অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৭+১৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
সময় চলছে নিজ গতিতে, তার কারো জন্য অপেক্ষা করার ফুরসত নেই- ইহা তার চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। দেখতে দেখতে কেটে গেল পুরো একটা মাস। সাথে কেটে গেছে হীরার জীবনে থাকা অতীতের সেই ভয়ানক রেশ। সে এখন মেতে আছে বর্তমানের নবীনতায়। আসলে অতীত ভূলা কঠিন নয়, যদি বর্তমানটা সুন্দর হয়। আর তা যদি হয় কোনো নারীর ক্ষেত্রে তবে তো তা আরো সহজ। কারণ নারীরা ভালোবাসার কাঙাল, একটু খানি ভালোবাসা, একটু খানি যত্ন পেলে তারা নিজেকেই ভূলে যেতে পারে -সেখানে অতীত ভূলা আর তেমন কী?
১০৪° জ্বর নিয়ে বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে হীরা। রাত থেকেই জ্বরে ভুগছে মেয়েটা। আর তার সাথে চিন্তায় ভুগছে অনিল। রাত থেকে হীরার শিয়োরে বসে তার মাথায় জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছে অনিল। তবে হীরার শরীরের তাপমাত্রা কমার কোনো নাম নেই। সকাল হতেই নাজিয়া বেগম, আনিকা হীরাকে দেখতে এসেছে। নাজিয়া বেগম এসে নিজের ছেলের অবস্থা দেখে বললেন,
“ তুই একটু বিশ্রাম করে নে বাবা। আম্মু থাকছি হীরার কাছে।”
“ সমস্যা নেই আম্মু। আমি ঠিক আছি। ”
“ তোকে যেটা বলছি সেটা কর, পরে আবার দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়বি। ”
তার কথায় আর কিছু বললো না অনিল। পাশের রুমে চলে গেল একটু খানি বিশ্রামের জন্য। সারারাত জেগে শরীর টা আসলেই খুব ক্লান্ত লাগছে তার। একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে অলস ভঙ্গিতে হেঁটে চলছে আনিকা। উদ্দেশ্য কলেজ গিয়ে পৌঁছানো। ড্রাইভার কাকাকে নিয়ে বাবা অফিস গেছেন, কথা ছিলো অনিল তাকে ও হীরাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। তবে হীরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তা আর সম্ভব হলো না। যদিও অনিলকে বললে অনিল তাকে পৌঁছে দিয়ে আসতো কিন্তু অনিলের শরীরের অবস্থা দেখে সে নিজেই বলে নি। আর এমনিতেও অনেকদিন যাবৎ হেঁটে যাওয়া হয় না তাই আজকে হেঁটে যেতে খারাপ লাগছে না। বরং চারপাশ দেখতে দেখতে আনন্দ নিয়ে হেঁটে চলছে সে। সহসা পিছন থেকে ভেসে আসলো কোনো অপরিচিত পুরুষের কন্ঠ,
“ ও হ্যালো মিস. পাবনা, ধ্যান জ্ঞান কী সব পুঁটলি বেধে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দিয়েছেন? ”
সাথে সাথেই পিছন ঘুরে তাকালো আনিকা। পিছন ফিরতেই দেখতে পেলো ড্রাইভিং সিটে বসে সেখান থেকেই খোলা জানালা দিয়ে নিজের মাথা বের করে তার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক সুদর্শন যুবক। তবে যুবকটি যতটা সুদর্শন তার কথাগুলো ততটাই কুৎসৃত লাগলো আনিকার কাছে। সে কপাল কুঁচকে জবাব দিলো,
“ ও হ্যলো মি. উগান্ডা, আমার ধ্যান জ্ঞান আমার নিজের মাঝেই আছে। মনে হয় আপনার গুলো উগান্ডা চলে গেছে তাই দেখতে পাচ্ছেন না। ”
“ কার ধ্যান জ্ঞান কোথায় আছে তাতো অবস্থান দেখেই বুঝা যাচ্ছে। রাস্তা থেকে সরুন। ”
বলেই জানালার কাঁচ টা লাগিয়ে দিলো যুবকটি। তার কথায় এতক্ষনে নিজের অবস্থানের দিক লক্ষ্য করলো আনিকা। আর সাথে সাথেই বাজ পড়লো মাথায়- প্রায় মাঝ রাস্তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে সে। হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে কখন যে সে এখানে এসে পড়েছে খেয়ালই করেনি সে। তৎক্ষনাৎ তাকালো সামনে থাকা যুবকটির দিকে পরপর একটা মেকি হাসি দিয়ে সাইডে সরে গেলো। সে সরতেই গাড়ি স্টার্ট করলো যুবকটি।
দুপুর বেলা, হীরার শরীরের তাপমাত্রা এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। গতকাল থেকে চুপ থাকা মুখটায় বুলি ফুটছে এখন। নাজিয়া বেগম তাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর সে বিছানায় আধশুয়া হয়ে তার সাথে কথা বলছে। তখনই রুমে ঢুকলো অনিল। হীরাকে মায়ের সাথে কথা বলতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সে। পরপর চলে গেলো ফ্রেশ হতে। কিছুক্ষন পরেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হীরার নিকট এগিয়ে গেলো অনিল। ঠান্ডা হাত টা হীরার কপালে রেখে তাপমাত্রা চেক করলো। ফোন স্ক্রোল করার মধ্যে অনিলের এমন ঠান্ডা স্পর্শে খানিকটা কেঁপে উঠলো হীরা। এর মাঝেই শুনতে পেলো অনিলের নরম স্বর,
“ উঠে বসতে পারবে? ”
তার কথায় ফোন রেখে ধীরে ধীরে শুয়া থেকে উঠে পরলো হীরা। সে উঠতেই অনিল অদূরে তার আলমারি থেকে কী যেনো একটা নিয়ে এলো। সামনে আসতেই সেটা দেখে আঁতকে উঠল হীরা। তৎক্ষনাৎ ছিটকে দূরে সরে গিয়ে বললো,
“ আমি ইনজেকশন দেবো না। ”
“ সামনে এসো হীরা ”
খানিকটা কঠিন স্বরেই বললো অনিল। তবে হীরা ভয় পেলো না উল্টো প্রবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বললো,
“ আমি ইনজেকশন নেবো না। আমাকে ঔষধ দিন আমি ঔষধ খাবো।”
“ তোমাকে যেটা বলছি সেটা শুনো, ঔষধ এর সাইড এফেক্ট প্রবল তাই আমি খুব বেশি জরুরি না হলে ঘরের কাউকেই ঔষধ খেতে দেই না। ”
“ প্লিজ, আমার ভয় লাগে ইঞ্জেকশনে। ”
একবারে বাচ্চাসুলোভ কণ্ঠে বললো হীরা। তারপর অনিলের দিকে মায়াভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো। অনিল হয়তো গলে গেলো কিছুটা। সে এইবার ঠান্ডা কণ্ঠে বললো,
“ আচ্ছা দেবো না। এখানে আসো তুমি, একটা কথা জানানোর আছে তোমায়। ”
“ আপনি মিথ্যে বলেছেন। আমি আপনার কাছে গেলে আপনি আমায় ইনজেকশন দিয়ে দিবেন। ”
“ ওকে, তোমার যদি শুনার ইচ্ছে না থাকে তাহলে আর কী করার। ”
বলেই চলে যেতে নিলো অনিল। যেতে নিতেই তড়িঘড়ি করে তাকে এসে আটকে দিলো হীরা। বললো,
“ বলুন আমি শুনবো। ”
কথাটি কর্ণপাত হতেই হীরার অগুচরে হাসলো অনিল। ঘুরে তাকালো হীরার দিক, পরপর হীরার সামনে বসে বললো,
“ চোখ বন্ধ করো। ”
তার কথায় কপাল কুঁচকে গেলো হীরার। বললো,
“ চোখ কেন বন্ধ করবো? ”
“ আমি বলেছি তাই। ”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখটা বন্ধ করলো হীরা। সে চোখ বুজতেই তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেলো অনিল। ফিসফিসিয়ে বললো,
“ আই…. ”
বলে তাকালো হীরার মুখপানে। বুঝতে চাইলো হীরার মনোযোগ। হীরার সম্পূর্ণ মনোযোগ তার কথার মাঝে দেখে পাশে থাকা ইনজেকশন টা নিয়ে হীরার হাতে সুই ফুটিয়ে দিতে দিতে কানের কাছে বললো,
“ আই.. অ্যাম স্যরি। ”
হাতে সুই ফুটতেই ব্যাথায় ”উফফ” শব্দ করে উঠলো হীরা। যদিও খুব বেশি ব্যাথা লাগেনি তবে সহসা এভাবে ফুটানোর কারনে ভয় পেয়েছে খুব। সাথে সাথেই চোখ খুলে ছলছল নয়নে অনিলের দিকে তাকালো সে। বললো,
“ ভন্ড ডাক্তার সাহেব ”
“ কিহ্ ”
অবাক হয়ে বললো অনিল। সাথে সাথেই হীরা কাটকাট কণ্ঠে জবাব দিলো,
“ ঠিক ই বলেছি আমি। আপনি ভন্ডামি করেছেন আমার সাথে। আমার মনে আশা জাগিয়ে নিজের কাজ হাসিল করেছেন। ”
তার কথায় খানিকটা হাসলো অনিল। তারপর হীরার দিক ঝুঁকে রসিকতা নিয়ে বললো,
“ আজকাল কিশোরীদের মাথার কী শুধু আজেবাজে কথাই ঘুরে? ”
“ জানিনা ”
রাগ নিয়ে কথাটা বলে সাথে সাথেই কাঁথা টেনে শুয়ে পরলো হীরা। তার কাণ্ডে হাসলো অনিল। অতঃপর নিচে গিয়ে খাবার খেয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে। আজকে শুধু তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত রোগী ভিজিট করে চলে আসবে সে- বলে গেলো নাজিয়া বেগম কে।
ঘড়িতে তখন রাত মাত্র ৭ টা। হীরা পড়ার টেবিলে বসে পড়ছে, শরীরের তাপমাত্রা এখন প্রায় স্বাভাবিক। তার পড়ার মাঝেই নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো অনিল। এসেই হীরার শরীরের তাপমাত্রা চেক করলো। শরীর এখনো হালকা গরম, রাতে যেনো আর জ্বর না উঠে সেটা নিশ্চিত করতেই আরেকটা ইনজেকশন দেওয়া উচিত। ভেবেই ইনজেকশন বের করলো। তবে তা দেখে হীরা দুপুরের মতো আর পালালো না উল্টো চেয়ার ঘুরিয়ে অনিলের দিক ফিরে বসলো। একটিবার ও তাকালো না অনিলের দিক। সবকিছুই লক্ষ্য করলো অনিল। তবে কিছুই বললো না, চুপচাপ ইনজেকশনটা দিয়ে দিলো। হীরাও মুখ বুঁজে ব্যাথা টুকু সহ্য করে নিলো টু শব্দও করলো না। সহসা হীরার অভিমানি মুখপানে চেয়ে গলায় থাকা স্টেথোস্কোপটার দু- মাথার ধরে লতাটা হীরার পিঠে ঠেকিয়ে বেশ জুরে টান মারলো অনিল। সাথে সাথেই হীরা মুখ থুবড়ে পড়ল অনিলের বুকে, খামছে ধরলো অনিলকে। মুখ তোলে অনিলের দিক তাকাতে নিবে তার আগেই এক অপ্রত্যাশিত কান্ড ঘটালো অনিল। নীল রঙের একটা টু পিস পরে ছিলো হীরা, ঢিলেঢালা জামার হাতা টা উপরে তোলে যেখানটায় ইনজেকশন দিয়েছিল ঠিক সেখানটায় ঠোঁট ছুঁয়ালো সে। পরপর আরো একবার ঠোঁট ছুঁইয়ে আদুরে গলায় বললো,
“ ব্যাথা কমেছে? ”
এইদিকে কথা বলবে তো দূর, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি টুকুও হারিয়ে ফেলেছে হীরা। অনিলের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ছুঁয়ায় নড়ে উঠেছে তার সমস্ত সত্ত্বা, চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে অনিলকে আরো খামছে ধরেছে। তার শরীরের কাঁপনি উপলব্ধি করলো অনিল। এইবার সে হীরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
“ যেদিন এই আমিটাকে সামলাতে পারবে সেদিন আমার সাথে অভিমান করো, তা নয়তো ক্ষতি তোমারই। ”
বলেই হীরাকে ছেড়ে দিয়ে সে ফ্রেস হতে চলে গেলো। সে যাওয়ার মিনিট খানেক পর পিটপিট করে চোখ খুললো হীরা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে তার। টেবিলে থাকা পানির বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেলো সে, স্বাভাবিক হলো কিছুটা। তারপর সহসাই লজ্জায় মুখ ঢেকে হেসে ফেললো। “ এখন সে কী করে তার ডাক্তার সাহেবের সামনে যাবে? ইয়া আল্লাহ, কী লজ্জা! কী লজ্জা! ভাবতে ভাবতেই আবারো হেসে উঠলো। তারপর হাওয়ায় হাত মেলে দিয়ে অশান্ত মনে গেয়ে উঠলো,
“ চোরাবালির পিছুটানে , বুঝিনা এই-
ভাষার মানে…
অশান্ত মন কী উচাটন খোদা জানে…”
কিয়ৎক্ষণ থেমে আবারও পড়ার বই গুলো গুছাতে গুছাতে বললো,
“ ঘরের কাজে সকাল সাঁঝে, জিওমিতির
ভাঁজে ভাঁজে…
কিসের ছায়া, এই কোন মায়া???
বুঝি না যে….”
“মাইনকার চিপা” কতো প্রকার ও কী কী তা ক্ষণে ক্ষণে উপলব্ধি করতে পারছে হীরা। তার সামনেই আশা নিয়ে বসে আছে তার একমাত্র ননদ ও শাশুড়ি। তাদের সামনে নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেও ভিতরে ভিতরে শাশুড়ি আর ননদের দেওয়া বাঁশটা এখনো হজম করতে পারছে না সে। তার ভাবনার মাঝেই নাজিয়া বেগম তাড়া দিয়ে বললেন,
“ আরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন তাড়াতাড়ি যা। আমি জানি তুই- ই পারবি অনিলকে রাজি করাতে। ”
“ যেখানে উনি কখনোই কাজ ছেড়ে কোনো জায়গায় যায়নি সেখানে এইবার আমি বললে কী যাবে বলে মনে হয় আপনার? ”
কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতেই বললো হীরা। অথচ তার অসহায়ত্ব কে সম্পূর্ন উপেক্ষা করে নাজিয়া বেগম আবারও বললেন,
“ যাবে যাবে নিশ্চই যাবে। তুই গিয়ে এমন ভাবে বলবি যেন ওঁ যেতে বাধ্য হয়। আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি যা তো, তুই তো আমার জিনিয়াস বউমা আমি জানি তুই পারবি। ”
তার কথায় আর কিছুই বলতে পারলো না হীরা। চুপচাপ হাঁটা ধরলো রুমের উদ্দেশ্যে। আসলে দুদিন পর অনিলের খালাতো বোনের বিয়ে আর সেখানেই যেতে হবে তাদের; কিন্তু সমস্যা হলো অনিল। সে নাকি আজ অব্দি কারো ভাষায় গিয়ে থাকেনি। গেলেও যেদিন যেতো সেদিনই এসে পড়তো। তার নাকি নিজের বাড়ি ছাড়া অন্য জায়গায় মন টিকে না। নাজিয়া বেগম হাজার চেষ্টা করেও কখনো রাখতে পারে নি তাকে। তবে এইবার তিনি হীরার উপর পুরো দ্বায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন। এখন হীরাকে যেকোনো উপায়েই হোক অনিলকে রাজি করাতে হবে। কিন্তু সে কী করে রাজি করাবে? সে তো কালকের ঐ ঘটনার পর থেকে অনিলের সামনেই যেতে পারেনি ভালো করে আর এখন কিনা সে ঐ লোককে রাজি করাবে! ঐ গাদ্দার লোক কী তার কথা শুনবে!
হসপিটাল থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে মাত্র ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে অনিল। বিছানায় বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছিলো। এর মাঝেই নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো হীরা। গিয়ে বসল অনিলের অপর পাশটায়। কীভাবে, কী বলে শুরু করা যায় সেগুলো ভাবতে ভাবতেই ছটফট করছে সে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখেই অনিল বুঝতে পারলো হীরার ছটফটানি। সে হীরার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো,
“ কিছু বলবে? ”
“ আসলে দুদিন পর রীতি ( অনিলের খালাতো বোন) আপুর বিয়ে। তাই খালামণি বলেছে সবাই নাকি কালকে যেতেই হবে বাধ্যতামূলক নয়তো ওঁনারা নাকি কখনো আমাদের বাড়িতে আর আসবেন না। ”
কিছুটা থেমে আবারও বললো,
“ খালামণি বলেছিলো আরো আগেই যাওয়ার কথা তবে আম্মু আপনার জন্য বলেছে এতো আগে যেতে পারবেন না। বিয়ের এক- দুদিন আগে যাবেন। আজকে ফোনে কথা বলার সময় আম্মু বলেছিলো বিয়ের দিন যেতে; কিন্তু খালামণি মানেন নি- বলেছে আগামীকালই যেতে হবে। ”
দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাগুলো বলে থামলো হীরা। তাকালো অনিলের মুখপানে তবে অনিল একেবারেই লাপাত্তা। সে এখনো ল্যাপটপ এর মাঝেই মগ্ন, হীরার কথাগুলো শুনেছে কিনা এটাও সন্দেহ। এর মাঝেই অনিল বললো,
“ তারপর? ”
“ তারপর আর কী, আগামীকাল আমরা সবাই খালামণি দের বাড়ি যাচ্ছি। ”
“ ওহ্ , ভালোই তো যাও সবাই। ”
“ যাও মানে কী আপনি যাবেন না? ”
“ নাহ ”
শব্দটি কর্ণপাত হতেই মুখটা চুপসে গেল হীরার। কিছুক্ষন থম মেরে বসে থেকে আবারো মায়াভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
“ ডাক্তার সাহেব ”
“ জ্বি বলুন রুগী সাহেবা ”
“ আপনি এমন কেন? দু-দিনের জন্য গেলে কী হয়! ”
“ না গেলে কী হয়? ”
“ না গেলে আপনার একান্ত রুগী সাহেবাকে দেখবে কে বলুনতো? আমি যদি সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি? ”
এইবার অনিল ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে তাকাল হীরার পানে। সুদীর্ঘ ঘন কালো পল্লব বিশিষ্ট ঐ মায়াবী নেত্রযুগলে রাখল নিজের কঠোর দৃষ্টি। সাথে সাথেই কঠোরতা ভেদ করে বেরিয়ে এলো এক নতুন সত্ত্বা যা সামনে থাকা এই কিশোরীটির কোনো আবদার অপূর্ণ রাখতে নারাজ। কিশোরীটি যাই বলে সে তাই শুনতে চায়- নিজের ভিতরে থাকা এই অবাধ্য সত্ত্বাটাকে অনিল চেয়েও মানাতে পারে না। তার এমন দুটানার মাঝেই হীরা বসা থেকে উঠে তার নিকট এগিয়ে গেলো, দাঁড়ালো একেবারে তার মুখ বরাবর। পরপর আবারও সে মায়াভরা কণ্ঠে বলে উঠলো,
“ প্লিজ চলুন না ডাক্তার সাহেব, আপনি কী আপনার একান্ত রুগী সাহেবাকে এইটুকু সেবা দিতে পারবেন না? ”
“ যদি বলি পারবো না? ”
“ তাহলে আমি আপনার নামে থানায় অভিযোগ করব। বলবো আপনি বউয়ের কোনো কথা শুনেন না তার উপর শুধু অত্যাচার করেন আর…..”
বাকিটা বলতে পরলো না হীরা অনিলকে বিছানা ছেড়ে উঠতে দেখে থেমে গেলো তার কন্ঠনালী। পিছাতে নিবে এর খপ করে তার হাত টা ধরে ফেললো অনিল। হীরার পিঠের সাথে হাতটা হালকা করে পেঁচিয়ে ধরে টান মেরে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। তারপর হীরার মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে বললো,
“ আর? ”
“ কি..ছুনা ”
ঘাবড়ানো স্বরে মিনমিন করে বললো হীরা। বলেই ছটফট করতে লাগলো ছাড়া পাওয়ার। তার এমন কাণ্ডে বাঁকা হাসলো অনিল। বললো,
“ অত্যাচারের সবগুলো ধরন জানা আছে আমার। মনে হচ্ছে এখন থেকে আমাকেও এপ্লাই করতে হবে। ”
“ আমার মতো কিশোরীর উপরে অত্যাচার করলে আপনার কখনো ক্ষমা হবে না। ”
“ তা কিশোরী যে আমার উপর মিথ্যা অভিযোগ করবে সেটার কী ক্ষমা হবে? ”
“ আপনি আমাদের সাথে গেলে আমি অভিযোগ মোটেও করবো না। প্লিজ চলুন না, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ।
“ ওকে বাবা যাচ্ছি আমি। প্লিজ প্লিজ বলে গলা শুকানোর দরকার নেই। ”
“ সত্যি! সত্যি যাবেন ? ”
“ আজ্ঞে হ্যাঁ ”
খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়লো হীরা, ঘটিয়ে ফেললো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ফ্লোরের উপর ভর দিয়ে পা দুটো উঁচু করে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে ফেললো অনিলের গালে। তার এমন কাণ্ডে তার ধরে রাখা হাতটা আপনা আপনিই ছেড়ে দিলো অনিল। অনড় হয়ে গেলো একদম, নিজের ভিতরে আবিষ্কার করলো এক অগুছালো সত্ত্বাকে। এইদিকে হীরা যখন বুঝতে পারলো সে অনিলর গালে চুপু খেয়ে ফেলেছে সাথে সাথেই এতক্ষণের আনন্দে দিশেহারা চেহারাটায় আতঙ্কের ছাপ ভেসে উঠলো। কোনো দিক না তাকিয়েই ছুটে পালালো সে। হীরা যেতেই এতক্ষনের বিস্ময়ের জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো অনিল। পরক্ষনে হীরার ছুটে পালানোর কথা মনে পরতেই ঠোঁট যুগল প্রসারিত করে হেসে উঠলো সে। তারপর আওড়ালো মন গহীনে লুকিয়ে রাখা সে নামটি,
“ অবুঝপাখি ”
“ মায়ের কথা এতদিন শুনিস নি অথচ আজ বউ বললো আর সাথে সাথেই মেনে নিলে। বুঝি বুঝি সবই বুঝি আজকাল মায়েদের দাম নেই বউরাই সব ”
কথাটি কর্ণপাত হতেই খাওয়ার মাঝে বিষম উঠে গেল হীরার। কাশতে কাশতে একদম চোখ দিয়ে পানি এসে পরেছে তার। পাশ থেকে আনিকা পানি এগিয়ে দিতে দিতে মায়ের উদ্দেশ্য বললো,
“ আম্মু এইগুলো কী বলছো! তুমিই তো জোর করে পাঠালে হীরাকে।”
আনিকার কথায় বিস্ফোরিত নয়নে নাজিয়া বেগমের দিক তাকালো অনিল। ছেলের তাকানো দেখে নাজিয়া বেগম বললেন,
“ তো কী করবো ? তুই তো আমার কথা শুনিসই না । তাই হীরাকে পাঠালাম। ”
“ নাহ, এটা কিন্তু মোটেও ঠিক নয় তোমরা সবাই মিলে আমার ছেলের জন্য গর্ত খুঁড়বে আর আমার ছেলে সেখানে পরে গেলেই দোষ! ”
বাবার কথায় অনিল অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছে গেলো।সে ভ্রু কুঁচকে তার বাবার উদ্দেশ্যে বলল ,
“ তারা তো অন্তত গর্ত খুঁড়ে সেখানে ফেলেছে আর তুমি তো আমাকে আকাশ থেকেই ফেলে দিলে! আজকে আমার পক্ষ নেওয়ায় উদ্দেশ্য কী? ”
“ আপাতত কোনো উদ্দেশ্য নেই যেটা ছিল সেটা আমার একমাত্র গুণধর বউমাই হাসিল করে ফেলেছে। তাই আজকে আমার বউমাকে খুশি করতে তোমার পক্ষ নিলাম। ”
“ বাবা তোমরা সবাই কিন্তু আমার ভাইয়ার সাথে অন্যায় করছো। আমি কিন্তু এটা মেনে নিবো না। ”
“ থাক বইন তুই আর আমার পক্ষ নিয়ে আমায় অপমান করিস না। ”
অনিলকে এমন অসহায় ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে হেসে ফেললো সকলে। আনিকা হাসতে হাসতেই বললো,
“ আরে ভাইয়া মন খারাপ করো না ভাবি কিন্তু তোমার পক্ষে। ”
তার কথায় অনিল হাসলো খানিকটা। তবে হীরা একদম চুপটি মেরে এক পাশে বসে আছে। সে এখনো অনিলের দিকে তাকাতেই পারে নি নিজের অমন লজ্জাজনক কাজের জন্য। অপরদিকে নাজিয়া বেগম অপলক দৃষ্টিতে নিজের ছেলের দিক তাকিয়ে আছেন। তার যেই ছেলেটা কখনো ঠিক করে কথাই বলতো না কারো সাথে সে ছেলে এখন কী সুন্দর আনন্দ করছে সবার সাথে। সবই এই মিষ্টি মেয়েটার কারণে- ভাবতে ভাবতেই হীরার নুইয়ে রাখা মুখের দিক তাকিয়ে প্রশান্তির হাসি হাসলেন তিনি।
খাবারের পর্ব চুকিয়ে সবাই ঘুমোতে চলে গেছেন। তবে হীরা এখনো রুমে যায়নি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে সে, ভাবছে কী করে রুমে যাবে? মন চাইছে যেভাবেই হোক উনার গাল থেকে গিয়ে চুমু টা ফিরিয়ে আনতে। ছি! আল্লাহ কী ভাবলেন ওঁনি। এসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতেই অনেকটা সময় কেটে গেলো। এইদিকে হীরাকে এখনো রুমে আসতে না দেখে অনিল আনিকাকে মেসেজে করলো,
“ তুই ঘুমাবি কখন? ”
সাথে সাথেই আনিকা রিপ্লাই করলো,
“ মাত্রই শুলাম, কেন ভাইয়া? ”
তার কথায় কপাল কুঁচকে গেলো অনিলের। বুঝতে পারলো হীরা ওখানে নেই। তবে কোথায় গেলো ওঁ? বিছানা ছেড়ে উঠে পরলো সে। আনিকাকে রিপ্লাই করলো, ”এমনেই”। তারপর নিচে গিয়ে। খুঁজতে লাগলো হীরাকে। রান্নাঘরে লাইট অন দেখে সেখানটায়ই গেলো প্রথমে। সেখানে গিয়ে দেখলো হীরা হাঁটছে আর কী যেনো ভাবছে। অনিল ধমকের স্বরে বলল,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১৫+১৬
“ এই মেয়ে এখানে কী করছো তুমি। ”
সহসা এমন ধমক শুনে ভয়ে লাফিয়ে উঠলো হীরার অন্তরাত্মা। সে পিছন ফিরে অনিলের উদ্দেশ্যে রাগী স্বরে বললো,
“ আজব তো আপনি কী হার্ট অ্যাটাক করাতে চাচ্ছেন না আমার! ”
