যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১১
মুন্নি আক্তার প্রিয়া
জানালার কাচ ভেদ করে বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে রাহাত ভাইয়ের মুখে। রোদের আলোতেও মুখটা চকচক করছিল। তার ভাবমূর্তি আগের থেকেও গম্ভীর। আমি তার পাশে বসে আছি বিধায় সরাসরি তাকাতে পারছি না। আড়চোখে তাকাচ্ছি।
আমরা এখন মূলত একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছি। আমরা দুজন ছাড়াও এখানে উপস্থিত আছে আমার বন্ধুরা এবং তার কলিগরা। তার সঙ্গে যে দুজন ছেলে ও দুজন মেয়ে ছিল তারা রাহাত ভাইয়ের অফিসের কলিগ। বিয়ে করার জন্য সাক্ষী লাগবে তাই তাদের নিয়ে এসেছে। মানে সে একদম তল্পিতল্পা গুছিয়েই বিয়ে করতে মাঠে নেমেছে। কিন্তু সমস্যা এক জায়গাতেই। আর সেই সমস্যটাও আমি নিজেই। আমাকে কেউ রাজি করাতে পারছে না। এই বিয়েতে আমার বন্ধুদেরও মত আছে। ওরাও চাচ্ছে আমি রাজি হয়ে যাই। কিন্তু কোথায় যেন একটা বাঁধা, একটা ছোট্ট পিছুটান! চাচ্চু আর চাচিমনি জানতে পারলে কত কষ্টই না পাবে!
সবাই যখন আমাকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে চুপ করে গেল, ঠিক তখনই রাহাত ভাইয়ের চোখেমুখে নেমে এলো একরাশ হতাশা। তাকে কিছুটা দিশেহারাও লাগছিল। আমি উপায়ন্তরহীন। সে আচমকা তার গম্ভীরতার খোলস থেকে বেরিয়ে আমার দুহাত তার দুহাতের মুঠোয় নিয়ে আবেগ মেশানো কণ্ঠে বলল,
“তোমার মনে কি আমার জন্য সত্যিই কোনো অনুভূতি নেই? আমাকে তুমি ভালোবাসো না?”
আমি জবাব দিতে পারিনি। মাথা নিচু করে রেখেছিলাম। কী জবাব দিতাম? যদি বলি ‘না’ তাহলে তো সেটা মিথ্যা বলা হবে। আমার মনে তো তার জন্য অনুভূতি আছে। আমি তাকে ভালোওবাসি। কিন্তু এ কথা তো স্বীকার করার উপায় নেই। আমার নিরবতাকে পরোয়া না করে তিনি আবারও একই কথা জিজ্ঞেস করলেন,
“বলো?”
আমি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম,
“আমি পারব না আপনাকে বিয়ে করতে।”
“এটা আমার প্রশ্নের উত্তর ছিল না। আমি জিজ্ঞেস করেছি তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না?”
আমি এবারও নিরুত্তর। তিনি বেশ কিছুক্ষণ নিরব থেকে বললেন,
“তোমার নিরবতাই কি তবে সম্মতির লক্ষণ?”
আমি এবারও কোনো জবাব দিলাম না। তিনি বললেন,
“আমার উত্তর আমি পেয়ে গেছি। এখন বলো, কেন আমায় বিয়ে করতে পারবে না?”
“চাচ্চু আর চাচিমনি জানলে ভীষণ কষ্ট পাবে। আমি তাদেরকে কষ্ট দিতে পারব না।”
“যদি তারা না জানে তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই?”
“মানে?”
“মানে আমাদের বিয়ের কথা আব্বু-আম্মু এখনই জানবে না। তুমি হোস্টেলেই থাকবে সমস্যা নেই। আমি ধীরে ধীরে আব্বু-আম্মুকে মানিয়ে তারপর তোমায় বিয়ে করেই নিয়ে যাব। কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয় নিয়ে আমি দিন পার করতে পারব না। তুমি আমার জীবনে বউ হয়ে আসো, তোমার জন্য পুরো দুনিয়ার সাথে আমি লড়ব। প্লিজ প্রিয়, আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিও না! একবুক আশা নিয়ে নিঃস্ব পথিকের ন্যায় তোমার দুয়ারে এসেছি আমি একটু ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে! করুণা করে হলেও আমায় তোমার হৃদয়ে একটু জায়গা দাও। প্লিজ, প্রিয়!”
রাহাত ভাইয়ের শেষ কয়েকটা লাইন যেন আমার বুকে গিয়ে লাগল। এত অস্থির আর এত কষ্ট লাগছে! আমার চোখ টলমল করছে। এরকম আবেদন কেউ কখনো ফিরিয়ে দিতে পারে? তাও আবার মানুষটা যদি হয় ভালোবাসার! কেউ পারে কিনা জানিনা, তবে আমি পারিনি। রাজি হয়ে গেছি। একদম বিনা আয়োজনেই আমাদের বিয়েটা হয়ে গেল রেস্টুরেন্টেই। কাজীকে রাহাত ভাই রেস্টুরেন্টেই ডেকে এনেছিলেন। বিয়েটা যেন ঘোরের মধ্যেই হয়ে গেল। তবে সত্যি বলতে বুকের ভেতর এই প্রথম আমি অন্যরকম একটা শান্তি অনুভব করতে পারছি। এই প্রথম আমার অনুভব হচ্ছে যে, এখন আর বিশাল পৃথিবীতে আমি একা নই। আমার নিজের একটা মানুষ আছে। একদম আমার নিজের! আমার স্বামী, আমার ভালোবাসা, আমার প্রাণ
রেস্টুরেন্ট থেকে খাওয়া-দাওয়া করে রাহাত ভাই তার গাড়িটা কলিগদের কাছে দিয়ে দিলেন। আমার ফ্রেন্ডরাও আমার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। রাহাত ভাই রিকশা ডাকলেন। আমি একটু অবাকই হলাম। বিয়ে করে তার মাথা কি খারাপ হয়ে গেল? নিজের গাড়ি রেখে রিকশা কেন? তিনি বোধ হয় আমার মন পড়তে পারেন। রিকশায় উঠে হেসে বললেন,
“তোমার সাথে তো কখনো রিকশায় ঘোরা হয়নি। তাই ভাবলাম, ফিলটা আজ নিয়েই নিই। বৃষ্টি হলে অবশ্য আরেকটু ভালো হতো। এই সুযোগে বৃষ্টিবিলাসও হয়ে যেত।”
আমি মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। রাহাত ভাইয়ের মতো এত কাঠখোট্টা স্বভাবের মানুষ এরকম রোমান্টিক কথা বলে কী করে?
“যদিও তুমি জীবনের সঙ্গে আগেই রিকশায় বৃষ্টিবিলাস করে ফেলেছ!”
এ কথা শুনে আমি চমকে তাকালাম তার দিকে। জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি জানলেন কী করে?”
“জানব কেন? নিজের চোখেই দেখেছি। খুব তো ঘুরতে ওর সাথে!”
“একদম না! আমি ওর সাথে কোথাও ঘুরিনি আর বৃষ্টিবিলাসও করিনি। ওর প্রতি আমার কোনো অনুভূতি তখনো ছিল না, এখনো নেই। আমরা জাস্ট রিকশা শেয়ার করেছি।”
“ওর তো অনুভূতি আছে তোমার প্রতি।”
“এতে আমার কী করার আছে?”
“তুমি এটা জেনেও কীভাবে ওর সাথে রিকশায় উঠলে? একটু খারাপও লাগেনি?”
“আমি আপনার মতো করে ভাবিনি।”
“তুমি জানো আমি কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম এসব দেখে?”
“আপনি আমার সব খবর রাখতেন?”
“তুমি কী আশা করেছ?”
“কিছুই না।”
“তোমার সব খবর আমার নখদর্পনে থাকে প্রিয়। যাই হোক, আমাকে আর পু’ড়ি’ও না।”
“ঠিক আছে। আমি আর ওর সাথে মিশব না।”
রাহাত ভাই খুশি হয়ে হাসলেন। আমার হাতের উলটোপিঠে আলতো করে চুমুও খেলেন। লজ্জায় যেন মুখ লাল হয়ে গেল আমার সাথে সাথেই! আমি সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।
রিকশা এসে থামল বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের সামনে। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলাম,
“আমরা এখানে এসেছি কেন?”
“শপিং করতে।”
“কেন?”
তিনি কোনো জবাব দিলেন না।ভেতরে গিয়ে নিজের পছন্দের একটা মেরুন জামদানি শাড়ি কিনে দিলেন। ডায়মন্ডের নাকফুল কিনে নাকে পরিয়ে দিয়েছেন। হাতে ডায়মন্ডের রিং পরিয়ে বললেন,
“সারাজীবনের জন্য নিজের করে রাখার চিহ্ন সাথে দিয়ে দিলাম।”
প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসলাম আমি। তিনি আরো প্রয়োজনীয় যা যা লাগে সব কিনে উবার ডাকলেন। এখন কোথায় যাচ্ছি আমি তাও জানিনা। আমি এক নতুন আবেশে ডুবে আছি। একটা মুহূর্তেও তিনি আমার হাত ছাড়েননি। এখনো হাত ধরেই বসে আছেন। গাড়ি যখন এয়ারপোর্টে এসে থামল তখন আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“এয়ারপোর্টে কেন এসেছি আমরা?”
“হানিমুনে যাব তাই।”
“হানিমুন?”
“ইয়েস। বাংলায় যাকে বলে মধুচন্দ্রিমা।”
আমি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি আমার মুখাবয়ব দেখে হেসে ফেললেন। কাঁধ জড়িয়ে ধরে হেসে হেসেই বললেন,
“বাচ্চা বউ নিয়েও ঝামেলা। কিছু বললেই ভয়ে আঁতকে ওঠে! বৃষ্টিবিলাস তো হলো না এখন। বিনিময়ে সমুদ্রবিলাস তো করাই যায় বলো?”
আমি বাক্যহীন। তাছাড়া আমার কিছু বলারও নেই। কবুল বলার পর থেকে আমি যেন আর আলাদা কোনো সত্তা নই। তিনি এবং আমি একই অংশ। আমার দুনিয়া বলতে আমি শুধু তাকেই বুঝতে শুরু করেছি।
সেই রাতের ফ্লাইটেই আমরা কক্সবাজারে এলাম। প্লেনেও তিনি আমার হাত চেপে বসে ছিলেন। ভয় পাওয়ারও যেন কোনো ফুরসত ছিল না। একটা বিলাসবহুল হোটেলে উঠেছি আমরা। বারান্দা থেকেই সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। আমি এখন বারান্দাতেই দাঁড়িয়ে আছি। তিনি এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“কী দেখছ?”
“ভাবছি।”
“কী ভাবছ?”
“সবকিছু স্বপ্ন নাকি সত্যি! একটুপরই কি ঘুম ভেঙে যাবে?”
তিনি আমাকে তখন পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখে বললেন,
“এখনো কি সব স্বপ্ন লাগছে?”
আমি কিছুটা শিউরে উঠলাম। সেই সাথে প্রচণ্ড খুশিতে আমার চোখেও অশ্রু জড়ো হয়েছে। গলা কাঁপছিল কথা বলার সময়। আমি কাঁপান্বিত কণ্ঠেই বললাম,
“কীভাবে সম্ভব হলো এসব!”
“কারণ আমরা দুজনই দুজনকে ভালোবাসি।”
আমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে তার হাতে পড়তেই তিনি আমাকে ছেড়ে মুখোমুখি দাঁড়ালেন। চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
“কাঁদবে না খবরদার!”
“বিশ্বাস করতে পারছি না এখনো।”
“বিশ্বাস করো আমার জান। তোমার জীবন আমি স্বপ্নের থেকেও সুন্দর ও রঙিন করব প্রমিস। শুধু তুমি আমার পাশে থেকো। থাকবে তো প্রিয়?”
আমি অশ্রুশিক্ত নয়নে তার দিকে তাকালাম। উপর-নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম,
যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ১০
“থাকব। সারাজীবন।”
তিনি এবার দুহাতের আজলায় আমার মুখটা ধরে বললেন,
“কখনো ছেড়ে যাবে না তো আমায়?”
আমি এবার সেই দুঃসাহসটা দেখিয়েই ফেললাম। নিজ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
“কখনো না!”
