Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬
রুপান্জলি

মাঝে কেটে গিয়েছে চারটি বছর।
বনানী এলাকায়, ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের (পাশে বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে বিরাট কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। আর এই কনসার্ট জুরে রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের ভিড়। সবার দৃষ্টি স্টেডিয়ামের মাঝখানে একের পর এক গান করতে থাকা “”;ব্রোকেন উইংস”” ব্যান্ডের উপর, যার মধ্যমণি রকস্টার অরিন্দম সাহা এবং তার পার্টনার রকস্টার পৃথা জামান। ইতিমধ্যে দুজন মিলে ৯ খানা গান সম্পূর্ণ করেছে। গান গাইতে গাইতে পৃথা জামানের গলা শুকিয়ে আসতেই সে কাঁধ থেকে ইলেকট্রিক গিটারটা নামিয়ে রেখে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের হাত দ্বারা ইশারা করল। সাথে সাথে একজন কালো পোশাকধারী গার্ড মিনারেল ওয়াটার নিয়ে ছুটে এলো।

ইতিমধ্যে ঘেমে-নেয়ে একাকার পৃথা। গার্ড পানি নিয়ে হাজির হতেই সে ঢকঢক করে বোতলের অর্ধেকটা পানি খেয়ে নিল, পরপর ডান হাতে ঢেলে দিল বাকি পানিটুকু। পানির ছোঁয়া পেতেই হাতটা কেমন সতেজ হয়ে উঠল। নীল রগগুলো সহসাই ফুলে-ফেঁপে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দেখাল। পৃথা বোতলখানা নিচে ফেলে তা পা দিয়ে পিষে আবারও এগিয়ে অরিন্দমের পাশাপাশি দাঁড়াল। গিটারটা কাঁধে তুলে নিয়ে গার্ডকে ইশারায় চলে যেতে বলতেই গার্ডটি কুর্নিশ জানিয়ে চলে গেল। গার্ড চলে যেতেই পৃথা তার ব্যান্ড গ্রুপের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে গান শুরু করতে ইশারা করল। সাথে সাথে তারা যন্ত্রে টুংটাং শব্দ তুলে ধীরে ধীরে তার মাত্রা বাড়িয়ে দিল। মুহূর্তেই নানান যন্ত্রের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। পৃথার হাতও থেমে থাকল না। আবারও জোরদার গতিতে ইলেকট্রিক গিটারে নিজের দক্ষতার ছাপ ফেলার কাজে মত্ত হলো। অর্পনার একটা বদ অভ্যাস রয়েছে। সে চোখ খোলা রেখে গান গাইতে পারে না। গানের প্রথম অংশে টান বসাতেই আপনা-আপনি চোখ বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই পর্যায়ে কিছুটা ব্যতিক্রম হলো। সে যখনই ঠোঁট নাড়িয়ে গাইতে যাবে, তখনই লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে তার নজর স্থির হলো স্টেডিয়ামের এক কোণায় বসে থাকা তিনটা মেয়ে আর দুটো ছেলের দিকে। ছেলে দুটোর মধ্যে একজন অন্যজনের কাঁধে হাত দিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই ছেলেটির কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে পাশে বসা মেয়েটি। সেই মেয়েটির কাঁধে মাথা রেখেছে তার পাশে বসা মেয়েটি, আবার সেই মেয়েটির কাঁধে মাথা রেখেছে সর্বশেষ মেয়েটি। হুট করেই পৃথার হাতের গতি কমে এলো। চোখের সামনে ভেসে উঠল পঞ্চমূর্তির প্রতিটি রূপ। ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে এলো তার হাত। গিটারে হাত চালানোর শক্তি পাচ্ছে না। পৃথাকে থেমে যেতে দেখে ব্যান্ডের সবাই থেমে গেল। সাথে সাথে শুরু হলো জনতার চিৎকার-চেঁচামেচি। এমন একটা মুহূর্তে ব্যান্ড থেমে যাওয়ায় উত্তেজিত হয়ে পড়েছে অনেকেই।

তবে “ব্রোকেন উইংস” ব্যান্ডের মাঝে সেসবের রেশ দেখা গেল না। তারা বর্তমানে অর্পনাকে নিয়ে চিন্তিত।অরিন্দম পৃথার কাঁধে হাত রেখে বিচলিত কণ্ঠে শুধাল— আর ইউ ওকে, পৃথা?
পৃথা বেশিক্ষণ নিজের সংযম ধরে রাখতে পারল না। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল স্টেজের উপর। সাথে সাথে অরিন্দমও বসে পড়ল পাশাপাশি। ফের কাঁধে হাত রেখে কিছু বলতে নেবে, তখনই স্টেজের দিকে ছুটে এলো একটা সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা মেয়ে। পরনে বাদামী কালারের শার্ট আর হোয়াইট প্যান্ট। শার্টের সাথে প্যান্ট ইন করা। এই বয়সেই চুল বেশ লম্বা হয়েছে, একদম পিঠ ছাড়িয়ে কোমর পর্যন্ত। বর্তমানে সেসব কার্ল করার ফলে পিঠ পর্যন্ত পৌঁছেছে। হাতে সিলভার ওয়াচ। বাম পকেটে খেলনার রিভলভার। ঠিক যেন আরও একটা দ্বীপ জোহান মির্জা।
— প্রকৃতি!!

চলতি পথে হুট করেই আরাফাত মামুর ডাক শুনে থেমে গেল প্রকৃতি। মামুর দিকে তাকাতেই মামুকে এগিয়ে আসতে দেখে পকেট থেকে টেনে-টুনে খেলনার রিভলভারটি বের করল। মামুর দিকে সেটা তাক করে রিভলভার নাড়িয়ে জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ইশারা করল, নয়তো এখানেই শুট।
,,,এতক্ষণ সবার দৃষ্টি রকস্টার পৃথা জামানের নিকট থাকলেও বর্তমানে তাদের মেইন আকর্ষণ স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট প্রকৃতির উপর, যে বাবার মতো সুকৌশলে মামুকে হুমকি দিতে ব্যস্ত। প্রকৃতির মুভমেন্ট, মুখভঙ্গি, রিভলভার ধরার কৌশল দেখে অনেকেই ফোন বের করে ভিডিও করতে ব্যস্ত। এতক্ষণ গান শুনতে শুনতে যারা ক্লান্তিতে মিইয়ে গিয়েছিল, তারাও প্রকৃতির কাণ্ডে চনমনে হয়ে উঠল। ইশারায় মামুকে হুমকি-ধামকি দেওয়া শেষ হলে মায়ের কাছে ছুটে গেল প্রকৃতি। মায়ের পাশে অরিন্দমকে বসে থাকতে দেখে তার দিকে রিভলভার তাক করে বলল—
— এই যে, অলিদম! দূলে ছলো। আমাল পাপ্পাকে ছিনো তুমি? এতা আমাল পাপ্পাল পুপাতি (প্রোপার্টি)। ছলো, ছলো, দূরে যাও।

অরিন্দম ছোট্ট প্রকৃতির দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। সমানে মেয়েটার নাকের পাটা ফুলে-ফেঁপে উঠছে, যেন অরিন্দমের প্রতি ভীষণ নারাজ সে। মেয়েটার মুখভঙ্গি দেখে ঠোঁট টিপে হাসল অরিন্দম। — সরব না, কী করবে? এই খেলনার রিভলভার দিয়ে আমাকে শুট করবে?
প্রকৃতি এবার অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। চোখ দুটোতে যেন আগুন ঝরছে। কত বড় সাহস এই ছেলের! তার রিভলভারকে খেলনার রিভলভার বলে! মেয়েটার চোখ দুটো একদম বাবার মতো হয়েছে— ধূসর রঙা বিড়াল চোখ। এই চোখের হিংস্রতা দেখে অরিন্দম ফের ঠোঁট টিপে হেসে দূরে সরে গেল। দ্বীপ মির্জার মেয়ে একেবারেই বাবার মতো হয়েছে। নাহ! বাবার মতো হয়েছে বললে বোধহয় ভুল হবে। এই বিষয়টা বড্ড গোলমেলে। একদিক থেকে দেখতে গেলে মেয়েটা বরাবর তার পাপ্পাকে ফলো করে। পাপ্পার ড্রেসআপ থেকে শুরু করে লাইফস্টাইল সবটাই পাই টু পাই কপি করে চলে। অপরদিকে দেখতে গেলে এই স্বভাবটা অর্পনার। অর্পনা যেমন আরশাদ জামান বলতে অজ্ঞান, তেমনি প্রকৃতিও পাপ্পা বলতে অজ্ঞান। তাই ঠিক করে বলা যায়না মেয়েটা আসলে কার মতো হয়েছে বা হতে চায়।

,, মেয়েটা এই বয়সেই অনেক কিছুই বুঝে। পাপ্পা তাকে ধীরে ধীরে সবটা বুঝিয়েছে। মাম্মা সিক, মাম্মাকে সবসময় আদরে রাখতে হবে, মাম্মার সামনে কান্নাকাটি করা যাবে না, মাম্মাকে মেন্টাল প্রেসার দেওয়া যাবে না। এমনকি মেন্টাল প্রেসার সম্পর্কেও ধারণা হয়ে গিয়েছে তার। সেই সাথে মাম্মা তার পাপ্পার ভালোবাসা, অর্ধাঙ্গিনী, প্রোপার্টি, কোনো মতেই কোনো পুরুষকে মাম্মার আশেপাশে আসতে দেওয়া যাবে না। এসব কথাও তার মাথায় সুন্দর করে সেভ করে দিয়েছে দ্বীপ।
,,, এই তো বছর তিনেক আগের কথা। হুট করেই একদিন অরিন্দম নামক একটা ছেলে তার দলবল নিয়ে মির্জা বাড়িতে এলো। সে কিভাবে কিভাবে যেন জেনেছে অর্পনা জামান আর পৃথা জামান একই ব্যক্তি। সহসাই অর্পনার সাথে দেখা করে একসাথে গান করার আবদার জুড়ে দিল ছেলেটা। অর্পনা প্রথমে রাজি ছিল না, তবে বাড়ির সবাই মিলে যখন জোর-জবরদস্তি করল, তখনই নিজেকে প্রকাশ করল সে। অরিন্দম ও তার দলবলকে নিয়ে একটা ব্যান্ড বানাল। নাম রাখল “”;ব্রোকেন উইংস”” আগে অরিন্দম ও তার ব্যান্ডকে মানুষ খুব একটা না চিনলেও, যবে থেকে পৃথা জামান এসে যুক্ত হয়েছে, তবে থেকেই তাদের নামডাক বাড়তে থাকল। ধীরে ধীরে তাদের নামডাক বাড়তে বাড়তে বর্তমানে পুরো বাংলাদেশের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছে তারা। তবে যখন থেকে অর্পনা অরিন্দম ও তার ব্যান্ডের সবাইকে নিয়ে “”;ব্রোকেন উইংস “”-এর পথচলা শুরু করেছে, তখন থেকেই অরিন্দমকে পছন্দ না দ্বীপের। ছেলেটা অর্পনার থেকে গুনে গুনে তিন বছরের ছোট। বয়স ২৫। তবুও দ্বীপ অর্পনার পাশে ওকে মানতে পারে না। দেখলেই কেমন ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায়, দূরে দূরে থাকতে বলে। অর্পনাও মেনে চলে সেসব।

দ্বীপ বর্তমানে কুয়াকাটায় আছে। যেহেতু তাদের কনস্ট্রাকশনের বিজনেস, তাই ম্যাক্সিমাম প্রজেক্ট ট্যুরিস্ট এলাকাগুলোতেই থাকে। সে যখন জানতে পেরেছে আজ “”ব্রোকেন উইংস”” -এর একটা বড় কনসার্ট রয়েছে, তখনই মেয়েকে পাহারাদার হিসেবে পাঠিয়ে দিয়েছে দ্বীপ। যেনো এখানে ঘটা প্রতিটি ঘটনা পাই টু পাই বাবার কাছে বলতে পারে মেয়েটা।
অরিন্দম দূরে সরে যেতেই প্রকৃতি ছোট ছোট হাতে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। এই চারটা বছরে অর্পনার জীবনটা পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে। সাথে মেন্টাল অবস্থাও আরও জঘন্য রূপ নিয়েছে।এই চার বছরে অর্পনা কবে হেসেছিল, সেই বিষয়ে দ্বীপেরও ধারণা নেই। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে। মাঝরাতে উঠে হুট করেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদে। ইদানীং হ্যালুসিনেশনের মাত্রাটাও বেড়েছে। সে কল্পনায় হুটহাট বন্ধুদের সাথে আড্ডা সাজায়, কত কত কথা বলে। সেসব চুপচাপ দেখা ব্যতীত দ্বীপের আর কিছুই করার থাকে না। এখনও পর্যন্ত অনেক সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়েছে দ্বীপ, কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হয়নি। আগে তো অর্পনা কাউকে আপন মনে করত না, ইদানীং সে মানতেই চায় না যে সে অসুস্থ। কৌশল করা ব্যতীত ঔষধও খাওয়ানো যায় না। জোরপূর্বক কাউন্সেলিংয়ের জন্য নিয়ে গেলেও হাসপাতালে ভাঙচুর করে নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।এমতাবস্থায় লুকিয়ে-চুরিয়ে চিকিৎসা করানো ব্যতীত কোনো রাস্তা নেই। কথায় আছে না? আল্লাহ চাইলে মানুষ ধ্বংসের শেষ প্রান্ত হতেও ফিরে আসে। দ্বীপ সেই আশাতেই আছে। আল্লাহ চাইলে হয়তো তাদের আদর-ভালোবাসায় অর্পনা একদিন ঠিক হয়ে যাবে। আর কখনো পাগলামি করবে না। একদিন না একদিন সে ঠিক তাদেরকে আপন ভাবতে শুরু করবে।

সেই মনোভাব থেকেই মেয়েকে ধীরে ধীরে সবটা বুঝিয়েছে দ্বীপ। প্রকৃতির হাতের স্পর্শ পেয়ে মাথা তুলে তাকাল অর্পনা। মেয়েটার ধূসর রঙা বিড়াল চোখের দিকে তাকিয়ে আনমনেই বলে উঠল—
— একদম বাপের মতো হওয়াটা খুব প্রয়োজন ছিল?
প্রকৃতি কেমন নাক কুঁচকাল। পরপর নিজের নাকের দিকে আঙুল তাক করে বলল— এদ্দম পাপ্পাল মতো না। নাকতা তোমাল মতো বুছা হয়েছে।
অর্পনা বিনিময়ে কিছু বলল না। তবে অরিন্দম হেসে ফেলল। প্রকৃতি সেসবের পাত্তা না দিয়ে ছোট ছোট হাতে মায়ের চোখ মুছে গালে হাত বুলিয়ে দিল। পরপর গালে চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরল। মা-মেয়ের আলাপচারিতার মাঝেই অরিন্দম প্রকৃতির দিকে ঝুঁকে এলো। ওকে ক্ষেপানোর জন্য কিছুটা নরম স্বরেই বলল— এই যে পিচ্চি! তোমার পাপ্পাকে বলো, অলিদ্দম তোমার মাম্মাকে বিয়ে করে নিয়েছে।
সাথে সাথে শুট করার শব্দ হলো। প্রকৃতি এক হাতে মাকে জড়িয়ে রেখে অন্য হাতে অরিন্দমকে খেলনার রিভলভার দিয়ে গুলি করে চিৎকার করে ডাকল—

— আলুদ্দমেল বাচ্ছা!!
মুহূর্তেই ধমকে উঠল অর্পনা— প্রকৃতি! আঙ্কেলের নাম নিতে হয় না। যাও, মামুর কাছে যাও। মাম্মা কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি।
বলেই প্রথম সারিতে বসে থাকা আরাফাতকে ইশারা করল। আরাফাত উঠে এসে স্টেজের কাছে পৌঁছাতেই প্রকৃতি অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে দুই আঙুল দিয়ে একবার নিজের চোখ, আরেকবার অরিন্দমের চোখে ইশারা করে বুঝাল— পরবর্তী হিসাবটা সামনাসামনি হবে। অরিন্দম ফের হেসে ফেলল। মেয়েটাকে ক্ষেপাতে তার ভীষণ ভালো লাগে। এমন নয় যে আজ প্রথম অরিন্দমকে অর্পনার নিকটে দেখে রিয়্যাক্ট করেছে প্রকৃতি। বরং যখনই তাদের পাশাপাশি দেখে, বাবার চেয়েও কঠিন রিয়্যাকশন দেয় সে। প্রকৃতিকে নিয়ে আরাফাত চলে যেতেই উঠে দাঁড়াল অর্পনা। লম্বা লম্বা দুটো শ্বাস নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল—

— এতক্ষণ আপনাদের বিলম্বনায় ফেলার জন্য আমি দুঃখিত। হুট করেই কিছু বেইমানদের কথা স্মরণে আসায় উইক হয়ে পড়েছিলাম। এরকম বেইমান হয়তো আপনাদের অনেকের জীবনেই রয়েছে, যারা কখনো ছেড়ে যাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখেনি। লাস্ট সংটা আপাতত তাদের নামেই হোক।
,,, মুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠল সবাই। অরিন্দম বোধহয় জানত অর্পনার কণ্ঠ ফুঁড়ে এখন কোন গানটা বের হবে। তাই সে কাঁধ থেকে ইলেকট্রিক গিটারটা রেখে বাকি আটজনের পাশাপাশি বসে পড়ল। অর্পনাও রেখে দিল তার কাঁধের গিটারটা। আবারও গার্ডদের দিকে ইশারা করতেই গার্ড অর্পনার পার্সোনাল আগর কাঠের গিটারটা নিয়ে এলো। অর্পনার চিকন-চাকন গড়নে ফ্রি সাইজের টি-শার্ট আর জগার্স। তার দেহের গঠন কিংবা মুখভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই তার বয়স বর্তমানে ২৮ চলছে। অর্পনা গিটারটা কাঁধে তুলে নিয়ে টুংটাং শব্দ করে গিটারে সুর তুলল। ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো—
,, আমার ফটো কপি করা সিট,, আমার বাসের লাস্ট সিট।
আমার ক্রেচ পরে যাওয়া চশমার কাচ সাইনোফাইকিট ইট

আমার চিনি বেশি দেওয়া চা, আমার ফোনে যান্ত্রিক মা,
আমার পকেট বাচানো ঢিম ভাজা ভাত মুখে হাসি বুকে ঘা।
আমার অমনোযোগী ক্লাসরুম, আমার মগজে নষ্ট ধুম,
আমার বাহিরে যুদ্ধ ভিতরে হিটলার লাশের মোড়কে ঘুম।
মেঘদল ও খুব ভালো আমার আর্টসেল ব্লাক শিরোনামহীন হাসি মুখে ছিলো।
,, আমার ধুলো বালি জমা বই,, আমার বন্ধুরা সব কই?
,, আমার ভাল্লাগে না এই মিথ্যে শহরে রাতের আড়ালে রই।

মির্জা বাড়িতে জোরদার গতিতে বিয়ের আয়োজন চলছে। দুদিনের মাথায় পরশীর বিয়ে। এই চার বছরে সবার সাথে সাথে পরশীর মাঝেও বেশ পরিবর্তন ঘটেছে। চঞ্চল পরশী এখন গম্ভীর ও বাস্তববাদী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সে বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। কিশোর বয়সে পল্লবের প্রতি একতরফা ভালোবাসা থাকলেও ইদানীং তার মাঝে সেই ভালোবাসাময় অনুভূতিগুলো টের পাওয়া যায় না। অগত্যা বিয়ের বয়স হওয়ায় পারিবারিকভাবেই আব্রাহামের সাথে পরশীর বিয়ে ঠিক করা হয়।আব্রাহাম ছেলেটা খুব ভদ্র। যদিও আব্রাহাম আর পরশীর বয়সের বিশাল ফারাক রয়েছে, তবে পরশীর প্রতি আব্রাহামের একতরফা ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়েছে দ্বীপ। এই তো মাস ছয়েক আগের কথা, পরশীসহ দ্বীপ, বিহান, মেধা ও অর্পনাকে প্রাইভেট রেস্টুরেন্টে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আব্রাহাম। অর্পনার মন-মেজাজ, শরীর ভালো না থাকায় বাকিদের নিয়ে হাজির হয়েছিল দ্বীপ। সেদিন ছেলেটা একটা অদ্ভুত কাজ করেছিল। দ্বীপ আর বিহানকে অবাক করে দিয়ে তাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছেলেটি অনুনয়ের স্বরে বলেছিল— “Will you be my brother-in-law?”

দ্বীপ আগে থেকেই জানত আব্রাহাম পরশীকে পছন্দ করে। একটা সময় ভেবেছিল, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে পল্লবকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পরশীর ইচ্ছেটুকু পূরণ করবে। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল, এরকমটা তো কারোরই ধারণা ছিল না। কতো প্রাণোচ্ছল একটা বন্ধুত্ব অকালেই ঝরে গেল। রাত্রি মারা যাওয়ার পর সেই পঞ্চমূর্তির সম্পর্কটাও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যায়। এখন শুধু ইরাদ ব্যতীত অর্পনার কাছে আর কেউ নেই। রাত্রি মারা যাওয়ার পর অরুণ তীব্র অসুস্থতায় ভোগে, বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে, পাগলামি করে বিদায় অরুণের বাবা-মা জোর করে অরুণকে তার মামাদের কাছে ইতালি পাঠিয়ে দেয়। সেখানেই আপাতত আছে সে। একবারও দেশে ফিরেনি, কারও সাথে যোগাযোগ পর্যন্ত করে না ছেলেটা। কেন করে না, জানা নেই।
এই তো বছরখানেক আগে শেষবার যখন দ্বীপ অরুণের খোঁজ করেছিল, তখন জানতে পেরেছিল— অরুণের বাবা-মা নাকি জোর করে তাকে তার মামাতো বোনের সাথে বিয়ে দিয়েছে। সে নিয়ে অরুণ খুব বাজে ভাবে সু*ইসাইডের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল বলে বেঁচে যায়। এখন অরুণ কোথায় আছে, কেমন আছে, কী করছে, সেই সম্পর্কে কারও ধারণা নেই। অন্য দেশে গিয়ে নতুন সিম নেওয়ায় ইরাদ কিংবা অর্পনা কেউই নিজ যোগাযোগ করতে পারেনি। সেই সাথে অরুন তার ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, সব প্ল্যাটফর্মই ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিয়েছে। যার পল স্বরুপ তার সাথে কারোরই যোগাযোগ নেই।

,,,, ইরাদের এখন বেশ উন্নতি হয়েছে। নিজে রোজগার করে বর্তমানে একটা নিজস্ব বড় আর্ট গ্যালারি তৈরি করেছে। সেখানে সাতজন নিজস্ব কর্মচারী রেখেছে, যাদের মাসিক বেতন ৯–১৫ হাজার টাকা। আশা করা যায়, ধীরে ধীরে তার অবস্থার আরও উন্নতি ঘটবে।
এই চার বছরে অবস্থার উন্নতি ঘটলেও ইরাদের জীবন থমকে আছে সেই পাঁচ বছর আগেই। বয়স সাতাশ পেরিয়ে আটাশে পৌঁছালেও মেয়েটা বিয়ে করেনি। আরশাদ জামান বহুবার চেয়েছেন মেয়েকে বিয়ে দিতে, কিন্তু ইরাদের এক কথা, সে বিয়ে করবে না। আরশাদ জামান কখনোই মেয়েদের উপর জোর-জবরদস্তি করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। এবারেও দিলেন না। মেয়ে বাবা-মায়ের কাছে সারাজীবন থাকতে চাইলে থাকুক এতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। মেয়ে বলায় আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। ইরাদের অবস্থার উন্নতি হলে নিজের মতো ফ্ল্যাট নিয়ে দূরে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও রাত্রি মারা যাওয়ার পর সুহাসিনীকে একা ফেলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কথা ছিল মাকে নিজের কাছে এনে রাখবে, তাও সম্ভব হয়নি। শত্রু পক্ষের আক্রমণে ইরার বাবা ইমানুয়েল সওদাগর আজীবনের জন্য প্যারালাইজিজ্টে আক্রান্ত হোন। খবর শুনে ইরাদ দেখতে গিয়েছিল তাকে, কিন্তু চাচারা কিংবা ভাইয়েরা কেউই ওকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি, উল্টো মারধর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। লুকিয়ে একবার মায়ের সাথে দেখা করেছিল সে। মা জানায়, তিনি অসুস্থ স্বামীকে ফেলে তার কাছে আসবেন না। হয়তো লোকটা জানোয়ার ছিল, কোনোদিন তাকে সম্মান দেয়নি, অকথ্য অত্যাচার ও মারধর করেছে; তবুও লোকটা তার স্বামী। এতগুলো বছর তিনি উনার ছায়াতলে ছিলেন। তাই সেই ছায়া তল থেকে বের হতে পারবেন না। এরপর আর কি? কিছুই না। আরও একবার নিজের জীবনের উপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঢাকায় ফিরে আসে ইরাদ। আপাতত তার কাছে মা-বাবা বলতে আরশাদ জামান আর সুহাসিনী আন্টিই। তাদের হয়তো সরাসরি বাবা-মা ডাকা হয় না, কিন্তু অন্তরের অন্তস্তল থেকে ইরাদ তাদেরই বাবা-মাই মনে করে।

,,, পরশীর বিয়ে উপলক্ষে অনেক আত্মীয়স্বজন মির্জা বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে। এদের মধ্যে সুহাসিনী আর ইরাদও রয়েছে। অর্পনার মর্জি রাখতে পরশীর বিয়ের জন্য পুরো এক সপ্তাহের জন্য আর্ট গ্যালারি বন্ধ রেখে সুহাসিনীকে নিয়ে মির্জা বাড়িতে চলে এসেছে ইরাদ। সবকিছু মিটমাট করতে গিয়ে শরীর ক্লান্ত থাকায় দুপুরের পর একটু ঘুমিয়েছিল,, এখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হতে চলেছে। কিছুক্ষণ আগেই পরশী তাকে ডেকে গিয়েছিলো। কিন্তু ঘুমে আচ্ছন্ন থাকায় সহজে উঠতে পারেনি ইরাদ। এখন ধীরে ধীরে উঠে বসলো।গায়ে উড়না জড়াতেই লাফাতে লাফাতে ঘরে এলো প্রকৃতি আর অরণ্য। যাদের সবাই বাড়িতে “ফরেস্ট” আর “ন্যাচার” বলে ডাকে। এই ডাকগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল অর্পনার মুখ থেকে, অথচ এখন আর এদের সেই নামে ডাকে না মেয়েটা।
,,বর্তমানে মির্জা বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক দুই মুরব্বিকে দেখে ইরাদ ভ্রু কুঁচকে নিল। দুজনকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল— “কি ব্যাপার? আমার ঘরে হঠাৎ ন্যাচার আর ফরেস্টের আগমন? কিছু হয়েছে?”

,,,সাড়ে চার বছরের অরণ্যের চোখ-মুখ গম্ভীর। সে দেখতে কিছুটা বাবার মতো হলেও স্বভাবে বড় বাবার মতো জেদি, গম্ভীর ও নির্লিপ্ত হয়েছে। অপরদিকে প্রকৃতি হয়েছে তার বিহান পাপ্পার মতো বহুরূপী। কখনো চঞ্চল, কখনো গম্ভীর, কখনো মারমুখী; মাঝেমধ্যে বাবার মতো হুমকি-ধমকিও দেয়। প্রিয় মানুষদের কাছে সে আবার বড্ড আদুরে। অরণ্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রকৃতি কোনো উত্তর না করে ইরাদের হাত টেনে ধরে বলল— ইলা মাম্মা!! ইউ নো? আমাল আলেকতা নিউ মামু এছেছে। কুব ছুন্দ (সুন্দর)। পছি মাম্মা আল মেদা মাম্মাও দেকেছে। আছো, তোমাকে দেকাই।
বলতে বলতে সে ইরাদের হাত টেনে ধরল। সদ্য ঘুম থেকে ওঠায় ইরাদকে বড্ড এলোমেলো দেকাচ্ছে। চুলগুলো উস্কোখুস্কো, পরনের জামা কুঁচকে আছে, চোখেমুখে এখনো ঘুমের রেশ। এ অবস্থায় অচেনা লোকের সামনে যাওয়া কেমন দেখায়। ভাবতে ভাবতেই ইরাদ নরম স্বরে বলল— “একটু অপেক্ষা করো মা, আমি মাথাটা আঁচড়ে নেই।”
কিন্তু বাধা দিল অরণ্য। ইরাদের অন্য হাতটা খপ করে ধরে বলল— “নো নিড আন্টি! তোমাকে এভাবেই সুন্দর লাগছে।”

বলতে বলতে সেও ইরার হাত ধরে টানতে থাকলো,, এই পর্যায়ে আর কোনো উপায় পেলো না মেয়েটা। এখন আবার না করে দিলে প্রকৃতি গাল ফুলিয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকবে। কেউ ধরতে গেলে আকাশ বাতাস কাপিয়ে কান্না করবে। যতক্ষণ না অর্পনা এসে ওকে টেনে তুলবে ততোক্ষণ জোর খাটিয়ে এখানেই পরে থাকবে। মেয়েটার এই একরোখা হওয়ার পিছনে বাবা মা দুজনেরি অবধান শীরধার্য। দুজন একরোখার ঘরে একরোখা প্লাস হবে এটাই স্বাভাবিক। অগত্যা দুই ছেলে মেয়ের পিছন পিছন ছোটলো ইরাদ। সে বর্তমানে পারশীর ঘরে থাকছে,, এখানে এলে সে পরশীর সাথেই থাকে। আরন্যক আর প্রকৃতি পরশির রুম পেরিয়ে আরও দুই ঘর সামনে যেই রুমটা আছে সেখানে গিয়ে থামলো। টানতে টানতে ইরাদকে রুমে এনে বিছানায় বসে ফোন স্ক্রল করতে থাকা যুবককে দেখিয়ে বললো ,,, মিত মাই ছিদ মামু। ছিদ মামু!! এতা আমাল ইলা মাম্মা। হাই বলো,,

,, প্রকৃতির কন্ঠে ফোন থেকে চোখ তুলে তাকালো মানব। কাঙ্ক্ষিত- অনাকাঙ্ক্ষিত এই সাক্ষাৎ এ দুজনেই কেমন থমকে গেলো। ইরাদ কেমন বোকা বনে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে,, সিডের নজর ও ইরার দিকেই স্থির। সেই চিরচেনা সাদা পোষাক পরা মেয়েটাকে বড্ডো এলো মেলো লাগছে,, উস্কখুষ্ক চুল, সদ্য ঘুম থেকে উঠার ফলে ফুলো ফুলো চোখ, মুখো গেলে থাকা থুবড়ে থাকা ব্যাডসিটের দাগ, মেয়েটা বোধয় উপুড় হয়ে ঘুমিয়েছিলো যার দরুন অধর যুগল টকটকা লাল রং ধারন করেছে। পাঁচ বছর আগের ইরাদ আর এখনকার ইরাদের মাঝে বিস্তর ফারাক। মেয়েটা আগে কিছুটা গলুমলু ছিলো তবে এখন শরীরের হাড় পর্যন্ত গুনা যাবে হয়তো। রাত জাগার ফলে নাকি অতিরিক্ত চিন্তায় চোখের তলানিতে ডার্ক সার্কেলের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে এই রুপে মেয়েটাকে খুব একটা মন্দ লাগছে না বরং তৃষ্ণার্থ সিডের বহুদিনের তৃষ্ণা লাঘব হচ্ছে ধীরে ধীরে। এক ভাবে তাকিয়ে থাকা দুটো ভিন্ন ধর্মি মানুষের ধ্যান ভাঙিয়ে আরন্যক বললো —

,,, কি হলো আন্টি? স্যা হাই!!
,,, আরন্যকের কন্ঠে দুজনার চেতনা ফিরলো,, সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলো ইরাদ তবে সিদ্বার্থ এখনো অটল চাহনিতে ইরার দিকে তাকিয়ে। ইরা এদিক ওদিক তাকিয়ে বাচ্চা দুটোকে কিছু বলবে তার আগেই সিদ্বার্থ আকুল কন্ঠে সুধালো — কেমন আছেন ইরাদ?
,,, বহুদিন পর পরিচিত কন্ঠস্বর কর্নকূহর ব্যাধ করতেই সিদ্বার্থের দিকে তাকালো ইরাদ,, প্রকৃতির হাত খানা ছেড়ে থুতনিতে জমা ঘাম টুকু মুছে নিয়ে, নরম স্বরে উত্তর করলো — ভালো, আপনি?
,,, সিদ্বার্থ ঠোট হেলিয়ে হাসলো — যেমন থাকার কথা ছিলো।

,,, ইরাদ ফের চোখ সরালো,, অকারনেই তার কান্না পাচ্ছে,, কেনো পাচ্ছে জানা নেই। এতগুলো বছর পর এখানে কেনো এসেছেন উনি? ইরাদকে মানাতে? কিন্তু ইরাদ যে মানবে না। পরপর এতোবার ঠকানোর পর কোনোভাবে কি এই মানুষটাকে ক্ষমা করা যায়? নাহ!! একদমি যায়না। ইরাদের ভাবনার মাঝেই ওয়াসরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো,, সেখান থেকে চুল মুছতে মুছতে বেড়িয়ে এলো সদ্য গোসল করা এক রমনি। পরনে টপ্স আর জিন্স,, চুলগুলো ভেজা চুপচুপা। মেয়েটা বোধহয় ইরাদকে এই মুহুর্তে এখানে আশা করেনি,, দেখেই কেমন ভ্রু কুচকে নিলো। ইরাদের কি হলো কে জানে? সে মেয়েটার অবস্থান আর ভেজা চুল দেখে সিদ্বার্থের দিকে তাকালো,, সিদ্বার্থের ও চুল ভেজা। পরনে হাফ হাতা ওভার সাইজ টিশার্ট আর ট্রাওজার। এখনো চুলের পানিতে টিশার্টের উপরের অংশ কিছুটা ভিজে আছে। ইরাদ মেয়েটির দিকে ইশারা করে কেমন চট করেই বলে বসলো — আপনার ওয়াইফ? আপনি বিয়ে করেছেন?
,,, সিদ্বার্থ কিছু বলার আগেই মেয়েটি উত্তর করলো– নাহ!! আমি ওর ফিয়ন্সি,, কিছু মাস পরেই বিয়ে করবো। আপনি কে? এভাবে প্রশ্ন করছেন কেনো? সিডকে আগে থেকেই চিনেন?

,,, এই প্রশ্নের বিপরীতে কি বলবে ভেবে পেলো না ইরাদ। সে কি সিডকে চিনে? নাকি সিডের সবটা জানে? সবটাই জানে বোধহয়,, লোকটা কি খেতে পছন্দ করে, কি করতে ভালোবাসে, জুতার সাইজ থেকে শুরু করে শার্টের সাইজ সবটাই তো তার জানা। কিন্তু এই মুহুর্তে বোধহয় সেটা বলা ঠিক হবে না। ইরাদ কতো টা বোকা, সে ভেবেছিলো সিদ্বার্থ বোধহয় তার মান ভাঙাতে এসেছে। অথচ দেখো!! ইরাদ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দীর্ঘ শ্বাস গোপন করে আরন্যকের হাত ছেড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে নিলো তখনি পিছন থেকে ডাকলো প্রকৃতি — কোতায় যাও ইলা মাম্মা? মামুকে দেখবে না?
,,, ইরাদ কিছুটা থামলো তবে পিছু ফিরে তাকালো না। সে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে বললো — তোমার মামু এখন বিজি মা,, পরে কথা বলবো। তোমরা থাকো এখানে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৫)

,,, আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বেড়িয়ে গেলো ইরাদ। সিদ্বার্থ এখনো দরজার পানে তাকিয়ে,, মেয়েটা ঝড়ের গতিতে এলো, তার মনে উত্থাল পাত্তার ঝড় তুলে দিয়ে আবার বেড়িয়ে গেলো। আচ্ছা,, সিদ্বার্থের বিয়ের কথা শুনে ইরাদের কি একটু মন খারাপ হলো? কষ্ট পেয়েছে কি? চাহনি আর কথা বার্তা তো তাই বললো। তবে সিদ্বার্থের কেনো যেনো বিশ্বাস হচ্ছেনা। ইরাদ কখনোই তার জন্য কষ্ট পাবেনা,, অভিমান করা তো দূর। ওয়াসরুম থেকে বেড়িয়ে আসা মেয়েটি এবার এগিয়ে এসে সিডের পাশে দাড়ািয়ে নরম কন্ঠে সুধালো — এটা কি রুমজাহিন ইরাদ?
,,, সিদ্বার্থ তপ্ত শ্বাস ফেলে শায় জানালো। মেয়েটা বিনিময়ে আর কিছু বললো না, সে আয়নার দিকে এগিয়ে গিয়ে চুল মুছায় ব্যাস্ত হয়ে পরলো।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here