হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৭
সাবা খান
আজকের রাতটা মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত শব্দকে গিলে খেয়ে নিজেকে কালো চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলেছে। আকাশে চাঁদের উপস্থিতি স্পষ্ট, কিন্তু সেই চাঁদের আলোও যেন আজ মৃত নিষ্প্রভ, বিবর্ণ, শীতল। চারদিকে এমন এক ভৌতিক নীরবতা বিরাজমান যেন বহু বছর আগে এই ভূমি থেকে জীবন বিদায় নিয়েছে, আর তার জায়গায় রেখে গেছে কেবল স্মৃতির ধ্বংসস্তূপ।
সেই অন্ধকারের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে জাওয়ান ম্যানশন। এক সময়ের এই ম্যানশন ছিল ঐশ্বর্যের প্রতীক, ক্ষমতার দুর্গ, অহংকারের প্রাসাদ আর রক্তে ভরা বেজমেন্ট যেখানে বন্দীরা তরফাতো একটুকরো মুক্তির আশায় হাহাকার করতো সারাদিন। অথচ আজ সেই ম্যানশন মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধ। প্রাসাদের বিশাল জানালাগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে, যেন শত শত শূন্য চোখ রাতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দেয়ালের গায়ে লতাগুল্ম এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে, যেন প্রকৃতি নিজেই ধীরে ধীরে এই প্রাসাদকে নিজের কবরে পরিণত করছে। ভাঙা কার্নিশে বসে থাকা কয়েকটা বাদুড়ের ছায়া দূর থেকে কোনো অশুভ উপস্থিতির বিভ্রম সৃষ্টি করছে বারবার। আর সেই মৃত্যুপুরীর মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল সোফিয়া।
কালো ওভারকোটে মোড়া তার অবয়বকে এই আঁধারে কোন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না বরং মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো অশরীরী আত্মা নিজের অতীত খুঁজতে ফিরে এসেছে। সে টলোমলো পদক্ষেপে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে তার শ্বাসও ভারী হয়ে উঠছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, ড্রাগসের প্রভাব মস্তিষ্ক থেকে সরে যেতে শুরু করেছে। আর একবার ড্রাগসের প্রভাব কেটে গেলে তখন সে তার নিয়ন্ত্রণে আর থাকবে না।
সোফিয়ার চোখদুটি উন্মাদের মতো চারদিকে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। সে অতিদ্রুত ম্যানশনের সামনের অংশ অতিক্রম করে পিছনের নির্জন প্রান্তে চলে এল। এখানে নীরবতাটা আরও গভীর, আরও ভয়ংকর শুধু মাঝে মাঝে কয়েকটা ক্ষুধার্ত কাকের আর্তনাদ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ তার দৃষ্টি দূরে গিয়ে আটকে গেল। যেখানে মাটির উপর উঁচু করে বাঁধানো কিছু একটা, হয়তো দেড় হাতের মতো উঁচু হবে। তবে অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। সোফিয়ার বুকটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠে। পরের মুহূর্তেই সে প্রায় দৌড়ে ছুটে গেল সেদিকে। কাছে যেতেই তার নিঃশ্বাস থমকে গেল কেননা তার সন্দেহই ঠিক, এটা একটা কবর। তার হাত কাঁপতে শুরু করে। কবরের মাথার কাছে লাগানো ফলকটি ধুলোয় ঢাকা। সোফিয়া এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে ঝুঁকে কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে ধুলো সরাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে নামটা স্পষ্ট হয়ে উঠল,
“ইকবাল জাওয়ান”
মুহূর্তে যেন পুরো পৃথিবী থমকে গেল সোফিয়ার জন্য, শুধু তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। জিহাদ বেজমেন্টে থেকে ইকবালের বডি বের করে দিলরুবা খানমের কাছে দিয়েছিল। পরবর্তীতে আরজের ব্ল্যাকমেইলের কারণে তিনি সেটা ফিরিয়ে দেন। আর আরজে তার বাবার দেহটাকে দাফন করে এই ম্যানশনে। সোফিয়া এতদিন জানতো না এটা। সে সবেমাত্র কয়েক দিন আগে জেনেছে কিন্তু আরজের কড়া সিকিউরিটির জন্য বাইরে পা রাখা দূর্সাধ্য ছিল।
সোফিয়া সেই পলকের উপর দৃষ্টিপাত করে কিয়ৎকাল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, একদম ঠিক পাথরের মূর্তির মতো। যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না, যেন এতদিন ধরে যে মানুষটাকে নিজের স্মৃতিতে জীবিত রেখেছিল, তাকে আজ এই কয়েকটি অক্ষরের মধ্যে বন্দী অবস্থায় দেখতে হচ্ছে। আজ তার কণ্ঠস্বরও তার সাথে বেইমানি করে কেননা এত চেষ্টার পরও একটা শব্দ বের করতে পারল না। চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রুগুলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। হঠাৎ মস্তিষ্কে বোধগম্য হতেই সে তাড়াহুড়ো করে ফলকের উপর জমে থাকা ধুলো ঘষে ঘষ পরিষ্কার করতে লাগল হাত দিয়ে অস্থিরভাবে ঠিক উন্মাদের মতো। আর নিচু স্বরে বিড়বিড় করে,
—”আ’ম সো সরি, ইকবাল, আমি দেরি করে ফেলেছি, তাই না? দেখো, তোমাকে আমি এভাবে রেখে যেতে চাইনি…তুমি নিশ্চয়ই আমার উপর ভীষণ রাগ করেছ… তাই না? তোমার ডাস্টে অ্যালার্জি, আমি জানি, আমি জানি তো। দেখো, আমি সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি…আর এক ফোঁটা ধুলোও তোমার গায়ে পড়তে দেব না। কিছুই পড়তে দেব না”
তার কণ্ঠ ক্রমশ কেঁপে উঠছে বারবার। কান্নায় ভেঙে যাচ্ছে কণ্ঠস্বর, শব্দগুলো যেন বেরুতে চাইছে না তবুও ফিসফিস করে,
—”তোমার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। এই অন্ধকারে একা একা থাকতে ভালো লাগে? দম বন্ধ হয়ে আসে না তোমার? আর চিন্তা করতে হবে না তোমাকে। আমি এসেছি তো, আমি তোমাকে একা থাকতে দেব না, আমি এসেছি”
এই বলে সে কবরটার দিকে এগিয়ে কবরের উপর থেকে মাটি সরাতে শুরু করে, নিজের নখ দিয়ে আচরাতে শুরু করে উন্মাদের মতো। কিয়ৎকালের মধ্যেই নখ ভেঙে সেখান থেকে রক্ত নির্গত হতেে শুরু করে। অথচ সোফিয়ার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এই মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কোন উন্মাদ পাগলের মত। কিছুক্ষণ পর যখন খেয়াল হয় তখন নজরে আসে সেখানে কোন মাটি নেই, পুরো কবর টাকে পাকা করে ফেলেছে। এবার সোফিয়া পাকার উপরে হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকে অনবরত। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত হানতে হানতে তার হাত থেতলে যায়। নরম তুলতুলে হাতগুলো এখন আর হাত নেই সেগুলো পুরো ডেকে গেছে রঞ্জিত রক্তের আড়ালে।
একসময় ক্লান্ত হয়ে কবরের উপর হাত রেখে বসে পড়ল। বারবার নিজের রক্তে ভরা হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। যেন পাথরের নিচে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটাকে আদর করছে, যেন একটু পরেই ইকবাল উঠে বসবে আর হেসে বলবে,
—”সোফিয়া”
কিন্তু কিছুই হলো না, কেউই ডাকল না তাকে। চারদিকে শুধু নীরবতা, ভয়ংকর, অসহনীয় নীরবতা। এবার সে দুই হাত প্রসারিত করে পুরো কবরটাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন পাথর আর মাটির নিচে শুয়ে থাকা মানুষটিকে সে নিজের বুকে টেনে নিতে চায়। চকচকে বাদামী চোখজোড়া থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। সেই অশ্রুগুলো কবরের শীতল পাথরের উপর পড়ে ছোট ছোট দাগ তৈরি করছে। সে কবরের উপর মুখ রেখে ফিসফিস করে আওড়ায়,
—”ইকবাল…দেখো না আমি এসেছি। আমি সত্যিই এসেছি…আর রাগ করে থেকো না। আমি তো এখনো তোমার পাশেই আছি। শুধু তুমি কথা বলছো না। একবার কথা বলো না, ইকবাল”
ধীরে তার চোখ লাল হতে শুরু করে, মানে ড্রাগসের প্রভাব কেটে গেছে। এখন সে নিজের মধ্যে আর নেই। সোফিয়া আরও শক্ত করে কবরটাকে জড়িয়ে ধরে আওড়ায়,
—”তুমি জানো ইকবাল?
আজও আমি ভিড়ের মধ্যে তোমাকে খুঁজি, আজও মনে হয় কোনো দরজা খুলবে আর তুমি হেঁটে চলে আসবে, আজও মনে হয় তুমি শুধু আমার সঙ্গে অভিমান করে লুকিয়ে আছো। কিন্তু তুমি তো আর আসো না, একবারও না”
রাতের বাতাসটুকু পর্যন্ত তার হাহাকারে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দূরে কোনো এক নিশাচর পাখির ডাক ভেসে এল। কিন্তু ইকবালের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর এলো না। সে কবরের উপর কপাল ঠেকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। তার কান্নার মধ্যে ভালোবাসার চেয়ে অনুশোচনা বেশি, আকাঙ্ক্ষার চেয়ে আফসোস বেশি, আর সবচেয়ে বেশি শূন্যতা, ভয়ংকর, অসহনীয় শূন্যতা। ধীরে ধীরে তার নেত্রপল্লব জোড়া বন্ধ হয়ে আসে। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিষাক্ত স্মৃতিরা হিংস্র জন্তুর মতো তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। যে দিনটাকে সে বছরের পর বছর ভুলে থাকতে চেয়েছিল, সেই দিনটা আজ তার সামনে জীবন্ত হয়ে দাঁড়াল।
এটা সেইদিন যেদিন সে নিজ হাতে ইকবালের উপর গুলি চালিয়েছিল। কথাটা মনে হতেই সোফিয়া এক ঝটকায় উঠে বসে পড়ে। তারপর তাড়াহুড়ো করে সে কোটের পকেট থেকে গানটা বের করে ইকবালের কবরের দিকে তাকিয়ে বলে,
—”এই হাতটা তোমাকে মেরেছিল তাই না? দেখো ইকবাল, আমি এই হাতটাকে মেরে দিচ্ছি। তুমি প্লিজ ফিরে আসো আমার কাছে..প্লিজ…”
এই বলে সে লহমায় “ঠাস” করে নিজের হাতে নিজেই গুলি চালিয়ে দে। গুলির শব্দ অন্ধকার বুক চিরে নীরবতা ভেঙে দেয়। সোফিয়ার হাতের মধ্যে বড়, পোড়ার মতো একটা গর্ত তৈরি হয়। ফিনকি দিয়ে গড়গড় করে রঞ্জিত রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সোফিয়ার কোন ব্যথা বা কোন অনুশোচনা মুখের মধ্যে একরত্তিও ফুটে ওঠে না। সে চার দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো ইকবালকে খুঁজে থাকে। তাকে না পেয়ে আবারো চিৎকার করে ওঠে,
—”ইকবাল, তুমি বললে আমি এই হাত কেটে ফেলে দেবো, বলো আমি কি কাটবো। তাহলে কি তুমি ফিরে আসবে”
সে এই মুহূর্তে নিজের মধ্যে নেই। এবার সম্পূর্ণ পাগলের মত ব্যবহার করা শুরু করে। বন্দুক দিয়ে নিজেই নিজেকে আঘাত হানতে শুরু করে, নিজের মাথা কবরে ঠুঁকতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সে নিজের মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ইকবাল কে হুমকি দে,
—”ইকবাল, আই সোয়ার, যদি এই মুহূর্তে তুমি ফিরে না আসো। তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে দিবে। বলো, তুমি আসবে…..””
সোফিয়া আবারও চারদিকে তাকায়, নাহ কেউ এলো না। না ইকবাল আর না কেউ। তার ঠোঁটের কোণের তাচ্ছিল্যের হাসিটা আরও বড় হয়। সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে,
—”ইকবাল, আমি ক্লান্ত, খুব ক্লান্ত। একবার তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাইলে কি বেশি চাওয়া হয়ে যাবে”
এই বলে সে বন্দুকটা তার মাথায় শক্ত করে চেপে ট্রিগারে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে। সোফিয়া ট্রিগার চাপাবে ঠিক এমন মুহূর্তে পিছন থেকে তার কানে ভেসে আসে একটা চেনা পরিচিত কণ্ঠস্বর, যেটি তিনি হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্যেও চিনে নিতে পারতেন,
—”মম, ডোন্ট ডু দ্যাট প্লিজ…”
সোফিয়ার সমগ্র শরীর আতকে ওঠে। এই কণ্ঠস্বর তিনি এখানে আশা করেনি। সে বন্দুক মাথায় নিয়েই চোখ খুলে সামনে তাকাতেই নজরে আসে অন্ধকারের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, আবার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। আরজের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে কিছু হারানোর আশঙ্কায়। সোফিয়া দেখল, ছেলেটার চোখে কী আতঙ্ক?
হ্যাঁ, তার চোখে এমন আতঙ্ক, এমন অসহায়তা, যা কোনোদিন কেউ দেখেনি। যে ছেলেটা সারা পৃথিবীর সামনে মাথা নত করেনি, সেই ছেলেটা আজ ভেঙে পড়া শিশুর মতো তাকিয়ে আছে তার মায়ের দিকে। সোফিয়া বুঝল না, আরজের চোখে আতঙ্ক থাকবে কেন? সেতো কখনো আরজে কে ভালো কিছু দিতে পারেনি, না মায়া, না মমতা, না ভালোবাসা।
আর আরজের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সানা। লাল লেহেঙ্গাটা দুই হাতে উঁচিয়ে ধরে রেখেছে, রমণীর চোখদুটিও ভয়ে বিস্ফারিত। মুহূর্তটা যেন সময়ের বাইরে চলে গেল। সোফিয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন নিজের ছেলের দিকে। কত বছর, কত শত স্মৃতি হানা দিল তার মানস্পটে। একটা শিশু প্রথমবার তার আঙুল ধরেছিল, প্রথমবার “মম” বলে ডেকেছিল, প্রথম হাঁটতে শিখেছিল, প্রথম পড়ে গিয়ে কেঁদেছিল। সোফিয়া হঠাৎ নিজের বিভ্রমের লাগাম টেনে ধরে বাস্তবে ফিরে আসে। এসব ভাবলে এখন দুর্বলতা বেড়ে যাবে আর সবচেয়ে বড় কথা, সে ইকবালের কাছে যেতে পারবে না। সে নিচু স্বরে শেষবারের মতো বিড়বিড়ায়,
—”রনো, মেরা ব্যাটা। মম, আজ ভীষণ ক্লান্ত। তুমি একদম ডিস্টার্ব করবে না। মম একটু তোমার ড্যাডের বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাই”
তার চোখের কার্নিশ বেয়ে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কিন্তু ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটি শান্ত হাসি ফুটে উঠে, একটি অদ্ভুত শান্তির হাসি।যেন বহু বছরের যুদ্ধ শেষে একজন ক্লান্ত সৈনিক বিশ্রাম খুঁজে পেয়েছে। আরজে ছুটে আসছে আর বারবার ডাকছে,
—”মম,,, মম, প্লিজ, স্টপ…”
সোফিয়া শুনল না তার কথা। সে ট্রিগারে চাপ দেয় আর সাথে সাথে বন্দুকের নল থেকে বেড়িয়ে যায় আগুনের স্ফুলিঙ্গ। ব্যাস একটা গুলি, আর চারপাশ টা সাথে সাথে যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায় আবারও। চারপাশের সকল শব্দ এক মুহূর্তের জন্য এক লহমার জন্য থমকে যায়। গুলিটা নিষ্ঠুর বাস্তবতার মতো সোফিয়ার মাথা ফাটিয়ে মস্তিষ্ক ভেদ করে ওপার দিয়ে বের হয়ে যায়। সে ইকবালের কবরটার উপর ঘুরিয়ে পড়তে পড়তে জীবনের শেষ সময়টা প্রাণ ভরে দেখে নিল নিজের ছেলেটাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার শরীরের সমস্ত শক্তি নিভে যেতে লাগল, মোমবাতির শেষ শিখার মতো। আরজে তখন উন্মাদের মতো ছুটে আসে সামনে। কিন্তু ভাগ্য যেন আর কোনো সুযোগ দিতে রাজি ছিল না। সোফিয়া মাটি স্পর্শ করার আগেই আরজে এক ঝটকায় এসে তাকে ধরে নিজের বাহুতে আগলে নিল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে।
রাত তখন যেন নিজের সমস্ত অন্ধকার একত্র করে জাওয়ান ম্যানশনের পিছনের সেই নির্জন প্রান্তরে ঢেলে দিয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ, এমন নিস্তব্ধতা যেন পৃথিবী হঠাৎ শব্দ করা ভুলে গেছে। সেই গাঢ় অন্ধকারের মাঝখানে আরজের কোলে নিথর হয়ে শুয়ে আছে সোফিয়া। যে নারীকে সে সবসময় পাহাড়ের মতো অটল দেখেছে, যাকে কখনো ভেঙে পড়তে দেখেনি, যাকে দেখে সে শক্ত হতে শিখেছে, আজ সেই মানুষটাই নিশ্চুপ, ভীষণ নিশ্চুপ। যেন বহু যুদ্ধ শেষে ক্লান্ত কোনো রাণী অবশেষে বিশ্রামে গিয়েছেন। কিন্তু সেই বিশ্রাম মেনে নিতে পারছল না তার ছেলে, একদমই না। আরজের দু’হাত কাঁপছে সাথে তার বুক ওঠানামা করছে অস্বাভাবিক দ্রুততায়। চোখ দুটো ইতিমধ্যে রক্তিম হয়ে উঠেছে। সে একবার নিজের মায়ের মুখের দিকে তাকায়, আবারও অবিশ্বাস নিয়ে তাকায়। যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। যেন মনে হচ্ছে, এইমাত্র চোখ খুলে সোফিয়া হেসে বলবেন,
—”রনো…’
কিন্তু কিছুই হলো না, নিষ্ঠুর সোফিয়া চোখ খুলল না আর না ডাকল। কাঁপতে কাঁপতে আরজে নিজের খসখসে পুরুষালী হাতটা বাড়িয়ে মায়ের গালে আলতো চাপড় দিয়ে ডাকল,
—”মম…মম, প্লিজ…ওপেন ইয়োর আইস। দেখো তোমার রনো এসে গেছে, এখন আর কোন ভয় নেই”
আজ তার নিজের কণ্ঠই নিজের কাছে অদ্ভুত ঠেকল। মনে হচ্ছে কণ্ঠনালি ছিঁড়ে শব্দ গুলো বের হচ্ছে। সোফিয়ার রক্তে তার গোল্ডেন শেরওয়ানি রক্তাক্ত হয়ে গেছে। তার সেদিকে কোন ধ্যান নেই। সে আরেকবার চাপড় দিয়ে শুষ্ক স্বরে ডেকে ওঠে,
—”তুমি আবার ছোটবেলার মতো খেলছো তাই না?
তুমি তো সবসময় এমন করতে, যখন আমি ছোট ছিলাম… তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে আর আমি ভয় পেয়ে কাঁদতাম। তারপর তুমি হঠাৎ উঠে আমাকে বলতে,
‘রনো পুরুষদের কাঁদতে নেই’
ভাবনাটা ভাবতেই একটা অসহায় হাসি খেলে যায় তার অধরে, সেই হাসির ভেতরে ছিল অসীম যন্ত্রণা। আর সেই যন্ত্রণাকে গলাধঃকরণ করে ফের তাকে মৃদু ঝাঁকিয়ে ডেকে ওঠে,
—”মম…এই খেলাটা আমার কোনোদিন পছন্দ ছিল না। প্লিজ, এবার উঠে বসো। আর বলো, এটা একটা গেম। আর একবার শুধু বলো “রনো”
বিপরীতে সোফিয়া একটুও নড়লল না। আরজের কণ্ঠ হঠাৎ ভেঙে গেল। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত আর্তনাদ একসঙ্গে বেরিয়ে এলো। সে চিৎকার করে ওঠে,
—”মম, প্লিজ আমাকে এভাবে শাস্তি দিও না।
আমি তো তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। হেই মম, একবার চোখ মেলে তাকাও আমার দিকল। তুমি আমার অপেক্ষা কেন করলে না? একবারও অপেক্ষা করলে না কেন?”
তার হাত অবিশ্বাস্য ভাবে ধরধর করে কাঁপছে। সে মায়ের নিথর শরীরটাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরল। যেন এভাবেই তাকে হারিয়ে যাওয়া থেকে আটকে রাখতে পারবে। যেন এভাবেই সময়কে থামিয়ে দিতে পারবে। আরো একটা হাহাকার বেড়িয়ে আসে তার ক্ষত বিক্ষত বুক ছিঁড়ে,
—”মম…তুমি বলেছিলে আমাকে কখনো একা ছেড়ে যাবে না। তাহলে আজ এই নিষ্ঠুর বিদায়ের তোমাকে কে দিল, মম?”
কথাগুলো বলতে বলতেই তার গলা আটকে যায়। তারপর হঠাৎ যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে আসে। আরজে মাথা নাড়তে নাড়তে বলতে থাকে,
—”মমমমম…একবার শুধু চোখ খোলো, একবার বকো আমাকে, একবার বলো আমি ভুল করেছি, একবার বলো তুমি রাগ করেছো। কিন্তু এভাবে চুপ থেকো না, মম….”
তার প্রতিটি শব্দ যেন বুকের গভীর থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে।
এদিকে তার থেকে কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সানা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল সে। রমণীর চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরছে। সামনে বসে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে তার বুকটাও ভেঙে যাচ্ছে। সে কখনো ভাবেনি এমন একটি দৃশ্য দেখতে হবে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আরজের পাশে বসে পড়ে। কাঁপতে থাকা হাতে তার কাঁধে হাত রাখে। কিন্তু কোনো সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পায় না। কারণ পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই এমন শোকের উপযুক্ত শব্দ নেই। রাত আরও গভীর হতে থাকে সাথে বাতাস আরও শীতল হয়ে ওঠে। পুরোনো জাওয়ান ম্যানশন নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু সেই অন্ধকার রাতের বুক চিরে বারবার ভেসে আসছিল এক পুরুষের ভাঙা কণ্ঠ,
—”হেই মম, প্লিজ গেট আপ। আই হেইট দিস ফা*কিং গেম। একবার চোখ খোলো, শুধু একবার…”
আর সেই আর্তনাদ যেন রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েও দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
পরদিনের সকালটা যেন সকাল ছিল না। সূর্য নিজের নিয়ম করে ঠিকই উঁকি দিয়েছিল কেননা কোনকিছুই তার নিয়ম বদলাতে পারবে না, কিন্তু তার আলোতে কোনো উষ্ণতা জাওয়ান ম্যানশনের অন্দর মহলে পৌঁছাতে পারেনি। গতকাল পর্যন্ত যে ব্ল্যাক ম্যানশন হাসি, উল্লাস, আলোকসজ্জা আর শুভকামনার শব্দে মুখরিত ছিল, আজ সেখানে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। যেন আনন্দের সমস্ত রঙ কেউ এক রাতেই মুছে দিয়েছে। যেখানে গতকাল সানার হাসির শব্দ ভেসে বেড়িয়েছিল, যেখানে চারদিকে বিয়ের সুর বাজছিল, আজ সেখানে কেবল কান্নার রুদ্ধ শব্দ। প্রতিটি দেয়াল যেন শোক বহন করছে, প্রতিটি করিডোর যেন নীরবে বিলাপ করছে। মনে হচ্ছিল, পুরো ম্যানশনটাই আজ কালো কাপড়ে মোড়ানো এক নিঃশব্দ আর্তনাদ।
ইতিমধ্যে প্রেস মিডিয়াকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আজ আর রিসিপশন হবে না। তারা হতাশ হলেও সত্য ঘটনা অনুমান করতে পারেনি। এই মুহূর্তে পরিবারের সবাই এসে জড়ো হয়েছে জাওয়ান ম্যানশনের বিশাল লিভিং রুমে। আজ এখানে কোনো সাংবাদিক নেই, কোনো ক্যামেরা নেই, কোনো ক্ষমতাশালী অতিথি নেই, কোনো প্রভাবশালী মানুষের ভিড় নেই। শুধু পরিবার, শুধু প্রিয়জন আর তাদের বুকভাঙা শোক। ঘরের মাঝখানে সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় শুয়ে আছেন সোফিয়া। নির্মল সাদা কাপড়ে ঢাকা সেই দেহটা দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল।
এ কি সেই নারী? যার এক নির্দেশে শত শত মানুষ মাথা নত করত? যে নারী নিজের হাতে গড়ে তুলেছিল ক্ষমতার এক বিশাল সাম্রাজ্য? যার নাম শুনে শত্রুরাও কেঁপে উঠত?
আজ সেই নারী নিঃশব্দ, নিঃস্পন্দ। সমস্ত অহংকার, সমস্ত ক্ষমতা, সমস্ত জয় পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি আজ কেবল এক নিথর দেহ। সাদা কাফনের নিচে শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। যেন পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ শেষ করে অবশেষে বিশ্রামে গেছেন। কিন্তু সেই বিশ্রাম মেনে নিতে পারছে না কেউ, বিশেষ করে সানা। রমণী যেন কাঁদতে কাঁদতে নিজের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। শেষ কবে এতটা কেঁদে ছিল তার মনে নেই, হয়তো আরজে কে ছেড়ে যাওয়ার সময় হবে। তার চোখদুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে। বারবার সে মুখ চেপে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। তার থেকে একটু দূরে বসে আছে সানিতা। সানিতার অবস্থাও আরও করুণ। মেয়েটা বড্ড আবেগী। সে কখনো চুপচাপ বসে কাঁদছে, কখনো হঠাৎ হাউমাউ করে ভেঙে পড়ছে অথচ সোফিয়া তার কাছের কেউও ছিল না বটে। তবে ব্ল্যাক ম্যানশনে থাকাকালীন তাদের দুজনের মধ্যে একটা বন্ডিং তৈরি হয়েছিল। এদিকে এসপি তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। বারবার কাঁধে হাত রাখছে, পানি খাওয়াচ্ছে কিন্তু শোকের সামনে সব সান্ত্বনা কত অসহায়।
এদিকে সানার কোলে বসে আছে ছোট্ট আরভি। কিয়ান আর কিয়ারাকে আনা হয়নি, হয়তো তারা ভয় পাবে তাই আয়ান রেখে এসেছে। আরভিকেও এই পর্যন্ত কেউই কিছু বলছে না তাই তার নিষ্পাপ চোখ দুটোতে বিভ্রান্তি স্পষ্ট। তার পাঁচ বছরের ছোট মস্তিষ্ক টা খাটিয়ে দেখল, নাহ, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। বারবার সানার জামা টেনে প্রশ্ন করছে,
—”মম…গ্র্যান্ডমা এভাবে শুয়ে আছে কেন?”
—”মম বলো না, গ্র্যান্ডমা কি ঘুমাচ্ছে?
উনি কি অসুস্থ?
উনি উঠছে না কেন?”
প্রতিটি প্রশ্ন সানার হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধছিল। কিন্তু তার কাছে কোনো উত্তর নেই, বলাট কোনো ভাষা নেই। শুধু ছেলেটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে নীরবে কাঁদছে সে। আরভি এবার সানার কোল ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলে গেল সোফিয়ার কাছে। এসে দাঁড়ায় কাফনের পাশে তারপর নিচু হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হয়তো অপেক্ষা করছিল, হয়তো ভাবছিল, একটু পরেই গ্র্যান্ডমা উঠে বসবে। কিন্তু কিছুই হলো না। আরভি আবার ডাকল,
—”গ্র্যান্ডমা…শুনতে পাচ্ছো? দেখো, আমি এসেছি। ড্যাড আমাকে নতুন আরো দুইটা ভিডিও গেম কিনে দিয়েছে। সেগুলো আমি তোমার সাথে শেয়ার করব, কিয়ানকে দিব না। তুমি উঠো না প্লিজ, এত ঘুমাচ্ছো কেন?”
সে আলতো করে সোফিয়ার বুকের উপর থাকা হাতটা ছুঁয়ে সাথে সাথে হাত সরিয়ে নিল,
—”গ্র্যান্ডমা…তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন?”
পরমুহূর্তে আবারও আলতো করে হাতটা ছুঁইয়ে ফের আওড়ায়,
—”ডোন্ট ওয়ারি, আমি ডাক্তার আঙ্কেলকে ডেকে দিব। রিজভী আঙ্কেল তো ডাক্তার, উনি তোমাকে ভালো করে দেবে”
ছোট্ট বাচ্চাটা তৃষ্ণার্থের মতো তাকিয়ে আছে, এই বুঝি তার গ্র্যান্ডমা উঠে বলবে, ‘ডাক্তার কেন লাগবে বোকা ছেলে, আমিতো ঠিক আছি’ কিন্তু সেটা তার কল্পনাতেই থেকে গেল।বাস্তবে কেউ ডাকল না। অশান্ত আরভি কিছু একটা ভেবে আবারও নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”ইউ নো গ্র্যান্ডমা, কাল রাতে আমি তোমাকে গুড নাইটও বলিনি। তুমি তো সবসময় বলো, গুড নাইট না বলে ঘুমাতে নেই। আমি সেটা একদমই ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি কি সেই জন্য রাগ করেছো?
আচ্চা তাহলে, আমি এখন বলছি, গুড নাইট গ্র্যান্ডমা। এখন ওঠো…প্লিজ”
ঘরের প্রতিটি মানুষ মাথা নিচু করে ফেলল। কারণ সেই শিশুটি বুঝতে পারছে না, যাকে সে এতক্ষণ ধরে ডাকছে, তিনি আর কোনোদিন সাড়া দেবেন না। তিনি এমন এক পথে চলে গেছেন, যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না। আর দূরে বসে থাকা আরজে, সে যেন সমস্ত অনুভূতির ঊর্ধ্বে চলে গেছে। তার চোখদুটো রক্তবর্ণ, চোয়াল শক্ত, মুখে কোনো শব্দ নেই আর না চোখে কোনো অশ্রু আছে। যেন কান্নার সীমা অতিক্রম করে মানুষ পাথর হয়ে গেছে। যেমনটা লোকে বলে,
“অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর”
সে শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে, না নড়ছে, না বলছে, কাঁদছে না আর না পলক ফেলছে। কিন্তু তাকে দেখলেই মনে হচ্ছে, তার ভেতরে এক সমুদ্র ভেঙে পড়েছে। আর সেই সমুদ্রের গর্জন এত গভীরে ডুবে গেছে যে, তার আর কোনো শব্দ বাইরে পৌঁছাচ্ছে না।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। আকাশের বুক জুড়ে জমে উঠেছে একরাশ ধূসর বিষণ্নতা। বাতাসে আজ উৎসবের কোনো গন্ধ নেই, নেই কোনো হাসির রেশ, নেই কোনো কোলাহল। যেন প্রকৃতিও বুঝে গেছে, আজ বিদায়ের দিন। ধীরে ধীরে সেই সময়টা ঘনিয়ে এলো, সোফিয়াকে শেষ বিদায় জানানোর সময়।
সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহটা খাটিয়ার উপর শুয়ে আছে। এতটাই নিস্তব্ধ, এতটাই নিশ্চুপ, যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ তার কাছে এসে থেমে গেছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সানা আবারও ভেঙে পড়ল। যে মেয়েটি এতক্ষণ নিজেকে কোনোভাবে সামলে রেখেছিল, খাটিয়াটা উঠতেই তার বুকের ভেতরের বাঁধনগুলো একে একে ছিঁড়ে যেতে লাগল,
—”মম…”
কান্নাভেজা কণ্ঠে শব্দটা বেরোতেই সে মুখ চেপে ধরে কেঁদে উঠে। ইবেলিনা দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
—”সানা… প্লিজ, শান্ত হো যাও”
কিন্তু কিছু রমণীর কান্না থামানো যায় না। চারজন মানুষ খাটিয়ার চার কোণা ধরল। সামনে আরজে ও রিজভী আর পিছনে আয়ান ও জ্যাক, আপন বলতে তো শুধু তারাই আছ সোফিয়ার। ধীরে ধীরে তারা হাঁটতে শুরু করে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন স্বাভাবিকের তুলনায় প্রচন্ড ভারী হয়ে উঠছে কেননা তারা শুধু একটি দেহ বহন করছে না, তারা বহন করছে একটি জীবনের সমস্ত পাপ, সমস্ত অহংকার, সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত ভালোবাসা এবং সমস্ত অপূর্ণতার সমাপ্তি। কখনো যে নারী পৃথিবীর বহু মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, যার এক নির্দেশে সাম্রাজ্য কেঁপে উঠত, যার নাম শুনে মানুষ ভয় পেত, আজ সেই নারী নিরবে এগিয়ে যাচ্ছে মাটির দিকে, তার শেষ আশ্রয়ের দিকে।
জানাজার নামাজ শেষ তাকে দাফন করা হলো ঠিক ইকবাল জাওয়ানের কবরের পাশে। দুটি ভিন্ন কবর, দুটি জীবন, দুটি অসমাপ্ত গল্প। অথচ একটি ভালোবাসা, যা কখনো পূর্ণতা পায়নি। আর একটি অনুশোচনা, যা মৃত্যুর পরও শেষ হলো না। আজ সবাই দাঁড়িয়ে দেখল, একজন পাপিষ্ঠ নারীও শেষ পর্যন্ত মাটির কাছেই ফিরে যায়। একজন ক্ষমতাধর মানুষও শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরেই আশ্রয় নেয়।
মাটি দেওয়ার পর ধীরে ধীরে সবাই একে একে ফিরে যেতে শুরু করে। কিন্তু আরজে ফিরল না। সে দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে, স্থির হয়ে। তার দৃষ্টি আটকে আছে মায়ের কবরের উপর। যেন সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, ওই মাটির নিচে তার মা শুয়ে আছে।অনেকক্ষণ পর সে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর হাত বাড়িয়ে কবরের মাটি ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,
—”জানো মম…আমি ছোটবেলায় ভাবতাম তুমি অমর। পৃথিবীর সবাই চলে যেতে পারে, কিন্তু তুমি যাবে না। তুমি তো সবসময় এত শক্ত ছিলে, তাহলে তুমি হেরে গেলে কীভাবে?”
আজ তার কথার বিপরীতে কোন শব্দ আসে না। সে জানে আসবেও না। তাই আবারও একতরফা ভাবে নিজের মনে আটকে রাখা কথাগুলো উগড়ে দিল,
—”তুমি কি কখনো আমাকে ভালোবাসনি, মম? একবারও না?
আমি কি এতটাই অপ্রয়োজনীয় ছিলাম তোমার কাছে? তুমি শুধু ড্যাডের কাছে যেতে চেয়েছিলে। ইউ নো মম, ছোট থেকে আজ পর্যন্ত আমি তোমাকে বহুবার ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছি। হ্যাঁ, জেবি কিং ও ব্যর্থ হয়েছে তার মাকে ঘৃণা করতে গিয়ে। কেন জানো?
কেননা, তুমি যত খারাপই হও না কেন, তুমি আমার মা ছিলে। আর আজ…আজ তুমি আমাকে সত্যি সত্যিই একা করে দিলে”
আজ সকাল থেকে সারাদিনে এই মাত্র একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। সেই জলটুকু যেন বছরের পর বছর জমে থাকা সমস্ত অভিমান নিয়ে ঝরে পড়ল সোফিয়ার কবরের কাঁচা মাটির উপর। ঠিক তখনই সে নিজের কাঁধে একটি পরিচিত স্পর্শ অনুভব করল। আরজে ধীরে ধীরে মাথা তুলল নজরে আসে সানা। চোখ দুটো তারও লাল, ফোলা ফোলা, কান্নায় ভেজা। সে নীরবে আরজের পাশে বসে পড়ল। এক হাত বাড়িয়ে তার হাত চেপে ধরে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। কারণ কিছু ব্যথা শব্দ দিয়ে সারানো যায় না। কিছু ক্ষতের পাশে শুধু নীরবে বসে থাকতে হয়। অনেকক্ষণ পর সানা মৃদু স্বরে আওড়ায়,
—”আপনাকে কে বলল, আপনি একা?
আপনার মা চলে গেছেন, কিন্তু তিনি আপনাকে ফেলে যাননি। তিনি আপনার ভেতরেই আছেন, আপনার স্মৃতিতে, আপনার ভালোবাসায়, আপনার প্রতিটি শ্বাসে আর….”
রমণী এটুকু এক নিঃশ্বাসে বলে থেকে সামনের মানবের রক্তাক্ত চোখে চোখ গেঁথে আওড়ায়,
—”আর আমি আছি। আমি কোথাও যাচ্ছি না আপনাকে ছেড়ে”
এইটুকু শুনতেই আরজের সমস্ত সংযম ভেঙে পড়ল। সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে সানার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল একটি শিশুর মতো, কোন পথহারা সন্তানের মতো। কোনো শব্দ নেই, কোনো আর্তনাদ নেই, শুধু নীরবে চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে সানার পোশাক ভিজিয়ে দিচ্ছে। সানাও তাকে আটকাল না শুধু তার নরম তুলতুলে হাতটা আরজের মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিল, সেও আছে।
কিয়ৎক্ষণ এভাবেই কেটে যায়। ধীরে ধীরে আরজে মুখ তুলে। তার রক্তবর্ণ চোখ দুটো চোখাচোখি হয় সানার নদীর মতো শান্ত চোখের সাথে। অতঃপর সে দুহাত বাড়িয়ে সানার মুখ ছুঁয়ে দিল। তার গালে আলতো করে হাত রেখে অদ্ভুত এক শান্ত কণ্ঠে বলল,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৬
—”ওয়াইফি…আজ আমি তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব, তুমি যাবে”
সানা চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। যেন বুঝার চেষ্টা করছে আরজের গভীর চোখের ভাষা। তবে সে বরাবরের মতোই ব্যর্থ। আরজে গভীর শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—”তুমি জানতে চাও না ঐদিন হসপিটালে কে ছিল?”
এবার রমণীর বোধগম্য হয়। সে তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যা’ বুঝায়। আরজে ফের মলিন কণ্ঠে শুধালো,
—”সেটা, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। যে সত্যটা এতদিন শুধু দুজন মানুষ জানত,
মম আর রিজভী। আজ আর সেটা লুকিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই….”
