমাত্র মানুষ যে ফ্লাইট মিস না করেও সবাইকে অপেক্ষা করাতে পারে”
ঠিক তখনই তার চোখ চলে গেল টার্মিনালের বিশাল কাঁচের দেয়ালের ওপারে। পরপর সাত-আটটি কালো গাড়ি এসে থামল। মাঝখানের একটি গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে নামল আরজে তার কোলে সানভী। আরজে গাড়ির অপর পাশের দরজা খুলে দিতেই সেখান থেকে নামল সানা। তার ঠিক পেছনের গাড়ির দরজা খুলতেই বেরিয়ে এল আরভি। বয়স বারো ছুঁই ছুঁই হলেও তাকে দেখে কেউই সেই বয়স অনুমান করবে না। কালো ডেনিম জ্যাকেট, গলায় হেডফোন, চোখে কালো সানগ্লাস, চোয়ালরেখা অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ, উচ্চতা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আরজের কিশোর সংস্করণ হাঁটছে, একই চোখ, একই মুখাবয়ব, একই গম্ভীরতা। এমনকি একবার চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার ভঙ্গিটাও অবিকল তার বাবার মতো। এসপি দুই বাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে তারপর মুখ বাঁকিয়ে বলল,

—”বুড়ো হলেও এই বাপ ছেলের ভাব কমবে না”
ঠিক তখন আরেকটি গাড়ি এসে থামল। সেখান থেকে নেমে এল জ্যাক, তার কোলে ইউবিকা। পাশ থেকে নেমে এল ইবেলিনা। তার হাত ধরে নামল ইউহান। সানা ভেতরে ঢুকতেই ঈশানী দুই হাত কোমরে রেখে খেঁকিয়ে উঠল,
—”ডাইনির বাচ্চা, তোদের এত সময় লাগে আসতে? আমি এত বড় সুপারস্টার হয়ে তোর জন্য দাঁড়িয়ে আছি”
সানা ধীরে ধীরে নিজের সানগ্লাস নামিয়ে ঈশানীর দিকে তাকাল। তারপর অবজ্ঞাসূচক ভঙ্গিতে বলল,
—”জানিস তুই কার জন্য অপেক্ষা করেছিস? গিনির হেড ডিজাইনার। আমার মতো ডিজাইনারের অপেক্ষা করে তোর জীবন ধন্য হওয়ার কথা। আর তুই ঝগড়া করতে এসেছিস?
সর সামনে থেকে, তোর মতো দশ বারোটা সুপারস্টার আমার বাম পকেটের চিপায় পড়ে থাকে। তাই তোকে গুনার টাইম নেই”
এই বলে সানা হাঁটতে শুরু করল। ঈশানী হতভম্ব, হুঁশ ফিরতেই তেড়ে গেল তার পেছনে,
—”এই ডাইনির বাচ্চা, দাঁড়া। কি বললি?”
সানা পিছনে না তাকিয়েই বলল,

—”তুই জানিস, আমার সাথে কথা বলতেও এক মিনিটে দশ হাজার টাকা লাগে?”
ঈশানী থমকে গেল।
—”কিহ?”
সানা এবার হাত বাড়িয়ে দিল,
—”টাকা বের কর। তারপর কথা বলবি”
—”দশ হাজার টাকা দিয়ে তোর সাথে কোন পাগল কথা বলে?”
—”এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য বিশ হাজার দে। তারপর বলব কোন পাগল বলে”
—”আমি এত বড় পাগল নই যে, তোর সাথে কথা বলার জন্য বিশ হাজার দিব”
—”কিন্তু তুইয়ে সেই পাগল, যে আমার সাথে কথা বলছিস”
ঈশানী তব্দা খেয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্ত মুখে বলল,
—”ধুর”
এবং উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল।
এদিকে জ্যাকের ফোনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কল আসায় সে ইউবিকাকে ইবেলিনার কাছে দিয়ে একটু দূরে চলে গেল। ইবেলিনা আলতো করে মেয়েটার হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক সেই সময় অন্য পাশ থেকে কায়াস গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এল। ইবেলিনা মাত্র হাত ছেড়েছে আর সেই সুযোগেই এক ধাক্কায় ইউবিকাকে ফেলে দিল কায়াস। ছোট্ট মেয়েটা ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে বসে মুহূর্তেই কান্নায় ফেটে পড়ল,

—”পাপাআআ…”
শব্দটা শুনতেই দূরে দাঁড়ানো জ্যাক ঘুরে তাকায়, তারপর নিজের মেয়েকে মেঝেতে বসে কাঁদতে দেখে তার চেহারা মুহূর্তে বদলে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে, কপালে শিরাও ফুলে উঠল। এক সেকেন্ডের জন্য সত্যিই মনে হলো সে ঝড়ের মতো এসে কায়াসকে তুলে একটা আছাঁড় মারবে কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল। তারপর পুরো টার্মিনাল কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—”কাইইইইইইইইইই….”
শব্দে আশপাশের সবাই চমকে উঠল। কাইলিন ঘুরে তাকিয়ে নিজের ছেলেকে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক দৌড়ে এসে কায়াসকে কোলে তুলে দাঁত চেপে বলল,
—”আমার বাপ, তুই একদিন নিজেও মরবি, আমাকেও মারবি”
কায়াস কিছুই বুঝল না। বরং খুশি হয়ে বাবার গলায় ঝুলে পড়ল। ওদিকে জ্যাক তড়িঘড়ি করে ইউবিকাকে তুলে নিয়ে মেয়েটার চোখের পানি মুছে দিল। তারপর বুকে জড়িয়ে নিয়ে একটু দূরে সরে গেল। ইউবিকা কান্নার মাঝেও বাবার শার্ট শক্ত করে ধরে রইল। আর জ্যাক এমনভাবে তাকে আগলে রাখল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা তার বুকে রয়েছে।

আজ বিমানবন্দরের উপস্থিত প্রত্যেকের আসার একটাই কারণ। সানা, আরজে, আরভি, কাইলিন, সিয়া, কিয়ান এবং কিয়ারা আজ আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। না, কোনো বিজনেস ট্রিপ না বরং দীর্ঘ সময়ের জন্য। আরজে আমেরিকা থেকেই নিজের সাম্রাজ্য পরিচালনা করবে, আর বিডির বাকি বিজনেস দেখবে জ্যাক। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে, আরভি।
দিন দিন ছেলেটার স্বভাব এমনভাবে বদলে যাচ্ছে যে সানা আর উপেক্ষা করতে পারছে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার জেদ, রাগ এবং উদ্ধত আচরণও বেড়ে চলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, সিরাত। কথায় কথায় সে সিরাতের উপর হাত তোলে, কখনো রাগ দেখায়, কখনো থাপ্পড় পর্যন্ত মেরে বসে।
এসপি কখনো মুখ ফুটে কিছু বলেনি ঠিকই তবুও সানা বুঝতে পারে। যখনই এসপি নিজের ছোট্ট মেয়েটাকে আরভির হাতে কাঁদতে দেখে, তার মুখটা অদ্ভুতভাবে গম্ভীর হয়ে যায়। সে চুপ করে থাকে ঠিকই, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরকার কষ্ট সানা খুব ভালোভাবেই অনুভব করে। অথচ সিরাতের অবস্থাও বিচিত্র, সে যেন আরভির আশেপাশে না থাকলেই নয়। সারাক্ষণ রিশী ভাইয়া’ করে করে ঘুরে বেড়ায়।
এই তো কয়েকদিন আগের ঘটনা। সেদিন সকালের নাস্তা শেষ করে সবাই মাত্র উঠেছে। ঠিক তখনই উপরের তলা থেকে ভেসে এলো সিরাতের কান্নার শব্দ। সাথে সাথে সানা আর এসপি দুজনেই একসাথে দৌড়ে গেছে। কিন্তু রুমের দৃশ্য দেখে সানা আর এসপি থমকে যায়। সিরাত মেঝেতে বসে কাঁদছে তার চোখ মুখ ভিজে একাকার। আর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরভি। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে আর মুখভর্তি বিরক্তির ভাব। এসপি কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তারপর নিঃশব্দে নিজের মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে স্নেহভরা হাতে চোখের জল মুছে দিল। তারপর কিছু না বলে মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর করে মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেই নীরবতাটাই যেন সানার হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছিল।
সানা আরভির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,

—”কি করেছো তুমি ওর সাথে?”
বিপরীতে কোনো উত্তর এলো না, আরভি যেন কিছুই শোনেনি। সে হেঁটে গিয়ে বিছানায় বসে নির্বিকারভাবে গেম খেলতে শুরু করল। সানার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে এক টানে ছেলের হাত থেকে গেম কনসোলটা কেড়ে নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে মারল। মুহূর্তেই সেটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। সানা গর্জে উঠল,
—”ভীর, আমি লাস্ট টাইম জিজ্ঞেস করছি, সিরাতের সাথে কি করেছো?”
এবার আরভি দাঁড়িয়ে মায়ের চোখে চোখ রেখে বলল,
—”ওকে থাপ্পড় মেরেছি। হয়েছে?”
সানার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফের প্রশ্ন করে,
—”কেন করেছো?”
কোনো উত্তর নেই। সে কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর আরভি ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
—”ভালো লেগেছে তাই”
ব্যাস, কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সানা জীবনে প্রথমবারের মতো একটা চড় বসিয়ে দিল ছেলের গায়ে। আরভি নিজেও হয়তো এই রকম কিছু আশা করেনি। সানাও আর কিছু না বলে ঘুরে সোজা দরজার দিকে চলে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আরজে। সানা দাঁতে দাঁত চেপে, আরভিকে শুনিয়ে বলল,
—”মিস্টার জাওয়ান, আপনার ছেলে কে স্পষ্টভাবে বলে দিবেন, আমি ওর এইসব উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ একদম সহ্য করব না। আজকে ওর এক গালে চড় পড়েছে। কালকে ওর পুরো শরীরে বেল্টের দাগ পড়বে। ভালো করে বিষয়টা ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিবেন”
কথাগুলো বলেই সে সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। আর সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আরভিকে কিছুদিনের জন্য এই পরিবেশ থেকে দূরে নিয়ে যেতে হবে, তার জেদ ভাঙতে হবে, তার আচরণ বদলাতে হবে। তাকে শেখাতে হবে দায়িত্ব, সম্মান আর সংযমের অর্থ। আর সেই সিদ্ধান্তের ফলেই আজকের এই যাত্রা।
এই মুহূর্তে সানা সবাইকে একে একে বিদায় জানিয়ে অবশেষে সানা এগিয়ে গেল এসপির দিকে। কিন্তু এসপি তার দিকে তাকালই না। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সানা ঠোঁট বাঁকিয়ে তার বাহুতে ঠাস করে একটা কিল বসিয়ে বলল,

—”স্যার, আমি কিন্তু আমেরিকা থেকে আপনার কোম্পানির ডিজাইনার হিসেবেই থাকবো। তার জন্য যদি আপনি এক টাকাও কম বেতন আমাকে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে কিন্তু আমি আমেরিকা থেকে আপনার কানের নিচে এমন বাজান বাজাবো, বাংলাদেশ পর্যন্ত বাজতে থাকবে।”
এসপি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েই ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। এই মেয়েটার স্বভাব এত বছরেও বদলায়নি। সানা আবার কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বলল,
—”তুই কি রাগ করে আছিস?”
এবার এসপি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—”তুই এই ডিসিশন শুধুমাত্র সিরাতের জন্য নিয়েছিস, তাই না? আবে ইয়ার, আরভি এখনো ছোট। বড় হলে ও বুঝতে পারবে।”
—”হ্যাঁ, এজন্যই তো বড় করতে নিয়ে যাচ্ছি”
দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই একসাথে হেসে ফেলল। সানা আবারও তার বাহুতে একটা কিল বসিয়ে বলল,

—”কি বেয়াই সাব?”
কথাটা শোনামাত্রই এসপি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট মানুষের মতো লাফিয়ে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে সানার হাত সরিয়ে দিয়ে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
—”ওই কটকটির বাচ্চা, আমি তোরে বেয়াইন মানছি নাকি? আমি আমার মেয়েকে কোন মতেই দিব না। আর না ওই জাউড়াকে আমি বিয়াই মানবো’
—”তুই মানবি না মানে? তোর চৌদ্দগুষ্টিও মানবে। হয় মেয়ে দিবি, না হয় বউ তালাক দিবি। বল, কোনটা করবি?”
এক মুহূর্তের মধ্যে এসপির মুখের সমস্ত রাগ উধাও হয়ে গেল। চোখের পলকে সে নিজের অবস্থান বদলে ফেলল। ঠোঁটের কোণে মেকি হাসি টেনে বলল,
—”বলছি শুভ কাজে দেরি কিসের? একটা ভালো দিন দেখে দুজনকে বিয়ে করিয়ে দিলেই তো হলো। দিন দিন তো এদের বয়স বেড়েই চলছে। কবে ঘর-সংসার করবে ওরা? তো এখন বেয়াইন হবি, নাকি আমেরিকা থেকে ফিরে এসে বেয়াইন হবি?”
কথা শেষ হতেই সানা এবার সত্যি সত্যিই তার বাহুতে জোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল।

—”শালা পল্টিবাজ”
এসপি ব্যথায় মুখ কুঁচকে জায়গাটা ডলতে ডলতে বলল,
—”শালা না বল, বেয়াই পল্টিবাজ। না মানে, জিন্দাবাদ”
ব্যাস, পরের মুহূর্তেই দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কেননা এসপি সামনে তাকাতেই তার হাসিটা গলায় আটকে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আরজে। আর তার দৃষ্টিটা এমন ছিল, যেন এই মুহূর্তে সে এসপিকে জীবন্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। এসপি তৎক্ষণাৎ নিজের মুখের ভাব গুছিয়ে নিল। এদিকে সানা মাথা নেড়ে হেসে সানিতার দিকে এগিয়ে গেল। আরজেও কিছু বলল না। তার কোলে তখন ছোট্ট সানভী। মেয়েটার উপস্থিতিই বোধহয় তার রাগের লাগাম টেনে ধরেছে। এসপি এগিয়ে এসে ইচ্ছে করেই আরজেকে শুনিয়ে বলল,
—”শোন জাউড়া, তোকে বেয়াইন বানানোর আমার কোন ইচ্ছা নেই। ওটা তো শুধু পেস্ট্রি বলেছে বলে…”
বাকিটা আর শেষ করতে পারল না সে তার আগেই আরজে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
—”তুই আমার বউকে পেস্ট্রি বলবি না”
এসপি থেমে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—”ওকে, আচ্ছা। ঐ তো ব্যস কিডোর মাম্মাম বলে…”
—”তুই আমার মেয়েকেও কিডো বলবি না”
এবার সত্যিই এসপির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
সে বিরক্তিতে চোখ উল্টে বলল,

—”শালা জাউড়া কোথাকার, যাহ, এবার মেয়েই দিব না। কি করবি কর”
আরজে তার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঠান্ডা স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”তোর কাছে মেয়ে চাইছে কে? সময় হলে আমার ছেলেই তোর মেয়েকে তুলে নিয়ে আসবে। তোকে দিতে হবে না”
কথাটা বলে সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আর এসপি?
সে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মিনমিনিয়ে বলল,
—”শালা আমাকে ওপেন হুমকি দিয়ে চলে গেল। আমিও ওকে দেখিয়ে দিব, আমি খুশদিল ফারুকীর জামাতা। শ্বশুরজির একশো ইঞ্চি উপর দিয়ে যাব আমি”
দুর্ভাগ্যবশত, সে যতটা আস্তে বলেছে বলে ভেবেছিল, ততটা আস্তে বলেনি। সামনে হাঁটতে থাকা আরজেও স্পষ্ট শুনে ফেলল। সেখান থেকেই না ঘুরে বলল,
—”আর হ্যাঁ, মেয়ে না আসতে চাইলে শ্বশুরকে গুলি মারা হবে”
এসপি এবার সম্পূর্ণ স্তব্ধ। সে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই সানিতা তার হাত চেপে ধরল। বিরক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করল এসপি,
—”কি হয়েছে?”
—”আরে আজকেই শেষ দিন”
—”কিসের?”
—”ওই আরজের অটোগ্রাফ নেওয়ার। ও আমেরিকা চলে গেলে আর কবে না কবে আসবে, প্লিজ, আজকে একটা অটোগ্রাফ নিই”
কথাটা শোনামাত্রই এসপি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এমন একটা দৃষ্টি দিল, যেন পৃথিবীর সমস্ত বিশ্বাসঘাতকতা সে এইমাত্র প্রত্যক্ষ করেছে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—”সানির বাচ্চা, আজ তুই শুধু বাড়ি চল। তোর সারা শরীরে আমি অটোগ্রাফ দিব”
সানিতা বিরক্ত মুখে বলল,
—”তোমার অটোগ্রাফ লাগবে না আমার”
—”তোকে আমার অটোগ্রাফই নিতে হবে, চল”
টার্মিনালের এক কোণে, বিশাল কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরভি। চারপাশের কোলাহল, বিদায়ের আবেগ, মানুষের কথাবার্তা কোনো কিছুতেই যেন তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে গেম খেলছে সে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিয়ান।
আরভি গেমে মগ্ন ঠিক তখনই একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। একটা কণ্ঠস্বর, যার জন্য তাকে দেশ ছাড়তে হচ্ছে। একটা কণ্ঠস্বর, যেটা শুনলেই তার মেজাজ অকারণে খারাপ হয়ে যায়,
—”রিশী ভাইয়া…”
আরভির আঙুল থমকে গেল। ধীরে ধীরে সে মুখ তুলে তাকায় নজরে আসে সিরাত। সে একগাল হেসে বলল,
—”রিশী ভাইয়া, তুমি বলেছিলে আমাকে এতগুলো চকলেট দিবে, দাও”
এক মুহূর্তের জন্য আরভির মনে সেই দিনের কথা ভেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে সিরাতের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—”রাতের বাচ্চা, চোখ নামিয়ে কথা বল”
সিরাত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। আরভি আরও বিরক্ত হয়ে আওড়ায়,
—”তোর এই কালো চোখে আমার দিকে একদম তাকাবি না। রিশী ভাইয়া, রিশী ভাইয়া করে মাথা খাস কেন?
তোর নিজের কোনো কাজ নেই?”
সিরাতের মুখের হাসিটা একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে লাগল। মায়াভরা আদলে নেমে এলো অন্ধকার। তবুও আস্তে করে বলল,
—”কিন্তু তুমি তো বলেছিলে…”
আরভি তাকে শেষ পর্যন্ত বলতেও দিল না,
—”চুপ, একটা শব্দও না, যা সামনে থেকে। নইলে এখনই একটা থাপ্পড় মারব”
ধমকটা এতটাই কঠিন ছিল যে সিরাত কেঁপে উঠল। তার চোখে মুহূর্তেই পানি জমে গেল। আরভি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, ঘুরে অন্যদিকে চলে গেল। সিরাত ঠোঁট উল্টে তৎক্ষনাৎ কেঁদে ফেলল। কিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এ দৃশ্য তার নতুন নয়। সে ধীরে ধীরে আরভির কাছে এসে বলল,
—”দোস্ত, তুই কি করেছিস দেখ। মেয়েটা কাঁদছে”
আরভি ফোনের দিকে তাকিয়েই বলল,
—”আই ডোন্ট ফাকিং কেয়ার”
কিয়ান মাথা নাড়ল, সে জানত এই উত্তরই আসবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আরভির কথা আর তার কাজ কখনোই এক হয় না। প্রায় দুই মিনিট যেতেই হঠাৎ আরভি গেম বন্ধ করে বিরক্ত গলায় বলল,
—”ওকে গিয়ে বল, ওর কান্না বন্ধ করতে। না হলে আমার একটা থাপ্পড়ও মাটিতে পড়বে না”
কিয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসল,

—”ওকে বস”
কিয়ান চলে গেল সিরাতের দিকে, কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। আরভি সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
—”ওই ডিসগাস্টিং মেয়েটার কান্না থেমেছে?”
—”হ্যাঁ থেমেছে, তুই একটু শান্ত হ”
আরভি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—”কিভাবে থামিয়েছিস?”
—”আরে একটা চকলেট দিয়েছি। আর বলেছি পরে রিশী ভাইয়া আরও অনেকগুলো চকলেট নিয়ে আস….”
বাকিটা শেষ করার আগেই আরভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। দন্ত চেপে বাক্য ছুঁড়ে,
—”তোকে চকলেট দিতে বলেছি?”
কিয়ান এবার সত্যি হেসে ফেলল,
—”আরে ইয়ার ছাড় না, ওর কান্না থেমেছে। ব্যাস, এখন তুই যাওয়ার আগে ওই মেয়েটাকে থাপ্পড় মারবি নাকি?”
আরভি নির্বিকার গলায় বলল,
—”আমার যখন খুশি হয় তখনই মারব”
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল সানা।
—”ভীর, লেটস গো”

আরভি আর কোনো কথা না বলে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে এগিয়ে গেল। এক এক করে সবাই শেষবারের মতো পিছনে তাকিয়ে সবার দিকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল। তারপর কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল প্রাইভেট জেটের দিকে। সানিতা ইতিমধ্যেই কাঁদতে শুরু করেছে। আর এসপি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই, হঠাৎ কেউ কিছু বোঝার আগেই। কাঁচের দরজাটা আবার খুলে আরভি বেড়িয়ে এলো। সে দ্রুত হেঁটে সোজা সিরাতের সামনে এসে দাঁড়াল। তার ছোট্ট হাতে তখনও কিয়ানের দেওয়া চকলেটটা ধরা। পরমুহূর্তেই আরভি এক টানে চকলেটটা নিয়ে নিয়ে
দাঁতে দাঁত চেপে তার দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”আই উইল বি ব্যাক”
তারপর সে চকলেটটা নিয়ে পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ঘুরে চলে গেল। সিরাতের চোখে আবার পানি চলে এলো। সে কাঁপা গলায় বলল,
—”পাপা…”

এসপি এক মুহূর্ত দেরি করল না। দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল। সিরাত কান্নাভেজা চোখে কাঁচের দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। যেদিক দিয়ে আরভি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এসপি তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল,
—”কাঁদে না, অ্যাঞ্জেল, ও আর আসবে না’
কিন্তু সিরাতের চোখ তখনও দরজার দিকেই। যেন সে অপেক্ষা করছে, আরভি আবার ফিরে এসে বলবে,
“রাত তোর এই ডিজগাস্টিং, কান্না থামাবি”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৯

কিন্তু সে আর ফিরে এল না। কাঁচের ওপারে দেখা গেল রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সাদা প্রাইভেট জেট কিছুক্ষণ পর দূর আকাশ উড়ান দিল সুদূর আমেরিকার উদ্দেশ্যে। বিমানটা যত ছোট হতে লাগল, ততই যেন কারো বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যেতে থাকল। সিরাত এখনো তাকিয়ে আছে, হয়তো সে বুঝতে পারছে না, তার রিশী ভাইয়া অনেক দূর চলে গেছে। হয়তো কোন এক ঝড়ের রাতে সেই জেড আবার ফিরে আসবে নতুন কোন গল্প নিয়ে।

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here