Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৫

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৫

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৫
সাবা খান

ক্যালেন্ডারের আরেকটা পাতা উল্টে পেরিয়ে গেল একমাস। তারিখ বদলালো, সময় এগিয়ে গেল। কিন্তু এই এক মাসে মানুষগুলোও বদলে গেছে ভেতর থেকে।
এই দীর্ঘ সময়টা ছিল না শুধুই দিন রাতের হিসাব, এটা ছিল ক্ষত শুকানোর সময়, ভাঙা মানুষগুলো নিজেদের আবার গুছিয়ে নেওয়ার সময়।
এই এক মাসে সবাই বেঁচে আছে, কাজ করছে, হাসছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই কিছু না কিছু হারিয়েছে। কেউ সেটা মানিয়ে নিচ্ছে, কেউ ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ নতুন কিছু খুঁজছে। শহর আগের মতোই চলছে ট্রাফিক, আলো, শব্দ, কিন্তু এই মানুষগুলো আর আগের মতো নেই।

সারহাদ আবার ফিরে গেছে নিজের জগতে ‘গিনিতে। একটা সময় যেখানে কৌশল, ষড়যন্ত্র আর অন্ধকারের খেলা ছিল, আজ সেই জায়গা টা নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা আর ক্ষমতার নিখুঁত ভারসাম্য দখল করে নিয়েছে। সারহাদ সকাল শুরু করে সারাদিন নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। তবে তার চোখে মাঝে মাঝে একটা শূন্যতা খেলে যায়। যেটা সে কাউকে দেখতে দেয় না। তবে রীতিমতো তার একটা কাজ রোজকার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হলো দিন বা রাত একবার হলেও ব্ল্যাক ম্যানশনে যাওয়া দূর থেকে একপলক দেখা।
অন্যদিকে তালহা আদিল আবার ফিরে এসেছে নিজের জায়গায়। ডিপার্টমেন্ট থেকে তাকে আবার ডেকেছে আর সে ফিরেছে আগের চেয়েও দৃঢ় হয়ে। এসিপি হিসেবে তার কাজ এখন আরও কঠিন। কেস, অপারেশন, রিপোর্ট সবকিছুতে সে এখন আরও নিখুঁত।
কিন্তু কোথাও না কোথাও তার জীবনে একটা অদ্ভুত শূন্যতা রয়ে গেছে।
এখন তার জীবনের অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো তার বোন সিতারা আদিল। তালহা সিতারা কে বহুবার বিয়ে করতে বলেছে, কিন্তু রমণী বিয়ে তো দূর উল্টো তাকেই বলে,

–“ভাই, আগে তোমাকে বিয়ে করতে হবে”
যদিও তালহা প্রথমে বিষয় টা উড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু সিতারার হাবভাব দেখে পরে রাজি হয়। এমনিতেই তার বয়সও তো কম হয়নি। দায়িত্বের বেড়াজালে বন্দী হয়ে জীবন অন্য রকম হয়ে গিয়েছে। যদি একটা ভালো জীবনসঙ্গী এখন সেই সংকট কাটিয়ে ওঠতে তাকে সাহায্য করতে পারে।
সিতারাও শুধু বলেই থেমে নেই। সে তার ভাইয়ের জন্য চারদিকে হন্য হন্য হয়ে খুঁজছে একটা ভালো মেয়ের সন্ধানে। এইতো গত সপ্তাহেই দুইটা ডেটে পাঠিয়েছিল তালহাকে। কিন্তু তাহলা ফিরে এসে বলে, প্রথম মেয়েটা অতিরিক্ত পারফেক্ট আর দ্বিতীয়টা, অতিরিক্ত কৃত্রিম। এজন্য দুটোই বাতিল।
অন্য দিকে সিতারা সে এখন ভাইয়ের আন্ডারে কাজ করে। কিন্তু ইদানীং তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস হয়ে গেছে, কারণে অকারণে গিনিতে যাওয়া। ফাইল নিতে, ডাটা চেক করতে, মিটিং আছে বলে হাজারো অজুহাতে সে সেখানে হাজির হবে। তার যাওয়ার পিছনের আসল কারণ টা নিজেও যেন নিজেকে বুঝাতে পারছে না। এই নিয়ে তার মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকে। মস্তিষ্ক যুক্তি দেখালেও মন তা উপড়ে ফেলে দেয়। এখনো সারহাদকে দূর থেকে এক পলক দেখলেই তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত লাগে। সে কখনো সামনে গিয়ে কিছু বলে না। শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। আর তারপর নিজেকেই বকাঝকা করে,

–“তুই কি পাগল?”
তালহা বোনের ব্যাপারটা বুঝে গেছে অনেক আগেই। তারপরও একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল,
–“তারা, তোর গিনিতে এত কী কাজ?”
সিতারা তার প্রশ্নে হকচকিয়ে উঠে তারপর তোতলাতে শুরু করেছিল,
–“ওই… কাজ আছে…”
তালহা শুধু তাকিয়ে ছিল উত্তরে আর কিছু বলেনি।
সিতারার কিন্তু গিনিতে যাওয়ার আরেকটা কারণ সেটা হলো রত্না, সানার এক সময়কার সেক্রেটারি। রত্ম শান্ত, মার্জিত, পরিমিত একটা মেয়ে। যার কারণে সিতারা প্রথম দিন থেকেই তাকে পছন্দ করে ফেলেছে। তার ভদ্রতা, কথা বলার ধরন, চোখের ভাষা সবকিছু আলাদা। সিতারা মনে মনে ঠিক করেও ফেলেছে রত্মাকেই সে তার ভাইয়ের বউ বানাবে। এরপর থেকে সে রত্নার সাথে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে।
আর এসপির যখন ইচ্ছা হবে সে গিনি তে আসবে। একটা জিনিস আজ এত বছর পরও বদলায়নি তা হলো খুশদিল ফারুকী ও এসপির সম্পর্ক। তাদের মধ্যে এখানো বিবাদ লেগেই থাকে। অফিসে মাঝেমধ্যে কাজের ক্ষেত্রে দুই জামাই শশুরের বনাবনি হয় না। এই নিয়ে বেঁধে যায় তুলকালাম। আজকাল এসপির ও বুলি ফুটেছে। সেও কথা বলতে ছেড়ে কথা বলে না।

তার মধ্যে আবার এসপির মেয়ের নাম রাখা হয়েছে, সারফারাদ চৌধুরীর মেয়ে “সিরাত চৌধুরী”। ছোট্ট সিরাতের নরম গোলাপি আঙুল, মুখে শান্তির ছাপ, চোখ বন্ধ করেও যেন পৃথিবীটাকে অনুভব করছে। আর সানিতা যে মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছে। মাত্র পনেরো দিনের চিকিৎসার পরই তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে তবে তার জন্য ভারী কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ডক্টর । এসপি এই পনেরো দিন প্রায় পুরো সময়টাই হসপিটালেই কাটিয়েছে। দিন রাতের কোনো হিসাব ছিল না তার কাছে। কখনো সানিতার পাশে বসে থাকে, চুপচাপ, নিঃশব্দে। কখনো নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে যেন সে এখনো নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না এই ছোট্ট ফুটফুটে প্রাণটা তার।
পনেরো দিন আগে তারা ফিরে এসেছে ব্ল্যাক ম্যানশনে। তার পিছনে কারণ টা অবশ্য সানা। সে সানিতাকে চৌধুরী মহলে যেতে দেয়নি। কেননা একেতো লিপি ফারুকী নিজেই অসুস্থ। তারউপর সানিতার খেয়াল কে রাখবে। তাই সানা নিজ দায়িত্বে সানিতাকে নিজের কাছেই রেখেছে সিয়া সহ। একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এই বাড়ির ভেতরে রক্তের নয়, তবুও আত্মার।

এসপি এখন প্রায় পুরো সময়টাই কাটায় তার মেয়ের সাথে। সে সিরাতকে কোলে নিয়ে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। মাঝে মাঝে তার ছোট্ট আঙুল ধরে রাখে যেন ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে। কখনো তার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসে। আর কখনো ইচ্ছা হলে অফিস যাবে।
আর এই দীর্ঘ সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণ ফিরে পাওয়া মানুষ টা হলো ঈশানী। সে ঐদিন রিজভীর বলা কথা গুলো অনুসরণ করে এখন আর কাঁদে না। নিজেকে শক্ত খোলসে আবদ্ধ করে নিয়েছে। তবে সিরাত আর আরভি দুইজনই এখন তার ছায়া। আরভি এবং সিরাত দুজনকেই সে নিজের মতো করে আগলে রাখে। ঈশানীর বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা অবিশ্বাস্য। রাত জেগে তাদের ঘুম পাড়ানো, খাওয়ানো, খেলানো সবকিছুতেই সে একদম মগ্ন। কখনো আরভির সাথে খেলতে খেলতে নিজেই শিশু হয়ে যায়। আবার কখনো সিরাতকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে গান গেয়ে ঘুম পাড়ায়।

তবে মাঝেমধ্যে ঈশানী অনেক চেষ্টা করে তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে স্মরণ করতে। তার শৈশবকে মনে করতে কিন্তু হয়ে ওঠে না। তার উপর সে এখনো ব্রেনে বেশি চাপ দিলে মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। তার শুধু ভাইয়ের সাথে কাটানো মুহূর্তের স্মৃতিগুলো মনে আছে। যেহেতু তার মা বাবা কারো চেহারা স্মরণে নেই সেহেতু সে ভাইকে বহুবার বলেছে কিন্তু তার ঈশান কোনদিনও তাদের ছবি পর্যন্ত তাকে দেখায়নি। এ বিষয়ে তার ভাই সব সময় এড়িয়েই গেছে। মাঝে মাঝে বলতো তারা একটা এক্সিডেন্টে মারা গেছে। তাই সে এদের সাথে সময় কাটিয়ে নিজের শৈশব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে। উপরন্তু সে এখন মডেলিং অ্যাক্টিং ও ছেড়ে দিয়েছে। ভালো লাগলে নাকি আবার শুরু করবে।

জীবন কখনো কখনো এমনভাবে বদলে যায় যেখানে গতকালের অন্ধকার আজকের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। এই এক মাসে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নরম, সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরিবর্তনটা এসেছে দুইটা মানুষের জীবনে তারা হলো জ্যাক ও ইবেলিনা।
জ্যাক হসপিটালে খুব বেশিদিন থাকেনি। মাত্র তিন দিনের মাথায় ডাক্তারের কঠোর আপত্তি উপেক্ষা করেই সে বেরিয়ে এসেছে। তার শরীর তখনো পুরোপুরি সুস্থ না। একটা পা এখনো দুর্বল হাঁটতে গেলে হালকা খোঁড়া ভাব আসে। কিন্তু যন্ত্রমানবের মধ্যে এক অদ্ভুত জেদ আছে। সে ব্যথাকে পাত্তা দেয় না। তবে এবার একটা জিনিস বদলেছে। তার ভিতরের কঠোরতা অনেক টা কমে এসেছে। আগে তার জীবনের প্রতি তেমন একটা আগ্রহ কাজ করতো না। যান্ত্রিক জীবনটাই তার কাছে সুষ্ঠু মনে হতো, সবকিছু রুটিন মাফিক চলাফেরা।

কিন্তু এখন জীবনের প্রতি কেমন একটা মায়া চলে এসেছে। অবশ্য তার কারণ ইবেলিনা এবং তার মধ্যে বেড়ে ওঠা তাদের অনাগত সন্তান।
আর ইবেলিনা যেই মেয়েটা একটা সময় নিজের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিল। চোখে ছিল শূন্যতা, মুখে ছিল নীরবতা, হাসি যেন ভুলে গিয়েছিল সে। কিন্তু এখন সে একদম উল্টো। তার চোখে এখন আলো ঝিলমিল করে, মুখে সবসময় হাসির রেখা লেগে থাকে। সে এখন আগের মতো উদাস না। বরং প্রাণোচ্ছল, চঞ্চল, হাসিখুশি হয়ে ওঠেছে। ব্ল্যাক ম্যানশনের করিডোরে তার হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। সে কখনো সানার সাথে গল্পে মেতে ওঠে, আবার কখনো ঈশানীর সাথে খুনসুটিতে। সানা আর ঈশানীর সাথে তার সম্পর্কটা একটা বন্ধুত্বের থেকেও বেশি।
আর জ্যাকও ম্যানশনে ফিরে আসার পর থেকে আগের থেকেও অনেক বেশি কেয়ারিং হয়ে গেছে। সাথে ইবেলিনার প্রতি একদম কঠোর হয়ে গেছে যতটা না রাগ থেকে, তার থেকেও বেশি ভালোবাসা থেকে কেননা এখন ইবেলিনা একা না, তার মধ্যে তার অংশও বেড়ে ওঠছে। যার জন্য জ্যাক হাজারটা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তার উপর। এই যেমন,

–“দৌড়াবে না”
–“সিঁড়ি একা উঠতে পারবে না”
–“সময়মতো খেতে হবে”
–“রাত জাগা যাবে না”
এইসব নিয়ম এখন ইবেলিনার জীবনের অংশ। ইবেলিনা আগে থেকেই জ্যাকের বাধ্যগত স্ত্রী ছিল। কিন্তু এখানে এসে সানার পাল্লায় পড়ে দুই একদিন একটু অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জ্যাকের এক দৃষ্টি আর সাথে সাথে সব শেষ। জ্যাকের মুখ থেকে বের হবে,
–“লিনা”
এই একটা ডাকেই রাজস্থানী রমণী থেমে যায়। মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জ্যাক কিছু না বলে তাকে কাছে টেনে নিয়ে তার মাথায় হাত রাখে। কেননা তার কাছে সান্ত্বনার ভাষা অজানা। এটা ইবেলিনাও খুব ভালো করে জানে তাই সেও নিঃশব্দে তার বুকে মুখ গুঁজে থাকে।
মাঝে মাঝে আরজে আর জ্যাক না থাকলে ম্যানশনের সকল রমণীরা মিলে খোশ গল্পে মেতে উঠে। কেননা আরজে বা জ্যাক একবার এসে তাদের এমনভাবে দেখা মাত্রই দুজনেই দুজনের প্রেয়সীকে সবার সামনে থেকে কোলে করে নিয়ে চলে যাবে। এতে কে কি ভাবল, না ভাবলো তাতে এদের কিছু যায় আসে না। সানা ও ইবেলিনার এই দুই বান্দার জন্য সবার সামনে বিশেষ লজ্জায়ও পড়তে হয়। কিন্তু এই বিষয়ে দুই নির্লজ্জ পুরুষকে বলেও লাভের লাভ কিছুই হয়নি। তাই সানা বা ইবেলিনা আরজে এবং জ্যাককে দেখলে নিজেদের কামড়ায় দৌড়ে লাগায়। এতে অবশ্য বাকিরা উপভোগই করে বিষয়টা।

এদিকে আরজে ও সানা মধ্যে চলছে নীরব দূরত্বের খেলা। সানা আরজে কে বেশিরভাগ সময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। দিনের বেলায় সে ব্যস্ত থাকে আরভিকে নিয়ে, সিরাতকে নিয়ে, ঈশানীর সাথে হাসি আড্ডায়। কিন্তু রাত নামলেই তার ভেতরের অস্থিরতাটা যেন বেড়ে যায়। তাই সে ইচ্ছে করেই নিজের রুমে না গিয়ে আরভির রুমে চলে যায়। ছোট্ট আরভির পাশে শুয়ে পড়ে, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে। কিন্তু এতে কী বিপরীত পাশের মানব তার থেকে দূরে থাকছে? নাহ।

আরজে অফিস থেকে ফিরেই সানাকে নিজের রুমে নিয়ে আসবে এতে সানা জেগে থাকুক আর ঘুমাক। যখন তার সানাকে লাগবে তখন লাগবে মানে লাগবেই। আর রোজ সকালে সানার ঘুম ভাঙলেই প্রথমেই নাকে আসে সেই পরিচিত স্মেল কফি আর ভ্যানিলার। আর তার পাশেই আরজে। তার বুকের উপর মাথা রেখে সে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেই জানে না। সাথে সাথে সে উঠে বসে, বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তারপর কণ্ঠে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলে,
–“আপনি আবার আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন?”
আরজে তখন চোখ বন্ধ রেখেই প্রতুত্তর করে,
–“আবার মানে? তুমি তো নিজেই এসেছ”
দিন গড়াতে থাকে, আর এই অদ্ভুত লুকোচুরি চলতেই থাকে। সানা যতই দূরে যেতে চায়, আরজে ততটাই কাছে টেনে নেয়।

প্রত্যুষের নরম আলো ধীরে ধীরে ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল কাচের জানালা ভেদ করে ভেতরে ঢুকে। সবকিছু যেন শান্ত, নিস্তব্ধ কিন্তু এই নীরবতার মাঝেই একটা অদৃশ্য শূন্যতা টের পেল আরজে। ঘুম ভাঙতেই সে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে পাশটা ছুঁতেই অনুভূত হয় শূন্যতা। তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। সে একদমই অবাক হলো না এতে। নিচু স্বরে নিজের মনেই আওড়ায়,
–“আবার পালিয়েছে মেয়েটা”
সে খুব ভালো করেই জানে সানা কোথায়। তাই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে, চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে সোজা হাঁটতে শুরু করে আরভির রুমের দিকে।
দরজার নব ঘুরিয়ে হালকা ঠেলতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো হাসির শব্দ, চিৎকার, আর ভিডিও গেমের সেই চেনা সাউন্ড। দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখতেই তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সময়। চোখের সামনে বিছানার উপর বসে আছে সানা আর পাশে আরভি। দুজনেই হাতে কন্ট্রোলার নিয়ে গেম খেলছে। সানা পুরোপুরি ডুবে আছে খেলায়। রমণীর চুলগুলো এলোমেলো, মুখে শিশুসুলভ উত্তেজনা। সে চিৎকার করে আরভি কে বলছে,

–“ভীর, লেফট লেফট, ওইদিকে যাওওওও”
–“না না মম, তুমি ভুল করছো, এইদিকে আসো”
–“আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি জানি সোনা”
আরভি একগাল হেসে বলে,
–“মম, তুমি তো একদমই গেম খেলতে পারো না”
সানা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বলে,
–“কি বললে? আমি পারি না? আমি তোমাকে এখন হারিয়ে দেখাচ্ছি'”
এই দৃশ্য দেখে দরজায় দাঁড়িয়েই কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে আরজে। তার সারা অঙ্গে একটা প্রশান্তির ঢেউ বয়ে যায়। তারপর মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে বলে,
–“সামটাইমস আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড… তুমি বাচ্চাদের সাথে থাকো, না বাচ্চারাই তোমার সাথে থাকে…”
সানা চমকে তাকায়,

–“আপনি এখানে?”
আরভি খুশিতে লাফ দিয়ে বলে,
–“ড্যাড, দেখো মম হারতে যাচ্ছে”
–“আমি হারছি না, গেমটাই খারাপ”
আরজে ভ্রু তুলে এগিয়ে আসে সানার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
–“গেম খারাপ না, তোমার স্কিল ইস্যু?”
–“একদমই না। আপনি আসুন, আপনি খেলুন দেখি”
–“আমি খেললে তো তুমি কাঁদতে শুরু করবে”
বিপরীতে রমণী মাছি তাড়ানোর মতো করে বলে,
–“আমি কাঁদবো? সানা খান কাঁদবে। আপনার স্বপ্নে মিস্টার জাওয়ান”
পাশ থেকে আরভি হেসে গড়িয়ে পড়ে,
–“ড্যাড তুমি প্লিজ খেলো, আমি মম কে হারাতে চাই”
আরজে সোফায় বসে, কোটটা ঠিক করতে করতে বলে,

–“আমি অফিসের জন্য রেডি হচ্ছি, তোমাদের বাচ্চাদের গেম খেলার সময় নেই আমার”
সানা চোখ ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
–“হ্যাঁ হ্যাঁ, গেম খেললে আপনার ইমেজ নষ্ট হয়ে যাবে”
আরজে তার প্রত্যুত্তর না করে কোটের বোতাম লাগাতে লাগাতে হঠাৎ কিছু একটা ভেবে আরভির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,
–“রিশ, তোমার বোন চাই”
তার এমন প্রশ্নে সানা একদম থমকে যায়। বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে,
–“কিহহহ?”
আরভি চোখ বড় বড় করে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,

–“ইয়েস ড্যাড, আমার একটা বেবি সিস্টার লাগবে। রাতের মতো”
আরভি সিরাত কে আদর করে ‘রাত’ বলে ডাকে। আরজে মাথা নেড়ে বলে,
–“গুড, তাহলে মম কে আর তোমার রুমে আসতে দিবে না’
সানা এবার পুরোপুরি ক্ষেপে ওঠে। সে এক পলক আরজের দিকে রক্ত চক্ষুতে তাকিয়ে তারপর আরভিকে শুধায়,
–“ভীর, সোনা তোমার বিচার চাই?”
যদিও আরভি তার কথার মানে বুঝতে পারেনি। তারপরও মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“ইয়েস মম”
–“দ্যান সোনা লিসেন, ইফ ইউ গেট বিগেস্ট, ডোন্ট কপি ইউর ফাদার। বি আ গুড হাজব্যান্ড অর……”
সানার বাক্যটুকু অর্ধেক থাকতেই আরভি তাকে থামিয়ে বলে,

–“মম, ওটা তো ‘হোয়েন ইউ গ্রো আপ, ইউ উইল নেভার বিকাম এনিথিং লাইক ইউর ফাদার’ হবে”
বিপরীতে রমণী হকচকিয়ে ওঠে। ছেলে তার ভুল ধরছে! এত বড় লজ্জা, সে কোথায় রাখবে। ‘ইশ, এখন মনে হচ্ছে সে কেন ছোটবেলায় ভালো করে পড়াশোনা করেনি। আজ যদি এসপির দেখে লিখে পাশ না করে নিজে একটু মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতো তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। কিন্তু কী করবে? তার পড়াশোনা কোন কালেই ভালো লাগতো না। শুধু মাত্র বাবার ভয়ে একটু আধটু করতো, বাকিতো এসপি ছিলই। কিন্তু এই দিন আসবে জানলে জীবন দিয়ে হলেও পড়াশোনা করতো।
তারপরও এখন হেরে যাওয়া যাবে না। কিছু একটা বলে ধামাচাপা দিতে হবে। ওইদিকে আরজে যে ঠোঁট চেপে হাসছে। সানা সেটাও লক্ষ্য করছে। তার দিকে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

–“হ্যাঁ, হ্যাঁ, সোনা। আই নো, ডোন্ট নিড টু সে”
আরজে নিজের টাই ঠিক করতে করতে গাকে শোধরে বলে,
–“নো নিড টু সে’ হবে ওটা’
এবার সানার রাগের পারদের সীমা ভেঙ্গে গেল। একটা লিমিট থাকে তার ভুল ধরার। কিন্তু এই বাপ ছেলে সেই লিমিট এবার ক্রস করে ফেলেছে। রমণী রক্ত চক্ষুতে বাপ ছেলে দু’জনকেই দেখে যারা মুখে হাত দিয়ে ঠোঁট চেপে হাসছে। এত বড় অপমান আর সহ্য হলো না রমণীর। সে নিজের নাকের পাঁঠাতন ফুলিয়ে হাতের রিমোট কন্ট্রোলারটাকে দূরে ছুড়ে ফেলে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর দুই বাপ ছেলেকে লক্ষ্য করে তর্জনী উঁছিয়ে বলে,
–“যাহ, আমি আর এখানে থাকবোই না আর না কারো সাথে কথা বলবো”
সে দরজার সামনে গিয়ে বলে,
–“আই উইল শাট আপ”
আরজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফের বলে,
–“আই উইল বি কোয়াইট”
সানা নিজের পা থামিয়ে ঘাড় কাত করে আরজের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কেউ কিছু বোঝার আগেই সে আরজের কাছে এসে তার হাতটা ধরে মুখের কাছে নিয়ে বসিয়ে দিল নিজের দন্ত। জোরে একটা কামড় বসিয়ে তার হাত ঝাঁটকা মেরে ছুঁড়ে ধুপ ধাপ কদম ফেলে চলে গেল। পিছনে পড়ে রইল বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা বাপ ছেলে।

ব্ল্যাক ম্যানশনের বিস্তৃত গার্ডেনটা ভোরের নরম আলোয় যেন এক অন্যরকম শান্তির আবরণে মোড়ানো। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরগুলো সূর্যের প্রথম আলোয় ঝিলমিল করে উঠছে, চারপাশে সাজানো বিদেশি ফুলগাছ থেকে ভেসে আসছে হালকা সুবাস। দূরে ফোয়ারার পানির ধারা টুপটাপ শব্দ তুলে একটানা বয়ে যাচ্ছে সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নময় সকালের দৃশ্য।
গার্ডেনের মাঝখানে কাঠের দোলনা চেয়ারে বসে আছে সানিতা। তার পাশে দাঁড়িয়ে এসপি, কোলে তাদের ছোট্ট মেয়ে সিরাত। এক মাসের অবুঝ সিরাত গোলগাল হাত দিয়ে বাবার শার্ট চেপে ধরে আছে, মাঝে মাঝে হাসছে, আবার কখনো বাবার মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এসপির চোখে মুখে এমন এক প্রশান্তি, যেন পৃথিবীর সব যুদ্ধ জিতে এসে সে এখন নিজের ছোট্ট দুনিয়াটাকে বুকে আগলে রেখেছে।
ঠিক তখনই ‘ধাম’ করে গার্ডেনের দরজা খুলে ঢুকে পড়ে সানা। রমণীর চোখ মুখ লাল, ভ্রু কুঁচকে আছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কারো ওপর ভীষণ রেগে আছে সে। এসপি একবার তাকিয়ে ভ্রু জোড়া গুছিয়ে বলে,

–“এই সাত সকালে কী হয়েছে তোর?”
সানিতা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে সানার রাগার কারণ তাই সে ঠোঁট চাপা দিয়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছে। সানা বিরক্ত গলায় বলে উঠে,
–“তুই ঠিকই বলিস, এক নাম্বারের জাওরা”
–“কে ঐ…..”
–“হ্যাঁ, ঐ রানভীর, সাথে আমার ছেলেটাকেও দিন দিন নিজের মতো বানাচ্ছে”
এসপি হালকা হেসে বলল,
–“আমি তো আগেই তোকে বলছি, শালা এই রকমই। একে ছেড়ে আরেকটা বিয়ে করে ফেল। এখন বল, আবার কী করলো ও?”
সানা হাত কোমড়ে রেখে উত্তর করে,
–“কি করেনি সেটা জিজ্ঞেস কর, কু*ত্তা”
এসপির কোলে থাকা সিরাত এতক্ষণে সানাকে দেখে একটু ঠোঁট বাকিয়ে হেসে ওঠে। সানার চোখ হঠাৎ নরম হয়ে গেল। সে এগিয়ে এসে এসপির কোলে থাকা সিরাতকে নিতে নিতে বলল,
–“আব্বে হাট, দেখি, দেখি, আমার মিষ্টি বউমা টাকে এদিকে দেয়”
এসপি সিরাতকে তো তার কোলে দিয়ে দিয়েছে কিন্তু “বউমা” শব্দটা কানে যেতেই সে যেন শক খেলো। কণ্ঠে বিস্ময়ের মিশেলে শুধালো,

–“বৌমা! কী বললি তুই? আবার বল?”
সানা একদম স্বাভাবিক গলায় ফের বলে,
–“হ্যাঁ, আমার ভীরের বউ”
এসপি এক লাফে দাঁড়িয়ে গেল বসা থেকে। সে হকচকিয়ে বলে,
–“এক্সকিউজ মি? এটা আমার অ্যাঞ্জেল। আর তুই বলছিস বউমা?”
–“তোর অ্যাঞ্জেল পরে, আগে আমার আরভির বউ”
রমণীর বলতে দেরি কিন্তু এসপির চিৎকার করে ওঠতে দেরি হয়নি,
–“অসম্ভব, আমি আরভিকে জামাই মানলে, ওই জাওরা বেয়াই হিসেবে মানি না, মানবো না। নট পসিবল নেভার এভার”
সানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

–“কেউ তোকে জিজ্ঞেস করছে নাকি?”
এসপির কণ্ঠ থেকে প্রত্যুত্তর বের হওয়ার আগেই পিছন থেকে ভেসে এল গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
–“সেম, বউমা ঠিক আছে। কিন্তু শ্বশুর এক নাম্বারের বারোভাতারি। তাই বিয়ে ক্যান্সেল”
সবাই ঘুরে তাকাতেই নজরে আসে আরজে। যে হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে এসপির দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এসপি চোখ কুঁচকে তাকাল,
–” তুই আবার কে রে? আমার মেয়ের বিয়ে ক্যান্সেল করবি? আমি নিজেই রিজেক্ট করে দিয়েছি”
আরজে এগিয়ে এসে দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,
–“আমি তোর সাথে কোনো আত্মীয়তাও রাখবো না বুঝলি?”
দুজন একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। দুজনের মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে, এখানে দুই রমণী না থাকলে একজন আরেকজন কে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। সানা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে এদের দুজনের কান্ড দেখছে। হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বলে,

–“ওকে, থামেন দুজনেই”
দুজন একসাথে তাকায় সানার দিকে। সানা সিরাতকে সানিতার কোলে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
–“আপনাদের যখন এতই সমস্যা, ঠিক আছে। আমরা শাশুড়িরা না হয় আপনাদের ছেড়ে আরেকটা বিয়ে করে নেই। ছেলে মেয়ের তো কোনো সমস্যা নাই, প্রবলেম তো আপনাদের, তাহলে প্রবলেম সল্ভ। কী বলেন?”
এক মুহূর্ত পুরো গার্ডেন নিস্তব্ধ। তারপরই ভেসে আসে চিৎকার,
–“কীইই?”
আরজে সানার দিকে রক্ত চক্ষুতে তাকিয়ে দন্ত চেপে বলে,
–“এক মিনিট… তুমি কী বললে?”
রমণীর ভাব পরিবর্তন হলো না। সে নির্বিকার চিত্তে বলে,

–“যা শুনেছেন তাই। আপনারা থাকেন আপনাদের ইগো নিয়ে। আমরা নিজেরাই সেটেল হয়ে যাবো”
এসপি একটা ফাঁকা ঢুক গিলে তড়িঘড়ি করে বলল,
–“না, না, কে বলেছে বিয়ে হবে না? বিয়ে আজকেই হবে। আর কে বেয়াই মানে না”
আরজেও সাথে সাথে নিজের বুলি পাল্টে ফেলে,
–“আমি অফিস থেকে আসার সময় কাজী নিয়ে আসব না এখুনি নিয়ে আসব”
সানা চোখ কুঁচকে তাকায়। কিন্তু আরজে কোন দিকে না তাকিয়ে ফোন বের করে কারো নাম্বার ডায়াল করতে করতে নিজের গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেছে,
–“হ্যালো কাই, এই মুহূর্তে কাজী নিয়ে আসো। একটা জরুরি বিয়ে পড়াতে হবে”
এসপি সানিতার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,
–“সানি, আমার জন্য একটা শেরওয়ানি রেডি রাখিস”

দুই রমণী হা করে তাকিয়ে আছে। কীভাবে চোখের পলকে এরা বদলে গেল।
আরজে অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই, ঈশানী দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে আসে। আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে সাধারণ কোথাও যাচ্ছে। চোখে হালকা কাজল, চুল গুছানো, সিম্পল কিন্তু মার্জিত একটা ড্রেস সবকিছুতেই যেন একটা বিশেষ যত্নের ছাপ। সে কারো দিকে না তাকিয়েই দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় মেইন গেটের দিকে। কিন্তু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জোড়া চোখ একদমই তাকে মিস করেনি। তারা আর কেউ না সানা আর এসপি। দুজনেই একসাথে মাথা একটু কাত করে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে থাকে। দুজনের চোখে কৌতূহল, ঠোঁটে হালকা সন্দেহের রেখা। এসপি ফিসফিস করে বলে,

–“এই সাত সকাল মিসেস নাগিন কই যাচ্ছে?”
সানা ভ্রু তুলে তাকিয়ে বলে,
–“এই কালনাগিনী তো অনেক দিন ধরেই সন্দেহজনক আচরণ করছে”
দুজনেই আর এক সেকেন্ড দেরি না করে, প্রায় একই সাথে দৌড় দেয় ঈশানীর পেছনে। মেইন গেটের পাশে এসে দুজন লুকিয়ে দাঁড়িয়ে উঁকি দিতে থাকে। তারপর তাদের চোখ পড়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির দিকে। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে রিজভী। ঈশানী গিয়ে চুপচাপ দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসে। গাড়িটা ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য সানা আর এসপির চোখাচোখি হয়। কথা নেই, শব্দ নেই শুধু চোখের ইশারাতেই সব কথা হয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই দুজনেই একসাথে মুখ চেপে হেসে ওঠে। এসপি হাসি থামিয়ে বলে,
–“তার মানে, আমাদের মিসেস নাগিন, সত্যিকারের মিসেস হওয়ার পথে?”
সানা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

–“ওই কালনাগিনীটা আমাদেরকে না জানিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে। আজকে বাসায় ফিরলে এর খবর আছে”
এসপি আর কিছু বলার আগেই পেছন থেকে আরেকটা গাড়ির শব্দ ভেসে আসে। দুজনেই ঘুরে তাকায়। গাড়িটা এসে থামে ঠিক তাদের পেছনে। দরজা খুলে নেমে আসে সিতারা আদিল। তাকে দেখা মাত্রই সানার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে যায়। সে দ্রুত এসপির দিকে তাকিয়ে বলে,
–“ভীকে নিয়ে আয়”
এসপি কিছু বলতে গিয়েও সানার চোখের দৃষ্টি দেখে বাকিটা আর বলে না। চুপচাপ ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে ছোট্ট আরভিকে নিয়ে। আরভি সানার দিকে তাকায়,
–“মম… কোথায় যাচ্ছি?”
সানা নরম গলায় বলে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৪ (২)

–“একটা জায়গায় যাচ্ছি সোনা”
সে আরভিকে কোলে তুলে নিয়ে সরাসরি সিতারার গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে পড়ে। সিতারা ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়, কিন্তু গাড়ি চালানোর আগে একবার পেছনে তাকিয়ে বলে,
–“মিসেস জাওয়ান, আর ইউ শিউর?
আপনি সত্যিই সোফিয়া ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চান?”
গাড়ির ভেতরে হঠাৎ এক ধরনের ভারী নীরবতা নেমে আসে। সানা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে। তার বুকটা যেন একটু ভারী হয়ে ওঠে। সে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তারপর চোখ খুলে সামনে তাকিয়ে বলে,
–“হ্যাঁ… আমি ওনার সাথে দেখা করতে চাই”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬