অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩+৪
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
রূমে গিয়ে চুপ চাপ সোফায় বসে আছে হীরা। পর্যবেক্ষণ করছে অনিলের রুমটা। অনিল ওয়াসরুমে ফ্রেস হচ্ছে এই সুযোগে রুমটা ভালো করে দেখতে পারছে সে। সহসা চোখ পড়লো অনিলের অ্যাপ্রোন এর দিকে সেখানে গুটিগুটি অক্ষরে লেখা, “Dr. Onil Ehsan”। এই প্রথম অনিলের পুরো নাম অবগত হলো তার। এর মাঝেই ওয়াশরুমের দরজা খোলে বাইরে বের হলো অনিল। শুধু প্যান্ট পরে তোয়ালে হাতে বের হয়ে এসেছে সে। তাকে এমন অবস্থায় দেখে তৎক্ষণাৎ চোখ ফিরিয়ে নিলো হীরা। অনিলও কিছুটা ইতস্তত বোধ করলো। সে ভুলেই বসেছিলো আজ থেকে এই পিচ্ছি মেয়েটারও তার কক্ষে আনাগোনা চলবে। নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখেই ওয়ারড্রপ থেকে একটা গেঞ্জি পরে নিলো সে। তারপর হীরাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
” তোমার কি এভাবেই সারা রাত কাটানোর প্ল্যান আছে নাকি?”
অনিলের কথার অর্থ বুঝতে পেরে হীরা ইতস্তত করে বললো,
“আমি তো কিছুই আনি নাই সাথে কইরা।”
সাথে সাথেই অনিল আনিকার উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ল। সে ভুলেই বসেছিলো এই মেয়েতো স্বাভাবিক ভাবে এই বাড়িতে আসেনি। আনিকা আসতেই তাকে হীরার জন্য কাপড়ের ব্যাবস্থা করতে বললো অনিল। কিছুক্ষনের মধ্যেই আনিকা তার অব্যবহৃত কিছু টু-পিস জামা নিয়ে আসলো। সেখান থেকেই একটা কালো খয়েরী রঙের জামা নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো হীরা। আনিকা ও হীরা দুজনের শরীরের গঠন প্রায় একই হওয়ায় জামাটা একদম ফিট হয়েছে তার গায়ে। সহসা ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে সেদিকে তাকালো অনিল। তাকিয়েই অবাক হলো সে। কিছুক্ষন আগেও যেই মেয়েটাকে একটা বাচ্চা মেয়ে মনে হয়েছিলো এখন তাকে পরিপূর্ন অষ্টাদশী লাগছে। সাধারণ একটা কামিজেই কতটা স্নিগ্ধ লাগছে মেয়েটাকে। অনিলের এমন চাহনিতে অসস্তিতে পড়ে গেলো হীরা। সে কনফিউজড হয়ে গেছে তাকে কি বেশি জঘন্য লাগছে নাকি বেশি সুন্দর লাগছে। তার ভাবনার মাঝেই শুনা গেলো অনিলের গম্ভীর কন্ঠ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
” বিছানায় শুয়ে পড়ো। আমি সোফায় ম্যানেজ করে নেব।”
সবে মাত্র সোফার দিকে হাঁটা ধরেছিলো হীরা। অনিলের কথা কর্ণপাত হতেই সে থেমে গেলো। পরপর সোফার দিকে আবারও হাঁটা দিয়ে বললো:
“আমি সোফায় ঘুমাইতে পারমু। সমস্যা…..”
” চুপ চাপ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমি এক কথা বারবার বলতে পছন্দ করি না। আর হ্যাঁ এখন থেকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে তুমি।”
হীরার কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই বলে উঠলো অনিল। এইবার বাধ্য মেয়ের মতো বিছানার দিকে হাঁটা ধরলো সে। অতঃপর লাইট অফ করে অনিল ও শুয়ে পড়লো সোফায়।
গভীর রাতে হঠাৎ কারো নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো অনিলের। চোখ খুলে বিছানার দিক তাকাতেই দেখতে পেলো কান্নার সাথে ক্ষণে ক্ষণে শরীর কেঁপে উঠছে হীরার। কিয়ৎক্ষণ হীরাকে লক্ষ্য করে নিরবতা ভেঙ্গে অনিল বলে উঠলো:
“ভূল জায়গায় নিজের মূল্যবান অশ্রুকণা বিসর্জন দিলে জীবনের সুন্দর অধ্যায়গুলোর দেখা কখনোই পাবে না মেয়ে। অতীতকে যেতে দেও, বর্তমানকে মেনে নাও, তবেই কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যত তোমার দোয়ারে আসবে।”
বলেই উল্টোদিকে ফিরে ঘুমে মনোযোগ দিলো সে। তার কথায় কান্না একেবারেই থেমে গেছে হীরার। সে এপাশে ঘুরে অনিলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই তাকিয়ে থেকে হীরা ভাবলো অতীতকে ভুলে যাওয়া কি এতোই সহজ? কি করে ভুলবে সে? তার একটা ভুলের কারণে তার পরিবার ও অনিল সবায়ই কতো জামেলায় পড়েছে। অথচ সে যার জন্য এত বড়ো কাণ্ড ঘটালো। সে কিনা শুধুই তার ভালোলাগা ছিলো। এখনো হীরার চোখে ভাসছে রনির দেওয়া চিঠিটা,
“আমাকে ক্ষমা করে দিও হীরা। আসলে আমি তোমাকে কখনোই ভালোবাসিনি। তুমি শুধুই আমার ভালোলাগা ছিলে। প্রথমে তোমাকে বিয়ের কথা ভাবলেও পরে আমার মনে হলো তোমার সাথে আমি সংসার করতে পারবো না। তুমি গ্রামের একটা সাধারণ মেয়ে আমার সাথে তোমাকে কখনোই মানাবে না। আমাকে ভূলে যাও। আর বাড়ি ফিরে যাও।”
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো হীরা। নিচে গিয়ে দেখতে পেলো নাজিয়া বেগম সকালের নাস্তা তৈরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেও রান্নাঘরের দিক গেলো। সে যেতেই নাজিয়া বেগম বললেন:
“এতো সকালে ঘুম থেকে উঠেছো কেন হীরা?”
“আমার সকালে ঘুম থেকে উঠেই অভ্যাস আন্টি।”
“ওহ আচ্ছা। তোমার বাড়ি কোথায়?”
“কুমিল্লায়”
“কুমিল্লা থেকে কীভাবে পরিচয় হলো অনিলের সাথে।”
কিছুটা অবাক হয়েই বললেন তিনি। তার কথায় অসস্তিতে পড়ে গেলো হীরা। তার অসস্তি ভাব বুঝতে পেরে নাজিয়া বেগম বললেন:
“আচ্ছা ঐসব বাদ দেও। তুমি কিন্তু আমাকে আন্টি বলে ডাকলে আমি মেনে নিবো না। ”
“কি বলে ডাকবো?”
“এখন থেকে “আম্মু” বলে ডাকবে আমায়।”
“আচ্ছা আম্মু”
মিষ্টি হেসে বললো হীরা। তারপর সেও কাজে সাহায্য করতে লাগলো। নাজিয়া বেগম না করাতে বলেছে, “আপনি যেহেতু আমাকে মেয়ে বলেছেন সেহেতু আমাকেও মেয়ের দায়িত্ব পালন করতে দিন।”
তার কথা শুনে নাজিয়া বেগমও আর নিষেধ করলেন না। হীরার এমন কাজে মনে মনে বেশ খুশি হলেন।
খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে সোফায় বসে আছে হীরা ও আনিকা। তখনই সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে আনিকার উদ্দেশ্যে অনিল বললো,
” হীরা কে নিয়ে আজকে মার্কেটে যাস”
বলেই অ্যাপ্রোন হাতে হাঁটা দিলো সে। আর তার কথায় আনিকা শুধু “হ্যাঁ সূচক” ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। তারপর হীরার সাথে কথা বলতে ব্যাস্ত হলো। কথার মাঝেই আনিকা প্রশ্ন করলো,
“তুমি কিসে পড়তে?”
“এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম।”
“ওহ্। পরীক্ষা তো তাহলে আর দেওয়া হলো না। ”
“নাহ, আপনি কিসে পড়েন?”
আনিকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো হীরা। তার প্রশ্নে আনিকা হেসে হেসে জবাব দিলো,
“আমি এইবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ি। আর শুনো, তুমি আমাকে আপনি করে ডেকো না প্লিজ। তুমি করে ডাকলে আমার ভালো লাগবে।”
“আচ্ছা”
ছোটো করেই জবাব দিলো হীরা। এরপর আনিকা তার মা নাজিয়া বেগমকে মার্কেটে যাওয়ার কথা জানালে তিনি উত্তর করলেন তিনিও সাথে যাবেন। দুটো মেয়েকে একা তিনি যেতে দিতে নারাজ। অতঃপর তারা রেডি হয়ে মার্কেটের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আছে হীরা। রাত জেগে তার অভ্যাস নেই। গ্রাম এলাকার মানুষরা খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে আবার সকালেও তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। আর সেই অভ্যাস অনুযায়ী এখন খাবার টেবিলে বসে ঘুমে ঢুলছে সে। সবাই খেয়েদেয়ে শুয়ে পরেছে শুধু সে আর অনিল বাকি রয়েছে। অনিল প্রতিদিনই রাত করে বাড়ি ফিরে আর তার মা তার জন্য অপেক্ষা করে। তবে আজ তিনি অপেক্ষা করতে চাইলেও হীরা মানা করে দিয়েছে। বলেছে, “সে দেখে নিবে”। তার কথাতে প্রশান্তির হাসি হেসেছেন নাজিয়া বেগম। এতোদিন ধরে তিনি এটাই চেয়েছেন- তার ঘরে মিষ্টি একটা বৌমা থাকুক আর সে তার ছেলেকে দেখে রাখুক। তবে অনিলের জন্য পারেনি। আজ তার স্বপ্ন পূরণ হলো। ভাবতে ভাবতেই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চলে গেছেন তিনি।
হীরার ঢুলতে থাকার মাঝেই নিঃশব্দে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলো অনিল। এসেই নজর আটকে গেল টেবিলে বসে থাকা কালো শাড়ি পরিহিতা হীরার পানে। আজকে মার্কেটে গিয়ে তার শাশুড়ি মা তাকে শাড়ি কিনে দিয়েছেন অনেকগুলো। এর থেকেই একটা পড়েছে সে। যদিও আনিকা বলেছিলো থ্রিপিস কিনে দিতে। তবে তিনি শুনেন নি। বলেছেন, “বউদের শাড়িতেই ভালো লাগে”।কারো পায়ের আওয়াজ শুনতেই চোখ তোলে সামনে তাকালো হীরা। সাথে সাথেই নজর সংযত করে ফেললো অনিল। তারপর সামনে এগিয়ে হীরার উদ্দেশ্যে বললো,
“ঘরে না গিয়ে এখানে ঢুলছিলে কেন?”
তার কথায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো হীরা। কি বলবে সে? কি করে বলবে যে সে অনিলের জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমতা আমতা করে সে বললো,
“আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি খাবার দিচ্ছি।”
তার কথায় আর কিছু বললো না অনিল। চুপচাপ ফ্রেশ হতে চলে গেলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই চলেও এলো। সে আসতেই তার সামনে খাবার দিলো হীরা। খাওয়া শুরু করলো অনিল। খাওয়ার মধ্যেই অনিল বললো,
” কালকে থেকে এখানকার স্কুল এ যাবে তুমি। আমি আজকে সব ঠিক করে এসেছি। আর হ্যাঁ আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।”
দ্বিতীয় কথাটায় কোনো মনোযোগ দিলো না সে। তবে প্রথম কথাটায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো তার মাথায়। তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে নিবে তার আগেই অনিল বললো,
” চাকরির কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো, যেখানে মানুষ বি.এ পড়ে চাকরি পায়না সেখান তুমি এসএসসি না দিয়েই কি চাকরি করবে?”
শেষ কথাটা হীরার দিক তাকিয়েই বললো অনিল। তার কথায় একদম চুপ হয়ে গেলো হীরা। আসলেই তো এসএসসি না দিয়েই কি করবে সে। তার ভাবনার মাঝেই অনিল আবারও বললো,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ১+২
“আর হ্যাঁ মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করবে। ঐটা কিন্তু আমার স্কুল। স্যাররা সবাই আমাকে চেনে । সো, কোনো গাফিলতি করা যাবে না ঠিকমতো পড়া চাই।”
তার কথায় ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো হীরা। এরপর খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে দুজনেই ঘুমোতে চলে গেলো।
