৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৮ (২)
রুপান্জলি
শাহিন মির্জা যখন যুবক ছিলেন, একদমি সদ্য ২১ বছরে পা দেওয়া যুবক, তখন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেছিলেন। বাবা চাচাদের অঢেল টাকা পয়সা আর সম্পদের ভারে তাকে কখনোই ম্যাম্বার, চেয়ারম্যান, কিংবা মেয়রের গন্ডি পেরুতে হয়নি। ২৯ বছর বয়সেই এমপির পদে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন তার দোসর ছিলেন সদ্য যুবক বয়সে পা দেওয়া মাহিন মির্জা। দুভাই অনেক চরাই উৎরাই পেরিয়ে আসার পর শাহিন মির্জা এমপির পদ পেয়েছিলেন। তারপর দীর্ঘ ১০ বছর এমপির পদ পালন করার পর সরকার কর্তৃক তাকে মন্ত্রীর আসন দেওয়া হয়। সেই আসন পেতেও বহু বিপদ, আপদ পেরুতে হয়েছে উনাকে।
এরপর শাহিন মির্জার জায়গায় মনোনিয়ন পায় মাহিন মির্জা। পরপর দুভাইয়ের সফলতায় সত্রু বৃদ্ধি হলো, প্রথম দিকে আপনের মতো ব্যাবহার করা মানুষগুলো হুট করেই রং বদলালো। একদিন দলের একজন লোক মাহিন মির্জার সাথে বিশ্বাস ঘাতগতা করে। ক্লাবের ভিতরে সামনাসামনি বসে দাবা খেলার সময় হুট করেই মাহিন মির্জাকে আক্রমণ করে বসে,, তখন শাহিন মির্জা ছিলেন নির্দিষ্ট দলীয় অফিসে, আদার্স ছেলেপুলেরাও সাথে ছিলো না। দ্বীপ আর বিহান তখন ১৪ বছরের বালক, প্রায়সই স্কুল ফাকি দিতো। বিহানটা দিতে চাইতো না, সেই কারনে দ্বীপ ওকে অনেক মারতো। মেরে মুরে সাথে করে নিয়ে স্কুল বাঙ্ক দিতো, বিহানকে পাশে দাড় করিয়ে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যেতো। বিহান প্রথমে নাক সিটকাতো, বমি করে দিতো কিন্তু জেদি দ্বীপ, বিহানকে সাথে নিয়েই সিগারেট খেতো। তার মতে, এখন থেকে বিহান এসব মেনে নিতে না শিখলে সারাজীবন পাশাপাশি থাকবে কি করে? পাশাপাশি থাকার জন্য হলেও শুরু থেকেই সিগারেটের ঘ্রাণ শুনে অভ্যস্ত করে নেওয়া উচিৎ।
আবার যদি বিহান কোনোদিন কৌতুহল বসত নিজের জন্য একটা সিগারেট চেয়ে বসতো,, তখন দ্বীপের থেকে আবার মার খেতো। দ্বীপের মতে, সিগারেট সাস্থের জন্য ক্ষতিকর, তাই বিহান এটা খেতে পারবেনা। পাছে যদি বিহান তার আগে মরে যায়? তাহলে এটা কেমন দেখায় না? দ্বীপ যেহেতু বড়ো তাই তার আগে মরা উচিৎ। আর সবচেয়ে বড়ো কথা বড়ো ভাইয়ের সামনে ছোট ভাই সিগারেট ফুকবে, এটা বড়ো ভাইয়ের জন্য অপমান জনক। তাই বিহান কখনো সিগারেট স্পর্শ করতে পারবেনা। এরকমি হাজারটা খুনসুটি,, ভালোবাসার মূহুর্ত রয়েছে জোহান-বিহানের। সেদিনো দ্বীপের পীড়াপীড়িতে বিহান স্কুল বাঙ্ক দিয়ে চাচার ক্লাবে আসে,, এসেই এরুপ ঘটনা দেখে দ্বীপ মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। ঘরের এক কোনায় রাখা হাতুড়ি দিয়ে বারি মারলো লোকটার মাথায়,, লোকটা পরে যেতেই আরও কয়েকটা বারি মারলো। এই অতর্কিত হামলায় প্রান গেলো লোকটার সাথে রক্তে রন্জিত হলো ছোট্ট এক বালকের হাত। অতঃপর সেখান থেকেই দ্বীপের রাজনিতির জীবন শুরু। কখনো খু*ন করেছে, আবার কখনো খু*ন হতে হতে বেচে গিয়েছে। দুই ভাই কতোবার যে হসপিটালে ভর্তি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
তবুও কেউ কখনো পিছিয়ে আসেনি, কারোর কাছে মাথা নত করেনি। দ্বীপ যখন যাকে যেই কথাটা দিয়েছে তা ঠিক সময় পূরুন করেছে। এইতো, মাসখানেক আগেই দ্বীপ তার চাচ্চুকে কথা দিয়েছিলো,, “” তুমি আবারও এমপি হবে,,নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হও””
সেই কথা রেখেছে দ্বীপ। আজ সন্ধায় ভোট গনগনে মাহিন মির্জা বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু এতোবড়ো সফলতায় ও মির্জা বাড়ি নিরব। দ্বীপের তিনটে গুলি লেগেছে, দুটো বাহুতে, আরেকটা বুকের তিন ইঞ্চি উপরে কাধের পাশাপাশি ,, যার ফলে দ্বীপ এখন অনেকটাই বিপদ মুক্ত, জ্ঞান ও ফিরে এসেছে। বর্তমানে দ্বীপ হসপিটালে থাকতে নারাজ, তাকে ধরে বেধে, পায়ে ধরেও কেউ হসপিটালে রাখতে পারলো না। এই মুহুর্তে সে বাড়ি ফিরবে মানে এই মুহুর্তেই ফিরবে। অগত্যা তার কথামতোই সব হলো। তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে সবাই।
দ্বীপ বাড়ি ফিরছে কথাটা কর্নকূহরে পৌছাতেই সিরি বেয়ে নিচে নেমে এলো অর্পনা। সারাটা দিন উপরে ছিলো,সন্ধা কেটেছে সেই কখন, এখনো ইফতার করেনি,, কান্নার তোপে চোখ দুটো ফুলে গিয়েছে, মুখটা টকটকা লাল, অতিরিক্ত কাদার ফলে মনে হচ্ছে গাল ফেটে রক্ত গড়াবে, শরীরটাও চলতে নারাজ। তবুও কোনোরকমে নিচে এসে দাড়ালো,, বাড়িতে বর্তমানে অনেকেই উপস্থিত। আত্মীয় স্বজন ও দলীয় নেতাদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি বাড়ি চলে এসেছেন,, হলরুমে রীতিমতো ছোটখাটো একটা হাট বলা যেতে পারে। আত্মিয় স্বজনদের উদ্দেশ্য দ্বীপকে এক পলক দেখে তারপর বাড়ি ফিরে যাওয়া। আর দলীয় নেতারা এসেছেন মাহিন মির্জাকে সংবর্ধনা জানানোর সাথে দ্বীপকেও দেখে যাবেন, সেই উদ্দেশ্য। এই আত্মীয় স্বজন আর নেতাদের ভীর ভাট্টায় বড্ড আনকমফোর্ট ফিল করছে অর্পনা। নিজেকে বহুদিন পর বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে। অর্পনা কাপা হাতে আরশাদ জামানকে মেসেজ পাঠালো — আর কতো দূর পাপ্পা?
,,, কিছু সময় পর ওপাশ থেকে রিপ্লাই এলো, — এইতো চলেই এসেছি মাম্মা, তোমার শ্বশুর বাড়ির গেইটের কাছাকাছি।
,,,অর্পনা নিস্পৃহের মতো সদর দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই বুঝি দ্বীপ বাড়িতে পা রাখলো, এই বুঝি দ্বীপকে দেখতো পেলো। সে যতটা কাতর হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে তার থেকেও অধিক আশ্চর্য হয়ে আত্মীয় স্বজনের অনেকেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকেই ওকে দেখিয়ে বলছে “” ওটা দ্বীপের বউ “” অর্পনার হাসফাস লাগলো। তার পরনে শুধু টিশার্ট, জগার্স আর জরজেটের উড়না। যতই ত্যরা, এক রোখা হোকনা কেনো, সে তো মেয়ে। সবার এভাবে তাকিয়ে থাকাটা তার অস্বস্তি লাগছে,, তবুও দ্বীপকে দেখার আসায় অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো। লোকটা যতক্ষণ সুস্থ ততোক্ষণই সে নিজের হম্বিতম্বি দেখাতে পারে কিন্তু অসুস্থ হলে অন্য কথা। তখন তো চাইলেও উনাকে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব না। অর্পনার কল্পনা ঝল্পনার মাঝে বাহিরে হইচই এর শব্দ শুনা গেলো, দ্বীপকে নিয়ে চলে এসেছে সবাই। অর্পনা তাকিয়েই রইলো, শরীরের দূর্বলতা কাটাতে এক হাতে সিরির হাতল ধরে রাখলো। মির্জা বাড়ির সিরি আর সদর দরজা একদম সামনাসামনি। ডান পাশে রান্নাঘর, খাবার টেবিল আর বামপাশে বসার ঘর, গেস্ট রুম। আত্মীয় স্বজনরা সিরির বাম পাসে বসার ঘরে সোফা, চেয়ার টেনে বসে আছে। কিছুক্ষণের মাথায় সদর দরজার ফটকে দ্বীপ জোহান মির্জাকে দেখা গেলো। লোকটাকে একপাশ থেকে আগলে রেখেছেন আরশাদ জামান। অপরপাশে বিহান,, শাহিন মির্জা,, মাহিন মির্জা পিছন থেকে বেড়িয়ে এসে দ্রুত দ্বীপকে বসানোর ব্যাবস্থা করতে চলে গেলেন। অর্পনা অনুভব করলো তার সামনে তার গোটা পৃথিবী দাড়িয়ে আছে,, একপাশটা তার পাপ্পা অন্য পাশটা তার স্বামী। তার সবচেয়ে আস্থার জায়গা, বিশ্বাসের জায়গা, যেখানে সে সবচেয়ে নিরাপদ। অর্পনার এই তাকিয়ে থাকার মাঝেই দ্বীপ সরাসরি অর্পনার দিকে তাকালো যার ফলে দুজনার চোখাচোখি হলো। দুজনার চোখে একরাশ কাতরতা, অর্পনার ইচ্ছা করছে এখুনি ছুটে গিয়ে দ্বীপের বুকে ঝাপিয়ে পরতে। যারা যারা তাকে অপমান করেছে তাদের সবার নামে নালিশ জানাতে। পরক্ষনেই অবাধ্য অর্পনার শক্ত মস্তিষ্কটা তার মনকে শাসালো, বললো “” তুই এতোটাও ভঙ্গুর নয় অর্পনা,,যে এই সামান্য কিছু কথায় কারোর বুকে লুটিয়ে পরে কষ্টের অভিযোগ জানাতে হবে। তাও এমন একজন মানুষের কাছে যার কাছে তুই বারবার ভালোবাসা চাওয়ার পরেও একবার বলেনি,,
ভালোবাসি। “” তবে অর্পনার মনটা সেসব বুঝলো না,, সে আজ বড্ড অবাধ্য হলো, পা দুটো যেনো দ্বীপের দখলে,, এই মুহুর্তে ছুটে না গেলে যেনো অনেক বড়ো অধর্ম হয়ে যাবে। হুস জ্ঞান হাড়িয়ে এতো লোকোর ভীরেই ছুটে গেলো অর্পনা,, একপ্রকার ঝাপিয়ে পরলো দ্বীপের বুকে। আরশাদ জামান সরে গেলেন। দ্বীপ বোধহয় জানতো তার ঘারত্যারা বউ এরকম কান্ড করে বসবে তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো। দ্বীপ এক হাতে আগলে নিলো অর্পনাকে,, বুকের ডানপাশটায় গুলি লেগেছে সেখানে বেন্ডেজ পেচানো, শরীরে জাস্ট একটা সেন্ডো গেঞ্জি থাকায় সেই বেন্ডেজ খানা উন্মুক্ত। ডান হাতের বাহুতেও বেন্ডেজ মোড়ানো। অর্পনা কাপা হাতে বেন্ডেজ খানা ছুয়ে দিলো, দ্বীপ অর্পনার চুলের ভাজে চুমু খেতে নিতেই অনুভব করলো, এটা তার শুধুই হেলোসোলেশন। অর্পনা আসেনি, জড়িয়ে ধরেনি তাকে, কাপা হাতে বেন্ডেজ খানাও ছুয়ে দেয়নি তবে মলিন মুখে সিরিগোড়ায় দাড়িয়ে ওর মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। মেয়েটার চোখ মুখ এমন কেনো? খুব কেদেছে কি? সিরিতে রাখা হাতটা সমানে কাপছে, অর্পনার দাড়ানোর ভঙ্গি বলে দিচ্ছে ও কতোটা উইক। দ্বীপ অনুভব করলো তার সাথে সাথে আরও একজোড়া চোখ আটকেছে অর্পনার কাপা হাতের দিকে। সে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো না তার আগেই পাশ থেকে শুনা গেলো আরশাদ জামানের কর্কশ কন্ঠের চাপা স্বর — তোমার আর আমার চুক্তির কথা ভুলে যেওনা ছেলে,, আমি কিন্তু আমার মেয়েকে এভাবে দেখবো বলে তোমার হাতে তুলে দেইনি।
,,, দ্বীপ কিছুটা অহমিকা নিয়ে বললো– তুলে আর দিলেন কই? আমি নিজের ক্ষমতায় তুলে এনেছি।
,,, আরশাদ জামান একপেশে হাসলেন, হুমকি স্বরুপ বললেন– এখন আমি নিজের ক্ষমতায় ওকে আমার সাথে নিয়ে যাই?
,,, দ্বীপের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। এই শ্বশুরটা মেবি ওকে হার্ট এটাক করানোর পায়তারা করছে, নয়তো ওকে অসুস্থ শরীরে দেখেও এমন হুমকি দিতে পারতেন না। দ্বীপ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো– আপনাদের মতো কিছু কূটনা শ্বশুর এখনো পৃথিবীতে এক্সিস্ট করে বলেই, মেয়েরা শান্তিতে স্বামীর ঘর করতে পারেনা।
,,, ভ্রু জোড়া কুচকে নিলেন আরশাদ জামান, সন্দেহি কন্ঠে শুধালেন — আমি বেঁচে না থাকলে বোধয় খুব খুশি হতে?
,,, দ্বীপ বিরবির করে বললো — সব স্বপ্ন সত্যি হয়নারে পাগলা।
,,, আরশাদ জামান দ্বীপের দিকে শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো, ছেলেটা ভারি বেয়াদব তো। শ্বশুরের সামনে শ্বশুরের মৃত্যু কামনা করে। বিহান অন্যদিকে ফিরে মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেললো। দ্বীপকে দেখে আত্মীয় স্বজন আর শুভাকাঙ্ক্ষীরা এগিয়ে আসতে চাইলে শাহিন মির্জা না করলেন, দ্বীপ শুরুতে বসার ঘরেই বসবে। আজ নির্বাচনে তারা বিজয়ী হয়েছে, সেই উপলক্ষে দলের কিছু নেতারাও এসেছে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করা প্রয়োজন। রাজনীতি তো আর শরীর খারাপ মানে না। এখানে শুধু বুদ্ধি আর কূটনৈতিক খেলা চলে। একপক্ষ যদি জানতে পারে অপরপক্ষ দূর্বল তাহলে ঐ দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠে,, তাই কাউকেই নিজের দূর্বল দিক দেখাতে নেই। সর্বদা এটাই প্রকাশ করতে হবে”” সিংহ ঘুমিয়ে থাকুক কিংবা জেগে, সে বরাবরি বনের রাজা”” সবার অতো মাতামাতিতে অর্পনা নিরব দর্শক,, দ্বীপকে বাপ চাচাদের সাথে বসার ঘরে যেতে দেখে সে আবার ঘরে ফিরে গেলো। তার মনটা খুব আবদার করেছিলো দ্বীপের বুকে জায়গা করে নিতে কিন্তু হয়ে উঠলো না। মস্তিষ্ক, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি আর নিজের তৈরি করা শক্ত আবরনের জন্য ঐটুকু বাচ্চামি সে করতে পারলো না।
যখনি ভাবে সে দ্বীপকে মেনে নিবে, সংসারটা স্বাভাবিক করবে কিন্তু ঐ আত্মসম্মান জনিত একটি কারন তাকে পিছু হটিয়ে দেয়৷ অর্পনা দ্বীপের কাছে কয়েকবার ভালোবাসার দাবি করেছিলো কিন্তু প্রতিবার দ্বীপ তাকে সোজা সাপ্টা বুঝিয়ে দিয়েছে সে তাকে ভালোবাসে না। এমনকি কয়েকদিন আগেও ভালোবাসা দিতে পারবেনা বলে মেসেজ পাঠিয়েছে। হয়তো দ্বীপ ওকে ভালোবাসে, অর্পনা উপলব্ধি করতে পারে সবটা, কিন্তু মুখের স্বীকারোক্তিটা কি প্রয়োজনীয় নয়? দ্বীপের কথা মতো সে অর্পনাকে ভালোবাসেনা, এখন অর্পনা যদি শুধু তিন কবুলের খাতিরে নিজেকে বিলিয়ে দেয় তাহলে এখানে তার মর্যাদাটা থাকলো কোথায়? অর্পনা জানেনা দ্বীপ কি চায়? আর তার পরিবার ই বা কি চায়? সে দ্বীপের সকল বরবরতা মেনে নিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে দিবে, এমনটাই চায় কি? কিন্তু সে তো অসহায় নয়। তাকে রাখতে হলে যোগ্য সম্মান দিয়ে রাখতে হবে। দ্বীপ ঘাড় বাকিয়ে একবার সিরির দিকে তাকালো, অর্পনা করিডরে উঠে পরেছে, কয়েকটা ঘর পেরুলেই ওদের ঘর। দ্বীপ তাকিয়েই রইলো, যতক্ষণ অর্পনাকে দেখা গেলো নজর সেদিকেই স্থির রাখলো।
অর্পনা যেতেই আত্মীয় স্বজনদের সাথে টুকটাক কথা বলে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বসলো। আজ ২৫ তারিখ, ২৮ তারিখে মাহিন মির্জা সপথ গ্রহণ করবে। দ্বীপ কথা দিলো সেদিন সেও উপস্থিত থাকবে, আজ দলের ছেলেরা স্লোগান দিতে চেয়েছিলো কিন্তু দ্বীপ নিষেধ করে দিয়েছে। গতকাল বিহান-মেধার সন্তান আসার খুশিতে মসজিদে মিলাদ পড়ানোর পর এলাকাবাসীদের মিষ্টি বিলানো হবে যদিও মেধা-বিহানের বাচ্চা আসার কথাটা উজ্ঝ থাকবে, কারন এসব ঘটা করে বলতে নেই। বাচ্চা পৃথিবীতে আসার পর অবশ্যই সবাইকে জানিয়ে মিষ্টি বিতরন করা হবে। কাল মিষ্টি বিতরনের পর বিকেলের দিকে যা স্লোগান দেওয়ার দিতে পারে। এরকম আরও কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলোচনার পর বসার ঘর খালি হলো, আরশাদ জামান তখনো দ্বীপের পাশে বসে, শ্বশুর জামাই মনে মনে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সবার সামনে বেশ মিল মোহাব্বত দেখালো। শাহিন মির্জা মাহিন মির্জা তাদের দলিয় নেতাকর্মীদের এগিয়ে দিতে গেলেন। মাহিদ মির্জা আরশাদ জামানকে আপ্পায়নের জন্য ব্যাস্ত হয়ে পরলেন। আরশাদ জামান অবশ্য নিষেধ করেছিলেন যেনো ব্যাস্ত না হয় কিন্তু এই প্রথম মেয়ের শ্বশুড় বাড়িতে এসেছেন। সেই খাতিরে একটু যত্ন আত্মি পাওয়াটা আবশ্যক। সবাই চলে যেতেই আরশাদ জামান নরম স্বরে বললেন — আমি ভাবতেও পারিনি তোমার মতো একটা বেয়ারা ছেলে আমার জামাই হবে. বিশ্বাস করো দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করিনি।
,,, শ্বশুরের কথায় নাক কুচকালো দ্বীপ,, এমনি শরীর খারাপ, তার মধ্যে শ্বশুরের পিন্চ করে বলা কথা। দ্বীপ দাতে দাত চেপে বললো — কেনো আপনার রান্না করা ডিসে এক্সট্রা লবন এড করেছি আমি? এতো হা হুতাশা করার কি হলো?
,,, আরশাদ জামান আগের ন্যায় শান্ত অথচ বিরক্তিকর কন্ঠে বললো — না, তা করোনি তবে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে এতো মাতামাতি করা খুব প্রয়োজন ছিলো? ঘরে গিয়ে রেস্ট নিতে পারতে, আমার মেয়েটার খোজ নিয়েছো? ওর সাথে দেখা করা প্রয়োজন ছিলো না?
,,, দ্বীপ হতাশ শ্বাস ফেললো, রাজনীতির ক্যাচাল তার ডিটেকটিভ শ্বশুর বুঝবেনা। বুঝলেও বুঝার চেষ্টা করবেনা,, মেয়ের বাপ হয়ে উদ্ধার করে ফেলেছেন না? এখন সবকিছুতেই দোষ ত্রুটির শেষ নেই। তবে অর্পনার খোজ নেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, মেয়েটাকে এতো উইক লাগছিলো কেনো? খাওয়া দাওয়া করেনি নাকি? বাড়ি ফাকা হতেই বাড়ির মহিলারা বসার ঘরে এলেন। রোমানা বেগম, সাথী বেগম দ্বীপকে দেখে গিয়ে দ্রুত খাবার গরম করতে ব্যাস্ত হয়ে পরলেন। আরশাদ জামান এই প্রথম তাদের বাড়িতে এসেছে, তেমন কোনো আয়োজন করতে না পারলেও যা আছে তা দিয়েই আপ্পায়নের কাজটা সারতে হবে। বিহান বরাবরের ন্যায় চিল, যেনো দ্বীপের কিছুই হয়নি। সে ফ্রিজ থেকে একটা আপেল নিয়ে খেতে খেতে দ্বীপের সামনে এসে বসলো, কিছু বলতে নিয়েও আরশাদ জামনকে সম্মান দেখিয়ে বলতে পারলো না। ওর হাবভাব দেখে আরশাদ জামান নাক কুচকালেন,, দ্বীপ দাতে দাত পিষে তাকালো। এই ছেলের চিলনেস এর জন্য একদিন তাকে সর্বোচ্চ বাশটা খেতে হবে। বিহান চোখ বাকিয়ে চলে গেলো,, তার এখানে থাকার জন্য অতো তাড়া নেই। বিহানের মেধা আছে, এসব শ্বশুর জামাইয়ের দন্দ না দেখে তার মেধা রানীকে কোলে নিয়ে বসে থাকলেও কাজ দিবে। বিহান চলে যেতেই দ্বীপ পরশীকে ডেকে পাঠালো, ভাইয়ের ডাক শুনে দৌড়ে এলো পরশী, আরশাদ জামানকে দেখে সালাম দিলো। মোটামুটি বাড়ির সবার অবস্থাই করুন, কেদে কেটে চোখ মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। দ্বীপ নরম স্বরে জানতে চাইলো — খেয়েছিস? আম্মু, ছোট আম্মু খেয়েছে?
পরশী মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো, মানে খেয়েছে। দ্বীপ আবারও জিজ্ঞেস করলো– তর ভাবি খেয়েছে?
,,, পরশী দুদিকে মাথা ঝাকিয়ে বললো — সকালের পর ভাবি আর ঘর থেকে বের হয়নি, আমি, ছোট আম্মু, মেঝো ভাবি শতো ডেকেও দরজা খোলাতে পারিনি। ইফতার ও করেনি বোধহয়।
,,দ্বীপ চোখ ঘুড়িয়ে ঘরির দিকে তাকালো, কাটায় কাটায় ৮ টা ৫৮ মিনিট পায় ৯ টা বাজে অথচ তার বউ খাবার খাওয়া তো দূর ইফতারটা পর্যন্ত করেনি। দ্বীপের রাগ বাড়লো, কপালের মাঝের শিরাটা দপ দপ করে ফুলে উঠলো। এটা তার পরিবার? এই পরিবারের কাছে তার বউ কতোটা সেইফ? একটা দিন অসুস্থ ছিলো, এইটুকু সময় কেউ অর্পনাকে আগলে রাখতে পারলো না। তাহলে সে মরে গেলে কি করবে? আজ যদি কোনোভাবে মরে যেতো, তাহলে তার বউয়ের কি হতো? অর্পনার অসহায়, হেল্পলেস অবস্থা মাথায় আসতেই চোখের শিরাগুলো জ্বলে উঠলো। বড়ো ভাইয়ার রাগ দেখে চুপসে গেলো পরশী, মাথা নতো করে বললো — ভাবি দরজা খুলেনি,, আমিতো বারান্দা বেয়ে উপরে উঠতে পারিনা, তাই ভিতরে গিয়ে দরজাও খুলতে পারিনি।
,,, পরশীকে ভয় পেতে দেখে দমে গেলো দ্বীপ, তার নিজের ও শরীর খারাপ লাগছে, বসে থাকতে পারছেনা। এতোক্ষণ মনোবল দিয়ে স্থির থাকলেও এখন শরীরটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছে, তিনটে গুলি তো কম নয়, যথেষ্ট ব্লাড লস হয়েছে। অগত্যা পরশীকে নরম স্বরে বললো — উপরে গিয়ে তর ভাবিকে ডেকে নিয়ে আয়।
,,,পরশী দ্রুত পায়ে ছুটতে নিলে আরশাদ জামান বাধ সেধে বললেন — তোমাকে যেতে হবেনা আম্মু, থাকো। আমি যাচ্ছি।
,,, বলেই উঠে দাড়ালেন তিনি, হাটা দিলেন সামনের দিকে। দ্বীপ কিছুটা ফোরন কেটে বললো — একান্তে পেয়ে আমার ওয়াইফকে যেনো উল্টা পাল্টা না বুঝানো হয়। ইহো জনম কিংবা পরজনম কোনোকালেই কেউ ওকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা।
,,, আরশাদ জামান কপাল কুচকে একবার দ্বীপের দিকে তাকালো, দ্বীপ চোখ মুখ শক্ত করে উনার দিকেই তাকিয়ে। যেনো বউকে কেড়ে নিতে চাইলে এই মুহুর্তে আরশাদ জামানকে চোখের আগুনে ধূলিসাৎ করে দিবে। চোখ মুখ বিকৃত করে নিলেন তিনি, ইদানিংকার ছেলেপুলেদের হাব ভাব দেখলে মনে হয় তারা কি না কি হয়ে গিয়েছে। কোথায় শ্বশুরকে ভয় পাবে,, সম্মান টম্মান দিবে, তা না উল্টো চোখ দ্বারা শাসায়, হুমকি দেয়, বেয়াদব ছেলে। আরশাদ জামান সত্যি ই কল্পনা করেনি উনার মেয়ে এরকম লাফাঙ্গা ছেলেকে বিয়ে করবে আবার ভালো ও বেসে ফেলবে। মেয়েটা ভালোবাসে বলেই এই ছেলেকে সহ্য করছে নয়তো জীবনেও এই ছেলের সাথে কথা বাড়াতো না। আরশাদ জামান যেতেই সস্থি পেলো দ্বীপ, ঠোঁট বাকিয়ে মৃধু হাসলো। শ্বশুরটা মোটামুটি মনের মতই, প্রতিদ্বন্দ্বীতা না থাকলে বিষয়টা খুব একটা জমতো না, এখন বেশ মিল খাচ্ছে।
,,, মেয়ের মুখে একটু একটু করে লোকমা তুলে দিচ্ছেন আরশাদ জামান,, একটু আগেই পরশী এক থালা খাবার সাজিয়ে ঘরে দিয়ে এলো,, এটা অবশ্য দ্বীপ নিজেই পাঠিয়েছে। বহুদিন পর বাবা মেয়ের দেখা হলো, অর্পনা নিশ্চয়ই বাবার হাতে খাওয়াটা মিস করে। এখন বাবার হাতে খেতে পারলে একটু তৃপ্তি পাবে। খেতে খেতে হুট করেই কেদে দিলো অর্পনা,, আরশাদ জামান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অর্পনা বাচ্চাদের মতো ফুপাচ্ছে,, পাপ্পার কাছে শ্বাশুড়ির নামে অভিযোগ করতে ইচ্ছা করছে। ওর মা যেমনি হোক, ওর মা না? মাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বললে কোনো সন্তানের সহ্য হয়? কখনোই না। সকালে টানা আধা ঘন্টার ও বেশি সময় নিয়ে রোমানা বেগম তাকে, তার মা আর বাবাকে নিয়ে হাজারটা কথা শুনিয়েছে। আজকের এই ঘটনায় অর্পনা বুঝলো, তার কাছে অহংকার করার মতো কিছুই নেই। রুপ যা আছে তাও তো অপবিত্র, কোনো কাজের না,, সে আগা গোড়া পুরোটাই লুজার। মেয়েকে এভাবে বাচ্চাদের মতো ফোপাঁতে দেখে আরশাদ জামান নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন — কি হয়েছে আম্মু? কেউ কিছু বলেছে?
,,, অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো, পরপর নাক টেনে বললো — পাপ্পা!! চলোনা আমরা অনেক দূরে চলে যাই, যেখানে পরিচিত কেউ থাকবেনা, কেউ আমাদের চিনবে না। শুধু তুমি আর আমি,, আর কেউ না।
,,, আরশাদ জামান মেয়ের কথায় অনেক কিছুই আচ করে নিলেন,, ছোট থেকে নিজ হাতে এতোটা বড়ো করলেন,, মেয়ে কোন কারনে কতোটা আঘাত পায় তার থেকে ভালো আর কে জানবে? আরশাদ জামান অর্পনার চোখ মুছে দিয়ে ভাতের লোকমা এগিয়ে দিয়ে বললেন– তুমি সত্যি দ্বীপকে ছেড়ে চলে যেতে চাও? ওকে ছাড়া থাকতে পারবে? পারলে আজ ই সাথে করে নিয়ে যাবো। নিঃসংকোচে বলো,, আমি নিয়ে গেলে কেউ আটকানোর সাহস পাবেনা।
,,, অর্পনা হুট করেই থমকে গেলো, কান্নাকাটি বন্ধ, ফুপাচ্ছেও না। অনেকটা সময় এরকম থম মেরে থাকার পর আবার ফুপিয়ে উঠে ভাঙা কন্ঠে বললো– পারবো না পাপ্পা,, এটাই আমার আফসোস!! আমি কেনো পারিনা? সবার বেলায় মনটা পাষাণ হলেও উনার বেলায় মনটা এতো অবুঝ কেনো? এতো বায়না কিসের তার?
,,,আরশাদ জামান মৃধু হাসলেন, জানতো মেয়ে এই কথা বলবে। — তুমি কি শিউর, দ্বীপ তোমায় ভালোবাসেনা?
,,, বাসে, কিন্তু বলেনা। এটুকু বলেনা পর্যন্তই থেমে থাকেনা পাপ্পা, উনি বড়ো মুখ করে বলে আমি তোমায় ভালোবাসিনা। এরপরেও কার থাকতে ইচ্ছে করবে বলো? তুমি থাকবে? কেউ মুখের উপর অস্বীকার করে দিলে সেখানে সম্মানটা কোথায় থাকে?
,,, তোমায় আমি আগেও বলেছি মাম্মা, যেহেতু ওর সাথে থাকতেই চাও, ছাড়তে পারবেনা সেহেতু একটু সময় দাও। সবকিছু হুটহাট হয়ে যায়না,, ঠিক হতে অনেক সময় লাগে।
,,, কিন্তু আমি যে দ্বিতীয়বার কাউকে সুযোগ দেওয়া প্রেফার করিনা পাপ্পা , আত্মসম্মানে লাগে খুব।
,,, আরশাদ জামান কিছু বললেন না, ধৈর্য ধরে মেয়েকে সম্পূর্ন খাবারটা খায়িয়ে দিয়ে, পানি দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন — সোল রেকোগনেসন থিউরি বুঝো মাম্মা? আমাদের ইসলাম ধর্মে যেটাকে রুহের জগত বলে আক্ষা দেওয়া হয়। এই থিউরিটা এমন যেখানে দুটো আত্মা আগে থেকেই একে অপরের মাঝে আবদ্ধ থাকে,, তারা রুহের জগতে একে অপরের কাছে অঙ্গিকারবদ্ধ হয়েই পৃথিবীতে আসে। আর যখনি পৃথিবীতে এসে সেই অপর আত্মার সন্ধান পায় তখন সেই আত্মাটাকে সবচেয়ে আপন মনে হয়। সেই আত্মার মালিক বাহ্যিক ভাবে যেমনি হোক না কেনো? সুন্দর -অসুন্দর,, ভদ্র-অভদ্র,, ধনী-গরিব যাই হোকনা কেনো? তার মাঝে অপর আত্মার মালিক আটকে পরবেই। আমার মন বলে,, তুমি আর দ্বীপ রুহের জগতে সোলমেট ছিলে। তাই একে অপরের দোষ ত্রুটি জেনেও কেউ কাউকে ছাড়ার কথা কল্পনা করতে পারছো না। যা কল্পনা করতে পারোনা তা করার চেষ্টা করো কেনো মা? যা আমাদের মন দ্বারা সম্ভব না,, তা যদি ব্রেইনের প্ররোচনায় মনের উপর চাপিয়ে দেই, তখন তো মনটা যখম হবেই। মনকে কষ্ট দিও না, নিজেকে,, দ্বীপকে সময় দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে,,
,,, অর্পনা পাপ্পার বুকে মাথা হেলিয়ে দিলো, দুহাতে ঝাপ্টে ধরে বিড়াল ছানার ন্যায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে কিছুটা আফসোসের স্বরে বললো — মাম্মা আমাদের ছেড়ে কেনো চলে গেলো পাপ্পা? আমরা কি ভালো থাকতে পারতাম না? আমাদের বেলায় ভালো থাকারা এতো অধরা কেনো? আমরা কি খুব খারাপ?
,,, আরশাদ জামানের চোখ জোড়া জ্বালা করে উঠলো,, মেয়ের প্রশ্নের উত্তর থাকা সত্ত্বেও মুখ তুলে সেটা বলতে পারলেন না। সব কথা বলা যায়না,, কিছু কিছু কথা স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে দেয়।
,,, ভে,ভেলোরা,, ভেলোরা!!
,,, দ্বীপের মুখে নিজের নাম শুনে চোখ মেলে তাকালো অর্পনা, আজ বহুদিন পর তারা পাশাপাশি,কাছাকাছি তবুও কারোর কোনো কথা হয়নি। অর্পনা কেনো যেনো দ্বীপকে জিজ্ঞেস করতে পারেনি, আপনি কেমন আছেন? আর দ্বীপ ও অর্পনাকে আদুরে নামে ডেকে কোনো কথা বলেনি। তাই পাশাপাশি থাকার পরেও দুজনার মাঝে বড্ড দূরত্ব। ঘুমের ঘোরে বিরবির করতে দেখে অর্পনা হাত বাড়িয়ে দ্বীপের গাল ছুলো, পাপ্পা তো বলেছিলো রাতে উনার জ্বর আসার সম্ভাবনা আছে। সত্যি ই দ্বীপের গা বেশ গরম, অর্পনার হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুমন্ত দ্বীপ নড়েচড়ে উঠলো, অর্পনার হাতটা টেনে মাথায় রাখলো। দ্বীপের কান্ডে কিছু একটা আচ করতে পারলো সে,, অগত্যা নিজের বালিশটা সোজা করে হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে রাখলো৷ পরপর নিজে কিছুটা উচু হয়ে শুয়ে দু’হাতে আগলে নিলো দ্বীপকে। খুব পরিচিত স্থানের সন্ধান পেতেই অর্পনার বুকে মুখ গুজে দিলো দ্বীপ। অর্পনা দ্বীপের বেন্ডেজ করা হাতটা নিজের ওপরে রাখলো। অবাধ্য এবং অত্যন্ত অসভ্য দ্বীপ মির্জা অর্পনার টিশার্ট বেধ করে ক্ষরক্ষরা হাতটা নরম উদরে রাখলো,, একটা পা উপরে তুলে দিয়ে আরেকটু এগিয়ে এসে শরীরের অর্ধেকটা ভার ছেড়ে দিলো।
অযাচিত স্পর্শে কেপে উঠলো মেয়েটা। লোকটা ঘুমের ঘোরেও উল্টো পাল্টা কাজ করে বেড়ান। এতোগুলো দিনে অর্পনা মাঝেসাঝেই টের পেয়েছে সেসব,, কিন্তু রিয়্যাক্ট করেনি। কারন অতিতে সর্বদাই সে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকতো,, দ্বীপের আগ্রহে হালকা সজাগ পেলেও অভিযোগ করতে ইচ্ছা করেনি। অর্পনা গোপনে নিবৃত্তে দ্বীপকে যথেষ্ট প্রশ্রয় দিয়েছে। হয়তো দ্বীপ খেয়াল করেছে কিংবা করেনি। ভিতরটা হাসফাস করে উঠতেই অর্পনা সন্তর্পণে দ্বীপের হাতটা সরাতে চাইলো। সাথে সাথে হাতের ব্যাথায় হালকা গুঙিয়ে উঠলো দ্বীপ। অর্পনা তাড়াহুড়ো করে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলো ,, থাকুক এভাবেই। উনি তো আর জেগে নেই তাইনা? আর উল্টোপাল্টা কাজ ও করছেন না। এটুকু মেনে নেওয়াই যায়। অর্পনা হাত সরিয়ে এনে এক হাতে দ্বীপের চুল টেনে অন্য হাতে মাথা টিপে দিতে লাগলো। আড়াম পেয়ে অর্পনার বুকে আরও মিশে গেলো দ্বীপ, অর্পনা বুঝেনা বরাবর লোকটা ওর বুকেই কেনো মুখ গুজে ঘুমায়? সারাজীবন শুনে এসেছে মেয়েরা নাকি তাদের স্বামীর বুকে গুটিশুটি মেরে ঘুমায়, হাত পা তুলে দিয়ে স্বামীর ঘুমের বেঘাৎ ঘটায়, তাহলে এই লোক উল্টো কেনো? যখনি ঘুমাবে, সম্পূর্ণ চেপে ধরে হাত পা, এমনকি নিজের অর্ধ ভার তার উপর চাপিয়ে দিয়ে ওর বুকেই মুখ গুজে ঘুমাবে।
উনি কি অর্পনার বউ? নাকি অর্পনা উনার বউ? শুয়ার ধরন দেখে বুঝার উপায় নেই। আজব লোক, বিরক্ত করা ব্যাতিত কিছুই পারলো না জীবনে। দ্বীপের নামে অভিযোগ করতে করতে চোখ বুঝে নিলো অর্পনা। চুলের ভাজে অর্পনার ভারি নিশ্বাস পরতেই চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ,, ঠোঁট বাকিয়ে সুক্ষ হাসলো। দ্বীপের ঘারত্যারা বউটা বড্ড বোকা,,যাকে বলে অতিরিক্ত বোকা। মেয়েটা শুধু উপরটাই পরখ করে, ভিতরটা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনা। এইযো দ্বীপকে পরপর তিনটে গুলি করা হলো তাও এমন জায়গায় যেখানে গুলি করলে মানুষ বড়োজোর আহত হবে,, নিহত হওয়ার চান্স খুব কম। তবুও একটুখানি সন্দেহ করলো না? একটাবার ভাবলো না যে কেউ খুন করতে চাইলে অবশ্যই এমন জায়গায় টার্গেট করবে যেখানে ট্রিগার প্রেস করার সাথে সাথে খেইল খতম। বোকা বউ,, ১০ দিনের হিসেব চুকানোর বড্ড চেষ্টা করেছে তবে সফল হতে পারলো না। অসুস্থ অবস্থায় ঘুমের ঘোরে ডাকা দুটো ডাক শুনেই নিজ থেকে কাছে টেনে নিলো।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৮
এখন চাইলেও দূরে সরাতে পারবে না, একবার যখন কাছে টেনেছে, মরার আগে দূরে সরবেনা দ্বীপ,, কখনোই না,, কোনোমতেই না। দ্বীপ নাক টেনে অর্পনার ঘ্রান নিলো,, ওর ঘুমন্ত অবস্থার ফায়দা স্বরূপ কিছুটা অবাধ্য হলো। অর্পনার ঘাড়, গলা, কাধের একটা পাশ পিষ্ট হলো দ্বীপের ওষ্ঠের ধ্বংসনে। প্রতিটি মুহুর্তে ঘুমন্ত অর্পনা কেপে কেপে উঠলো। দ্বীপের চুলের ভাজে থাকা হাতের মুঠো শক্ত হলো। অজান্তেই আকরে ধরলো দ্বীপের মসৃণ চুল। খেই হাড়ালো দ্বীপ, ইচ্ছা করছে চরম অবাধ্য হতে,, সর্বোচ্চ বেপরোয়া হতে কিন্তু উপায় নেই। প্রথমত অর্পনার সম্মতি নেই, দ্বিতীয়ত অর্পনার সম্মতি নেই, এন্ড এট লাস্ট বাট নট লিস্ট অর্পনার সম্মতি নেই। যেদিন অর্পনা সম্মতি দিবে, সেদিন প্রকৃতিতে তুফান চলবে স্রেফ তুফান!!
