Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৬

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৬

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৬
সাবা খান

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সবে শেষ হয়েছে। চারদিকে যেন উৎসবের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। বিশাল গম্বুজাকৃতির সজ্জিত প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে আছে মানুষের হাসি, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের শব্দ। কেউ নবদম্পতিদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত, আবার কেউ গল্পে মেতে উঠেছে। ফুলের সুগন্ধ, ঝাড়বাতির আলো আর ক্যামেরার অবিরাম ফ্ল্যাশ মিলে পুরো পরিবেশটাকে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। এদিকে আরজের কয়েকজন ছোট্ট ভক্ত অনেকক্ষণ ধরেই তার নিরাপত্তারক্ষীদের অনুরোধ করে যাচ্ছে। তাদের একটাই চাওয়া, আরজের একটা অটোগ্রাফ বা তার সাথে যেন একটা ছবি নিতে পারে।

প্রথমে আরজে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সানার ভীষণ মায়া হলো তাদের উপর, এরা সেই শুরু থেকে এই পর্যন্ত একটা আশাতেই রয়ে গেছে। তাই সে আরজে কে বলাতে, বিপরীতে মানব নিজের গুরুত্ব টাকে একপাশে রেখে বউয়ের চাওয়াটা কেই প্রাধান্য দিল। এই মুহূর্তে সে কয়েকজন শিশুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ অটোগ্রাফ নিচ্ছে, কেউ তার সাথে ছবি তুলছে। বাচ্চাদের উচ্ছ্বাস দেখার বাহিরে ছিল।
অন্যদিকে একই সময়ে সানিতা যেন এসপির ধৈর্যের শেষ সীমা পরীক্ষা করার মিশনে নেমেছে। সে গত আধা ঘণ্টা ধরে একই কথা এসপির কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে। এবার এসপির মনে হচ্ছে তার কানের পোকা নাড়িয়ে ফেলবে রমণী। সানিতা আবারও বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলে,

—”প্লিজ… শুধু একটা অটোগ্রাফ”
এসপি ফের মুখের উপর সাফ সাফ নিষেধ করে দিল,
—”না”
—”একটা সেলফি?”
—”না”
—”একটা গ্রুপ ফটো?”
—”না”
—”একটা দূর থেকে তোলা ছবি?”
—”একদমই না”
শেষমেষ রমণী বাধ্য হয়ে এসপির পাথর মনকে গলাতে শেরওয়ানির কিনারা ধরে টানতে টানতে ঠোঁট উল্টে বাচ্চাদের মতো মুখ বানিয়ে বলল,
—”তুমি জানো আমি ওর কত বড় ফ্যান। অটোগ্রাফ নিতে দিলে না, ঠিক আছে। কিন্তু একটা ফটোগ্রাফ তো নিতেই পারি। ভবিষ্যতে আমাদের বাচ্চাদের দেখাব, আমি কত বড় সুপারস্টারের সাথে ছবি তুলেছি, প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ….”
এসপি ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকায় ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিতে। তার চোখের ভাষা এমন যা দেখে আশেপাশের দু একজন পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেল। রুক্ষ স্বরে বুলি ছুড়ে,

—”আর সেই ফ্যানে আমি তোকে উল্টো করে ঝুলাবো সারাজীবনের জন্য। বল, রাজি আছিস?”
সানিতা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে তার বাহুতে সজোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল,
—”অসভ্য”
এই বলেই রমণী মুখ গোমড়া করে সেখান থেকে চলে গেল। এসপি ব্যথায় মুখ কুঁচকে নিজের বাহু ঘষতে ঘষতে দাঁত খিঁচিয়ে আরজের দিকে প্রতিহিংসার দৃষ্টিতে তাকায়। মাঝে মাঝে তার বোধগম্য হয় না, পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে তার বউ কেন আরজের ফ্যানই হলো? অন্য কাউকে নজরে আসে না নাকি। পরমুহূর্তেই তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল আরজে কে একটু শিক্ষা দেওয়ার। চোখ ঘুরিয়ে সে খুঁজতে লাগল কাউকে যার মাধ্যমে কাজটা অতি সহজে করা যাবে আর তার নামও উঠবে না। মানে অনেকটা, ‘সাপও মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না” এর মতো।
মাথার ভেতর দুষ্টু বুদ্ধিগুলো কিলবিল করতে লাগল। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো আরভির উপর। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসিটা চওড়া হয়ে গেল। সে হাত তুলে ডাকল,

—”আরভি, মাই লিটল চ্যাম্প, কাম হিয়ার”
বিপরীতে আরভি তার দিকে একটু বিরক্ত সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবারও কিয়ানের সাথে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এসপি দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড়ায়,
—”বাপের থেকেও বড় ঘাড়ত্যাড়া”
এই বলে সে নিজেই আরভির কাাছে গেল। আরভি থেমে বলে,
—”হোয়াট হ্যাপেন্ড, ছোট পাপা?”
এসপি চারপাশে একবার তাকিয়ে নিচু হয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। তারপর শুরু হলো দীর্ঘ গোপন প্রশিক্ষণ। একটা কথা বোঝাতে গিয়ে দশটা উদাহরণ দিচ্ছে। দশটা উদাহরণ শেষ করে আবার প্রথম কথায় আসে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে আরভিকে বুঝিয়েই চলল। শেষমেষ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবে,
‘নাহ… ছেলে অনেক বেশি বুদ্ধিমান হয়ে গেছে। এই বয়সে এত প্রশ্ন করে কে?’
তবুও যতটুকু বোঝানো দরকার ছিল, ততটুকু বোঝাতে পেরেছে বলে সে সন্তুষ্ট। এরপর সে দূরে বসে থাকা সানাকে দেখিয়ে বলল,

—”ওই দেখো তোমার মম। যাও গিয়ে জিজ্ঞেস করো”
আরভি মাথা নেড়ে সোজা সেদিকে চলে গেল। এসপি ধীরে ধীরে পিছিয়ে এসে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ায়, মুখে এমন ভাব যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ মানুষ। এদিকপ সানা তখন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিল। ছেলেকে আসতে দেখে হাসিমুখে কোলে টেনে নিল,
—”কি হয়েছে আমার সোনাটার?”
আরভি গম্ভীর মুখে বলল,
—”মম, আজকে কি আবার বিয়ে হয়েছে?”
—”হ্যাঁ”
—”তুমি আবার ড্যাডকে বিয়ে করেছ?”
—”হুম”
আরভি কয়েক সেকেন্ড এসপির কথা গুলো ভেবে প্রশ্ন করে,
—”আচ্ছা… তাহলে তুমি দুইবার একই ড্যাডকে কেন বিয়ে করেছ?”
সানা হঠাৎ ছেলের এমন প্রশ্নে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কপাল কুঁচকে বলে,
—”মানে?”
—”মানে, আমার ড্যাডের মতো আরও একটা ড্যাড চাই”

বাক্যটা যেন বোমা বিস্ফোরণের মতো আঘাত করল চারপাশে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এসপি মুখ চেপে হাসি আটকাতে গিয়ে প্রায় মরে যাওয়ার অবস্থা। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরজে বাচ্চাদের সঙ্গে ছবি তুলে মাত্র ফিরে এসেছে। বাক্যটা শ্রবণ হতেই তার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার চিরাচরিত মুখের রঙ পাল্টে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে চোয়াল। অতঃপর সে নিজের ছেলের দিকে তাকায়, তার সেই রক্তচক্ষু দেখে সানা পর্যন্ত আঁতকে উঠে। রমণী তড়িঘড়ি করে আরভির গালে হাত রেখে বলল,
—”দুই দুইটা ড্যাড দিয়ে তুমি কি করবে সোনা?”
আরভি খুব স্বাভাবিকভাবে এসপির শিখানো বাক্যটা উগড়ে দেয়,
—”হুমম, দিনে তো একটা ড্যাড আমার সাথে থাকে কিন্তু রাতে তো থাকে না। তাই রাতে থাকার জন্য আরেকটা ড্যাড লাগবে”
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে এসপির উচ্ছ্বাস ভরা বজ্রধ্বনির মতো কণ্ঠ ভেসে এল,

—”সাব্বাস বেটা, সাব্বাস। লা-জবাব, একেই বলে বাপকা মানে মা কা বেটা”
এসপি এই মুহূর্তে আরজের রাগে লাল হওয়া চেহারা দেখে কিছুটা হলেও মনের ক্ষোভ টা শান্ত হয় সাথে আরভির উপরেও গর্ব হচ্ছে। যাক ছেলেটাকে পড়ানো অপচয় হয়নি। নাহয় এই দুটো লাইন শিখাতে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে। বারবার বলছিল, তার একটা ড্যাডই চলবে আরেকটার দরকার নেই।
এদিকে আরজের মুষ্টিবদ্ধ হাতের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠল। সে নিজেকে সংবরণের জন্য চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিয়ে আবার চোখ খুলল। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। আরভির কথাগুলো কানের ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকায় আরভির পিছনে দাঁড়ানো এসপির উপর। তারপর রক্তচক্ষু গুলো এসপির দিকে নিবদ্ধ করে দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,

—”বারোভাতারির বাচ্চা… তুই ওর কানে কানে কি পড়িয়েছিস?”
এই কথাটা শোনার মাত্রই এসপি আতকে উঠে। মনে মনে শঙ্কা জাগে, ‘এই রে ধরা পড়ে গেলাম নাকি? কোথাও এই জাওরা শুনতে পাইনি তো? তাহলে ব্যাস কেল্লাপাত। সে আর পৃথিবীতে থাকতে পারবে না। যদি এই আরজে জানতে পারে তাহলে নিশ্চিত আজ তার পৃথিবীতে শেষ দিন। তবে একটু দুঃখ আছে, আজ সে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে কিন্তু দ্বিতীয় বাসর করার আগেই যে সে খাটিয়াতে উঠবে। ইস, কি নির্মম পরিণতি! তারপরও যতক্ষণ দেহে প্রাণ অবশিষ্ট আছে এই জাওরা কে কোনমতে সন্দেহ করতে দেওয়া যাবে না। তাই অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠে,
—”এ কিরে জাওরা, এতদিন বউয়ের দোষ চাপাতি, নাহয় মেনে নিলাম। এখন ছেলের দোষও!! দুদিন পর তো তোর না হওয়া বাচ্চার দোষও চাপাবি”
আরজে নিজের কালো সিল্কি চুলগুলোকে ব্যাক ব্রাশ করে একই কণ্ঠে শুধালো,
—”দুদিন পর কেন, এখন থেকেই সব দোষ তোর”
— “শালা, পৃথিবীতে আটশো কোটি মানুষ থাকতে তোর সমস্যা শুধু আমার সাথে কেন?”
—”পৃথিবীতে আটশো কোটি মানুষ থাকতে তুই কেন আমার বউয়ের বন্ধু-ই হবি?
আর তুই নিজেই সবচেয়ে বড় সমস্যা”
এসপি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলে,

—”এইটা কোনো কথা হলো? কটকটি তুই কিছু বল”
আরজের এবার সমস্ত পারদ ভেঙে যায় এসপি কে সানার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। সে তেড়ে যাবে তার আগেই সানা তাকে আটকে ফেলে। সে এক টানে আরজের হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল। তারপর কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
—”রানভীর, আর একটা শব্দ বললে আমি কিন্তু আজ রাতে রুমের দরজা বন্ধ করে রাখবো”
রমণীর এমন হুমকির তোপে আরজের মুখের রং বদলে গেল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকি সে শুনেছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। তারপর সমস্ত অপমান, সমস্ত রাগ, সমস্ত প্রতিশোধের ইচ্ছা গিলে ফেলে শান্ত হয়,
—”ওকে, বাট আ’ম ড্যাম শিউর। ও রিশের কান পরিয়েছে”
—”আচ্ছা, আমি ওকে দেখে নেব”
আরজে এবার কিছুটা শান্ত হলো। এদিকে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এসপি মনে মনে ভাবল,
“বাহ… পৃথিবীতে একমাত্র কটকটিই আছে যে এই জাওরা কে দুই সেকেন্ডে চুপ করাতে পারে’ আর সেই উপলব্ধি হতেই সে আরেকবার হেসে ফেলল, যদিও এবার অনেক সাবধানে, কারণ তারও বেঁচে থাকার ইচ্ছা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

ম্যনশনের মধ্যে তখনও উৎসবের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই উৎসবের একটি কণাও স্পর্শ করতে পারেনি একজন মানুষকে, সে হলো সারহাদ। যেই মানুষটা এই মুহূর্তে প্রাসাদের বাইরের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে আছে। সে অনেক্ক্ষণ আগেই বাহিরে চলে এসেছে যখন দেখেছিল আরজে সবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সানার জুতোর ফিতা বেঁধে দিচ্ছে ঠিক তখনই। সেটা ছিল একটি সামান্য দৃশ্য। অথচ সেই সামান্য দৃশ্যটাই তার বুকের ভেতরে বহু বছরের যত্নে চাপা দেওয়া ক্ষতগুলোকে নতুন করে ছিঁড়ে দিয়েছে। তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকা সম্ভব হয়নি। আরভিকে কোলে থেকে নামিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছে সে। এখন সে দাঁড়িয়ে আছে নিজের গাড়ির পাশে।
কালো গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে একের পর এক সিগারেট টেনে যাচ্ছে। তার পায়ের নিচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য পোড়া ফিল্টার। মনে হচ্ছে সিগারেট নয়, সে নিজের অস্তিত্বটাই পুড়িয়ে ফেলতে চাইছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো আকাশে মিশে যাচ্ছে, কিন্তু বুকের ভেতরের আগুন কিছুতেই নিভছে না। তার ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে ছাই হয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রণারও একটা সীমা থাকে। কিন্তু কিছু ভালোবাসা আছে, যাদের কোনো সমাপ্তি নেই, শুধু দহন আছে, শুধু শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা আছে, শুধু না পাওয়ার দীর্ঘ শোক আছে। আজও সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। তার জন্য এই পর্যন্ত তিনবার সকাল থেকে ড্রাগস নিয়েছে, ভয়ংকর সেই ড্রাগস গুলো আর নিলে মৃত্যু নিশ্চিত।

কিন্তু ড্রাগসের প্রভাব না মস্তিষ্কে পড়ছে আর না অবাধ্য হৃদয়ে। তাই যতবার সে চোখ বন্ধ করছে, ততবারই ভেসে উঠছে কাজল কালো মায়াবী চোখজোড়া, সারা আদলে লেপ্টে থাকা হাসি আর লাল বধূবেশে সানার মুখ। যে মুখ কোনোদিন তার ছিল না আর কোনোদিনও হবে না। তবুও তার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে সেই মুখেরই অধিকার। সারহাদ ধীরে ধীরে হাতের গ্লাভস খুলে ফেলে। গ্লাভসের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে হাতের পুড়ে যাওয়া চামড়া, বিক্ষত, দগ্ধ, অসংখ্য পোড়া দাগে ভরা। এগুলো গত রাতের স্মৃতি। সানার ছবির উপর ক্রোধে, অভিমানে, যন্ত্রণায় জ্বলন্ত ছাই ফেলেছিল সে। তারপর সেই অপরাধের শাস্তি দিয়েছিল নিজেকেই। একটার পর একটা জলন্ত সিগারেট নিজের হাতের উপর চেপে ধরে। যেন দেহের ক্ষত দিয়ে মনের ক্ষতকে ঢেকে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে পোড়া দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর আবার নতুন একটি সিগারেট ধরায়। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।

হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে যায় এক জোড়া হাই হিল। তার ছুঁড়ে ফেলা সিগারেটের ছাইয়ের উপর এসে থেমেছে। সারহাদ ধীরে ধীরে মুখ তোলে তাকায়, নজরে আসে সামনে দাঁড়িয়ে আছে সিতারা আদিল। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। বাতাসে শুধু সিগারেটের ধোঁয়া আর অসমাপ্ত নীরবতা ভেসে বেড়ায়। সিতারা এগিয়ে এসে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই গাড়ির গায়ে হেলান দেয়। কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে আওড়ায়,
—”মিসেস জাওয়ান বারবার নিষেধ করার পরও আমাকে নিমন্ত্রণ করেছেন। আমি না করতে চেয়েছিলাম। তবুও উনি আমাকে আসতে বাধ্য করেছেন। মেয়েটার মনটা সত্যিই অদ্ভুত বড়… তাই না?”
সারহাদের তরফ থেকে কোনো উত্তর আসে না। ভাব এমন, যেন কথাগুলো তার কানেই পৌঁছায়ইনি। সে ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে। সিতারা মৃদু হেসে ফের বলে,

—”আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি, মুভ অন করার। জানিনা হবে কিনা তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কি”
এবার সারহাদ একবার তার দিকে তাকায়, তারপর আবারও সামনে ফিরে বলে,
—”বেস্ট ডিসিশন”
সিতারা মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়,
—”হুম, অনেক দেরিতে হলেও বুঝেছি… যে গল্পের উপসংহারে নিজের নাম লেখা নেই, সেই গল্পের শেষ পাতার জন্য অপেক্ষা করাটা অর্থহীন”
বাক্যটার মর্মার্থ ধরতেই সারহাদের ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে,
—”সবাই এত সহজে বুঝতে পারে না”
—”আপনিও বুঝুন”
—”কোনটা”
—”যে কিছু মানুষকে ছেড়ে দিতে হয়”
সারহাদ নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে থাকে। তারপর হাতের সিগারটা দুই ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে শুধালো,
—”ছেড়ে দেওয়া আর ভুলে যাওয়া এক জিনিস নয়”
—”কিন্তু আপনি তো নিজেকেই শেষ করে ফেলছেন”
—”হয়তো”
—”কেন?”
সারহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার ভিতর টা যে কেউ বুঝতে পারবে না স্বয়ং তার ছোট ভাইও না সে তা জানে। আর না সে কাউকে বুঝাতে পারবে তবুও খুব নিচু স্বরে বলে,

—”কেননা কিছু মানুষকে ভালোবাসা বন্ধ করা যায় না। তারা চলে যায়, অথচ হৃদয় থেকে তাদের বিদায় নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না”
এই বাক্য শুনে রমণী সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে যায়। কিয়ৎকাল পর আবারও বলে,
—”যাকে কোনোদিন পাবেন না, তার জন্য এতটা তৃষ্ণার্থের মতো হাহাকার কেন?”
সারহাদের অধরে খেলে যায় বেদনাভেজা এক হাসি যার অর্থ কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। সিগারের শেষ ধোঁয়া আকাশ পানে ছেড়ে উদাসী ভাবে শুধালো,
—”ভালোবাসা কি পাওয়ার জন্য হয়, মিস আদিল?
সব নদী সমুদ্রে পৌঁছায় না, তবুও তারা প্রবাহিত হয়। সব প্রার্থনা রবের দুয়ারে কবুল হয় না, তবুও বান্দা হাত তোলে। সব ভালোবাসা মিলনে শেষ হয় না, তবুও মানুষ ভালোবাসে। সবাই যদি পেয়ে যায়, তবে না পাওয়ার মহত্ত্ব কোথায় থাকবে?”
সিতারা নির্বাক হয়ে যায়। রমণী কল্পনাও করেনি সারহাদ এমন যুক্তি দেখাবে। মনে মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সে কি সারহাদকে ঠিকভাবে ভালোবাসতে পারেনি। সারহাদ যেই ভালোবাসার কথা বলছে সেটাতো আদি অন্তহীন, যার সাথে পাওয়া না পাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। সারহাদ আরেকটি সিগারেট জ্বালায়। ধোঁয়ার আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফের বলে,

—”শুধু একটা আফসোস রয়ে গেল…”
সিতারার ভ্রম ছুটে যায়। মেনে নিল, তার ভালোবাসায় কমতি ছিল। সে আশা করছিল, সারহাদ শেষ পর্যন্ত তার হবে আর সারহাদের আশারা মরে গেছে, কিন্তু ভালোবাসা একরত্তিও কমনি বৈকি বেড়েছে। নিজের হতাশা ব্যক্ত না করে প্রশ্ন করে,
—”কি আফসোস?”
—”এই যে, কেউ একজন তাকে দূর থেকে পাগলের মতো ভালোবেসে গেল… অথচ সে কোনোদিন জানতেই পারল না”
—”আপনার অন্তত এখন ওকে ভুলে যাওয়া উচিত”
যদিও সিতারা জানে তা নিঃসঙ্কোচে অসম্ভব। বিপরীত মানবও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে,
—”আপনি কি আমাকে শ্বাস নিতে ভুলে যেতে বলছেন?”
সিতারা থমে যায়। রমণী বুঝে গেল, এই পাথর মানবকে বুঝানো অসম্ভব যার মনটা শুধুমাত্র একবারই গলেছিল। আর তার উষ্ণতা সে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে চায়। সে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শেষবারের মতো বলে,
—”সে আবার মা হতে চলেছে”
কথাটা বলে সে ধীরে ধীরে সরে যায়। কিছুদূর গিয়ে আর পিছনে তাকায় না, আজ আর তাকাবে তাতে হৃদয় যতই ভেঙে পড়ুক। আর নিজের আত্মসম্মান কে ছোট করতে পারবে না। আজ চোখের অশ্রুকেও গুরুত্ব দিল না সিতারা, কেননা সে কীভাবে জানবে হৃদয়ের বেদনা। ঐদিন বৃষ্টির মধ্যে সে সত্যিই ভীষণ ইমোশনাল হয়ে গেছে কিন্তু আজ আর না।
সারহাদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। চোখদুটো কেমন অস্বাভাবিকভাবে চকচক করে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর সে ফিসফিস করে,
—”হারানোর যন্ত্রণা তুমি বুঝবে না, সানাম…কেননা যাকে পৃথিবী তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়, তার শূন্যতা কোনো ভাষায় লেখা যায় না। আমি প্রতিদিন সেই শূন্যতার ভেতর বেঁচে আছি… আর তুমি এখনো হারাওনি”
শেষ সিগারেটটুকু মাটিতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দিয়ে তারপর গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসে। একটার পর একটা কালো গাড়ি তার পেছনে সারিবদ্ধভাবে চলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তারা রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরও ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল প্রাঙ্গণে উৎসবের আমেজ এতটুকুও কমেনি বরং কৃত্রিম আলো, ফুলের সুগন্ধ আর মানুষের হাসি আনন্দে পরিবেশটা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একাধিক ক্যামেরাম্যান। কেউ লাইট ঠিক করছে, কেউ লেন্স বদলাচ্ছে, কেউ আবার সবাইকে নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ানোর অনুরোধ করছে। চারপাশে নিরন্তর ফ্ল্যাশের ঝলকানি, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর আর হাসির রোল।
অনেকেই ইতোমধ্যে নবদম্পতিদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেলেছে। তবে আরজে সানাকে কারও সঙ্গে একা ছবি তুলতেই দিচ্ছে না। যেই কাছে আসছে, সেই আরজের রক্তচক্ষুর মুখোমুখি হচ্ছে। আর কারো সাহস হয়ে উঠেনি তার সেই চোখ উপেক্ষা করে সানার কাছে যাওয়ার। অন্যদিকে জ্যাকের অবস্থাও একই। সে ইবেলিনার কাছাকাছি কাউকে ঘেঁষতেও দিচ্ছে না। শেষমেশ সবাই হাল ছেড়ে দেয়। সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত শুধু মেয়েরাই আলাদা ছবি তুলবে। আর তাদের ছবি তুলবে এসপি।
হাতে ক্যামেরা নিয়ে এসপি বেশ ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সানা, ঈশানী, সানিতা আর ইবেলিনা বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। ঠিক তখনই ঈশানী ফ্রেমের একটু বাইরে সরে যেতেই এসপি মুখ তুলে আদেশ ছুঁড়ে,
—”মিসেস নাগিন…সরি সরি, আই মিন, মিস…”
কথার মাঝখানেই সে থেমে যায়। পরমুহূর্তে কিছু একটা ভেবে ক্যামেরা নামিয়ে সন্দেহ জনিত গলায় প্রশ্ন করে,
—”তো মিস ঈশানী, আজ থেকে কি আমি আপনাকে মিসেস নাগিন বলে ডাকতে পারি? না মানে… পরে আবার ছোবল মেরে বসবেন না তো?”
কথাটা শুনে মুহূর্তেই সবাই থমকে যায়। ঈশানী বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এসপি আচমকা এমন কথা বলবে এটা সে কল্পনা করেনি। তারপর ধীরে ধীরে চোখ সরু করে বলে,

—”কি বললে?”
এসপি সঙ্গে সঙ্গে দু’পা পিছিয়ে যায়। ঠিক তখনই সানা পাশে দাঁড়িয়ে তার মাথায় একটা চাপড় মেরে বলে,
—”আবে ইয়ার, কি বলছিস মিসেস নাগিন। বলবি মহারানী ডাকেশ্বরী”
কারো বোধগম্য হলো না সানার কথা তাই সবাই একসাথে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
—”ডাকেশ্বরী, মানে?”
—”আরেএএ…খুব সিম্পল ব্যাপার।
নাগিনদের রানীকে বলে নাগেশ্বরী,
যারা একটু মটু তাদের বলে মটেশ্বরী,
আর যারা ডাক্তারের বউ তাদের বলে ডাকেশ্বরী।”
কথাটা শেষ হতেই চারপাশে হাসির বিস্ফোরণ ঘটে। রিজভী দূর থেকে ঠোঁট চেপে ধরে হাসছে। ঈশানী দাঁত চেপে সানার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”আচ্ছা… আর সুপারস্টারের বউদের কে বলে…..”
সানা তার কথা কেটে বলে,

—”মেগাস্টার, সুপারস্টারের বউদের মেগাস্টার বলে”
হাত নেড়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিল তার কথাটা ঈশানী। পরিবর্তে কোমরে দুই হাত গুজে আওড়ায়,
—”ডাইনিস্টার, সুপারস্টার এর বউ ডাইনিস্টার তুই”
—”কালনাগিনীর বাচ্চা, কি বললি তুই?”
সানার ভাবমূর্তি এমন যেন সে এখনই হামলে পড়বে তার উপর আর বিপরীতে ঈশানীও এক নড়তে নারাজ। পরিস্থিতি হিতে বিপরীত হচ্ছে বুজে সানিতা আর ইবেলিনা দুজনকে সরিয়ে দিয়ে মাঝে তারা অবস্থানে নেয়। আর যে এইসবের মূল হোতা এসপি, সে দাঁত কেলিয়ে হেসে সবাইকে আদেশ করে,
—”অল দ্যা লেডিস, স্মাইল প্লিজ….ওয়ান, টু, থ্রি…”
সাথে সাথে ক্লিক। আর চার রমণীর ঠোঁটে ফুটে ওঠে বিস্তৃত হাসি। সেই হাসিখুশি দৃশ্যটার দিকে একটু দূর থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আয়ান। তার চোখে যেন অদ্ভুত এক আলো, হয়তো আনন্দের, হয়তো বেদনার কিংবা হয়তো দুটোরই। ধীরে ধীরে তার চোখের কোণ ভিজে ওঠে। সে দ্রুত পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখ মুছে ফেলে। কেউ যেন না দেখে। তারপর মাথা তুলে তাকায় সন্ধ্যার আকাশের দিকে। অসংখ্য আলোর ভিড়ের ওপারে কোথাও যেন সে খুঁজে ফেরে এক পরিচিত মুখ, তা নিঃসন্দেহে রিয়ানার। আজ যদি রিয়ানা থাকতো তাহলে হয়তো তার এমন বাচ্চামোর জন্য তাকে বকা দিত, কেইবা নিজের প্রেয়সীকে তারাদের ভিড়ে খুজে?
কিন্তু আয়ান খুঁজে। জানে নেই তবুও খোঁজে। জিহবা দিয়ে নিজের অধর ভিজিয়ে খুব নিচু স্বরে সে বিড়বিড় করে,

—”দেখতে পাচ্ছেন, কল্পবাসিনী। সবাই কত সুখী….
আজ ওদের সবার গল্প পূর্ণতা পেল। আপনি থাকলে হয়তো আজ এই ছবিটার এক কোণে আপনিও দাঁড়িয়ে থাকতেন। হয়তো কিয়ান আপনার হাত ধরেই দৌড়ে বেড়াত, হয়তো আমিও আজ এত একা লাগতাম না”
এক ফোঁটা জল কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সে আকাশের দিকে তাকিয়েই ফের বলে,
—”জানেন, শুরুতে আমি কখন যে আপনার প্রেমে এতটা পড়েছিলাম, নিজেও বুঝিনি।আর যখন বুঝলাম…..”
হঠাৎ সে হালকা হেসে ফেলে। সেই হাসি মোটেও আনন্দের ঠেকলো না বরং তাতে বেদনার ভাগই বেশি,
—”তখন দেখলাম আপনি অন্য কারো স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন, আপনার চোখে অন্য কারো নাম ছিল, আপনার হৃদয়ে অন্য কারো ঠিকানা ছিল”
বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে আসে ধীরে ধীরে। যেটাকে সে এতক্ষণ ধরে আটকে রেখেছিল,
—”কল্পবাসিনী, আমি কখনো আপনাকে দোষ দিইনি, রিয়ানা। ভালোবাসা তো আর জোর করে পাওয়া যায় না। শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়…যদি একবার জানতে চাইতেন, কতটা ভালোবেসেছিলাম আপনাকে, যদি একবার জানতেন, কত রাত আমি আপনার নাম নিয়েই ঘুমিয়েছি…যদি একবার জানতেন, আপনার অনুপস্থিতিও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপস্থিতি ছিল…”
সে আবারও চোখ বন্ধ করে। আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিজের প্রেয়সীর হাসি খুশি চেহারাটা। কিছুক্ষণ মন ভরে তাকে দেখে ফিসফিস করে বলে,
—”আজ সবাই নতুন জীবন শুরু করছে। আর আমি এখনো সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি…”
ঠিক তখনই নিচ থেকে ছোট্ট একটা কণ্ঠ ভেসে আসে,

—”পাপা”
—”পাপা”
আয়ান নিজের ভ্রম ছুটিয়ে নিচে তাকায়। কিয়ান দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখভর্তি হাসি। আয়ান দ্রুত চোখ মুছে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই নিজের ভাঙাচোরা অনুভূতিগুলো বুকের গভীরে লুকিয়ে ফেলে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে দু’হাত বাড়িয়ে দেয়।
কিয়ান দৌড়ে এসে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আয়ান তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। হয়তো কিছু ভালোবাসা হারিয়ে যায় কিন্তু কিছু ভালোবাসা আবার নতুন রূপে ফিরে আসে।
আর সেই মুহূর্তে, কিয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে, আয়ানও ধীরে ধীরে ফিরে যায় আলো, হাসি আর মানুষের ভিড়ে।

রাত বাড়ার সাথে সাথে ব্ল্যাক ম্যানশনের আঙিনার ভিড়ও কমে আসছে। সাধারণ মানুষ সব বেরিয়ে গেছে। এখন যারা আছে তারা হলো কিছু গেস্ট আর মিডিয়ার লোক। তারা সবাই একের পর এক সবাই ছবি তুলছে। কেউ পারিবারিক ছবি, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার নবদম্পতিদের ঘিরে স্মৃতির মুহূর্ত বন্দি করতে ব্যস্ত। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের মাঝেও একজন মানুষ যেন নিজেকে ইচ্ছে করেই আড়াল করে রেখেছে, সেটা হলো কাইলিন।
এক কোণে দাঁড়িয়ে সে নিঃশব্দে সবকিছু দেখছিল। আজ জ্যাক না থাকায় সম্পূর্ণ সিকিউরিটির ভার তার উপর। তার জন্য সারাদিনে সে একজায়গায় বসতে পর্যন্ত পারে নি। দুই একবার শুধু ঐ পিচ্চি টাকে দেখেছিল যে সম্পূর্ণ মেরুন রঙের লেহেঙ্গা পরিধান করেছিল। যেহেতু সিয়ার কোলাহল একদম পছন্দ না তাই সে পুরো অনুষ্ঠানে দূরে দূরেই ছিল। ভিড় কমে যাওয়ায় এসেছে সানাদের সাথে ছবি তুলতে।
এদিকে সানা দূর থেকেই কাইলিন কে লক্ষ করে। সে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবশেষে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,

—”কি ব্যাপার, মিস্টার চাইনিজ সান্ডা? সবাই ছবি তুলছে, আর আপনি এখানে একা একা তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
কাইলিন হালকা কেশে প্রতুত্ত্যর করে,
—”আমি ঠিক আছি, ম্যাম”
—”আপনি যে ঠিক নেই তা আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আর কতদিন সিঙ্গেল থাকবেন? এবার মিঙ্গেল হওয়ার ব্যবস্থা টাও করুন”
কাইলিন প্রায় হকচকিয়ে উঠে। একেতো সানা তাকে ঐ পুচকে আর পিচ্চির দেওয়া উপাধিতে ডেকেছে তার উপর এখন বিয়ের কথাও বলছে,
—”না, না, না। এসব বিয়ে-টিয়ে আমার দ্বারা হবে না”
সানা দুই হাত কোমরে রেখে শুধায়,
—”কেন হবে না?”
—”কারণ বিয়ে মানেই ঝামেলা”
—”কে বলেছে?”
—”আমার অভিজ্ঞতা বলেছে”
—আপনার অভিজ্ঞতাকে ডাকুন, আমি তার সঙ্গে কথা বলব”
কাইলিন হতভম্ব হয়ে গেল। এখন সে কীভাবে অভিজ্ঞতাকে ডাকবে। সামনের রমণী একপলক আড়চোখে তাকিয়ে বলে,

—”শুনুন, বিয়ে মানে শুধু ঝামেলা নয়। বিয়ে মানে হাসি, দুষ্টুমি, খুনসুটি, ভালোবাসা, ঝগড়া, আবার সেই ঝগড়ার পর মিল। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিশৃঙ্খলার নাম বিয়ে”
—”ম্যাম, প্লিজ, কেন শুধু শুধু আমার পিছনে পড়েছেন। আমি সিঙ্গেল লাইফে খুশি। কোন ঝামেলায় জরাতে চাই না”
বিপক্ষে রমণী মানতে নারাজ, সে তার কথা বাঁধা দিশে বলে,
—”আরে আপনি আমাদের সবাইকে দেখুন। আমরা বিয়ে করেছি না, কোনো ঝামেলা আছে, বলুন? না না, আপনি বলুন। যদি বিশ্বাস না হয়, আপনি আপনার ডানে দেখুন…”
দুজনেই একসঙ্গে ডানদিকে তাকায় আর সঙ্গে সঙ্গে নজর আটকায় এসপি ও সানিতার উপর। এসপি সানিতাকে চিৎকার করে জোরে জোরে বলছে,
—”দেখ, সানি, আমার মেয়েটা সেই বিকাল থেকে উপোস করে বসে আছে। তাড়াতাড়ি চল আমার অ্যাঞ্জেলের কাছে”
কিন্তু সানিতা মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে,
—”তোমার মেয়েকে প্রতিবার আমি কেন খাওয়াব। তোমার মেয়েকে তুমি খাওয়াও”
—”আরে আমার মা, মানে আমার বউ, আমি কীভাবে খাওয়াব, সানি চল”
বিপরীতে রমণী একটুও টললো না। বরং জেদ ধরে বলে,
—”আমি আরজের অটোগ্রাফ ছাড়া কোথাও যাব না”
—”আমি বলছি চল”
—”আমি বলছি যাব না”
—”চল”
—”যাব না”
দুজনের তর্ক শুনে কাইলিন একটা ফাঁকা ঢুক গিলে ধীরে ধীরে সানার দিকে তাকায়। বহু কসরতে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,

—”ম্যাম… আমি দেখে নিয়েছি, বিয়ের পর মানুষ কত হাসিখুশি থাকে”
সানা তার কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে বলে,
—”আরে, আপনি বুঝতে পারছেন না। এরকম এক দুটো হয়। তার মানে এই নয় যে সবাই খারাপ। বিশ্বাস না হলে, আপনি আপনার বামে দেখুন”
কাইলিন সানার কথা মতো বামে একসঙ্গে তাকিয়ে দেখে ঈশানী আর রিজভী। সেখানে বেচারা রিজভী প্রাণপণে ঈশানীকে বোঝানোর চেষ্টা করছে,
—”ঈশু, আমাকে হসপিটালে যেতে হবে। জরুরি কেস”
—”না”
—”পেসেন্টে অবস্থা খারাপ”
—”তাহলে পেসেন্ট কে বলো কাল আসতে”
—”ঈশু…”
বিপরীতে মানবী শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
—”আজ যদি এই ম্যানশন থেকে এক কদম বাইরে যাও, আমি এই মুহূর্তে বিয়ে ভেঙে দেবে”
রিজভী স্তম্ভিত হয়ে বলে,

—”কিন্তু আমাদের তো বিয়ে হয়ে গেছে”
—”হয়েছে তো, তো কী হয়েছে? তুমি শুধু এই ম্যানশনের বাইরে এক কদম রেখে দেখো। তারপর আমি কী করি, সেটাও তুমি দেখবে”
এই বলে সে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। আর রিজভী তার পিছন পিছন যাচ্ছে তাকে বোঝাতে,
—”ঈশু প্লিজ, বোঝার চেষ্টা করো’
কাইলিনের এবার মুখের মেকি হাসিটাও উড়ে গেল। সে সেদিক থেকেও মুখ ফিরিয়ে সানাকে বলে,
—”ম্যাম, প্লিজ…”
রমণী ফের তার কথা কেটে বলে,
—”আরে, এরকম এক-দুইটা তো হয়ই। আপনি বুঝতে পারছেন না’
—”আপনি বামেও এই কথা বললেন, ডানেও এই কথাই বলছেন, ম্যাম”
—”আমি আপনাকে কী বলেছি? এক-দুইটা হয় এমনই। আপনার ডানের একটা হয়েছে, বামে আরেকটা হয়েছে। মোট দুইটা হয়েছে। এবার দেখবেন তিনটার সময় আর হবে না। আপনি পিছনে তাকান”
কাইলিন আর কী বলবে? শতহোক বসের বউ বলে কথা। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে পিছনে তাকাতেই দেখে আয়ান কিয়ানের এক জুতা নিয়ে দৌড়াচ্ছে আর তাকে বলছে,

—”কিয়ান, বাবা, প্লিজ এদিকে আসো। জুতাটা পরে নাও”
কিন্তু কিয়ান জেদ করছে, নাহ, সে জুতা পরবে না। সে আরভির সাথে খেলবে। অন্যদিকে কিয়ারা কান্না করছে, কিয়ান তাকে মেরেছে। একা আয়ান একবার কিয়ানকে বুঝাচ্ছে, আরেকবার কিয়ারাকে বুঝাচ্ছে।
কাইলিন মুখ কুঁচকে কিছু বলবে তার আগেই সানা বলল,
—”ইসকা বিবি গায়েব হ্যায়। এ লিস্ট কি বাহার হেয়। আচ্ছা, আপনি একে ছাড়েন। আর সামনে তাকান। আপনি সামনে তাকালেই দেখতে পাবেন বিয়ে কত হাসিখুশি লাগে”
কাইলিন আর সানা একসঙ্গে সামনে তাকাতেই দেখে জ্যাক আর ইবেলিনা। যেখানে ইবেলিনা জ্যাককে কখন কড়া কড়া কথা শোনাচ্ছে, কেন তাকে সবার সাথে ছবি তুলতে দেয়নি, কেন জ্যাক এমন করছে। জ্যাকের এইরকম টক্সিক ব্যবহার ইবেলিনা আর সহ্য করবে না। ইবেলিনার শেষ বাক্যটা শ্রবণ হতেই জ্যাক ক্ষুদ্ধ চক্ষু নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে,

—”কী? কী বললে? তুমি সহ্য করবে না, মানে? সারা জীবন তোমাকেই আমাকে সহ্য করতে হবে”
তারপর সন্দিহান দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধালো,
—”কোথাও তুমি বিয়ে বাড়িতে অন্য কাউকে দেখে ফেলোনি তো, মোরনি জান?”
জ্যাকের স্বরে ভয়ংকর কিছুর টের পেয়েও ইবেলিনা চড়া গলায় বলে,
—”আপনার এই সন্দেহের জন্য আজকে আপনি আমার কক্ষে আসবেন না”
ইবেলিনা এবার হাতে থাকা বিয়ের মালাটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে সামনে ধুপধাপ কদম ফেলে চলে যায়। জ্যাক পিছন থেকে বলছে,
—”লিনা, ভালো হবে না কিন্তু। তাড়াতাড়ি আমার সামনে এসে দাঁড়াও এই মুহূর্তে, এক সেকেন্ডে। তোমার সাহস কীভাবে হলো আমাকে এভাবে ইগনোর করে যাওয়ার?”
কিন্তু ইবেলিনা না এসে সেখান থেকে চিৎকার করে,
—”পারব না”
জ্যাক এক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁত চেপে মালাটাকে তুলে সেই ইবেলিনার পিছু পিছু যেতে যেতে বলে,
—”লিনা, স্টপ। লিনা, কাম হিয়ার”
কাইলিন চোখ ফিরিয়ে সানার দিকে তাকিয়ে একটা বড়সড় শুষ্ক ঢোক গিলে গলাটাকে ভেজানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু গলাটা কিছুতেই ভিজছে না। শুকনো গলায় আবারও বলে,

—”ম্যাম, আপনি এক দুইটা বলেছেন। আমি তিন চারটা পর্যন্ত দেখে ফেলেছি, সব একই। এই জ্যাকের মতো বান্দার অবস্থা দেখেছেন? যে এক কথা দুইবার বলে না, সেই জ্যাক বউয়ের পিছু পিছু মালা নিয়ে ঘুরছে। ম্যাম, আপনি কেন শুধু আমার পিছনে পড়ে আছেন?”
সানা আবারও তাকে বোঝানো ভঙ্গিতে বলে,
—”আরে, সবাই আপনার চারপাশে এমন হলে ঠিক আপনার সামনে যে এমন হবে, এমন কোনো কথাই নেই। আপনি আমাকে দেখুন। আমি বিয়ে করে কত হাসিখুশি লাইফ লিভ করছি। দেখতে পাচ্ছেন তো….”
ঠিক এমন মুহূর্তে আরজে পিছন থেকে ডেকে ওঠে,
—”ওয়াইফি…”
সানার কথায় ডিস্টার্ব হওয়াতে সে বিরক্ত হয়ে তাড়াহুড়ো করে থামিয়ে বলে,
—”দাঁড়ান, এক মিনিট। মিস্টার চাইনিজ আপনি দেখতে পেয়েছেন?”
আরজে আবার তাকে ডাকে,

—”ওয়াইফি”
—”এক মিনিট”
—”হেই লিসেন টু মি”
— “এক মিনিট!”
এভাবে চতুর্থবার ডাক আসতেই সানা ঘুরে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠে,
—”সমস্যা কী আপনার? কখন থেকে ম্যা ম্যা ম্যা করছেন কেন?”
তার এমন ধমকে কাইলিনসহ কেঁপে উঠেছে। আরজে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে,
—”রিশকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না”
সানা এবার শান্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে,
—”সিরাতকে দেখতে গেছে, আমাকে বলে গেছে, হয়েছে? এবার এদিকে আসুন”
আরজেও সানার কথামতো তার সঙ্গে এসে পড়ে। সানা তার হাত ধরে কাইলিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
—”দেখছেন? আমরা কত হাসিখুশি হ্যাপি লাইফ লিভ করছি”
আরজে তাকে ভ্রু কুচকে শুধরে বলে,
—”লিড”
—”হ্যাঁ, ঐ একটা হলেই হলো, সান্ডাজি আপনি দেখুন”
আরজে সানার কথা কিছুই বুঝল না। তাই সে কাইলিনের দিকে তাকায়। সানা আরজের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলে,
—”একটা হাসি দিন”
আরজে তার কথামতো হেসে তার দিকে তাকায়। সানা তার দিকে তাকিয়ে আবার কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
—”সামনের দিকে তাকান”
আরজে বাধ্য স্বামীর মতো মুখে হাসি রেখেই সামনে কাইলিনের তাকায়। সানা এবার কাইলিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

—”দেখলেন তো কতটা হাসিখুশি আমরা?”
কাইলিন বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে বলে,
—”ম্যাম, খুব করে দেখতে পেয়েছি। আমার আর দেখার দরকার নেই।”
সানা আরজের হাত ছেড়ে বলে,
—”আরে না না, আপনি বুঝতে পারছেন না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, আপনার কি রকম লেভেল দরকার। আপনার, আপনার লেভেলের নয়, আপনার একটু নিচু লেভেলের দরকার। তাই না?”
কাইলিন তার কথায় চোখ উল্টে ঘুরাতেই নজর আটকে যায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর ওপর। আর মুহূর্তেই যেন চারপাশের শব্দ ঝাপসা হয়ে গেল। অদূরে সিয়া একা দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। পাঁচ ইঞ্চি হাই হিল পরে সে সাবধানে হাঁটছে, হালকা বাতাসে তার রেশমে মতো সিল্কি চুল উড়ে এসে মুখে পড়ে বারবার তাকে বিরক্ত করছে। কাইলিনের মনে হলো, কেউ যেন ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সমস্ত কোলাহল থেকে আলাদা এক নীরবতার দ্বীপ হয়ে গেছে। তার দৃষ্টি আর ফিরল না।এদিকে সানা তখনও কথা বলেই যাচ্ছে। কিন্তু কাইলিন শুনছেই না। সে শুধু তাকিয়ে আছে সিয়ার দিকে একদম মুগ্ধ হয়ে।
সানা কথা বলতে বলতে কয়েকবার কাইলিনের দিকে তাকায়, তারপর তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সিয়ার দিকে তাকায়। আর এক মুহূর্তে সানার যা বুঝার তা বুঝে নিল। সানা দুই হাতে নিজের ভারী লেহেঙ্গা টা তুলে চিৎকার করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে কাইলিনের ঘোর কেটে যায়। সে লাফিয়ে উঠে,

—”কি?”
কিন্তু ততক্ষণে সানা দৌড় শুরু করে দিয়েছে,
—”বিটকেল….”
—”কেয়া হুয়া কটকটি?”
—”কাজি ডাক ইয়ার”
—”আবার কাকে বলি ছড়াবি?”
—”চাইনিজ সান্ডাকে….”
—”কিহহহ?”
পুরো গম্বুজ যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। আর কাইলিন নিজের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর আতঙ্ক নিয়ে সানার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে উঠে,
—”ম্যাম, শুনুন, আপনি ভুল বুঝছেন, প্লিজ”
কিন্তু সানা কারও কথা শোনার মুডে নেই। সে ইতোমধ্যে এসপি, সানিতা, ঈশানী, রিজভী সবাইকে ডাকতে শুরু করেছে। আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সিয়া কিছুই না বুঝে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আর কাইলিনের মনে তখন একটাই কথা ঘুরছে,
—”আজকে যদি এই মহিলা সত্যিই কাজি ডেকে ফেলে, তাহলে আমার জীবন এখানেই শেষ”

কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটি নিজের অবিবাহিত জীবন নিয়ে গর্ব করছিল, সে এখন বিয়ের মঞ্চে বরবেশে বসে আছে, সেই বান্দা আর কেউ না স্বয়ং কাইলিন। তার পাশেই বসে আছে তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী,সিয়া তালুকদার যে নাক টেনে টেনে কাঁদছে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়টা তার সঙ্গেই হয়ে গেছে। কাইলিন একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে কোটের পকেট থেকে একটা টিস্যু বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। সিয়া কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় সেটা কেড়ে নিল। পরমুহূর্তেই সেই টিস্যু দিয়ে নাক মুছে, চোখের জল মুছে, মুখ গোমড়া করে আবার সেটা কাইলিনের দিকেই ফিরিয়ে দিল।
কাইলিন হতবাক হয়ে ভেজা, কুঁচকে যাওয়া টিস্যুটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর সিয়ার দিকে তাকায় আবার টিস্যুর দিকে, আবার সিয়ার দিকে। সে যেন বুঝতেই পারছে না পৃথিবীর কোন নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহৃত টিস্যু ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু সিয়ার কটমট দৃষ্টি দেখে তার সমস্ত প্রশ্ন গলায় আটকে গেল। দ্রুত টিস্যুটা পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে সে গম্ভীর মুখে সামনে তাকিয়ে বসে রইল। যেন কিছুই ঘটেনি।

অথচ ভেতরে ভেতরে তার মনের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো। এখনো তার মাথায় ঢুকছে না কীভাবে সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল। কয়েক ঘণ্টা আগেও সে অবিবাহিত ছিল। আর এখন…এখন তার পাশে বসে থাকা এই ঝড়ের মতো মেয়েটা তার স্ত্রী। তার বৈধ, আইনসম্মত, সম্পূর্ণ নিজের স্ত্রী। ভাবনাটা মাথায় আসতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠে। অবশেষে পিচ্চিটা তার হয়ে গেছে। এখন যখন ইচ্ছে হবে রাগাবে, যখন ইচ্ছে হবে খেপাবে, যখন ইচ্ছে হবে জ্বালাবে। আর তারপর সেই রাগী মুখটা বসে বসে দেখবে। ভাবনাটুকুতেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত উচ্ছ্বাসের ঢেউ বয়ে গেল।
এদিকে অদূরে দাঁড়িয়ে সানা এখনো সিয়ার মা বাবাকে কীসব বুঝিয়ে চলেছে। কখনো হাত নাড়ছে, কখনো হাসছে, কখনো আবার এমনভাবে যুক্তি দিচ্ছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার হলো কয়েক মিনিটের মধ্যে কারো বিয়ে দিয়ে দেওয়া। অনেকক্ষণ পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়। অতিথিরাও বিদায় নিতে শুরু করে। আর একসময় সবাই নিজেদের ক্লান্ত শরীর নিয়ে ব্ল্যাক ম্যানশনের দিকে চলে যায়।
সারাদিনের অনুষ্ঠান, অতিথিদের ভিড়, অসংখ্য আনুষ্ঠানিকতা আর আবেগঘন মুহূর্তের পর যেন প্রত্যেকেই ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়েছে। যে ম্যানশন কয়েক ঘণ্টা আগেও মানুষের কোলাহল, হাসি, উল্লাস আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মুখরিত ছিল, এখন সেখানে ধীরে ধীরে নেমে এসেছে এক গভীর নীরবতা।
একজন একজন করে সবাই নিজেদের কক্ষে চলে যায়।
কিন্তু সানা সবার মতো নিজের কক্ষে গেল না।

হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে যায় সোফিয়ার রাতের ওষুধের কথা। সন্ধ্যার সময় বের হওয়ার আগে সে অবশ্যই একজন মেইডকে বলে গিয়েছিল, কিন্তু তারপরও অজানা এক অস্থিরতা তার মনে খচখচ করতে থাকে। যেন কিছু একটা ঠিক নেই। তাই আর সময় নষ্ট না করে সে সোজা চলে যায় সোফিয়ার কক্ষের দিকে। কিন্তু দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই থমকে যায় রমণী কেননা পুরো রুম খালি। সানা একে একে পুরো কক্ষে তল্লাশি চালায়, কিন্তু সোফিয়া তো দূর তার ছিটেফোঁটার অস্তিত্বও নেই। এক মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরে অস্বস্তির অনুভূতিটা তীব্র হয়ে ওঠে। আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে দ্রুত বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে চলে আসে আরজের কাছে। আরজে তখন কন্ট্রোল রুমে বসে দিনের শেষ কিছু নিরাপত্তাজনিত রিপোর্ট যাচাই করছিল। সানাকে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে দেখে সে কপাল কুঁচকে তাকায়,
—”ওয়াইফি? হোয়াট হ্যাপেনড?”
সানা নিঃশ্বাস সামলে বলে ওঠে,
—”মম নেই”
বাকিটা বলার আগেই আরজের মুখের সমস্ত রং যেন বদলে যায়। তার কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে। চোখ দুটো মুহূর্তে ধারালো হয়ে ওঠে। গম্ভীর স্বরে ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে,

—”হোয়াট ডু ইউ মিন, শি ইজ নট দেয়ার?”
—”আমি পুরো রুম চেক করেছি। কোথাও নেই”
কথাটা শোনার পর যেন পুরো কন্ট্রোল রুমের পরিবেশ বদলে যায়। আরজে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়। পরের মুহূর্তেই তার কণ্ঠ বজ্রপাতের মতো গর্জে ওঠে,
—”সার্চ দ্য হোল ম্যানশন, রাইট নাউ”
মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে সাইরেন বেজে ওঠে। চারদিক থেকে গার্ডরা ছুটে আসে। আরজে একের পর এক নির্দেশ দিতে থাকে। আর তার নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিটা ফ্লোর চেক করা হয়, প্রতিটা রুম, বাগান, গ্যারেজ, বেজমেন্ট, সিকিউরিটি রুম, এমনকি ছাদ পর্যন্ত তল্লাশি করা হয়। কিন্তু কোথাও সোফিয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। সময়ের সাথে সাথে আরজের মুখ আরও কঠোর হতে থাকে। তার তীক্ষ্ণ চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। শিরাগুলো পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কপালে।
অবশেষে ডেকে আনা হয় সেই চারজন গার্ডকে যারা সোফিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। চারজনই এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর আরজে তাদের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেন এই মুহূর্তেই তাদের জীবনের শেষ দিন। হঠাৎ নীরবতা কেটে ভেসে আসে আরজের গর্জন,

—”হোয়্যার ইজ শি?”
তার এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারল না। তারা ভেবেছিল, হয়তো সোফিয়া নিজের কক্ষে চলে এসেছে তাই ভয়ে ঐ সময় আরজে কে বলেনি। কাঁপতে কাঁপতে একজন বলে,
—”বস…লে..লেডি ভিড়ের মধ্যে নেমেছিলেন…আ….আমরা ফলো করছিলাম…তার…তারপর তাকে হারিয়ে ফেলি, বস”
কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আরজের চোখে যেন আগুন জ্বলে ওঠে। এক টানে কোমর থেকে বন্দুক বের করে ফেলে সে। পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে চারজন গার্ড প্রায় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগেই সানা তার হাত চেপে ধরে,
—”রানভীর, এখন মাথা গরম করে কিছু হবে না”
আরজে দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে যেন নিজেকে সামলানোর অধিক চেষ্টায় আছে সে। তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে রাগে। তারপর ধীরে ধীরে বন্দুকটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। হঠাৎই যেন তার মাথায় কিছু একটা খেলে যায়। রক্তিম বর্ণ হয়ে থাকা বাদামী চোখজোড়া খুলে সানার দিকে তাকিয়ে বলে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৫

—”ওয়াইফি…লেটস গো। আই নো হোয়ার শি ক্যান গো”
সানা তার বিপরীতে একটা প্রশ্নও করল না বরং নিঃশব্দে আরজের সাথে বেড়িয়ে পড়ে। পরের মুহূর্তেই একের পর এক কালো গাড়ি ব্ল্যাক ম্যানশনের প্রাসাদসদৃশ গেট অতিক্রম করে ঝড়ের বেগে রাতের অন্ধকার চিরে ছুটে যায় যেন রাতের বুক বিদীর্ণ করে ছুটে চলেছে কোনো অশুভ ভবিষ্যতের দিকে। অবশেষে সবগুলো গাড়ি এসে থামে জাওয়ান ম্যানশনের সামনে। আরজে আর সানা দুজনেই হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ম্যানশনের পেছনের অংশের দিকে এগোতে শুরু করে। কিন্তু ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে এক বিকট গুলির শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে ওঠে,
—”ঠাস্‌সসসস…”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here