অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৫+১৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
১২- ই নভেম্বর, আজকের এই দিনটি সবার কাছে সাধারণ মনে হলেও, এহসান ভিলার প্রতিটা সদস্যের নিকট এটি একটি বিশেষ দিন। কারণ এই দিনটিতে এই পরিবারের একমাত্র কন্যাসন্তান ”আনিকা এহসান ইরা” বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে আগমন করেছিলো পরিবার টিতে। তার দরুণ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রত্যেক বছরের মতো এইবারও ছোটখাটো একটা আয়োজন করা হয়েছে এহসান ভিলায়। আয়োজন উপলক্ষ্যে অনিলদের সকল আত্মীয় স্বজন ও কিছু সুপরিচিত প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অনিলের মামার বাড়ি লোকজন এসেও গেছেন। বাকিরাও এসে পৌঁছে যাবেন বিকেলের মধ্যেই। সকাল থেকেই হীরা ও নাজিয়া বেগম খেটেই যাচ্ছে, দম ফেলার সময়টুকুও নেই তাদের। যদিও নাজিয়া বেগম বারবার হীরাকে বলছেন সে সামলে নিবেন, হীরা যেন বিশ্রাম করে গিয়ে। কে শুনে কার কথা? হীরা নাজিয়া বেগমকে এক গাঁদা কাজের মাঝে একলা ছেড়ে চলে যাবে- এতটাও খারাপ বউমা সে নয়। মানছে সে বুঝে কম, ছোটো একটা মেয়ে তবে তার মায়ের থেকে সংসারের ব্যাপারে অনেক কিছুই শুনেছে সে। আর সেইগুলো সর্বদা মেনে চলে সে।
নিলয়ের সাথে ফোনে কথা বলছে অনিল। কখন আসবে- সেই বিষয়েই প্রশ্ন করছে নিলয়কে। নিলয় জানালো বিকেলের মধ্যে চলে আসবে। কল রেখে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলো অনিল। তখনই হন্তদন্ত পায়ে রুমে প্রবেশ করলো হীরা। নাজিয়া বেগম এক প্রকার জোর করেই তাকে পাঠিয়েছে। বলেছে ফ্রেশ হয়ে নিচে যেতে, কিছুক্ষনের মধ্যেই সবাই চলে আসবে, সে যেনো সুন্দর হয়ে থাকে সবার সামনে, সবাই তাকে দেখবে। বলেই ঠেলে ঠুলে রান্নাঘর থেকে বের করে দিয়েছে তাকে। হীরা এগিয়ে গিয়ে ওয়ারড্রপ থেকে নাজিয়া বেগমের বলা শাড়িটা বের করলো। শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমের দিক হাঁটা দিতেই মনে পরলো অনিলের গতকাল রাতে বলা কথা। এইবার সে ছোট ছোট পা ফেলে অনিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হীরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনিল ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে হীরার দিক তাকালো। ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ কী চাই। ”
“ আম্মু বললো আজকে শাড়ি পরতে। আমি বলেছি আপনি নিষেধ করেছেন তাও বললো আজকের জন্য পরতে, সবাই নাকি আমাকে দেখবে তাই। ”
কিছুটা ইতস্তত বোধ নিয়ে উত্তর করলো হীরা। তার কথায় অনিল কিয়ৎক্ষণ ভেবে উত্তর করলো,
” আচ্ছা আজকে পরো, এরপর যেন আর না দেখি। ”
তার কথায় বাধ্য মেয়ের মতো মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল হীরা। অতঃপর অনিল আবারও কাজে মনোযোগ দিলো।
কিছুক্ষনের মধ্যেই ওয়াশরুমের দরজা খট করে খোলার শব্দে সেদিকে তাকালো অনিল। তাকাতেই চোখ আটকে গেলো খয়েরী পেড়েযুক্ত ক্রিম কালারের জামদানি শাড়ি পরিহিতা কিশোরীর পানে। যার কোমড় সমান ভিজা চুল থেকে টপ টপ করে পানি পরছে এখনো, শরীরের অনেকাংশ ভিজে যাচ্ছে তাতে। কিশোরীটি আপ্রাণ চেষ্টা করছে তোয়ালে দিয়ে সেই পানি আটকানোর জন্য। তাও অবাধ্যের মতো ঝরে যাচ্ছে তারা। এইদিকে তোয়ালে দিয়ে চুলের পানি মুছতে মুছতেই এগোচ্ছিল হীরা, সামনে এসে অনিলের এমন চাহনিতে পা দুটো থেমে গেলো তার। চোখ পিটপিট করে অনিলের দিকে তাকালো সে।
এভাবে কী দেখছে উনি? সামনে পিছনে তো কিছুই নেই তো কী দেখছে এভাবে? তাকে দেখছে কী! ভাবতেই শিউরে উঠলো হীরা। চঞ্চল চোখ দুটোতে এইবার ভিড় করলো লজ্জা নামক এক নতুন অনুভূতি। আজকাল প্রায়ই এই অনুভূতি টা গ্রাস করে হীরাকে। গতকালও যখন অনিলের অ্যাপ্রন পড়ে ঘুমিয়ে পরেছিল, সকালে ঘুম ভাঙতেই তা দেখে লজ্জারা গ্রাস করেছিল তাকে। অনিলের সামনেই আসতে পারে নি লজ্জায়। কী ভাবলেন উনি? আর সে বিছানায়ই বা এলো কী করে? অনিল কী তাকে কোলে করে এনেছিল ? ভাবতেই গাল দুটো রক্তিম হয়ে গিয়েছিলো তার। পুরোটা দিন অনিলের থেকে পালিয়ে বেরিয়েছিল সে। সহসা কারো কলের শব্দে হুশ ফিরলো অনিলের। সাথে সাথেই হীরার থেকে চোখ সরিয়ে নিলো সে। পরপর ব্যাস্ত হলো কথা বলায়। হীরাও স্বাভাবিক হয়ে রেডি হতে শুরু করলো।
সন্ধ্যার দিক পুরো বাড়ি ভরে গেল মেহমান দ্বারা। অনিলের খালামণিরা, ফুপিরা সকলেই চলে এসেছেন। সকলে এসেই হীরাকে দেখতে উঠে পড়ে লেগেছেন। তারা সকলেই ফোনে শুনেছিলো অনিলের বিয়ের কথা। শুনে খানিকটা রাগ ও হয়েছিলো তবে নাজিয়া বেগম যখন বলেছেন তিনি নিজেও জানতেন না বিয়ের কথা মেয়ের অণ্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছিলো তাই অনিল অকস্মাৎ কাউকে না জানিয়েই বিয়ে করে নিয়ে এসেছে তখন সকলেরই রাগ উবে যায়। সকলেই তখন হীরাকে দেখার আশায় বসে ছিলো। কারণ যেই ছেলে কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকানো তো দূর উল্টো তাদের থেকে নিজেকে সর্বদা দূরে রাখার চেষ্টা করেছে সেই ছেলে কিনা একটা মেয়েকে বিয়ে থেকে এনে বিয়ে করে ফেলেছে! নিশ্চই মেয়েটা অনেক সুন্দরী হবে। আর হলোও তাই সবায়ই হীরাকে দেখে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছে। যেমন সুন্দর মেয়ে তেমনই সুন্দর ব্যাবহার সকলেই মুগ্ধ হয়েছে হীরাকে দেখে। রান্না ঘরে সবার জন্য নাস্তা বানাচ্ছিল হীরা। সহসাই অনিল কোথা থেকে যেন এসে হীরার হাত টা ধরে ড্রয়িং রুমে নিয়ে যেতে লাগলো। হীরা অবাক হয়ে বললো,
“ আরে আরে কী করছেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। ”
“ মারতে নিয়ে যাচ্ছি তোমায়! এতগুলো ডাক দিলাম কানে যায়নি? ”
“ এতো মানুষের মাঝে শুনতে পাই নি। কেন ডেকেছিলেন? ”
“ আমার স্যার এসেছেন, তোমার সাথে দেখা করাতে বলেছেন। ”
বলেই হীরার হাত ধরে একজন বয়স্ক পুরুষের সামনে নিয়ে দাঁড় করলো। তারপর লোকটির উদ্দেশ্যে বললো,
“ সি ইজ মাই ওয়াইফ। ”
হীরা লোকটিকে আপাদমস্তক দেখে লোকটির উদ্দেশ্যে সালাম দিলো। লোকটি সালামের জবাব দিয়ে সৌজন্য হাসলেন। তারপর হীরার সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করলেন।
আলাপ আলোচনা শেষ করে হীরা রান্নাঘরে এসে নাস্তা হাতে ড্রয়িং রুমের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলো। ইতিমধ্যে প্রতিবেশীরাও চলে এসেছে। ট্রে হাতে ছোটো ছোটো পা ফেলে সবাইকে গিয়ে নাস্তা প্রধান করলো হীরা। আসতে নিবে তখনই এক প্রতিবেশী আন্টি বলে উঠলেন,
“ তোমার বাড়ি কোথায় গো বউমা? ”
তার কথায় হীরা কিছুটা ইতস্তত করেই বললো,
“ কুমিল্লা ”
” ওমা তা তো বেশ দূরে, সেখান থেইকা আমাগো অনিলের সাথে সম্পর্ক হইলো কেমনে? তো তোমার বাবার নাম কী? কুমিল্লার কোন জায়গায় থাকো তুমরা? ”
তার কথায় এইবার পাশে বসে থাকা নাজিয়া বেগম বললেন।
“ আপা এতো কিছু জেনে লাভ কী? আপনি চা খান চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। হীরা মা তুই আনিকার কাছে যা তো। ”
” আরে কী বলো জানা লাগবো না, এমনে কোনো কিছু না জাই নাই কী মেয়েরে ঘরে জায়গা দিয়া দিছো নাকি তুমি? মাইয়া কইত্তে না কইত্তে আইলো তা জানবা না। এখনকার যেই জামানা মাইয়া কইত্তে না কইত্তে আইয়া তুমার এই ভালো পোলাডারে ফাঁসাইছে আল্লাহ মালুম। ”
কথাটা কর্ণপাত হতেই সামনের দিকে এগোতে নেওয়া পা জোড়া থেমে গেলো হীরার। চোখে এসে ভিড় করলো অশ্রুকণারা। নাজিয়া বেগম এইবার তেতে উঠলেন। তিনি বেশ রাগী কণ্ঠেই বললেন,
“ আপা এইবার কিন্তু বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আপনি আমার ছেলে বউয়ের নামে যা তা বকে যাচ্ছেন। ”
নাজিয়া বেগমের এমন রাগী কণ্ঠে পুরো ড্রয়িং রুমের উৎসুক চোখ এসে পড়লো তার উপর। ড্রয়িং রুমের এক পাশে নিলয়ের সাথে কথা বলছিল অনিল। কিয়ৎক্ষণ আগেই এসেছে তারা। কথা বলার মাঝেই মায়ের এমন তেজী কন্ঠ কর্নপাত হতেই এদিকটায় ছুটে এলো সে। এসে যখন দেখলো হীরার চোখে পানি। সে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ কী হয়েছে আম্মু? ”
“ এইতো অনিল বাবা, দেখনা আমি শুধু তোর বউয়ের পরিচয় জানতে চাইছিলাম আর মা হুদাই কেমনে চেইতা উঠলো ! ”
মহিলাটির কথায় অনিলের কপাল কুঁচকে গেলো। ওভাবেই থমথমে কণ্ঠে সে বললো,
“ কী পরিচয় জানতে চান আপনি? ”
“ এই এমনেই আর কী জানতে চাইছিলাম ওঁর পরিচয়। পরিচয় জানা তো আর দুষের নয়! ”
“ হুম, তাহলে জেনে নিন, ওঁ হচ্ছে ডা. অনিল এহসানের বউ, আর আমি ওঁর স্বামী- এটাই ওঁর প্রধান পরিচয়।”
থেমে আবারও বললো,
“ আর বাকি পরিচয় আপনাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করছি না। বউ আমার তার সম্পর্কে আমার জানা থাকলেই চলবে। আপনাকে এখানে আমার বউয়ের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার জন্য ডাকা হয়নি। ”
বলেই ধুপধাপ পা ফেলে সেখান থেকে চলে গেলো অনিল। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। সে নিষেধ করেছিলো তার আম্মুকে এসব থার্ডক্লাস মহিলাদের না বলতে। এদের কাজই হচ্ছে অন্যের সমালোচনা করা। অথচ নিজের ব্যাপারে কোনো খবর নেই। এসব থার্ডক্লাস মানুষদের দেখলেই রাগ উঠে যায় তার।
“তুই কী হীরাকে ভালোবেসে ফেললি? ”
অনিলের কাধে হাত রেখে তার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করলো নিলয়। তার প্রশ্নে অনিল মেঝের থেকে চোখ তুলে শান্ত দৃষ্টিতে তার দিক তাকালো। বললো,
“ তোর এমন কেন মনে হলো? ”
“ হীরার প্রতি তোর কনসার্ন দেখেই বুঝা যায় তুই হীরাকে ভালোবেসে ফেলেছিস। ”
“ জানিনা ”
“ ওঁ তো রনির প্রাক্তন ছিলো, ওঁকে এতো তাড়াতাড়ি ভালোবেসে ফেললি কীভাবে? ”
কথাটি কর্ণপাত হতেই অনিল তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো নিলয়ের দিকে। বললো,
“ এইযে বললি “ ছিলো ” এই শব্দটির মাঝেই সব উত্তর। যদিও আমি জানিনা আমি ওঁকে ভালোবাসি কিনা, তবে এইটা জেনে রাখ
ওঁ যেদিন আমার নামে কবুল শব্দটি উচ্চারণ করেছিলো সেদিন থেকেই আমার ভালোবাসা ওঁর প্রাপ্ত হয়ে গেছে, তা আজ হোক বা কাল হোক আমি ওঁর সামনেই জাহির করবো। ”
কিয়ৎক্ষণ থেমে আবারও বললো,
“ ওঁ রনির প্রাক্তন ছিলো ঠিক। তবে রনির সাথে এক বছরের প্রেমে একদিন সামান্য দেখা টুকুও করেনি ওঁরা , আর ওঁ তো রনি কেও ধোঁকা দেয়নি, উল্টো ওঁ এতটাই সরল ছিলো যে রনির জন্য গ্রাম থেকে শহরে এসে পরলো। সুতরাং ওঁর মাঝে আমি কোনো খারাপ দিকই দেখতে পাচ্ছি না। শুধু একটাই ভূল ওঁর, রনির জন্য বিয়ে থেকে পালিয়ে আসা। এরকম ভূল কিশোরীরা করেই থাকে আর রনি! ওঁ তো বুঝদার ওঁ কেন হীরাকে আসতে বলেছিলো? ”
“ জানি নারে দোস্ত, রনি তো ঐ ঘটনার পরে আর কলই ধরে না। সীম বন্ধ বলে সবসময়। এসব বাদ দে, তবে আমারও কিন্তু হীরাকে খুব ভালো লাগে দুষ্টু, মিষ্টি, পিচ্ছি একট মেয়ে। একদম খাঁটি হীরা ”
বলেই হাসতে লাগলো নিলয়। তারপর বললো,
“ তোর পিচ্ছি বউকে তো দেখতে পাচ্ছি না। মনে হয় ঘরে গিয়ে কাদঁছে যাহ থামিয়ে নিয়ে আয়। আমি আমার বউয়ের কাছে যাই। ”
বলেই সে অদূরে দাঁড়িয়ে মহিলাদের কথা শুনতে থাকা নীলার দিক হাঁটা ধরলো।
বারান্দার গ্রীলের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হীরা। দেখছে বাইরে অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা জগতটাকে সাথে ভাবছে মহিলাটির বলা এক একটা কথা। আসলেই কী সে অনিলকে ফাঁসিয়েছে? হয়তো তাই, সে ই তো বলেছিলো অনিলকে বিয়ে করার কথা, অনিল না করাতে আবার মরতেও গিয়েছিলো- এটা তো ফাঁসানোই হলো, নাহ? কিন্তু সে তো তখন এসব কথা ভাবেই নি, তার মাথায় শুধু ঘুরছিলো একটাই শব্দ সেটা হচ্ছে “আশ্রয়”। বেঁচে থাকার জন্য একটা ছোট অধিকার। এইটার জন্যই সে বিয়ের কথা বলেছিল। তার ঐ ছোটো মাথায় তখন এটাই ছিলো – সে এখন কোথাও যেতে পারবে না, গ্রামে ফিরে গেলে পরিবার ও গ্রামের মানুষের কথার কারণেই সে শেষ হয়ে যাবে। একটা মেয়ে যখন ভূল করে তা মেয়েটির জীবনের সবচেয়ে বড়ো কাল হয়ে দাঁড়ায়, মেয়েদের যে ভূল করার অধিকার নেই, সেই অধিকার যে আমাদের সমাজ একেবারেই কেড়ে নিয়েছে। আজ যদি এই একটাই ভূল ছেলেরা করতো যাদের জীবনে তার কোনো প্রভাবই পড়তো না- এটাই আমাদের সমাজের নির্মম বাস্তবতা। ভাবতে ভাবতেই আবারো গাল বেয়ে ঝরে পরলো অশ্রুকণা। এভাবেই কাঁদতে কাঁদতে গেলো কিছুক্ষন। সহসা পাশে এসে দাঁড়ালো কেউ, হীরা বুঝতে পারছে সে ব্যাক্তিটি কে, তবে পিছন ফিরে দেখার ইচ্ছে হলো না। বাহিরেই তাকিয়ে রইল সে।
“ কিশোরীরা বুঝি একটু বেশিই কান্না করে? ”
নিরবতা ভেঙ্গে বলে উঠলো অনিল। তার প্রশ্নে হীরা থমথমে কণ্ঠে বললো,
“ জানিনা। তবে কিশোরীরা ভূল করে বেশি এইটুকু জানি। ”
“ সেদিন আমায় একজন কিশোরী বলেছিলো, আমার মতো পূরুষ যেন প্রত্যেকটা কিশোরীর জীবনে এসে তাদের জীবন গুছিয়ে দেয়। তবে আমার তো মনে হচ্ছে আমি সেই কিশোরীটিকে ঘুছাতে নিতান্তই ব্যার্থ। ”
“ আমি আর নিজেকে গুছাতে চাই না। এতটা অগুছালো হতে চাই যতটা অগুছালো হলে এই ইহজীবনে আর কেউ আমাকে ভালোবাসবে না আর নাতো আমি কারো মিথ্যা ভালোবাসায় আটকাবো। ”
বলতে বলতেই চোখ দিয়ে গলগল করে বৃষ্টির ন্যায় পানি ঝরতে লাগলো হীরার। এইবার তার দু-বাহু ধরে তাকে নিজের দিকে ঘুরালো অনিল। তারপর হীরার চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,
“ বড্ডো বেশিই কাব্যিক কথা হয়ে গেলো নাহ! কিশোরীদের মুখে কিন্তু এসব কথা এক দময়ই বেমানান। তাদের মুখে শুধু মানায় মিষ্টি মিষ্টি হাসি আর অবুঝ অবুঝ কথা যা হাসাবে তাদের সামনে থাকা বুঝদার মানুষগুলো কেও। ”
“ আমি আপনাকে ফাঁসিয়েছি তাই নাহ? ”
অনিলের দিক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো হীরা। সাথে সাথেই ভেসে এলো অনিলের কন্ঠ,
“ তোমার কী আমাকে ইঁদুর মনে হয়? যে তুমি ফাঁদ পাতলে আর আমি সেখানে ফেঁসে গেছি! ”
অনিলের এমন কথায় মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললো হীরা। চুপ চাপ তাকিয়ে রইলো তার সামনে থাকা বুঝদার পুরুষটির দিকে। পরপর একদম মাসুম স্বরে বললো,
“ তাহলে ঐ আন্টি যে বললো। ”
“ বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন কথা, তা কানে নিলেই হয় মাথা ব্যাথা। আর কিশোরী দের তো আরো আগেই তা কানে নেওয়া উচিত নয় কারণ তাদেরকে বুঝাতে বুঝাতে তাদের সামনে থাকা বুঝদার মানুষগুলোর জীবন হয়ে যায় তেজপাতা। ”
শেষের কথাটা একটু অসহায়ত্ব নিয়েই বললো অনিল। তার এমন কথায় কান্নার মাঝেও হেসে দিলো হীরা। তার হাসি দেখে হেসে ফেললো অনিলও। পরপর বললো,
“ তবে আমার সামনে থাকা কিশোরীটি কিন্তু যথেষ্ট বুঝদার। সে আবার আমার সব কথাই শুনে। তো এখন কী সে আমার সাথে নিচে যাবে? তার একমাত্র ননদিনি কিন্তু তার অপেক্ষা করছে। ”
বলেই নিজের হাত টা হীরার পানে বাড়িয়ে দিলো সে। তৎক্ষনাৎ মুচকি হেসে তার হাতটায় নির্দ্বিধায় নিজের হাত রাখলো হীরা। এই হাতে হাত রাখতে কোনো ভয় নেই, পুরো একটা জীবন অনায়াসেই কাটিয়ে দেয়া যাবে নির্ভয়ে। সে হাত রাখতেই তার ছোট্ট হাতটা মুঠোয় পুরে হাঁটা ধরলো অনিল। অতঃপর দুজনেই চললো ড্রয়িং রুমের উদ্দেশ্যে।
রঙিন হয়ে আছে পুরো ড্রয়িং রুম। আলোতে ঝলমল করছে চারদিক, সেই আলোর মাঝখানেই একটা ব্রাইট হোয়াইট কালারের প্রিন্সেস গ্রাউন পরে অপেক্ষারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে আনিকা। বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে উজ্জল শ্যামলা বর্নের বদন খানায়। তার মূল কারন তার কিছুটা দূরে থাকা মহিলাটি। যিনি কিছুক্ষন আগে তার একমাত্র ভাবি রূপে বান্ধুবীকে কথা শুনিয়েছে। মন তো চাচ্ছে চুল গুলো ছিড়ে ফেলতে ঐ থার্ডক্লাস মহিলার। তবে মনের এই নিষিদ্ধ ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেওয়ার মতো এতোটা অসভ্য সে হয়নি। তাই চুপ চাপ দাঁড়িয়ে নিজের রাগটা সংযত করছে। অবশ্য মহিলাটি ইতিমধ্যে একদম চুপ চাপ হয়ে গেছেন। শুধু অসহ্য কর দৃষ্টি নিয়ে দেখছেন চারিপাশ।
সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হীরা ও অনিলের আগমন ঘটলো। তাদের উপর নজর যেতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো আনিকার। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তার ভাইয়া ভাবীর দিকে। কাধ সমান লম্বা হীরার সাথে একদম পরিপূর্ণ লাগছে তার ভাইয়াকে। দুজন কে একসাথে দেখলে যেনো মনে হয় তার ভাইয়া এক সুবিশাল আকাশ আর হীরা তার একমাত্র চাঁদ। তার ভাবনার মাঝেই সামনে এসে হাজির হলো অনিল ও হীরা। তারা আসতেই তাদেরকে নিজের পাশে নিয়ে দাঁড় করালো আনিকা। সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন নাজিয়া বেগম ও আসিফ এহসান। এইবার পূর্ণ হলো তাদের ছোটো পরিবারটা। অতঃপর সবাই একসাথে হতেই বাবা- মায়ের হাত ধরে কেক কাটার অধ্যায়টা শেষ করলো আনিকা। আশেপাশের সবার মুখে তখন শুনা যাচ্ছে জন্মদিনের সেই জাতীয় গান।
কেক কাটা শেষ হতেই বরাবরের মতো দু-হাতে চামচ তুলে বাবা- মাকে এক সাথে কেক খাইয়ে দিলো আনিকা। ছোটোবেলা থেকেই সে এমন করে কেক খাওয়ায়, বাবা- মাকে সমান প্রাধান্য দিয়ে তাদের দুজনকে এক সাথেই কেক খাওয়ায় সে। তারপর একইভাবে হীরা ও অনিলকে খাওয়ালো সে। এক পর্যায়ে খাওয়ার পর্ব শেষ হয়ে গিফ্টের পর্ব শুরু হতেই, অনিল তার বোনকে একটা স্বর্নের ব্রেসলেট গিফ্ট করলো হীরা ও তার পক্ষ থেকে। তবে একটা গিফট্ পেয়ে খুশি হলো না আনিকা। সে কিছুটা অভিমান নিয়ে বললো,
“ দুজনের থেকে একটা গিফট্ কিন্তু মানবো না আমি। আমার আরো একটা গিফট্ চাই। ”
“ কী লাগবে বল? ভাইয়া এনে দিবো তোকে। ”
“ আমার একটা দুষ্টু মিষ্টি পুচকি ভাইঝি চাই। যে সারাদিন ফুপি, ফুপি বলে ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। ”
তার এমন আবদারে খুক খুক করে কেসে উঠল অনিল। কাশতে কাশতেই তাকালো পাশে থাকা হীরার দিক। লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেছে হীরার কপোল দ্বয়। তাদের এমন কাণ্ডে হেসে ফেললো বাকিরাও। নাজিয়া বেগম হাসতে হাসতেই বললেন,
“ কাশলে হবে না। আমারও কিন্ত নাতি/ নাতনি চাই, পুরনো সঙ্গীর সাথে আর ভালো লাগছে না এইবার নতুন সঙ্গী চাই। ”
শেষ কথাটা আসিফ এহসানের দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি। পরপর আসিফ এহসান ও বললেন,
“ সহমত, সহমত ”
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৩+১৪
আবারো হাসির রোল পরলো। উচ্চ শব্দে হেসে উঠলো সবাই। আর হীরা তো একদম নুইয়ে পরছে লজ্জায়। অনিল সবার অগোচরে বিড়বিড় করে বললো,
“ এদিকে এক পিচ্ছি আবার যদি আসে আরেক পিচ্ছি তাহলে সব মিলিয়ে আমার জীবন হয়ে যাবে লাচ্ছি। ”
