৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯ (৪)
রুপান্জলি
রাস্তার মাঝখানে গাড়ির ঢিকির উপর বসে আছে দ্বীপ,, তার হাতে আঁধপোড়া সি*গারেট। একটার পর একটা টান দিচ্ছে আর নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে,, বহুদিন পর সি*গারেট ছুলো সে। লাস্ট ছুয়েছিলো ৬ দিন আগে,, অর্পনা যখন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো তখন। আজ আবার ছুলো তাও একই কারনে,, সামনে দাড়িয়ে আছে শত শত গার্ড। গতো এক ঘন্টা যাবত অর্পনাকে খোঁজার পরেও ওর টিকিটির ও দেখা পাওয়া যায়নি। ওর খোঁজ পাওয়া তো দূর সামান্য পরিমান ক্লু ও রেখে যায়নি বে*য়াদবটা। অর্পনার সাথে কোনো ফোন নেই তাই ওকে ট্রেস করা যাচ্ছেনা সেই সাথে ওর বন্ধুদের লাস্ট লোকেশন দেখাচ্ছে ভার্সিটির পিছনে।
চালাকি করে বেরোনোর সময় সব কয়টা ফুল ডিভাইস অফ করে দিয়েছে। কোনো মতেই তাদের বর্তমান লোকেশন জানার উপায় নেই। বিহান চাচ্ছিলো নিউজের মাধ্যমে অর্পনার খোঁজ চালাতে কিন্তু দ্বীপ নাকোচ করে দিয়েছে। সে চায়না তার বউকে সবাই দেখুক,, বউ হচ্ছে হালাল জিনিস,, আদরের জিনিস তাকে সবার সামনে প্রকাশ করা কাপুরুষতা। দ্বীপের ভাবনার মাঝেই তার দিকে ফোন এগিয়ে দিলো বিহান,, চরুই পাখির ন্যায় কিচির মিচির করা কন্ঠে বাঘের মতো হুংকার শুনে চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ। ফোনের স্ক্রিনে ভাসছে অর্পনা আর সেই লোকের ঝগড়ার দৃশ্য। বাসে যখন অর্পনা লোকটার উপর এটাক করেছিলো,, তখন থেকে শুরু করে লোকটার বুকের উপর হাটু দিয়ে চেপে ধরে বলা প্রতিটি কথা,, আঘাত স্পষ্ট দেখা যাছে। দ্বীপ খপ করে ফোনটা হাতে নিয়ে নিলো,, অর্পনাকে দেখে হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগলো। ওর পাগলামি দেখে অবাক হলোনা বিহান,, গত দের ঘন্টা যাবত এই ছেলে অর্পনার ছবি দেখছে আর চুমু খেতে খেতে কাতর স্বরে বলছে “” বউ তুই কই? চলে আয়না। আমার একটু ও ভালো লাগছেনা”” তবে এবারের কথাটা ব্যাতিক্রম ছিলো। সে ফোন থেকে ঠোঁট সরিয়ে বিহানের দিকে ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে বললো — কই পেয়েছিস?
,,,বিহান ঠোঁটে বিশ্ব জয়ের হাসি ফুটিয়ে বললো — আমার বোন তো পুরো ভাইরাল,, বাসে এই লোকটা একটা মেয়েকে হেরাস করছিলো। সেটা দেখতে পেয়ে অর্পনা লোকটাকে ইচ্ছা মতো পিটিয়েছে। পিটিয়ে আবার হসপিটালে ভর্তি করানোর জন্য টাকাও দিয়েছে,, ভাবতে পারছিস? কতো বড়ো হিম্মত থাকলে মানুষ এমন করতে পারে? আই প্রাউড অফ মাই সিস্টার!!
,,,দ্বীপের ঠোঁটেও হালকা হাসি ফুটলো,, সে আবারও মোবাইলে চলা ভিডিও টা পোজ করে অর্পনার ছবিটা জুম করে ঠোঁট বরাবর চুমু খেয়ে গর্ভের সহিত আওড়ালো– আমার জংলী বাঘিনী,, যেখানে অন্যায় দেখবে সেখানেই আও!! ( বাঘের থাবার ন্যায় হাত দ্বারা থাবা মেরে)
,,, বলতে বলতে আবারও ভিডিওটাতে মনোযোগ দিলো,, ইতিমধ্যে ২৩ k ভিউ আর ১২k শেয়ার হয়ে গিয়েছে। এই বিষয়টাতে বড্ড ব্যাথা পেলো দ্বীপ,, সে তার বউকে হাইড করতে চাইলো অথচ আর তার বউ এমন কান্ড করলো যার ফলে এখন সবাই তাকে দেখছে। সেই সাথে ঐ লোকটার বলা প্রতিটি গালি দ্বীপের মস্তিষ্কে গিয়ে লাগছে। আপাতত এই লোক কে নিয়ে ভাবার সময় নেই,, যত দ্রুত সম্ভব তাকে তার ভেলোরার কাছে পৌছাতে হবে। ঐ ছোট্ট শরীরটা যতক্ষণ না তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে ততোক্ষণ তার বুকটা শান্ত হবেনা। দ্বীপ ভিডিও জুম করতে করতে বাসের লেখাটার দিকে নজর তাক করলো,, এটা বসুন্ধরার বাস তার মানে অর্পনা বসুন্ধরায় আছে। ফোনের স্ক্রিন অফ করে গাড়ির ঢিকি থেকে লাফিয়ে নামলো দ্বীপ। বিহানের উদ্দেশ্যে বললো — স্রিফানকে নিয়ে আয়!!
,,, বিহান আগেই বাসের বিষয়টা খেয়াল করেছে। তাই তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা। গাড়ির পাশে রাস্তায় বসে থাকা স্রিফানকে কোলে তুলে নিলো বিহান,, তরিহরি করে গাড়ির ডোর খুলে ভিতরে ঢুকে পরলো। দীর্ঘ ৪০ মিনিটের পথ ২৮ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড পারি দিয়েছে। বসুন্ধরা গেইটে গাড়ি থামতেই স্রিফানের গলায় থাকা রকেটে ট্রেকার সেট করে দিলো দ্বীপ। পরপর মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে বললো — তোমার পার্মানেন্ট মাম্মাকে খুজে বের করবে,, ওককে? পাপ্পা খুব কষ্ট পাচ্ছে আর পাপ্পার কষ্ট লাঘব করা তোমার দায়িত্ব।
,,, ট্রেনিং প্রাপ্ত স্রিফান তার পাপ্পার পরনের শার্টে দুবার লেহন দিলো মানে সে তার দায়িত্ব ঠিকঠাক ভাবে পালন করবে। দ্বীপ বক্র হেঁসে স্রিফানকে গাড়ির ডোর খুলে রোডে নামিয়ে দিলো। স্রিফান ছুটলো তার মাম্মার খোঁজে আর স্রিফানের পিছন পিছন ছুটলো দ্বীপ তার প্রান প্রিয়ার খোঁজে,,,
,,, দোস্ত!!”S25 Ultra” না কিনে কমলা কালার আইফোন টা কিনতে পারতি,, তর জামার রঙের সাথে মিলে যেতো। একদম খাপে খাপ, ময়নার বাপ।
,,, পল্লবের কথায় ধীরো স্বরে হেঁসে ফেললো ইরা,, মন খারাপ থাকায় উষ্ঠপুটে হাসিরা ভিরতে চায়না,, তবুও ঠোঁটে কিঞ্চিত হাসি রেখে মজা করার চেষ্টা করে বললো — এটা ময়নার বাপ হবেনা বোকা, এটা ময়নার মা হবে।
,,,, অরুন বেশ স্বাভাবিক,, এমন ভাব করছে যেনো তার মতো সুখি এই পৃথিবীতে কম মানুষ ই রয়েছে। সে অতিরিক্ত প্রফুল্ল চিত্তে বললো — অর্পনা ময়নার মা হলে দ্বীপ ভাই তবে ময়নার বাপ হবে,, একই তো হলো। অর্পনা আর দ্বীপ ভাই আলাদা নাকি? ময়নার বাপ বলা যেই কথা ময়নার মা বলা একি কথা। সেই তো ময়না ওদেরি সন্তান।
,,, বন্ধু বান্ধবের কথায় অর্পনা বিরক্তিকর কন্ঠে বললো — ওসব বাচ্চা কাচ্চা টানিস নাতো,, আমি কখনোই ওসব নিয়ে ভাবিনি। আমি তো কখনো সংসারি করবোনা,, আর না সেসব নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। আমার কাছে সংসার, বাচ্চা এগুলো লেইম লাগে। আগে জানলে দ্বীপ মির্জার সাথে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ টা করে নিতাম আর এখন কোর্টে গিয়ে ডিরেক্ট ডিভোর্স। শুধু কবুল বলায় ছাড়াছাড়িটা করতে পারছিনা।
,,, অর্পনার কথায় অসন্তুষ্ট হলো ইরা,, বিয়ে করেছে সংসার করবে এটাই স্বাভাবিক। মেয়েটা ভালোবাসাকে যতটা প্রাধান্য দেয় বিয়ে নাম বন্ধনকে ঠিক ততোটাই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। কত মানুষ ভালো না বেসেও বিয়ে নামক বন্ধনের জন্য একসাথে থাকছে,, আবার একসাথে থাকতে থাকতে ভালো ও বেসে ফেলছে। সেসব ভেবে ইরা অর্পনার হাত ধরে বললো — এসব বলিস না,, দ্বীপ ভাইয়া ভুল করেছে তাকে শাস্তি দে,, ছেড়ে যাওয়া কোনো সমাধান না সোনা। ভাইয়ার জীবনে থেকে জীবনটা তুলোধুনো করে দে,, জ্বালাতে জ্বালাতে একদম অগ্নিকুণ্ড বানিয়ে দে তবুও ছেড়ে যাসনা। ইগু নিয়ে প্রেম হলেও ভালোবাসা হয়নারে।
,,, অর্পনা মলিন হেসে বললো — আর ভালোবাসা ছাড়া সংসার হয়না। হোয়াট এভার,, তরা এখন কোথায় যেতে চাস? ট্রিট দিবো সবাইকে। সন্ধা কিন্তু হয়ে গিয়েছে,, দ্রুত বল।
,,, অরুন বললো — ফুড কর্থে যাবি?
,,, অর্পনা কাধ উচালো,,,মানে তদের ইচ্ছা। পল্লব একবার রাতের দিকে তাকালো,, রাত্রিকে উদাস হয়ে দাড়ি থাকতে দেখে বললো — নাহ!! এটাতে আমরা বহুবার গিয়েছি,, চল ৩০০ ফিট পূর্বাচল যাই,, সেখানে পিঠা আর হাসের গোস্ত পাওয়া যায়। এমনিতে তো বাড়িতে এসব বানানো হয়না,, ইউনিক কিছু টেস্ট করা হবে।
,,, পল্লবের কথায় সবাই শায় জানালেও হাসের গোস্তের কথা শুনে চমকে উঠলো রাত্রি। সাথে সাথে নাকোচ করে বললো — না না, হাসের গোস্ত না,, অরুনের তো হাসের গোস্তে এলার্জি। অন্য কিছু বল।
,,, রাত্রির কথায় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে অন্য দিকে তাকালো পল্লব। মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসলো অরুণ,, ভালোবাসেনা আবার মায়া দেখাতে আসে। যা খুশি হয়ে যাক,, প্রয়োজনে অরুন মরে যাক তাতে এই মেয়ের কি। আজ থেকে সে চরম বেখেয়ালি হবে,, নিজের এতোটা ক্ষতি করবে যেনো এই নিষ্ঠুর প্রিয়াও একদিন তাকে ব্যাথা দেওয়ার অপরাধে আফসোস করে। অরুন ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো — আমার কোনো এলার্জি টেলার্জি নেই ভাই,, আমি এখন সব খেতে পারি। সময় নষ্ট না করে চল, সত্যি ই এবার লেইট হয়ে যাচ্ছে।
,,, অরুনের কথায় রাতের মুখে আঁধার নেমে এলো,, তখনকার পর আর একবারও অরুন তার দিকে তাকায়নি,, উদ্দেশ্য করে একটা কথাও বলেনি। এমন একটা ভাব করছে যেনো রাত্রির সাথে ওর কখনোই কিছু ছিলোনা। অরুন কি তবে তাকে সত্যি সত্যি ভুলে যেতে চাচ্ছে? দূরে সরে যেতে চাইছে? ভালোই হলো,, সে তো এটাই চায়। মনকে বুঝাতে চেয়েও বুঝাতে পারছেনা রাত্রি,, মন চাচ্ছে সব ঠিক হয়ে যাক,, রাতের জীবনেও একজন বাবা আসুক। মাম্মার কাপুরুষ প্রেমিকটা ফিরে এসে মাম্মাকে বিয়ে করে নিক। সে নাহয় বাবা মানবেনা কিন্তু তাকে কেউ জা*রজ ও তো বলতে পারবেনা। রাত্রিকে মন মরা দেখে অর্পনা ওর একটা হাত টেনে ধরল,, একে একে সবার একটা একটা হাত টেনে নিয়ে একত্র করে বললো — আই নো, এই পৃথিবীতে কেউ একসাথে সকল পূর্নতা নিয়ে বাঁচতে পারেনা। প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছুনা কিছু অপূর্ণতা থেকেই যায়। আজকে এই মুহুর্তে তদের মাঝে থাকা সকল কষ্ট, যন্ত্রনা, অপূর্ণতাগুলো আমায় দিয়ে দে। আমি সেসব জমা করে একটা বন্ধ দরজার ভিতরে লুকিয়ে সেই দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিবো। চেষ্টা করবো সারাজীবনের জন্য সেই কষ্ট গুলোকে আটকে রাখার,, তবুও যদি বাতাসের ন্যায় ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে যায়,, তাহলে আবার এসে আমার কাছে জমা দিয়ে যাস। আমরা তো শুধুই একে অপরের জন্য। তদের কে আছে না আছে জানিনা, কিন্তু আমার তো তরা ছাড়া কেউ নেই। তদের একজনার ও মন খারাপ দেখলে আমার অন্তরটা খুব পোড়ে। আমি চাই,, আল্লাহ তদের সব খারাপ আমায় দিয়ে দিক,, আর আমার জন্য যদি সামান্য পরিমান ভালো কিছু ও থেকে থাকে তাহলে সেটা তদের ভাগ্যে লিখে দিক। তবুও তরা এভাবে মন মরা হয়ে থাকিস না। অন্তত আমরা পাঁচ মুর্তি যতটা সময় একসাথে থাকি ততোটুকু সময় সবাই হাসি খুশি থাকি? প্লিজ।
,,, অর্পনার কথায় পল্লব ব্যাতিত সবাই ছলছল দৃষ্টিতে তাকালো,, পরপর সবাই একসাথে মাথা নাড়িয়ে শায় জানালো মানে তারা আর মন খারাপ করে থাকবেনা। পল্লব কিছুটা ফিসফিস করে বললো — তাহলে মন খারাপ নং ৮২৯ এর জন্য মন ভালো করার ৭ নম্বর টিপ্স টা এপ্লাই করা যাক? যেহেতু এটা নির্জন রাস্তা, জমবে ভালোই।
,,, আবারও মাথা নাড়িয়ে শায় দিলো সবাই। একে একে সবাই সবার দিকে তাকালো,, পাঁচ জনের মুখেই মুচকি হাসি। এরপর পাঁচ জন ধীরে ধীরে দূরে সরে গেলো,, অনেকটা দূরে গিয়ে প্রথমে অর্পনা ঠোঁট নাড়িয়ে গাইলো —
,,, Taino main love karda
ইরা হাতে চুটকি বাজাতে বাজাতে গাইলো–
,,, Bemadlab kardaaa
,,,মন খারাপ থাকায় রাত্রি বড্ড উদাশিন ছিলো, ইরা রাত্রির দিকে এগিয়ে হালকা করে ধাক্কা দিতেই রাত্রির হুস ফিরলো,, সে তাল মিলিয়ে গাইলো —
,,,,Bahoon main aa soniyee
,,,এরপর সবাই একসাথে নাচতে নাচতে গাইলো —
Tenu main love karda, bematlab karda
Baahon mein aa soniye,
bas aaj raat ke liye
,,, সবাই ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে এলো,, এগুতে এগুতে একে অপরের কাধ জড়িয়ে ধরে ঘুরতে ঘুরতে একসাথে গাইলো —
Saadi taan desi hai adaa,
saade te hoja ni fida
Baahon mein aa soniye,
bas aaj raat ke liye
Subah hone na de, saath khone na de
Ek doosre ko hum sone na de
Tu mera hero oo oo
Tu mera hero
,,,, দূর থেকে গাড়িতে বসে মনোযোগ সহকারে বউয়ের নাচ দেখছে দ্বীপ ,, বিকাল থেকে তর তর করে উঠা রাগটা ধপ করেই নিভে গেলো,, চোখ জুড়ে বয়ে গেলো এক পশলা শীতলতা। বউটা বন্ধুদের সাথে থাকলে এতোটা খুশি থাকে? এতোটা প্রাণোচ্ছল থাকে? তার সাথে সংসার করছে আজ আট মাস তেরোদিন অথচ মেয়েটাকে এতোটা প্রাণোচ্ছল সে কখনোই দেখেনি। সবসময় মুখে কেমন একটা গম্ভীর ভাব নিয়ে ঘুরে বেরায়,,, যেনো সে ৬০, ৭০ বছর বয়সি কোনো বৃদ্ধ মহিলা। চাইলেই সবার দায়িত্ব নিতে পারে,, অথচ নিজের দায়িত্ব কাউকে দিতে নারাজ। বিহান এসে থেকে ফোন বের করে অর্পনাদের কর্মকাণ্ড, নাচ গান ভিডিও করে যাচ্ছে। তারা এখানে এসেছে প্রায় ১০ মিনিট হবে। স্রিফানের গলায় ট্রেকার লাগিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর সে যেদিকে ছুটেছে তারাও গাড়ি নিয়ে সেদিকেই ছুটেছে। ছুটতে ছুটতে এই রাস্তার মাঝে পেলো ওদের। মাথায় প্রচন্ড রাগ থাকা সত্তেও অর্পনাকে বন্ধুদের সাথে কিছু একটা নিয়ে কথা বলতে দেখে এখানেই গাড়ি থামিয়ে দিলো দ্বীপ। দেখতে চাইলো তার বউ এখানে কি করছে আর কি করতে চাচ্ছে।
,,, অর্পনা নাচতে নাচতে খেয়াল করলো একটা কুকুর তার খুব কাছে এসে দাড়িয়ে আছে। কুকুরটি দেশি নয়, সম্ভাবত পারশিয়ান,, গায়ের রং কুচকুচে কালো আর চোখ দুটো লাল,, সন্ধার সময় হওয়ায় চোখ গুলো আরও লাল দেখালো। এমনি কুকুর ভিষন ভয় পায় অর্পনা। তার উপর কুকুরের এরুপ ভয়াঙ্কর রুপ দেখে অর্পনার আত্মাটা ছলকে উঠল,, দ্রুত পা চালিয়ে পল্লবের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর শার্ট খামচে ধরে আতঙ্কিত স্বরে বললো — পল্লব!! কু,কুকুর, বাঁচা আমায়,, এটাকে যেতে বল। আল্লাহ!! কি ভয়াঙ্কর।
,,, ভয়ে কাঁপতে থাকা অর্পনাকে এক হাতে আগলে নিলো পল্লব,, অরুন আর ইরা হুস হুস করতে করতে কুকুরটাকে সরাতে চাইলো কিন্তু কুকুরটা জ্বীব বের করে হাপাতে হাপাতে অর্পনার কাছে যেতে চাইছে। বিরক্ত হচ্ছে সবাই,, নিরীহ পশুকে আঘাত করা ঠিক নয় বলে কেউ কুকুরটি আঘাত করছেনা অথচ অর্পনার ভয়ে কেঁদে দেওয়ার অবস্থা। শেষে না পেরে চারজন অর্পনাকে ঘিরে ধরলো যেনো কুকুরটা ওর কাছে পৌছাতে না পারে। সবাইকে ঘিরে ধরতে দেখে কুকুরটি তাদের চারপাশে ঘুরতে থাকলো। কুকুরটি বেশ সাস্থবান আর প্রচন্ড ভয়ানক,, অর্পনার সাথে সাথে এবার ইরা আর রাতের ও ভয় করতে লাগলো। রাত্রি ভয়ে ভয়ে অরুনের হাত ধরে কাপা স্বরে বললো — ভয় পাচ্ছি!!
,,, রাত্রি যতটা ভরসা নিয়ে কথাটা বলেছে অরুন তার থেকেও হাজার গুন বেশি অবহেলা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে রাতের হাত। রাত্রির বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো,, অরুন তাকে সত্যি ই চাচ্ছেনা? সহসা দূরে সরে গেলো। নিজের ক্ষতি করার লোভে কুকুরটির দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে পল্লব হাত ধরে নিলো,, চোখের ইশারায় আশ্বাস দিলো,, আমি আছিতো, তর কিছু হবেনা।
,,,স্টেয়ারিঙে হাত রেখে পাচ মূর্তির দিকে তাকিয়ে আছে দ্বীপ। অর্পনা কুকুরে ভয় পায় বুঝতে পেরে ভ্রু কুচকালো দ্বীপ,, পরোক্ষনেই ঠোট বাকিয়ে সুক্ষ্ম হেসে বললো — মিসেস জোহান মির্জা ভয় ও পায়? স্ট্রেন্জ!!
,,, বিহান ভিডিও অন রেখেই হাঁসতে হাঁসতে বললো — এই প্রথম এমন কিছু পেলাম যা দেখে জার্সির রানী ভয় পায়,, আমি তো ভাবলাম সে বোধহয় আল্লাহ ব্যাতিত কাউকেই পরোয়া করেনা। এমন সুন্দর একটা দৃশ্য দেখে জীবনটা আজ ধন্য হয়ে গেলো। ভিডিওটা আমার মেধা রানীকে দেখাতে হবে,, নয়তো বেচারি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য হওয়ার মতো ব্যাপারটা মিস করে যাবে।
,,,দ্বীপ স্টেয়ারিং ঘুড়িয়ে অর্পনাদের সামনে গিয়ে গাড়ি থামালো,, গাড়ির ডোর খুলে বেড়িয়ে সামনে দাড়িয়ে নরম স্বরে ডাকলো– স্রিফান!! কাম হেয়্যা পাপ্পা!!
,,,, কুকুরটি সেকেন্ডের গতিতে দ্বীপের কাছে চলে গেলো। দ্বীপের কন্ঠ শুনে পল্লবের পিছন থেকে উঁকি মারলো অর্পনা,, দ্বীপের কোলে স্রিফানকে দেখে দাঁতে দাঁত চাপলো। পল্লবের পিছনে গুটিশুটি মেরে দাড়িয়ে থেকেই গলা উঁচিয়ে বললো — অসভ্য মির্জা!! আপনার সাহস হয় কি করে এসব ফালতু কুকুর এনে আমাকে ভয় দেখানোর? আপনি কি ভাবছেন আমি কুকুর দেখে ভয় পাই?
,,, দ্বীপ স্রিফানকে নামিয়ে দিয়ে বুকে হাত গুজে বললো — ভয় পাননা?
,,, অর্পনা পল্লবের পিছনে থেকেই সাহসী কন্ঠে বললো — না, পাইনা।
,,,দ্বীপ ঠোঁট কামরে হাসলো পরপর স্রিফানের উদ্দেশ্যে বললো — স্রিফান!! যাও মাম্মাকে পাপ্পার কাছে নিয়ে আসো,, পাপ্পার বুকটা খা খা করছে,, এই মুহুর্তে তোমার মাম্মাকে বুকে না পেলে বুকের দহনে পৃথিবী ছাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
,,, বলতে দেরি স্রিফানের এগিয়ে যেতে দেরি নেই,, অর্পনা আবারও সিঁটিয়ে গেলো পল্লবের পিছনে,, দ্বীপের বলা কথাগুলো শুনে রাত্রি আর ইরা ঠোঁট টিপে হেঁসে দূরে সরে গেলো,, আরও ভয় পেলো অর্পনা। অরুন ধমকে বললো– আপনি ওকে ভয় দেখাচ্ছেন কেনো? এটাকে দূরে সরান,, বেয়াদব কুকুর!!
,,, দ্বীপ ডান হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে ভ্রু চুলকে বললো — তোমাদের ফ্রেন্ডকে বলো নাটক না করে আমার কাছে আসতে,, ভালো লাগছেনা,, টানা দু ঘন্টা ধরে খুঁজছি,, আমি খুব ক্লান্ত। কাছে আসো ভেলোরা,, আই বেডলি নিড ইউ।
,,, শেষের দিকল দ্বীপের কন্ঠটা বড্ড অসহায় শুনালো। ইরা অর্পনার হাত ধরে বললো — এর পরেও বলবি ভাইয়া তকে ভালোবাসেনা? আর কিভাবে ভালোবাসা যায় অর্পন,, ভাইয়ার চোখ মুখের অবস্থা দেখোছিস? যাহ!! একটু শান্ত করে দিয়ে আয়।
,,,, ইরার কথায় ভ্রু কুচকে তাকালো অর্পনা, ইরা মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো পরপর অরুন, পল্লব, রাত্রিও ইশারায় বললো দ্বীপ ওকে ভালোবাসে। ওর উচিৎ দ্বীপের বুকে ঝাপিয়ে পরা। বন্ধুদের কথা কিছুটা বিশ্বাস করলো অর্পনা। তবে কুকুরের ভয়ে পা বাড়াতে পারছেনা। তাই আবারও গলা উঁচিয়ে বললো — আপনার বেয়াদব কুকুরটাকে সরে যেতে বলুন,,নয়তো আমি আসতে পারবোনা।
,,, দ্বীপ স্রিফানের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো — স্রিফ!! কারের পিছনে যাও।
,,, সত্যি সত্যি ই স্রিফান এক ছুটে গাড়ির পিছনের দিকে চলে গেলো। অর্পনা ভ্রু বাকালো,, এই বেয়াদব কুকুরটা দ্বীপের সব কথা শুনে? যা বলে সব বুঝতে পারে? ভালোই তো। ভাবতে ভাবতে অর্পনা ধীরে ধীরে দ্বীপের কাছে এসে দাড়ালো,, সেকেন্ডের গতিতে কোমর জড়িয়ে ওকে উপরে তুলে নিলো দ্বীপ, খেই হাড়িয়ে দ্বীপের গলা জড়িয়ে ধরলো অর্পনা। দ্বীপের হৃদয়ে অশান্ত কাঁপুনি বিরাজমান,, অর্পনাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে নিজের সাথে। যেনো একটুখানি ছাড় দিলেই ভেলোরাটা আবার ওকে একা ফেলে পালিয়ে যাবে। অর্পনাও মিশে রইলো দ্বীপের বক্ষ পাজরে। ওদের আলিঙ্গনের দৃশ্য দেখে অরুন, পল্লব, ইরা, রাত্রি চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসতে লাগলো,, বিহান এখনো গাড়িতে বসে ভিডিও করে যাচ্ছে। সি*গারেটের বাজে গন্ধ নাকে আসতেই দ্বীপের বুক থেকে মাথা তুললো অর্পনা,, অত্যন্ত আশ্চার্যনীয় কন্ঠে প্রশ্ন করলো — আপনি সি*গারেট খেয়েছেন?
,, দ্বীপ অর্পনার চোখে চোখ রেখে বললো — হুম!! খেয়েছি।
,,, রেগে গেলো অর্পনা, দ্বীপের গলা ছেড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো — ছাড়!! তকে নিষেধ করছিলামনা, এসব খেলে আমার কাছে আসবিনা? কেনো খেয়েছিস? খেয়েছিস যখন তখন আমার কাছে কেনো এসেছিস? ছাড় আমায় দ্বীপ মির্জা। তর সংসার আমি করবোনা,, ছাড়!!
,, দ্বীপ অর্পনাকে ঘুরিয়ে গাড়ির ঢিকির উপর বসিয়ে দিলো,, পরপর কোমর জড়িয়ে চুলের ভাজে নাক ঠেকিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে বললো — বেশ করেছি খেয়েছি,, আরও খাবো। তুই পালিয়েছিলি কেনো? আমায় একটু ও শান্তি দেসনা তুই,, সারাক্ষণ জ্বালাস।
,,, সিগারেটের গন্ধে বমি পাচ্ছে অর্পনার,, সে দ্বীপের বুকে ধাক্কা মেরে রাগি কন্ঠে সুধালো — তাহলে ছেড়ে দিন,, যে জ্বালাবেনা তাকে গিয়ে বিয়ে করুন। আপনাকে আমার একটু ও পছন্দ না,, নে*শাখোর!!
,,, অর্পনার কথায় পাত্তা দিলোনা দ্বীপ,, মেয়ে মানুষ কতো কথাই বলে। সবকিছুতে পাত্তা দিলে পৃথিবীতে আর বংশবিস্তার হতোনা। দ্বীপ অর্পনার হাত দুটো ওর পিছনে নিয়ে এক হাতে আটকে রেখে,, মাথা থেকে ঘোমটা টা সরিয়ে গলায় মুখ গুজে দিয়ে বললো — ওমম!! সোনা, আড়াম দেদো মুঝে,, বারসোকা মে হো থাকা।
,,, অযাচিত স্পর্শ আর কথাবার্তায় কেপে উঠলো অর্পনা। লোকটা নির্ঘাৎ নিয়মিত ঔষধ খাচ্ছেনা,, নয়তো কোনো স্বাভাবিক মানুষ পাবলিক প্লেইসে এমন করে? অর্পনা দ্বীপের থেকে হাত ছাড়াতে চেয়ে বললো — মাথা খারাপ নাকি আপনার? পথে ঘাটে এসব কেমন আচরন? আমার ফ্রেন্ডরা আছে এখানে,, সরুন।
,,,দ্বীপ গলায় মুখ গুজে রেখেই দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নাকোচ করে বললো — ওহুম,, প্লিজ!! ভালো লাগছেনা। আচ্ছা তাহলে চলো বাড়িতে যাই,, রুমে তো কেউ থাকবেনা।
,,, না চাইতেও বড্ড লজ্জা পাচ্ছে অর্পনা,, উনার মুখে কি কিছু আটকায়না? পুরো অটো মেশিনের মতো চলতেই থাকে চলতেই থাকে,, লজ্জা পেলেও মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে বললো — ধূর, মাথা খারাপ লোক। আমি এখন বাড়ি যাবোনা। ফোন কিনেছি ফ্রেন্ডদের ট্রিট দেওয়া বাকি।
,,, আচ্ছা, কাল দিও,, আজ ভালো লাগছেনা।
,,, আমার ভালো লাগছে,, আমি আজই দিবো। সরুন!!
,,,দ্বীপ সরলোনা,, অর্পনার কানের লতিতে উষ্ঠ ছুইয়ে মাদকিয় স্বরে বললো — তুই আমাকে অনেক অবহেলা করিস কোমল,, একটু ও দাম দিসনা।
,,, দ্বীপের মুখে নতুন ডাক শুনে অর্পনার ভীতরটা শীতলতায় ছেয়ে গেলো,, ইরা, অরুন, রাত কি তবে ঠিকি বলেছে? উনি তবে ভালোবাসে তাকে,, হয়তো মুখ ফুটে বলতে পারছেনা কিন্তু সত্যি অর্থে ভালোবাসে। অর্পনার মনে এক পশলা শান্তি বহিতো হলো,, ঠোঁটে ফুটলো লজ্জাতুর হাসি। পরোক্ষেনেই অনুভব করলো দ্বীপ হুস জ্ঞান খয়িয়ে বড্ড বেহিসেবি হয়ে যাচ্ছে,, সে তারাহুরো করে বললো — দ্বীপ!! আপনি হুসে আছেন তো? নাকি মারাত্মক ধরনের কোনো নে*শাদ্রব্য পান করেছেন? কি শুরু করেছে এই লোক ,, আল্লাহ!! মানুষে দেখলে কি ভাববে?
,,, দ্বীপ আবারও লম্বা শ্বাস টেনে বললো — করেছি তো, পৃথিবীর সেরা নে*শাদ্রব্যের ঘ্রাণ নিয়েছি। তুমি তো এ*লকোহলকেও হাড় মানাও বউ !! সু সুইট স্মেল,, লাইক,, নরম, পেজা তুলোর মতো।
,,,অর্পনা হতাশ হলো,, এই লোকের সাথে কখনোই শক্তিতে পেরে উঠেনা সে,, অপরদিকে বন্ধু মহল তার দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে,, অর্পনা আফসোসের স্বরে বিরবির করলো– ভাবতেও অবাক লাগছে,, লাস্ট মোমেন্টে আমার কপালে এই বেহলাজ পুরুষ লেখা ছিলো? মাফ করুন আল্লাহ!! রেহাই দিন। আমার মানসম্মান কিছু রাখলোনা।
,,, অর্পনার বিরবিরের মাঝেই গাড়ি থেকে নেমে এলো বিহান,, হালকা গলা খাকারি দিতেই দ্বীপ ভ্রু কুঁচকে বিহানের দিকে তাকালো। বিহান একটা পিউর হাসি উপহার দিয়ে দ্বীপের দিকে একটা না*ইফ এগিয়ে দিয়ে বললো — আসলে তুই তো বলেছিলি অর্পনাকে খুঁজে পেলে ওর কলিজাটা কেটে পিস পিস করে স্রিফানকে খাওয়াবি। এখানে অর্পনাও আছে আবার স্রিফান ও আছে,, শুধু এই ছু*ড়িটার অভাব ছিলো। তুই কাট আমরা নাহয় তকে উৎসাহ দেই,, কি বলো তোমরা?
,,, লাস্টের কথাটা অরুনদের দিকে তাকিয়ে বললো বিহান,, তারা মাথা ঝাকিয়ে শায় জানিয়ে অর্পনাদের দিকে এগিয়ে এলো। অর্পনা দাঁত কটমট করে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বললো — আপনি আমার পেট থেকে কলিজা বের করে আপনার বেয়াদব কুকুরকে খাওয়াবেন?
,,, দ্বীপ চোখ রাঙিয়ে বিহানের দিকে তাকালো, বিহান সাথে সাথে সয়তানি একটা হাসি দিয়ে অন্য দিকে তাকালো। বিহানের থেকে নজর সরিয়ে দ্বীপ কোমল স্বরে বললো — ওহুম!! তোমাকে আদর করে স্রিফানের ভাই কিংবা বোন আনার ব্যাবস্থা করবো।
,,, আমাকে আপনার কুকুর মনে হয়? যে কুকুরের বাচ্চা জন্ম দিতে যাবো? ( ভ্রু কুচকে)
,,, অর্পনার কথা শুনে মুচকি হাসলো দ্বীপ, চোখের ইশারায় না করে বললো — ওহুম!! তুমি তো আমার বউ,, তুমি হলে আমার বেবির মাম্মা হবে। আর আমি তোমার বেবির পাপ্পা।
,,, বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে সত্যি ই কোনোদিন ভাবেনি অর্পনা,, এমনকি কোনোদিন ছোট বাচ্চা কোলেও নেয়নি। তার মাঝে বেবি নিয়ে কোনো এক্সট্রা অনুভুতি নেই। তাই বেবির কথা বাদ দিয়ে বললো — সেসব ছাড়ুন,, আমাকে এখন ফ্রেন্ডদের ট্রিট দিতে হবে। আগে ট্রিট দিবো তারপর বাড়ি ফিরবো।
,,,,ততোক্ষণে অরুনরা দ্বীপদের কাছে চলে এসেছে, তা দেখে দ্বীপ অর্পনাকে গাড়ির ঢিকি থেকে নামিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো, পরপর অর্পনার হাত ধরে বললো — কোথায় যেতে চাও? চলো আমি নিয়ে যাচ্ছি।
,,,, অর্পনা কিছু বললোনা তবে বন্ধুদের গাড়িতে উঠার জন্য ইশারা করলো। অরুনরা প্রথমে না করলে দ্বীপ সবাইকে ধমকে ধামকে গাড়িতে উঠতে বললো। বিহানের সাথে আগেই ওদের সম্পর্ক ভালো ছিলো। তাই বিহান রিকোয়েস্ট করতেই রাজি হয়ে গেলো সবাই। যতোই হোক লোক দুটো গুনে গুনে তাদের থেকে নয় বছরের বড়ো। চাইলেই অবমাননা করা যায়না।
,,, রাস্তার ধারে থাকা স্ট্রিট লাইটের নিচে উচু জায়গাটায় বসে আছে অর্পনা,, ক্ষনে ক্ষনে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বীপের দিকে তাকাচ্ছে,, সে কি যেনো একটা ইম্পর্ট্যান্ট কলে বিজি আছে। আপাতত অনেকটা দূরে দাড়িয়ে থাকা গার্ড ব্যাতিত এখানে অন্য কেউ নেই। সবাইকে সবার গন্তব্যে স্থলে পৌছে দিয়ে গাড়িটি সাহাবাগ ক্রস করতেই গাড়ি থেকে নেমে পরেছিলো অর্পনা। দ্বীপ কারন জানতে চাইলে অর্পনা বলেছিলো তার কাজ আছে,, তাই বিহানকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে সে নিজেও নেমে পরলো। এরপরেই ফোনে কল এসেছে,, অনেকটা সময় কথা বলার পর অর্পনার সামনে এসে দাঁড়ালো দ্বীপ। অর্পনা চোখের ইশারায় তাকে পাশে বসতে বললো। দ্বীপ কিছুক্ষণ ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থেকে অর্পনার পাশাপাশি বসে,, অর্পনার একটা হাত টেনে নিয়ে তাতে চুমু খেয়ে বললো — গাড়ি থেকে নেমে পরলে কেনো? বাসায় যাবেনা? আরও ঘুড়তে চাও?
,,, অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — ওহুম, আমি আপাতত আপনার বাড়ি যাবোনা।
,,, অর্পনার কথায় ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো দ্বীপ– বাড়ি যাবেনা তাহলে কোথায় যাবে?
,,, অর্পনা পায়ের তলায় থাকা সানে আকিবুকি করতে করতে বললো — আমি আমার বাড়ি মানে পাপ্পার কাছে যেতে চাই। খুবি ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ আছে,, যেতেই হবে। প্লিজ!!
,,, দ্বীপ নাকোচ করে বললো — নো!! তোমার পাপ্পা আমার কাছ থেকে তোমায় কেড়ে নিতে চেয়েছিলো। তাই আমি তোমার পাপ্পার বাড়িতে যাবোনা।
,,,দ্বীপের কথায় চোখ ছোট ছোট করে তাকালো অর্পনা,, বললো — আমি আপনাকে যেতে বলেছি?
,,, দ্বীপ সংকোচ করলোনা বরং সরাসরি বললো — আমি তোমায় ছাড়া এক মুহুর্ত ও থাকতে পারবোনা। সেখানে একটা রাত তো বিশাল ব্যাপার। তোমার যাওয়া হচ্ছেনা।
,,, অর্পনার দৃষ্টি শান্ত হয়ে এলো,, সে বললো — তাহলে আমার সাথে চলুন। কাল সকালে নাস্তা করে আবার ফিরে যাবো।
,,, দ্বীপ নাকচ করে বললো — নো!! আমি তোমার পাপ্পাকে লাইক করিনা।
,,, অর্পনা মুখ বাকিয়ে সাথে সাথে বললো — আমিও তো আপনাকে লাইক করিনা। তাই বলে আমি কি আপনার বাড়ি থেকে চলে গিয়েছি?
,,, দ্বীপ ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে অর্পনার দিকে হালকা ঝুকে বললো — বাট!! ভালো তো বাসো,, এটাই চলবে।
,,, অর্পনা মাথাটা পিছনের দিকে নিয়ে বললো — ওহুম!! ভালো ও বাসিনা।
,,,, জানা আছে আমার!!
,,, বলতে বলতে দ্বীপ হাত দাবিয়ে অর্পনাকে কোলে তুলে সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। দ্বীপের হুটহাট কাজে এখন আর অবাক হয়না অর্পনা। সে দ্বীপের গলা জড়িয়ে বললো — এখান থেকে আমাদের ফ্লাটের দূরত্ব ১৭+ মিনিটের। এতোটা পথ কোলে নিয়ে যেতে পারবেন? মাঝপথে হাঁপিয়ে যাবেন নাতো?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯ (৩)
,,, দ্বীপ আরেকটু শক্ত করে অর্পনাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বললো — তুমি শায় দিলে পুরো একটা জীবন তোমায় কোলে নিয়ে পার করে দিবো। শায় দিবে?
,,, অর্পনা দ্বীপের বুকে মুখ গুজে দিলো। সারাদিন লাফালাফি করে এখন বেশ ক্লান্ত সে। নিজস্ব আশ্রয়স্থল পেয়ে সব ক্লান্তি ঢেলে দিলো অর্পনা,, এবার বাকিটা সামলানোর দায়িত্ব দ্বীপ মির্জার।
