৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৭০
রুপান্জলি
সূর্যের আলো কিছুটা তীক্ষ্ণ হতেই ঘুম ভেঙে গেল অর্পনার। নাকে এখনো পুরুষালি দেহের মনোমুগ্ধকর সুগন্ধ বহমান। চোখ বন্ধ রেখেই আপন পুরুষের বুকে আরেকটু নাক ঘষে ঘ্রাণ নিল রমণী। মুহূর্তেই আবেশিত হলো অন্তর। আফিমের নেশার ন্যায় তা দ্রবীভূত হয়ে পড়ল তার নাসারন্ধ্রে। অকারণেই শিহরণ বয়ে গেল শরীরের প্রতিটি সিরায় সিরায়। অর্পনা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো। মেয়েটা এখনো তার গলা জড়িয়ে ধরে বাবার বুকে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। অর্পনা এবার মাথা উঁচিয়ে লোকটার পানে তাকালো। লোকটাও ঘুমে বিভোর, তবে হৃদস্পন্দন জোরালো। অর্পনার আলতো স্পর্শ পাওয়ার পরেই হৃদয়টা দিকবিদিক ছুটোছুটি করছে। এর মানে লোকটা সজাগ, অথচ চোখ বুজে রেখে কেমন নাটক করছে, দেখো। নিশ্চয়ই সারা রাত জেগে থেকে অর্পনা আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। লোকটার এই পাগলামিগুলো একটু বেশিই পাগলামি মনে হয় তার কাছে। নিজের ঘুম বিসর্জন দিয়ে এত কী দেখে তাদের মাঝে? দেখলে কী হয়? কোনো লাভ আছে কি?
লোকটার ভাবভঙ্গি দেখে আকস্মিক অর্পনার মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলা করল। সে দ্বীপের বুকে নাক ঘষতে ঘষতে আকস্মিক সজোরে কামড় বসালো। তৎক্ষণাৎ শিউরে উঠল মানব। অর্পনা কামড় দেওয়া জায়গাটাতে আলতো করে চুমু খেয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে আওড়ালো — নাটক করতে হবে না, আমি বুঝতে পেরেছি আপনি যে জেগে আছেন।
,,, মুহূর্তেই ঘুমের ভান করে পড়ে থাকা দ্বীপের ওষ্ঠযুগল সামান্য বেঁকে গেল। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাতেই অর্পনার সঙ্গে চোখাচোখি হলো। অর্পনা এক ভ্রু উঁচিয়ে সন্দেহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দ্বীপ নাক কুঁচকালো — এখনো সময় আছে, ভালো হয়ে যাও। ভালো হতে পয়সা লাগে না।
,,, ভালো হতে বলায় আরও অবাধ্য হলো অর্পনা। এই পর্যায়ে দ্বীপের কাঁধে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল। সহসা দাঁতে দাঁত চাপল মানব, তবে টু শব্দটুকুও করল না। কোলে মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। অতিরিক্ত শব্দ করলে মেয়েটা জেগে গিয়ে আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। দ্বীপকে চুপচাপ সবটা মেনে নিতে দেখে অর্পনা মনের খায়েশ মিটিয়ে দ্বীপের কাঁধে মাথা রেখে মুখ উঁচিয়ে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে কিছুটা দুষ্টুমি-ভরাট কণ্ঠে বলল — আপনার বাপ-দাদার সব সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিন, প্রমিজ!! ভালো হয়ে যাব। আপনি যা বলবেন, তাই শুনব। আপনি যদি বলেন, ভেলোরা, তুমি এখানে বসো তাহলে আমি এখানেই বসব। যদি বলেন, ভেলোরা, তুমি ওখানে বসো তাহলে আমি এখান থেকে উঠে গিয়ে ওখানে বসব।
,,, অর্পনার কথায় আশ্চর্যই হলো দ্বীপ। অর্পনা মজা করে কথা বলে না, আজ কত বছর পেরিয়ে গেল। রাত্রি মারা যাওয়ার পর অরুণ আর পল্লবকে হারিয়ে মেয়েটা দিনের বেশিভাগ সময়ই মন খারাপ করে ঘুরে বেড়ায়, আর বাকিটা সময়ও কেমন সিরিয়াস হয়ে থাকে। দ্বীপের মনে হলো, সে আজ একটা অভাবনীয় সকাল পেয়েছে। এরকম সকাল সে প্রতিনিয়ত কামনা করে। মানবের চোখেমুখে আপ্লুত দৃষ্টি থাকলেও নিজ থেকে কণ্ঠে কিছুটা দুষ্টুমি ঢেলে আওড়ালো — আমার বাপ-দাদার প্রধান সম্পত্তি তো আমি নিজেই। নিজেকে আর কতবার লিখে দেব? ১৫২টা কাগজে লিখে দেওয়ার পরেও তোমার আরও কাগজ চাই, ভেলোরা?
,,, দ্বীপের এহেন কথায় অর্পনার দুষ্টুমি-ভরাট মুখটা কেমন চুপসে গেল। কোথায় সত্যি সত্যি জিজ্ঞেস করবে, “”তোমার কি সত্যি সব সম্পত্তি লাগবে, ভেলোরা?””‘ তা না করে নিজেকেই প্রধান সম্পত্তি বানিয়ে দিচ্ছে এই লোক। লোকটা এত বদমাশ হয়ে গেল কবে? অর্পনা এবার ঠোঁট ফুলিয়ে আবারও শক্ত করে কামড় বসালো মানবের কাঁধে।
এই পর্যায়ে ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল দ্বীপ। একই সঙ্গে অর্পনার উন্মুক্ত উদরের ওপর রাখা পুরুষালি হাতটি আরও খানিকটা শক্তি প্রয়োগ করে চেপে ধরল উদরখানা। যেন ব্যথা সহ্য করতে না পেরে অর্পনার উদর আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে। দ্বীপের এহেন কাণ্ডে মুহূর্তেই মুচড়ে উঠল রমণী। নাক কুঁচকে আওড়ালো — আপনার মতো লুল্লু ভূতকে আমার চাই না। হাত সরান। কিছু হলেই খালি এসব করবেন।
,,, বলেই উদর থেকে শক্তপোক্ত হাত সরাতে নিতেই অবাধ্য হয়ে পড়ল লোকটা, সঙ্গে অবাধ্য হলো তার স্পর্শ। প্রতিটি স্পর্শে কেঁপে কেঁপে উঠছে অর্পনা, সঙ্গে থরথর করে কাঁপছে তার ওষ্ঠজোড়া। সেই ওষ্ঠজোড়াতেই এবার নিশানা তাক করল দ্বীপ। কোনো বাক্য ব্যয় না করেই দুই জোড়া ওষ্ঠ একত্র করে দিল। অর্পনা আর বাধা দিল না। দুজন মত্ত হলো আবেশিত চুম্বনে। অনেকটা সময় পেরোনোর পর যখন দুজনেরই দম আটকে আসার জোগাড়, তখনই বিচ্ছিন্ন হলো দুজন। দ্বীপ জোরালো নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে করতে অর্পনার কপালে কপাল ঠেকালো। নাকে নাক ঠেকাতেই আবারও মিলিত হলো ওষ্ঠজোড়া। এই পর্যায়ে আলতো করে চুমু খেল মানব। অর্পনা দ্বীপের অধর হতে অধর সরিয়ে দ্বীপের গালে পৌঁছাতেই দ্বীপের অধরজোড়া অর্পনার গাল ছুঁল। সেভাবেই একের পর এক চুম্বন আদান-প্রদান চলল দুজনের মাঝে। তৎক্ষণাৎ আড়মোড়া ভেঙে সজাগ হলো প্রকৃতি। মেয়ে নড়েচড়ে উঠতেই কিছুটা দূরে সরে গেল দুজন। প্রকৃতি হাই দিতে দিতে বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল — তোমলা তোমলা কিসি দিচ্চো যে, পকিতিকে দিচ্চো না যে? আমাকেও কিসি দাও।
,,, মেয়ের কথায় আপ্লুত হলো দ্বীপ-অর্পনা। উল্টানো ঠোঁটটাতে টুপ করে চুমু খেল দ্বীপ। অর্পনাও মুখ নামিয়ে চুমু খেল মেয়ের ফুলো ফুলো গালটায়। পরপর একটার পর একটা চুমুতে রাঙিয়ে দিতে লাগল মেয়ের গাল, নাক, থুতনি। দ্বীপ চুমু দিতে দিতে শুধালো—
— আপনার আরও কয়টা কিসি লাগবে, সুইটহার্ট?
,,, বাবা-মায়ের থেকে এত এত কিসি পাওয়ার আনন্দে গদগদ হয়ে উঠল ছোট্ট প্রাণটা। বিড়ালছানার ন্যায় দুটো হাত থুতনিতে ঠেকিয়ে কিউট করে হেসে বলল—
— মাম্মাল তেকে একতা কম।
,,, দ্বীপ আবারও শব্দ করে চুমু খেল মেয়ের গালে—
— কম কেন? বেশি কেন নয়?
,,, প্রকৃতি বাবা-মায়ের আদর পেতে পেতে খিলখিল করে হেসে বাবার প্রশ্নের উত্তর করল — কালন, মাম্মাকে তুমি বেচি বালো বাসবে। মাম্মা হচ্ছে ছবচে আদলেল। আমি আদো কব্বো, তুমি আদো কব্বে, আমলা মিলে মিচে মাম্মাকে অনেক অনেক কিসি দিবো।
,,, মেয়ের এহেন কথায় কী যে অবাক হলো অর্পনা, সেটা ভাবনারও বাইরে। মেয়েটা তার এত কেয়ার করে কেন? তাকে এতটা ভালোবাসার খুব প্রয়োজন ছিল? অর্পনার অবাকতার মাঝেই মেয়েকে প্রশ্রয় দিল দ্বীপ—
— তাই!! তাহলে চলো, স্টার্ট করি।
,,, বাবার সাহারা পেয়ে বিড়ালের বাচ্চাটা ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের গালে। দ্বীপও থেমে থাকল না। সুযোগ পেয়ে আবারও চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল অর্ধাঙ্গিনীর গালটা। দুই বাপ-মেয়েতে মিলে মিশে মনের খায়েশ মিটিয়ে চুমু খাচ্ছে অর্পনার নরম গালটাতে। প্রথম দিকে ভালো লাগলেও এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল রমণী। সহসা দুহাত জোড় করে বিরক্তিকর কণ্ঠে আওড়ালো—
,,, হয়েছে, ক্ষমা দিন। কী শুরু করে দিয়েছে দুই বাপ-মেয়ে মিলে! ইসস!! আমার গাল দুটো একেবারে ভিজিয়ে দিল।
,,, কে শোনে কার কথা? দ্বীপ জীবনে কারও কথা শুনেছে নাকি ? আর পাপ্পা যেহেতু সরছে না, তাই প্রকৃতিও আজ সরে যাবে না। অগত্যা দুই বাপ-মেয়ে মিলে রমণীর গালের ওপর সাইক্লোনের ন্যায় ঝড় বইয়ে দিতে লাগল।
,,, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা বাড়ির রান্নাঘরের ব্যস্ততা বাড়ল। রোমানা বেগম, সাথি বেগম মিলে-মিশে একটার পর একটা পদ রান্না করে যাচ্ছেন, আর হেল্পিং হ্যান্ডরা যে যার মতো করে ধীরস্থিরভাবে তাদের রান্নার কাজে হেল্প করে যাচ্ছেন। মেধা দুজন মেইড নিয়ে সম্পূর্ণ বাড়িটা নতুন করে সাজানোর কাজে মত্ত। অর্পনা সোফায় বসে ছেলে-মেয়ে দুটোকে খাওয়াতে ব্যস্ত। মাত্রই কোচিং সেন্টার থেকে ফিরেছে দুজন। গোসল করিয়ে নিচে এনে সিদ্ধ ডিম আর সালাদ নিয়ে বসেছে অর্পনা। আজ দীর্ঘ ১১ দিন পর আব্রাহাম সমেত বাপের বাড়িতে পা রাখবে পরশী। বিয়ের পর আব্রাহাম যেহেতু তৃতীয়বারের ন্যায় শ্বশুরবাড়িতে পা রাখবে, সেহেতু আয়োজনটা একটু জাঁকজমকভাবেই করা হচ্ছে। পরশী-আব্রাহাম আসবে, বিদায় আরাফাতও বাড়িতে এসেছে আজ। বয়সের তারতম্যটা কাছাকাছি হওয়ার দরুন পরশী আর আরাফাতের বেশ জমে, একপ্রকার ভালো বন্ধুই বলা চলে। তাই যবে থেকে পরশী ঠিক করেছে সে স্বামীকে নিয়ে মির্জা বাড়িতে আসবে, তবে থেকেই আরাফাতকে কল দিয়ে কান-মাথা গরম করে দিচ্ছিল, যেন ওদের সঙ্গে সেও এসে কয়েকটা দিন থেকে যায়। প্রথম দিকে ছেলেটা মানা করলেও বাড়ির সবাই জোরাজুরি করতেই আর মানা করতে পারল না। সকাল সকাল ছুটি নিয়ে চলে এসেছে বাড়িতে। এখন আপার পাশে বসে সে ভাগিনা-ভাগ্নির সঙ্গে খুনসুটিতে মেতেছে। আরাফাত বর্তমানে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি অ্যান্ড জেনারেল এভিয়েশন লিমিটেড প্রতিষ্ঠানে গ্রাউন্ড স্কুল পজিশনে অধ্যয়ন করছে। রমনা থেকে কুর্মিটোলা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দূরত্ব খুব একটা না হলেও প্রতিদিন আসা-যাওয়ায় ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তাই সেখানকার হোস্টেলেই থেকে পড়ালেখা করছে সে। সপ্তাহে একবার অবশ্য আপার সঙ্গে দেখা করে যাওয়া হয়। আপাও প্রায় দেখা করতে যায় তার কাছে, তবে মাসখানেকের আগে বাড়িতে আসা যায় না। টিচাররা ছুটিই দিতে চায় না।
,,, বর্তমানে মির্জা বাড়িতে প্রতি মুহূর্তে মুগ্ধ হওয়ার মতো যদি কোনো ব্যাপার থাকে, সেটা হলো বিহান-মেধার ক্যামিস্ট্রি। এদের বয়স বেড়ে বুড়ো হওয়ার জোগাড়, তবুও প্রেম কমার নাম নেই। এদেরকে বর্তমান যুগের লাইলি-মজনু বলাটাও বোধহয় কম পড়ে যাবে। এই তো অর্পনার সামনাসামনি সোফায় বসে আছে বিহান। অফিস থেকে ফিরেই কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে বসেছে এখানটায়। প্রথম দিকে বউয়ের পিছু পিছু ঘুরঘুর করলেও, যখন দেখল বউ তাকে পাত্তা দিচ্ছে না, অমনি লোকলজ্জার ভয়ে এখানটায় বসে আছে। বর্তমানে তার দৃষ্টি বসার ঘরের এক কোণায় ফুলদানিতে নতুন নতুন ফুল সাজাতে থাকা মেধার পানে স্থির। মেধা যতবার ফুলদানিতে ফুল সাজাতে গিয়ে দু-একটা কাটার আঘাত পাচ্ছে, ততবার শিউরে উঠছে ছেলেটা। এদিকে যে চোখের সামনে বড়ো ভাবি বসে আছে, সেদিকে কোনো খেয়াল আছে এই ছেলের? নাহ!! দিনকে দিন বিহানের বাচ্চাটা কেমন বখে যাওয়া ছেলে-পুলেতে পরিণত হয়েছে।
অর্পনা মনে মনে মুখ বাঁকালো। তখনই বাড়িতে ঢুকলেন মাহিদ মির্জা। পিছু পিছু ভেতরে ঢুকল দুজন লম্বা মতো লোক। তাদের হাতে এক গাদা বাজার-সদাই। ভাসুরকে বাজার করে ফিরতে দেখে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন সাথি বেগম। মেধা ফুলদানিতে ফুল রাখার কাজ বাদ দিয়ে ছুটে গেল রান্নাঘরে। উদ্দেশ্য, বড়ো আব্বুর জন্য এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত বানিয়ে আনা। বাজার করতে করতে এই শীতের মাঝেও ঘেমে-নেয়ে একাকার মাহিদ মির্জা। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে অর্পনার পাশে সোফায় বসে পড়ল। মুহূর্তেই শাড়ির আঁচল টেনে শ্বশুরের চোখ-মুখ মুছে দিতে লাগল অর্পনা। ছেলের বউয়ের কাণ্ডে আপ্লুত হলেন মাহিদ মির্জা। এই মেয়েটা আসার পর থেকে তিনি কখনো মেয়ের অভাব বুঝেননি। মেয়েটা যখন মুখ ভরে “আব্বু” বলে ডাকে, তখন উনার অন্তঃকরণে শান্তির স্রোত বয়ে যায়। এতক্ষণ টি-টেবিলের ওপর বাবু হয়ে বসে ডিম আর সালাদ খেতে থাকা ছেলে-মেয়ে দুটো দাদুকে বসতে দেখে তাড়াহুড়ো করে টি-টেবিল থেকে নেমে দাদুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তেই ধমকে উঠল অর্পনা—
— দাদুকে বিরক্ত করছো কেন? দেখছো না, দাদু ক্লান্ত। আব্বু! ছেড়ে দিন ওদের। অরণ্য, প্রকৃতি, তোমরা এখানে এসে বসো। খাবারটা শেষ করতে না পারলে আজ তোমাদের পিঠে লাঠি ভাঙব আমি।
,,, কে শোনে কার কথা? তারা দাদুকে ছেড়ে এখন ডিম আর সালাদ খাবে? কোনো দরকার নেই। প্রয়োজনে তারা জ্বালাতে জ্বালাতে দাদুর মাথাটাই চিবিয়ে খেয়ে নেবে, তাও কোনো মতেই দাদুকে ছেড়ে ডিমের কাছে যাওয়া যাবে না। মাহিদ মির্জাও ছাড়লেন না নাতি-নাতনিদের। উল্টো শক্ত করে আলিঙ্গনে নিয়ে অর্পনার উদ্দেশে বললেন—
— এভাবে মারের ভয় দেখাতে নেই, আম্মা। বাচ্চারা ভয় পাবে। তুমি এভাবেই খাওয়াও। দাদুভাইরা, দ্রুত খেয়ে নাও। খাওয়া শেষে তোমাদের এত্তোগুলো চকলেট দেব।
,,, আরণ্যক তো ভদ্র বাচ্চা। সে দাদুর কথা মতো চ্যাম্পের থেকে ডিমের টুকরো টুকু খেয়ে নিল। কিন্তু দ্বীপ মির্জার পাজি মেয়ে কি তা মানে? সে চাচার মতো ইতর হয়েছে না? সে দাদুর গলা জড়িয়ে ডিমের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বললো—
— এচব চক্কেত মক্কেত আমাল চাইনা। আমাল বিয়ান পাপ্পা আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে ইত্তোগুলা ইম্মি ইম্মি চক্কেত পাচেস কলে দিয়েচে। আমি এচব কাউকে বব্বো না। মাম্মা জানতে পাল্লে আমাকে আল বিয়ান পাপ্পাকে মাব্বে।
,,, ভাতিজির কথা শুনে বিষম উঠে গেল বিহানের। মায়ের সামনে বসে বসেই বলছে, মা জানলে তাকে আর বিহান পাপ্পাকে মারবে? মেয়েটা এত বড় বেইমানিটা করতে পারলো? সে মুখ চেপে কাশতে কাশতে আড়চোখে অর্পনার দিকে তাকালো। অর্পনা দাঁত কটমট করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মেধা তখনই শরবত নিয়ে হাজির হয়েছে। বিহান ভাবলো, তার মেধা রানি বোধহয় তার জন্য চিন্তিত হয়ে পানি নিয়ে এসেছে। অথচ মেয়েটা তাকে পাত্তাই দিল না। সে বিহানকে পাশ কাটিয়ে মাহিদ মির্জার কাছে চলে গেল। মুহূর্তেই কাশি থেমে গেল বিহানের। সে চোখ ছোট ছোট করে তার মেধা রানির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো— এটা কি হলো, মেধা রানি? দেখলে না আমার বিষম উঠেছে? পানিটা আমাকে দেওয়া উচিত ছিল না?
,,, মেধা বড়ো আব্বুকে শরবতের পাত্রটি দিয়ে দাঁত কটমট করে বিহানের দিকে তাকালো। পরপর ঝাঁঝালো স্বরে আওড়ালো — বাচ্চা দুটোকে লুকিয়ে লুকিয়ে চকলেট দেওয়ার বেলায় মনে থাকে না? এদের দাঁতের ক্ষতি হতে পারে? ন্যাচারটার পাঁচটা দাঁত পোকায় খেয়েছে, ফরেস্টের দুটো। ডাক্তার যে পই পই করে মানা করে দিয়েছে, সেসব কানে ঢুকেনি আপনার?
,,, বউয়ের ঝাড়ি খেয়ে বিহানের মুখটা চুপসে এইটুকুনি হয়ে গেল। পাপ্পাকে বকা শুনতে দেখে তেতে উঠলো প্রকৃতি। তর্জনী আঙুল তুলে বললো — এইদে ইউ, মেদা মাম্মা!! এদ্দম আমাল পাপ্পাকে বব্বে না। পকিতি কিত্তু তাল পাপ্পাল পক্কে।
,,,, মেধা এবার ভ্রু কুঁচকে বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালো। বাপের জন্য কেমন রাগে ফুসছে দেখো। নাকটা ফুলে-ফেঁপে একাকার, চোখ জোড়াতে আগুন। যেন তার পাপ্পাকে কিছু বললে সে এই চোখের আগুনেই মেধাকে জ্বালিয়ে দেবে। ভাতিজির এই ভালোবাসা দেখে বিহান অযথাই চোখ মুছলো, যেন তার যোগ্য উদ্দেশ্বরীর কাজে সে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছে। অর্পনা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে দুই চাচা-ভাতিজির নাটক। মির্জা বাড়িটা এদের দৌলতে কবে না জানি নাট্যশালায় পরিণত হয়। এইটুকু মেয়ের এই অগ্নিমূর্তিকে একটুকরো দাম দিল না মেধা। উল্টো প্রকৃতির তাক করা আঙুলটাতে নিজের তর্জনী আঙুল মিলিয়ে হালকা ঝুঁকে বললো— তোমাকে কোচিং সেন্টারের সামনে আর তোমার পাপ্পাকে বেইলি রোডের সামনে নিয়ে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলে সব পক্ষ-টক্ষ ছুটে যাবে, মা।
,,, মুহূর্তেই চুপসে গেল প্রকৃতি। মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বিহান পাপ্পার দিকে তাকালো। বিহানের মুখটাও চুপসে এইটুকুনি হয়ে গিয়েছে। দুই বাবা-মেয়ের এমন একখানা ভাব, যেন তাদের মতো অসহায় আর অবুঝ এই দুনিয়াতে দুটো নেই। এই পর্যায়ে শব্দ করে হেসে উঠলেন মাহিদ মির্জা। তৎক্ষণাৎ রান্নাঘর থেকেও ধেয়ে এলো দুই কর্ত্রী আর মেইডদের হাসির শব্দ। এরপর মেধা, বিহান, আরাফাত, আরণ্যক, প্রকৃতিও হেসে উঠলো। সবার হাসি-ঠাট্টার মাঝে বাড়ির দোরগোড়ায় আগমন ঘটলো মির্জা বাড়ির ছোট মেয়ের। সে স্বামীকে বাইরে রেখেই “” ন্যাচার, ন্যাচার, ফরেস্ট, ফরেস্ট”” বলে ডাকতে ডাকতে ছুটে এসেছে বাড়ির ভেতর। আকস্মিক ছোট ফুপির কণ্ঠে নিজেদের নাম শুনে দাদুর কোলে থাকা প্রকৃতি আর আরণ্যক লাফিয়ে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে দাদুর কোল থেকে নেমে লাফাতে লাফাতে ছুটে গেল দরজার পানে। একদিক থেকে আরণ্যক-প্রকৃতি ছুটছে, অপরদিক থেকে পরশী ছুটছে। যেন বাংলা সিনেমার কোনো ইমোশনাল সিন চলছে বর্তমানে। দুপক্ষ সামনাসামনি হতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো পরশী। আরণ্যক আর প্রকৃতি ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ফুপির বুকে। পরশী ছেলে-মেয়ে দুটোকে জড়িয়ে ধরে এই গালে, ওই গালে চুমু দিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো— আমার বাচ্চারা, মাম্মা তোমাদের অনেক মিস করেছি।
,,, বলতে বলতে আরও কয়েকটা চুমু খেয়ে বাচ্চা দুটোকে আবারও জড়িয়ে ধরলো। বাচ্চা দুটোও মিশে রইলো ফুপির বুকে। যেন বহুদিন পর নিজেদের প্রাণ ফিরে পেয়েছে তারা। ফুপু-ভাতিজা-ভাতিজির সম্পর্কগুলো বুঝি এমনই হয়? কাছে এলে মায়া, দূরে গেলে শূন্যতা। পৃথিবীতে প্রতিটি অবিবাহিত ফুপুর প্রথম সন্তান বোধহয় ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরাই হয়। এই যে এই দুটো বাচ্চা! দিনের অনেকটা সময় পরশীর সাথেই থেকেছে। ছোটবেলায় হাগু-মুতু পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে মাঝেসাঝে গোসল পর্যন্ত করিয়ে দিয়েছে। নিজের সাথে সাথে রেখেছে, ঘুরে বেড়িয়েছে, ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় এটা-ওটা নিয়ে এসেছে। আবার বাচ্চাগুলোও তাকে মুখ ভরে পরশী মাম্মা বলে ডাকে। মা হওয়ার জন্য এই ডাকটাই যথেষ্ট নয় কি? মেয়ের আগমনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন রোমানা বেগম, সাথি বেগম। কয়েকজন মেইডও এগিয়ে গেলো সেদিকে। অর্পনা, মেধা, বিহানও এগিয়ে গেলো। সবাইকে আসতে দেখে ছেলে-মেয়ে দুটোকে রেখে প্রথমেই অর্পনাকে জড়িয়ে ধরলো পরশী। কাঁদতে কাঁদতে শুধালো — কেমন আছো, ভাবি? শরীর ঠিক আছে তো?
,,, আমৃত্যু অসুস্থতা বহন করা মানবী ননদের পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করলো সে ভালো আছে। পরশী এবার বিহানের কাছে গেলো। বিহানকে জড়িয়ে ধরতেই ছেলেটার কণ্ঠ কেমন ভেঙে এলো। অর্পনার এখনো মনে পড়ে, পরশীকে বিদায় দেওয়ার বেলায় দুই ভাই কী কান্নাটাই না কেঁদেছিল! যেন আব্রাহাম তাদের প্রাণভোমরাকে টেনে-হিঁচড়ে তাদের থেকে নিয়ে যাচ্ছে। পরশী তো গুনে গুনে চারবার সেন্সলেস হয়েছিল। দুই ভাই-বোনের আবেগঘন মুহূর্ত শেষ হতেই পরশী মেধাকে জড়িয়ে ধরলো। দুই বোন গলা জড়াজড়ি করে কাঁদলো কিছুক্ষণ। পরশীর বিদায়ের দিনও এই দুই বোনের কান্নার শব্দে বিয়ে বাড়িকে পুরো মরা বাড়ি মনে হয়েছিল। দুই বোনের কান্নাকাটি শেষ হতেই পরশী এবার সাথি বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। এবারও সেই কান্নাকাটি। সবশেষে মায়ের কাছে গেলো পরশী, ঝাপিয়ে পড়লো মায়ের বুকে। এতগুলো দিন পর মেয়েকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন রোমানা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের চোখে-মুখে চুমু দিতে দিতে আবারও জড়িয়ে ধরলেন। সবার কান্নাকাটি শেষ হতেই রোমানা বেগম খেয়াল করলেন, পরশীর সাথে আব্রাহাম নেই। পরশীকে একা দেখে ভ্রু কুচকে নিলেন তিনি। শুধালেন— একা এসেছো? আব্রাহাম আসেনি?
,,, মায়ের কথা শুনে চোখ মেলে গভীর শ্বাস টানলো পরশী। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আব্রাহামকে দেখতে না পেয়ে কেমন নিষ্পাপ হাসলো। মুখটা কাচুমাচু করে বললো — এসেছে তো। পিছনেই আছে বোধহয়।
,,, মুহূর্তেই তেতে উঠলেন রোমানা বেগম। মেয়ের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন — ছেলেটাকে রেখে চলে এসেছো? এই তোমার ম্যাচিউরিটি? সাথি! যাও তো, রান্নাঘর থেকে খুন্তিটা নিয়ে আসো। ওটা আজ ওর পিঠে ভাঙবো আমি।
,,, মারের কথা শুনে আঁতকে উঠলো পরশী। তখনই এক গাদা চকলেট, চিপস নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো আব্রাহাম। পিছু পিছু আরও তিনজন গার্ড এলো। দুজনের হাতে নানান পদের ফল-মিষ্টি, আর অন্যজনের হাতে আব্রাহাম আর পরশীর ট্রলি। আব্রাহাম এগিয়ে আসতে আসতে পরশীর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। ইশারায় বুঝালো, এই মায়ের হাতে মার খাওয়ার ভয় থেকেই তার আর পরশীর প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। আজ বিয়ের পর তাকে রেখে চলে আসার দায়ে আবার সেই মার খাওয়ারই ভয় করতে হচ্ছে। পরশী কেমন লজ্জা পেলো। লোকটা কি মায়ের কথা শুনে নিয়েছে নাকি? নাহ! মান-সম্মান আর থাকার নয়। আব্রাহামকে দেখে ছুটে গেলো প্রকৃতি আর আরণ্যক। আব্রাহাম ওদের হাতে চকলেট, চিপসগুলো দিয়ে বাচ্চা দুটোকে কোলে তুলে এগিয়ে গেলো শাশুড়িদের দিকে। আব্রাহামকে দেখে এবার ধীরস্থিরভাবে এগিয়ে এলেন মাহিদ মির্জা। আব্রাহাম এবার বাচ্চা দুটোকে নামিয়ে মাহিদ মির্জার সাথে মোলাকাত করলো। পরপর বিহানের সাথে মোলাকাত করে সবাইকে সালাম জানাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রোমানা বেগম আর সাথি বেগম। রোমানা বেগম পরশীর দিকে তাকিয়ে তাড়া দিয়ে আব্রাহামের উদ্দেশ্যে বললেন — আব্বা! যাও, তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। পরশ! ওকে ঘরে নিয়ে যাও।
,,, কার পরশী কে? সে যেন কথাটাই কর্ণপাতই করলো না। ভাতিজা আর ভাতিজিকে পিছু পিছু আসতে বলে সে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে আরাফাতের পাশে সোফায় বসে পড়লো। আরাফাত শুয়ে শুয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ গেম খেলছিল। পরশী খপাশ করে আরাফাতের চুল টেনে বললো — কিরে, পিচ্চি পাইলট! কখন এসেছিস?
,,, আকস্মিক চুলে টান খেয়ে উঠে বসলো আরাফাত। পরশীর মারের বিপরীতে মারতে নিতেই চোখ পড়লো আব্রাহামের দিকে। আব্রাহাম করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মানে আরাফাত যেন তার কাশ্মীরি আপেলকে না মারে। আরাফাত হাত গুটিয়ে নিয়ে নাক কুচকে বললো — তোর জামাইয়ের জন্য বেঁচে গেলি। নয়তো আমাকে পিচ্চি ডাকার অপরাধে তোর সবকয়টা চুল বর্তমানে আমার হাতের মুঠোয় থাকতো।
,,, মুখ বাঁকালো পরশী। এমতাবস্থায় আবারও আব্রাহামের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। মুহূর্তেই মিইয়ে গেল মেয়েটা। এদিকে পরশীর কাণ্ডে রেগে গেলেন রোমানা বেগম। ফের ধমক ছুড়লেন মেয়ের উদ্দেশ্যে— পরশ! তোমাকে যেতে বললাম না?
,,,, পরশী মুখ ফিরিয়ে নিল। তাকে মেরে ফেললেও সে এখন রুমে যাবে না। কতদিন পর বাড়ি এসেছে বলে কথা। বাড়ির লোকগুলোকে সময় নিয়ে কাছ থেকে দেখবে না? ভাতিজা-ভাতিজির সঙ্গে সময় কাটাবে না? বাড়িতে আসার পর ঠিকমতো তো নিশ্বাসই নেওয়া হলো না। এখনই ঘরবন্দী হওয়ার কোনো মানে হয়? আব্রাহাম যেন স্ত্রীর মনের কথাটুকু বুঝতে পারলো। তাই শাশুড়ির উদ্দেশ্যে অতীব নরম স্বরে বললো—
— থাক, আন্টি। আমি এখানেই ঠিক আছি।
,,, রোমানা বেগম কি তা মানার মানুষ? মেয়ের জামাই এসে ফ্রেশ না হয়ে কিনা এখানে বসে থাকবে? তিনি মেয়ের দিকে আবারও রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে অর্পনার উদ্দেশ্যে বললেন— অর্পনা! হাতটা ধুয়ে আব্রাহামকে একটু রুমে নিয়ে যাও তো।
,,, অর্পনা মানা করলো না। হাত ধুয়ে এসে আব্রাহামের উদ্দেশ্যে বললো — চলুন ভাইয়া, উপরে গিয়ে রেস্ট নিবেন। (পরশীর দিকে তাকিয়ে) বাচ্চাদের রেখে রুমে দ্রুত আসো। পরিবারের সঙ্গে পরেও সময় কাটানো যাবে।
,,, আব্রাহাম আর অর্পনার মাঝে গভীর সখ্যতা থাকলেও আপাতত অতিরিক্ত কথা বললো না। নতুন শ্বশুরবাড়ি বলে কথা। এসেই তো যেভাবে খুশি সেভাবে কথা বলা যায় না। আব্রাহাম ব্যক্তি-জীবন এবং বাহ্যিক জীবন—সবদিক থেকেই নিতান্তই ভদ্র একজন মানব। কথাবার্তা কিছুটা মেপে মেপেই বলে। পোশাক-আশাক, আচরণেও ভদ্রলোক-ভদ্রলোক একটা ব্যাপার আছে। করিডর পেরিয়ে আব্রাহামকে নিয়ে পরশীর রুমে এলো অর্পনা। তৎক্ষণাৎ একজন মেইড ট্রলি নিয়ে পিছু পিছু রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। অনুমতি চাইতেই অর্পনা জায়গা দেখিয়ে দিল। মেইড ভেতরে ঢুকে ট্রলিটি রেখে আবারও অনুমতি নিয়ে রুম থেকে প্রস্থান নিল। এই পর্যায়ে লম্বা একটা নিশ্বাস নিল আব্রাহাম। যেন মহাযুদ্ধক্ষেত্র অতিক্রম করে এসেছে মাত্রই। আব্রাহামের কাণ্ড দেখে কী বলবে ভেবে পেলো না অর্পনা। অগত্যা বিছানায় বসার জন্য ইশারা করে আলমারি খুলে তোয়ালে বের করে দিতে দিতে বললো— ফ্রেশ হয়ে নিন, ভাইয়া। আমি কফি পাঠাচ্ছি। কফি কোনটা নিবেন? ব্ল্যাক নাকি সুগার?
,,, আব্রাহাম তোয়ালেটা নিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বললো — মাত্রই বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি, আপাতত লাগবে না। তোমার শরীর এখন কেমন? এখনো হুটহাট মাথা ঘোরে?
,,, অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে নাকচ করে বললো— নাহ! পল্লব আর অরুণকে পাওয়ার পর থেকে কিছুটা ভালোই আছি। আমার ননদিনী কেমন সংসার করছে? আঙ্কেল-আন্টি সন্তুষ্ট তো?
,,, আব্রাহাম মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে বললো — আলহামদুলিল্লাহ! বাড়ির সবাই বেশ সন্তুষ্ট।
,,, আব্রাহামের চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে এই বিয়ে নিয়ে ঠিক কতটা হ্যাপি। অর্পনা স্বস্তি পেল। পরশীটা যে সব মেনে নিয়েছে, এই অনেক। যদিও এখনকার পরশী আর আগের পরশীর মাঝে ভীষণ ফারাক, তবুও একটা দ্বিধা তো থেকেই যায়। অর্পনা কেমন শান্ত কণ্ঠেই বললো — পরশটা যদি ভুলেও কোনো ভুলচুক করে ফেলে, তাহলে আঙ্কেল-আন্টিকে বলবেন যেন কিছু মনে না রাখেন। বাচ্চা মেয়ে তো, আমাদের সবার খুব আদরের। আপনারাও একটু আদরে রাখার চেষ্টা করবেন।
,,, আব্রাহাম মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। এই মেয়েকে যে সে পেয়েছে, এটাই তো সৌভাগ্য। আদর করার প্রশ্নই আসে না, উল্টো সে পারলে নিজের প্রাণটাই পরশীয়া মির্জার নামে লিখে দেয়। অর্পনা আর কথা বাড়ালো না। যতই বাড়ি থেকে খেয়ে আসুক না কেন, বাড়ির একমাত্র জামাই বলে কথা, কিছুটা আয়োজন তো করতেই হবে। যদিও মির্জা বাড়িতে মেয়ের সংখ্যা দুজন, তবে ঘুরে ফিরে আব্রাহামই মির্জা বাড়ির একমাত্র জামাই। অন্যজন তো সুন্দরী চাচাতো বোন দেখে নিজের দৃষ্টি সামলাতে পারেনি, ঠিক নজর লাগিয়ে দিয়েছে। ভেবেই মনে মনে বিহানকে দুদফা বকে নিল অর্পনা। একটা মানুষের ক্যারেক্টার কতটা খারাপ হলে নিজের চাচাতো বোনের দিকে নজর দেয়! ফালতু ভাইটাই। ভাবনা রেখে সে আব্রাহামকে ফ্রেশ হওয়ার তাড়া দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে রুম থেকে বের হতে চাইলে পেছন থেকে ডাকলো আব্রাহাম — অর্পনা!! একটু শুনবে?
,,, আব্রাহামের ডাক শুনে তড়িৎগতিতে ফিরে তাকালো অর্পনা। ভাবলো, কিছু লাগবে হয়তো, তাই কিছু জিজ্ঞেস করতে নিবে। তখনই আব্রাহাম আমতা আমতা করে বললো — তুমি তো এখন অনেকটা সুস্থ। আসলে একটা কথা বলার ছিল, মানে এটা দেওয়ার ছিল।
,,, বলতে বলতে পকেট থেকে একটা মাঝারি সাইজের অফ-হোয়াইট কালারের খাম বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলো। সহসাই অর্পনার বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। এসব খাম, কাগজ তার জন্য অশুভ। কখনোই ভালো কিছু বহন করে নিয়ে আসেনি তার জীবনে। বরাবর এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি করেছে তাকে। তাই এসবের প্রয়োজন নেই অর্পনার। সে কেমন অনীহা-ভরাট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো — লাগবে না, রেখে দিন। এসব খাম-টাম কখনোই আমার জন্য সুখবর নিয়ে আসেনি।
,,, আব্রাহাম কেমন অসহায় নেত্রে তাকালো। এই চোখে কাতরতা ব্যতীত কিছুই নেই। অর্পনা চোখ সরিয়ে নিলো। আর কোনো সত্যের মুখোমুখি সে হতে চায় না। অর্পনাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে আব্রাহাম কেমন ভঙ্গুর কণ্ঠেই আওড়ালো — এই কাগজটা তোমার, মালিকানা তোমার নামে, এখানে তোমারই অধিকার স্পষ্ট। বহুদিন যাবৎ দেবো দেবো করেও তুমি অসুস্থ, বিদায় দেওয়া হয়ে ওঠেনি। এই পর্যায়ে এসে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি, অর্পনা। ইদানীং তীব্র যন্ত্রণা কাজ করে। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। এই কাগজের ভার বহন করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। প্লিজ, আমাকে দায়মুক্ত করো।
,,, অর্পনার কী যে হলো, মুহূর্তেই ফুপিয়ে উঠলো মেয়েটা। কণ্ঠে তীব্র অসহায়তা ঢেলে আওড়ালো—
— আপনারা আমার সঙ্গে এমন করেন কেনো? কী পেয়েছেন আমায়? কেনো আমার নামেই এত এত খাম, চিঠি থাকতে হবে? আমার ঘরটায় দুটো #৩৭_পৃষ্ঠার_ডায়েরি আর এক বেইমান বাবার দেওয়া চিঠি পড়ে আছে। এগুলো কি আমার কাম্য ছিল? সব দুঃখ আমার নামেই কেন লেখা হয়? আমার নিয়তি কি পারত না আমার নামে দুটো ভালো মুহূর্ত লিখতে? আমি কি আমৃত্যু শূন্যতাই বয়ে যাব? ভেতরকার হাহাকারের অবসান কি কোনোদিন হবে না?
,,, কান্নারত অর্পনার কথার জবাব দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পেলো না আব্রাহাম। তার চোখে এখনো কাতরতা বিরাজমান। এই মেয়েটার জন্য বড্ড আফসোস হয় তার। এমনিতেই মেয়েটা মানসিকভাবে তীব্র অসুস্থ, তবুও যে কেন মেয়েটার দুঃখ ফুরায় না।
,,, দুপুরের পরপর পুরো মির্জা বাড়ির সদস্যরা একসাথে খেতে বসলো। ইরাদ, সিদ্বার্থ, অরুণ, বৃষ্টিকেও দাওয়াত করা হয়েছে আজ। সবাইই নামাজের পরপর উপস্থিত হয়েছে মির্জা বাড়িতে। সবাই একসাথে হওয়ার দরুন দুই শাশুড়িও বাদ যায়নি। মির্জা বাড়ির বড়ো ডাইনিংটা আজ কানায় কানায় ভর্তি। সবার ঠোঁটেই তৃপ্তির হাসি। সবাই কেমন আনন্দের সহিত খাবার খাচ্ছে, দেখো। ইরাদটা সিদ্বার্থকে বিয়ে করে বেশ সুখে আছে। অরুণটাও বৃষ্টিকে অবহেলা করা ছেড়ে দিয়েছে। মির্জা বাড়িতে এখন আর তেমন কোনো অপূর্ণতা নেই। অথচ অর্পনার মনে বরাবর শূন্যতা কাজ করে। বুকের ভেতরটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সে খেতে খেতে আনমনেই কল্পনা করতে চাইলো অরুণের পাশে বৃষ্টির পরিবর্তে রাত্রি বসে আছে। পরশীর পাশে পল্লব বসে আছে। ইরাদের পাশে সিদ্বার্থ, তার পাশে দ্বীপ, বিহানের পাশে মেধা। কত সুন্দর একটা কল্পচিত্র! এটাই তো হওয়ার কথা ছিল, তাই না? তাহলে কোথায় ওরা? কোথায় অর্পনার রাত আর পল্লব? রাতটা কেন এত বড় বেইমানি করলো? পল্লবের জন্য অর্পনার ভেতরটা এবার মুচড়ে উঠলো। ছেলেটা আজ প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলেনি। কাছে যেতেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। বহু কষ্টে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে খাবার খাইয়ে এসেছে সে। খাওয়ার মাঝেই আকস্মিক কাশি উঠে গেল অর্পনার। চোখজোড়াতে পানি জমা হলো মুহূর্তেই। আকস্মিক কাণ্ডে সবাই কেমন ধরফরিয়ে উঠলো। দ্বীপ তাড়াহুড়ো করে আগলে নিল নিজ অর্ধাঙ্গিনীকে। পিঠে আলতো করে ম্যাসাজ করতে করতে মুখের কাছে পানি এগিয়ে দিতেই ধীরে ধীরে পানি পান করলো অর্পনা। সবাই ততক্ষণে বিচলিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সবাইকে এত অশান্ত হতে দেখে অর্পনা ধীরস্থির কণ্ঠে বললো—
— আমি ঠিক আছি। সবাই কন্টিনিউ করুন, প্লিজ।
,,, অর্পনাকে স্বাভাবিক হতে দেখে এবার বাকিরাও কিছুটা স্বাভাবিক হলো, তবে দ্বীপের স্বাভাবিক হওয়ার নাম নেই। একবার যেহেতু খেতে গিয়ে বিষম লেগেছে, সেহেতু অর্পনার আর নিজের হাতে খেয়ে কাজ নেই। দ্বীপ ওর সামনে থাকা প্লেটটা দূরে সরিয়ে নিজের প্লেট থেকে খাবার এগিয়ে দিলো। অর্পনাও মানা করলো না। চুপচাপ খেয়ে নিল আপন পুরুষের হাতে।
,,, সময়টা সন্ধ্যার আগের মুহূর্তে। ইরাদ, সিদ্বার্থ, অরুণ, বৃষ্টি বাড়ি ফিরে গিয়েছে অনেকটা সময় পেরিয়েছে। আপাতত মির্জা বাড়ির পরিবেশ বেশ শান্ত। পরশী আর আব্রাহাম রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে। মেধা বোধহয় বিহানের পোশাক-আশাক গুছিয়ে দিচ্ছে। অর্পনাও তীব্র মনোযোগ দিয়ে ট্রলি গুছানোতে মত্ত। দ্বীপ রেডি হওয়ার উদ্দেশ্যে কাবার্ড রুমে গিয়েছে অনেকক্ষণ। সাজেকে মোট তিনটি প্রজেক্ট মিট রয়েছে। একটা ঠিক রাত ৮টা ৩০ মিনিটে। আপাতত সেই উদ্দেশ্যেই রওনা হবে দুই ভাই। চার-পাঁচ দিন থাকতে হবে বোধহয়, তাই যা যা প্রয়োজন, লিস্ট সমেত গুছিয়ে দিচ্ছে অর্পনা।
বিছানার মাঝখানটায় বসে হোমওয়ার্ক করছে প্রকৃতি। প্রকৃতির সামনাসামনি শুয়ে আছে স্রিফান। তার দৃষ্টি প্রকৃতির খাতার দিকে স্থির। স্বরবর্ণ লিখতে থাকা ছোট্ট প্রকৃতি বড়ো করে ” ই ” লিখে স্রিফানকে উদ্দেশ্য করে বললো — এতা কি লিকেচি জানো? এতা হচ্চে লচ্চয়ি। আমাচ চাথে চাথে বলো, লচ্চয়ি।
,,, স্রিফান এবার খাতা থেকে নজর সরিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকালো। হয়তো বুঝতে চাচ্ছে মালিকের মেয়ে তাকে ঠিক কী করতে বলছে। স্রিফানকে কিছু বলতে না দেখে আবারও তাড়া দিলো প্রকৃতি। বারবার বলতে বলার পরেও যখন স্রিফানটা হ্রস্ব-ই শব্দটা উচ্চারণ করলো না, তৎক্ষণাৎ ছেলেটার মাথায় ধাম করে চাটি মারলো প্রকৃতি। মায়ের মতো বোচা নাকটা কুঁচকে বললো — ইউ, বেদ্দপ চিপান। পলা লেকায় তোমাল এদ্দম মুনযুক নেই। পকিতিল মতো পাকিপাচ হয়েচো তুমি। লচ্চয়ি বলো, বলো লচ্চয়ি।
,,, অর্পনার এমনিতেই মন-মেজাজ খুব একটা ভালো নেই। তার ওপর মেয়ের এরূপ অবান্তর কাজ দেখে মাথায় রাগ চেপে গেল। মুহূর্তেই ধমকে উঠলো ছোট্ট মেয়েটাকে — এসব কী ধরনের বাচ্চামি, প্রকৃতি? স্রিফান কি কথা বলতে পারে? চুপচাপ লেখায় মনোযোগ দাও।
,,, মায়ের ধমক খেয়ে চুপসে গেলো মেয়েটা। ঠোঁট ফুলিয়ে ভেংচি কাটলো স্রিফানকে। বিরবির করে বললো — অচিক্কিত চিপান, তল জন্য মাম্মা আমাকে বকেচে। আমি তকে আল চিক্কিত বানাবো না। তুই মুক্ক হয়ে তাক।
,,, বিরবির করে বললেও অর্পনার কানে ঠিকই পৌঁছেছে কথাটা। সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো। পুরো চাচার মতো ইতর হয়েছে। বড়ো হয়ে নাকি বাবা-চাচার মতো রাজনীতি করবে এই মেয়ে। করতে পারবে, চাচার মতো হয়েছে না? অর্পনার অবশ্য এতে কোনো আপত্তি নেই। মেয়ে হয়েছে তাতে কী? আজ যেমন শাহিন মির্জা আর মাহিন মির্জার ডান হাত-বাম হাত হিসেবে জোহান-বিহান রয়েছে, কোনো একদিন জোহান-বিহানের ডান হাত-বাম হাত হিসেবে আরণ্যক ওয়াহিদ মির্জা আর প্রকৃতি জোহান মির্জা থাকবে। রক্তে যেহেতু রাজনীতি মিশে আছে, এরা বুঝদার হয়ে রাজনীতির পেছনে ছুটবে, এটাই স্বাভাবিক।
অর্পনার ভাবনার মাঝেই রেডি হয়ে বেরিয়ে এলো দ্বীপ। পাপ্পাকে রেডি হয়ে বেরোতে দেখে খাতা-কলম রেখে পাপ্পার দিকে ছুটে গেলো প্রকৃতি। মুহূর্তেই এক ঝটকায় মেয়েকে কোলে তুলে নিলো মানব। শব্দ করে চুমু খেলো মেয়ের গালে। প্রকৃতিও থেমে থাকলো না। সেও পাপ্পার গালে শব্দ করে চুমু খেলো। বাবা-মেয়ের কাণ্ড দেখতে দেখতে ট্রলি ব্যাগের চেইন লাগিয়ে নিচে নামালো অর্পনা। তৎক্ষণাৎ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডকে ঘরে আসতে বললো দ্বীপ। গার্ডটি দ্বিতীয়বার অনুমতি নিয়ে ব্যাগ সমেত বাইরে চলে গেলো। গার্ড চলে যেতেই অর্পনা বিছানার ওপর থেকে ওয়ালেট, ফোন, প্রয়োজনীয় চাবির গোছাটা নিয়ে একে একে দ্বীপের পকেটে গুঁজে দিলো। দ্বীপ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো তার ঘাড়ত্যাড়া বউয়ের দায়িত্বশীল রূপ। দ্বীপকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচালো অর্পনা। দ্বীপ মেয়ের গালে আরও একটা চুমু খেয়ে বললো — সুইটহার্ট! গিয়ে দেখো তো বিহান পাপ্পা রেডি হয়েছে কিনা?
,,, বাবার থেকে কাজ পেয়ে তীব্র খুশিতে ফেটে পড়লো মেয়েটা। লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মেয়ে বেরিয়ে যেতেই অর্পনাকে একটানে কাছে টেনে নিলো দ্বীপ। মুহূর্তেই লোকটার চওড়া বুকে মুখ থুবড়ে পড়লো মেয়েটা। নাকে ব্যথা পেতেই বিরক্তিকর কণ্ঠে আওড়ালো — ওফ্ফ! আপনি কি কোনোদিন সুস্থ মানুষের মতো কাছে টানা শিখবেন না? খালি হুটহাট টানাটানি।
,,, দ্বীপ পাত্তাই দিলো না। সে আলতো করে হাত উঁচিয়ে অর্পনার মাথাটা ধরে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। এই তো বুকের বাম পাশটায় কেমন শীতল হাওয়া বহিত হচ্ছে। এই মেয়েকে রেখে গেলে এই শীতলতা মিস করবে না সে? অগত্যা অর্পনার লম্বা চুলের ভাঁজে আলতো করে বিলি কেটে শান্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলো মানব — কেন যেন তোমাকে রেখে যেতে ইচ্ছা করছে না। মেয়েকে নিয়ে চলো না আমার সঙ্গে। কয়েকদিন ঘুরে এলে মাইন্ডটাও ফ্রেশ হবে।
,,, লোকটার উষ্ণ আলিঙ্গনে অর্পনার অশান্ত মস্তিষ্কটা শান্ত হলো। সে দুহাতে লোকটার পিঠ আঁকড়ে ধরে প্রত্যুত্তর করলো—— না গো, আগামীকাল “” আলোক ছায়ার “” ; রেকর্ডিং ডেট। আপনার সঙ্গে চলে গেলে অরিন্দম ঝামেলায় পড়ে যাবে না?
,,, দ্বীপ কেমন উৎসুক কণ্ঠে শুধালো— তাহলে কাল যাবে?
,,, সায় জানালো অর্পনা — আপনার মন কেমন করলে জানাবেন। আমি রেকর্ডিং শেষ করে মেয়েকে নিয়ে কাল সন্ধ্যায় রওনা দিবো।
,,, এই পর্যায়ে স্বস্তি পেলো বোধহয় মানব। বাইরে থেকে বিহানের কণ্ঠস্বর ধেয়ে আসতেই অর্পনার কপালে গাঢ় চুম্বন করলো মানব। পরপর গালে, নাকে, থুতনিতে, ধীরে ধীরে পুরো মুখে অসংখ্য চুম্বন লেপ্টে দিয়ে আওড়ালো — নিজের যত্ন নিও, ভেলোরা। আমি আসছি।
,,, অর্পনা লোকটার কলার টেনে দুই পা উঁচিয়ে কপালে গাঢ় চুম্বন করে বললো — কাল দেখা হচ্ছে, আমার বন মানুষ!
,,, দ্বীপ ক্ষীণ হাসলো। অর্পনাকে আবারও আলতো করে জড়িয়ে ধরে বাইরে দিকে হাঁটা দিলো। মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়ালো অর্পনা। লোকটা কোথাও গেলে সে তাকিয়ে থাকে না, আবার রুমের বাইরেও যায় না। কেমন যেন কষ্ট হয়। পরে সবার সামনে কেঁদে দিলে সবাই স্বামী-পাগলি বলবে না? তাই তো রুমেই থেকে যায়। অর্পনা ঘুরে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস টেনে কান্না আটকানোর প্রয়াস চালাতে না চালাতেই আকস্মিক তার বাহু ধরে টান দিতে দেরি করলো না দ্বীপ। আবারও অতর্কিত হামলায় মানবের বুকে আছড়ে পড়লো রমণী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শোনা গেল দ্বীপের অশান্ত স্বর — যেতে ইচ্ছা করছে না, ভেলোরা। বারবার মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই।
,,, লোকটার পাগলামি দেখে কী বলবে ভেবে পেলো না রমণী। দ্বীপের বুক থেকে মুখ তুলে মানবের দুই গালে হাত রেখে আদুরে কণ্ঠে আওড়ালো — এত পাগলামি করছেন কেন, পাগল লোক? আমি কি বাড়িতে একা? কত মানুষ আছে। তারা কি আমার খেয়াল রাখবে না?
,,, দ্বীপ কেমন অসন্তুষ্টি জানিয়ে বললো — আমি তো আর থাকবো না।
,,, কে বলে থাকবেন না? আপনি আমার মন, মস্তিষ্ক সবখানটা দখল করে রেখেছেন। এর পরেও বলবেন আপনি নেই?
,,, বউয়ের সরল স্বীকারোক্তিতে আপ্লুত হলো মানব। আবারও শক্ত করে অর্ধাঙ্গিনীর মাথাটা বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো — তুমি আমার সঙ্গে এটা কী করে ফেললে, ভেলোরা? আমার অসুখের নিরাময় হওয়াটা কি খুব প্রয়োজন ছিল? এখন যে তুমি ছাড়া আমি কিছু বুঝি না। এক পাও এগোতে পারি না। এ কেমন অসুখ হলো আমার?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯
,,, স্বামীর অশান্ত বুকে চুমু খেলো অর্পনা। আনমনেই আওড়ালো — আপনাকে ভালোবেসে যদি আমি সত্যিই কোনো পাপ করে থাকি, তাহলে সেই পাপে আমায় আমৃত্যু পাপিষ্ঠ বলে ঘোষণা করা হোক। আপনাকে পেতে আমি যদি ছলনা করে থাকি, সেই ছলনার অপরাধে আমায় নিকৃষ্ট ছলনাময়ীর উপাধি দেওয়া হোক। তবুও আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা না কমুক, আপনাকে পাওয়ার খাতিরে ছলনা না ফুরাক
