হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১ (২)
সাবা খান
নিশীথ রাত যেন আজ নিজের সমস্ত অন্ধকার ঢেলে দিয়েছে ধরণীর বুকে। চারদিক এতটাই নিশ্চুপ যে দূরে কোথাও শুকনো পাতার উপর বাতাসের হালকা ঘর্ষণের শব্দটুকুও স্পষ্ট শ্রবণ ইন্দ্রিয় হচ্ছে। আকাশে চাঁদ লেশমাত্র নেই, তারারও কোন আনাগোনা নেই, শুধু কালি মাখা এক বিশাল শূন্যতা মাথার উপর ঝুলে আছে। মাঝেমধ্যে ঠান্ডা বাতাস এসে গাছের ডালগুলো নাড়িয়ে দিচ্ছে, আর তাতে ছায়াগুলো মাটির উপর এমনভাবে নড়ছে যেন অদৃশ্য কোনো প্রেতাত্মা নীরবে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
সেই কালিমাখা নিশীথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, “ব্ল্যাক ম্যানশন” বিশাল কালো অট্টালিকাটা দূর থেকে যেন ঘুমন্ত কোনো দৈত্যের মতো লাগছে। দিনের বেলায় যে ম্যানশনটা আভিজাত্যে ঝলমল করে, রাতের আঁধারে সেটাই হয়ে উঠেছে রহস্যে মোড়ানো এক নিঃশব্দ গোলকধাঁধা। ম্যানশনের লম্বা করিডোরজুড়ে টিমটিম করে জ্বলছে কয়েকটা নাইট লাইট। আধো আলো আর আধো অন্ধকারে পুরো পরিবেশটা আরও ভৌতিক হয়ে উঠেছে।
ম্যানশনের ভিতরের প্রতিটা জীবন্ত প্রাণী নিসাড় ঘুমে ডুবে আছে, চারপাশে গভীর নীরবতা। ঠিক তখনই তীব্র পিপাসায় ঘুম ভেঙে গেল সিয়ার। ঘুমজড়ানো চোখে সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। গলাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এমন অনুভূতি হচ্ছে, বহুক্ষণ ধরে সে মরুভূমির মধ্যে হাঁটছে।রমণী হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে পানির বোতলটা তুলতেই বুঝল, সেটা একদম শূন্য। সাথে সাথে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। স্বর থেকে বেড়িয়ে আসে বিরক্তিসূচক বাক্য,
–“উফফ, এত বড় ম্যানশন, এতগুলো সার্ভেন্ট… অথচ কেউ আমার রুমে এক বোতল পানি পর্যন্ত রেখে যেতে পারলো না”
বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে করতে সে বেড থেকে নেমে এলো। আসলে বিরক্তিটা যতটা না পানির জন্য, তার থেকেও বেশি নিজের ভিতরের ভয়টাকে চেপে রাখার জন্য। কারণ এই গভীর রাতে ব্ল্যাক ম্যানশনটাকে সত্যিই ভয়ংকর লাগছে। সে বোতলটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে দরজা খুলে করিডোরে পা রাখতেই ঠান্ডা বাতাস এসে তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। এক অজানা ভয়ে সিয়ার বুকের ভিতরটা ধুকপুক করে উঠে। মনে মনে রমণী নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দিল,
—”নাহ… কিছু না… কিছু নেই, সব তোর মনের ভুল সিয়া…..'”
মনে মনে দোয়া দুরুদ বিড়বিড় করে পড়ে অবশেষে কিচেনে পৌঁছে ফ্রিজ খুলে একটা ঠান্ডা পানির বোতল বের করল সে। কিন্তু ফ্রিজ বন্ধ করে ঘুরতেই, তার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। হঠাৎ মনে হলো…তার ঠিক পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে গেল ভয়ে। শীতের রাত হওয়া সত্ত্বেও কপালে ঘাম জমে উঠল। সে বারবার ঢোক গিলে নিজের শুকিয়ে যাওয়া গলাটা ভিজানোর চেষ্টা করছে, হাত রীতিমতো কাঁপছে, শ্বাস দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এখনই কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠবে। সিয়া বুক ভরে সাহস জোগাড় করল চিৎকার করার জন্য। সে ঠিক করল, নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করবে। এতে সবার ঘুম ভেঙে গেলে যাক। এই ভেবে রমণী মুখ খুলতে যাবে ঠিক তখনই হঠাৎ পিছন থেকে একজোড়া শক্ত, বলিষ্ঠ পুরুষালী হাত তার মুখ চেপে ধরল। সিয়া শব্দ করতে না পেরে গুঙিয়ে উঠে,
–“হুমমম…”
তার মনে হলো বুকের ভিতর থেকে প্রাণটাই বের হয়ে যাবে। এই রাতে কোন মানুষ তো নিচে আসবে না, তাহলে কি?
“ভূত”
এই একটা শব্দ মাথায় আসতেই সে ভয়ে প্রায় অর্ধমৃত। সিয়া ছোটবেলা থেকেই ভূত, প্রেতাত্মা এগুলোকে খুব ভয় পায়। এই ভয়ের জন্য এসপি বহুবার তার মজাও উড়িয়েছিল। এদিকে পিছনের ব্যক্তি তাকে ঘুরিয়ে সামনে ফেরাতেই ভূতের বিভৎস চেহারা দেখার ভয়ে সিয়া চোখ বন্ধ করে ফেলল। তারপর দিক্বিদিক ভুলে হাতে থাকা পানির বোতলটা দিয়ে সামনে থাকা মানুষটাকে সজোরে পেটাতে শুরু করে আর মুখে বলতে থাকে,
—”শালা ভূতের বাচ্চা ভূত, তোর এত বড় সাহস। তুই সিয়াকে কিডন্যাপ করতে এসেছিস। আজকে একদম মেরে মেরে তোকে ভূত থেকে আত্মা বানিয়ে দেব”
এদিকে তার সিয়ার বারির তোপে পানির বোতলের মুখ খুলে গিয়ে সম্পূর্ণ পানি সামনের ব্যক্তির গায়ে ছিটকে পড়েছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো হুঁশ নেই। সে এখনো একই ভঙ্গিতে বলেই চলছে,
—”তুই ভূত হতে পারিস কিন্তু আমিও সিয়া তালুকদার। আমার হাইট খাটো হতে পারে, কিন্তু আমার কলিজা তোর থেকেও লম্বা”
সিয়া আর কিছু বলবে তার আগেই হঠাৎ সামনের ব্যক্তি শক্ত করে তার দুই হাত চেপে ধরে গর্জে উঠল,
—”এই পিচ্চি, নিজের মাথা তুলে উপরে তাকিয়ে দেখো সামনে ভূত নাকি মানুষ”
সিয়া হতভম্ব বনে গেল, মনে মনে ভাবল,
“আজকালকার ভূত মানুষের মতো কথাও বলতে পারে নাকি? হবে হয়তো… এখন তো বিশ শতক চলছে, আধুনিক ভূত এটা”
রমণী এই ভেবে ধীরে ধীরে চোখ খুলে মাথা তুলল। তারপরই চোখ উঠে গেল কপালে। বাইরে থেকে আসা হলদেটে আলোয় কাইলিন কে দেখে চারশ চল্লিশ ভোল্টের জটকা খেলো যেন। তারউপর একটু লক্ষ্য করতেই নজরে আসে কাইলিন পুরো ভিজে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুল থেকে পানি পড়ছে। কালো টিশার্টের কয়েক জায়গা শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। মুখভর্তি বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে সিয়ার দিকে।
এদিকে কাইলিন নিজেও রুম থেকে বেরিয়েছিল। অতঃপর কিচেনের দিকে একটা ছায়া যেতে দেখে পিছন পিছন এসেছে। কিন্তু এই মেয়ে তাকে ভূত ভেবে এমন হামলা করবে, সেটা কল্পনাও করেনি। সিয়ার হুঁশ আসতেই কাইলিনের হাতে নিজের হাত আটকানো দেখে ঝাঁকাতে লাগল,
—”আপনি, আপনি এত রাতে এখানে কি করছেন?”
কাইলিন দাঁতে দাঁত চেপে বিদ্রূপের সুরে প্রতুত্তর করে,
—”আর কি করবো, আত্মা সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর দেখছি কোথাও হরলিক্সের ডিব্বা আছে কিনা”
সিয়া সাথে সাথেই বুঝে গেল এই তালগাছ আবারও তার হাইট নিয়ে ঠাট্টা করছে যেটা তার কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য। ব্যাস, এবার সিয়া রেগে ফুঁসতে লাগল। নিজের গলা চওড়া করে জিজ্ঞেস করে,
—”হোয়াট, আমি হরলিক্সের ডিব্বা?”
—”না না, ডিব্বাও না। ডিব্বার স্যাম্পল, ডিব্বা আরেকটু লম্বা”
সিয়া এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে বুঝায়, “নাহ, সে আর এই তালগাছের সাথে কথা বলবে না।
কথায় কথা বাড়ে,
তর্কে ঝগড়া বাঁধে।
এই কথায় সে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। তাই সে মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করে,
—”আপনি চরম লেভেলের অসভ্য”
—”আর তুমি দেড় ফুটের পিচ্চি”
সিয়া নিজেকে এতবার নিষেধ করা সত্ত্বেও আটকাতে পারল না ঠিকই ঝাঁঝিয়ে উঠে কাইলিনের কথার বিপরীতে,
—”আমি পিচ্চি না, পিচ্চি হবে আপনার বউ, আপনার চৌদ্দ গোষ্ঠী”
—”আমার চৌদ্দ গোষ্ঠী রোজ নিয়মিত হরলিক্স খায়”
কাইলিন আর একটু ঝুঁকে সিয়ার কাছাকাছি এসে ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি ঝুলিয়ে আওড়ায়,
—”আর বউ আমার পিচ্চি হলেও সমস্যা নেই, আমি আছিতো হরলিক্স খাওয়ানোর জন্য”
বিপরীতে রমণী কি বুঝলো কে জানে তবে কাইলিন আর বলতে পারল না। তর আগেই সিয়া তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
—”অসভ্য, আপনার সাহস তো কম না”
—”তোমার হাইটও তো কম না… মানে, আছে নাকি?”
—”দেখুন মিস্টার কাইলিন, আর একটা কথা বললে….”
—”কি করবে? আগে স্টুল নিয়ে এসে আমার লেভেলে আসো। তারপর আরেক টা কথা শুনব”
—”আমি আপনাকে….”
—”আমাকে না, নিজেকে হরলিক্স খাওয়াও”
সিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের নাকের পাটাতন ফুলিয়ে গর্জে উঠে,
—”আমি আপনাকে খুন করে ফেলব”
—”তোমার ওই দেড় ফুট উচ্চতা নিয়ে?”
—”দেড় ফুট আপনার ব্রেইন”
তর্ক করতে করতে সিয়া আরও উত্তেজিত হয়ে উঠে। হঠাৎ কাইলিন বিরক্ত হয়ে তার মুখ চেপে ধরল। ঘটনা এতটা আকষ্মিক ঘটল যে কয়েক পলকের জন্য সিয়া হতভম্ব হয়ে যায়। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই কাইলিন গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
—”ব্যাস, আর একটা কথাও না। এতটুকু একটা পুচকি মেয়ে, দেড় ফুট হবে না, কিন্তু কথা বলছো দুই ফুটের মতো”
সে আরও ঝুঁকে এসে নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব অনেকটা ঘুছিয়ে ফের রুক্ষ স্বরে আওড়ায়,
—”আর এত রাত বিরাতে ম্যানশনে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? ঘুমাওনি কেন? ভয় পেলে একা নিচে আসার দরকার কি ছিল? কিছু হয়ে গেলে? নিজেকে সুপারওম্যান ভাবো নাকি?”
এই অদ্ভুত অধিকার মেশানো ধমকগুলো শুনে সিয়ার ভিতরের রাগ আরও একধাপ বেড়ে গেল। আজ পর্যন্ত কেউ তার সাথে এভাবে কথা বলেনি। মা বাবার একমাত্র কন্যা হিসেবে যথেষ্ট আদরে বড় হয়েছে। রমণী আর কিছু না বলে মোচড়াতে লাগল নিজেকে ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু বিপক্ষে মানব শক্ত করে ধরে আছে তাকে। ঠিক তখনই হঠাৎ কাইলিনের হুঁশ ফিরল। সে দ্রুত হাত ছেড়ে দিয়ে বলে,
—”সরি… সরি…”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। সিয়ার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে উষ্ণ একফোঁটা জল। সে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করল কাইলিনের দিকে। তারপর এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না, দৌড়ে উপরে উঠে গেল। পিছনে কাইলিন পিছু পিছু আসে,
—”হেই লিসেন, এই পিচ্চি, দাঁড়াও। আরে সরি বলছি তো’
কাইলিন কয়েক কদম এগিয়েও থেমে গেল। তারপর বিরক্তিতে নিজের চুলে হাত চালিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—”শিট….”
আরও জোরে দাঁত চেপে আওড়ায়,
—”ড্যাম, আমি এমনটা করতে গেলাম কেন। নিশ্চয় ঐ পিচ্চি টা এবার ভয়ে আমার ধারে কাছেও আসবে না”
কাইলওন ফিরে গেল নিজের কক্ষে। নিস্তব্ধ ব্ল্যাক ম্যানশনে আবারও নেমে এলো সেই ভারী নীরবতা।
রাত তখনও গভীর। ব্ল্যাক ম্যানশনের প্রতিটা দেয়াল যেন নিস্তব্ধতার ভারে জমাট বেঁধে আছে। বাইরে শীতল বাতাস মাঝে মাঝে জানালার কাঁচে এসে ধাক্কা দিচ্ছে, আর সেই শব্দে মনে হচ্ছে কেউ যেন অন্ধকারের আড়াল থেকে নিঃশব্দে হাঁটছে। আরজের কক্ষটাও অদ্ভুত ভাবে শান্ত হয়ে আছে। মৃদু নীলাভ নাইট ল্যাম্পের আলোয় বিশাল মাস্টার বেডটা আধো অন্ধকারে ডুবে আছে। সেই বিশাল বেডের মাঝখানে কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে আছে সানা। হঠাৎ ভূত দেখার মতো সে ছটফটিয়ে উঠে বসে। বড় বড় শ্বাস টেনে নেয় যেন নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বুকটা দ্রুত উঠানামা করছে। কপালের পাশে চিকন চিকন ঘাম চিকচিক করছে। রমণীর চোখদুটো আতঙ্কে বিস্ফারিত। কি দেখেছে সে?
দুঃস্বপ্ন, হ্যাঁ, সে আবারও সেই দুঃস্বপ্নটাই দেখেছে। রক্ত, হাসপাতালের সাদা দেয়াল, রিয়ানার নিথর মুখ, আয়ানের আহাজারি এগুলো বারবার তার চক্ষু সম্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে। আজ সারাদিনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ, রিয়ানাকে নিয়ে ভাবনা সব মিলিয়ে তার অবচেতন মন তাকে শান্তিতে ঘুমোতেও দিচ্ছে না। সানা কাঁপা হাতে নিজের বুকটা চেপে ধরে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল। তারপর স্বভাবতই হাত বাড়িয়ে পাশে আরজেকে খুঁজতে গেল। কিন্তু অনুভূত হয় শূন্যতা। সাথে সাথে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে একটু উঠে চারপাশে তাকায়,
—”রানভীর…”
বিপরীতে কোনো সাড়া নেই। সানা এবার কম্বলটা সরিয়ে নিচে নামল। ঠান্ডা মেঝেতে পা রাখতেই শরীরটা কেমন শিউরে উঠল। সে একে একে বাথরুম, বেলকনিতে খুঁজে। কিন্তু কোথাও আরজের লেশমাত্র নেই। তার কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো,
—”এই লোকটা আবার কোথায় গেল?”
নিজের মনেই বিড়বিড় করতে করতে সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। বেরুতেই নজরে আসে করিডোরটা অদ্ভুত নীরব। টিমটিমে হলুদ আলোয় পুরো পথটা আরও দীর্ঘ, আরও রহস্যময় লাগছে। সানা ধীরে ধীরে সামনে এগুতে শুরু করে। হঠাৎ তূর কানে আসে একটা চাপা, কারো গুমরানোর মতো শব্দ। অচিরেই তার চলিত পা থমকে গেল। শব্দটা আসছে করিডোরের শেষ প্রান্তের একটা কক্ষ থেকে। সানা কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। ভিতরে যাবে?
নাকি ফিরে যাবে?
মস্তিষ্ক বলছে, না। কিন্তু মন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় তাকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করল। শেষমেশ সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে নব ঘুরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। ভিতরে ঢুকতেই নজরে আসে পুরো রুম অন্ধকার। দূরে কোথাও একটা ছোট্ট নাইট লাইট টিমটিম করে জ্বলছে। সেই ক্ষীণ আলোয় আসবাবপত্রের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে দেয়ালে পড়েছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, এতক্ষণ যে গুমরানোর শব্দটা হচ্ছিল, সেটা হঠাৎ করেই থেমে গেছে। সানা সাবধানে এক পা এগোয়। ঠিক তখনই, হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার গলায় ঠান্ডা একটা ধারালো জিনিস চেপে ধরে। সাথে সাথে রমণী জমে গেল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে বরফশীতল একটা স্রোত নেমে গেল সাথে বুকের ভিতরটা হুহু করে উঠে অজানা আতঙ্কে। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথায় হাজারটা চিন্তা এসে আছড়ে পড়ে। বহু কসরতে একটা ঢোক গিলে ঠোঁটের কোণে কাঁপা হাসি টেনে বলল,
—”মম… আমি জানি এটা আপনি…”
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সোফিয়া স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার গাড়ো বাদামী চোখদুটো অদ্ভুত ভীত। অগোছালো চুল মুখের উপর পড়ে আছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে বহুদিনের নিদ্রাহীন, আতঙ্কে ভাঙাচোরা এক মানবী। তিনি কিছুক্ষণ সানার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বোঝার চেষ্টা করছেন, এই মেয়েটা কে?
চিনতে পারছেন?
নাকি পারছেন না?
তা বুঝা গেল না তবে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে সাথে তার ছুরি ধরা আঙুলগুলোও কাঁপছে। সানা আলতো করে তার হাত সরাতে চাইতেই সোফিয়া হঠাৎ আরও শক্ত করে ছুরিটা চেপে ধরে কাঁপা গলায় বললেন,
—”ইকবাল কোথায়?
তাড়াতাড়ি বল, না হয় আমি… আমি মেরে দিব”
সানা তার কথা শুনে অবাক হলো না। বরং খুব ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সোফিয়ার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ড্রাগস না পেলে তার শরীর ভেঙে পড়ে। আর ড্রাগস দিলে ভেতরের অঙ্গগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই এখন তাকে খুব অল্প পরিমাণে দেওয়া হয়। এতটাই কম, যাতে মানুষটা শুধু কোনোরকমে নিজেকে সামলাতে পারে। কিন্তু সেই কম মাত্রার নেশা তার ভাঙতে থাকা মস্তিষ্ককে আর ধরে রাখতে পারছে না। যার কারণে সে ভুলে যাচ্ছে, চিনতে পারছে না। বাস্তব আর অতীত একাকার হয়ে যাচ্ছে তার কাছে। তবে এতকিছুর পরও সে এক মুহূর্তের জন্যও ইকবালকে ভুলেনি।
সানা খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে সোফিয়ার হাতে ধরা ছুরিটা নিজের হাতে নিল। তারপর চোখ নামিয়ে তাকিয়ে হালকা থমকে গেল। এটা একটা খেলনা ছুরি, আরভির খেলনার বক্সের একটা প্লাস্টিকের ছুরি। নিশ্চয়ই দিনের বেলা খেলতে খেলতে এখানে ফেলে গেছে। সানা নিঃশব্দে ছুরিটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। টুক করে শব্দ হতেই সোফিয়া হঠাৎ ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন, যেন তিনিই এখন সবচেয়ে আতঙ্কিত। অতঃপর দেয়ালের পাশে গুটিসুটি মেরে দাঁড়ালেন। তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে শিশুসুলভ ভয়। তিনি সানার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করেন,
—”তুমি… তুমি কে?”
সানা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সোফিয়া দিকে। অন্ধকার কক্ষের ক্ষীণ আলোয় মানুষটাকে আজ কেমন ভাঙাচোরা লাগছে। এই নারীকে কি সত্যিই কোনোদিন পৃথিবী ভয় পেত? এই কাঁপা কাঁপা চোখের, স্মৃতি হারিয়ে ফেলা, আতঙ্কে গুটিয়ে থাকা মানুষটাই কি সেই সোফিয়া জাওয়ান, যার একটিমাত্র নাম শুনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বহু দাপুটে পুরুষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে ফেলত?
সানার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। কোথায় সেই আগুনচোখা নারী?
ক্ষমতার অহংকারে যার প্রতিটা পদচারণা ছিল ঝড়ের মতো। যার ঠোঁটের একটুকরো তির্যক হাসি মানেই কারও পতনের সূচনা। আর কোথায় আজকের এই সোফিয়া, যে নিজের কাছের মানুষকেও চিনতে সময় নিচ্ছে। একটা খেলনা ছুরিকে সত্যিকারের অস্ত্র ভেবে নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর চেষ্টা করছে। জীবন বোধহয় এমনই, আজ ক্ষমতা আছে, কাল নেই। আজ পৃথিবী পায়ের নিচে নতজানু, কাল সেই পৃথিবীই মুখ ফিরিয়ে নেয়। মানুষ ভাবে ক্ষমতাই সব। অথচ সময় নামের নিষ্ঠুর জিনিসটা একদিন সব কেড়ে নেয়, দম্ভ, প্রতাপ, অহংকার, পরিচয় এমনকি নিজের স্বাভাবিক অস্তিত্বটুকুও। আজ বাইরের পৃথিবীর কাছে সোফিয়া মৃত। যে নারী একসময় শত মানুষের ভাগ্য লিখত, আজ সে নিজেই নিজের স্মৃতির ভাঙা টুকরোগুলোর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। সানা খুব ধীরে এগিয়ে গেল। তারপর আলতো করে সোফিয়ার গালে হাত রেখে মৃদু হেসে নরম স্বরে বলল,
—”মম… আপনি আমাকে চিনতে পারেননি?
আমি সানা”
সোফিয়া স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে অনেকক্ষণ। মনে হলো, তিনি যেন স্মৃতির অতল গহ্বরে ডুবে গিয়ে নামটা খুঁজছেন। অবশেষে ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝালেন, তার মানে চিনতে পেরেছেন। সানার ঠোঁটের কোণে স্বস্তির ক্ষীণ হাসি ফুটে ওঠে। সোফিয়া ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“সা…সানা..তুমি… এখানে কেন?”
—”আপনাকে নিতে এসেছি। আপনি একা একা অন্ধকারে বসে ছিলেন কেন?”
হঠাৎ সোফিয়া ভয়ার্ত দৃষ্টিজোড়া চারপাশে নিক্ষেপ করে বিড়বিড়ায়,
—”ওরা… ওরা আসবে…”
—”কে আসবে?”
—”সবাই… সবাই আমাকে মারতে চায়…”
সানা তাকে আশ্বস্ত করে বলে,
—”কেউ কিছু করবে না আপনাকে। আমি আছি না?”
এই বলে, সে খুব সাবধানে সোফিয়ার হাত ধরে, হাতটা কেমন ঠান্ডা, কাঁপছে। সানা তাকে ধীরে ধীরে এনে বেডে বসায়। বিপরীতে সোফিয়া টু শব্দটাও করছে না। শুধু চুপচাপ বসে আছে। সানা তার পাশে বসে নরম গলায় শুধালো,
—”এখন বলেন, আপনি এখানে কেন এসেছেন”
সোফিয়া একটু নিচের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করলেন,
—”ঘুম… আসছিল না…”
—”ভয় পেয়েছিলেন?”
তিনি খুব আস্তে করে মাথা নাড়লেন। সানার বুকটা হুহু করে উঠল। এই নারী কোনোদিন ভয় শব্দটার অর্থ জানতেন না। অথচ আজ…? সানা খুব কোমল স্বরে ফের বলল,
—”আমাকে ডাকতেন…”
সোফিয়া এবার ধীরে ধীরে আড়চোখে তাকালেন। তারপর আধো আধো স্বরে বলে,
—”তুমি… ঘুমাচ্ছিলে…”
—”তবুও ডাকতেন, আমি আসতাম”
সোফিয়া কিছু বললো না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। তারপর খুব আস্তে বলল,
—”রনো কোথায়?”
যদিও সানা জদনে না তবুও মুখে মেকি হাসি টেনে প্রতুত্তর করে,
—”বাইরে গেছে”
—”সে খেয়েছে?”
সানা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তার হাতটা টেনে ধরে বলে,
—”মম, আপনার নিজের অবস্থা খারাপ, আর আপনি ছেলের খাওয়া নিয়ে ভাবছেন?”
—”হয়তো মা এমনি….”
ঠিক তখনই হঠাৎ সানার কিছু একটা মনে পড়ে, তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠে। সে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে শুধালো,
—”মম, আপনি জানেন?”
সানার এমন কণ্ঠে সোফিয়া চমকে তাকালেন।কণ্ঠে অগাধ বিস্ময়ের মিশেলে জিজ্ঞেস করে,
—”কি?”
সানা নিজের হাসিটা সামলাতে না পেরে বলল,
—”আপনি আবার দাদী হতে চলেছেন”
বাক্যটুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই মুহূর্তে সোফিয়ার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সে একেবারে স্থির হয়ে গেল, যেন কথাটা বুঝতেই পারেননি। চোখ দুটো বড় বড় করে ফের জিজ্ঞেস করে,
—”কিহহহ..? সত্যি আ..আমি… আবার.. দাদী?”
সানা এবার আরো কাছে সরে এসে বলতে শুরু করে,
—”হুম, আর আপনার ছেলে উফফ, সে তো একদম খুশিতে পাগল হয়ে গেছে এই খবর শুনে। আর… ভীর? ওর কথা আর কি বলব, ওর তো এখনই সিস্টার চাই….”
সোফিয়ার চোখে মুখে ধীরে ধীরে অগাধ খুশি নেমে আসে। সানা সেদিকে ধ্যান দিল না, সে নিজের মতো করে বলতেই থাকল আর সোফিয়া বাধ্য শ্রোতার মতো অতি মনোযোগের সহিত তা শুনছে,
—”জানেন, ভীর আমাকে জিজ্ঞেস করছে‘মম, সিস্টার কবে আসবে?’ আমি বলেছি আট-নয় মাস পর, এখন বেবি ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ও কিছুতেই মানতে রাজি না। বলছে, সে তো মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুমায়, তাহলে সিস্টার কেন আট নয় মাস ঘুমাবে”
সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠে, আজ এতগুলো দিন পর, সত্যিকারের হাসি। অতঃপর কিছু একটা ভেবে বলেন,
—”বাচ্চারা… খুব নিষ্পাপ হয় তাই। আমার রনোও এমন ছিল বোধহয়?
আচ্ছা, আমি… আমি কি ওকে দেখতে পারবো?”
সানা ভ্রুকুটি করে তাকায়। সে বুঝলো না সোফিয়া কার কথা বলছে। তাই জিজ্ঞেস করে,
—”কাকে?”
—”তোমার বেবিটাকে…”
সানার চোখ হঠাৎ তার অজান্তে ভিজে উঠে। সে ধীরে সোফিয়ার হাত চেপে ধরে বলে,
—”অবশ্যই দেখবেন”
বিপরীতে সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে যেন সে কিছু একটা অনুমান করতে পেরেছে,
–“যদি আমি তার আগেই চলে যাই, ওকে বলে দিও, ওর গ্র্যান্ডমা ওকে হয়তো খুব ভালোবাসবে”
সানার বুকটা নরম হয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে সোফিয়ার কাঁধে মাথা রাখে,
—”মম…”
সোফিয়া এবার নিজেই কাঁপা হাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিশে বলে,
—”তুমি… খুশি?”
সানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাসল,
—”অনেক”
—”রনো?”
—”আমার থেকেও বেশি”
—”আমার রনো, বাবা হতে খুব ভালোবাসে বুঝি…”
সানা মৃদু গলায় প্রতুত্তর করে,
—”হুম… খুব”
কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে আর কোন শব্দ হলো না। সোফিয়া কিছু একটা ভেবে খুব নিচু স্বরে আওড়ায়,
—”সানা, আমি কি খুব খারাপ মা ছিলাম…”
তার এমন প্রশ্নে সানার কপালে ভাঁজ পড়ে। সে মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”হয়তো”
—”খুব খারাপ মানুষও…”
—”সেটা আমিও জানি”
সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে তিক্ত একটা হাসি ফুটে ওঠে,
—”তবুও তুমি কেন আমার পাশে বসে আছো?”
—”কারণ আপনি এখন শুধু সোফিয়া জাওয়ান না, আপনি একজন অসুস্থ মা”
সোফিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে সে তা মুছবার প্রয়োজন বোধ করল না বরং সেভাবেই সানার কোলে আলগোছে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে বলে,
—”সানা…আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবে? ড্যাড চলে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নি। শুনেছি, এতে নাকি ঘুম তাড়াতাড়ি আসে। আমি একটু ঘুমাতে চাই'”
সানার বুকটা কেঁপে উঠল, সাথে চোখ দুটোও ভিজে গেছে। সে ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল,
—”এভাবে?”
—’হুম”
—”ঘুম আসছে?”
—”অনেকদিন পর…”
—”তাহলে চোখ বন্ধ করুন”
—”তুমি যাবে না তো?”
—”না, আপনি ঘুমান”
সোফিয়া চোখ বন্ধ করে ফের বলে,
—”সানা…তোমার বেবিটা… ছেলে হোক বা মেয়ে… ওকে খুব ভালোবাসবে। ওকে কখনো একা হতে দিবে না। নাহয় ও সোফিয়া হয়ে যাবে”
সানা ঠোঁট কামড়ে হাসল, চোখ দিয়ে গরগর করে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার। রমণী নিজেকে সামলে কথার প্রসঙ্গ পাল্টাতে আরো এটা সেটা বলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে কথার ফাঁকে ফাঁকে সোফিয়ার চোখ ভারী হয়ে আসতে লাগল। তিনি সানার কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। সানা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ডাক্তারের কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার,
“ওনার সাথে যত বেশি কথা বলবেন, উনি ততটা স্বাভাবিক থাকবেন। না হলে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবেন…”
আজও ঠিক তাই হয়েছে। একটু আগেও সোফিয়া তাকে চিনতে পারেননি, আতঙ্কে আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন। আর এখন, শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছেন। সানা ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ড্রাগস দিলে হয়তো সোফিয়া দ্রুত স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু সেই ড্রাগসই ধীরে ধীরে তার শরীরের প্রতিটা অঙ্গকে মেরে ফেলবে। বাঁচাতে গেলেও মৃত্যু,না বাঁচালেও মৃত্যু। কী ভয়ংকর এক বাস্তবতা। সানা খুব যত্ন করে কম্বলটা টেনে সোফিয়ার গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর ধীরে নিজের ফোনটা বের করে লোকেশন অ্যাপসটা অন করতেই তার চোখ কুঁচকে গেল। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—”রানভীরের বাচ্চা…আজকে এই লোককে আমি ছাড়বো না”
এই বলে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। শেষবারের মতো একবার ঘুমন্ত সোফিয়ার দিকে তাকায় তারপর নিঃশব্দ পায়ে অন্ধকার কক্ষটা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
গভীর নিশীথের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে, “নূর-ই-সাফা এস্টেট” এক অদ্ভুত নীরবতায় মোড়ানো এক প্রাসাদসম অট্টালিকা। চারপাশের বিশাল বৃক্ষরাজি কুয়াশার ধূসর চাদরে ঢেকে গিয়ে যেন মৃত ছায়ার মতো স্থির হয়ে আছে। ফার্মহাউসের অভ্যন্তরটাও আজ অস্বাভাবিক নীরব। বিশাল লিভিং রুমের ঝলমলে ঝাড়বাতির আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনের কালো সোফাটায় বসে আছে সারহাদ চৌধুরী।
তার কালো ওভারকোট রক্তে ভিজে গাঢ় হয়ে গেছে। মুখের বাঁ পাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের রেখা। কৃষ্ণকালো চোখদুটো নিথর, ভয়ংকর ভাবে স্থির সামনের প্রৌঢ়াতে। তার সামনের কাঁচের টেবিলের উপর রাখা কালো মলাটের ডায়েরিটা। আর তার ডান হাতে ধরা একটা কালো ধাতব বস্তু। আর বিপরীত পাশে বসে আছেন দিলরুবা খানম। তাঁর ঠোঁটের কোণে ধূর্ত হাসি সাথে চোখের গভীরে মুহূর্তের জন্যও সাবধানতা কমেনি। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে রায়ান ও আরও কয়েকজন বডিগার্ড, সবাই বন্দুক তাক করে রেখেছে সারহাদের দিকে।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা ঝুলে রইল পুরো হলরুমে। তারপর হঠাৎ, দিলরুবা খানম উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। সেই হাসির শব্দ যেন নিস্তব্ধ দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে ফিরে এলো সারহাদের কানে। তবে সে নির্বিকার। তিনি হাত নেড়ে পেছনের গার্ডদের বললেন,
—”গানস ডাউন”
গার্ডরা ধীরে ধীরে বন্দুক নামিয়ে নিল। দিলরুবা খানম এবার শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
—”প্রমাণ?”
সারহাদ কোনো উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে ডায়েরিটার একটা পাতা খুলে তার দিকে এগিয়ে ধরল। দিলরুবা খানম ভ্রু কুঁচকে পাতাটার দিকে তাকালেন নজরে আসে পাতার উপর রিয়ানার গুটিগুটি হাতের লেখা,
“জানেন সারহাদ,
আজ আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আয়ান হঠাৎ আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার কথা বলে নিয়ে গেল ডক্টর নায়রার কাছে। আমি পুরো রাস্তা জুড়ে আতঙ্কে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, প্রতিটা সেকেন্ডে আমার লুকিয়ে রাখা সত্যিটা ধরা পড়ে যাবে। আমি ভেবেছিলাম ডক্টর নায়রা হয়তো আয়ানকে সব বলে দেবে। হয়তো বলবে, আমার শরীরে যে রোগ বাসা বেঁধেছে, সেটা আর সাধারণ কোনো অসুখ নয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তিনি কিছুই বললেন না। আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন তিনি কিছুই জানেন না। যেন কেউ আগেই তাকে সতর্ক করে রেখেছিল। তার চোখে আমি চিকিৎসকের সততা দেখিনি, দেখেছিলাম অদ্ভুত এক ভয়। আর সেই ভয়টাই আমাকে আরো ভয় পাইয়ে দিয়েছিল’
দিলরুবা খানমের ঠোঁটের হাসিটা সামান্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সারহাদ আরেকটা পাতা উল্টায়,
“ডক্টরের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার পরও আমার অস্বস্তিটা কাটছিল না। আয়ান তখনও শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত ছিল। আমি তাকে গাড়িতে বসিয়ে আবার কেবিনে গিয়েছিলাম শুধু ডক্টর নায়রাকে ধন্যবাদ জানাতে। কিন্তু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আমি শুনতে পেলাম তিনি কারো সাথে ফোনে কথা বলছেন।আমি দরজার কাছে যেতেই তিনি চমকে উঠেছিলেন। সেদিন প্রথমবার আমার মনে হয়েছিল, আমার জীবনটা হয়তো আর আমার হাতে নেই”
পাতাটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন দিলরুবা খানম। সারহাদ ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলে রাখল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বুলি ছুঁড়ে,
—”আয়ান হয়তো এই ডায়েরিটা হাজারবার পড়েছে। কিন্তু ওর মাথায় কখনো এটাকে অস্বাভাবিক লাগেনি। কারণ ও ভালোবাসতে জানত, সন্দেহ করতে না। কিন্তু আমি…”
সে ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে আসে। তার চোখদুটো সরাসরি গিয়ে ঠেকল দিলরুবার চোখে। সারহাদ হিসহিসিয়ে উঠে,
—”আমি একবার পড়েই বুঝে গেছি এখানে কিছু একটা বড় কিছু হচ্ছে। একজন ডাক্তার যতই পেশেন্টের কথা রাখুক, কিছু নিয়ম থাকে। রোগীর গুরুতর অসুস্থতার ব্যাপারে পরিবারের সাথে আলোচনা করা বাধ্যতামূলক। অথচ ডক্টর নায়রা চুপ ছিলেন। কেন?”
দিলরুবা খানম তার প্রশ্নের বিপরীতে এবারও নিশ্চুপ। এদিকে সারহাদের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠে। সে ফের বলে,
—”আমার সন্দেহ আরো পোক্ত হয় যখন পরদিন ডক্টর নায়রা এক্সিডেন্টে মারা যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার কী জানেন? পুলিশ তার লাশই খুঁজে পায়নি। আর ঠিক তিন মাস পর… তাকে দেখা যায় চায়নার সাংহাই শহরের লুমিনা শপিং মলের সিসিটিভিতে”
দিলরুবা খানম এখনো নির্বিকার থাকলেও রায়ানের মুখের রঙ বদলে গেল। সারহাদ এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
—”চায়না…সেই দেশ, যেখানে আপনি নিজের সাম্রাজ্য গড়েছেন। চায়না… যেখানে সোফিয়া জাওয়ানও পুরোপুরি নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি, এমনকি আরজেও না। চায়না, যেখানে আপনি ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে মানুষকে অদৃশ্য করে দিতে পারেন”
সে কয়েক কদম এগিয়ে গেল দিলরুবা খানমের দিকে,
—”যেমন টা আপনি সানাম মানে সানার সাথে করেছেন আরজের থেকে দূরে রাখতে। আর আপনার পরিকল্পনাটা এমন নিখুঁত ছিল যে সোফিয়া কিংবা আরজে কেউই আপনাকে সন্দেহ করবে না। কারণ তাদের সামনে ছিল রিয়ানার মেডিকেল রিপোর্ট। এমন রিপোর্ট, যেগুলো সে নিজেই সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল”
সারহাদের চোখ এবার ধীরে ধীরে রক্তবর্ণ হয়ে উঠে। সে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে নিজেকে সামলে বলে,
—”কিন্তু আপনি একটা ভুল করেছিলেন। আপনি ভেবেছিলেন সবাই আবেগ দিয়ে ভাবে, কেউ যুক্তি দিয়ে ভাববে না। ডক্টর নায়রা ছিল ডক্টর সাইয়েদার অ্যাসিস্ট্যান্ট। আর ডক্টর সাইয়েদা কাজ করত জাইফেরার হয়ে। জাইফেরা… যার ছায়া অজান্তে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডের উপর পড়ে আছে। আর সোফিয়া কিংবা আরজের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে যদি কেউ এত বড় খেলা খেলতে পারে….”
সে থেমে সরাসরি দিলরুবার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”তাহলে সেই সাহস একমাত্র আপনারই আছে, মিসেস দিলরুবা খানম। আর আপনি হয়তো কখনো কল্পনাও করেননি, রিয়ানা এমন একটা ডায়েরি লিখবে তাও মৃত্যুর আগে আই মিন খুনের আগে”
পুরো হলরুম নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও বাতাসে জানালার কাঁচ কেঁপে উঠছে বারবার। সারহাদ বন্দুকটা ধীরে ধীরে হাতে তুলে নিল। তারপর একেকটা শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
—”তো, এখনো অভিনয় চালিয়ে যাবেন? নাকি এবার সত্যিটা বলবেন?”
সারহাদের প্রতিটা যুক্তি, প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা সন্দেহ যেন ধারালো ছুরির মতো গিয়ে বিঁধছিল দিলরুবা খানমের মুখোশের গভীরে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি বিচলিত হলেন না। বরং…হঠাৎ করেই পুরো হলরুম কাঁপিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তার সেই হাসি কোন স্বাভাবিক হাসি না বরং ওই হাসির ভেতরে ছিল বহু বছরের জমাট বাঁধা ঘৃণা, প্রতিশোধ, শোক আর উন্মাদনার বিষাক্ত প্রতিধ্বনি। সারহাদ দাঁতে দাঁত চেপে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আর দিলরুবা খানম হাসতে হাসতেই সোফায় হেলান দিয়ে হাত তালি দিয়ে উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বললেন,
—”বাহ… সত্যিই বাহ, সারহাদ চৌধুরী। আমি জানতাম তুমি বুদ্ধিমান, কিন্তু এতটা কল্পনার বাহিরে? তুমি আজ প্রমাণ করে দিলে, তুমি চৌধুরীদের যোগ্য উত্তরসূরী একদম আজাদ চৌধুরীর মতো”
তারপর হাত থামিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে স্বগোতক্তি করেন,
—”হ্যাঁ, রিয়ানাকে আমিই মেরেছি। ঐ ডক্টরের মাধ্যমে”
এক নিঃশ্বাসে বাক্যটা উগড়ে দিল, একটুও দ্বিধাবোধ ছাড়া, একটুও অনুশোচনা ছাড়া। মনে হচ্ছিল, কোনো অপরাধ নয় বরং এক বিশাল অর্জনের কথা স্বীকার করছেন তিনি। সারহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে, হাতের শিরাগুলোও ফুলে উঠেছে। সে গম্ভীর, কর্কশ স্বরে জিজ্ঞেস করে,
—”কেন?”
দিলরুবা খানম কোনো উত্তর দিলেন না। পরিবর্তে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন লিভিং রুমের বিশাল দেয়ালে টাঙানো দুটো ছবির সামনে। একটায় সামরিক পোশাক পরা এক সুদর্শন পুরুষ যার চোখে দৃঢ়তা, ঠোঁটে সাহসী হাসি। পাশের ফ্রেমে এক তরুণী মেয়ে তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক প্রাণবন্ত হাসি, চোখে স্বপ্ন। দিলরুবা খানম কাঁপা আঙুল তুলে প্রথম ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—”এদের জন্য”
সারহাদ ভ্রু কুঁচকাল। সে কিছুই বুঝতে পারল না। দিলরুবা ফিসফিসে গলায় বললেন,
—”ওই মানুষটার নাম বীরজাদা খানম, আমার প্রয়াত স্বামী”
কিছুক্ষণ তিনি শুধু ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
—”আমাদের পরিচয়টা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু ভালোবাসাটা, অস্বাভাবিক রকম গভীর। নব্বই দশকের ভালোবাসা বলে কথা। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। আর সে ছিল দেশের জন্য পাগল একটা মানুষ। চোখে ছিল দেশকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন, মানুষের মুখে হাসি দেখার স্বপ্ন”
তিনি বলতে বলতে মৃদু হেসে ফেললেন,
—”ও খুব কম কথা বলত। কিন্তু যখন বলত… মনে হতো পৃথিবীর সমস্ত নিশ্চয়তা তার কণ্ঠে বাসা বেঁধেছে। আমি মাসের পর মাস তার একটা চিঠির জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম। পিতাজানের তাকে পছন্দ ছিল না। তাই আমি নিজে তার হাত ধরে পরিবার পিছনে ফেলে চলে আসি। অতঃপর আমাদের ভালোবেসে বিয়ে হলো। আমার পরিবারের কেউ সেই বিয়েতে সম্মতি দেয় নি বরং পিতাজান আমাকে ত্যাজ্য করে দিয়েছে”
এটুকু বলেই থেমে যান তিনি। তার চোখের কোণে ইতিমধ্যে জল জমে ওঠেছে, কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সেই নীরবতার বুক চিরে বেরিয়ে এলো ভাঙা কণ্ঠ,
—”আর বিয়ের ঠিক সাতদিন পর…”
তার গলায় আটকে গেল বাকি শব্দ গুলো। তিনি চোখ বন্ধ করে বলেন,
—”ও দেশের পতাকায় মোড়ানো লাশ হয়ে ফিরেছিল।
পুরো হলরুম স্তব্ধ। কারো মুখে ‘রা’ নেই। দিলরুবা খানম এবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার চোখে তখন আর জল ছিল নেই তার জায়গায় অদ্ভুত এক বিষ ছিল। তিনি দন্ত পাটি পিষে বলেন,
—”একটা টেররিস্ট হামলায় এসব হয়েছে। আর সেই হামলার নেতৃত্বে ছিল সোফিয়া জাওয়ান”
সারহাদের চোখ সরু হয়ে এলো। দিলরুবা খানম এবার যেন বহু বছরের জমে থাকা আগুন উগরে দিতে শুরু করলেন,
—”তখনকার বাংলাদেশে ক্ষমতা ছিল চৌধুরীদের হাতে। সোফিয়া জানত, সরাসরি এখানে সাম্রাজ্য গড়া সহজ না। তাই সে প্রথমে ভারত আর পাকিস্তানের আন্ডারওয়ার্ল্ডকে ব্যবহার করল। সে মানুষের মনে ভয় ঢোকাতে শুরু করে। রাতের আঁধারে বিস্ফোরণ, গণহত্যা, অপহরণ, সীমান্ত হামলা করতে শুরু করে। লরেন্স যেমন রাতের বেলা শয়তান হতো আর দিনের আলোতে ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকত… সোফিয়াও ঠিক সেভাবেই নিজের শুরুটা করেছে। আর তার ডান হাত ছিল আলী মির্জা। ভারতের সন্তান হয়েও ক্ষমতার লোভে নিজের দেশকে বিক্রি করে দেওয়া এক বিশ্বাসঘাতক”
তিনি দাঁত চেপে আরও কয়েকটা নাম উচ্চারণ করলেন,
—”রাশেদ কুরেশি, বিক্রম সেহগাল, ফারুক নাভিদ সবাই ক্ষমতার নেশায় পাগল ছিল”
তারপর তিনি আবার বীরজাদা খানমের ছবির দিকে তাকালেন,
—”আমার স্বামী তখন এসব দানবদের থামানোর জন্য একটা সংস্থা গড়েছিল,
“জাইফেরা”
ও বলত, যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন এই দেশকে জানোয়ারদের হাতে ছাড়বে না। কিন্তু ও চলে গেল। আর আমি…”
তিনি ধীরে ধীরে নিচে বসে পড়লেন যেন পুরনো স্মৃতি গুলোকে শরীর আর বহন করতে পারছে না। দিলরুবা নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আওড়ান,
—’আমি একা হয়ে গেলাম। দিনের বেলা আমি শক্ত ছিলাম। সরকারের হয়ে জাইফেরা সামলাতাম। কিন্তু রাত হলেই পুরো পৃথিবীটা খালি লাগত”
তারপর ধীরে ধীরে দ্বিতীয় ছবিটার দিকে তাকালেন, যেটা ছিল সুনেহনার,
—”তখন আমি ওকে দত্তক নিই। রক্তের সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু… সে-ই ছিল আমার পৃথিবী। আমি ওকে নিজের হাতে বড় করেছি। প্রতিরাতে ওকে ওর বাবার গল্প শোনাতাম। বীরজাদা খানম কেমন সাহসী ছিল, কেমন নির্ভীক ছিল। আর হয়তো সেই ভুলটাই করেছিলাম”
তিনি এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করলেন,
—”কারণ একদিন সুনেহনা এসে বলল,
‘মা, আমি বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব, দেশ বিরোধীদের শাস্তি দিব। আমি বাবার মতো দেশের জন্য লড়ব’ আমি..আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম এই পথ কেমন। কিন্তু সে ছিল তার বাবার মতোই জেদি। আমার সব বাধা অমান্য করে সে বেরিয়ে পড়ল।”
তারপর ধীরে ধীরে তিনি বলতে শুরু করলেন সেই ভয়ংকর অধ্যায়ের কথা, কিভাবে সুনেহনা জাওয়ানদের শিপে উঠে পড়েছে, কিভাবে সেই শিপে মেয়েদের পাচার করা হচ্ছিল। আর সুনেহনা সেই মেয়েদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেই শিকারে পরিণত হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, কিভাবে কক্সবাজারে পৌঁছানোর আগেই প্রতিটা মেয়েকে ভোগের পণ্যে পরিণত করা হয়েছিল। দিলরুবা খানমের কণ্ঠ কেঁপে উঠে,
—”আমি জানার সাথে সাথেই বাংলাদেশে আসি। এখানকার প্রতিটা রেস্টুরেন্টে গেছি, প্রতিটা হোটেলে, প্রতিটা অন্ধকার ঘরে। একজন মা হয়ে আমি আমার মেয়েকে খুঁজেছি”
তার চোখ দিয়ে এবার ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন,
—’কিন্তু পাইনি, আমি ভেবেছিলাম ও বেঁচে আছে… কোথাও পালিয়ে গেছে”
হঠাৎ তার কান্না থেমে গেল। তিনি ধীরে ধীরে ফের বললেন,
—”তারপর একদিন, ডক্টর সাইয়েদের স্বামী আলভী তুৎমিশ আমার কাছে একটা কফিন পাঠাল। ডক্টর সাইয়েদার সাথে আমার কক্সবাজার এসেই প্রথম পরিচয় হয়। আমার শ্বাস আটকে এসেছিল, আমি যখন কফিন খুললাম। আমি আমার মেয়েটাকে চিনতেই পারিনি। ওর শরীরটা…ওর শরীরটা এমন ছিল যেন হিংস্র জানোয়ার ছিঁড়ে খেয়েছে…”
এটুকু বলেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন,
—”আমার সুনেহনা, আমার বাচ্চাটা, আমার নিষ্পাপ ফুলটা….”
পুরো হলরুমে শুধু তার কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে বলেন,
—”আমি তিনমাস একদম শকে ছিলান। তারপর একদিন আমি ওর ল্যাপটপ খুললাম। সেখানে একটা ক্যামেরা রেকর্ডিং ছিল। যেটা সে নিজের গলায় একটা সিক্রেট ক্যামেরা লাগিয়ে ছিল তার এক্সেস এখানে ছিল। আমি ভিডিওটা চালু করতেই নজরে আসে আমার মেয়েটাকে, ঐ জানোয়ারগুলো ছিঁড়ে খাচ্ছে”
তিনি বুক চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন,
—”ও চিৎকার করছিল, আমাকে ডাকছিল। আর আমি কিছুই করতে পারিনি। আর সেই ভিডিওতে তিনটা মুখ আমি পরিষ্কার দেখেছিলাম, আলী মির্জা, রাশেদ কুরশি, রনি হায়দার”
কক্ষে এক ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউই কিছু বলছে না। শুধু ভারী শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে দিলরুবা খানম উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখে এখন কেন জল নেই, শুধুই উন্মাদনা,
—”তারপর আমার জীবনে আর কি ছিল? স্বামী নেই, মেয়ে নেই, কিছুই নেই। তারা আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়েছে। তাই আমিও তাদের কাছ থেকে সব কেড়ে নিতে চেয়েছি। আমি বুঝে গিয়েছিলাম সরাসরি সোফিয়ার সাথে লড়াই করা যাবে না। তাই আমি জাইফেরাকে দুই ভাগে ভাগ করি। দিনের আলোতে ব্যবসা।ল, আর রাতের আঁধারে…”
তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে উঠে,
—”মৃত্যু”
তিনি ধীরে ধীরে সারহাদের দিকে এগিয়ে এলেন। রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”আমি সোফিয়াকে বোঝাতে চেয়েছি… নিজের মেয়ের নিথর দেহ দেখলে একটা মায়ের কেমন লাগে। রিয়ানার সাথে যা করেছি… সবই প্রতিশোধ। আর এমনিতেও ওর রোগ ছিল। আজ না হোক কাল… মরতই”
তার চোখে এখন ভয়ংকর উন্মাদনা নাচতে লাগল, কণ্ঠে এক বিকৃত প্রশান্তি ফুটে উঠে,
—’আমি শুধু ওকে কষ্টের জীবন থেকে একটু আগে মুক্তি দিয়েছি”
তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, আবারও সেই ভয়ংকর, শীতল হাসি। আর সেই হাসি শুনে মনে হচ্ছিল, এই নারী বহু আগেই মানুষ থাকা ছেড়ে দিয়েছে। সোফিয়ার নাম উচ্চারণ করলেই তার চোখের মণি কেমন বিকৃত উন্মাদনায় কেঁপে উঠে,
—”আর সোফিয়া, ওই নারী মানুষ না… অভিশাপ। যেখানে গেছে, সেখানেই মৃত্যু বুনেছে। মানুষের জীবনকে দাবার গুটির মতো ব্যবহার করেছে…”
তিনি একাধারে বলেই যাচ্ছিলেন। আর এদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদ ধীরে ধীরে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। গালের পাশের রগগুলো পর্যন্ত ফুলে উঠেছে। আঙুলের গিঁটগুলো এত জোরে চেপে ধরেছে যে সেগুলো সাদা হয়ে গেছে। তার বুকের ভেতরে যেন কেউ আগুন ঢেলে দিয়েছে। চোখের মণিগুলো ধীরে ধীরে রক্তবর্ণ ধারণ করছে। তারপরও নিজেকে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করে, কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে সে যদি নিজের রাগের কাছে হেরে যায়, তাহলে সত্যের শেষ অংশটুকুও আর জানা হবে না। কিন্তু যখন দিলরুবা খানম আবারও অবজ্ঞার সুরে “রিয়ানা” নামটা উচ্চারণ করলেন। সারহাদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় গর্জে উঠে,
—”রিয়ানার এত দোষ কী ছিল?
ওর দুইটা নিষ্পাপ বাচ্চার কি দোষ ছিল। অন্যায় ওরা করেছে আর আপনি শাস্তি দিলেন তাদের?”
পুরো হলরুম কেঁপে উঠল প্রশ্নটার ভারে। এক মুহূর্তও দেরি করলেন না দিলরুবা খানম। ঠান্ডা, নির্মম স্বরে বলে উঠলেন,
—”আমার মেয়ের কী দোষ ছিল?
আর রিয়ানার একটাই দোষ ছিল, সে সোফিয়ার মেয়ে ছিল। আর যদি বলো ঐ দুইটা বাচ্চা তাহলে আমি ওদের মেরে নিজের ভুল শোধরে নিতে পারি। কি বলেো?”
সারহাদের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে পড়ে গেল রিয়ানার ডায়েরির প্রতিটা লাইন, প্রতিটা চাপা কান্না, প্রতিটা অসমাপ্ত অনুভূতি। তার ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে সামনের মহিলাকে মেরে ফেলতে কিন্তু এখন সঠিক সময় না। সে ধীরে ধীরে আবার জিজ্ঞেস করে,
—”সানাম মানে সানাকে এই সবকিছুর মধ্যে টেনে আনা… এটাও কি আপনার প্ল্যান ছিল?”
দিলরুবা খানম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন,
—”নাহ”
তার কণ্ঠে এবার প্রথমবারের মতো উন্মাদনার বদলে অন্য এক অনুভূতি ফুটে উঠল। সেটা কি মমতা? হয়তো,
—”সানা আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না। বরং… মেয়েটার জন্য সত্যিই আমার খারাপ লাগত”
সারহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। দিলরুবা খানম ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিলেন। তার চোখে যেন বহু পুরনো কোনো স্মৃতি ভেসে উঠে,
—”যেদিন প্রথম ডক্টর সাইয়েদা আমাকে বলল, ‘মেয়েটা আরজের স্ত্রী’ সেদিন আমি ঠিক করেছিলাম ওকে চায়নায় নিয়ে গিয়ে শেষ করে ফেলব। কারণ আমি ভেবেছিলাম… সোফিয়ার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কেড়ে নেব, তার বংশধর”
তারপর হঠাৎ তার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠে,
—”কিন্তু সানাকে প্রথম দেখার পর…আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন আবার সুনেহনাকে দেখছি। একইরকম জেদ, একইরকম দুষ্টুমি, একইরকম চোখে আগুন নিয়ে কথা বলা আর হাসলে একদম আমার মেয়ের মতো লাগে”
সারহাদ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল যেন বুঝার চেষ্টা করেছে, ওনি এখনো অভিনয় করছেন নাকি সত্যি। দিলরুবা খানম এবার সত্যিই কোমল হয়ে গেলেন,
—”সানা যখন রাগ করত…আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো সুনেহনা যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে। ও যখন হাসত…আমার বহু বছর পর মনে হতো এই পৃথিবীটা এখনও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি। আমি কখন যে মেয়েটাকে নিজের মেয়ের চোখে দেখতে শুরু করেছি… বুঝতেই পারিনি”
কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল কক্ষটা। তারপর হঠাৎ তিনি সামনে ঝুঁকে এলেন। চোখে আবার সেই বিপজ্জনক ঝিলিক নিয়ে সারহাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—”তাই একটা অফার দিচ্ছি তোমাকে, সারহাদ। আমার সাথে হাত মেলাও। আমরা একসাথে জাওয়ানদের পুরো বংশ শেষ করে দেব। আরজেকে মেরে ফেলো। আর সানাকে…”
তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে ফুটে ওঠল ক্রুর হাসি,
—’সারাজীবনের জন্য নিজের করে নাও। আমি জানি তোমার মনে সানার জন্য অনুভূতি আছে”
তার এত বড় অফারের বিপরীতে সারহাদ তখবও নির্বিকার। হঠাৎ পুরো হলরুম কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সারহাদ। সে এত জোরে হাসছিল যে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ডগুলো পর্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। দিলরুবা খানমের চোখ সরু হয়ে এলো,
—”হাসছ কেন?”
সারহাদ উত্তর দিল না। সে ধীরে ধীরে কোটের বুকপকেট থেকে মোবাইল বের করল। স্ক্রিনে তখনও ভিডিও রেকর্ডিং চলছে। সে শান্তভাবে রেকর্ডিংটা বন্ধ করে কারো নাম্বারে সেন্ড বাটন চাপল। দিলরুবা খানমের মুখের রঙ মুহূর্তে বদলে গেল। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালেন তিনি। তার মানে এতক্ষণ ধরে বলা তার প্রতিটা স্বীকারোক্তি রেকর্ড হয়েছে। সারহাদ ঠান্ডা গলায় শুধালো,
—”আপনার অফার?
আই’ম ডিসগাস্টেড”
তারপর একদম স্পষ্ট স্বরে বলল,
—”আমি কখনোই সানামকে ঘৃণা, প্রতিশোধ আর রক্তের বিনিময়ে চাইব না। আর আরজে?”
সে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সত্যি টা বলে,
—”ওকে মারার ইচ্ছে আমার অনেকবার হয়েছে। কিন্তু সেটা আমার ব্যাপার। আপনার মতো উন্মাদ নারীর সাথে হাত মিলিয়ে না”
দিলরুবা খানমের মুখ মুহূর্তে বিকৃত হয়ে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল। তিনি হাত তুলতেই চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সব বডিগার্ড একসাথে বন্দুক তাক করল সারহাদের দিকে। দিলরুবা খানম ফিসফিস করে বললেন,
—”যদি আমার সঙ্গ না দাও তাহলে মরো”
তিনি হাত নামিয়ে ইশারা করতেই পর মুহূর্তে ঠাস ঠাস করে পরপর কয়েকটা গুলির শব্দে পুরো হলরুম কেঁপে উঠল। কিন্তু দিলরুবা খানমের ঠোঁটের হাসিটা মিলিয়ে গেল যখন দেখল গুলিগুলো সারহাদের গায়ে লাগেনি বরং তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ডগুলোর মাথার খুলি উড়ে গেছে, রক্ত, মগজ আর হাড়ের টুকরো চারদিকে ছিটকে পড়ে। দিলরুবা খানম আতকে উঠলেন। রায়ানও চমকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল।
দুজনের বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা ভয় নেমে এলো। কেননা এত দ্রুত, এত নিখুঁত শট, এটা সাধারণ কারও কাজ না। তারা ধীরে ধীরে পিছনের অন্ধকারের দিকে তাকায়। আর ঠিক তখনই অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে এলো আরেকটা কালো অবয়ব। যার মাথায় ক্যাপ, মুখের অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা, দুই হাতে ধোঁয়া ওঠা বন্দুক। ধীরে ধীরে সে আলোয় এগিয়ে এলো। আর আলো তার মুখ স্পর্শ করতেই জ্বলজ্বল করে উঠল একজোড়া বাদামি চোখ,
“আরজে”
দিলরুবা খানম তাকে দেখে সত্যিই চমকে উঠলেন। তার বুকের ভেতর কেমন ধাক্কা লাগল। আরজে ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দিলরুবা খানম দ্রুত রায়ানের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলেন। রায়ান মাথা নাড়িয়ে কাউকে মেসেজ পাঠায়। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আরো কয়েকজন বডিগার্ড চারদিক থেকে এসে সারহাদ আর আরজেকে ঘিরে ফেলল। দিলরুবা খানম এবার হেসে উঠলেন,
—”তো এটা তোমাদের প্ল্যান ছিল। কি বাচ্চাদের মতো খেলা খেলছো। যাক ভালোই হয়েছে। আজ তোমাদের দুজনকেই একসাথে শেষ করব”
তিনি দাঁত চেপে বাকিটা বললেন,
—”এক রাতে চৌধুরী আর জাওয়ান দুই বংশের উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যাবে”
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আরজে নির্বিকার। মনে হচ্ছিল সে পুরো পরিস্থিতিটা উপভোগ করছে। হঠাৎ সে মাথা কাত করে দিলরুবা খানমের দিকে তাকায় তারপর নিচু স্বরে, তির্যক হাসি নিয়ে ফিসফিস করে আওড়ায়,
—”মাই সেকেন্ড মাদার-ইন-ল…মরার আগে একবার নিজের মেয়েকে দেখবেন না?”
দিলরুবা খানম কেঁপে উঠলেন বাক্যটা শুনে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১
—”কি?”
তিনি কথাটার অর্থই বুঝতে পারলেন না। কিন্তু আরজে ধীরে ধীরে তার পিছনের দিকে তাকাতেই দিলরুবা খানমও ঘুরে তাকালেন। আর পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল। সাথে চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠে। মনে হচ্ছিল তিনি কোনো মৃত মানুষকে দেখছেন। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল, গলা দিয়ে শব্দ বের হতে চাইছে না। তারপরও একটা ফাঁকা ঢোক গিলে বহু কষ্টে ফিসফিস করে বের করলেন,
—”স…সানা…”
