৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি শেষ পর্ব
রুপান্জলি
রাত ২টা ২৭ মিনিট।
,,, এই প্রথম বারের ন্যায় জয়পুরহাটে পা পড়লো অপরাজিতা হামিদের। গত সাড়ে চার বছরের দোটানা কাটিয়ে বেইমানদের সাথে দেখা করতে এসেছে আজ। ফুল স্পিডে বাইক চালিয়ে আসার দরুন শীতের তোপে শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। তবুও সে নিয়ে ভাবান্তর হলো না মেয়েটার। এমনকি গায়ে একটা হাফহাতা ওভারসাইজ টি-শার্ট আর জগার্স ব্যতীত শীত নিরাময়ের উপাদান হিসেবে একটা সুতোও নেই। দৃষ্টি কেমন নিশ্চল, শূন্য, ভাবাবেগহীন, যেন এই দুনিয়ার নিয়ম-নীতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই তার।
অপরাজিতা বাইক থেকে নেমে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে গোরস্থানের দিকে তাকালো। লাল ইটে মুড়ানো, রঙিন আস্তরণে তৈরি করা গোরস্থানটির নাম ইস্কে মোহাব্বত।
গোরস্থানের চারপাশে ঘিরে রয়েছে নানা জাতের ফুল, গাছ, যার মধ্যে কিছু গাছে শীতকালীন ফুলও ফুটেছে। সেই ফুলের ঘ্রাণ এসে নাকে ঠেকতেই অপরাজিতার ভিতরটা কেমন ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো। অদেখা বাবা, মা আর বোনের জন্য বুকের বাম পাশে কী যে যন্ত্রণা হলো, এটাকেই বুঝি রক্তের টান বলে? নয়তো বেইমানদের সাথে দেখা করবে না, করবে না বলেও মেয়েটা কী করে চলে এলো এই জয়পুরহাটে? এই তো, এখানটাতেই তিনটে বেইমানের বসবাস, যারা চাইলেই অর্পনার জীবনে থেকে যেতে পারতো, কিন্তু থাকেনি। কোনো না কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে ছেড়ে গিয়েছে তাকে। অর্পনা ভঙ্গুর পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে। অর্পনাকে দেখে সতর্ক হলো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন গার্ড। একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো — কিছু হয়েছে, ম্যাম? আপনি হঠাৎ এখানে?
,,, অর্পনা চোখ উঁচিয়ে গার্ডটাকে দেখলো। ঝাপসা চোখে এতক্ষণ এদেরকে খেয়ালই করেনি। অর্পনাকে অস্বাভাবিক হারে কাঁপতে দেখে গার্ডটি সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললো — ম্যাম!! স্যার আসেনি? আপনাকে দেখে ভীষণ অসুস্থ মনে হচ্ছে। একটু অপেক্ষা করুন, গরম জামাকাপড় দিচ্ছি।
,,, অর্পনা মাথা ঝাঁকিয়ে মানা করলো, মানে তার এসবের প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত কথা না বাড়িয়ে শুধু এক বাক্যে আওড়ালো — তোমরা আপাতত ঘণ্টা দুয়েকের জন্য এখান থেকে চলে যাও। আর উনাকে একদম জানাবে না আমি এখানে এসেছি।
বলেই ভিতরের দিকে হাঁটা দিলো। লোকটা তো একটা পাগল। জানতে পারলে সব ছেড়ে-ছুড়ে কাজকারবার লাটে তুলে দিয়ে এখানে চলে আসবে। বিষয়টা একদমই পছন্দ হবে না অর্পনার। সে আজকের এই সময়টা একটু একান্তে কাটাতে চায়। বেইমানগুলোর সাথে যে তার অনেক কথা বাকি আছে।অর্পনাকে এগিয়ে যেতে দেখে বাধ সাধলো গার্ড — কিন্তু ম্যাম!! আপনাকে একা রেখে দূরে সরে যাওয়া আমাদের কাম্য নয়। আপনার সেফটি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
,,, অর্পনার কথা বাড়াতে ইচ্ছা করলো না। চুপচাপ এগিয়ে গেলো ভিতরে। প্রতিটি কবরের মাথায় ও পায়ের কাছে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা। বাহির হতে আসা মৃদু শীতল হাওয়ায় মোমের শিখাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে, তবে তা নিভার নাম নিচ্ছে না। অর্পনা প্রতিটি কবরের পায়ের কাছে নজর বুলালো। চট করেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো দুটো পাশাপাশি অবস্থান করা কবর। দ্বীপ জোহান মির্জা এবং পৃথা জামান অর্পনা, এর নিচে ছোট করে লেখা অপরাজিতা হামিদ। আর কিছুই লেখা নেই। হয়তো সে আর তার স্বামী মারা গেলে নেইমপ্লেট নতুন করে তৈরি করা হবে।
অপরাজিতা বহু খুঁজে এক কাঙ্ক্ষিত মানব-মানবীর কবর দেখতে পেলো। একেবারে শেষের দিকে তাসনোভা বেগম নামে একটা কবর রয়েছে, তার পাশে হামিদ হোসেন নামক আরও একটা কবর। এগুলো বুঝি অপরাজিতার মা-বাবার কবর? মা-বাবা হয়, না? হুম!! মা-বাবাই তো। অপরাজিতা সেদিকে পা বাড়িয়েও কেনো যেনো বাড়ালো না। তীব্র হারে বুক কাঁপছে। সরাসরি মা-বাবার কাছে যাওয়ার সাহস নেই তার। তাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলো একটা ছোটমোট কবরের পাশে। অতোটাও ছোট নয়, তবে পরিমাপ করলে অর্পনার কবরটা বোধহয় এই মাপেরই হবে। কিছুটা নড়চড় হলেও খুব বেশি একটা তফাৎ হবে না। অপরাজিতা ঝুঁকে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়লো কবরটার পাশে। এতো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কবরের উপরের অংশ ফাঁকা, সান বাঁধানো হয়নি। অপরাজিতা আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো মাটিতে। এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে গন্ধ শুকলো। এখানে তার আপা শুয়ে আছে। অপরাজিতার মনে হলো, সে মাটির নয়, বরং আপার গায়ের ঘ্রাণ নিচ্ছে। মুহূর্তেই চোখ জ্বালা করে পানি জমা হলো, আর সময় না গড়াতেই তা টুপটুপ করে গাল বেয়ে কবরের সান বাঁধানো জায়গাটাতে আছড়ে পড়লো। মেয়েটা আনমনেই আওড়ালো—
,, একটা প্রচলিত বাক্য আছে, জানিস? গাঙ্গে গাঙ্গে মিল হয়, তাও বোনে বোনে সাক্ষাৎ হয় না। আপা!! এই উক্তিটা কি তর আর আমার জন্য লেখা হয়েছিলো? কেনো তর আর আমার সাক্ষাৎ হলো না? কেনো একে অপরকে জড়িয়ে ধরা হলো না? তর হাতে খাওয়া হলো না, তর বুকে মাথা রেখে ঘুমানো হলো না। তর হাত ধরেই তো আমি স্কুল যেতাম, কেনো হলো না সেসব? কথা ছিলো কষ্ট পেলে তর কাঁধে মাথা রেখে কষ্ট কমানোর, অথচ দেখ, তুই কোথাও নেই। কেনো নেই তুই? আমাকে তোরা এভাবে একা করে চলে যেতে পারলি? একবার ভাবলি না আমার কথা?
,,,, বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। আপার কবরে মাথা হেলিয়ে দিতেই অপরাজিতার মনে হলো, তাকে কেউ ডাকছে। কানে এসে বাড়ি খাচ্ছে, “”আমার অপরাজিতা আম্মা!! আমার আরও একটা জান্নাত। “”” সেই সাথে একটা মেয়েলি স্বরে ভেসে আসছে, “” অপু, অপুরে, ও অপু! কই তুই, মা? এদিকে আয়। তর মা যে তকে খোঁজে। “” বসে থাকতে পারলো না অপরাজিতা। আপাকে রেখে ছুটে গেলো আব্বা-আম্মার কাছে। হামিদ হোসেন আর তাসনোভা বেগমের কবর দুটো বহু কষ্টে পাশাপাশি রেখেছে দ্বীপ। তাদের মৃত্যুর সময়ের বিশাল পার্থক্য থাকার ফলে পাশাপাশি রাখতে গিয়ে তাসনোভা বেগমের পাশের কবরটা ভাঙতে হয়েছে। সেই কবরের উপরেই কবর দেওয়া হয়েছে হামিদ হোসেনকে।অপরাজিতা ছুটে গিয়ে বাবা-মায়ের কবরটার মাঝখানে বসে পড়লো। কতো সুন্দর করে আব্বা-আম্মা মিলে-মিশে ঘুমিয়ে আছে এখানটায়। তাদের কি অপরাজিতার জন্য মায়া হচ্ছে না? ওকে ছুঁতে ইচ্ছা করছে না? একবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে না? সে কতোটা বড়ো হলো, তা দেখার বুঝি কোনো তাড়া নেই? মেয়েটা আব্বার দিকে কেমন কাতর চোখে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো করে ডাকলো—
,,,, আব্বা!!! ও আব্বা!! আপনি আমাকে রেখে কেনো চলে গেলেন? আপনি না বলেছিলেন, আমাদের সাক্ষাৎ হলে আমরা অনেক কথা বলবো? কই, আমাদের তো সাক্ষাৎ হলো না। আপনি দেখতে কেমন, আব্বা? আপনাকে দেখতে মন চাচ্ছে। একবার আসেন না, আব্বা।(তাসনোভা বেগমের কবরের দিকে তাকিয়ে) আম্মা!! ও আম্মা!! তুমিও আসবা না? তোমরা এতো স্বার্থপর হয়ে গেলে? তোমাদের অপরাজিতার বুকে যে ভীষণ কষ্ট, তার যে এই মুহূর্তে একটা মায়ের ভীষণ প্রয়োজন। আমার প্রয়োজন মিটাবে না? আমার জন্য কিচ্ছু করবে না? একবার তোমার কোলে মাথা রাখি? মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না, মা।
,,, বলতে বলতে মায়ের কবরখানায় মাথা হেলিয়ে দিলো অপরাজিতা। ঠান্ডা কংক্রিটে মাথা রাখতেই তীব্র শীতলতায় মাথাটা হিম হয়ে এলো। তবে সেসবে মন নেই রমনির। সে অনুভব করলো একটা নারী অবয়ব, যার পরনে গ্রাম্য সুতির শাড়ি। সিমসাম গড়নের রমনিটি হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে। আর অপরাজিতা সেই হাঁটুতে মাথা রেখে শুয়ে আছে।মেয়েটা এবার বাচ্চাদের মতো অনুনয় করে বললো—
— আমি বরই ক্লান্ত, মা। জীবনের এই কঠিন যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে নিঃশ্বেস হয়ে যাচ্ছি। তুমি তো আল্লাহর কাছে আছো, আল্লাহকে শুধাবে কি? আর কতোটা পরীক্ষা দিতে হবে আমায়? এই নিত্যনতুন যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে আমার ভীষণ যন্ত্রণা হয়।
,,, ওপাশ থেকে উত্তর এলো না। মনে মনে একটা অবয়ব বানিয়ে নিলেও, কখনো চেহারা না দেখায় মায়ের মুখ কিংবা কণ্ঠ কিছুই বানাতে পারলো না রমনি। তবে অনুভব করলো, মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বড্ডো শান্তি লাগছে তার। কতোটা আরাম বোধ হচ্ছে, তা প্রকাশ করার নয়। ভঙ্গুর অপরাজিতা পেন্টের পকেট হাতরে ভাঁজ করে রাখা মাঝারি সাইজের খামটা বের করে হাতে নিলো। বুকের ভিতরটা কেমন ধড়ফড় করছে। কাগজটা খুলতে ইচ্ছা করছে না। কী আছে এর ভিতর? কী থাকতে পারে? আরও কোন সত্যের মুখোমুখি হতে হবে তাকে? ভেবে পেলো না রমনি। তবুও সাহস নিয়ে খামে থাকা কাগজখানা টান দিলো। মুহূর্তেই কোলের উপর ছিটকে পড়লো পান্না খচিত একটা রিং। অর্পনা রিংটার দিকে তাকানোর সময় পেলো না। কাঁপা হাতে কাগজটা মেলতে চাইলো। সহসা বুঝতে পারলো, এখানে একটা নয়, বরং দুটো কাগজ রয়েছে। সে দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রথম কাগজটা খুললো। মোমের আলোয় চকচক করতে থাকা কবরস্থানের আলোতে বুঝতে অসুবিধা হলো না, এটা হার্ট ম্যাচিং রেজাল্ট। যেখানে খুব সুনিপুণভাবে দুটো সারিতে দুটো মানুষের হেলথের রিপোর্ট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ব্লাড গ্রুপ থেকে শুরু করে সবটা মিলে গিয়েছে, শুধু হার্টের সাইজ অর্পনারটা একটু ছোট, আর ওপাশের ব্যক্তির হার্টটা একটু বড়ো।অর্পনার সেসবে কোনো ধ্যান নেই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ডোনারের নামের দিকে।
একদম গোটা গোটা অক্ষরে লেখা Adriyan Kaisar Ebrak, আর তার পাশের নামটি Pritha Jaman Arpona। অর্পনার পৃথিবীটা কেমন আকস্মিক দুলে উঠলো। আদ্রিয়ান!! এখানে তার পাশে আদ্রিয়ানের নাম কেনো? তাকে তো একটা মেয়ে হার্ট দিয়েছিলো। ঐ মেয়ের পরিবারের সাথে সুস্থ হওয়ার পর কথাও হয়েছিলো তার। তাহলে? তাহলে এসবের মানে কি? আব্রাহাম তাকে এটা কেনো দিলো? তাকে হারাবে বলে কি চাল চেলেছেন ঐ লোক? অর্পনা তাড়াহুড়ো করে উঠে বসলো। পরপর অপর কাগজটি খুলে নজর বুলাতেই দেখলো, যেখানে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা আছে অনেক কথা। যেই কথাগুলো হয়তো বিষাক্ত তীরের ন্যায় রমনির অস্তিত্ব এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে সক্ষম। অর্পনা সময় নিলো। কয়েকটা বড়ো বড়ো নিশ্বাস ত্যাগ করে আবারও তাকালো কাগজটার দিকে। মুহূর্তেই কোটর ভরে উঠলো মেয়েটার। চোখে টইটম্বুর করা পানি নিয়ে ধীরগতিতে পড়তে শুরু করলো প্রতিটি বাক্য।
,,, জানেম!! আমার জান!! আমার মূল্যবান ভালোবাসা। কেমন আছো তুমি? শরীরটা ভালো আছে? মনের অবস্থা কেমন? মনটা ভালো আছে তো? তুমি কি এখনো আগের মতো শরীরে কাটাছেঁড়া করো? মানসিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে? ইদানীং কি খুব হাসিখুশি থাকো? খুব আনন্দে থাকো, তাই না? থাকারই কথা। আদি নামক উটকো প্রোফেসারটা যে আর তোমাকে জ্বালাতে আসে না, বারবার “””জানেম, ভালোবাসি। জানেম, ভালোবাসি।””; বলে অতিষ্ঠও করে দেয় না। এর থেকে শান্তির আর কিছু হতে পারে? তুমি নিশ্চয়ই বেশ ভালো আছো।
আচ্ছা জানেম!! কতো বছর পেরিয়েছে গো? কতো বছর পর তোমার-আমার সাক্ষাৎ হলো? দুই, চার, ছয়, দশ, নাকি আরও বেশি? আব্রাহাম কতোদিন পর তোমার কাছে দিলো এই চিঠিটা? যতোদিন পরেই দিক, ততোদিনে আমি আর এই দুনিয়ার মাটিতে অবশিষ্ট নেই। তবে আমি বিনা তোমায় নিঃসঙ্গ করার কিংবা তোমার পিছু ছেড়ে দেওয়ার কল্পনা আমি কল্পনায়ও করতে পারি না। আমি আছি, তোমার সাথে, তোমার কাছে। এতোটাই কাছে, যতোটা কাছে তোমার স্বামী দ্বীপ জোহান মির্জাও নেই।তোমায় আমি বারংবার বলেছিলাম না? তুমি আর আমি পাশাপাশি দুটো রেললাইনের মতো। তুমি যেই পথেই যাও না কেনো, পাশে তাকালে ঠিক আমাকে দেখতে পাবে। তুমি কি জানো? তোমার যেই হৃদয়ে দ্বীপ মির্জা বসবাস করে, সেই হৃদয়টাই আমি। প্রতিদিন তোমার বুকে যেই কম্পন সৃষ্টি হয়, তার কারণ আমি। তোমার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি আমার নামে লেখা হয়। আমি তোমার শরীরের প্রতিটি কোষ, টিস্যু, শিরা-উপশিরার সাথে যুক্ত। তোমার শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাটাও আমার হাতেই বন্দি। তুমি কোনোদিন আমাকে নিজের কাছে ঘেঁষতে দাওনি, অথচ দেখো, কী অবলীলায় আমি তোমার বুকের বাম পাশটা দখল করে রেখেছি। কী? অবাক হলে? সারপ্রাইজ হয়ে গিয়েছো, তাই না? কেমন লাগলো আমার সারপ্রাইজটা? তুমি বলেছিলে, তুমি যার থেকে একবার মুখ ফিরিয়ে নাও, তার দিকে ফিরেও তাকাও না। তোমার জীবনে আর কোনোদিন জায়গা পাবো না আমি। কতো কিছু করলে আমায় দূরে সরাবে বলে, কতো নীরব যুদ্ধ হয়ে গেলো তোমার-আমার মাঝে। অথচ দিনশেষে ভালোবাসার খেলাটায় আমি জিতে গিয়েছি, জানেম। তোমার বুকের বাম পাশটা দখল করে নিয়ে সত্যি সত্যিই জিতে গিয়েছি।
,,, এই পর্যায়ে অর্পনার চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়ালো। মুহূর্তেই আবারও পানিতে টলমল করে উঠলো চোখজোড়া।
,,, জান!! আমি হার্ট দিয়েছি বলে তোমার কি আফসোস হচ্ছে? তুমি কি কাঁদছো? চোখে পানি জমা হয়েছে, তাই না? কেঁদো না গো, জানেম। তুমি কাঁদলে যে আমার হৃদয়টাতে বড্ডো যন্ত্রণা হয়। আমি নাহয় বেঁচে নেই, কিন্তু আমার হৃদয়টা তো বেঁচে আছে। তাকে কষ্ট দিও না। তুমি জানো? আব্রাহাম যখন জানালো, আমার হার্টের সাইজ তোমার হার্টের থেকে কিছুটা বড়ো, পুরোপুরি ম্যাচ করছে না, তখন আমি উত্তরস্বরূপ বলেছিলাম,
“””” যেই হৃদয় সর্বক্ষণ তোমার নামে স্পন্দিত হয়, সে হৃদয় কখনোই তোমার স্পন্দন হারাতে দেবে না। ও যে তোমায় খুব ভালো করে চেনে।”””
এর পরেও আব্রাহাম ভরসা পাচ্ছিলো না। বারবার মানা করছিলো। অথচ দেখো, তুমি আজ দিব্যি তোমার বুকে আমার হৃদয় নিয়ে আমার লেখা চিঠি পড়ছো।আমার ভালোবাসা এতোটাও ঠুনকো নয়, জানেম। তীব্র বিশ্বাস রয়েছে, আমার হৃদয়কে তোমার শরীর কখনোই অবহেলা করবে না, অপরিচিত ভেবে আঘাত করবে না। কারণ ঐ জায়গাটাতেও একটা সময় আমারই বসবাস ছিলো। ওহুম!! একটা সময় নয়, বরং এখনো আছে। আমি জানি, তুমি আমায় ভালোবাসো না। তবে ঘৃণা তো করো। ভালোবাসা যেমন হৃদয় থেকে আসে, ঘৃণাও তো হৃদয় থেকেই আসে। তোমার ভালোবাসার ভাগ না পাই, ঘৃণার ভাগটা আমার। তাই ঘৃণিত আদ্রিয়ান কাইসারকে তোমার শরীর কখনোই দূরে সরিয়ে দিতে পারবে না।আজ আমার সেই বিশ্বাস মিলে গিয়েছে। তুমি আমার হৃদয় নিয়েই বেঁচে আছো। আমি কি ভুল কিছু বলেছি, আমার জান?
,,, লিখতে গিয়ে বড্ডো কান্না পাচ্ছে। হাতের রগগুলো কেমন থরথর করে কাঁপছে, বুকটা ভার হয়ে আসছে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। তুমি কেনো আমায় ভালোবাসলে না, জানেম? আমি কেনো সেদিন তোমার কাছে গেলাম না? আমি চাইলেই তো সেদিন তোমাকে বাঁচাতে পারতাম। সেদিন বেঁচে গেলে আজ তোমার এই পরিণতি হতো না। তুমি ম্যাসোকিস্টে পরিণত হতে না, আর না এসব উল্টোপাল্টা ঔষধ খেয়ে নিজেকে ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠতে। কতো পাপ করেছি আমি, কতো বড়ো পাপিষ্ঠ তোমার আদি ভাই। সেই পাপের ডোরেই তোমায় হাতড়ালাম, তোমায় আবারও ফিরে পাওয়ার আশায় আরও একটা মেয়ের জীবন ধ্বংস করে দিলাম। ইরাদ মেয়েটা খুব ভালো। আমাকে অন্ধের মতো ভালোবেসেছিলো, কিন্তু আমি তাকে দাম দিতে পারিনি। কিভাবে দাম দিতাম? বলো!! যেখানে তুমি হীনা আমি নিজেই মূল্যহীন, সেখানে ইরাদকে মূল্য দেওয়ার মতো মূল্য আমি কোথায় পাবো?
এই বিষয়টাতে আমি অপারগ। তুমি জানলে অবাক হবে, ইরাদের সাথে চরম অন্যায় করেছি আমি। পদে পদে ঠকিয়েছি মেয়েটাকে। নিজের স্বার্থের জন্য সিদ্বার্থকে বাধ্য করেছি আমার রূপ নিয়ে ইরাদের সাথে ভালোবাসার নাটক করার জন্য। আমার ভাইটা তো ছোট, নরম আর সাদাসিধা। মনটা বেশ কোমল। ইরাদের সাথে কথা বলতে বলতে সে ইরাদকে ভালোবেসে ফেলেছে। উল্টো দিকে ইরাদ বেশ কঠিন মনের অধিকারী। একা একা নিঃশেষ হয়ে যাবে, তবুও আমার ভাইকে মেনে নিবে না।সব মিলিয়ে আমার একটা পর্যায়ে এসে মনে হলো, ইরাদের থেকেও বেশি ঠকে যাবে আমার ভাইটা। বড়ো ভাই হয়ে এটা কিভাবে মেনে নিবো আমি? ছোট থেকে আমার ভাইটা আমি ব্যতীত কারোর আদর পায়নি। সিদ্বার্থ বড্ডো নির্মল হৃদয়ের অধিকারী ছিলো, বিদায় মম ওকে খুব একটা পছন্দ করতো না।
সব কেয়ার, এফোর্ট ছিলো আমার নামে। তুমি তো জানোই, কাইসার বাড়িতে আমায় নিয়ে ঠিক কী পরিমাণ মাতামাতি হতো।ছোট থেকে ভালোবাসা না পাওয়া আমার ভাইটা যদি জীবনের এই পর্যায়ে এসেও তার কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসাটুকু না পায়, তাহলে বড়ো ভাই হিসেবে আমার জীবন বৃথা। ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা যে কতোটা প্রখর, তার ওজন বুঝতে পারার পর ভাইকে একই যন্ত্রণায় কাতর হতে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। তাই বাধ্য হয়েই জঘন্য খেলায় মেতে উঠেছিলাম আমি। সিদ্বার্থ ইরাদের কিছু মুহূর্ত, কিছু কনভারসেশন নিজের আয়ত্তে এনে সব পাঠিয়ে দিয়েছিলাম ইরাদের বাবার নিকট। শর্ত রেখেছিলাম, ইরাদকে সিডের সাথে বিয়ে না দিলে তাদের মেয়ের সম্মান রাস্তায় নামিয়ে আনবো।বিশ্বাস করো, আমার জান!! আমি কখনোই এমনটা করতাম না। আমি ইরাদকে সম্মান করি, বরাবর ছোট বোনের মতো দেখেছি। শুধু ভাইটাকে ভালোবাসা পাইয়ে দিবো বলেই এরকম একটা কাজ করেছিলাম। তুমি কি এই জন্য আমাকে ঘৃণা করবে? পাপী ভাববে? ভেবো না গো। তোমার চোখে ঘৃণা দেখার মতো যন্ত্রণা অগ্নিকুণ্ডেও নেই।
,,আচ্ছা!! ইরাদ এখন কেমন আছে? আমার ভাইকে ভালোবাসে? ওদের বিয়ে হয়েছে তো, তাই না? মিলমিশ হয়েছে? না হয়ে থাকলে ওদের একটু মিলিয়ে দিও। ইরাদকে একটু বুঝিয়ে বলো, সিদ্বার্থ ওর জীবনে কোনো অভিশাপ নয়, বরং আল্লাহপ্রদত্ত শান্তি। ওর জন্য আমি ঠিক ছিলাম না, সিদ্বার্থই ওর ভবিতব্য। আর বলো, যদি পারে, তাহলে যেনো আমায় ক্ষমা করে দেয়। আমার পক্ষে তো চাওয়া সম্ভব না। তুমি একবার আমার হয়ে চেয়ে নিবে? ক্ষমা না করলেও সমস্যা নেই। আমি জানি, আমার পাপের কোনো ক্ষমা হয় না।
,,, এই পর্যায়ে কিছুটা থামলো অর্পনা। চোখে অবাধ নোনা জল। কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে আসছে। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে। সে ঠোঁট কামড়ে কান্না দমাতে চাইলো, তবে সক্ষম হতে পারছে না।
,,, জান!! একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? সত্যি বলবে? তোমার কি আমার কথা মনে পড়ে? মিস করো আমাকে? এই যে আশপাশে আমি আর নেই, আশপাশটা কি কখনো ফাঁকা ফাঁকা লেগেছে? খুব ভোরে তোমার যখন ঘুম ভেঙে যায়, তখন দরজা খুলে দরজার বাহিরে আমায় বসে থাকতে না দেখে কখনো বুকে শূন্যতা অনুভব করেছো? খাবার কিংবা কফি খাওয়ার বেলায় অবহেলা আর তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে তাকানোর জন্য আমাকে একটাবারও কি খুঁজেছো? নীরব রাস্তায় বাইক চালাতে গিয়ে পাশে আরও একটা বাইকের অনুপস্থিতি তোমায় কখনো পুড়িয়েছে?
ইসস!! সবগুলো প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হতো, আমার জীবন সার্থক হয়ে যেতো। কোনো আফসোসই থাকতো না। কিন্তু তা তো হওয়া সম্ভব না। আমি জানি, তোমার উত্তরগুলো “”না “” ই হবে। ইদানীং হয়তো স্বামী, সুখের সংসার নিয়ে তুমি বরই ব্যস্ত। তাদের ভিড়ে আমার মতো একটা উটকো ঝামেলাকে মনে করার সময় কোথায়? বলো।
,,, আচ্ছা জান!! তোমার বিয়ের আজ কতো বছর পেরিয়েছে গো? বাচ্চা হয়েছে তোমার? মেয়ে হয়েছে, তাই না? আমি জানি, তোমার একটা মেয়েই হবে। তোমার মেয়েটা না, বড্ডো অবাধ্য জানো? কতোবার তোমার মেয়েটাকে মানা করলাম, যেনো দ্বীপ মির্জাকে আমার সামনে পাপ্পা বলে না ডাকে, কিন্তু মেয়েটা কথা শুনে না। বারবার আমার সামনে এসে দ্বীপ মির্জাকেই পাপ্পা বলে ডাকে। কেনো ডাকে গো? ও কি জানে না, ও অন্য কাউকে পাপ্পা ডাকলে আমার যন্ত্রণা হয়? মনে হয় মরণযন্ত্রণায় এখনই তড়পাতে তড়পাতে আরও একবার মরে যাবো। ওর পাপ্পা তো আমি হতাম। আমাকে পাপ্পা ডাকার কথা ছিলো না? ও কেনো অন্য কাউকে পাপ্পা ডাকবে? মেয়েটাকে কেনো এতোটা অবাধ্য বানালে? তোমরা মা-মেয়েতে মিলে বড্ডো পোড়াও আমায়। আমার যে আর জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হতে ভালো লাগে না।
,,, ইদানীং শরীরটা খুব খারাপ যায়। মাথা ঠিক থাকে না। চোখে ভ্রম দেখি, হাত-পা অবশ হয়ে আসে। মাসের পর মাস বিছানায় পড়ে থাকি। সবাই বলে, আমার নাকি মানসিক সমস্যা। দিনকে দিন পাগল হয়ে যাচ্ছি। সিদ্বার্থটা বারবার নানান ডক্টরের কাছে নিয়ে যায়। কাউন্সেলিং, নানান থেরাপি, ঔষধ, ইনজেকশনের ভিড়ে জীবনটা প্রায় উষ্টাগত। আমার যে আর সহ্য হয় না। মন চায় ছুটে তোমার কাছে চলে যাই। তোমার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে তোমার কোমর জড়িয়ে পেটে মুখ গুঁজে সকল যন্ত্রণা কান্নার মাধ্যমে উগড়ে দেই। তোমার কাছে তোমার নামে অভিযোগ করার বড্ডো শখ গো আমার, কিন্তু সেই রাস্তাটা তো তুমি খোলা রাখোনি। তোমার কাছে পৌঁছাবো বলে কতো পাগলামি করলাম, অথচ এই পাগলের খোঁজ তুমি নিলে না। যে অন্যের জন্য পাগল হলো, তাকে তুমি কতো যত্ন দিয়ে ভালোবাসলে, অথচ তোমায় ভালোবেসে যে পাগল হলো, তার দিকে ফিরেও তাকালে না। তুমি বরই পাষাণ, আমার বিনাশিনী। তবুও তোমার তরে আরও শতবার বিনাশ হতে আমি রাজি।
ভেবো না, এই পৃথিবীতে তুমি ছাড় পেয়েছো বলে আখিরাতেও ছাড় পেয়ে যাবে। এই পর্যায়ে শক্ত গিঁট বেঁধেছি, আমার বিনাশিনী। আমি তোমার দ্বীপের আগে আল্লাহর কাছে পৌঁছে গিয়ে তোমায় চেয়ে নিবো। পরজন্মে আমাদের আবারও দেখা হবে। সেবার আমি কোনো ভুল করবো না। তোমায় একবিন্দু অবহেলা করবো না। নির্মল, নির্ভেজাল হবে তোমার আদি ভাই। তখন নিশ্চয়ই তুমি আমায় ভালোবাসবে? আমাদের সংসার হবে? এখন যেই মেয়েটা তোমার সাথে এসে আমাকে জ্বালাতন করে, সেই মেয়েটা আমাকে পাপ্পা বলে ডাকবে। আমি সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম। হয়তো একটু সময় লাগবে, তবে আমি অপেক্ষা করতে রাজি। শতপ্রহর অপেক্ষা করার পর যদি আমার বিনাশিনীর একটি মাত্র দর্শন মিলে, তবে সেই অপেক্ষা শতবার মঞ্জুর।
,,, তোমাকে আরও অনেক কথা বলার ছিলো, কিন্তু আমার হাতে সময় নেই। সময়ের পরিবর্তে বর্তমানে হাতে রয়েছে রিভলবার। আব্রাহাম ছেলেটার সাথে আমার তেমন কোনো সখ্যতা নেই, অথচ ছেলেটা আমার জন্য কাঁদছে। অনুরোধ করছে, যেনো আমি আত্মহত্যা না দেই। অনবরত ছেলেটার হাত-পা কাঁপছে। সে কোনো মতেই আমার থেকে হার্ট নিতে রাজি না। ওকে কী করে বুঝাই বলো তো? তোমাকে হার্ট দেওয়াতে আমার কোনো কষ্ট নয়, বরং আনন্দ হচ্ছে। আমি আনন্দের তাড়ে বারবার বাক হারাচ্ছি। ও বুঝতে পারছে না, আজকের পর আমার স্থান কোথায় হবে। বিনাশিনীর বুকে, বিনাশিনীর শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত থেকে যাওয়ার ভাগ্য যে সবার হয় না। আমার হয়েছে। আমি আজকের পর তোমার বুকের ঠিক বাম পাশটায় থাকবো। তাই আব্রাহামের পথটা একটু সহজ করে দিতে হাতে রিভলবার তুলে নিয়েছি। কিছুক্ষণের মাঝেই হয়তো তোমার বিরক্তিকর প্রোফেসারের নিথর দেহটা লুটিয়ে পড়বে এই বদ্ধ রুমে। আমি হয়তো তখনো তড়পাবো একটাবার তোমায় দেখার আশায়। তুমি একবার ভ্রম হয়ে হলেও দেখা দিও। ছুঁয়ে দিয়ো আমার কপালখানি। চোখ বোজার আগ পর্যন্ত আমি অপলক চেয়ে চেয়ে দেখবো তোমায়।
,,, সময়ের সাথে সাথে পৃষ্ঠাও ফুরিয়ে এসেছে। বেশি কিছু লেখা যাবে না আর। এমতাবস্থায় দুটো শেষ ইচ্ছা রাখতে বললে ফিরিয়ে দিবে আমায়? এই শেষ!! আর তো চাওয়ার সুযোগ মিলবে না। দয়া করে ফিরিয়ে দিয়ো না, জান। আমার খুব ইচ্ছা একটাবার কিশোরী অর্পনার কণ্ঠে “” আদি ভাই”” ডাক শুনার। আমার ইচ্ছাটুকু রাখবে? বর্তমানে আমার স্থান তো তোমার বুকে। একটাবার তোমার বুকের বাম পাশে হাত রেখে আমায় অনুভব করার চেষ্টা করে বলবে? “”আই হেইট ইউ আদি ভাই। “” প্লিজ!! আর তোমার কোলের উপর পড়ে থাকা রিংটা সবসময় হাতে রাখবে? বড্ডো শখ নিয়ে কাস্টমাইজ করে বানিয়েছিলাম, তোমায় বিয়ের রাতে উপহার দিবো বলে। অথচ কিছুই হলো না। না আমাদের বিয়ে হলো, আর না তোমার হাতে রিংটা পরাতে পারলাম। তোমার-আমার ভালোবাসার মুহূর্তটা একসাথে এলে খুব একটা ক্ষতি হতো না বোধহয়,,,,
এই পর্যায়ে লেখা কিছুটা ফ্যাকাশে দেখালো। চিঠির মালিক বোধহয় খুব কেঁদেছিলো। চোখের পানিতে লেখাগুলোর রং এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গিয়েছে। অর্পনা অনুভব করলো, তার অকারণেই দম আটকে আসছে। সে বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিতে নিতে পরের লেখাটুকুতে মনোযোগ দিলো—
,,, তোমাকে দেখিনা কতোদিন। তুমিও আমায় কাছাকাছি এসে অবহেলা করো না, বহুদিন পেরিয়ে গেলো। বড্ডো সাধ ছিলো চোখ বোজার আগে তোমায় একটাবার দেখবো, কিন্তু আমার ভাগ্য আমায় সায় দিলো না। আব্রাহাম জানালো, তোমার অবস্থা খুব করুণ। হাতে সময় নেই। আগে থেকেই অপারেশন থিয়েটার রেডি রাখতে হবে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ল্যান্ড করার সাথে সাথেই অপারেশন শুরু হবে তোমার। অতঃপর,,,
,,তোমার সাথে আর হলো না দেখা, দেখারে
বুকে আমার বিসর্জনের ব্যথা,,
,,তোমার সাথে আর হলো না দেখা, দেখারে
বুকে আমার বিসর্জনের ব্যথা,,
,,,, অর্পনার দুলয়মান পৃথিবীটা কেমন স্থির হয়ে গেলো। মেয়েটা কেমন বোকা বোকা দৃষ্টিতে চাইলো কোলের উপর পড়ে থাকা পান্না খচিত রিংটার দিকে। রিংয়ের অবস্থান দেখে বরই আশ্চর্য হলো রমনি। হিসেবমাফিক লোকটা মারা গিয়েছে আজ অনেক বছর পেরিয়ে গিয়েছে। তাহলে উনি জানলেন কী করে রিংটা তার কোলের উপর পড়ে থাকবে? এতোটা বিশ্বাস কোথায় পেলেন তিনি? কী বুঝাতে চাইলেন? তার মতো করে অর্পনাকে কেউ চিনতে পারবে না? আর তাকে হার্ট দিয়েই বা কী প্রমাণ করতে চাইল? উনার মতো করে অর্পনাকে কেউ ভালোবাসতে পারবে না? অর্পনার বিষয়টা পছন্দ হলো না। কিছু ভালো লাগছে না। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। বুকের বাম পাশটা যেনো কামড়ে ধরেছে কেউ। সে এক হাতে অনবরত বুকের বাম পাশে ম্যাসাজ করতে লাগলো। ম্যাসাজ করতে করতে মনে পড়ে গেলো, এইখানটায় আদ্রিয়ানের হার্ট রয়েছে। মুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিলো অর্পনা। বুকের বাম পাশে সে হাত রাখবে না। আদ্রিয়ানকে একবিন্দু প্রশ্রয় দিবে না সে। অথচ বুকের বাম পাশের সেই অসহ্যকর যন্ত্রণাটাও কমার নাম নিচ্ছে না। কী করবে ভেবে না পেয়ে অর্পনা মায়ের কবরখানা খামচে ধরলো। অনবরত নাক টানছে মেয়েটা। কোলের উপর থাকা আঙটিটার জায়গা হয়েছে মাটিতে। অর্পনা তার দিকে তাকানোর ধৈর্য পেলো না। একটা লোক তাকে না পেয়েও কীভাবে পেয়ে গেলো? কেনো জিতে গেলো আদ্রিয়ান? এই নীরব যুদ্ধে তো অর্পনার জিত হওয়ার কথা ছিলো। জিতেও গিয়েছিলো। তাহলে এটা কেনো হলো? আদ্রিয়ান কেনো মারা গেলো? অর্পনা মানতে পারছে না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে এবার শব্দ করে কেঁদে দিলো মেয়েটা। অশান্তের ন্যায় মায়ের কবরখানায় আঁচড় কাটতে কাটতে নিজের ভিতরকার সব কষ্ট, যন্ত্রণা লাঘব করতে চাইলো। ওদিকে অনবরত ফোন বেজে চলেছে। ওপাশের ব্যক্তির বোধহয় ভীষণ তাড়া। এক সেকেন্ডও রেস্ট নিচ্ছে না। একের পর এক, একের পর এক বেজেই চলেছে। এই অবিরাম ফোনের চক্করে আরও ভঙ্গুর হয়ে উঠলো অর্পনা। এতো রাতে বিপদ-আপদ না হলে এভাবে কেউ কল দেয় না। আরও কী হারানোর বাকি আছে তার? আর কী কী হারাবে সে? একটা শূন্যকে আর কতোবার বিয়োগ করা যায়? এর কোনো উত্তর নেই রমনির কাছে।
,,, বারংবার ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দ সহ্য করতে না পেরে বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে টেনে-হিঁচড়ে ফোনটা বের করলো রমনি। এভার কেয়ার হসপিটাল থেকে কল এসেছে। অর্পনা তাচ্ছিল্য হাসলো। তার সিক্সথ সেন্স এতোটা প্রখর হতে হবে কেনো? কেনোই বা সে যা আশঙ্কা করবে, তা সত্যি হতে হয়? অর্পনার কল ধরতে ইচ্ছা করলো না। এখন নতুন করে কোনো যন্ত্রণা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয় তার হৃদয়। নিজের হৃদয় ভাবতে গিয়েও বারবার বাধা পাচ্ছে মেয়েটা। এটা তো তার নয়, বরং এমন একজন মানুষের, যাকে জীবনে জায়গা দিবে না বলে নিজেকে ধ্বংস করার প্রয়াস চালাতেও দ্বিধাবোধ করেনি সে।
অর্পনার ভাবনার মাঝে ফোন কেটে আবারও ফোন এলো। এই পর্যায়ে আর কোনো উপায় না পেয়ে কল রিসিভ করলো রমনি। কানে তুলে কোনো কথা বললো না। ওপাশ থেকে যা বললো, তা শুনে চুপচাপ কল কেটে দিলো। রমনির ঠোঁটে অমলিন হাসি। ঠোঁটে হাসি, চোখে জল,, সবসময় সুখের হয় না, মাঝে মাঝে বিদ্রূপেরও হয়। সেই হাসিটুকু মুখে রেখেই নিদারুণ কণ্ঠে বিধাতার নিকট বার্তা পাঠালো—
,,, আল্লাহ!! শুনছেন? অর্পনার তৈরি মায়াজাল ছিন্ন করে আবারও পালিয়েছে সুহাসিনী রাতের অপ্রেমিক। অথচ অর্পনা এদেরকে ঘিরেই বাঁচতে চেয়েছিলো।
,,, বলতে বলতে শব্দ করে হেসে উঠলো মেয়েটা। তীব্র অস্থিরতা আর মাথার যন্ত্রণায় দু’হাতে চুল খামচে ধরলো। নাহ!! শান্তি লাগছে না। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে।মুহূর্তেই ভঙ্গুর অর্পনা তৈরি হলো ম্যাসোকিস্টে। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে মাথায় একটার পর একটা আঘাত করতে লাগলো। তীব্র আঘাতে যখন কপাল ও মাথার অংশ ব্যথায় বুঁদ হয়ে এলো, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেলো অর্পনা।নাহ!! এখনো শান্তি লাগছে না। এই পর্যায়ে পকেট হাতড়ে তিন ইঞ্চি সাইজের সার্জিকাল নাইফ বের করলো। পরপর পায়ের জগার্সটা তাড়াহুড়ো করে টেনে উপরে তুললো। লুজ জগার্স হওয়ার দরুন খুব একটা সময় লাগলো না উপরে তুলতে। মুহূর্তেই নাইফ চালিয়ে দিলো পায়ের মাংসল অংশে। একটার পর একটা, একটার পর একটা আঁচড় কাটতে কাটতে সাত নম্বর আঁচড়ে গিয়ে থামলো। মুহূর্তেই কাটা স্থান জ্বলে উঠে রক্তাক্ত হয়ে পড়লো পাটা। ধীরে ধীরে রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়লো। অর্পনার ভাবাবেগ নেই। চুপচাপ কিছুটা সময় রক্ত ঝরতে দিলো। পরপর বাবা-মায়ের পায়ের কাছে জ্বলতে থাকা দীর্ঘ বছরের আগরবাতির ছাই হাতে তুলে নিলো। এমন একখানা ভাব, যেনো এই আগরের ছাই তার সকল যন্ত্রণার উপশম ঘটাতে সক্ষম। সে মুঠোভর্তি করে ছাই নিয়ে লেপ্টে দিলো কাটা স্থানে। মুহূর্তেই অগ্নির দাবানলের ন্যায় জ্বলে উঠলো জায়গাটা। তবে রমনির ভাবাবেগ হলো না। সে তৃপ্তি নিয়ে উপভোগ করছে এই যন্ত্রণা। প্রথমবার ছাই দেওয়ায় রক্ত প্রবাহিত হওয়া বন্ধ হলো না। তাই আবারও মুষ্টিভরে ছাই ল্যাপ্টালো জায়গাটায়। আবারও জ্বলে উঠলো।এই পর্যায়ে শব্দ করে হেসে উঠলো মেয়েটা। বাবা-মায়ের উদ্দেশে চিৎকার করে বললো—
— আম নট অপরাজিতা, আ’ম অ্যা লুজার। ফা*ক অফ মি এন্ড অলসো ফা*ক মাই পার্সোনালিটি।
,,,, অর্পনার পাগলামির মাঝেই ওর হাত ধরে সজোরে টান বসালো কেউ। আকস্মিক টানে কিছুটা উঁচু হতেই ওপাশের ব্যক্তিটি ওকে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। পা জোড়া অবশ হয়ে আসার দরুন মেয়েটা উঠে দাঁড়াতে পারলো না। অথচ অপর পাশের মানুষটা সযত্নে উঁচু করে আগলে নিলো নিজের বাহুবন্ধনে।পরিচিত স্পর্শ আর ঘ্রাণ নাকে ঠেকতেই মানবের গলা জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে দিলো রমনি। বাচ্চাদের মতো আকুল কণ্ঠে আওড়ালো—
— তোমার চ্যাম্প একটা লুজার, পাপ্পা। জীবন তাকে পদে পদে গো হারান হারিয়ে দিয়েছে। যতবার সুখে থাকার জন্য একটা উৎস খুঁজে নিয়েছে, ততবার তা মরীচিকার মতো উড়ে গিয়েছে। আমি কি খুব খারাপ, পাপ্পা? সুখ কেনো আমায় ধরা দিয়েও পালিয়ে যায়? বলো না, পাপ্পা!! তোমার অর্পনা খুব খারাপ?
,,, মেয়ের আর্তনাদে আরশাদ জামানের চোখ ভিজে উঠলো। আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। মেয়ের চুলের ভাঁজে চুমু খেতে খেতে নিজেও ফুঁপিয়ে উঠলেন। এই বাচ্চাটার প্রতি বড্ডো উইক তিনি। বাচ্চাটা একটু কষ্ট পেলেই তার ঝড় যেনো আরশাদ জামানের বুকের উপর দিয়ে বয়ে যায়। এই পর্যায়ে আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো রমনি। বারবার নিজেকে লুজারের তকমা দিতে দিতে গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করতে লাগলো। মেয়েকে সামলাতে না পেরে ফাঁকা মেঝেতে বসে পড়লেন আরশাদ জামান।
পাপ্পার কোলে ছোট্ট বাচ্চাটির ন্যায় জুবুথুবু হয়ে বসে পড়লো অর্পনা। মুখ গুঁজে দিলো গলার ভাঁজে। কে বলবে কোলে বসা মেয়েটার বয়স আঠাশ? তার একটা সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়ে রয়েছে? নাহ!! কেউ বলতেই পারবে না। বরং বাবা-মেয়ের এই নিগূঢ় আলিঙ্গনে খুঁজে পাবে এক ক্যাঙ্গারু মাকে। একটা ক্যাঙ্গারু মা যেমন তার বাচ্চাকে প্রটেক্ট করতে নিজস্ব পকেটে জড়িয়ে রাখে, অমনি করে ছোট্ট অর্পনাকে আগলে রেখেছে তার পাপ্পা। আরশাদ জামান নিজেকে সামলে মেয়ের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন। বাচ্চা ভোলানোর মতো করে মেয়েকে শান্ত করতে আওড়ালেন—
,,, আমার প্রিন্সেস, আমার জান বাচ্চা!! আব্বা-আম্মার কবরে এসে কেউ এভাবে কাঁদে? আব্বা-আম্মা কষ্ট পাবে না? ভাববে না, তোমার পাপ্পা তাদের মেয়েকে আগলে রাখতে পারেনি? শান্ত হও, মা। আমার মা, আমার জান। একটু শান্ত হও।
,,, বাবার আদুরে কথাগুলোতেও শান্তি পাচ্ছে না রমনি। বারবার মনে হচ্ছে, সে দোষী। সে খারাপ। এই কারণেই তার জীবনে আসা প্রতিটি মানুষের জীবন এভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। কাউকে ভালো রাখার ক্ষমতা নেই তার। আদ্রিয়ান ঠিকই বলেছিলো। অর্পনা বিনাশিনী। বিনাশ করা ব্যতীত আর কোনো গুণ অবশিষ্ট নেই তার মাঝে।
,,,, আজকের শেষ ট্রেন রাত ২টা ৩০ মিনিটে হওয়ার কথা থাকলেও টিকিট চেক আর ড্রাইভারের হুটোপুটির তোড়ে ট্রেন ছাড়তে ছাড়তে ২টা বেজে ৪০ মিনিট। কিছু মুহূর্তেই তা বাতাসের গতিতে ঝকঝক শব্দ তুলে কমলাপুর রেলস্টেশন ক্রস করলো। তারও ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় তেজগাঁও পৌঁছালো ট্রেনটি।
,, এই বেলায় ছুটতে ছুটতে রেললাইনের কাছে এসে পৌঁছালো পল্লব। শরীরে এখনো হাসপাতালের ড্রেস। কাপড়টি তেমন একটা মোটা না হওয়ায় তীব্র শীতে শরীরখানা কেমন থরথর করে কাঁপছে। তার দৃষ্টি চলমান ট্রেনটাতে স্থির। সে কেমন দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকালো। এতোগুলো দিনে সে বহু কষ্টে অনেকগুলো টাকা জোগাড় করেছে। ছোট্ট প্রকৃতির বিড়াল পেন্টে কিছু কিছু টাকা থাকে। পল্লব জানে না সেগুলো কতো টাকা। ইদানীং টাকা কিংবা অন্যান্য সংখ্যাগুলো চিনতে পারে না। তালগোল পাকিয়ে যায়। ছোট্ট প্রকৃতির থেকে টাকা নিতে নিতে এখন তার হাতে অনেকগুলো টাকা জমা হয়েছে। একদম অনেক টাকা। এই টাকাগুলো দিয়ে পল্লব ঐ ট্রেনটাতে উঠতে চায়। তারপর চাঁদটাকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। কতোদিন হয়ে গেলো, নাদানটা ট্রেনে উঠলো, নামার নামই নিচ্ছে না। এভাবে তো আর চলতে পারে না, তাই না? নাদানটাকে খুঁজে না পেলে কিভাবে হবে? পল্লবের প্রতিদিন দম আটকে আসে। বুকের ভিতর কী যে কষ্ট লাগে। ওসবের একটা উপশমের প্রয়োজন আছে না?
কিন্তু এই ট্রেনটা তো থামছেই না। পল্লবের ইচ্ছা করলো ট্রেনটাকে বলতে, যেনো তার জন্য থেমে যায়। কিন্তু ঠোঁট ফুঁড়ে কথা বের হলো না। কিভাবে বলবে, সেটাও গুছাতে পারছে না। পল্লবের এই তালগোল অবস্থায় ট্রেনটি তাকে প্রায় ক্রস করে গিয়েছে। তবুও কিছু করতে পারছে না ছেলেটা। ট্রেনটি যখন পল্লবকে একেবারে ছাড়িয়ে যেতে নিলো, তৎক্ষণাৎ শেষের বগির জানালা থেকে উঁকি দিলো একটা মেয়ে। ঠোঁটে তার অমলিন হাসি, চোখে কাজল টানা, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, মুখশ্রীতে ভারী মেকআপের আস্তরণ, কপালে টিপ, পরনে পল্লবের দেওয়া তাঁতের নীল শাড়ি। মেয়েটা পল্লবের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে ইশারা করে বললো—
— কিরে, আয়!! দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? আয় না, চলে যাচ্ছি তো আমি। এই পাগল!! আসবি তো নাকি? আয়!!
,,,, হকচকিয়ে উঠলো ছেলেটা। এক সেকেন্ড ভাবার সময়ও নিলো না। ছুটে গেলো ট্রেনের পিছু পিছু। চিৎকার করে ডাকলো — চাঁদ!! দাঁড়া, একটু দাঁড়া। ওদের থামতে বল, আমি আসছি। চাঁদ!! এই নাদানের বাচ্চা!! থাম। তকে হাতের কাছে পেলে মেরে ফেলবো আমি, খোদার কসম। থাম না, চাঁদ!!
,,,, ডাকতে ডাকতে ট্রেনের পিছু পিছু ছুটতে লাগলো ছেলেটা। ট্রেন আর পল্লবের মধ্যকার দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। ঐ তো চাঁদ হাসছে, পল্লবকে ডাকছে। পল্লব পায়ের গতি বাড়ালো। শরীরে যতখানি শক্তি রয়েছে, সব শক্তি প্রয়োগ করে পায়ের গতি বাড়িয়ে এগিয়ে গেলো ট্রেনের পিছু পিছু। ছুটতে ছুটতে আকস্মিক ট্রেনের বগির সাথে বাড়ি খেলো ছেলেটা। ছিটকে গুনে গুনে এগারো হাত দূরে আছড়ে পড়লো। মুহূর্তেই ধাম করে শব্দ তুলে মাথায় তীব্র আঘাত পেলো। নাক, মুখ, কান গলিয়ে রক্ত গড়ালো অবিরত। বুকের পাঁজর ভেঙেছে বোধহয় কয়েকটা। মেরুদণ্ডটা ভেঙেছে নিশ্চিত। অথচ ছেলেটার তাতে কোনো ভাবাবেগ নেই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পাষাণ নাদানের বাচ্চার দিকে। মেয়েটা এখনো অনবরত হেসে যাচ্ছে আর হাতের ইশারায় পল্লবকে ডাকছে। পল্লবও হাত বাড়িয়ে রেখেছে সেদিকে। এতো ছুটার পরেও মেয়েটাকে ছুঁতে পারলো না। ঠিকই দূরে সরে গেলো বেয়াদবটা।পল্লবের ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো — মারবো না, বিশ্বাস কর, মারবো না। তুই ছাড়া আমি মরে যাবো। ফিরে আয়, চাঁদ!! আমার চাঁদ!! চাঁদ!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৭০
,,, বলতে বলতে কেশে উঠলো ছেলেটা। কাশির সাথে সাথে বেরিয়ে এলো একদলা রক্ত। বাড়িয়ে রাখা হাতটা অবশ হয়ে আছড়ে পড়লো কনা-ঢালা রাস্তায়। চোখজোড়া নিভু নিভু হয়ে এলো। সেই নিভু নিভু চোখে দেখলো, নাদানের বাচ্চাটা চলে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে দূরে। পল্লব হাত উঁচিয়ে আবার ডাকতে চাইলো, তবে শক্তি মিললো না। ঠোঁট ফুঁড়েও কথা বের হচ্ছে না। তবে তার মস্তিষ্ক হতে প্রবাহিত হলো দুটো লাইন—
,,,, তারে ধরতে পারলে মনো বেড়ি
দিতাম পাখির পায়,,,,
কেমনে আসে যায়, খাঁচার ভিতর
অচিন পাখি কেমনে আসে যায়,,,,
সমাপ্ত
