Home Mad for you 2 Mad for you 2 part 24

Mad for you 2 part 24

Mad for you 2 part 24
তানিয়া খাতুন

এস.এ.পি ইন্সপেক্টর মিরাজ হোসেন—বাংলাদেশ পুলিশের একজন কিংবদন্তি কর্মকর্তা।
তার নাম শুনলে অপরাধীদের বুক কেঁপে উঠে, আর সাধারণ মানুষের মনে জেগে উঠত একরাশ ভরসা।
কর্মজীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি অসংখ্য দুর্ধর্ষ অপরাধীকে আইনের আওতায় এনেছেন।
সমাধান করেছেন এমন সব জটিল মামলা, যেগুলোর কিনারা করার সাহস পর্যন্ত অনেকেই দেখাতে পারেনি।
মানুষ তাকে সততার প্রতীক বলে জানে।
সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই তার প্রশংসা শোনা যায়।
তার সহকর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা করে, অধস্তনরা তাকে আদর্শ মানে।
অনেকের কাছেই তিনি যেন একজন নায়ক, একজন ত্রাণকর্তা।
কিন্তু মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ই কি তার সম্পূর্ণ পরিচয়?
মিরাজ হোসেনের চোখের গভীরে যে অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তার অন্তরের গোপন কুঠুরিতে যে স্মৃতিগুলো বন্দী হয়ে আছে,

সেগুলোর কথা আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি। হয়তো জানার চেষ্টাও করেনি।
আজকের দিনটা অবশ্য অন্য দিনের মতো নয়।
আজ তার একমাত্র মেয়ে আলিসার জন্মদিন।
প্রতিবছরের মতো এবারও তিনি নিজের সব ব্যস্ততা দূরে সরিয়ে রেখেছেন।
যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুক না কেন, এই দিনটা তিনি নিজের পরিবারের জন্য বরাদ্দ রাখেন।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়ি আলোয় ঝলমল করে উঠেছে।
রঙিন বেলুন, ফুলের সাজসজ্জা আর বিভিন্ন রকমের আলোকসজ্জায় বাড়িটাকে যেন ছোটখাটো এক রাজপ্রাসাদের মতো লাগছে।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী—সবাই একে একে এসে জড়ো হয়েছে।
ড্রইংরুমে হাসি-ঠাট্টা চলছে, কোথাও বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ, কোথাও আবার বড়দের গল্পের আসর।
কিন্তু এই আনন্দমুখর পরিবেশের মাঝেই একটি জরুরি ফোনকল আসে মিরাজ হোসেনের কাছে।
কলটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তিনি সবার কাছ থেকে সরে নিজের ঘরে চলে যান।
দরজা বন্ধ করে প্রায় দশ মিনিট ধরে কথোপকথন চলে।
অবশেষে ফোন রেখে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
তারপরই মনে পড়ল আলিসার কথা।
সকালে থেকেই মেয়েটা উত্তেজনায় অস্থির হয়ে ছিল।
বন্ধুদের নিয়ে নিজেই কেক কিনতে বেরিয়েছে। যাওয়ার সময় হাসতে হাসতে বলেছিল,

“বাবা, চিন্তা করো না। আমি ঠিক সময়েই ফিরে আসব।”
মেয়ের কথা মনে হতেই মিরাজ হোসেন ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে ফোন বের করলেন।
নম্বর ডায়াল করলেন।
“দুঃখিত, আপনি যে নম্বরে কল করেছেন সেটি এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে।”
রেকর্ড করা নারীকণ্ঠ ভেসে আসতেই তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল।
তবে খুব বেশি চিন্তিত হলেন না।
মেয়ে কে তিনি ভালো করেই চেনেন।
মেয়েটা স্বাধীনচেতা। নিজের মতো করে বাঁচতে ভালোবাসে।
বাইরে গেলে ফোন চার্জ দিতে ভুলে যায়, কখনও আবার ইচ্ছা করেই ফোন সাইলেন্ট করে রাখে।
তাই ফোন বন্ধ পাওয়া নতুন কিছু নয়।
মিরাজ হোসেন ফোনটা পকেটে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আবার ফোন বেজে উঠল।
তিনি থেমে গেলেন।
অপরিচিত একটি নম্বর।
কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে কলটি রিসিভ করলেন।

“হ্যালো?”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর ধীরে ধীরে ভেসে এল একটি ভারী, কর্কশ কণ্ঠস্বর।
কণ্ঠস্বরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত।
আর সেই শান্ত স্বরই যেন আরও ভয়ঙ্কর।
“মিস্টার মিরাজ হোসেন…”
মিরাজ সাহেবের চোখ সরু হয়ে এল।
“আপনার আদরের মেয়ে আলিসা এখন আমাদের কাছে আছে।”
মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের সব অভিব্যক্তি মুছে গেল।
বছরের পর বছর অপরাধীদের জেরা করতে করতে তিনি নিজের অনুভূতি লুকাতে শিখেছেন।
তবুও বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করে কেঁপে উঠল।
“আপনি কে?” ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
ওপাশ থেকে হালকা হাসির শব্দ শোনা গেল।
“সেটা জানার দরকার নেই। দরকার শুধু এটুকু জানা যে আপনার মেয়ে বেঁচে আছে।
আর তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে আমাদের কথা শুনবেন।”
মিরাজ হোসেন চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

“আলিসা কোথায়?”
“এত তাড়া কিসের, অফিসার?”
“ঠিকানা আপনাকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছে যাবেন।”
এরপর কণ্ঠস্বরটা আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।
“আর একটা কথা… কোনো রকম চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। পুলিশ, ট্র্যাকিং, ব্যাকআপ—কিছুই না।”
“আমাদের লোকজন আপনার ওপর নজর রাখছে। আপনি কখন শ্বাস নিচ্ছেন, কখন চোখের পলক ফেলছেন—সব খবর আমাদের কাছে আছে।”
মিরাজ হোসেনের মুঠো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।
ওপাশ থেকে শেষবারের মতো ভেসে এল সেই শীতল কণ্ঠস্বর—
“যদি সামান্যও বাড়াবাড়ি করেন… তাহলে আপনার মেয়েকে এমনভাবে টুকরো টুকরো করব যে সেগুলো গুনে শেষ করতে পারবেন না।”

কলটি কেটে গেল।
ঘরের ভেতর নেমে এল ভয়ঙ্কর নীরবতা।
মিরাজ হোসেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিন ধীরে ধীরে নিভে গেল।
বাইরে এখনও হাসির শব্দ ভেসে আসছে। অতিথিরা গল্প করছে।
কেউ জানেও না যে এই বাড়ির আনন্দের আকাশে ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর কালো মেঘ।
কিন্তু মিরাজ হোসেন জানেন।
এটা কোনো সাধারণ অপহরণ নয়।
এটা কোনো মুক্তিপণের খেলা নয়।
ফোনের ওপাশের লোকটার কণ্ঠে ছিল ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, বহু বছরের জমে থাকা ঘৃণা।
আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—
কথাগুলো শোনার পর তার মনের গভীরে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা একটি পুরোনো স্মৃতি ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করেছে।

একটি নাম…একটি মুখ…
এবং এমন একটি অতীত…
যেটাকে তিনি ভেবেছিলেন চিরতরে মাটিচাপা দিয়ে এসেছেন।
ফোন কেটে যেতেই নীল চেয়ার ছেড়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
কয়েক পা এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
— কী বলল ওই অফিসার?
— আরেকবার ভাব, ক্ৰুশ ওই অফিসার যদি পুলিশ নিয়ে চলে আসে, তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।
ক্ৰিৱ অস্থিরভাবে মাথা নাড়ল।
— কিছু হবে না। আমি ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়েই এগিয়েছি।
ওর মেয়ে ওর চোখের মণি। মেয়ের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
— আর একটা কথা। বারবার “ক্ৰুশ ক্ৰুশ” করে ডাকিস না।
রুহির সামনে যদি ভুল করে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, তাহলে অনেক বড় সমস্যা হয়ে যাবে।
নীল সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— সরি। ছোটবেলার অভ্যাস তো, তাই মাঝে মাঝে বেরিয়ে যায়।
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ ভেসে এল।
দুজনেই চমকে উঠল।
ক্ৰিশ ভ্রু কুঁচকে নীলের দিকে তাকাল।

— মেয়েটাকে কীভাবে বেঁধে রেখেছিস?
নীল বিব্রত মুখে বলে,
— আর বলিস না। ভীষণ চঞ্চল মেয়ে। একদম শান্ত হয়ে বসে থাকতে চায় না।
অনেক কষ্টে বেঁধে রেখেছিলাম। মনে হয় আবার কোনো কাণ্ড করেছে।
তুই গিয়ে দেখ, আমি দরজার কাছে আছি।
ক্ৰিশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘরের ভেতর এগিয়ে গেল।
ঘরটি প্রায় ফাঁকা।
একটি মাত্র চেয়ার আর কিছু পুরোনো আসবাবপত্র ছাড়া তেমন কিছু নেই।
মেঝের ওপর চেয়ারসহ উল্টে পড়ে আছে আলিসা।
তবুও মেয়েটা থেমে নেই। একবার এদিকে, একবার ওদিকে নড়েচড়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে।
ক্ৰিশ বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তারপর এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটা সোজা করে আলিসাকে ঠিকভাবে বসিয়ে দেয়।
শীতল কণ্ঠে বলে,
— একটু শান্ত হয়ে বসে থাকুন। আপনার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই।
যা আছে, সব আপনার বাবার সঙ্গে। তাই অযথা ভয় পাওয়ার দরকার নেই।
কিন্তু ক্ৰিশের র কথায় আলিসার যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।
সে বিস্মিত চোখে শুধু ক্ৰিশের দিকেই তাকিয়ে রইল।
এলোমেলো চুল, কালো রঙের খোলা শার্ট, গম্ভীর মুখভঙ্গি—অদ্ভুত এক ব্যক্তিত্ব রয়েছে মানুষটার মধ্যে।
আলিসা যেন চোখই সরাতে পারছে না।
কিছুক্ষণ পর সে আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলে,

— কিডন্যাপার যদি এমন সুদর্শন হয়, তাহলে আমি রোজ কিডন্যাপ হতে রাজি আছি।
কথাটা শুনে ক্ৰিশ থমকে গেল।
তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
মেজাজ বিগড়ে গেল।
ব্যক্তিগত তার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অন্য একটা মেয়ে তাকে এভাবে প্রশংসা করছে, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে—বিষয়টা যেন তার মস্তিষ্কে ধাক্কা মারল।
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
পরের মুহূর্তেই—
সপাটে একটা চড় পড়ল আলিসার গালে।
মুহূর্তে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে আলিসা।
ক্ৰিশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে ,
— শালী! আমার প্রশংসা মারাই….

ফ্ল্যাটের নিচে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট কুকুরছানাকে খাবার খাওয়াচ্ছিল আয়েশা। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল রুহি।
কুকুরছানাটা ক্ষুধার্ত ছিল বোধহয়। খাবার দেখেই লেজ নেড়ে নেড়ে খেতে শুরু করল।
সেটা দেখে আয়েশার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
রুহিও মৃদু হেসে তাকিয়ে ছিল প্রাণীটার দিকে।
কিন্তু হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেল কোকোর কথা।
সেদিনের ঘটনার পর থেকে কোকোকে আর একবারও দেখেনি সে।
মুহূর্তের মধ্যেই তার হাসি মিলিয়ে গেল।
কোকো এখন কোথায়?
সেদিন তো ক্ৰিশ তাকে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আর কখনো কুকুরটার দেখা মেলেনি।
রুহি ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগল।
ক্ৰিশ কেও তো একবারও কোকোকে খুঁজতে দেখেনি সে। এমনকি কোকোর কথা বলতেও শোনেনি।
তাহলে কি মানুষটা কোকোকে কোথাও দিয়ে এসেছে?
ভাবনাগুলো মাথায় আসতেই অকারণে মনটা খারাপ হয়ে গেল তার।
কোকোকে সে খুব বেশি দিন চেনে না, তবুও ছোট্ট প্রাণীটার প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মে গিয়েছিল।
আয়েশা কুকুরছানাটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

Mad for you 2 part 23

— দেখো না, কী সুন্দর!
রুহি হালকা হাসল ঠিকই, কিন্তু তার মন তখন অন্য কোথাও।
চোখের সামনে কুকুর ছানাটাকে দেখলেও বারবার কোকোর মুখটাই ভেসে উঠছে।
না, আজ ক্ৰিশ বাড়ি ফিরলেই সে জিজ্ঞেস করবে।
কোকো কোথায়?
কুকুরটা তো ক্ৰিশের খুব প্রিয় ছিল।
তাহলে এতদিন সে কোকোর কোনো খোঁজই নিলো না কেন?
প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল।

Mad for you 2 part 25

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here