অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৫+৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
আজকে এখানকার স্কুলে হীরার প্রথম দিন। কিছুক্ষন আগেই বাড়ির ড্রাইভার কাকা তাদের অর্থাৎ হীরা ও আনিকাকে দিয়ে গেছেন। হীরা এখনো মনোযোগ সহকারে স্কুলের চারিপাশ দেখছে। স্কুলের সাথেই আবার কলেজ ও আছে এই কলেজেই পড়ে আনিকা। তাই দুজনে একসাথেই এসেছে। আনিকা হীরাকে নিয়ে ওর ক্লাস দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলো নিজ ক্লাসে। গুটি গুটি পায়ে ইতস্তত বোধ নিয়ে ২য় বেঞ্চ টা খালি দেখে সেখানেই বসলো হীরা। কিছুক্ষন বাদেই পাশে এসে বসল একটা মেয়ে। মেয়েটার চুল ছাড়া সাথে মুখে আছে বিভিন্ন ধরনের মেকআপ। হীরা হিজাব করে এসেছে তাকে ছাড়া সবায়ই চুল ছেড়ে উড়না ব্যাতিত এসেছে। মেয়েটা তার পাশে বসেই জিজ্ঞেস করলো,
“নাম কি তোমার? আগে তো এই স্কুলে দেখিনি নিশ্চয়ই নতুন?”
“হাফসা নূর হীরা। আজকেই প্রথম এলাম অন্য স্কুল থেকে এসেছি।”
“ওহ্”
“তোমার নাম কি?”
“জারা”
“ফ্রেন্ডস?”
বলেই জারা হাতটা বাড়িয়ে দিলো হীরার দিকে। হীরাও নির্দ্বিধায় হাত মিলালো। সে ভেবেছিলোশহরের মেয়েরা হয়তো অনেক অহংকারী হবে তবে জারার কথা বার্তায় সে এইটুকু বুঝতে পেরেছে জারা ভালো মেয়ে। তাদের কথার মাঝেই ক্লাসে স্যার প্রবেশ করলো। অতঃপর তারা ক্লাসে মনোযোগ দিলো তারা।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সবগুলো ক্লাস ঠিকঠাক ই চলছিলো। তবে ৩য় ক্লাস অর্থাৎ গণিত ক্লাসে এসে শহীদ স্যার হীরার দিকে লক্ষ্য করলেন। হীরার হাতে চুড়ি দেখে কপাল কুঁচকে হীরাকে দাঁড় করালেন তিনি। এর আগের ক্লাসের স্যার এরাও দাঁড় করিয়ে পরিচয় জেনেছে তার তাই কোনোরূপ দেনামোনা ছাড়াই উঠেদাঁড়ালো সে। সে উঠতেই শহীদ স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
” তুমি কি বিবাহিতা? ”
” জ…জ্বি স্যার। ”
” তা এতো অল্প বয়সেই যখন বিয়ের স্বাদ হয়েছে তবে পড়তে এসেছো কেন?”
স্যার এর কথায় ক্লাসের সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। সাথে সাথেই চোখে পানি এসে গেলো হীরার। তারপর থেকে সবগুলো ক্লাসেই নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে হীরা। জারা তাকে অনেক বুঝিয়েছে এই স্যার এমনই উনি সবসময় ছাত্র ছাত্রীদের পিছনে লেগে থাকেন। কাকে কিভাবে অপনান করা জায় এটা খুঁজাই উনার কাজ। তবে তার কথায় শান্ত হতে পারলো না হীরা। এরোকম কটু কথার সাথে এই প্রথম পরিচিত হলো সে। তাই তা খুব জঘন্য ভাবে তার আত্মসম্মানে আঘাত হেনেছে।
গেটের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে হীরা। অনিল নাকি দাড়োয়ান চাচার কাছে কল করে বলেছে তাকে নিতে আসবে। তাই অপেক্ষা করছে সে। আনিকার কলেজ একটার দিকেই ছুটি দিয়ে দিয়েছে। তখন হীরাদের টিফিন টাইম মাত্র। একটা থেকে ৪টা অব্দি তো আর অপেক্ষা করা সম্ভব না তাই তাকে ড্রাইভার কাকা নিতে আসায় সে চলে গেছে। যদিও সে হীরাকে বলেছিল হীরার সমস্যা হলে নাহয় সে অপেক্ষা করবে তবে হীরা বলেছে চলে যেতে তাই আর থাকে নি সে। সহসা গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হলো অনিল। সাথে সাথেই গাড়িতে গিয়ে বসলো সে। হীরা গাড়িতে বসতেই হীরার ফোলা ফোলা চোখ মুখ দেখে অনিলের কপাল কুঁচকে গেলো। তৎক্ষনাৎ সে জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু হয়েছে? ”
” নাহ্। ”
মাথা নিচু করেই উত্তর করলো হীরা। তার কথায় কিছুটা রেগে অনিল বললো,
” কি হয়েছে বলতে বলেছি। ”
ধমক খেয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো হীরা। এতক্ষন নিজের ভিতরে চেপে রাখা অশ্রুকণাদের ছেড়ে দিয়ে অঝোরে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
” আল্লাহ আমায় এতো বোকা কেন বানালো ডাক্তার সাহেব, আমার করা এই একটা বোকামি আমার পুরো জীবনটাই নরক বানিয়ে দিলো!”
হীরার এমন কান্না দেখে বিচলিত হয়ে পড়লো অনিল। কিছুটা নরম স্বরে বললো,
কী হয়েছে বলো? কে কী বলেছে একবার বলে দেখো আমায়। কসম ঐ আরশের অধিপতির তাকে শাস্তি পাওয়া থেকে এই দুনিয়ার কেউ আটকাতে পারবে না।”
শেষের কথাটা বড্ডো রুষ্ট শুনা গেলো তার। কিছুটা ভয় পেলো হীরা কান্না থামিয়ে ফুঁপাতে ফুঁপিতেই সব খোলে বললো। সব শুনতেই রাগে কটমট করে উঠলো অনিল। সাথে সাথেই গাড়ি থেকে নেমে হীরাকে নামতে বললো। গাড়ি থেকে নামতে বলায় অবাক হলেও কিছু না বলে নেমে গেলো হীরা।সে নামতেই তার ছোট্ট হাত টা মুঠোয় নিয়ে অনিল তাকে নিয়ে স্কুলে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
” চলো। ”
ছাত্র-ছাত্রী ছুটির পরেও শিক্ষকরা বেশিরভাগ দিনই নিজেদের কিছু কাজ শেষ করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আজও তার ব্যাতিক্রম নয়। অফিসে বসে সকল শিক্ষকমন্ডলী কোনো একটা ব্যাপারে আলোচনা করছেন। ঠিক সে সময়েই হীরার হাত ধরে কোনো রুম আদেশ ছাড়াই অফিসে প্রবেশ করলো অনিল। তাকে দেখা মাত্রই শহীদ স্যার বলে উঠলেন,
“আরে অনিল যে, কী খবর তোমার?”
তার কথার কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না অনিল। সে ধুপধাপ পা ফেলে প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। পাশ থেকে আরেকজন শিক্ষক বললেন,
“এইগুলো কি ধরনের বেয়াদপি অনিল! তোমার থেকে এরকম ব্যাবহার আশানুরূপ নয়।”
“আমার পাঁজরের অংশীদারিনিকে যে অপমান করবে তার সাথে আদব দেখিয়ে কথা বলবো- এতটাও ভদ্র আমি নই স্যার।”
কাটকাট ভাষায় জবাব দিলো অনিল। তার কথায় প্রধান শিক্ষক এইবার কিছুটা অবাক হয়ে বললেন,
“মানে!”
“মানেটা আপনি এখনি বুঝে যাবেন স্যার। আমাকে আগে শহীদ স্যার এর সাথে কথা বলতে দিন।”
বলেই ঘুরে তাকালো শহীদ স্যার এর দিকে। তারপর বললো,
“আপনাদের স্কুল যে বিবাহিতা মেয়ে পড়ার নিয়ম নেই তা স্কুলের গেইটে লিখে দিন নি কেন?”
“আমি কখন বললাম যে আমাদের স্কুলে বিবাহিতা শিক্ষার্থী পড়ার নিয়ন নেই!”
কিছুটা কাচুমাচু করেই উত্তর দিলো সে। এই ছেলে না আবার তার চাকরি খেয়ে বসে। সে যদি জানতো এই মেয়ে তার বউ তাহলে সে কখনোই কিছু বলতো না। তিনি জানেন এই ছেলে খুব ভয়ংকর। স্কুল এ থাকতেই একজন শিক্ষক কে চাকরী থেকে বরদাস্ত করেছিলেন একজন মেয়েকে খারাপ কথা বলায়। আসলে অনিল যেদিন হীরাকে ভর্তি করাতে এসেছিলো সেদিন সব শিক্ষক ক্লাসে ছিলো সে শুধু প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে গেছিলো। তার দরুন প্রধান শিক্ষক ছাড়া কেউই এই ব্যাপারে অবগত নয়। তার ভাবনার মাঝেই অনিল বাঁকা হেসে বললো,
” আপনার স্মৃতিশক্তি এতটাই কম হলে আপনি হয়তো এখন এখনকার শিক্ষক হতেন না!অবশ্য তাতে কোনো সমস্যা নেই হয়তো ভূল করে আপনার চাকরি হয়ে গিয়েছিল আর সেই ভুলটাই শোধরাতে আসলাম আমি। ”
এইবার মুখ খুললেন প্রধান শিক্ষক। তিনি এইটুকু বুঝে গেছেন যে নিশ্চয়ই শহীদ কিছু করেছে যার জন্য অনিল এভাবে কথা বলছে নয়তো অনিল যথেষ্ট ভদ্র ছেলে। বললেন,
“অনিল তুমি আমার সাথে কথা বলো। কী হয়েছে আমায় খুলে বলো।”
তার কথায় প্রথম থেকে সব জানালো অনিল। সব শুনতেই তিনি অনিলকে বললেন,
“তুমি টেনশন করো না অনিল আমি এই ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।”
তারপর হীরার দিকে তাকিয়ে আদুরে স্বরে বললেন,
“এর পর থেকে তোমায় কেউ কিছু বললে সরাসরি আমায় এসে জানাবে। ঠিক আছে মামুনি।”
তার কথায় ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো হীরা। এতক্ষণ সে বিড়ালছানার ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিলো অনিলের পিছনে। আর মুগ্ধ হয়ে শুধু অনিলের এক একটা কথা শুনছিল।সে কতোই না খারাপ ভাবত তার সামনে তার একান্ত গার্ডিয়ান হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে। অথচ আজ মনে হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম আদর্শের পুরুষটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাবনার মাঝেই তার হাত ধরে তাকে নিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা ধরলো অনিল। এই বিষয়ে আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না। কারন সে জানে প্রধান শিক্ষক যখন বলেছেন তখন তিনি এর কিছু একটা সমাধান তিনি করবেনই। এর আগেও একবার তাকে পুরো সাপোর্ট দিয়েছিলেন তিনি। আর সে শিক্ষকদের যথেষ্ট সন্মান করে। তবে যে শিক্ষক শিক্ষা দেওয়ার বদলে ছাত্র ছাত্রী দের পার্সোনাল ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে তাদের একটা ব্যাবস্থা করা একান্ত জরুরি। আর সেই ব্যাবস্থা টাই পাকাপোক্ত করে গেলো সে।
হীরাকে গাড়িতে বসিয়ে হাত থেকে এক টানে চুড়িগুলো খোলে ফেললো অনিল। বললো,
“নেক্সট টাইম যেনো আর এসব পড়তে না দেখি”
সহসা এইভাবে টান মেরে খুলায় ব্যাথায় “আহ” শব্দ করে উঠলো হীরা। চোখে এসে ভীর জমালো অশ্রুকণারা। সেসবে তোয়াক্কা না করেই গাড়ি স্টার্ট দিলো অনিল। রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে এভাবেই স্কুল ড্রেসে মেয়েটাকে একদম বাচ্চা বাচ্চা লাগছে আবার পরেছে চুড়ি! এইগুলো পড়ার কী দরকার? এইগুলো না পড়লেই তো কেউ বুঝতো না ও বিবাহিতা আর না অপমান করতে পারতো।
এইদিকে ছলছল নয়নে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হীরা। ভাবছে একটা মানুষের এতগুলো রূপ কী করে হয়? কিছুক্ষন আগেও যেই মানুষটা তার জন্য এতকিছু করলো আবার এখন তাকেই এভাবে কষ্ট দিতে পারে। হীরার চাহনি বুঝতে পেরে তার দিকে ঘুরে তাকালো অনিল। সাথে সাথেই ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো তার বক্ষপিঞ্জর। এমন ছলছল নয়নে ইনোসেন্ট ফেস নিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে কেন আছে এই মেয়ে তার দিকে! সে কি বুঝতে পারছে তার এই লুক নাড়িয়ে দিচ্ছে অনিলের পুরো সত্ত্বাকে।
রাতে স্কুলের পড়া শেষ করে ড্রয়িং রুমে বসে আনিকার সাথে আড্ডা দিচ্ছিল হীরা। বাসায় কেউই আজকের ঘটনার ব্যাপারে কিছু জানেন নি। কারন হীরাই কিছু বলেনি কাউকে। তাদের আড্ডার মাঝেই সেখান উপস্থিত হলো অনিল। তাকে এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হলো দুজনেই। আনিকা তো অবাকের সাথে ভয়ও পেলো এতো তাড়াতাড়ি পড়ার থেকে উঠার কারনে। তাই সে আর এক মুহুর্ত ও দেরি না করে সেখান থেকে কেটে পরলো। সে যেতেই হীরার পাশে এসে বসলো অনিল বললো,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩+৪
“হাত টা দাও।”
তার কথায় তৎক্ষনাৎ হাত এনে তার সামনে ধরলো হীরা সে আর ধমক খেতে চায় না এই লোকের। হীরা হাত দিতেই তার কেটে যাওয়া হাতটায় প্রাথমিক চিকিৎসা প্রয়োগ করতে লাগলো অনিল। বিকেলে সে লক্ষ্য করেছিল হীরার হাত টা খানিক কেটে গেছে সে ওভাবে চুড়িগুলো খুলায়। তখন কিছু বলেনি সে হীরাকে বাসায় রেখে চলে গেছিল নিজ কাজে। তবে সেখানে গিয়ে একটুও স্বস্তি পায়নি সে। শুধু চোখের সামনে ভেসে উঠেছে হীরার ক্রন্দনরত মুখ খানা ও তার কাটা হাতটা। তাই তো আজ সে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসেছে।
