Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৮
সুরভী আক্তার

ছেলের ডাক কানে পৌঁছানো মাত্রই ধড়ফড়িয়ে নিচে নামলেন রুবিনা কাবির । রৌদ্র তখন চেয়ার টেনে বসেছে । খাবে এখন । রুবিনা কাবির নেমেই ছেলের কাছে ছুটে আসলেন । বাড়ির ভেতরে তেমন কেউ নেই । বাইরে সবাই । কান্না চেপে ধরে আসা গলায় কোনো রকমে বুলি ফুটালেন রুবিনা কাবির….
” রৌদ্র , বাবা এসেছিস তুই ? কখন এসেছিস ? এতক্ষণ ডাকিস নি কেনো আমায় ? কোথায় ছিলি তুই কাল থেকে ?
সব প্রশ্নের বিপরীতে রৌদ্রের ঠান্ডা স্বর….
” খেতে দাও মম । দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার !
ধক্ করে উঠলো মাতৃ হৃদয় । চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো পুনরায় ।
” দেরি হয়ে যাচ্ছে মানে ? কিসের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে তোর ?
” নয়টায় ফ্লাইট আছে আমার । অলরেডি সাতটা বেজে গেছে । আ’ম লেইট মম । খেতে দাও , নয়তো এভাবেই বেরোতে হবে ।
রুবিনা কাবির আর পারলেন না নিজেকে সামলে রাখতে । ওষ্ঠ ভেঙে কেঁদে উঠলেন এবার । ছেলের বাহু আঁকড়ে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলেন ফুঁপিয়ে….
চেপে রাখা সব কথা ঝেড়ে ফেললেন…

” চলে যাবি তুই আমাকে ছেড়ে ? সত্যিই চলে যাবি আবার ? মায়া হচ্ছে না আমার জন্য একটুও ? এভাবে আবার আমায় ফেলে রেখে চলে যাবি । আমি আর কষ্ট সইতে পারবো না রৌদ্র । এমনটা করিস না আর । অবাধ্য হোস না এবার । কখনো আমার কথা শুনিস নি , এবার অন্তত শোন । ছেড়ে দে এসব জেদ , পাগলামো । আর কত জ্বালাবি তোরা আমায় ? নিজেরা নিজেদের জেদ ধরে বসে থাকিস , আর মাঝখান থেকে আমি জ্বলে পুড়ে মরি । কি আছে তোর ঐ দেশে ? কেনো যাবি তুই ওখানে ?
মেঘা অনড় হয়ে বসে । দৃষ্টি সরিয়ে মেঝেতে নিবদ্ধ করেছে । রৌদ্র আড়চোখে তাকে দেখে বললো…
” এ দেশেও আমার কিচ্ছু নেই মম ।
” আমি ? আমরা ? আমরা কেউ নই তোর জীবনে ? কি করবি ও দেশে গিয়ে ? কি করিস তুই ওখানে ‌? দিন কাটে কি করে আমাদের ছাড়া ?
” জব করি ! এমনি এমনি এতো গুলো বছর একটা দেশে পড়ে আছি ভেবেছো ? কথা বাড়িও না মম । ইউ নো , কান্নার আওয়াজ আমার পছন্দ নয় । কাঁদবে না এভাবে । খেতে দিলে দাও , না দিলে আমি চললাম । সময় নেই আমার হাতে ।

রুবিনা কাবির একই ভাবে কেঁদে কেঁদে এক কথা বারংবার বলে চলেছেন । তিনি কিছুতেই ছেলেকে যেতে দেবেন না । জাপটে ধরে রেখেছেন ছেলে কে । তার কান্নার আওয়াজে বাইরে থেকে ভেতরে জড়ো হয়েছে অনেকে । শুভ্র, আহিয়ানসহ , বাড়ির দুই কর্তা ছুটে আসলেন । ভেতরে বাইরের অধিকাংশ লোকজন জড়ো হওয়া মাত্রই রৌদ্র রুবিনা কাবির কে ঠেলে সরালো নিজের থেকে । ধীরে বললো মায়ের চোখ জোড়া আলগোছে মুছিয়ে দিয়ে…..
” কেঁদো না মম । মানুষ মানুষের অভ্যাস । পাঁচ বছর যখন আমাকে ছাড়া কাটাতে পেরেছো , তখন আজ আমি চলে গেলে বাকি জীবনটাও ঠিক কাটাতে পারবে । কেঁদে কেঁদে মায়া বাড়িও না অযথা । তোমার আরেকটা ছেলে তো আছে । বাধ্য , ভদ্র , শিক্ষিত , ছেলে । আমার মতো অবাধ্য, অভদ্র ছেলে না থাকলেও চলবে । দিব্যি চলবে এ বাড়ির সবার জীবন । ঠিক যেভাবে গত পাঁচ বছর চলেছে , সেভাবেই ।
কথা শেষ করে মাকে ছাড়লো । এতো এতো মানুষের মাঝে আঁচলে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠলেন রুবিনা কাবির । সিরাত দ্রুত কদমে এগিয়ে আসে । রৌদ্র পিছু ফিরে সিঁড়ি উঠতে গেলে সিরাত টেনে ধরে ওর হাত । অবিশ্বাসে শুধোয় চাপা স্বরে…..

” রৌদ্র ! কি হচ্ছে এসব ? আর ইউ সিরিয়াস ? দেখ , আম্মু কাঁদছে । প্লিজ এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করবি না এখন । শুভ্রর কথাটা ভাব একবার । আজ ওর গেট টুগেদার । বাড়িতে কত শত গেস্ট এসেছেন । আর তুই এখন এসব কি শুরু করেছিস ?
” শেষ করছি আপু । আমি চলে গেলেই সবশেষ হয়ে যাবে । তোমার জন্য এসেছিলাম । আমার ছুটি শেষ , দুই সপ্তাহ শেষ । এবার ফেরার পালা ।
এভরিঅন , হোয়াট আর ইউ আর ডুয়িং হেয়ার ? কাম অন গাইস ,,, প্লিজ গো আউটসাইট । দ্যা ইভেন্ট ইজ হ্যাপেনিং আউটসাইট , নট হেয়ার । প্লিজ লিভ….
অতিথিরা একে একে বেরিয়ে গেলেন কথা শুনে । রৌদ্র মুচকি হাসলো একটু আধটু । মায়ের দিকে ফিরে বললো…
” মম , খেতে দিতে হবে না আর । আই এম অলরেডি লেইট । রেডি হয়ে আসছি….
এটুকুনি বলেই উপরে উঠে গেলো গটগটিয়ে ।
শুভ্র পেছন পেছন উঠলো । আদ্র এতক্ষণ ছিলো না বাড়িতে । ফিরেই বাড়িতে ঢোকা মাত্র পুরো বাড়ির সবাই সহ টুকিটাকি আত্মীয় স্বজনদের একসাথে দেখে ভ্রু গুটিয়ে নিলো সে । রুবিনা কাবির কে নিঃশব্দে ফোপাতে দেখে আদ্র তড়িতে এগোয় । বিচলিত হয়ে শুধোয়….

” আম্মু , কি হয়েছে তোমার ? কাঁদছো কেনো এভাবে ? সবাই এখানে একসাথে জড়ো হয়েছো কেনো ? কি হয়েছে বলবে তো ?
” তোর ভাইকে থামা আদ্র । ওকে যেতে দিস না দয়া করে । ও চলে যাচ্ছে । তোর বাবা কে বল‌ ওকে আটকাতে ।
বলতে বলতে তৌসিফ কাবিরের দিকে এলোমেলো পায়ে এগোলেন রুবিনা কাবির….
” ভাইজান , আপনি তো কিছু করুন । রৌদ্র কারোর কথা না শুনলেও আপনার কথা ঠিক শুনবে । ও মান্য করে আপনাকে । আপনার উপর অবাধ্য হতে পারবে না ও । ওকে বাঁধা দিন দয়া করে । আমার ছেলে টাকে আটকান কেউ । আপনারা এতো নিষ্ঠুর কেনো ? ও তো এ বাড়ির ছেলে । তাহলে ওর প্রতি এতো কেনো অনিহা প্রকাশ করেন আপনারা ? এতো কেনো পাষান ওর প্রতি সবাই….
চাপা আর্তনাদে ডুকরে উঠলেন রুবিনা কাবির ।
তোফায়েল কাবির সম্পুর্ন নির্বিকার । মতিগতিতে বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তনের লেশমাত্র নেই । মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে নিরেট পায়ে কেবলই স্থান ত্যাগ করলেন তিনি ।
তৌসিফ কাবির শান্ত থাকতে পারলেন না । উঠে গেলেন রৌদ্রের রুমে ।
মেঘা সেই একই ভাবে বসে । ফোন নিয়েছে হাতে । আজগুবি ফোন ঘাটছে । ব্যাস্ত আর নির্বিকার প্রমাণ করছে নিজেকে । আদ্র এক পলক তাকালো ওর দিকে । মেঘার পাশে স্বল্প চেনা আরেকটা মুখ নজরে পড়লো । আদ্র বেশি ঘাটলো না ।
শিশির কিছুই বুঝতে পারছেনা এসবের । এদের পারিবারিক বিষয় । বোঝার চেষ্টাও করলো না । এখানে থাকাটা ঠিক হবে না আর । ইনিয়ে বিনিয়ে কথা তুললো ক্ষিণ স্বরে….

” মেঘা ,, উনি কে ?
রৌদ্র কে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন । মেঘা হাতের গতি বাড়ালো । এলোমেলো ফোন স্ক্রল করতে করতে জবাব দিলো শক্ত কন্ঠে….
” চিনি না আমি ।
সারা আর শাফাহ্ তাকায় চকিতে । উত্তর করে শাফাহ্…
” উনি আমার ভাইয়া । মানে আদ্র ভাইয়ার জমজ ভাই ।
” এজন্যই আদ্র স্যারের সাথে চেহারায় মিল আছে । বুঝতে পেরেছি একটু । আচ্ছা , তোরা থাক । আমি বরং এখন আসি ? তোদের বোধহয় স্পেস প্রয়োজন । আমার ও দেরি হয়ে যাচ্ছে । বাড়ি পৌঁছাতে লেট হয়ে যাবে নয়তো । আসি এখন….
” সে কি , একা যাবি ?
” হুম , যেতে পারবো । বেশি রাত হয় নি এখনো ।

উঠে দাঁড়ালো শিশির ।
আদ্র ঠায় দাঁড়িয়ে । কি করবে বুঝতে পারছে না । রৌদ্র একটা অচেনা অজানা মানুষের কথাতে গুরুত্ব দিলেও কখনো আদ্রের কথায় গুরুত্ব দেবে না , শুনবেও না হয়তো । তা ওর ভালো করেই জানা আছে । চেনা আছে রৌদ্র কে ? এভাবে আর মন মানে না । শান্তিময় পরিস্থিতি নেই বাড়িতে । ভেবেছিলো রৌদ্র ফিরবে না , এখনো তাই মনে হচ্ছে । রৌদ্র কে চেনে সে । এসময়ে এভাবে ফেরার পাত্র নয় রুডভিক কাবির রৌদ্র । তাহলে হচ্ছে টা কি এসব ?
আদ্র চোয়াল নিরেট করলো ।
এর মধ্যেই ধুপধাপ আওয়াজ আসছে সিঁড়ির দিক থেকে । তৈরি হয়ে ল্যাগেজ গুছিয়ে নিচে নামছে রৌদ্র ।
পেছন পেছন শুভ্র আর তোফায়েল কাবির । হাজার বোঝানোর পরও বেপরোয়া ছেলের মনকে ফেরানো যায় নি । কানে তোলে নি কোন কথা । রৌদ্র নিচে নেমে সিঁড়ির নিচে ল্যাগেজ রাখলো । রুবিনা কাবির তা দেখে সমস্ত শক্তি খুইয়ে ফেললেন । ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে । সিরাত তার বাহু আঁকড়ে ধরলো । রৌদ্র হাসলো এক ফালি । সবাইকে উপেক্ষা করে একটু কোমল কন্ঠে বললো…

” গুড বায় এভরিঅন ।
মেঘা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় । এখানটায় টেকা যাচ্ছে না আর । কোনো দিকে তাকালো না ও । হাতের মুঠোয় ফোন চেপে ধরে মাথা নত করে দ্রুত পদে এগোলো সিঁড়ির দিকে । উদ্দেশ্য এখান থেকে মুক্তি পাওয়া । দম বন্ধ লাগছে এতো সবার উপস্থিতিতে । সিঁড়ির সামনে পাশাপাশি রৌদ্র কে পাশ কাটালো সে । একবারও বাঁকা দৃষ্টিতেও চাইলো না । পাশ কাটিয়ে মোটে দুই কদম বাড়াতেই টান পড়লো ওরনার এক কোণে ।
দ্রুত হকচকিয়ে পিছু ফিরলো মেয়েটা । কেমন যেনো বুক কাঁপল রৌদ্রের সাথে চোখাচোখি হতেই । দৃষ্টি নিচে করে পরক্ষনে তাকালো ওরনার দিকে । অপ্রত্যাশিত ভাবে আচমকাই মেঘার ওরনার এককোণা আটকে আছে রৌদ্রের রোলেক্স ঘড়ির সাথে । মেয়েটা হুট করেই বাঁধা পড়লো অবাধ্য লোকটার সাথে । ঢোক গিললো । পরিবর্তে ফিচেল হাসলো রৌদ্র । মেঘা তড়িঘড়ি করে ওরনায় টান মারে । ওরনার সাথে ঘড়ি আটকানোর দরুন হাতে ঝাড়া পেতেই দাঁত পিষে ধমকালো রৌদ্র….

” ইডিয়ট , থাপ্পর খাবি বলে রাখলাম । যাওয়ার আগে হাত খুলে নিবি আমার ।
নিজেই ছাড়িয়ে দিলো ওরনার কোণা । মেঘা মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । দম খিচে দ্রুত ছুটলো উপরের দিকে । রৌদ্র ও তাকালো না আর ।
সেই বেপরোয়া ছেলে কে রুখতে পারলো না কেউ । সমস্ত বাঁধা ‌, পিছুটান , কান্নার রোল , মায়ার বাঁধন ‌, সব চিরে সেই ছেলে বেরোলো বাড়ি থেকে । রুবিনা কাবির ভেজা চোখে কেবলই চেয়ে দেখলেন ছেলেকে । বাড়ি থেকে বেরোনোর আগ অবধি ওকে রুখতে কত কসরতই না করলো সবাই । কিন্তু সেই ছেলে পরোয়া করলো না কোনো কিছুর । বেরিয়ে আসলো সে ।
বাইরে অতিথিদের ভিড় ঠেলে প্রধান গেইট পেরোলো । গেইটের বাইরে চকচকে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে । ভেতরে সৌভিক বসে ড্রাইভিং সিটে । রৌদ্র উঠে পড়লো পাশে । আর ফিরলো না বাড়ি পানে । চেয়ে দেখলো না , ওর পিছু পিছু সবাই বেরিয়ে এসেছে ।
গাড়ি স্টার্ট হলো । নিমিষেই স্বাভাবিক স্পিডে কাবির ম্যানসনের গন্ডি ছাড়ালো সেই গাড়িটা । রাতের আঁধারে ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো অদূরে । আড়াল হলো কতশত জোড়া দৃষ্টির ।
ব্যালকনিতে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মেঘা । আঁধারে মিলিয়ে যাওয়া গাড়িটার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে খামচে ধরলো রেলিংয়ের রোলার । চোখ বুজে নিলো অতৃপ্ততায় । দম আটকে দীর্ঘক্ষণ পর ধীরে হাঁফ ছাড়লো । স্থির চিত্ততে অস্থিরতা অদৃশ্যমান । স্বল্প বিধ্বস্ত শরীর ‌। নেতিয়ে আসছে দূর্বলতায় । কোনো রকমে শরীর টা টেনে ধপ করে বারান্দার ইজি চেয়ারটায় বসে পড়লো মেঘা । শরীর টা এলিয়ে দিলো পিছনের দিকে । ঢোক গিলতে গলায় বাঁধছে । হাতের মুঠোয় ফোন,সাথে এয়ার ফোন । মেঘা দ্রুত কানে এয়ার ফোন গুঁজে নিলো । কম্পিত হচ্ছে হাতের সাথে পুরো শরীর । ঠকঠক করে কেঁপে কেঁপে কোনো রকমে মনকে সংযত করতে একটা গান চালালো আন্দাজে । হাঁসফাঁস করে চালিয়েই ফোনটা কোলে ফেলে মাথা এলিয়ে চোখ বুজলো আবার । মৃদু সাউন্ডে হিন্দি গান বাজছে কানে…

“ Meri Dua…… haayee,,,
Sajda teraaa kardi sadaa
Tu sun ikraar Mera,, Main karoon intezaar tera…
Tu Dil tu yun jaaaaan meri…
mein tenu samjha waki
Na tere bina lagda gii….
মেঘা উপহাস করে হাসে নিজের উপর । চোখ খোলে না এক মুহুর্ত । বন্ধ চোখ ছাপিয়ে বাঁ চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পরপর দুই ফোঁটা উষ্ণ তরল । ঠোঁট ভেঙে আসে যন্ত্রণায় । ওষ্ঠপূটে দাঁত বসিয়ে হাত মুঠো করে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে মেয়েটা । লুকিয়ে ফেলে ক্ষোভের আড়ালে লুকায়িত অপ্রকাশিত সব কিছু ।

গাড়ি চলছে পুরো গতিতে । উদ্দেশ্য এয়ার পোর্ট । রৌদ্র সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে রেখেছে ‌সেই থেকেই । সৌভিক কথা বলার চেষ্টা করলেও সাঁড়া পায় নি ওর থেকে । তাই চুপ করেছে সে নিজেও । কিছুদূর যাওয়ার পর রৌদ্রের কড়া স্বরের হুংকার ভেসে আসলো…..
” স্টপ দ্যা কার !
সৌভিক বুঝলো না । এতক্ষণে রৌদ্রের জবানে বাণী শুনে সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করলো…
” হ্যাঁ ?
” গাড়ি থামা !
” কেনো ? এই মাঝ রাস্তায় কি করবি ? এয়ার পোর্ট এখনো দূর আছে….
” থামাতে বলেছি থামা । আই সেইড স্টপ…..
দ্রুত একপাশে ব্রেক কষলো সৌভিক । গাড়ি দাড় করিয়ে রৌদ্রের দিকে ফিরলো । চোখ খুললো রৌদ্র । সোজা হয়ে বসে বললো…..
” নাম গাড়ি থেকে !
” কি বলছিস ? নামবো কেনো ?
” নামতে বলেছি তাই । নাম ।
” কিন্তু কেনো ? দেখ ব্রো, আ’ম কনফিউজড । কি করছিস তুই এসব ? আবার ফিরছিস কেনো সেটাই তো বুঝতে পারছি না আমি ।

” তোকে অতো বুঝতে হবে না । নামতে বলেছি নাম । আর যদি মরার ইচ্ছে থাকে তাহলে বসে থাক ।
” হোয়াট ? রুডি , হোয়াট আর ইউ সেয়িং….?
” শাট আপ ,,, তোকে যা বলেছি তাই কর । নাম গাড়ি থেকে ।
তপ্ত ধমকে চমকালো সৌভিক । রৌদ্রের রক্ত বর্ন চোখ । কথা না বাড়িয়ে সিটবেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো সে । রৌদ্র ফ্রন্ট সিট থেকে ড্রাইভিং সিটে ট্রান্সফার করলো নিজেকে । সৌভিক গাড়ির পাশে দাঁড়ালো । স্টিয়ারিংয়ে দুহাত রেখে সামন পানে তাকায় রৌদ্র । অদুরে একটা ইলেকট্রিক শক্ত পোক্ত পোল দেখা যাচ্ছে রাস্তার ধারে । এ রাস্তায় যানজট ও কম । তাই এ পথ বেছে নেওয়া ।
পোল’টার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দম টানলো বুক ভরে । চোখ বুজে রেখে সেকেন্ড তিনেক বাদ চোখ খুললো ।
মুখ গোল করে শ্বাস ফেলে স্টিয়ারিং ঘোরালো । গাড়ি দাঁড় করিয়েই ব্রেক চেপে একে একে তরতর করে পুরো স্পিড বাড়িয়ে দিলো গাড়ির । সৌভিক জানালা গলিয়ে রৌদ্রের কান্ড দেখে ভড়কায় ‌ ।

” রুডি , কি করছিস ?
ওর কথা শেষ হতে না হতেই ব্রেক ছাড়লো রৌদ্র । ফুল স্পিডে দ্রুত এলোমেলো হয়ে ছুটলো চার চাকার গাড়িটা । গতি বেগতিক হয়ে সোজা ছুটলো পুরো গতিতে । সৌভিক চোখ গোল করে তাকায় । মিনিট দুয়েকের মাথায় ওর চোখ সম্মুখে ঘটে যায় বিভৎস এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা । দ্রুত বেগে এলোপাথাড়ি ছুটে গিয়ে ধাম করে গাড়িটা ধাক্কা খায় সামনের ইলেকট্রিক পোলটায় । বিকট এক শব্দে থমকে যায় আশপাশ ।
ফাঁকা যানজট হীন রাস্তার গুটি কয়েক মানুষ চমকে তাকায় গাড়িটার দিকে । ততক্ষণে গাড়িটার ইঞ্জিন থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে ! সৌভিক বাকরুদ্ধ । চোখে অবিশ্বাস । মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো ওর । তিরতির করে কম্পিত হলো চিত্ত । বৃহৎ অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে থেকে সেকেন্ড কয়েক বাদ অস্ফুটে উচ্চারণ করলো…
” রুডি…..

রৌদ্র বেরিয়ে যাওয়ার পরপর থমথমে হয়ে গেছে পুরো কাবির ম্যানসন । রুবিনা কাবির নিস্তেজ হয়ে চুপটি মেরে ঘরে উঠেছেন ঠিক তখনই । বাড়ি এবং বাইরের পরিবেশ গুমোট । জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে স্তব্ধতার রেশে আঁধার নেমেছে একজনের বেপরোয়া পনার জন্য ।
শিশির আটকে পড়েছে । বেরোতে পারে নি এখনো । কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে সবটা । আটটা বাজতে চললো । এখন আর না বেরোলেই নয় ‌। দেরি হয়ে যাবে নয়তো । বাড়ি থেকে এরমধ্যেই ফোন এসেছে কয়েকবার । শাফাহ্ কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে একপাশে । বললো শিশির….
” শাফাহ্ , দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার । আমি বরং এখন যাই । ভার্সিটিতে আসবি তো দুদিন পর । তখন দেখা হবে আবার । মেঘা বোধহয় রুমে । ওকে বলে দিস আমার যাওয়ার কথা ।
শাফাহ্ কিছু বললো না । ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো শুধু । আদ্র ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নেমে বেরিয়ে যাচ্ছে গটগটিয়ে । শাফাহ্ চোখ তুলে তাকিয়েই কিছু একটা ভাবলো । শিশিরের হাত টেনে দ্রুত পিছু নিলো আদ্রের । বাইরে বেরিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে বসেছে আদ্র । মুখো ভঙ্গিমা বিভৎস নিরেট । রেগে আছে সাংঘাতিক । গাড়ি স্টার্ট করার আগেই শাফাহ্ ডাকলো ….

” ভাইয়া ,,,,
জানালা ভেদে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো আবার….
” বাইরে যাচ্ছো ? শিশির কে নিয়ে যাবে একটু , প্লিজ ? রাত হয়ে গেছে অনেক । ওকে ফিরতে হবে , একা ছাড়ি কি করে ? তুমি ওকে একটু পৌঁছে দেবে ? যাচ্ছোই তো বাইরে !
শিশির তৎক্ষণাৎ বাঁধা দিলো….
” আরে না , প্রয়োজন হবে না । আমি যেতে পারবো । পৌঁছে দিতে হবে না আমায় ।
” তুই চুপ কর । ভাইয়া , পৌঁছে দাও ওকে । একা একটা মেয়েকে এভাবে একলা ছাড়বো ? ও আমার আর মেঘার দায়িত্বে এসেছে , আমাদের রেসপন্সিবিলিটি আছে একটা ।
আদ্র গাড়ি স্টার্ট করে সামন পানে তাকিয়ে গুরু গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করলো ছোট বাক্য….

” উঠতে বল ।
শাফাহ্ চিকচিক করে ওঠে । ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে শিশির কে ঠেলে বসিয়ে দেয় ।
আদ্র আদেশের সুরে বলে না তাকিয়েই….
” তুই মেঘের কাছে যা ।
শিশির কে শেষ বার দেখে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো শাফাহ্ । আদ্র এখনো অবধি একবারও তাকায় নি মেয়েটার দিকে । স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গলা তুঙ্গে তুলে আদেশ করলো….
” সিট বেল্ট বেঁধে নাও ।
মেয়েটা বুঝলো না । অবুঝ চোখে তাকালো । শুধালো না বুঝে….
” সরি স্যার ??
” সিট বেল্ট বাঁধো ।

শান্ত স্বর । ততক্ষণে গাড়ি বেরিয়ে গেছে গেইট পেরিয়ে ।
টেনে টুনে সিট বেল্ট টা কোনো রকমে আটকেছে শিশির । এতো দামি গাড়িতে জীবনে প্রথম বার ওঠা তার । তার উপর ভার্সিটির লেকচারারের সাথে । একেই এনাকে ভয় পায় সবাই । গুরুগম্ভীর হিসেবেই খ্যাত ইনি । শাফাহ্ আর মেঘার বদৌলতে শিশির এনাকে আরো বেশি জানে টুকটাক । ওরা সবসময় বলে আদ্রিয়ান কাবির আদ্র কলেজেই সেই গুরুগম্ভীর । বাকিটা সময় সম্পুর্ন ভিন্ন ।
মেয়েটা গুটিয়ে বসে আছে ।
কেমন জড়তা লাগছে । পিটপিট করে আড়চোখে তাকাচ্ছে মুহুর্ত পর পর । মিনিট কয়েকের মাথায় টুং টুং শব্দে আদ্রের ফোনটা বেজে উঠলো । আটটা বেজে সাত মিনিট চলে । শুভ্র ফোন করেছে । কানে ব্লুটুথ গুজে ড্রাইভিংয়ে মনযোগ রেখেই ফোন রিসিভ করলো আদ্র ।
” হ্যাঁ ভাইয়া , বলো….
ফোনের ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই তড়িতে চোখে মুখে পরিবর্তন আসে আদ্রের । তাৎক্ষণিক শৃঙ্গে উঠলো চোখ সহ কপাল । ভড়কানো অভিব্যক্তি প্রকাশ পেলো নিরেট মুখাবয়বে । সহসা ব্রেক পড়লো গাড়িতে । সশব্দে হাঁসফাঁস করে উচ্চারণ করে আদ্র….
” হোয়াট ??
ওপাশ থেকে আরো কিছু বললো ।
দুলে উঠলো আদ্রের সম্পুর্ন শরীর । কাপলো দৃষ্টি যুগল । কন্ঠ মনি ওঠা নামা করলো ঢোক গেলার সাথে সাথে । খুবলে চেপে ধরলো স্টিয়ারিং । কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করলো বাঁধা ধরা গলায়….
” আ…আমি এক্ষুনি আসছি ভাইয়া !!
ইঞ্জিন চালু হলো পুনরায় । শিশির না বুঝে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে । আদ্রের ভড়কানো অস্থিরতা দেখে পুরোপুরি দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটা । কপালের পাশের শিরা ফুলে উঠেছে আদ্রের ‌। ঘাম গড়িয়ে পড়লে চিবুকের ধার ঘেঁষে । গাড়ির স্পিড বাড়ালো সে । শিশির চোখ গোল গোল করে তাকায় । নড়েচড়ে বসে , ধীরে বলে….

” স্যার , আর ইউ ওকে ?
উত্তর নেই । ধড়ফড় হৃদয় লোকটার । অবস্থা টালমাটাল উচাটন । অবিন্যস্ত হয়ে বারংবার ঢোক গিলছে ।
ব্যাস্ত শহরের ব্যাস্ত রাস্তার বাদ বাকি গাড়ি গুলোকে অতিক্রম করে উদগ্রীব হয়ে ছুটে চলেছে ওর গাড়িটা । গন্তব্য পাল্টে নির্দিষ্ট পথে ছুটেছে , গতি অনিয়ন্ত্রিত । শিশির ভড়কায় আকস্মিক এমন আচরনে । গাড়ির গতি ক্রমশ বাড়তে দেখে মুখ শুকিয়ে আসে মেয়েটার । রাস্তায় যানজট প্রচুর ।
” স্যার , কি করছেন ? স্পিড কমান । অনেক জ্যাম রাস্তায় । এভাবে ড্রাইভিং করছেন কেনো ? স্যার…..
আদ্র গুরুত্বহীন । দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য সে । মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে । শূন্য হয়ে আসছে মস্তিষ্ক । শুকিয়ে আসছে কন্ঠনালি । কম্পন অনুভূত হচ্ছে সর্বাঙ্গে । কি শুনলো ও ? শুভ্র কি বললো ওকে ? চোখ জ্বলছে । কান ঝা ঝা করছে ওর ।
রাস্তার সব গাড়িগুলোকে এলোমেলো হয়ে অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছাতে উদগ্রীব সে । এভাবে গাড়ি চালালে যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটে যেতে পারে ।
শিশির ফের বলে থেমে থেমে….
” স্যার , স্যার প্লিজ আস্তে ড্রাইভ করুন । এভাবে যেকোনো মুহূর্তে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে । ট্রাফিক রুলস বহির্ভূত এতো স্পিডে গাড়ি চালানো । প্লিজ কন্ট্রোল….
” ওওও শাট আপ ,, ঘ্যান ঘ্যান করবে না কানের কাছে । চুপচাপ বসে থাকো…..
তপ্ত ধমকানিতে চমকে ওঠে মেয়েটা । সিটিয়ে যায় জানালার দিকে । আদ্র এলোমেলো শ্বাস ফেলছে । হাঁসফাঁস বেগতিক অবস্থা ।

মেঘা ঘর হতে বেরোয় নি ।
খানিকক্ষণ স্থবির হয়ে বসে থেকে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে । ওয়াশ রুম থেকে বেরোনো মাত্রই মুখোমুখি হলো টুকটুকির । হন্তদন্ত হয়ে হুমড়ি খেয়ে ঘরে ঢুকলো মেয়েটা । মেঘা দেখেও দেখলো না । দৃষ্টি সরালো । টাওয়েল দিয়ে ভেজা মুখ মুছতে মুছতে গতিহীন দাঁড়ালো মিররের সামনে । চোখ তুলতেই আয়নাতেই দ্বিতীয় বার শাফাহ্ কে দেখতে পেলো । দরজার সামনে ঠিক এক জায়গাতেই চিপকে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা । অদ্ভুত একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেঘার পানে । মেঘা কপাল কুঁচকালো । মস্টারাইজার হাতে তুলে সেভাবে তাকিয়েই প্রশ্ন করলো হালকা স্বরে…..
” ওভাবে কি দেখছিস ?
ওষ্ঠ ভেজায় শাফাহ্ । দূর্বল পায়ে এগোয় ছোট ছোট কদমে । বাঁধা গলায় ডাকে থেমে থেমে….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৭

” মে…মেঘা !
” কি হয়েছে ?
” মেঘা , ভাইয়া…..
” ভাইয়া ? কি হয়েছে ভাইয়ার ?
” ভাইয়া নয় ! আদ্র ভাইয়া নয় ‌। রৌ.. রৌদ্র ভাইয়া….
মেয়েটার আধো আধো কম্পিত স্বরে রৌদ্রের নাম শোনা মাত্রই প্রতিক্রিয়া বদলালো তাৎক্ষণিক । মুখ শক্ত করে নিলো । দৃষ্টি নামিয়ে উপেক্ষা করে পাল্টা কিছু শুধালো না আর । ক্ষিয় কাল বাদ শাফাহ্ চুপ থাকতে পারে না । বলেই ওঠে ধরা গলায়…..
” এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে রৌদ্র ভাইয়ার গাড়ির এক্সিডেন্ট হয়েছে মেঘা । ভাইয়া এখন হসপিটালে…..

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here