ডেসটেনি পর্ব ২৮
সুহাসিনি মিমি
” আজই আমাদের চলে যেতে হবে আম্মু!”
সকালের নাস্তার টেবিলে বসেছে সকলে। মেয়ের জামাইয়ের প্লেটে গরুর মাংসের খিচুড়ি সার্ভ করে দিচ্ছিলেন মোহনা। ওমনেই হাতটা থেমে গেলেন ভদ্রমহিলার। থমকে গিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“আজই? এত তাড়াতাড়ি কেন বাবা?”
পাভেল মৃদু হেসে জানাল,
“অনেকদিন তো আপনাদের জ্বালালাম। এবার নিজের বাসায় ফিরতে হবে। অফিসের কাজও জমে আছে খুব। জানেন তো আজকালের ছেলেমেয়েরা একেকটা কাজ ফাঁকি দেয়ার উস্তাদ।”
“আরো ক’টা দিন থাকলে কী হতো?তোমরা এলে শূন্য বাড়িটা ভরাট হয়ে যায়। চলে গেলে বাড়িটা আবার ফাঁকা, শূন্য হয়ে পড়ে থাকবে।”
পাভেল কিছু বলার আগেই সায় দিলেন দাদিও,
“আসলে আমরাও তো অনেকদিন হইয়া গেল আইছি। বাড়িঘর ফাঁকা রাইখা কতদিন থাকা যায় কও? এখন ফিরা যাওনটাই ভালো।”
“আপনি থাকলে আমার তো বরং ভালোই লাগে খালা। বাড়িটা জমজমাট থাকে।”
“সেইডা আমি বুঝি মা। কিন্তু নিজের বাড়িরও তো একটা টান থাকে। তার উপর পাভেলের অফিস যাওন লাগবো। প্রিয়ডারও তো সামনে পরীক্ষা। কয়দিন যাবৎ ভার্সিটিতেও যাইতে পারেনা। তুমি বরং আমাদের লগে লও। কয়দিন থাইক্কা আইও নে!”
“না খালা। আমি গেলে মেয়েটা একা হয়ে যায়। ছোট মানুষ একা থাকতে ভয় পায়!”
“তাও কথা।”
এদিকে পুরো সময়টাতে প্রায় চুপচাপ বসে ছিল প্রিয়ন্তী। মাথা নিচু করে দ্রুত খাবার তুলছে মুখে। যেন কোনো জরুরি কাজ পড়ে আছে ওর । খাওয়া শেষ করেই উঠে যাবে এমন তাড়া। আসলে তাড়াটা অন্য কিছুর।লোকটার মুখোমুখি না হওয়ার। গতকাল যেই ঘটনা হয়েছে এরপর তো আরও নয়। মূলত গতকাল রাতেই প্রিয়ন্তী পাভেলকে জানায় সে বাড়ি ফিরে যেতে চায়। উদাহরণস্বরূপ সামনে পরীক্ষা এমন এক্সকিউস দাঁড় করালে পাভেলও সায় জানায় তাতে। বোনের কথার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেই আজ সকালেই চলে যাবে ওরা।
মিতালীর মুখটাও আজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ফ্যাকাশে। খাওয়ার প্রতি কোনো মনোযোগ নেই বললেই চলে। চুপচাপ প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করছে শুধু।মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মোহনা বেগম হঠাৎ বিষণ্ন গলায় বললেন,
“ছেলেটাও চলে গেল। এখন তোমরাও চলে যাবে।”
কথাটা শুনতেই চামচের নড়ন থামালো মিতালীর। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভাইয়া চলে গেছে মানে? কোথায় গেছে?”
“সকালে ফজরের পরই তো বের হয়ে গেল। বলল নাকি খুব জরুরি কাজ পড়ে গেছে।”
” আমাকে একবার বলেও গেলোনা ভাইয়া?”
আনমনে বিড়বিড় করে আওড়াল মিতালী। কি যেন ভাবল অনেক্ষন। এর মাঝেই মোহনা বেগম ফির আফসোসের সুরে বললেন,
“সত্যি বলতে কী, তোমরা আসার পর বাড়িটা কতটা জমজমাট হয়ে উঠেছিল, সেটা তোমরা চলে গেলে বুঝব।”
পাভেল হেসে বলল,
“আরে আম্মু, এমনভাবে বলছেন কেন? আমরা কি আর দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি? সময় পেলেই চলে আসব।”
ওদিকে তাজধীর চলে গেছে কথা শুনতেই খাবার চিবানো থামল প্রিয়ন্তীর। শক্ত হয়ে গেল হাতের আঙ্গুলগুলো। লোকটা চলে গেছে?কী এমন জরুরি কাজ পড়ল যে কাউকে না জানিয়ে হুট্ করে এভাবে চলে গেলো? গতকাল রাতের ব্যবহারের জন্য একটা বারও অনুতপ্তবোধ টুকুও করল না? এতটা দাম্ভিকতা লোকটার ভিতর? অথচ কই সারাটা রাত ছটফট করে কেটেছে ওর। ঘুমাতে পারেনি এক ফোটাও। কোথাও একটা সুক্ষ অপরাধবোধ কাজ করছিলো ভিতরে ভিতরে। তখন চড়াও হয়ে অনেক কটু কথা বলেদিয়েছিল কিনা! এখন মনে হচ্ছে একদম উচিত কাজ’ই করেছে ও। ভেবেই পরক্ষণেই নিজের মনকেই ধমক দিল। লোকটা কোথায় গেল, কী করল, তাতে তার কী?বরং ভালোই হয়েছে।অন্তত সামনে পড়লে আর সেই বিরক্তিকর মুখটা দেখতে হবে না।অকারণে খোঁচা দেওয়া কথা শুনতে হবে না। অপমানিতও হতে হবে না।এই তো চেয়েছিল ও।
তবুও কেমন যেন একটা অসস্তি কাজ করছে ভিতরটায়। যার কোনো সঠিক যুক্তি নেই। কোনো ব্যাখ্যাও নেই।প্রিয়ন্তী দ্রুত পানির গ্লাস নিয়ে একটানে অনেকটুকু পানি খেলো। তারপর নিজের অস্বস্তিটাকে জোর করেই ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক মুখে আবার খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল।
ঘড়ির কাঁটা নয়টা পেরিয়েছে অনেক্ষন। যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে হলরুমে বসে আছে পাভেল।ওর সামনেই সেন্টার টেবিলের উপর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম গরম আদা চা।সেখান থেকে উঠিয়ে এক হাতে কাপ ধরে চুমুক বসিয়ে আস্তে ধীরে ফোন স্ক্রলিং করছে। কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো প্রিয়ন্তী। এসে পাভেলের পাশের সোফাটায় বসতে বসতে বলল,
“আর কতক্ষণ?”
“তোর ভাবি আসুক আগে।”
প্রিয়ন্তী বিরক্ত মুখে ঘড়ির দিকে তাকাল।বিড়বিড় করে বলল,
“ভাবির রেডি হতে তো যুগ লেগে যায়।”
“এই কথা ওর সামনে বলিস না।”
“কেন?”
“কারণ এরপর পুরো রাস্তা জুড়ে আমার কান ঝালাপালা করবে।”
কথাটা ফোন স্ক্রলিং করতে করতেই বলল পাভেল। ফিক করে হেসে দিলো প্রিয়ন্তী। তখনি সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেল মিতালীকে। হাতে একটা ছোট ব্যাগ। সেটার ভিতর চেক করতে করতে নামছে সিঁড়ি বেয়ে। ওদিকে হঠাৎই স্ক্রল করতে করতে কী একটা দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠল পাভেল। আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“ইস!”
ততক্ষনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে মিতালী। স্বামীর পাশ ঘেঁষে বসতে বসতে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”
“আর বোলো না। আজকাল দেশের যা অবস্থা! এখন তো বাড়ির বাইরে বের হতেও ভয় লাগে। কখন কার সঙ্গে শেষ দেখা হয়ে যাচ্ছে, কেউ বলতে পারে না।”
“মানে?”
“এই ছেলেটাকে দেখলাম শিহাবের বোনের বিয়ের দিন। কী হাসিখুশি একটা ছেলে! দেখতে একদম নায়কদের মতো। অথচ আজকে…”
কথা শেষ না করেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল পাভেল।
মিতালী কৌতূহলী হয়ে আরেকটু এগিয়ে বসল। ঝুকে গিয়ে বলল,
“কী হয়েছে খুলে বলো তো?”
পাভেল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল,
“কাল রাতে বাইক নিয়ে বের হয়েছিল। সকালে খবর বেরিয়েছে। একটা বড় মালবাহী ট্রাকের সঙ্গে ভয়ংকর এ ক্সিডেন্ট করেছে। ট্রাকটা নাকি সরাসরি বাইকের ওপর দিয়েই চলে গেছে।”
“ইন্না লিল্লাহ…”
অস্ফুট স্বরটা বেরিয়ে এলো মিতালীর মুখ থেকে।
পাভেল গম্ভীর গলায় বলল,
“বাইকটা একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। আর ছেলেটার অবস্থা তো আরো করুন। লাসটাও চেনার উপায় নেই। কোনো কিছুই নাকি অক্ষত নেই। বুঝতে পারছো কি অবস্থা হয়েছে?”
মিতালীর মুখটাও কেমন ফ্যাকাশে হয়ে এলো। বলল,
“দেখি তো? কোন ছেলেটা?”
পাভেল ফোনটা এগিয়ে ধরল সামনে।
“তুমিও হয়তো দেখেছিলে। সেদিন ভিড়ের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি।শিহাবের বোনের চাচাতো দেবর। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। অকালেই যেমন ঝরে গেল প্রাণটা!”
মিতালী ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল কাছ থেকে। মিতালীর পাশেই বসা ছিল প্রিয়ন্তী। প্রথমে বিশেষ আগ্রহ না দেখালেও ভাবীর পাশ ঝুকে সেও তাকাল স্ক্রিনে। অমনি মুখটা কেমন বিষাদ আর ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করল।স্ক্রিনে পাশাপাশি দুটি ছবি।একটাতে ছেলেটার স্বাভাবিক হাসিমাখা মুখ।অন্যটাতে দুর্ঘটনার পরের ছবি। ছি ন্নবিন্ন হয়ে পড়ে থাকা দেহাবশেষ! এক পলক দেখেই শরীরের ভেতর কেমন শিরশিরে একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল প্রিয়ন্তীর। সময় নিয়ে আর তাকানোর সাহসটুকু সঞ্চয় হলোনা।
ছেলেটাকে চিনতে একটুও সময় লাগল না ওর।
এটা তো সেই ছেলে!কমিউনিটি সেন্টারে যে ওর সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছিল।
কপালে কেমন ঘাম জমল চিকচিক করে।হাতের তালু দুটোও ঠান্ডা হয়ে গেছে।মিতালীও তখন স্তম্ভিত হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আফসোস করল,
“হায়!আল্লাহ!”
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে নিজেদের বাড়িতে ফিরেছে পাভেল,মিতালী,প্রিয়ন্তী আর দাদী। যাত্রার ক্লান্তি সবার শরীরেই বইছে। তাইতো বাড়ি ফিরেই ফ্রেশ হয়ে যে যার রুমে ঢুকেছে বিশ্রামের উদ্দেশ্য।নিজের রুমে ফিরেই বড় করে একটা হাফ ছাড়ল প্রিয়ন্তী। কয়েকদিন পর নিজের ঘর, নিজের বিছানায় শোয়ার স্বস্তিটাই আলাদা।অন্যরকম একটা ফিলিংস!
আজ ভার্সিটিতেও যাওয়া হয়নি ওর। তাছাড়া গত ক’দিনে এতকিছু ঘটেছে যে শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।ফলে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল মেয়েটা।এভাবেই পার হলো ঘন্টা খানেক।গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন প্রিয়ন্তীর ফোনটা যে কতক্ষন যাবৎ একনাগাড়ে বেজেই চলেছে তার কোনো হিসেব নেই। ফোন সাইলেন্ট করে ঘুমানোটা ওর পুরোনো অভ্যাস।একবার, দুইবার করে পরপর গুনে গুনে স্ক্রিনে জমা হলো প্রায় সতেরোটা মিসড কল ! সবগুলোই একই নাম থেকে আসা।শ্রেয়া।
বান্ধবীর থেকে এতক্ষনে একবারও রেসপন্স না পেয়ে এবারে বিরক্ত শ্রেয়া দাঁত করমড় করে উঠল। রিকশা থেকে নেমে প্রিয়ন্তীদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও শেষবারের মতো কল করল বান্ধবীকে।এবারেও কল বাজতে বাজতে কে টে গেল।যথারীতি কোনো সাড়া মিলল না।বিরক্তিতে দাঁত কিঁচিয়ে ফোনটা নামাল মেয়েটা।বিড়বিড় করতে করতে সোজা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখতে পেল মিতালী সোফায় বসে টিভি দেখছে।শ্রেয়াকে দেখে মিতালী অবাক হয়ে বলল,
“আরে শ্রেয়া! কখন এলে?”
“এই তো এখনই।”
“এসো,বসো।কি খবর তোমার?”
“বসতে আসিনি ভাবি। আগে বলো তো প্রিয় কোথায়?”
“রুমে আছে।ঘুমাচ্ছে বোধহয়। কিছু হয়েছে নাকি?”
এর বেশি কিছু শোনার প্রয়োজন মনে করল না শ্রেয়া।সরাসরি সিঁড়ি বেয়ে ধুপধাপ পা ফেলে উঠে চলে গেল মিতালীর দৃষ্টি সীমার বাইরে। সোজা এসে থামলো বান্ধবীর কক্ষের সামনে।ভেতরে ঢুকেই দেখতে পেল মেয়েটা একেবারে নিশ্চিন্ত মনে কম্বল জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। শ্রেয়ার এমনিতেই মাথা গরম।
সোজা গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল এবার,
“এই প্রিয়!উঠ! উঠ মাইয়া।”
উহুম! মেয়েটা উঠা তো দূর নড়ল চড়ল না অব্দি। দিব্বি পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। যেমন কত রাত নির্ঘুম কাটিয়ে অবশেষে শান্তির একখান ঘুম দিয়েছে। বান্ধবীর এহেন অবস্থায় শেষমেশ বিরক্ত হয়ে কম্বল ধরে টান দিল শ্রেয়া।
“উঠ! ওঠ বলছি!”
এবারে কাজ হলো কিছুটা। প্রিয়ন্তী কুঁকড়ে গিয়ে আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করে কম্বল পেঁচিয়ে নিলো শরীরে। ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে বলল,
“উফফ! কী হয়েছে?”
“কী হয়েছে মানে? এখানে আমার জীবন নিয়ে টানাটানি আর তুই পড়ে পড়ে আরামসে মতো ঘুমাচ্ছিস!”
বলতে বলতেই টেনে হিচড়ে উঠিয়ে বসাল মেয়েটাকে। চোখদুটো এখনও আধবোজা প্রিয়ন্তীর।এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে হাই তুলে বলল,
“তুই এখানে? কখন এলি?”
“এইমাত্র এসেছি।”
“কেন?”
“কেন এসেছে সেটা পড়ে বলি। এখন বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি রেডি হ। বাইরে বের হব আমরা।”
“বাইরে বের হব মানে?কোথায় যাব?”
“আমার সাথে যাবি তুই।”
“সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু যাবো টা কোথায় ?”
“সেটা গেলেই দেখতে পাবি।”
“কোথাও যাচ্ছিনা আমি। তোর দরকার হলে তুই যা। আমায় ঘুমাতে দে প্লিজ!”
“যাবিনা মানে? তুই যাবিনা তোর ঘাড় যাবে। জলদি উঠ। উঠে রেডি হ। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেরোবো আমরা।”
প্রিয়ন্তী এখনও পুরোপুরি ঘুমঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময় নিয়ে শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই পাগল হয়ে গেছিস?কিসব আবোল তাবোল বকছিস? যে পর্যন্ত না বলবি কোথায় যাবি, আমি এক পা ও নড়ছি না।আর কি হয়েছে তোর? চেহারা এমন লাগছে কেন?”
শ্রেয়া তখন আলমারি খুলে একটা ড্রেস বের করে ধরিয়ে দিয়েছে প্রিয়ন্তীর হাতে।
“এত বেশি কথা বলিস না। আমার কাছে সময় নেই। প্লিজ, তাড়াতাড়ি রেডি হ।”
“কিন্তু,
“নো কিন্তু। পাঁচ মিনিট।”
শ্রেয়ার মুখের ভাব দেখে আর তর্ক করার সাহস পেল না প্রিয়ন্তী। বাধ্য মেয়ের মতো ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
সত্যি সত্যিই পাঁচ মিনিটের মধ্যে কোনোমতে রেডি হয়ে বেরোতেই শ্রেয়া ওর হাত চেপে ধরল।
“চল।”
“আরে কোথায় যাচ্ছি সেটা তো এটলিস্ট বলবি?”
“যেতে যেতে বলছি। আয় দ্রুত।”
বলেই প্রায় টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামিয়ে আনল বান্ধবীকে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই চিৎকার করে বলল,
“ভাবি! প্রিয় আমার সঙ্গে যাচ্ছে। আমি বাসায় ড্রপ করে দিয়ে যাব। আমাদের আসতে একটু লেট হবে।”
মিতালীর উত্তর শোনারও প্রয়োজন মনে করল না।
তার আগেই প্রিয়ন্তীকে নিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সিএনজি থামাল শ্রেয়া।দুজন উঠে বসতেই সে তড়িঘড়ি করে বলল,
“মামা, মিরপুর বেরিবাঁধ চলেন। আরেকটু জোরে চালাইবেন। একদম সর্বোচ্চ স্পিডে!আজকে হাতেনাতে ধরবো শালারে!”
“মাথা খারাপ তোর? এক্সিডেন্ট করে মা রতে চাস নাকি আমাদের?আর কাকে ধরবি হাতেনাতে?
“কাকে আর! ওই হারামির বাচ্চাকে!”
“শ্রেয়া এক্সাক্টলি তুই বলবি এবার কাহিনীটা কি? আর আমরা কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি?”
ফোঁসফোঁস করে বলে উঠল প্রিয়ন্তী। শ্রেয়া বারবার সময় দেখছে ফোনের স্ক্রিনে।ওখানে চোখ রেখেই রুক্ষ, ক্রুদ্ধ স্বরে চেচিয়ে উঠল,
“কি হয়েছে মানে? ওই বেইমানটা আমার সাথে ডাবল টাইমিং করছে!”
প্রিয়ন্তী হতভম্ব হয়ে বলল,
“কি?কোন বেঈমান?কি করেছে? কার কথা বলছিস?”
“কে আবার শুভ! সালা দুজনের সাথে ডাবল টাইমিং করছে। আজকে শালাকে একদম হাতে নাতে ধরব।”
” তুই কীভাবে জানলি?”
শ্রেয়া ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
“আজ দুপুরে খবর পাইছি। আমার এক পরিচিত ওদের দুজনকে একসাথে মিরপুর বেরিবাঁধে দেখছে। হাতে হাত ধইরা ঘুরতেছে লাইলী মজনু!”
“হতে পারে ভুল দেখছে?”
“ভুল দেখছে না। ছবিও পাঠাইছে।”
বলেই ফোনটা এগিয়ে দিল।প্রিয়ন্তী ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকল।সত্যিই দূর থেকে একটা ছেলে আর মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। যদিও মুখ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।তবুও শ্রেয়ার রাগের মাত্রা দেখে মনে হচ্ছে সে পুরোপুরি নিশ্চিত।
“আচ্ছা এক মিনিট!তুই তো কখনো উনাকে হ্যা বলিসনি।তাহলে এত সিরিয়াস হচ্ছিস কেন?”
শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
“হ্যাঁ বলিনি,তোকে। মনে মনে তো ঠিকই হ্যা বলে দিয়েছি। মানে তুই বুঝ শালারে আমি দুই মাস ধরে ঝুলাইতেছি!ও আমারে প্রতিদিন মেসেজ দিবে, কল দিবে, প্রেমের ডায়লগ মারবে আর পিছনে আরেকজন নিয়া ঘুরবে?”
“কিন্তু তুই তো রাজিও হসনি!”
“রাজি হই নাই ঠিক আছে। কিন্তু বেইমানি করার লাইসেন্সও তো দেই নাই!”
প্রিয়ন্তী কপালে হাত ঠেকাল।
“তোর যুক্তি আমার মাথার উপর দিয়া যাচ্ছে। কি বলছিস কিছুই তো বুঝতে পারছি না।একটু বুঝিয়ে বলবি? শুভ ভাইয়ের সঙ্গে তোর রিলেশন চলছে কবে থেকে? আর তুই আমাকে এই ব্যাপারে কিছু জানাস নি কেন এতদিন?”
“যাক! আমার মাথায় ঢুকছে, এটাই যথেষ্ট।এখন চুপ থাক। অতিরিক্ত টেনশনে এমনিতেই মেজাজ হাই হয়ে আছে। ওই হারামির রাগ নাইলে তোর উপর ঝাড়বো।”
প্রিয়ন্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।সিএনজিটা ততক্ষণে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলেছে মিরপুর বেরিবাঁধের দিকে। শ্রেয়া বারবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে অস্থিরভাবে পা নাড়িয়ে যাচ্ছে।
যেন সামনে কোনো যুদ্ধ অপেক্ষা করছে।আর সে যুদ্ধ সেই জিতেই দম নিবে। তার আগে নয়।
মিরপুর বেরিবাঁধে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল প্রায় গড়িয়ে এসেছে। সিএনজিটা থামার সঙ্গে সঙ্গেই তড়িঘড়ি করে ভাড়া মিটিয়ে ফেলল শ্রেয়া। তারপর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই প্রিয়ন্তীর হাত চেপে ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল ভেতরের দিকে।
“আরেহ! আস্তে! মানুষ নাকি বস্তা টানছিস, শ্রেয়ার বাচ্চা?”
“চুপ করে আয়তো !”
“আমি পড়ে যাব তো বা ল!”
“পড়লে টেনে উঠাবো। এখন চল।”
প্রিয়ন্তী বিরক্তিতে মুখ বাঁকাল।এদিকটায় এর আগে কখনো আসেনি প্রিয়ন্তী। পশ্চিম আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে কমলা আর সোনালি আভা। দূরে বিশাল জলরাশি। সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে তা।এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট চায়ের দোকান, ভ্রাম্যমাণ ফুচকার স্টল, ভুট্টা বিক্রেতা আর অসংখ্য মানুষের আনাগোনা। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, আবার কেউ নির্জনতা খুঁজে একটু দূরের গাছগাছালির আড়ালে বসে আছে।
বাঁধের একপাশে জলরাশি হলেও অন্যপাশে ঝোপঝাড়, বুনো গাছপালা আর খানিকটা জঙ্গলঘেরা নিরিবিলি এলাকা। আর সেই জঙ্গলঘেরা অংশেই গোয়েন্দা সেজে নেমেছে শ্রেয়া। বারবার এদিক সেদিক খুঁজে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে।প্রিয়ন্তীর মনে হচ্ছে ওর বান্ধবী বয়ফ্রেন্ড কে নয় বরং কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধীকে ধরতে এসেছে।
একটা সময় হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে উঠল প্রিয়ন্তী।
“শ্রেয়া, বইন আমার পক্ষে আর সম্ভব না!আমি আর পারছি না।”
“চুপ করে আয়।”
“সত্যি বলছি। আমার পক্ষে সম্ভব না বইন। তুই খোঁজ।”
বলে কাছের একটা সিমেন্টের বসার জায়গায় ধপাস করে বসে পড়ল ও। শ্রেয়া অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল।চোখ কপালে তুলে বলল,
“মানে, কি?বান্ধবীর এই অসময়ে তুই এই কথা বলছিস?তুই বুঝতে পারছিস আমার মনের অবস্থা?”
বসে থাকা অবস্থাতেই কোমরে ডু হাত চেপে খিটমিটিয়ে বলল প্রিয়ন্তী,
“ঠিকই আছে। আরো কর রিলেশন আমাকে না জানিয়ে। একদম ঠিক হয়েছে।”
“নে, নে মজা নে আমার সঙ্গে।দেখিস, তোর ভাগ্যেও যেন এরকম না হয়। তখন বুঝবি কেমন লাগে।”
“প্রথমত, আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নাই। দ্বিতীয়ত, থাকলেও আমি তোর মতো গোয়েন্দাগিরি করে বেরিবাঁধ চষে বেড়াতাম না।ওরকম ছেলেকে হ্যা বলতে গিয়েছিলি কোন আক্কেলে শুনি? দেখতেই তো কেমন দুই নাম্বার লাগে।”
“বড় বড় কথা বলিস না।ভালোবাসা বলে কয়ে হয়না। এমনিতেই হয়ে যায়।”
“এমন ভালোবাসার খেতায় আগুন। তুই খোঁজ তোর ভালোবাসা কে। আমার পক্ষে সম্ভব না।”
শ্রেয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে।তুই এখানে ওয়েট কর।আমি দেখছি আশেপাশে খুঁজে!”
“আচ্ছা!”
“এখানেই থাকিস কিন্ত। কোথাও যাবি না।আমি যেন ফিরে এসে এখানেই পাই তোকে।”
“যাব না।”
প্রিয়ন্তী মাথা নেড়ে সায় দিলো।হঠাৎ কী যেন মনে হতেই আবার জিজ্ঞেস করল,
“তুই শিওর তো এখানেই এসেছে?”
শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“শিওর না হয়ে আমি তোকে নিয়ে এখানে আসছি নাকি?”
“আচ্ছা আচ্ছা।”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না শ্রেয়া।ঝড়ের বেগে আবার হাঁটা ধরল সামনে।প্রিয়ন্তী কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বান্ধবীর পেছনে ছুটে চলা অবয়বটার দিকে।
তারপর মাথা নাড়িয়ে হেসে ফেলল।বিড়বিড় করে আওড়াল,
“পাগল ছাগলের দল একটা!”
বলে পেছনে হেলান দিল।বিকেলের কোমল বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল ওর মুখজুড়ে। দূরে কোথাও কয়েকটা পাখি আকাশ কে টে উড়ে যাচ্ছে। চারপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও এই মুহূর্তে নিজেকে অদ্ভুত শান্ত লাগছে ওর।
সময় কতটা পেরিয়েছে ঠিক খেয়াল নেই প্রিয়ন্তীর।
প্রথমদিকে বসে বসে আশেপাশের মানুষজন দেখল।যতদূর চোখ যায়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে যুগলদের আনাগোনা। কেউ ঝোপঝাড়ের আড়ালে, কেউবা লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেদের ছোট্ট জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। বিরক্তই হলো প্রিয়ন্তী। কিছুক্ষণ ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করল। এভাবে অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরোও বান্ধবীর দেখা মিলল না আর।
আকস্মিক আকাশটাও কেমন বদলে গেল। গুমগুম শব্দ তুলে ডাকতে লাগল মেঘ। এযাত্রায় প্রিয়ন্তী চমকে মাথা তুলল।চাইলো খোলা বিস্তর আকাশের পানে। আকাশের অবস্থা ভালো না।কয়েক মুহূর্ত আগেও পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলোটুকু দেখা যাচ্ছিল। অথচ এখন ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে প্রায় পুরো আকাশ। বৃষ্টিহিনা বজ্রধ্বনি শুনতে পেল আরেকটা।ক্রমশই চারোপাশ কেমন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে যেন। এমনিতেই বিকেল শেষের দিকে।
তার উপর মেঘে ঢেকে যাওয়ায় আলো আরও কমে এসেছে। প্রিয়ন্তী এবার ভালো করে চারপাশে তাকাল।
অদ্ভুতভাবে জায়গাটা আগের চেয়েও অনেক বেশি নির্জন লাগছে।যেসব পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর ঘুরতে আসা মানুষজন কিছুক্ষণ আগে চারপাশে ছিল, তাদের অনেকেই চলে গেছে। কিছু দোকানও গুটিয়ে ফেলছে তাদের জিনিসপত্র।বাতাসের গতিও বেড়েছে।গাছের পাতাগুলো শো শো শব্দ তুলে দুলছে।প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল আচমকাই।শ্রেয়া কোথায়?মেয়েটা তো বলেছিল একটু দেখে আসবে। কিন্তু সেই একটু তো অনেক আগেই পার হয়ে গেছে।ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী। ডানে বামে তাকাল। খুঁজল বান্ধবীকে।তবে
কোথাও দেখা নেই মেয়েটার। আশ্চর্য!এমন আবহাওয়াও মেয়েটা ফিরে আসছে না?উদ্বেগের সূক্ষ্ম একটা রেখা ফুটে উঠল। আরও কয়েক মিনিট অপেক্ষা করল সেখানে দাঁড়িয়ে।
তবে এবারেও এলোনা মেয়েটা। এবার সত্যি সত্যিই অস্বস্তি হতে শুরু করল ওর। সাথে ভয় ও। ভয় অসস্তি থেকে জন্ম নিলো রাগ। উদ্বেগী হয়ে ভাবল,
ওর আবার কোনো বিপদ-টিপদ হলো না তো?কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
না না।শ্রেয়ার মতো মেয়ের কিছু হবে কেন?শ্রেয়া তো ওর থেকেও বেশি সাহসী, স্ট্রং। নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল প্রিয়ন্তী।কিন্তু তাতেও শান্ত হতে পারছেনা মন। কারণ চারপাশের পরিবেশটাই কেমন যেন অস্বস্তিকর লাগছে হুট্ করে।
ঝোপঝাড় গুলো কেমন আরো ভয়ানক লাগছে দেখতে। বাতাসটা পর্যন্ত কেমন ঠান্ডা হয়ে গেছে।
প্রিয়ন্তী দ্রুত ভাবল শ্রেয়া কে কল দিবে। কিন্তু স্ক্রিন অন হতেই মুখটা মলিন হয়ে গেল।ফোনের কালো স্ক্রিনে ভেসে উঠল মাত্র একটিই বার্তা।ব্যাটারি এম্পটি।তারপরই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল ফোনটা।মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। এরপর বিরক্তিতে কপালে হাত ঠুকল।
“ধুর!আজকেই মরতে হলো ব্যাটারিটাকে?”
রাগে-ক্ষোভে প্রায় দাঁত চেপে বলে উঠল। ফোনটা ঝাঁকিয়ে আবার চালু করার চেষ্টা করল।কোনো লাভ হলো না তাতে।এবার সত্যি সত্যিই নিজের ওপর রাগ হতে লাগল ওর। মনে মনে অন্তত দশবার শ্রেয়ার গুষ্টি উদ্ধার করল,
“বা লের মাইয়া ! নিজে কোথায় উধাও হয়েছে তার ঠিক নেই, আমাকে এনে ফেলে গেছে জঙ্গলের মধ্যে!”
বিরক্তিতে গজগজ করতে করতেই অবশেষে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। বসে থাকলে হবে না।শ্রেয়াকে খুঁজতে হবে।কিন্তু যতই এগোতে লাগল, ততই বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা বাড়তে লাগল।মিরপুর বেরিবাঁধের মূল অংশে মানুষের আনাগোনা থাকলেও এই দিকটায় পরিবেশটা সম্পূর্ণ আলাদা।এখানে বড় বড় কাশবন,ঝোপঝাড় আর বুনো ঘাসে ভর্তি।কোথাও কোথাও সরু কাঁচা পথ সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে ভেতরের দিকে। দূরে জলরাশির কালচে রেখা দেখা যাচ্ছে।তবে সেদিকে জনমানবের চিন্হ নেই।
তারউপর মাথার উপরে জমাট বেঁধে আছে ঘন কালো মেঘ।চারপাশে তাকিয়ে প্রিয়ন্তীর মনে হলো সে কি আটকা পড়ে গেছে?কোন দিক দিয়ে এসেছিল, কোন দিকে রাস্তা, ভুলে বসল সবটা। আগাম ভয়ে হিম হয়ে এলো শরীর।
দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো জনমানবের চিহ্নও চোখে পড়ল না, পড়ছে না।অজান্তেই ওড়নাটা বুকের কাছে আরও শক্ত করে চেপে ধরে ডাকল বান্ধবীকে,
“শ্রেয়া!শ্রেয়া। কই তুই মাইয়া?”
আসেপাশ থেকে ভেসে এলোনা কোনো উত্তর। বান্ধবীর জন্য চিন্তায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল ওর। চিন্তিত হয়ে দিকবেদিকশুন্য হয়ে ছুটল অনেক্ষন।
সময় যত যাচ্ছে, আকাশ তত অন্ধকার হয়ে উঠছে।একই সাথে বাড়ছে বাতাসের বেগও।প্রিয়ন্তীর কলিজাটা শুকিয়ে গেল। এসব ব্যাপারে মেয়েটা খুবই ভীতু। উপরন্তু জায়গাটা একদমই ওর অপরিচিত। যার কারণে ভয়টা আরো গ্রাস করছে বেশি। এভাবেই আর কিছুদূর হেটে সামনে এগোতেই আচমকা থেমে গেল ওর পা। চোখ আটকে গেল সামনের দিকে।
কালো জলরাশির অন্তরমুখী হয়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।লম্বা,সুদৃঢ় পুরুষালি এক অবয়ব।
পিঠটা ওর দিকেই ফেরানো। কানের পাশে ফোন চেপে ধরে কারও সঙ্গে কথা বলছে মানব।
গায়ে নিখুঁতভাবে ফিট করা চারকোল ধূসর রঙের ফরমাল স্যুট।এক হাতে মোবাইল।অন্য হাতে ভাঁজ করে রাখা কালো কোট।বিকেলের ম্লান আলো আর মেঘলা আকাশের নিচেও লোকটার ব্যক্তিত্ব আলাদা করেই চোখে পড়ছে। প্রিয়ন্তীর কাছে অতিমাত্রায় পরিচিত মনে হলো সেই অবয়বটা।
ডেসটেনি সারপ্রাইস পর্ব
অন্যদিকে প্রিয়ন্তী লোকটার পিছনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই লোকটা কিভাবে যেন বুঝে ফেলল। নিজের পিছনে কারো উপস্তিতি টের পেয়ে ফোন কানের পাশ থেকে নামিয়ে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল উল্টো দিকে। অবিশ্বাষ্য দুই জোড়া চোখ আটকালো একে ওপরের সঙ্গে। অমনি বেশি মাত্রায় বিস্ফোরিত হয়ে উঠল প্রিয়ন্তী। অপ্রত্যাশিত বিস্ময় নিয়ে প্রিয়ন্তী’ই আগেভাগে বলে উঠল,
“আ আপনি এখানে?”
