Home Mad for you 2 Mad for you 2 part 44

Mad for you 2 part 44

Mad for you 2 part 44
তানিয়া খাতুন

হাসপাতালে ডাক্তারের কেবিনে নিঃশব্দ হয়ে বসে আছে ক্ৰুশ।
তার দৃষ্টি শূন্যে স্থির, অথচ মনের ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা মানুষটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না—কীভাবে সবকিছু এত দ্রুত বদলে গেল!
মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও তো সব ঠিকঠাক ছিল।
কিছুক্ষণ আগের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এখনও তার চোখের সামনে ভাসছে।
নিজের সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত অনুভূতি দিয়ে সে রুহিকে আদরে ভরিয়ে রেখেছিল।
মনে হয়েছিল পৃথিবীতে তাদের দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।
কিন্তু সেই সুখের মুহূর্তগুলো হঠাৎই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
হঠাৎ করেই রুহির শরীর খারাপ হয়ে যায়।

বমি শুরু হয়, ব্লিডিং শুরু হয় মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে, পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
ক্ৰুশের বুকের ভেতর তখন আতঙ্কের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল।
মুহূর্তের জন্যও দেরি না করে সে রুহিকে কোলে তুলে গাড়িতে বসায় এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসে।
এখন এই কয়েক মিনিটের অপেক্ষাও তার কাছে কয়েক বছরের সমান মনে হচ্ছে।
নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে ক্ৰুশের। মুঠো করে চেপে ধরা দুই হাত কাঁপছে।
“আমার আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল… বাটারফ্লাই কতটা কষ্ট পেয়েছে!
আমি কেন নিজেকে সামলাতে পারলাম না?”
অপরাধবোধে তার বুকটা ভারী হয়ে আসে।
যদি রুহির কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন একজন লেডি ডাক্তার।
দরজার শব্দে চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে আসে ক্ৰুশ প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

— “ডাক্তার! আমার স্ত্রী কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো? ওর কিছু হবে না তো?”
ডাক্তার কয়েক মুহূর্ত ক্ৰুশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
লোকটার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক, উদ্বেগ আর অসীম ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।
হালকা হাসি দিয়ে তিনি বললেন,
— “আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি আপনার স্ত্রীকে ভীষণ ভালোবাসেন, ভীষণ পজেসিভও।
কিন্তু এমন সময়ে আপনাদের আরও একটু সাবধান হওয়া উচিত ছিল।
নিজের স্ত্রীকে একটু বিশ্রাম দেওয়াও তো দরকার।”
ক্ৰুশ বিস্মিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “এমন সময় মানে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
ডাক্তার এবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন,
— “কেন? আপনি জানেন না? আপনার স্ত্রী গর্ভবতী।”
মুহূর্তেই যেন সময় থমকে গেল।
ক্ৰুশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ বড় বড় হয়ে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
যেন কথাগুলো তার কানে পৌঁছেছে, অথচ মস্তিষ্ক এখনও তা বিশ্বাস করতে পারছে না।
— “কি… কী বললেন? প্লিজ… আরেকবার বলুন। আমি… আমি ঠিক শুনতে পারিনি।”
ডাক্তার এবার মৃদু হেসে উঠলেন বুঝতে পারলেন, তারা এখনও এই সুখবর সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
তিনি কোমল স্বরে বললেন,

— “অভিনন্দন, মিস্টার ক্ৰুশ। আপনি বাবা হতে চলেছেন।”
শব্দগুলো শুনেই ক্ৰুশের সমস্ত পৃথিবী যেন বদলে গেল।
চোখ দুটো আনন্দে ভিজে উঠল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল।
জীবনে এত বড় সুখবর সে আগে কখনও পায়নি।
তার বুকের ভেতর যেন হাজারো আনন্দের ঢেউ একসঙ্গে আছড়ে পড়ছে।
সে… বাবা হতে চলেছে!
রুহি… তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর উপহার নিজের ভেতরে ধারণ করে আছে!
কিন্তু পরমুহূর্তেই আনন্দের জায়গা দখল করে নিল ভয়।
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ক্ৰুশ দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
— “ডাক্তার… আজ যা হয়েছে, তাতে আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি তো? রুহি ঠিক আছে তো? প্লিজ সত্যিটা বলুন।”

ডাক্তার আবারও আশ্বস্ত করে হাসলেন।
— “আপনি শান্ত হন। আপনার স্ত্রী এবং আপনাদের অনাগত সন্তান—দুজনেই সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।
চিন্তার কোনো কারণ নেই। আপনি সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন বলেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে আর এমন অসাবধানতা করবেন না।”
তিনি ফাইলের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
— “রুহির শরীর এমনিতেই বেশ দুর্বল।
এখন থেকে ওর বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
নিয়মিত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, সময়মতো ওষুধ এবং কোনো ধরনের অতিরিক্ত শারীরিক চাপ যেন না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
আগামী কয়েক মাস আপনার স্ত্রীকে আগের চেয়েও বেশি আগলে রাখতে হবে।”
— “আমি কথা দিচ্ছি ডাক্তার… আজকের মতো ভুল আর কখনও হবে না।
আমার স্ত্রী আর আমার সন্তানের কোনো কষ্ট আমি হতে দেব না।
নিজের জীবনের চেয়েও বেশি আগলে রাখব ওদের।”

প্রায় অনেকটা সময় ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আমান।
রাতের নীরবতা যেন ধীরে ধীরে আরও ঘন হয়ে উঠছে।
দূরে কালো আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা, কিন্তু সেই সৌন্দর্যও আজ তার চোখে ধরা পড়ছে না।
মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, শুধু তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলোরই শব্দ শোনা যাচ্ছে।
আর কিছুক্ষণ পরই হয়তো ভোর হবে।
নতুন একটা সকাল আসবে।
কিন্তু সত্যিই কি নতুন কিছু শুরু হবে? নাকি আগের মতোই সবকিছু জট পাকিয়ে থাকবে?
কালো আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমানের বুকটা হঠাৎ করেই আরও ভারী হয়ে উঠল।
“এই জীবনটা এত বিষণ্ন কেন?”
প্রশ্নটা সে নিজেকেই করল।
সে তো কখনো এত জটিল জীবন চায়নি।
খুব সাধারণ একটা সংসার, ভালোবাসায় ভরা কয়েকটা মুহূর্ত, অভিমান-মান ভাঙানো ছোট্ট ছোট্ট দিন—এটুকুই তো স্বপ্ন ছিল তার।
তাহলে কেন সবকিছু ঠিক হতে গিয়েও বারবার ভেঙে গেল? কেন সুখগুলো তার হাতের মুঠোয় এসেও ফসকে গেল?

একটা দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস ফেলে আমান ঘুরে ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই হঠাৎ অনুভব করল—কেউ তার দুই পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।
সে বিস্ময়ে নিচের দিকে তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠল।
সিমরান…
মেয়েটা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে।
দুই হাত দিয়ে আমানের পা আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
চোখের জল গড়িয়ে তার পায়ের ওপর পড়ছে।
আমান কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সে বুঝতেই পারেনি, কখন সিমরান ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, কখন নিঃশব্দে তার সামনে এসে বসেছে।
গলাটা শুকিয়ে এলো তার।
—”এসব কী করছো, সিমরান? উঠো… প্লিজ, আমার পা ছেড়ে দাও।”
কিন্তু সিমরান মাথা নাড়ল।
আরও শক্ত করে আমানের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
—”আমাকে… আমাকে আরেকবার আগের মতো ভালোবাসবেন, আমান?”
কথাগুলো বলতে বলতেই তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
—”আমার খুব ইচ্ছে করে আগের সেই দিনগুলো ফিরে পেতে।
আপনার সেই ভালোবাসা… সেই যত্ন… সেই শাসন… সেই ছোট ছোট অভিমান… সবকিছু।
আমি আবার সেই আগের সিমরান হয়ে যেতে চাই।”
সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

—”প্লিজ… যদি সারা জীবনের জন্য না-ও পারেন, অন্তত একটা দিনের জন্য… আমাকে আগের মতো ভালোবাসবেন?”
মুহূর্তের মধ্যেই আমানের চোখ ভিজে উঠল।
কী অদ্ভুত!
যে মেয়েটা একসময় তার অতিরিক্ত যত্নে বিরক্ত হতো, বারবার বলত—”এত কেয়ার করতে হবে না”—আজ সেই মেয়েটাই সেই যত্নটুকুর জন্য কাঁদছে।
সত্যিই…মানুষ কাছে থাকতে ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারে না।
হারিয়ে ফেলার ভয় যখন বুকের ভেতর বাসা বাঁধে, তখনই বোঝা যায় একটি মানুষের উপস্থিতি কতটা মূল্যবান ছিল।
আমান ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল।
খুব যত্ন করে দুই হাতের তালুতে সিমরানের অশ্রুভেজা মুখটা তুলে নিল।
মেয়েটার লাল হয়ে যাওয়া চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর আলতো করে তার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল।
কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

—”আমার সঙ্গে নতুন করে সংসার করবে, সিমরান?”
সিমরান বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমান মৃদু হেসে আবার বলল,
—”চলো… সবকিছু নতুন করে শুরু করি।
পুরোনো সব কষ্ট, সব ভুল, সব অভিমান আজ এখানেই রেখে দিই।
আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে আর কোনো অভিযোগের সুযোগ দেব না।”
—”তোমার প্রতিটা হাসির দায়িত্ব আজ থেকে আমার।
তোমার চোখে আর কোনোদিন অশ্রু দেখতে চাই না। যতদিন বেঁচে থাকব, আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে তোমাকে সুখে ভরিয়ে রাখব।”
এক মুহূর্তও দেরি করল না সিমরান।
হঠাৎই ঝাঁপিয়ে পড়ল আমানের বুকে।

Mad for you 2 part 43

দুই হাতে তাকে এমন শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন একটু আলগা হলেই মানুষটা আবার হারিয়ে যাবে।
আমানও আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না।
সে নিজের প্রাণের মানুষটাকে বুকের ভেতর শক্ত করে চেপে ধরল।
বহু বছর পর যেন তার শূন্য বুকটা আবার পূর্ণ হয়ে উঠল।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্লান্তি, অভিমান আর একাকীত্ব ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগল সেই উষ্ণ আলিঙ্গনে।
চারপাশে তখনও গভীর রাত।
কিন্তু তাদের দুজনের জীবনে যেন নতুন ভোরের প্রথম আলো নিঃশব্দে নেমে এসেছে।

Mad for you 2 part 45

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here