যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৬
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
আজ সেই শুভ দিন কিংবা অশুভ দিন যেটাই বলি না কেন, মূল কথা হলো আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসার দিন। বাড়িতে আজ তাই বিরাট আয়োজন। চাচিমনি রান্নার কাজে ব্যস্ত। তাকে সাহায্য করতে ছোটো চাচিমনিও এসেছেন। সিনথিয়া আপু এসেছে আমাকে সাজিয়ে দিতে।
আমাকে দেখতে আসার বিষয়টা এখনো ঠিকমতো আমারই হজম হয়নি। তাই বন্ধুদেরও কিছু জানানো হয়নি এখনো। বাইরের মানুষজনও জানে না কিছু। চাচিমনি বলতে নিষেধ করেছেন। এতে নাকি মানুষের নজর লাগে। একই চাচিমনির আফসোসের শেষ নেই যে, না জানি কার নজরে তার ছেলেটা বিগড়ে গিয়ে এখন বিয়ে করতে চাচ্ছে না। আমার কাছে একটা গোপন তথ্যও আছে। চাচিমনি গোপনে কবিরাজ খুঁজছেন এটা জানার জন্য যে, কেউ আবার সত্যি সত্যি তাবিজ করে রাহাত ভাইয়ের বিয়ে আটকে রেখেছে কিনা। চাচিমনিকে কিন্তু একদম সেকেলে বলা যাবে না। তিনি খুব স্মার্ট। তীক্ষ্ণ তার বুদ্ধি। শুধু ছেলের টপিক এলেই তিনি কেন জানি জ্ঞানহীন ,হতবুদ্ধি হয়ে যান।
যাই হোক, এত ব্যস্ততার মাঝে রাহাত ভাইয়ের কোনো খবর নেই সকাল থেকেই। চাচ্চু এবং চাচিমনি দুজনই তাই ভীষণ রেগে আছে রাহাত ভাইয়ের ওপর। তাদের ভাষ্যমতে রাহাত ভাই একটা স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলে।
“প্রিয়তা, তুমি এই মেরুন জামদানিটা পরবে?”
আমি আবোলতাবোল কী ভাবছিলাম,ঠিক মনে নেই। সিনথিয়া আপুর প্রশ্নে হুঁশ এলো। বললাম,
“শাড়িটা তো বেশ সুন্দর।”
“তাই না? এটা আমার শাড়ি। একদম নতুন। এখনো ভাঁজও খুলিনি। তুমিই আজ শাড়িটা পরে উদ্ভোবন করো।”
“সে কী আপু! তা আবার হয় নাকি? তুমি এই শাড়ি রেখে দাও। আমি চাচিমনির অন্য একটা শাড়ি পরে নেব।”
“এত কথা বলো কেন? আমি যা বলেছি তাই হবে। ওকে?”
“ওকে।”
সিনথিয়া আপু হেসে ফেলল। আমার গালে হাত রেখে বলল,
“তুমি এত মিষ্টি কেন বলো তো? আমি শিওর আজই ওরা তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইবে।”
“কিন্তু আমি তো যাব না। এখানেই থাকব।”
সিনথিয়া আপুর হাসি হাসি মুখটা হঠাৎ করেই কেমন যেন মলিন হয়ে গেল। ম্লান হেসে বলল,
“প্রিয়তা, তুমি কি জানো ঐ বাড়ির প্রত্যেকে শুধু তোমার ছবি দেখেই তোমাকে পছন্দ করে ফেলেছে? এমনকি ছেলে নিজেও। প্রথমে ছেলে রাজি হতে চায়নি বয়সের এত গ্যাপের জন্য। কিন্তু যখন তোমার ছবি দেখেছে তখন সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, তারা যখন তোমাকে সরাসরি দেখবে তখন তাদের মুগ্ধতা কয়েক গুণ বেশি বেড়ে যাবে। আকদের সাথে কাবিনও করতে চাইতে পারে। আর বিয়েটা কিন্তু দুদিনের জন্য নয়। আমি জানি, তোমার জীবনে চাচ্চু ও চাচিমনির অবদান অনেক বেশি। এই ঋণ হয়তো তুমি কখনো শোধও করতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েতে রাজি হয়ো না। প্রয়োজনে আরো সময় নাও। চাচ্চু কখনো তোমার মতের বিরুদ্ধে কিছু করবে না। তবে এই ছেলে যে খারাপ আমি কিন্তু তাও বলছি না। অবশ্যই এটা তোমার জন্য একটা বেস্ট অপশন। তবুও তোমার পার্সোনাল কোনো পছন্দ থাকতে পারে। এজন্যই আজ এতগুলো কথা বললাম তোমায়। হুটহাট কোনো ডিসিশন নিও না।”
“আমার কোনো পছন্দ নেই আপু। আমি চাচ্চুকে ভরসা করি।”
আপু হেসে বলল,
“বেশ! তাহলে তো ভালোই।”
আপু আমাকে শাড়ি পরিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়ানোর পর সত্যিই একদম বউ বউ লাগছিল। সিনথিয়া আপুর হাতের কাজ খুব সুন্দর।
“সাজ ভালো লেগেছে?” জিজ্ঞেস করল সিনথিয়া আপু।
“খুব!”
চাচিমনির ডাক শুনে সিনথিয়া আপু চলে গেল। এদিকে হৃদির প্রশংসার ঝুলি যেন শেষই হচ্ছে না। ঠিক তখন আমাকে ও হৃদিকে অবাক করে দিয়ে, সারাদিন লাপাত্তা থাকা রাহাত ভাই সোজা রুমে ঢুকলেন। চোখ-মুখ খুব শান্ত ও স্বাভাবিক। নিষ্পলকভাবে আমাকে দেখছে। কিছুটা জড়তা কাজ করছিল আমার এই মুহূর্তে। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না। হৃদি খুব আশা নিয়ে রাহাত ভাইকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, প্রিয়তা আপুকে কেমন লাগছে দেখতে?”
“পরীর মতো।”
তার মুখে আমার প্রশংসা! বিষম খাওয়ার উপক্রম আমার। হৃদি এবার শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার মাথায় ঘোমটা দিয়ে বলল,
“আর এখন কেমন লাগছে ভাইয়া?”
রাহাত ভাই বিন্দুমাত্র সময় না নিয়েই বললেন,
“রাহাতের বউ বউ লাগছে।”
এবার আমার নাক-মুখ দিয়ে সত্যিই বিষম উঠে গেছে। হৃদি হা করে তাকিয়ে আছে রাহাত ভাইয়ের দিকে। চাচিমনিও রুমে এলো তখন। রাহাত ভাইকে সারাদিন পর দেখে রাগ দেখানোর পরিবর্তে একদম আইসক্রিমের মতো গলে গিয়ে বললেন,
“বাবু, কখন এসেছিস তুই? যা যা বসার ঘরে যা। মেহমানরা সব চলে এসেছে।”
রাহাত ভাই বিনাবাক্য ব্যয়ে চলে গেলেন। চাচিমনি আমার বেগতিক অবস্থা দেখে পানি এগিয়ে দিয়ে হৃদিকে বকতে বকতে বললেন,
“মেয়েটা এভাবে বিষম খেয়ে কাশছে আর তুই হাদারামের মতো মুখ হা করে দাঁড়িয়ে আছিস!”
হৃদি কাচুমুচু করছে। নিজের কানকেও হয়তো মেয়েটা সন্দেহ করছে এখন। যাওয়ার আগে চাচিমনি হৃদিকে বলে গেলেন,
“আমি ডাক দিলে প্রিয়তাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসবি।”,
হৃদি মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা।”
এরপর রুম ফাঁকা হওয়ার পর হৃদি আমাকে চেপে ধরে বলল,
“আপু, ভাইয়া কী বলেছে শুনেছ তুমি?”
আমি মিথ্যা বললাম,
“না তো! কী বলেছে?”
“ভাইয়া বলেছে, তোমাকে নাকি ভাইয়ার বউ বউ লাগছে।”
“ওহ তাই নাকি? মজা করে বলেছে তাহলে।”
“অসম্ভব ব্যাপার! আমার ভাইয়ার মতো এমন রসকষহীন একটা মানুষ এরকম রসিকতা করতেই পারে না! সত্যি করে বলো তো, তোমাদের মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক আছে? আর এজন্যই কি ভাইয়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না?”
“কীসব যা তা বলছিস হৃদি! তোর মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেছে পুরো? ওনার সাথে যদি আমার সম্পর্ক থাকত তাহলে কি আমি রাজি হতাম অন্য কাউকে বিয়ে করতে?”
“আমি তো এই হিসাবটাই মেলাতে পারছি না।”,
“পারবিও না। কারণ ম্যাথে তুই আমার চেয়েও দুর্বল।”
“আপু, তুমি কিন্তু এখন পার্সোনাল অ্যাটাক করছো!”
“এই বিষয়ে আর একটা ফালতু কথা বললে মা’ই’রও খাবি। সো তোর জন্য এটা ভালো হয় যে, চুপ করে থাক।”
হৃদির ভাবসাব চুপ থাকার মতো না। ওর মাথায় একবার কিছু ঢুকলে ঐটার নাড়ি-নক্ষত্র বের না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না। তবে এবার আর বেশি বাড়তে পারেনি। তার আগেই চাচিমনির ডাক এসেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও হৃদি দমে গেল। আমাকে নিয়ে গেল ড্রয়িংরুমে। ঘর ভরতি মানুষজন দেখেই আমার হাত-পা কাঁপছিল। তারা একেকজন আমাকে একেক প্রশ্ন করছিল। কিন্তু প্রত্যেকেই খুব বিনয়ী ছিল। একজন মুরুব্বি ছেলেকে বলল,
“তোমার কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞেস করো।”
পাশ থেকে পাত্রপক্ষ থেকে আসা একজন মহিলা বলল,
“এভাবে কি ছেলে-মেয়ে সবার সামনে কথা বলবে নাকি? ওদের আলাদা কথা বলার সুযোগ করে দিলে মনে হয় ভালো হয়।”
চাচিমনি দেখলাম একমত হলো। আমাদের আলাদা কথা বলার জন্য আমার রুমটাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। চাচিমনি আমাকে ধরে বসা থেকে উঠে দাঁড় করালেন রুমে নেওয়ার জন্য। এতক্ষণ পর্যন্ত মাথা নত করে বসে ছিলাম বিধায় , কতজন আর কে কে আছে দেখিনি। কিন্তু রুমের দিকে যাওয়ার আগেই রাহাত ভাই ঘর ভরা মানুষের সামনে খপ করে আমার হাত ধরে বললেন,
“প্রিয় কোথাও যাবে না।”
সবাই অবাক। এমনকি আমি নিজেও। তিনি এতক্ষণ তাহলে এখানেই ছিলেন!
পাশ থেকে চাচ্চু ফিসফিস করে বললেন,
“এসব কী হচ্ছে রাহাত? কী বলছিস এসব? হাত ছাড় ওর।”
রাহাত ভাই মোটেও আমার হাত ছাড়লেন না। বরং আগের চেয়েও আরো শক্ত করে ধরে সবার উদ্দেশে বললেন,
“আমার কোনো কথা কিংবা ব্যবহারে যদি আপনারা কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে আমি শুরুতেই সরি বলে নিচ্ছি। এই বিয়ে হবে না। আপনারা আমাদের বাড়িতে এসেছেন, দাওয়াত গ্রহণ করেছেন এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তবে, প্রিয় আপনাদের বাড়ির বউ হবে না।”
চাচ্চু এবার হুংকার ছাড়লেন,
“রাহাত!”
রাহাত ভাইয়ের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পাত্রের নাম দিহান। তিনি এতক্ষণ যাবৎ নিরব ছিলেন। এবার রাহাত ভাইকে প্রশ্ন করলেন,
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৫
“প্রিয়র ওপর আপনার কীসের অধিকার?”
রাহাত ভাই চোখ-মুখ শক্ত করে ক্ষুব্ধ কিন্তু শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“প্রিয়তা! ওর নাম প্রিয়তা। ও শুধু আমার জন্য প্রিয়। আমি ওকে বিয়ে করব। ও শুধু আমার প্রিয়, আমার প্রিয় বউ হবে।”
