Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৮

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৮

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৮
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

ফুল আমার ভীষণ পছন্দ। ভীষণ মানে ভীষণ। সামান্য বুনোফুল দেখলেই আমি খুশি হয়ে যাই। এমনকি ফল হওয়ার আগে যে ফুল হয় ঐ ফুলগুলোও আমার ভালো লাগে। একবার চাচিমনির দেখাদেখি খুব শখ করে ছাদে করলার বিচি লাগিয়েছিলাম। সেটা থেকে কদিন পর গাছও হয়েছিল। আমি প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিতাম। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ছাদে গিয়ে দেখি দুটো হলুদ ফুল হয়েছে করলা গাছে। সেই খুশিতে যে আমি কতদিন নেচেছি! এতটুকুতেই বোধ হয় আন্দাজ করা যায় আমি কতটা ফুলপ্রেমী! উপহার আমার ততটা পছন্দ না হলেও কেউ যদি আমাকে ফুল উপহার দেয় আমি তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি না। এইযে রাহাত ভাই আজ আমার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে ফুল নিয়ে এসেছেন, এটা তো আমার কাছে কল্পনাতীত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। তবুও আজ আমি খুশি হতে পারছি না। এমনকি অবাকও নয়। মনের ভার এত বেশি যে, ফুলও আমার কাছে এখন দুঃখের প্রতিক।
আমাকে এভাবে নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহাত ভাইয়ের হাস্যোজ্বল মুখটায় অন্ধকার নেমে এলো। তবে সে তার স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য ভাবটা আনেনি। বরং বেশ আদর মাখানো কণ্ঠে শুধু বলেছেন,

“তোমার কি এখনো মন খারাপ?”
আমি জবাব দিতে পারলাম না। বুকের ভেতর থেকে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তিনি ফুলগুলো আমার টেবিলের ওপর রেখে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“মন খারাপ কোরো না, প্রিয়। আমি আছি তো তোমার সাথে।”
দিনশেষে কেউ থাকে না আমি জানি। খুব প্রিয় মানুষও যে মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে তা এখন আর আমার থেকে ভালো কে জানে? কিন্তু রাহাত ভাইয়ের মুখনিঃসৃত এইটুকু কথা ‘আমি আছি তো তোমার সাথে’ আমার পুরো হৃদয়টাকেই যেন মুহূর্তে শীতল করে দিল। আমার এই প্রথমবারের মতো আশ্চর্যজনকভাবে ইচ্ছে হলো তাকে একটাবার জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সেই দুঃসাহস কিংবা ভুল কোনোটাই আমি করলাম না। দমিয়ে নিয়েছি ইচ্ছেটাকে।
চোখে পানি টলমল করছিল। রাহাত ভাই সেটাও লক্ষ্য করেছেন। আলতো হাতে চোখের পানি মুছে বললেন,

“এই চোখে গাঢ় কালো কাজল মানায়। পানি না!”
রাহাত ভাইয়ের এই ছোটো ছোটো যত্নগুলো আমার ওপর য়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম কিছুদিন পর থেকে। চাচিমনি একদিন আমাকে তার রুমে ডেকে পাঠালেন। তখন আমি কিছুক্ষণ আগে মাত্র কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরেছি।
আমি চাচিমনির রুমে যেতেই চাচিমনি বললেন,
“বোস।”
আমি খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসলাম। চাচিমনিও একটু দূরত্ব রেখে খাটে বসে বললেন,
“তোর চাচ্চু তোর জন্য হোস্টেল খুঁজেছে। কিন্তু এই মাসে কোনো সিট ফাঁকা পায়নি। সামনের মাসের এক তারিখ থেকে খালি হবে।”
আমার কিছু বলার ভাষা নেই। শুধু বললাম,

“আচ্ছা।”
“তোর কলেজ থেকে হোস্টেল সামনেই। যাতায়াতে কোনো সমস্যা হবে না।”
“আচ্ছা।”
“পরিবেশ খুব ভালো। আমিও গিয়ে দেখে এসেছি। ওদের রান্নাও ভালো। তাও যদি তোর ভালো না লাগে ঐ খাবার তাহলে আমাকে কল দিস। আমি তিনবেলা খাবার তোর চাচ্চুকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো।”
“ঠিক আছে।”
চাচিমনি কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমার দৃষ্টি নত। রুমে নীরবতা। চাচিমনি নিজেই সেই নিরবতা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কলেজ থেকে এসে খেয়েছিস?”
“না, এখনো খাইনি।”
“আচ্ছা যা, খেয়ে নে তাহলে।”
আমি ‘ঠিক আছে’ বলে উঠে দাঁড়ালাম। দরজা পর্যন্ত যেতেই আবার চাচিমনির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“প্রিয়তা?”

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, চাচিমনিও বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তখনো তাকিয়ে আছি। চাচিমনি হঠাৎ করেই আবেগ মাখানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই কি এখন আমাদের ঘৃণা করিস?”
আমি হাসলাম। হাসিটা কেন জানি আপনা-আপনি চলে এসেছে। ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়েই বললাম,
“ঘৃণা কেন করব চাচিমনি? তোমরা আমার কথা কত ভাবছ! কত চিন্তা করছ আমার জন্য! তোমরা তো আমার ভালোই চাচ্ছ। শুধু কষ্টটা কোথায় জানো চাচিমনি? তোমরা আমার ভালোটাই শুধু চাইলে, আমাকে চাইলে না!”
চাচিমনির চেহারা নির্বিকার। ঘুরে চলে আসার সময় কখন যে আমার দুচোখ থেকে দুফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল টেরই পাইনি!

এই ঘটনার পর থেকে সত্যিই বাড়িতে নিজেকে আশ্রিতা বলে মনে হচ্ছিল আমার। আমি সময় গুনছিলাম কবে আসবে এক তারিখ আর কবে আমি এই বাড়ি ছাড়তে পারব। যেই বাড়িটা এক সময় আমার কাছে সুখের নীড় ছিল সেই বাড়িতেই এখন আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। সবার মাঝে থেকেও নিজেকে একা লাগার অনুভূতিটা ঠিক বোঝানোর মতো নয়। এরচেয়ে ভালো আমি অচেনা জায়গায়, অচেনা মানুষজনদের সাথে থাকব।
বিছানার এক কোণে শুয়ে ছিলাম, হৃদি এলো তখন দৌঁড়ে। এক লাফে বিছানায় উঠে বসে বলল,
“আপু, জানো আজ কত সুন্দর চাঁদ উঠেছে?”
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কী রিয়াকশন দেবো বুঝতে পারছিলাম না। অবশ্য ওর মন তো আর আমার মনের মতো বিষন্ন নয়। আমি হালকা হেসে বললাম,
“না, জানিনা। দেখিনি।”
“চলো তাহলে দেখে আসি?”
“কোথায় যাব?”
“ছাদে।”
“ধুর নাহ্! পাগল নাকি? রাত বাজে আটটা। এখন যাব ছাদে?”
“তাতে কী? ছাদে যেতে আবার সময়, অসময় আছে নাকি? তুমি চলো তো।”
হৃদি এক প্রকার টেনে-টুনেই আমাকে ছাদে নিয়ে গেল। কিন্তু সত্যি বলতে ছাদে এসে আমার প্রচণ্ড ভালো লাগছিল! এত সুন্দর থালার মতো একটা রূপলী চাঁদ, অগণিত তারা আকাশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ছাদে বেশ শীতল বাতাসও আছে।

“ভালো লাগছে?” জিজ্ঞেস করল হৃদি।
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
“ভীষণ!”
হৃদি আর আমাকে ঘাটাল না। আমার মতোই চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করেই বলল,
“তুমি কি ভাইয়াকে ভালোবাসো?”
ওর মুখে এরকম প্রশ্ন শোনার চেয়েও আমি বেশি অবাক হচ্ছি এটা ভেবে য়ে, আমি আগের মতো তৎক্ষনাৎ কেন ‘না’ বলতে পারছি না? আমাকে কেন এত ভাবতে হচ্ছে? তবে আমি উত্তর দেওয়ার আগেই হৃদি বলল,
“ভাইয়া কিন্তু তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে।”
“আমাকে কেউই ভালোবাসে না হৃদি।”
“কেউই না?”
“না।”
“আমিও না?”
“উহুম!”
“তুমি এভাবে বলতে পারলে? আমি তোমাকে কত ভালোবাসি!”
এতক্ষণ আমি রেলিঙের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এবার রেলিং ছেড়ে হৃদির মুখের দিকে তাকালাম। মেয়েটা যে আমার কথায় ভীষণ কষ্ট পেয়েছে বোঝা যাচ্ছে। আমি এক হাত ওর কাঁধে এবং অন্য হাত ওর গালে রেখে বললাম,

“আমার মতো অনাথ, আশ্রিতাদের ভালোবাসা যায় না, হৃদি। বড়জোর করুণা করা যায়। কেউ করুণা করে, কেউ দয়া করে কেউ বা মায়া করে। রাহাত ভাই আমাকে ভালোবাসে না। করুণা করে। চাচ্চু আর চাচিমনি দয়া করে আর তুই করিস মায়া।”
“তুমি বলতে চাচ্ছ জীবনে তোমাকে কেউ কখনো সত্যিকারের ভালোবাসেনি?”
“না রে, অতটা ভাগ্যবতী হয়েও তো আমি জন্মাইনি।”
“তাহলে আজ আমি দোয়া করে দিচ্ছি, তোমার জীবনে এমন একজন ভালোবাসার মানুষ আসুক যে তোমাকে সব বিপদ-আপদ থেকে আগলে রাখবে, তোমার অতীতের কষ্ট মুছে দেবে, তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসবে। আর সেদিন তোমারও ভুল ধারণা ভাঙবে যে, দুনিয়ার বুকে তুমিও একজন ভাগ্যবতী নারী।”
ছোটো মেয়েটার মুখে এত দামি কথা শুনে আমি সত্যিই আপ্লুত না হয়ে পারলাম না। হৃদির কপালে চুমু খেয়ে বললাম,
“তুই একটু বেশিই ভালো, হৃদি!”
“আসতে পারব?”
ছাদের দরজায় আমি আর হৃদি একসাথেই তাকালাম। দেখি রাহাত ভাই এসেছেন। হৃদি বলল,

“আসো না!”
রাহাত ভাই এগিয়ে এসে হৃদিকে একটা আইসক্রিম দিল হাতে। হৃদি জিজ্ঞেস করল,
“একটাই?”
“কয়টা লাগবে?”
“প্রিয়তা আপুর জন্য আনোনি?”
“না, ওর খেতে হবে না।”
হৃদি আক্ষেপ নিয়ে আমার দিকে তাকাল। ওর চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে, একটু আগে বলা আমার কথাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। রাহাত ভাই তখন ওকে বললেন,
“নিচে যা।”
হৃদি মন খারাপ করে বলল,
“যাচ্ছি।”
ওর আমার প্রতি এত মায়া! আমি চুপচাপ হৃদির চলে যাওয়া দেখছি।
“তোমারও মন খারাপ হলো?” জিজ্ঞেস করলেন রাহাত ভাই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“আমার?”
“হু।”
“না। কেন?”
“তোমার জন্য আইসক্রিম আনিনি বলে।”
“আমি তো আপনাকে আইসক্রিম আনতে বলিনি।”
“তাও ঠিক।”
একটুখানি থেমে বলল,
“তবে তুমি না বলা সত্ত্বেও অন্য কিছু এনেছি।”
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। তিনি প্যান্টের পকেট থেকে দুটো কিটক্যাট বের করে দিলেন। বললেন,
“আশা করছি চকোলেট খেলে ঠান্ডা লাগবে না।”
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কয়েকদিন ধরেই আমি ঠান্ডা-কাশিতে ভুগতেছি। ওষুধ খেয়েও কাজ হচ্ছে না। উনি যে এই ছোটো বিষয়গুলোও খেয়াল রাখছেন এবং খুব নিরবে যত্ন নিচ্ছেন, এসব না চাইতেও আমার নজর কাড়ছে। তার প্রতি আমার মন নরম করে দিচ্ছে। কিন্তু আমি চাই না এমন কিছু হোক। সমস্যা শেষ করতে চাচ্ছি, বড়ো করতে না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে কতদিন নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব আমি সেটাও জানিনা। এখন আমার জন্য উত্তম পথ একটাই। সবার থেকে দূরে চলে যাওয়া। বিশেষ করে রাহাত ভাইয়ের থেকে! মজার বিষয় হচ্ছে উনি এখনো আমার বাড়ি ছাড়ার ব্যাপারে কিছু জানেন না। যখন জানবেন তখন ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তাও জানিনা।
আমি গোপনে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বললাম,

“ঘরে যাই।”
“দাঁড়াও। এখনো শেষ হয়নি তো!”
“কী?”
“যা এনেছি।”
উনি এবার ওনার শার্টের বুকপকেট থেকে একটা লাল টুকটুকে ছোট্ট গোলাপ বের করলেন। আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“ধরো।”
আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি। উনি তাড়া দিয়ে বললেন,
“ধরো, কুইক!”
আমি ফুলটা নিলাম দ্রুত। উনি এবার প্যান্টের বামপকেট থেকে একটা ফুল বের করে আমার হাতে দিলেন। এরপর ডানপকেট থেকে। এভাবে প্যান্টের পেছনের পকেট থেকেও একটা একটা করে ফুল বের করে হাতে দিলেন। এরপর আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে উনি শার্ট খুলতে লাগলেন। আমি প্রায় ফাঁকা চিৎকার করে বললাম,
“কী করছেন?”
উনি শার্টের বোতাম খোলার সময় আমি দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছি সাথে সাথে। উনি বললেন,

“তাকাও।”
“না!”
“আরে তাকাও! আমি নে’ক’ড না।”
আমি ভয়ে ভয়ে তাকালাম। উনি ওনার কালো শার্টটা দুই দিকে মেলে ধরতেই দেখি প্যান্টের ইনে কোমরভরতি গোলাপ ফুল। আমি আঁতকে উঠে বললাম,
“এসব কী!”
উনি ফুলগুলো হাতে নিতে নিতে বললেন,
“কী মানে? অন্ধকারে কী বোঝা যাচ্ছে না? গোলাপ ফুল।”
“এভাবে এনেছেন কেন?”
“তোমার জন্যই। মা দেখলে তো আবার পরে তোমার ওপরই রাগ করবে।”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তার দিকে। এ আমি কোন রাহাত ভাইকে দেখছি! উনি ফুলগুলো আমার হাতে দিয়ে বললেন,

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৭

“এভাবে তাকিয়ে থেকো না তো! আবার কিন্তু প্রেমে পড়ে যাব।”
আমি দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বললাম,
“আমি আপনার জন্য সঠিক নই। কেন বারবার কাছে আসতে চাচ্ছেন? কেন চাচ্ছেন আমাকে আপনার মায়ায় বাঁধতে? কেন আমার থেকে দূরে থাকছেন না আপনি?”
রাহাত ভাই মুচকি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি শান্ত নদীর মতো, প্রিয়। তোমার মধ্যে অদ্ভুত একটা জাদু আছে, প্রশান্তি আছে যা আমাকে বারবার তোমার কাছে টেনে নিয়ে আসে।”

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here