Mad for you 2 part 42
তানিয়া খাতুন
দেখতে দেখতে একটি পুরো মাস কেটে গেছে।
এই এক মাসে রুহি আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
নিয়মিত চিকিৎসা, সবার যত্ন আর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে সে যেন নতুন করে জীবনে ফিরে আসছে।
তবে পুরোপুরি নয়। এখনও তার স্মৃতির অনেক অংশ এলোমেলো হয়ে আছে।
কিছু কিছু ঘটনা খুব স্পষ্টভাবে মনে পড়ে, আবার কিছু স্মৃতি ধোঁয়াশার মতো এসে মিলিয়ে যায়।
যতই মনে করার চেষ্টা করুক না কেন, কিছু মুখ, কিছু ঘটনা আর কিছু অনুভূতি যেন তার মস্তিষ্কের কোনো অন্ধকার কোণে আটকে আছে।
তবুও সে হার মানেনি। প্রতিদিন নিজেকে আরও একটু করে শক্ত করে তুলছে।
নিজের মানুষগুলোকে আবার নতুন করে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ক্ৰুশও সবসময় তার পাশে রয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও রুহিকে একা ছাড়ে না।
অফিসের ব্যস্ততা সামলেও প্রতিদিন তাকে সময় দেয়, ওষুধ খাওয়ায়, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়, গল্প করে, হাসায়।
রুহি যদিও এখনও সবকিছু মনে করতে পারেনি, তবুও সে বুঝতে পারে—এই মানুষটা তাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে।
ক্ৰুশের চোখে নিজের জন্য সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখলেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসে।
আজ সারাদিনের আবহাওয়াটাই ছিল অদ্ভুত। সকাল থেকেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে ছিল।
সন্ধ্যা নামার পর থেকেই শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি।
এখন তো যেন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে।
বাটারফ্লাই ম্যানশনটাও আজ অস্বাভাবিক নীরব।
বিশাল বাড়িটার প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি সিঁড়ি, প্রতিটি কোণ যেন বৃষ্টির শব্দে আরও বেশি নির্জন হয়ে উঠেছে।
জানালার কাঁচে অবিরাম বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে। বাইরে বড় বড় গাছগুলো ঝড়ের দাপটে এদিক-ওদিক দুলছে।
হঠাৎ করেই বিকট শব্দে বজ্রপাত হলো।
শব্দটা এতটাই ভয়ংকর ছিল যে পুরো বাড়িটাই যেন কেঁপে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলকানিতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ আলোকিত হয়ে আবার আগের মতো অন্ধকারে ডুবে গেল।
দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার টিকটিক শব্দও যেন আজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা জানিয়ে দিচ্ছে—রাত ঠিক দশটা।
আজ সন্ধ্যায় ক্ৰুশ আর রুহি একসঙ্গে রুহির আম্মুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।
অনেকদিন পর মেয়েকে আগের তুলনায় স্বাভাবিক দেখে রুহির আম্মুর চোখ আনন্দে ভিজে উঠেছিল।
বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে, একসঙ্গে চা খেয়ে তারপর তারা বাড়ি ফিরেছিল।
বাড়িতে ফিরেই ক্ৰুশ একটু তাড়াহুড়ো করে তৈরি হতে শুরু করল।
রুহি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
— “এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন?”
ক্ৰুশ হালকা হেসে তার কপালে আলতো টোকা দিয়ে বলেছিল,
— “একটা জরুরি মিটিং আছে। খুব বেশি সময় লাগবে না। মাত্র ত্রিশ মিনিট। তারপরই ফিরে আসব। তুমি চিন্তা কোরো না।”
রুহি তখন আর কিছু বলেনি। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।
কিন্তু সেই ত্রিশ মিনিট অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।
দুই ঘণ্টারও বেশি সময় হয়ে গেছে।
তবুও ক্ৰুশের কোনো খোঁজ নেই।
রুহি বারবার দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে। তারপর আবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছে। বাইরে এখনও একইভাবে ঝড়-বৃষ্টি চলছে।
তার বুকের ভেতরটা অকারণেই ধুকপুক করছে।
এত ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মানুষটার কিছু হয়নি তো?
এই প্রশ্নটাই বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
নিজেকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক, মনটা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।
অজানা এক ভয় ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ধরছে। মনে হচ্ছে, কোনো খারাপ ঘটনা যেন তার অপেক্ষায় আছে।
ঠিক তখনই পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল।
এক নিমিষেই চারপাশ অন্ধকারে ডুবে গেল।
রুহি চমকে উঠে তাড়াতাড়ি ফোনের টর্চ জ্বালাল। ক্ষীণ আলোয় নিজের ঘরটুকু কোনোমতে দেখা যাচ্ছে কিন্তু বিশাল বাড়িটার বাকি অংশ যেন কালো অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
সময় কাটানোর জন্য ক্ৰুশের অপেক্ষায় রুহি অনেক টা সময় ফোন দেখছিল সেই কারণেই ফোনের চার্জও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল।
সে দ্রুত ক্ৰুশ কে ফোন করল।
প্রতিবারই একই উত্তর—
“The number you are trying to call is switched off.”
এই কথাটা শুনেই রুহির বুকের ভেতরটা আরও কেঁপে উঠল।
— “ফোনটাও বন্ধ… কেন?”
তার হাত কাঁপতে শুরু করল। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। অজানা ভয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই…
ফোনের স্ক্রিনে লাল রঙের একটি সতর্কবার্তা ভেসে উঠল—
Battery Low… 1%
রুহি আতঙ্কিত চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের মুহূর্তেই…
ফোনের আলোটুকুও নিভে গেল।
চারদিকে নেমে এল ঘন কালো অন্ধকার।
ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজিয়ে চলেছে আমান। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ আসছে না।
আমান কপাল কুঁচকে হাতে ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত এখনও খুব বেশি হয়নি।
এত তাড়াতাড়ি কি সিমরান ঘুমিয়ে পড়ল?
আজ তার এত দেরি হওয়ারও একটা কারণ ছিল।
আসলে ক্ৰুশের সঙ্গে মিটিংয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সে যেতে পারেনি।
হঠাৎ করেই তার আব্বুর শরীরটা ভীষণ খারাপ হয়ে পড়েছিল।
তাই সবকিছু ফেলে সে আগে আব্বুর কাছে ছুটে গিয়েছিল।
ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা, ওষুধ আনা, কিছুটা সময় আব্বুর পাশে থাকা—সব মিলিয়ে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়।
তার ওপর ফেরার সময় হঠাৎ করেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি।
ছাতা থাকলেও তেমন কোনো লাভ হয়নি। ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এমনভাবে আছড়ে পড়ছিল যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে পুরোপুরি ভিজে একাকার হয়ে যায়।
শার্ট থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, চুলগুলো কপালে লেপ্টে গেছে। ঠান্ডায় শরীর কাঁপলেও এখন তার একটাই চিন্তা—সিমরান আর ঐশী
ঠিক আছে তো?
আরও একবার বেল বাজিয়েও কোনো উত্তর না পেয়ে আমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ধীরে ধীরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে ডুপ্লিকেট চাবিটা বের করল।
চাইলেই প্রথমেই এই চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়তে পারত। কিন্তু সে কখনোই তা করে না।
কারণ একটা ছোট্ট অভ্যাস তার ভীষণ প্রিয়।
প্রতিদিন যত রাতই হোক না কেন, সিমরান তার জন্য অপেক্ষা করে। দরজাটা নিজ হাতে খুলে দেয়।
তারপর চুপচাপ খাবার গরম করে টেবিলে সাজিয়ে রাখে। দু’জনে একসঙ্গে বসে রাতের খাবার খায়।
হ্যাঁ… এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি তারা। আগের মতো সহজ হয়ে কথা বলে না, হাসেও না। তাদের মাঝের অস্বস্তিটুকু এখনও রয়ে গেছে।
তবুও এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আমানের ভীষণ ভালো লাগে।
এই অপেক্ষাটুকু…এই একসঙ্গে বসে খাওয়াটুকু…
এই নীরব সঙ্গটুকুই যেন তার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই আমান ভেতরে ঢুকল।
কিন্তু ঘরে পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়াল।
চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢাকা।
এক মুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
বাইরের করিডোরে আলো জ্বলছে। পাশের ফ্ল্যাটগুলোর জানালা দিয়েও আলোর আভা ভেসে আসছে।
তার মানে পুরো বিল্ডিংয়ে বিদ্যুৎ আছে।
তাহলে শুধু তাদের ফ্ল্যাটেই অন্ধকার কেন?
ফিউজ নষ্ট হয়েছে?
মনের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জন্ম নিল।
সে দ্রুত দেওয়ালের সুইচবোর্ডে হাত বাড়িয়ে একে একে সব লাইট জ্বালিয়ে দিল।
মুহূর্তের মধ্যেই আলোয় ভরে উঠল পুরো ফ্ল্যাট।
তবুও তার অস্থিরতাটা কমল না।
চারপাশে চোখ বুলিয়ে সে সোজা সিমরানের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
এই ঘরেই সিমরান আর ছোট্টো ঐশী একসঙ্গে ঘুমায়।
আর আমান…ড্রয়িংরুমের সোফাতেই রাত কাটায়।
এই বাড়িতে একই ছাদের নিচে থাকলেও তাদের মাঝের অদৃশ্য দূরত্বটা এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
সিমরানের ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা।
দরজার সামনে এসে আমান এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা যেন তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
বিছানার ওপর নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে সিমরান। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ, ঠোঁট শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই, যেন গভীর অচেতন ঘুমে ডুবে আছে।
আর তার ঠিক পাশেই বসে আছে ছোট্ট ঐশী।
দু’হাত দিয়ে বারবার নিজের মায়ের গাল নাড়িয়ে বলছে,
— “আম্মু… আম্মু… ওতো না…”
কিন্তু সিমরানের কোনো সাড়া নেই।
ছোট্ট মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু বারবার মাকে ডাকছে, আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার নিষ্পাপ চোখ দুটো ভয়ে আর কান্নায় লাল হয়ে গেছে।
আমানের হাত থেকে নিজের অজান্তেই ব্যাগটা মেঝেতে পড়ে গেল।
ব্যাগের ভেতরে থাকা ছোট্ট গিফট বক্সটা গড়িয়ে একটু দূরে চলে গেল।
আজ অফিস যাওয়ার পথে সে কত যত্ন করে সিমরানের জন্য একটি সুন্দর শাড়ি আর কাঁচের চুড়ি কিনেছিল।
সারাটা পথ শুধু একটাই কথা ভেবেছে—
আজ সব ঠিক করে নেবে।
আর কোনো অভিমান নয়…
আর কোনো দূরত্ব নয়…
আজ সে নিজের সব ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে। আর কখনো সিমরানকে কষ্ট দেবে না।
কিন্তু বাড়িতে ফিরে এমন একটা দৃশ্য তার জন্য অপেক্ষা করছে, সেটা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
ঠিক তখনই ছোট্টো ঐশী বাবাকে দেখতে পেয়ে টলমল পায়ে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে এল।
আমান দ্রুত নিচু হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেই ছোট্টো মেয়েটা কান্নাজড়ানো গলায় বলতে লাগল,
— “পাপা… পাপা… আম্মু তথা বলে না…
কথাগুলো বলতে বলতেই সে আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
আমান এক মুহূর্তেই সবকিছু বুঝে গেল।
সে মেয়েটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে দ্রুত বিছানার পাশে গিয়ে বসল।
কাঁপা কণ্ঠে ডাকল,
— “সিমরান… এই সিমরান… কী হয়েছে তোমার? শুনতে পাচ্ছো?”
কোনো উত্তর নেই।
আমান আলতো করে সিমরানের কাঁধে হাত রাখল।
পরের মুহূর্তেই তার বুকটা ধক করে উঠল।
সিমরানের সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
কপাল, গাল, গলা—সব যেন আগুনের মতো গরম।
এত বেশি জ্বর যে সে সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়ে আছে। কোনো হুঁশই নেই তার।
আমানের মুখের রং মুহূর্তেই বদলে গেল।
এক অজানা ভয় তার বুক চেপে ধরল।
সে দ্রুত ঐশী কে কোল থেকে নামিয়ে দিল।
নিজেও পুরো ভিজে একাকার হয়ে আছে। জামাকাপড় থেকে এখনও পানি ঝরছে। এভাবে কোলে রাখলে ঐশীও ভিজে যাবে।
মেয়েটার চোখের পানি মুছে দিয়ে দুই গালে আলতো করে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল,
— “কাঁদে না, আমার রাজকুমারী। তোমার আম্মুর কিছু হয়নি। খুব জ্বর এসেছে, তাই ঘুমিয়ে আছে। দেখো, আমি এখনই ডাক্তার আঙ্কেলকে নিয়ে আসব। তোমার আম্মু একদম ভালো হয়ে যাবে।”
আজ তুমি কি দাদি জানের কাছে থাকবে? শুধু আজকের রাতটা। আমি তোমার আম্মুর যত্ন নেব।
যখন আম্মু ভালো হয়ে যাবে, তখন তোমাকে আবার নিয়ে আসব।”
ছোট্টো মেয়েটা পুরো কথার অর্থ বুঝল কি না বোঝা গেল না।
তবে বাবার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
আমান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ফ্ল্যাটের নিচতলায় একজন বয়স্ক মহিলা থাকেন।
ঐশী তাকে দাদি জান বলেই ডাকে।
মহিলাও ছোট্টো মেয়েটাকে নিজের নাতনির মতোই আদর করেন। সুযোগ পেলেই তাকে নিজের কাছে নিয়ে যান, গল্প করেন, খাওয়ান।
Mad for you 2 part 41
তাই আপাতত ঐশী কে তার কাছেই রেখে আসাই সবচেয়ে নিরাপদ হবে।
কারণ এই অবস্থায় ঐশী এখানে থাকলে ভয়ে ঘুমাতে পারবে না।
এক হাতে ঐশী কে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল আর অন্য হাতে দ্রুত ফোনটা বের করল।
যেভাবেই হোক এখনই একজন ডাক্তারকে খবর দিতে হবে।
আজ রাতেই সিমরানকে সুস্থ করে তুলতে হবে।
