Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭
সুরভী আক্তার

শুভ্রর কাছে রাতটা আর শুভ হলো না । ভাই বোনদের ঠকিয়েও লাভ হলো না কোনো । অশুভ, অতৃপ্ত ঘুমহীন রাত কাটিয়ে নতুন এক ভোরের সূচনা ঘটলো তার দরবারে । রাতটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিলো । যা ছিলো প্রত্যাশায় তা আর হলো কই !
ভোরের আলো ফুটছে ধরনীর বুক চিরে । বারান্দার পর্দা ভেদ করে সূর্যের উত্তাপ হীন সোনালী মৃদু তীর্যক রশ্মি এসে পড়াতেই চট করে ঘুম ছুটে যায় নব বিবাহিত রমনীর । অল্প তপ্ত মিষ্টি কিরণে চোখ বুজে রেখেই নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করে মেহের । তবে শরীর নাড়াতে পারে না । নিজের ছোট্ট কায়ার উপর ভারী কিছু অনুভব হতেই মুখ কুঁচকে আসে আপনা আপনি । শ্বাস নিতে স্বল্প কসরত হচ্ছে । লাগছে দম বন্ধ । মেহের জোর খাটিয়ে এপাশ হতে ওপাশ হওয়ার চেষ্টা করলো । নিজেকে কোনো কিছুর বন্ধনে আবদ্ধ অনুভব হতেই ধীরে ধীরে খোলার চেষ্টা করলো ঘুমে ভার অক্ষি যুগল‌‌‌ । পিটপিট করে চোখ খুলতেই সিলিংয়ের দিকটা নজরে পড়লো প্রথমে । আধো ঝাপসা চোখে নতুন কিছু অবলোকন হওয়া মাত্রই ছ্যাঁত করে উঠলো মেয়েটার বক্ষস্থল । দ্রুত মেললো নিভু নিভু চোখ জোড়া । অমনি বক্ষস্থল কেঁপে ওঠে । এপাশ ওপাশ চোখ বোলায় দ্রুত । সে সম্পুর্ণ নতুন জায়গায় , নতুন ঘরে , নতুন কারোর বাহুডোরে আবদ্ধ । বালিশ হতে স্বল্প বিস্তর মাথা তুলে চায় মেয়েটা । শুভ্র পুরোপুরি ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে । আপন গ্রীবার নিকট ঘুমন্ত হালাল পুরুষের তপ্ত উষ্ণ শ্বাস অনুভব করলো সে । অমনি ছটফটিয়ে উঠলো নাজুক কোমল তনু । এক নিমিষেই ঘুম ছুটে গিয়ে জোরালো হলো হৃদস্পন্দন ।

ছটফট করে উঠলো মেহের । রাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই ‌। ও বাড়ি থেকে আসার সময় কেঁদেছে খুব । বেশি কান্নার দরুন মাথা ভার ছিলো । ধরেছিলো মাথাটা ‌। ওকে ফ্রেশ করিয়ে বিছানার উপর এক বহর ঘোমটা টেনে বসিয়ে রেখে গেছিলো মেঘা আর শাফাহ্ । বাইরে থেকে দরজা লাগিয়েছিলো । বসে থাকতে থাকতে ভার মাথা নিয়ে আর টিকতে পারে নি মেয়েটা । শত চেষ্টা করেও দুচোখের পাপড়ি আর খুলে রাখতে পারে নি । বসা থেকে বাম কাত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই নিমিষেই তলিয়ে গেছে ঘুমের রাজ্যে । বাদ বাকি আর কিছু মনে নেই ওর । এরমধ্যেই সকাল ও হয়ে গেলো ?
ছটফট করতে করতে চঞ্চল হয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ তুললো মেহের । সাতটা বাজতে চললো । সময় ঠাহর করে শুল্ক ঢোক গিললো । শুভ্রর নড়চড় না দেখে চোখ নুইয়ে তাকালো ওর ঘুমন্ত মুখ পানে । প্রথম কোনো পুরুষ কে নিজের এতোটা সন্নিকটে অনুভব করলো সে । শ্বাস প্রশ্বাস বেগতিক এই অবস্থায় । আপনা আপনি ঠোঁট দুটো প্রগাঢ় হলো । লোকটার ঘুমন্ত মুখ পানে তাকিয়ে মাথার কাছটায় হাত রাখলো । এলোমেলো চুলের ভাঁজে আঙ্গুল ডুবিয়ে গুছিয়ে দিলো ঘুমন্ত লোকটার চুল গুলো । আরো কিছুক্ষণ চেয়ে দেখলো । এক চিলতে লাজুক হাসলো আপন খেয়ালে । ওষ্ঠ বাড়িয়ে খুব আলগোছে কপোলের ডান পাশে আলতো স্পর্শ আঁকলো কেঁপে কেঁপে । অতঃপর দ্রুত সরে এসে মৃদু কম্পিত স্বরে ডাকলো….

” এইযে ….
ঝাঁকালো একটু । নড়ে চড়ে উত্তর দেয় শুভ্র….
” হু ?
” ওঠো , আমি উঠবো ?
” ওঠ !
” ধরে আছো আমায় । ছাড়ো আগে !
” ছাড়বো না । ঘুম হয় নি এখনো আমার ! ঘুমাবো আরো , ডিস্টার্ব করবি না একদম ।
ঘুম কাতর নিরেট কন্ঠে মেহের ঢোক গিলে মিনমিন করে….
” সকাল হয়ে গেছে । উঠতে হবে এখন । তুমি ঘুমাও । আমাকে ছাড়ো আমি উঠে যাই !
শুভ্র মাথা তোলে এবার ‌। ধীরে নিভু করে চোখ মেলে । মেহেরের কাঁচুমাচু মুখাবয়ব দেখে আবারও আগের মতো গলার নিকট মুখ ডুবিয়ে চোখ বুজে বলে….
” আমার ঘুম হারাম করে সারারাত আরাম করে ঘুমিয়েছিস । এখন আমাকে একটু আরাম করে ঘুমাতে দে । নড়চড় করবি না একদম ।

আজ এই সাত সকালে আদ্রের ঘরে উপস্থিত হয়েছেন তোফায়েল কাবির । আদ্র ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করছিলো । দরজায় কড়া পড়লো তখন । অনুমতি দিতেই দরজা ঠেলে ছেলের ঘরে ঢুকলেন তোফায়েল কাবির । নিজের উপস্থিতি জানান দিতে গলা খাঁকারি দিলেন তিনি । আব্বুর উপস্থিতি বুঝে তড়াক করে চায় আদ্র । শার্টের হাতা কনুই অবধি গুটিয়ে মিররের সামনে থেকে দ্রুত সরে আসে । ততক্ষণে তোফায়েল কাবির ভেতরে ঢুকে পড়েছেন । আদ্র পরিস্থিতি আন্দাজ করতে না পেরে সহসা বললো….
” আব্বু , আপনি আমার ঘরে ? কিছু প্রয়োজন ছিলো ? আমাকে ডাকলেই পারতেন ।
পেছনে হাত গুটিয়ে গুরুভার হয়ে দাঁড়ান তোফায়েল কাবির । রাশভারী গলায় বলেন….
” কথা আছে তোমার সাথে !
” হ্যাঁ, বলুন না । বসুন আগে….

টেবিলের পাশের সিঙ্গেল সোফাটায় বসলেন তিনি । আদ্র অধীরে চেয়ে ব্যাকুল হয়ে । তার বাবা নিজে থেকেই তার ঘরে পদার্পণ করেছেন , নিশ্চয়ই খুব জরুরী কিছু । নয়তো এভাবে সকাল সকাল নিজে থেকে আসতেন না তিনি ।
সময় নিয়ে তোফায়েল কাবির ঠান্ডা স্বরে মুখ খুললেন….
” তোমাকে যা করতে বলেছিলাম , করেছো ?
আদ্র বুঝলো না । প্রশ্ন করলো পাল্টা…
” কি ?
” ডিভোর্স পেপার তৈরি করতে বলা হয়েছিলো তোমায় । হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না তা করেছো বলে ।
আদ্রের চোখে মুখে তড়িতে পরিবর্তন আসে । তোফায়েল কাবির এক মুহুর্ত থেমে আবার বলেন থমথমে গলায়….
” ভাইয়ের মতো অবাধ্য হচ্ছো দিন দিন ? তোমার গতিবিধি আজকাল অন্যরকম লাগছে । কি হয়েছে বলতো ? কি চাইছো তুমি বা তোমরা ? কথা বলেছো তোমার ভাইয়ের সাথে ? তার তো আজ ফিরে যাওয়ার ডেট । রাতে ফ্লাইট আছে তার ! এই নিয়ে খোঁজ খবর আছে তোমার কাছে ? ও যাওয়ার পর ঝামেলা বাড়াতে চাইছো ?
আব্বুর ভারী কথা গুলোর প্রত্যুত্তরে আদ্র খানিক গম্ভীরতা টেনে বললো..
” ঝামেলা বাড়লে আমি ঝামেলা পোহাবো আব্বু । রুডি যদি যায় , তাহলে ডিভোর্স হওয়াটা পরের ব্যাপার । আমি সামলে নেবো পরে ।

” যদি যায় মানে ? তোমরা কি কোনো ভাবে আশায় বসে আছো , যে সেই ছেলে যাবে না ? হুহহ , আশা করা বাদ দাও । ভবিতব্য সম্পর্কে তোমাদের ধারনা আছে বলেই জানি । আজ হলেও ডিভোর্স হবে , আর কাল হলেও হবে । মেঘা আটকে থাকবে না এই গন্ডিতে । বেকার বেকার সময় আর সুযোগ দুটোই নষ্ট করছো কেনো তোমরা ? যত সহজে ওকে মুক্ত করা যায় , ততই ভালো হবে ।
আদ্র চুপ রইলো । এবার আর মুখ খুললো না । তোফায়েল কাবির যেভাবে দম্ভভরে এসেছিলেন , সেভাবেই বেরিয়ে গেলেন দৃঢ় পায়ে ।
আটটার কোঠায় ঘড়ির কাঁটা । শুভ্র কে সরিয়ে কিছু সময় আগে উঠে পড়েছে মেহের । ফ্রেশ হয়ে নতুন একটা শাড়ি জড়িয়েছে গায়ে । হাত পা তিরতির করে কাঁপছে কেমন জড়তায় । শিরশির করছে হাত পায়ের তালু । নিচে যেতে হবে । সবাই কি ভাববে ওকে দেখলে ? আন্দাজ করলেই লজ্জায় মুড়িয়ে যাচ্ছে নাজুক মেয়েটা ‌। লাল হয়ে উঠছে কপোল দুখানি । শুভ্রর হেলদোল নেই । বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সেই লোক । মেহের খাটের পাশে অনেকক্ষণ যাবৎ পায়চারি করলো । শাড়ির আঁচল খামচে সকল জড়তা ঠেলে ধাতস্থ করলো নিজেকে । আধো ভেজা চুলগাছি মুড়িয়ে হাত খোঁপা করে নিলো । শাড়ির আঁচল টেনে তুললো মাথায় । ঘোমটা টানলো কপাল ঢেকে । শুভ্র কে ডাকার সাহস পেলো না । একেই ইতস্ততায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে , তার উপর ঐ লোকের মুখোমুখি হলে ওকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না ।

পরপর ঢোক গিললো মেহের । ঘুমন্ত শুভ্রর দিকে শেষ এক পলক চেয়ে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোলো । দরজা খুলে আগেই নিচে নামবে ও । ওদের তো কেউ ডাকতেও আসছে না । আর কতক্ষন এভাবে হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবে ? তার চেয়ে বরং একা একাই নিচে নামা ভালো । সে তো আগে থেকেই সবকিছুর সাথে পরিচিত । খুব একটা সংশয় হবে না ।
দরজার ছিটকিনি খুললো মেহের । কিন্তু দরজা খানা খুলে আসলো না তবুও । আটকে গেছে বোধহয় । জোর খাটিয়ে দরজাটা টানাটানি করলো সে । অধীক চাপ প্রয়োগেও কোনো কাজ হলো না । অথচ ছিটকিনি খোলা ।
পাক্কা দুই মিনিটের চেষ্টার পর ও শত কসরত করেও লাভ হলো না । খুললো না দরজাটা । কোনো ভাবে কি আটকে গেছে ? নাকি বাইরে থেকে লাগানো ?
মেহের দরজার কাছ থেকে সরে এসে খানিক বিচলিত স্বরে শুভ্র কে ডাকলো…..
” ভাইয়া , শুনছো ? আর কত ঘুমাবে ? ওঠো এবার ।
ঘুমের ঘোরে জবাব দেয় শুভ্র….
” ঘুম পুরো হয় নি এখনো । জ্বালাবি না….
” দেখো না , দরজাটা খুলছে না । বাইরে থেকে আটকানো হয়েছে বোধহয় । আটটা বেজে গেছে । বাইরে যেতে হবে তো । সবাই কি ভাববে এতো সকাল অবধি ঘুমালে ? ওঠো প্লিজ , দরজাটা খুলে দাও । আমি বের হয়ে যাই । তার পর আবার ঘুমাও তুমি…

” বের হতে হবে না । ঘুমা তুইও….
ঘুমের ঘোরে শুভ্রের বেখেয়ালে জবাবে মেহের বিছানার পাশে বসলো । দুহাতে ওকে ঝাঁকিয়ে ডাকলো….
” প্লিজ ওঠো , আমি বাইরে যাবো । আমি না নতুন বউ । দরজা খুলে দাও , আমি বেরোবো ।
শুভ্র গা মুড়িয়ে উঠলো এবার । ঘুম হবে না আর । চোখ ডলে হাই তুললো । নিভু চোখ পুরু করলো । পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মেহেরের দিকে । সকাল সকাল মেয়েটার স্নিগ্ধ শোভন ভীতু মুখখানা দেখা মাত্রই থমকালো অক্ষি যুগল‌‌‌ । বিমূঢ় হলো দৃষ্টি জোড়া । লাল টুকটুকে শাড়ি পড়েছে মেয়েটা । আঁচল টেনে ঘোমটা দেওয়া কপালের অদূর অবধি । কালকের ভারী মেকআপের আবরন ওঠাতেই আজ স্নিগ্ধ কোমল লাগছে মেয়েটাকে । এভাবেই সাজগোজ হীনা অবস্থায় ওকে বরাবর দেখে অভ্যস্ত শুভ্র ‌। তবে আজ অন্যরকম লাগছে । দৃষ্টি ভঙ্গির সাথে সাথে মেয়েটার মাঝেও পরিবর্তন এসেছে হাজার ।
একটু আধটু ঠোঁট রঞ্জনে গোলাপি দেখাচ্ছে ওষ্ঠ জোড়া । চোখে গাঢ় কাজল ।
শুভ্র চোখ স্থির করে কয়েক মুহূর্ত পলকহীনা মেয়েটা কে পরখ করলো । দেখলো মন ভরে । এমন একটা সকালে এই মেয়েটাকে এভাবে পাবে , এটা কি কভু ভাবনায় ছিলো ওর ? সম্পুর্ন অভাবনীয় হলেও এটাই হলো ।
শুভ্রর ঠোঁট প্রসারিত হলো মৃদুমন্দ । আকস্মিক ডান হাতে এক টান মেরে মেয়েটাকে কাছে এনে ফেললো । হুবড়ি খেয়ে ওর বুকের উপর আছড়ে পড়লো মেয়েটার নমনীয় অনুচ্চ দেহ খানা । তৎক্ষণাৎ ভড়কালো মেয়েটা । ছলকে চাইলো শুভ্রর চোখপানে । বললো শুভ্র….

” নতুন বউ হওয়ার আসল দায়িত্বটাই পালন করিস নি এখনো । এখন আর বাইরে গিয়ে ফরমালিটি দেখাতে হবে না । আয় ঘুমাই….
মেহের খচখচ করে । বারে হৃৎস্পন্দনের গতি । মিনমিন করে কোনো রকমে….
” বাইরে যেতে হবে ।
” হবে না । আমার কাছে থাকলে তাতেই হবে….
” ভাইয়া ,, দরজা বাইরে থেকে….
বাকি টুকু উচ্চারণ করতে পারলো না । শুভ্র দাঁত খিচে ধমকালো…..
” গাধা , কিসের ভাইয়া ? কাকে ভাইয়া বলছিস তুই ? বিয়ে করেছি তোকে , বউ হোস তুই আমার । কাল কবুল পড়েছিস আমার নামে । আর আজ আমাকে ভাইয়া বলছিস ? গাধা….
মেহের তৎক্ষণাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে । অধর ভেজায় জিভে । অভ্যাস হয়ে গেছে ভাইয়া বলা টা । শুভ্র কে দেখলেই কিছু বলার আগে ভাইয়া সম্বোধন টা আপনা আপনি উচ্চারণ হয় জিভের ডগায় । শুল্ক ঢোক গিললো মেয়েটা, অভিযোগ করে বললো শেষের কথাটা টেনে নিয়ে…
” তুমি আমাকে সবসময় গাধা বলো কেনো ?
” আগে বল, আমি তোর কি লাগি ?
” ভা..
বলতে বলতে শুভ্রর রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে সেকেন্ডের মাথায় নিজেকে শুধরে নিলো…
” না , হাসবেন্ড !
” এবার বল , কাল রাতে ঘুমিয়েছিলি কেনো ?
” ঘুম পেয়েছিলো খুব , তাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই করিনি ।
শুভ্র ওর কোমর জড়িয়ে নিলো শক্ত করে । বললো দাঁতে দাঁত চেপে…..
” এজন্যই তোকে গাধা বলি । গাধা একটা । তোর আক্কেল কি হাঁটুর নিচে ? কাল আমাদের বাসর রাত ছিলো । কোন সেন্সে আমি আসার আগেই তুই কাল ঘুমিয়ে পড়লি ? গাধা কোথাকার !
মেহের দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নেয় । জিভে কামড় বসায় সহসা । শুভ্রর কথাটায় কান গরম হয়ে আসে ওর । আমতা আমতা করে বলে চোখ চুরিয়ে….

” আ… , না মানে , মাথা ধরেছিলো একটু । বসে থাকতে থাকতে শুয়ে পড়েছিলাম । কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি । তুমি কখন এসেছো , সেটাও টের পাই নি । তুমি তো ডাকোও নি আমায় । ডাকলেই পারতে…
শুভ্র ঠোঁট কামড়ে শুধালো…..
” ডাকলে কি হতো শুনি ?
মেহের চিবুক নুইয়ে ফেলে আরো বেশি ।
শুভ্র হাসি চেপে সবটুকু দূরত্ব ঘুচে মেয়েটাকে টেনে নিয়ে বলে হাস্কি স্বরে….
” তোকে হঠাৎ করেই খুব আদুরে লাগছে মেহের ।‌ ইচ্ছে করছে খুব করে আদর করে দেই ।
মেহের এক ধাক্কায় শুভ্র কে দূরে সরায় । নিচে নেমে পিছু ফিরে মুখ লুকিয়ে বলে ধরা গলায়….
” দরজা খুলে দাও প্লিজ । অনেকটা সকাল হয়ে গেছে ।
শুভ্র হেসে ফেললো শব্দহীন । গা ঝেড়ে বিছানা ছাড়লো । মেয়েটা কে জ্বালাতন করলো না আর । দরজা টানলো । খুললো না । বুঝতে বাকি রইলো না বাইরে থেকে আটকানো হয়েছে দরজা টা । হাঁফ ছাড়ল শুভ্র । বিছানার উপর থেকে ফোন তুলে আদ্রের নাম্বারে ডায়াল করলো । এক বারেই রিসিভ হতেই শুভ্র বললো গলা ভার করে….
” দরজা আটকে রেখেছিস কেনো ? খুলে দে….
ওপাশ থেকে টুং টুং করে ফোন কাঁটার আওয়াজের পর পরই দরজার বাইরে থেকে শাফাহ্’র উচ্চ বাক্য ভেসে আসলো…..

” পাওনাদার’রা দরজা অবরোধ করে রেখেছে ভাইয়া । টাকা না দিলে এ দরজা আজ আর খুলবে না ।
শুভ্র হতবাক হয়ে কান থেকে ফোন নামায় । গলা বাড়িয়ে বলে…..
” টুকটুকি , দরজা খুলে দে ।
” আগে টাকা দাও তারপর । কাল বোকা বানিয়েছিলে আমাদের । এতে পার পাবে ভেবেছো ? আজ আর ছাড়ছি না তোমায় । টাকা দিলে তবেই দরজা খুলবো । আর না দিলে ভেতরেই বসে থাকো তোমরা । আমরা আর বোকা বনে দরজা খুলছি না আজ ।
” দেখ বনু , মজা করিস না সকাল সকাল । টাকা পেয়ে যাবি , এখন দরজা খোল । মেহের বেরোবে বাইরে….
এবার মেঘার আওয়াজ শোনা গেলো….
” ভাবি কে নিয়ে ঘরেই থাকো ভাইয়া । আমরা এমনি এমনি দরজা খুলবো না আজ ।
আদ্রও বাদ পড়লো না…..
” তোমার ঘরের দরজায় দু – দুটো তালা ঝুলছে ভাইয়া , টাকা দিলে তবেই চাবি ঘুরিয়ে তালা খোলা হবে । তার আগে নয় । তুমি কিপটেমি করছো কেনো বলতো ?
” তোরা বাচ্চামো করছিস কেনো ? আদ্র , তুইও যোগ হয়েছিস ওদের সাথে ?
” হ্যাঁ ভাইয়া । ওদের সাথে যোগ দিয়ে দল ভারী করেছি একটু ।
” আমার কাছে ক্যাশ নেই এই মুহূর্তে । থাকলে কালই দিয়ে দিতাম তোদের । এখন দরজা খোল , পরে টাকা দিয়ে দেবো আমি , ট্রাস্ট মি…..
মেঘা বললো প্রত্যুত্তরে…..

” বিশ্বাস আর নিঃশ্বাস , একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না ভাইয়া । একবার বিশ্বাস হারিয়েছি তোমার উপর , আর পারছি না বিশ্বাস করতে । ক্যাশ নেই তো কি হয়েছে ? কার্ড দিয়ে দাও আমাদের । আমরা ভাঙ্গিয়ে নিতে পারবো । কিন্তু না দিলে দরজা খুলবো না বলে রাখলাম….
” মেঘা প্লিজ দরজা খুলে দে , তুই না আমার মিষ্টি বোন ।
” তুমিও আমার মিষ্টি ভাইয়া , বাট এখন তোমার কথায় গলতে পারছি না ভাইয়া । সরি…..
শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । এগুলোর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই । মেহের ও পেছন থেকে তাড়া দিচ্ছে ওদের আবদার মিটিয়ে দেওয়ার জন্য ।
আলমারি থেকে ব্যাংক কার্ড বের করলো শুভ্র । ওর কাছে ক্যাশ নেই এটা সত্য । দরজার নিচ দিয়ে কার্ড টা বাইরে বের করে দিয়ে বললো….

” এই নে , যা ইচ্ছে তাই কর । তোদের ডিমান্ডের থেকেও বেশি এ্যামাউন্ট আছে কার্ডে । এবার তো দরজা খোল….
মুহুর্তেই খট করে দরজা খুললো । দরজার বাইরে আদ্র,মেঘা আর শাফাহ্ দাঁড়িয়ে । শুভ্র কে দেখা মাত্রই শব্দ করে হেসে উঠলো ওরা । মেহের দ্রুত ঘর হতে বেরোলো । মেঘার হাত খামচে ধরে পিছু ফিরে শুভ্রর দিকে এক ঝলক চেয়ে বোকা বোকা স্বরে বললো চট করে…..
” আমি নিচে যাচ্ছি ভাইয়া , তুমি এবার ঘুমাও…..
অগত্যা বৃহৎ নয়নে মেয়েটার দিকে বর্ষিত হয় চার জোড়া দৃষ্টি । শাফাহ্,মেঘা আর আদ্র সমস্বরে উচ্চারণ করে টান দিয়ে…..
” ভাইয়াআআআআআআ…….
ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেহের । শুভ্র রাগি চোখে কটমট করে চেয়ে আছে । এই মেয়েটা আসলেই একটা গাধা । যদি মিনিমাম কমন সেন্স থাকে ওর মাথায় ! মনে মনে রাগ পিষে বিড়বিড় করলো শুভ্র…..
” গাধা । কাল আমার সাথে বিয়ে হয়েছে তোর । ভ্যাবলার মত ঘুমিয়েছিলি বলে দয়া মায়া দেখিয়ে বাসরটা করি নি , তাই বলে এখনো ভাইয়া ডাকবি আমায় ? আমি তোর কোন জন্মের ভাই ? বন্ধুর বোন রুপি বউ না হলে এক্ষুনি বন্ধুর বাড়িতে রিটার্ন করে দিতাম তোকে । বউয়ের মুখে সাত সকালে ভাইয়া ডাক শুনতে হচ্ছে , কি মুসিবত আমার !
আদ্র,শাফাহ্ আর মেঘা এক মুহুর্ত পর হো হো করে হেসে উঠলো । ওদের হাসিতে লজ্জায় মুড়িয়ে গেলো মেয়েটা । মেঘা ভেঙ্গিয়ে বললো….

” ভাইয়াআআআ , তুমি এবার ঘুমাও । আমরা যাই । চলো ভাবি…..
শাফাহ্’র হাতে কার্ড । শুভ্র কে লাস্ট বার কার্ড টা দেখিয়ে ভেংচি কেটে নিজের ঘরের দিকে ভোঁ দৌড় দিলো সে ।
কেবলই দুদিকে মাথা নাড়ালো শুভ্র ।
আজ ওদের বউভাত । সন্ধ্যার পর গেট টুগেদার । অতিথি আসবেন অনেক । ব্যাস্ততা দ্বিগুণ বেশি ।
রৌদ্রের নাগাল নেই কাল থেকে । রাতেও বাড়িতে দেখা যায় নি আর ।
বিকেলের আগে আগে আজ কিছু পুরনো মুখ হাজির হয়েছে । বিয়েতে আসতে পারেন নি এনারা । তবে বিয়ের পরদিন বউভাতে ঠিক এসেছেন !
রুবিনা কাবিরের একমাত্র বোন , #রেহানা_শিকদার আর তার পুরো পরিবার । এই পরিবারের সাথেই আলাদা করে নতুন একটা সম্পর্ক জোড়ার কথা ছিলো পাঁচ বছর আগে । যা জোড়া লাগে নি । বরং বর্তমান সম্পর্কেও টানাপোড়েন লেগেছে । ভেঙ্গেছে সম্পর্কের শৃঙ্খল ।
সেই পাঁচ বছর আগ থেকেই বোনের সাথে মনোমালিন্য ছিলো রুবিনা কাবিরের । তবে সময়ে সময়ে মনমালিন্য কমে এসেছে । সম্পুর্ক টা পুরোপুরি আগের মতো স্বাভাবিক না হলেও মধ্যকার ন্যায় তিক্ত নেই এখন । এখন মিটে এসেছে সব মন কষাকষি ।

রেহানা শিকদারের সাথে তার পুরো পরিবার এসেছে । স্বামী #ইসমাইল_শিকদার , বড় মেয়ে #আরিবা_শিকদার_ইভা , ছোট মেয়ে #সানিহা_শিকদার_সারা । আর একটা তিন বছরের ফুটফুটে বাচ্চাও আছে সাথে । সবার আগমন স্বাভাবিক হলেও ইভার আগমন টা বেশ সংঘাতে ফেলেছে কাবির পরিবারের সকলকে । পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনায় ঘাঁ পড়লো আজ আবার ।
রৌদ্র এখনো বাড়িতে নেই । সে ফিরলে এই মেয়েকে এ বাড়িতে দেখার পর কি করবে কে জানে ?
ভয়ে তটস্থ রুবিনা কাবির । একেই কাল থেকে ছেলের চিন্তায় দিশেহারা , এখন ইভা কে দেখে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন আরো বেশি । তার বেপরোয়া ছেলে যে পরোয়া করবে না কোনো কিছুর । এতো দিনে বোনের সাথে পূণরায় সম্পর্কটা ঠিক হয়েছে একটু, আবার কি হবে কে জানে ?
পার্লার থেকে মেকআপ আর্টিস্ট এসেছেন । মেহের কে সাজানো হচ্ছে ওর রুমে । অলরেডি বাদ বাকি অতিথিরা আসা শুরু করে দিয়েছেন । মেঘা নিজের রুমেই আছে । তৈরি হয়েছে সে । এতো এতো মেহমানদের ভিরে নিচে নামে নি আজ । ঘরেই বসে আছে সেই থেকে । দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে কেউ ভেতরে ঢোকা মাত্রই চমকালো মেয়েটা । ধক্ করে চাইলো দরজার দিকে ‌। অমনি কন্ঠ চিপে উদ্বিগ্ন হয়ে উৎসুকতায় চেঁচিয়ে উঠলো সারা..
” মেঘা !
ছ্যাত করে ওঠে মেঘা । নিমিষেই প্রগাঢ় হাসি ফোঁটে ওষ্ঠ জোড়ায় । সারা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে মেঘা কে….
” মেঘা , কেমন আছিস তুই ? কত দিন পর দেখলাম তোকে ! কেমন আছিস বল আগে ?
মেঘা হাসি সমেত বলে…..

” আমি ভালো আছি । আমিও তো কতদিন পর দেখলাম তোকে ! তুই কেমন আছিস বল ?
” আমি বিন্দাস আছি । তোকে দেখে আরো বেশি বিন্দাস হয়ে গেলাম । উফফফ , আমার যে কি খুশি লাগছে । ভাবতেই পারবি না । বল , কতদিন পর তোর সাথে দেখা । সেই কবে থেকে আসবো আসবো করেও আসা হচ্ছে না । অবশেষে আসলাম , শুধু তোর সাথে দেখা করার জন্য । ইশশ্ , আজ আমি ভীষণ হ্যাপি । ইউ নো , তোকে দেখে খুশিতে পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে আমার ।
মেঘা ফিক করে হাসে । সারা কে ছেড়ে বলে..
” পাগল একটা । সেই পাগলই রয়ে গেছিস । কখন আসলি বল আগে ?
” কেবলই তো আসলাম , এসেই তোর কাছে ছুটে এসেছি । এক মুহুর্ত অপেক্ষা করি নি ।
মেঘা ঠোঁটের হাসি কমায় । ধীরে বলে..
” আঙ্কেল আন্টি আসেন নি ?
” এসেছে তো । আর ইভা আপুও….
থামলো সারা । মেঘার মুখপানে তাকিয়ে বাকি কথা গিলে নিলো । বললো কথা পেঁচিয়ে..
” এসব ছাড় , কত শুকিয়ে গেছিস তুই । খাওয়া দাওয়া করিস না ঠিকঠাক ?
” করি তো ।

মলিন ছোট উত্তর । হাসার চেষ্টা করলো সারা । মেঘা কে টেনে খাটের উপর বসালো । সাইট ব্যাগ থেকে হাত ডুবিয়ে কয়েকটা লজেন্স বের করলো । মেঘার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
” এই দেখ , তোর পছন্দের লজেন্স । এনেছি তোর জন্য । জানিস , আমাদের স্কুলের পাশের দোকানটায় এখনো পাওয়া যায় এসব । আমি আসার আগে অনেক গুলো নিয়ে এসেছি তোর জন্য । তোর তো এটা খুব পছন্দ । আমরা কত খেতাম আগে ।
মেঘা ভরা গালে হাসে ।
সারা ওর সেই ছোট্ট কালের ফ্রেন্ড । সেই ক্লাস টু থেকে বন্ধুত্ব এই পাগলটার সাথে ।
বন্ধুত্বে দূরত্ব এসেছে পাঁচ বছর আগে ।

মেঘা তো এখন আর নিজেদের বাড়িতে থাকে না । সব হারিয়ে এ বাড়িতে পড়ে আছে । নিজের সেই ছোট্ট বাড়িটা থেকে অনেকটা দূরে । সারার সাথে দূরত্ব বেড়েছে সেই তখন থেকেই । এ বাড়ির আত্মীয় হওয়ার আগে সারা ওর বেস্ট ফ্রেন্ড । ওর জান ছিলো । আর বেস্ট ফ্রেন্ডের খাতিরেই পাঁচ বছর আগে তার দেখা হয়েছিলো রুডভিক কাবির রৌদ্র নামে এক রুখো, বেপরোয়া, ছেলের সাথে । বেস্ট ফ্রেন্ডের খাতিরেই পাঁচ বছর আগের কমিউনিটি সেন্টারের সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছিলো মেঘা । সেখানেই বর বেশে প্রথম দেখেছিলো সেই ইরিটেটিং লোক টাকে । মেঘা বড্ড খুশি ছিলো সেদিন । সারার বোন হওয়ার দরুন , মেঘার কাছেও ইভা ছিলো আপন বোনের ন্যায় । আপনজন হীনা অনাথ একটা মেয়েটার দ্বিতীয় পরিবার ছিলো শিকদার পরিবার । মেঘা কে খুব স্নেহ করতো ও বাড়ির সবাই । কিন্তু সেই দিনের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর , সেই বেপরোয়া ছেলের ঔদ্ধত্যার পর, মেঘা ছিন্ন হয়েছে তার সেই দ্বিতীয় পরিবার হতে । এখানে এসে পড়েছে সে । পেয়েছে কাবির পরিবার ।
সেবার বিয়ের দিন ইভাকে বউ সাজে দেখেছিলো মেঘা । আর রৌদ্র কে দেখেছিলো ইভার বর রুপে । ইভার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা জানতো না সে । তার আগেই বাড়িতে ফেরার জন্য বেরিয়ে এসেছিলো সেন্টার হতে । বেরোনোর পর পর বাড়ি ফেরার আগেই পথিমধ্যে রাস্তার ধারে রৌদ্র কে দেখা মাত্রই থমকে ছিলো ষোড়শী কন্যা । চেনা মুখশ্রী দেখা মাত্রই গদগদ হয়ে এগিয়ে গেছিলো সে ।

অতঃপর বাকিটা যা হয়েছে , সব অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত । যা কভু কল্পনাও করে নি ষোড়শী কন্যা । যা সেই ষোড়শী কন্যার পুরো জীবনটাই পাল্টে দিয়েছে । রং বদলে দিয়েছে জীবনের ।
সারার সাথে আজকাল দেখা হয় না । কথা হয় টুকটাক ফোনে । ওদের আগের মতো সেই গভীর বন্ধুত্ব টা নেই । একে অপরকে হীনা অচল ছিলো ওরা । সেই অচলতা কেটে গেছে । সয়ে গেছে সবটা ।
সারা মেয়েটা বড্ড ভালো । মেঘা কে আজও খুব বেশি ভালোবাসে ও । এই যে কাছে পেয়েছে , কত শত কথা জমে আছে । সবটা উজাড় করে বলবে এখন । করছেও তাই । মেঘাকে জড়িয়ে গল্প জুড়ে বসেছে । চুপচাপ আনমনে শুনছে মেঘা । মনটা অন্য কোথাও ।
শাফাহ্ এতক্ষণে ঘরে আসলো । খাটের উপর মেঘার সাথে সারা কে দেখে কুঁচকে আসলো চোখ মুখ ।
তেজি হয়ে এগিয়ে এসে ফোঁস করে বললো…..
” সারা , তোমাকে তোমার মা খুঁজছে । ডাকছে নিচে ।
সারা কথা বন্ধ করলো । মেঘা কে উদ্দেশ্য করে বললো…
” এখানে থাক , আমি গিয়ে দেখি আম্মু ডাকছে কেনো । এক্ষুনি আসছি কেমন ?
বলেই বেরিয়ে গেলো ।
ও বেরোতেই ওষ্ঠ উল্টায় শাফাহ্ । গাল ফুলিয়ে কাতর চোখে তাকিয়ে বলে নিভু স্বরে…..

” সারার সাথে একদম মিশবি না বলে দিলাম । তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । এখন ওর আর কিচ্ছু নোস । বেশি ঢলাঢলি করবি না ওর সাথে । আমার কিন্তু একটুও ভালো লাগে না তোর সাথে ওকে দেখলে । বল আমায় , ওর সাথে কথা বলবি না বেশি । শুধু মাত্র তোর বেস্ট ফ্রেন্ড আমি , শাফাহ্ ব্যাতীত তোর লাইফে আর কোনো বেস্ট ফ্রেন্ড নেই ….
মেয়েটার উল্টো পাল্টা কথায় মিহি হেসে ওঠে মেঘা ।
এই মেয়েটাও কম পাগল নয় ‌!
সন্ধা হতে চললো । তবুও বাড়ির ছোট ছেলের কোনো পাত্তা নেই । রুবিনা কাবির চিন্তায় চিন্তায় টলে পড়েছেন । মাথা ঠিক রাখতে পারছেন না আর । তোফায়েল কাবিরের কাছে খবর পেয়েছেন তার ছেলের ফ্লাইট আছে আজ রাতে । নয়টার ফ্লাইটে তার ছেলে পাড়ি জমাবে অদূরে । তার মানে আটকানো যাবে না তার ছেলেকে । থামবে না তার বেপরোয়া ছেলে । কেউ রুখতে পারবে না তাকে । এই ভেবেই কেঁদে কেঁদে অস্থির রুবিনা কাবির । বিকেলের পর থেকে ঘর হতে বেরোন নি আর । অতিথিদের সামনে যান নি । প্রকাশ করেন নি দূর্বলতা ।
শুভ্র আর মেহের কে বাইরে স্টেজের উপর বসানো হয়েছে । আজ মেয়েটা শুভ্র সফেদ রংয়ের লেহেঙ্গা পড়েছে ভারী কাজের । শুভ্র ও তাই । মেহেরের বাড়ি থেকেও সবাই এসেছে ইতোমধ্যে ।

মেঘা সেভাবে ঘর হতে বেরোচ্ছে না আজ । খানিক আগে শাফাহ্ টেনে টুনে ওকে নিয়ে বেরিয়েছে গার্ডেনে ।
শিশির এসেছে আজ । অনেক করে বায়না ধরে বলার পর সেই মেয়ে এসেছে এ বাড়িতে । শাফাহ্ আর মেঘার ক্লোজ ফ্রেন্ড হওয়ার দরুন বিয়েতে শুধুমাত্র ওকেই ইনভাইট করেছিলো ওরা । কিন্তু ঐ মেয়ের সময় কুলোয় নি বিয়েতে হাজির হওয়ার মতো । তবে বউভাতে আর ছাড় দেয় নি । টুকটুকি অনেক বার জিদ্দি খেয়ে ওকে আসতে বলেছিলো । এতো করে বলার পর কথা রাখতে এসেছে ও ।
বিলাসবহুল কাবির ম্যানসন ঝিকঝিক করছে উত্তাল সাজসজ্জায় । অদূর পর্যন্ত ঝলকানিতে চোখ ঝলসে যাচ্ছে । শিশির অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের মেয়ে । বেড়ে উঠেছে অভাবে । এতো বড় বাড়ির এতো এতো সাজসজ্জায় চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা ওর । প্রথম বার এ বাড়িতে আগমন তার । গেটের বাইরে থেকে শাফাহ্ আর মেঘা ওকে রিসিভ করে নিয়েছে । মেয়েটা আজকেও খুব সাধারণ পোশাকে এসেছে এখানে । এতো এতো চাকচিক্যতায় মলিন দেখাচ্ছে ওর সাজপোশাক ।

তবুও মেয়েটার আত্মসম্মান কম নয় । ওকে নিয়ে পুরো পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে মেঘা আর শাফাহ্ । বাইরে প্রচুর ভিড় । গেস্টরা একে একে বেড়েই চলেছে । সন্ধ্যার আঁধার নেমেছে চারপাশে । তবে এই আঁধার কাবির ম্যানসনের উজ্জ্বল আলোকে একটুও ক্ষিণ করতে পারে নি । মেঘা,শাফাহ্, শিশির আর সারা ওরা বাইরের হৈচৈ ফেলে ড্রইং রুমের একধারে বসে আছে । গল্প করছে টুকটাক ।
রৌদ্র বাড়িতে কখন এসেছে , এসব ভিড়ভাট্টায় কেউ লক্ষ্য করে নি । ফ্রেশ হয়েছে সে । রোজকার ন্যায় ভেজা শরীরে টিশার্ট জড়িয়ে গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে নিচে নামলো । ওর পায়ের শব্দে চকিতে তাকালো তার রমনী । বিশাল বড় সড় ঝটকা খেলো সারা । রৌদ্রের ফেরা সম্বন্ধে ওরা অজ্ঞাত । কেউই জানে না যে রৌদ্র ফিরেছে । এমন আচমকা এতো বছর পর রৌদ্র কে দেখা মাত্রই বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে গেলো রমনী । অস্ফুটে উচ্চারণ করলো….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৬

” রৌদ্র ভাইয়া ……
রৌদ্র এক ঝলক চেয়েছে ওদের দিকে । শুধুমাত্র একজনের দিকে । কাঙ্ক্ষিত জনকে তৃষ্ণার্ত নয়নে এক ঝলক তাকিয়েই দ্রুত দৃষ্টি ফেরালো । গলা থেকে টাওয়েল সরিয়ে ঝাড়া মেরে ডাকলো উচ্চস্বরে….
” মম…..

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here