Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮২
সাজিয়া জাহান সুবহা

ভোর সকাল। একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের তাগিদে আজ আবরারের ঢাকায় যাওয়ার কথা৷ এজন্যে বেশ ভোরে ঘুম ছেড়ে উঠেছে সে। ছয়টার ট্রেনে চট্টগ্রাম হতে ঢাকা পৌঁছাবে। সময় মতো ট্রেন ধরলো সে। রওনা দেওয়ার পর ঘুম ঘুম চোখে মোবাইল বের করলো পকেট থেকে। রাতভর ক্যাম্পাসের বন্ধুদের সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্র পাড়ে আড্ডা দিয়েছিলো বলে ঠিকঠাক ঘুমুতে পারেনি সে। বাসায় ফিরে কোন রকমে চোখ বুজেছিল দুই তিন ঘন্টার জন্য। এখন ঘুমের তাড়নায় চোখ দুটো ভেঙ্গে আসতে চাইছে।

মোবাইল পুণরায় পকেটে ঢুকানোর পূর্বে মেসেঞ্জারের আনরিড মেসেজেস চেক করতে নিলো সে। সাফওয়ানের তরফ হতে মেসেজ এসেছে দেখে আশ্চর্য হলো বেশ। অনেক মাস হলো তাদের মাঝে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কিনা। তাই আজ হুট করে ভয়েস মেসেজ এসেছে দেখে কৌতুহল জাগলো মনে। রাত সাড়ে তিনটার মেসেজ! আবরার কানে হেডফোন লাগিয়ে ভয়েসটি প্লে করলো। এবং সময়ের সাথে সাথে তার প্রতিক্রিয়া বদলাতে শুরু করলো। অবাক, বিষ্ময়ে প্রায় মিনিট খানিক স্তব্ধ হয়ে থাকতে দেখা গেলো তাকে। এরপর একই ভয়েস নোট পুণরায় চালালো। দুইবার, তিনবার, পাঁচবার। সাফওয়ানের-ই কন্ঠস্বর। কিন্তু এই কথাগুলো! এসব আদৌও সত্যিই? আবরারের ঘুম টুম সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো যেনো। ইচ্ছে করলো এখন, এই মুহুর্তে ডানা মেলে ঢাকা পৌঁছাতে। ছটফট করতে করতে সরাসরি সাফওয়ানের নাম্বারে কল দিলো সে। সুইচড অফ জানাচ্ছে দেখে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। এসব কীভাবে সম্ভব? সে বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও কেনো কিছু জানে না

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

একটি অলস সকাল আজ। না রোদের তাপ, না কালো মেঘ, না বৃষ্টির কোন আগমনী বার্তা। কিছুই নেই।থমকানো, ধূসর রাঙা আকাশ। এমনই গুমোট দিনটিতে নিজের বেডরুমের সঙ্গে লাগোয়া খোলা বারান্দার গোল দোলনায় স্বভাবসুলভ ভাবে দুই পা তুলে বসে মোবাইল স্ক্রল করছে সায়েরী। তার চেহারায় এখনো ঘুম ঘুম ভাব মিশে রয়েছে। তবে অধর জুড়ে মিটিমিটি, লাজুক হাসি। নিগূঢ় দৃষ্টিতে দেখছে সাফওয়ানের জন্মদিনের কিছু ছবি, ভিডিও। একই সাথে সাফওয়ান এবং তার পুরনো ছবি গুলোও ঘেটে দেখছিলো। একটি ছবিতে এসে তার দৃষ্টি থমকালো। ছবিতে সাফওয়ানের ধবধবে হাতের উল্টো পিঠ দেখা যাচ্ছে। কব্জিতে অ্যাপল ওয়াচটি। হাতটি সায়েরী ধরে রেখেছে নিজ হাতের মধ্যে। সাফওয়ানের বড়সড় হাতটার উল্টো পিঠে টকটকে লাল ঠোঁটের ছাপ বসে রয়েছে। ঠিক সেটাতেই ফোকাস করা হয়েছে। ছবিটি দেখে সায়েরী ফিক করে হেসে দিল। এক সঙ্গে থাকাকালীন সময়ে সাফওয়ান অন্য কারো সঙ্গে ফোনকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তখনই সায়েরী এসব অকাজ,কুকাজ করে বেড়াতো। সাফওয়ান নির্বিকার থেকে নিরব সম্মতি দিতো বলেই সায়েরী সাহস পেয়ে বসতো এমন দুষ্টমি করার। ছবিটায় আরেকটু রংচং মেখে ফোনের হোম স্ক্রিনে সেট করে নিলো সায়েরী। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল অগণিত বার। অমন বড়সড় দানবীয় হাতের পিঠে ঠোঁটের ছাপটা দেখে মনে হচ্ছে সায়েরী সিলমোহর এঁকে দিয়েছে। যে, এই পুরুষটা একান্ত আমার।

একথা কল্পনা করে পুলকিত হলো সায়েরী। ভাবনাতে ভুল নেই। সাফওয়ান তেহজিব খান নামক গম্ভীর পুরুষটা শুধু, এবং শুধুমাত্র সায়েরীর-ই।
আরও কিছুক্ষণ মোবাইল ঘাটাঘাটি করার পরেও কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির তরফ থেকে কোন টেক্সট, কল না পেয়ে হতাশ হলো সায়েরী। গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ কল করেছিলো সাফওয়ান। অথচ, কথার কথা কিছুই বলেনি। সায়েরী গুণে দিতে পারবে ঐ মিনিট পাঁচেক এর ফোনকলে সাফওয়ান মোট কতটি শব্দ উচ্চারণ করেছিল। একে তো ঠিক করে কোন কথা বলেনি। তন্মধ্যে সায়েরী সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখলো হোয়াটসঅ্যাপে সাফওয়ানের আইডি হতে ৭টি ডিলেটেড মেসেজ। এগুলো ভয়েট নোট ছিলো, নাকি কেবল টেক্সট তা জানে না সে। কিন্তু বিগত দেড় মাস ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে দেখতে বড্ড সন্দিহান হয়ে পড়েছে সে। সাফওয়ানের মতো স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড ছেলে কিনা এমন লুকোচুরি খেল খেলছে সায়েরীর সঙ্গে! কি এমন কথা যে বার বার বলেও ডিলেট দিতে হচ্ছে? তাছাড়া, সায়েরীর কাছে কেনো এমন লুকোচুরি করতে হচ্ছে তার? কই! সায়েরী তো কখনো সাফওয়ানের কাছে দ্বিধাবোধ করে না কিছু নিয়ে। অকপটে মনের সব কথা উজাড় করে বলে দিতে পারে। তবে পুরুষ হয়েও সাফওয়ান ভাই এমন আচরণ করছে কেনো?
সায়েরী ফিরতি বার্তা পাঠাল। কিন্তু সাফওয়ান অফলাইনে তখন। অগত্যা সে অপেক্ষায় রইলো। কারণ সাফওয়ান সেদিন বলেছিলো, আজ কল দিলে কিছু কথা বলবে। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কথা। এজন্যই সায়েরী সকাল হতে খানিকটা চিন্তিত, মনটা অস্থির-ও হয়ে আছে। কেমন এক অদ্ভুত ভয় ভয়, অশান্ত অনুভূতি।

বেলা এগারোটা তখন। বসুন্ধরা সিটি শপিং মলজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সায়েরী, সাফ্রিন এবং তোহা। বিনা পরিকল্পনায় আচানক সাফ্রিনের কল পেয়ে তিন বান্ধবী বেরিয়েছে ঘুরাঘুরির উদ্দেশ্যে। তিন জনের কেউই অন্যদিনের মতো খুশমেজাজে নেই। তোহা গতরাতে আয়ানের সঙ্গে বড়সড় ঝগড়া বাঁধিয়েছে। সেই নিয়ে উদাসীন হয়ে আছে সে। সাফ্রিনকে একটু বেশিই বিষন্ন দেখাচ্ছে। সুন্দর মুখটা অসম্ভব ফ্যাকাসে হয়ে রয়েছে। বেখেয়ালিতে হাঁটতে গিয়ে হোচট খেলো সে। সঠিক সময়ে সায়েরী না ধরলে বাজেভাবে মুখ থুবড়ে পড়তো। সায়েরী লক্ষ্য করলো সাফ্রিনের উদাসীনতা। নরম সুরে জানতে চাইলো,
‘ এমন বেখেয়ালি হয়ে আছিস কেনো? কিছু নিয়ে টেনশন করছিস? রেজাল্টের টেনশন? ‘

সাফ্রিন জবাব দিলো না। জবাব দেওয়ার মতোন কথা খুঁজে পেলো না সে। এক্সাম শেষ হওয়ার পর হতে লক্ষ্য করছে তার মা,বাবা,ভাই কেউই পূর্বের মতো স্বাভাবিক নেই। তিনজনেরই স্বভাব, আচরণে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। বিগত কয়েক মাস যাবত সাফওয়ান তো খান ভিলাতে আসেই মাত্র সপ্তাহে এক কি দুইবার। কোথায় থাকে, কি করে কিচ্ছুটি সাফ্রিন জানে না। আবার বাড়ি এলেও সর্বদা সাক্ষাৎ মিলে না। অপরদিকে, বাবা নওশাদ খান বরাবরই ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু আগে যে সারাটাদিনের ব্যস্ততার পরেও একমাত্র মেয়ের খোঁজ নিতেন, একটুখানি সময় বের করে হলেও মেয়ের সঙ্গে খোশগল্প করতেন৷ তার কিছুই এখন করেন না। সর্বদা গম্ভীর হয়ে থাকেন। সাফ্রিন আরও একটি ব্যাপার লক্ষ্য করলো, তার মা-বাবার মধ্যে নিরব কোন দ্বন্দ্ব চলছে। দুজন সোজা মুখে কথাও বলে না। একে অপরের দিকে তাকায় অবধি না। বিগত দেড় মাস যাবত তাহুরা খান একেবারে বোবা হয়ে আছেন।

প্রয়োজন ব্যতীত তাকে নিজ কামরা হতে বের হতেও দেখা যায় না। সারাক্ষণ কেমন মনমরা হয়ে থাকেন। সাফ্রিন ভালোমন্দ জানতে চাইলে, মায়ের খিটখিটে মেজাজের শিকার হতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। এখন সে আর কারো কাছে কিছু জানতে চায় না। সবার মাঝে থেকেও নিজেকে একা অনুভব করছে সে। মা,বাবা,ভাই কেউ তার সঙ্গে একটু ভালো করে কবে কথা বলেছিল তা বোধহয় তারা জানেই না। সাফ্রিন কি এতোটাই ছোট যে কোন সমস্যার কথা তাকে বলা যাবে না? নাকি সে তুচ্ছ ভীষণ? যার সবটা থেকেও মানসিক শান্তির বিন্দুমাত্র নেই। রোজ রোজ এসব দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। বাড়িতে একপ্রকার দম বন্ধ অনুভূতি হয় তার। হুট করে আপন মানুষগুলোর এমন পরিবর্তন সে মেনে নিতে পারছে না।

গত পরশু সাফওয়ানের সঙ্গে সুন্দর কিছু সময় কাটিয়েছে সে এবং সাম্য, সামান্তা। অনেক, অনেকগুলো দিন পর সাফ্রিনের মনে হচ্ছিলো একটুখানি স্বস্তির শ্বাস নিতে পেরেছে সে। কিন্তু একদিনের মাথায় সেই স্বস্তি, শান্তি ও উবে গেলো। এইতো, গত রাতের কথা। বেড সাইড টেবিলে সাফওয়ানের ওয়ালেট এবং এন্ড্রয়েড মোবাইলটা পড়ে আছে দেখে আশ্চর্য হয়েছিলো সে। ওয়ালেটে ক্রেডিট কার্ড সহ কিছু ক্যাশ টাকা ও ছিলো। সাফ্রিনের রুমে এসব জিনিস নিশ্চয় হেঁটে আসেনি? স্বয়ং সাফওয়ান এসে না রেখে গেলে অন্য কারোর স্পর্ধা নেই তার জিনিস এদিক সেদিক করার। কিন্তু কারণ ব্যাতিত এসব রেখে যাওয়ার কোন মানে খুঁজে পেলো না সাফ্রিন। খোঁজ পেলো না ভাইয়েরও। সম্ভবত বেরিয়ে গিয়েছিলো গ্রীন ভ্যালি কিংবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে। এই ভেবে সাফ্রিন বিশেষ ধ্যান দেয়নি সেদিকে। কিন্তু সে চিন্তিত ভীষণ। সবচেয়ে বেশি চিন্তা তার মা তাহুরা খানকে নিয়ে। অন্যদিনে তুলনায় আজ একটু বেশিই ভঙ্গুর লাগছিলো উনাকে দেখে। সকাল হতে সাফ্রিন একাধিকবার কারণ জানতে চেয়েও যখন উত্তর পেলো না। তখন তার নিজেরই মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। আর কারো ব্যাপারে ভাববে না, কারো কাছে কিচ্ছুটি জানতে চাইবে না। এমন মনোভাব নিয়েই সে বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছে একটু মানসিক শান্তি পাওয়ার তাগিদে।

‘ ভাইয়ার সঙ্গে তোর কথা হয়েছে, সায়ু? ‘
কথার পিঠে সাফ্রিনের পাল্টা প্রশ্নটা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সায়েরী। ডানে বামে মাথা নেড়ে বোঝাল, কথা হয়নি। সাফ্রিন পুণরায় ভাবুক হয়। সায়েরীর কাছে ভাইয়ের ব্যাপারে কথা বলতে নিয়েও পুণরায় গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সে নিজে যথেষ্ট কঠোর হৃদয়ের হয়েও চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সায়েরী তো একটুতেই অস্থির হয়ে পড়ে। ওকে জানানো মানে বাড়তি ঝামেলা ঘাড়ে তোলা৷ অগত্যা সাফ্রিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজ চিন্তা নিজের মাঝেই ধামাচাপা দিয়ে রাখলো।
নিজ নিজ ভাবনায় মশগুল হয়ে নিরবে হাঁটছে ওরা তিনজন। বেবি সেকশনের সম্মুখে এসে আচমকা থমকালো তিনজনে। শপটিতে একবার চোখ বুলিয়ে আবার একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। এবং অপ্রত্যাশিত ভাবে তিন রমনী একই সুরে বলে উঠলো,

‘ আমাদের পুচকো’টার জন্য কিছু নিয়ে নিই? ‘
প্রশ্ন করেও আশ্চর্য হলো ওরা। পরমুহূর্তেই উচ্চ শব্দে হেসে ফেললো। হইহই করে ঢুকলো শপের ভেতরে। ছোট ছোট হরেক রকমের বেবি ড্রেস, টয়েস দেখে মন-মস্তিষ্কের সব চিন্তা ভাবনা কই যেনো উবে গেলো। আবেগে আপ্লূত হয়ে ঘেটে দেখতে লাগলো সব। বেবি গার্লের জিনিসপত্র কিনবে? নাকি বেবি বয়ের জন্য? এই নিয়েই একদফা বিড়ম্বনায় ডুবে উভয় জেন্ডারের জন্য শোভনীয় কিছু পোশাক কিনলো, টয় নিলো। আবার অতিরিক্ত পছন্দ হয়েছে দেখে দুটো ফ্রক এবং ছেলে বাবুদের থ্রি-পিস স্যুট, বুট ও কিনে ফেললো। পারলে যেনো দোকানটা ব্যাগে ভরে বান্ধবীর কাছে পাঠিয়ে দেয়। এতো কিউট কিউট জিনিস! কোনো টা ছেড়ে আসতে মন চাইছে না ওদের৷

কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া শেষে সাফ্রিনের গাড়িতে করেই বাড়ির পথে রওনা দিলো তারা। সোজা পথে প্রথমেই যেহেতু খান ভিলা এসে পড়েছে। তাই সাফ্রিন ড্রাইভারকে বলে দিলো যেনো তাকে নামিয়ে দিয়ে সায়েরী এবং তোহাকে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে। খান ভিলার সম্মুখে গাড়ি থামলে সাফ্রিনের পাশাপাশি অন্য দুজন ও বেরিয়ে এলো। ঢিকি থেকে ব্যাগ সব বের করলো একে একে। যেহেতু শপিং ব্যাগ বেশি তাই যার যার গুলো ভাগাভাগি করে নাজরাতের বেবির জন্য কেনা জিনিসপত্র সব সাফ্রিনের কাছেই রাখতে বললো। তারা যখন নিজেদের কাজে মশগুল, এমন সময় আরও একটি গাড়ি এসে থামলো গেইটের সম্মুখে। সাফ্রিনের মামা,মামী এবং মামাতো বোন রিদিতাকে এই এসময়ে দেখে সাফ্রিনের কপালে ভাঁজ পড়ে। এই আপদ গুলোরই কমতি ছিলো বোধহয় আজকের দিনে। সাফ্রিনের মামা, মামীকে বাধ্য মুখে সালাম দিলো তোহা, সায়েরী। উনারা ভেতরে প্রবেশ করলেও, ত্যাড়ার মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইলো রিদিতা। সাফ্রিন দেখেও কিছু বললো না। সায়েরীর সঙ্গে রিদিতার চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো সায়েরী। দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে চাইলো। কিন্তু বিধি বাম। আজ এমন অসময়ে বাড়িতে ফিরেছে স্বয়ং নওশাদ খান। উনাকে দূর থেকে দেখেই তোহা, সায়েরী ঢোক গিলে। সাফ্রিন নিজেও চাইলো না বান্ধবীরা বাবার সম্মুখীন হোক। তাড়া দিলো, যেনো চলে যায়। কিন্তু এভাবে মুখ দেখেও কথা না বলে চলে যাওয়াটা বেয়াদবি হয়ে যাবে বলে অনেকটা বাধ্য হয়েই দাঁড়িয়ে থাকলো দুজনে। নওশাদ খান গম্ভীর মুখে গাড়ি থেকে বেরিয়ে ভারিক্কি সুরে সাফ্রিনের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

‘ কোথায় যাচ্ছো তুমি? ‘
‘ ক-কোথাও না বাবাই। একটু শপিং করতে বেরিয়েছিলাম। ‘
সাফ্রিনের ইতস্তত জবাব। তোহা, সায়েরী সালাম জানালে নওশাদ খান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকান। সাফ্রিন ফের বলে উঠে,
‘ ওরা আমার ফ্রেন্ডস। ‘
নওশাদ খানের ধারালো দৃষ্টি সায়েরীর দিকে নিবদ্ধ। মেয়েটাক আগাগোড়া লক্ষ্য করে কপালে আরও দুটো ভাঁজ ফেললেন তিনি। গম্ভীর হলো মুখাবয়ব। উনার দৃষ্টির কবলে পড়ে মিইয়ে গেলো সায়েরী। এই লোক না নিজে এখান থেকে নড়ছে, না তাদের নড়তে দিচ্ছে। স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে। সায়েরীর দিক হতে দৃষ্টি সরিয়ে নওশাদ খান পরপর লক্ষ্য করলেন রিদিতাকে। রিদিতা হাসিমুখে সালাম দিলো। বললো,
‘ আমিও মাত্রই এসেছি, মামা। আম্মুরাও এসেছে। ফুপি মন খারাপ করে আছে কিনা তাই একটু দেখা করতে এসেছি।

নওশাদ খান বুঝবার ন্যায় মাথা নাড়লেন। বললেন,
‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভীষণ ভালো হয়েছে তোমরা এসেছো। তুমি গিয়ে একটু সামলাতে পারো কিনা দেখো। আগে পরে সবটা তোমাকেই তো সামলাতে হবে। ‘
রিদিতা সগৌরবে হাসে। কথার পিঠে জবাব দিয়ে বসে, ‘ অবশ্যই। আমি আছি তো সামলে নেওয়ার জন্য। ‘
নওশাদ খানের বলা কথাটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলো না উপস্থিত তিন রমনী। সাফ্রিনের মুখের ভেতরটা তেঁতু হয়ে উঠে রিদিতার এমন চটাং চটাং জবাব শুনে। সে বিরক্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আম্মুকে কেনো দেখতে আসতে হলো? আর আপনি কি আমার ফ্যামিলির দেখভালের ডিউটি নিয়েছেন? অন্য কোন কাজ নেই? ‘

রিদিতা জবাব দেওয়ার পূর্বে নওশাদ খান ভারিক্কি গলায় সাফ্রিনের নাম ধরে ডাকলে সহসা চুপ মেরে গেলো সাফ্রিন। নওশাদ খান গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
‘ লো ক্লাস ছেলে পেলেদের সঙ্গে মিশে তোমরা দুই ভাই – বোন ও নিজেদের আদব কায়দা ভুলে বসেছ। কার সঙ্গে কেমন কথা বলতে হয় শিখোনি তুমি? রিদিতা তোমার বয়সে, সম্পর্কে সব দিক দিয়ে বড়ো। সম্মান দিয়ে কথা বলো। তোমার বড় ভাইয়ের বউ হয়ে এলেও কি এমন আচরণ করতে পারবে ওর সঙ্গে? ‘
অপমানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো তোহা এবং সায়েরী। নওশাদ খানের শেষ কথাটা বজ্রপাতের মতো শোনাল। স্তব্ধ হলো সাফ্রিন, তোহা। মৃদু শব্দে সায়েরীর হাতের শপিং ব্যাগ সব জমিনে লুটিয়ে পড়লে দুই বান্ধবী চকিতে তাকালো সায়েরীর দিকে। সায়েরী স্তম্ভিত। বড় বড় আঁখি যুগল মেলে রিদিতার দিকে তাকিয়েছে। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসছে অসভ্যটা। হাসিমুখেই সে বলে উঠলো,

‘ ইট’স ওকে, মামা। আমি কিছু মনে করিনি। এক ঘরে থাকলে মিলমিশ হয়েই যাবে। সাফা, চলো ভেতরে যাই। ব্যাগ গুলো দাও আমাকে। ‘
সাফ্রিন দাঁতে দাঁত চাপে। এসব আলগা পিরিতি সহ্য হচ্ছে না মোটেও। আড়চোখে সায়েরীর বিমূঢ় মুখাবয়ব লক্ষ্য করে সে শক্ত কন্ঠে বলে উঠে,
‘ ভাইয়াকে আপনি চিনেন না, বাবাই? এভাবে যাকে তাকে তার বউ হবে বলে উপাধি দিয়ে দিলেই কি সে মেনে নিবে? তার নিজস্ব পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে না? ‘
নওশাদ খান মেয়ের স্পর্ধা দেখে আপনমনে তেঁতে উঠেন। মেয়েটাও একদম ভাইয়ের মতো হয়ে উঠছে দিনদিন। রাগ চেপে তিনি গম্ভীর সুরে বলেন,

‘ তোমার ভাই কতোটা মা ভক্ত জানো না তুমি? রিদিতার ব্যাপারে তোমার ভাই সব জানে, এবং মেনেও নিয়েছে। পছন্দ, অপছন্দ যা ছিলো সব ছেলেমানুষী পেছন ফেলে এখন নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়েছে সে। আমাদের স্বীদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে বলেই ওসব মোহ ছেড়ে দূরের পথ বেঁচে নিয়েছে।তুমিও এসব মানুষের সঙ্গ ছেড়ে নিজের ক্যারিয়ারের দিকে ফোকাস করো, সাফা। ভাইয়ের মতো শত ত্যাড়ামি করলেও শেষে আমার ইশারাতেই চলতে হবে। ভুলে যেওনা আমি বাবা হই তোমাদের। আমার অবাধ্য হওয়ার কথা কল্পনা ও করো না। ‘
নওশাদ খান আর সময় অপচয় করলেন না। গটগট পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন। পেছন পেছন রিদিতাও গেলো। সাফ্রিন লজ্জায় বান্ধবীদের দিকে তাকাতে অবধি পারলোনা। অপমানে তোহার মুখশ্রী থমথমে হয়ে আছে। নিরবতার মাঝে শোনা গেলো সায়েরীর কম্পিত সুর, ‘ তোর ভাইয়া কোথায় গিয়েছে, সাফা? ‘

কন্ঠটা শুনে দুই বান্ধবী নজর তুলে তাকায়। সায়েরীর দৃষ্টি টলমল করছে। স্বাভাবিক। এতগুলো কথা শুনে তার বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে হয়তো। সাফ্রিন ওর গালে দুহাত রাখে। বুঝানোর সুরে বলে,
‘ প্লিজ বাবার কথায় ভুল বুঝিস না, সায়ু। তুই জানিস ভাইয়া তোকে কতোটা ভালোবাসে। বাবা সবসময় আমাদের উপর নিজের ডিসিশন চাপিয়ে দিতে চায়। এসব বিয়ে, টিয়ের ব্যাপারে হয়তো সে জানেই না। জানলেও কখনো মান.. ‘
‘ জানে। সে সব জানে। কিন্তু আমাকে বলেছিলো তোর মামাতো বোন বিয়েতে রাজি নেই। আ-আমাকে মিথ্যে কেনো বলেছিলো? ‘
কথার মাঝে সায়েরীর এমন ভারী কন্ঠের বাণী শুনে সাফ্রিন থমকে গেলো। সাফওয়ান জানে এসবের ব্যাপারে? কখন হলো এই স্বীদ্ধান্ত? সে কেনো কিছু জানে না?

‘ তোর ভাই কোথায়? জবাব দিচ্ছিস না কেনো? ‘
সায়েরীর কন্ঠটা রাগান্বিত শোনাল। সাফ্রিন দ্রুত গলায় জবাব দিলো,
‘ জানি না। কাল রাতে বাড়ি এসেছিলো। কিন্তু দেখিনি আমি। সকালেও দেখিনি। হয়তো গ্রিন ভ্যা… ‘
সাফ্রিনের কথা শেষ হলো না। পূর্বেই গাড়িতে চড়ে বসলো সায়েরী। ড্রাইভারকে বললো গ্রিন ভ্যালি নিয়ে যেতে। তাড়াহুড়ো করে তোহাও উঠে এলো পাশে। মুহুর্তে গাড়ি ছুটে গেলো দূরে। রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা শপিং ব্যাগ গুলো তুলে ছুটন্ত কদমে বাড়িতে ঢুকলো সাফ্রিন। কারোর দিকে তাকাল না। সোজা গেলো মায়ের কক্ষে। সেখানে কাউকে না পেয়ে কি যেন ভেবে আবার সাফওয়ানের কক্ষের দিকে এগোল। সে দরজা খোলার পূর্বেই খুলে গেলো সেটা। ভেতর হতে রিদিতা এবং তার মা বেরিয়ে এসেছে থমথমে মুখে। সাফ্রিন অদেখার মতোন করে তাদের পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ধরাম শব্দ তুলে বন্ধ করলো দরজাটা। বিছানার এক কোণে বসে থাকা তাহুরা খান কেঁপে উঠলেন এই শব্দে। অসম্ভব রকমের রক্তিম, ফুলো চোখ জোড়া মেলে তাকালেন মেয়ের দিকে। সাফ্রিনের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো এই দৃশ্যে। কিন্তু সেদিকে ধ্যান না দিয়ে সে নরম গলায় জানতে চাইলো,

‘ ভাইয়া কোথায়, আম্মু? ‘
তাহুরা খান দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন। উনার দুই হাতের মাঝে সাফওয়ানের একটি ফটো ফ্রেম দেখে সাফ্রিন কেমন বেকুব বনে গেলো। আশ্চর্য হলো বেশ। ভাইয়ের ছবি নিয়ে বসে এমন কান্নাকাটি জুড়ে দেওয়ার মানে কি? আবার তার কথার জবাব ও দিচ্ছে না। একই প্রশ্ন পুনরায় আওড়াল সে। এবারেও জবাব পেলো না। সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ বিগড়ে গেলো সাফ্রিনের। এমন অবহেলা আর কতো সইবে সে! রাগে, জেদে ড্রেসিং টেবিলের উপর হতে সাফওয়ানের পারফিউমের বোতল তুলে এক আচাড় মারলো ফ্লোরে। ঝনঝন শব্দের তালে তাল মিলিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তোমরা সবাই মিলে আমাকে পেয়েছ টা কি বলবে? যদি কিছু না-ই জানাতে চাও তাহলে রোজ রোজ চোখের সামনে এমন নাটক জুড়ে বসো কেনো? ‘
তাহুরা খান রক্তিম আঁখি রাঙিয়ে তাকালেন। নিরব দৃষ্টিতে শাসালেন যেনো। কিন্তু সাফ্রিন দমলো না। একই সুরে পুণরায় বলে উঠলো,

‘ তোমরা নিজেরা সুস্থ, স্বাভাবিক নেই। নিজেদের অসুস্থ পরিবেশের মাঝে অবুঝের মতো আমাকে আটকে রাখতে রাখতে আমাকেও পাগল করে দিচ্ছো। শান্তির জন্য একটু বান্ধবীদের সঙ্গে বেরিয়েছিলাম সেখানেও আমাকে লজ্জিত হতে হলো। আমার কোন মূল্যই যেহেতু নেই, তাহলে রেখেছো কেনো সাথে? দূরে পাঠিয়ে শান্তি হয়ে যাও সবাই। থাকো নিজেদের মতো। ‘
একদমে কথাগুলো বলে উল্টো ঘুরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো সাফ্রিন। এমন সময় পেছন হতে শোনা গেলো তাহুরা খানের ক্ষীণ কন্ঠস্বর,
‘ বড়ো হয়েছো। নিজেদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, পছন্দ-অপছন্দ হাসিল করতে শিখেছ যখন। এখন আর মায়ের সঙ্গে থাকার কি প্রয়োজন? যেভাবে বাঁচতে ইচ্ছে হয় সেভাবে বাঁচো। ভাইয়ের মতো যদি মা’র কাছ থেকে দূরে গিয়েই সুখ খুঁজে পাও। তবে য-যাও দূরে। আমি তোমাকেও আটকাব না। ‘
সাফ্রিন থমকে গেলো। বুকের ভেতর হু হু করে উঠলো। কতদিন পর মায়ের কথা শুনল! কিন্তু মায়ের অভিমানের মানে বুঝল না সে। ঘুরে দাঁড়ালো পুণরায়। এবারে সরাসরি মায়ের গা ঘেঁষে বসলো। হাত দুটো ধরে কান্না মিশ্রিত গলায় বলে উঠলো,

‘ আমি তোমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাচ্ছি না, আম্মু। কেনো এভাবে বলছো? আর ভাইয়া তো তোমার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তুমি জানো না ভাইয়া তোমাকে কতোটা ভালোবাসে? এসব কথা কেনো বলছো তাহলে? ‘
তাহুরা খান জবাব দিলেন না। মেয়ের স্পর্শে ফুঁপিয়ে উঠলেন। অবিরাম জল ধারায় উনার দুগাল ভিজতে লাগলো। সাফ্রিনের মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। আবারও কল দিলো সে সাফওয়ানের নাম্বারে। সুইচড অফ জানাচ্ছে এবারেও। আচানক তার স্মরণে এলো রূপমের নাম। যে গত কালই সিলেট থেকে ঢাকা এসেছে। সাফওয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে রূপমের খোঁজ করলো সে। এবং ভাগ্যক্রমে তৎক্ষনাৎ তার দেখা মিললো ডাইনিংয়ে। এই বেলা বারোটায় ঘুম ছেড়ে উঠে এখন নাশতা করতে বসেছে। দেখে মনে হচ্ছে রাতভর ঘুমায়নি। সাফ্রিন তার নিকট পৌঁছে সরাসরি প্রশ্ন করলো যে তার ভাই কোথায়? সাফ্রিনের আরক্তিম মুখশ্রী দেখে রূপম থতমত খেয়ে চেয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। অতঃপর, সেকেন্ড কয়েক সময় নিয়ে সে যা জবাব দিলো তা মেনে নিতে পারলো না সাফ্রিন। রূপমের কাছে বিস্তারিত জানার সুযোগ ও পেলো না সে। পুর্বেই স্মরণে এলো সায়েরীর কথা। মুখে দুহাত চেপে সায়েরীর নাম নিয়ে হাহাকার করে উঠলে রূপম ভয় পেয়ে গেলো। যখন জানলো সাফওয়ানের খোঁজে সায়েরী গ্রিন ভ্যালি গিয়েছে তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়লো সে। চাপা স্বরে ধমকে উঠলো সাফ্রিনকে,

‘ সায়েরী ভাইয়ার ব্যাপারে জানলো কি করে? ভাইয়া বলেছিলো সে নিজে মেয়েটাকে বুঝিয়ে বলবে। কে জানিয়েছে ওকে? ‘
‘ ওসব কথার এখন কোন মূল্য নেই ভাইয়া। প্লিজ গ্রিন ভ্যালি নিয়ে চলো আমাকে। ‘
সাফ্রিনের কন্ঠ ভঙ্গুর শোনাল। রূপম নিজেও চিন্তিত ভীষণ। দুজনে অস্থির চিত্তে দৌঁড়ে বের হলো গ্রিন ভ্যালির উদ্দেশ্যে।

আবরার যখন ঢাকায় পৌঁছাল, বেলা তখন সাড়ে বারোটা। সাফওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে সে জিমন, রায়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করলো। কিন্তু তাদের কাছেও সঠিক কোন তথ্য পেলো না। বাড়িতে এসে সায়েরীকেও পেলো না। ব্যাগপত্র রেখে পুণরায় বেরিয়ে গেলো সে। উদ্দেশ্য – গ্রিন ভ্যালি। যেখানে সাফওয়ানের খোঁজ মিলবে বলে শতভাগ নিশ্চিত সে।

গ্রিন ভ্যালিতে পৌঁছানোর পর করিম চাচার কাছে সায়েরী জানতে পারলো, সাফওয়ান গতকাল সন্ধ্যার দিকে এসেছিলো এখানে। সঙ্গে তার একজন ভাই-ও ছিলো। রাতে থাকেনি। আসার কিছুক্ষণ পরেই ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে দুজন। করিম চাচাকে বলে গিয়েছে যেনো বাড়ির এবং বাগানের দেখভাল করে ঠিকমতো। একথা শুনে তোহা চমকালেও সায়েরীকে স্তম্ভিত দেখাল। মেয়েটা বিবশ চিত্তে কয়েক সেকেন্ড ভেবে গেলো। এরপর আচানক ছুট লাগালো দোতলার দিকে। সাফওয়ানের কক্ষে ঢুকে থমকে গেলো। মাত্র একদিন পূর্বেও এই রুমটা নিজ হাতে গুছিয়েছিলো সে। ড্রেসিং জুড়ে সাফওয়ানের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি ছিলো। আজ সেখানটা প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে৷ সায়েরীর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে তখন। কিচ্ছুটি ভাবতে, কারো কথায় বিশ্বাস করতে মন চাইলো না। কিন্তু সে এগোল। কাবার্ড খুলে চোখ বুলালো সব দিকে। অর্ধেকেরও বেশি স্থান খালি পড়ে আছে। সায়েরী সেদিকে ধ্যান দিলো না। সাফওয়ান ভাই তো বলেছিলো সিলেটে যাবে। হতেও পারে অনেক দিনের জন্য গিয়েছে। এর চেয়ে বেশি আর কি হবে? কিছু না, কিছুই হয়নি। সব ঠিক আছে। স-সব.. মনকে যেন আর বুঝ দিতে পারছে না মেয়েটা। মাথাটা ভনভন করছে। বেখেয়ালে ঘুরে দাঁড়াতে উদ্যত হলে মাথা ঘুরে উঠলো তার। ব্যালেন্স রাখতে গিয়ে কাবার্ডের তাকের উপর হাত রাখলো সে। নিজেকে সামলে হাত সরিয়ে নিলো। অমনি হাতের স্পর্শে একটি কাগজের প্যাকেট এসে পড়লো পায়ের কাছটায়। সেটি তুলে নিয়ে পুণরায় কাবার্ডে রাখতে গিয়েও থমকাল সায়েরী। কৌতুহল বশত প্যাকেটটা উল্টে পাল্টে দেখলো। ভেতর হতে বের করলো এক টুকরো কাগজ। যেটাতে সাফওয়ানের নাম দেখে দ্বিগুণ কৌতুহলী হলো সে।

Passenger Name: Safwan Tehjib Khan
​Flight Number: EK 587
​Date: 10AUG
​Departure: Dhaka (DAC) – 21:00 (09:00 PM)
​Arrival (Stopover): Dubai (DXB)
​Final Arrival: Stockholm (ARN)
​Class: Economy (Y)

ফ্লাইটের টিকেট? কিন্তু সাফওয়ানের নামে কেনো? সায়েরীর মস্তিষ্ক শূন্যে বিচরণ করছে। কিচ্ছুটি ভাবতে পারছে না সে। এরইমধ্যে উক্ত স্থানে উপস্থিত হয়েছে তোহা। সঙ্গে সাফ্রিন এবং রূপম। সায়েরী তখন কাবার্ডের তাক হতে একই রকমের আরও ৪-৫ টি প্যাকেট বের করলো। উন্মাদের মতোন মনে হলো তার এক একটি আচরণ। তাড়াহুড়ায় খুলে খুলে দেখলো সব কটা টিকেট। ৩১-ই জুলাই, ১০-ই আগস্ট, ১৭-ই আগস্ট, ২৩-ই আগস্ট, ২৯-ই আগস্ট এমন ভিন্ন ভিন্ন তারিখের পাঁচ পাঁচটি টিকেট অবহেলায় পড়েছিলো। সব গুলো টিকেট ঘেটে দেখে সায়েরীর সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরলো। তার দেহের দৃশ্যমান কম্পন, অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস সব স্পষ্ট দেখলো বাকিরা। সাফ্রিন, তোহা কিচ্ছুটি বলার সাহস পেলো না। রূপম মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। সায়েরী ঘন ঘন পলক ঝাপটায়। বড় করে দম নেয়। সামলাতে চায় নিজেকে। রূপমকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে উঠে, ‘ ভাইয়া!! ‘
পরপর উদ্ভ্রান্তের মতো ফ্লোর থেকে কুড়িয়ে নেয় টিকেটের কাগজ সব। দ্রুত কদমে রূপমের দিকে এগিয়ে এসে জানতে চায়,

‘ এ-এগুলো..এখানে এতগুলো টিকেট কেনো?এগুলোতে আপনার ভাইয়ের নাম লিখা কেনো? স-সাফওয়ান.. আমার সাফওয়ান ভাইয়ের নামে টিকেট বুকিং করা হয়েছে কেনোওও? ‘
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলা প্রশ্নগুলোর কোন জবাব দিতে পারলো না রূপম। আহত চোখে দেখলো সায়েরীকে। মেয়েটা এক একটি শব্দের পর অগণিত বার ঢোক গিলছে। দমিয়ে রাখছে উপচে পড়তে চাওয়া কান্নাগুলো। রূপমের জবাব না পেয়ে সায়েরী ফের কাগজগুলোতে চোখ বুলায়। এলোমেলো সুরে বলে উঠে,

‘ আ-আপনারা কথা বলছেন না কেনো? এসব কি লিখা! দুবাই! স্ট..স্টকহোম! স্টকহোম মানে?কিসব লিখা এখানে? কোথাকার ফ্লাইট এটা? ‘
‘ সুইডেন। সুইডেনের ফ্লাইট। ‘ রূপমের শীতল প্রত্যুত্তর।
সায়েরী চোখ তুলে তাকায়। একবার বুঝবার ন্যায় মাথা দোলায়। পরক্ষনে আবার অস্থির কন্ঠে বলে উঠে,
‘ আপনার ভাই কোথায়? সে তো বলেছিলো সিলেটে যাবে। এখন ওখানে না? একটু কল দিন। অন্য কোন নাম্বার নেই? বাসার কাউকে কল দিয়ে দেখুন না একটু। আ-আম.. আমি কথা বলতে চাই। ‘
‘ ভাইয়া সিলেটে যায়নি, সায়েরী। ‘
‘ হু? যায়নি! তাহলে কোথায় সে? ফোন বন্ধ কেনো? ‘
সায়েরীর দৃষ্টি জুড়ে প্রশ্ন, এবং প্রশ্ন। ডাগরডাগর চোখজোড়া উত্তরের আশায় চেয়ে আছে রূপমের দিকে। রূপম সেই চোখে চোখ মিলাতে পারে না। মনকে শক্ত করে জবাব দেয়,
‘ ভাইয়া নেক্সট টিকেটটা সেপ্টেম্বর ৩ তারিখের জন্য বুকিং দিয়েছিলো। সে এখন ফ্লাইটে। ‘

সায়েরী প্রতিক্রিয়াহীন। রূপম দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফেলে ফের বলে,
‘ আগের পাঁচ বার সাহস করতে না পারলেও এবার তাকে যেতেই হলো। ভাইয়া তোমাকে জানাতে চেয়েছিলো কিন্তু তু… ‘
‘ অসম্ভব! ‘ কথার মাঝেই চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো সায়েরী। আশ্চর্য হয়ে দাঁড়িয়ে রূপমের কথা শুনতে শুনতে এই পর্যায়ে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গেছে যেনো। ডানে বামে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে আপন মনেই আওড়ায়,
‘ অসম্ভব, অসম্ভব।এমনটা কক্ষনো হতে পারেনা। ‘
টিকেটের কাগজ সব সে আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে ফ্লোরে। আচমকা হেসে উঠে। উপস্থিত তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

‘ আপনারা সবাই মিলে আমার সঙ্গে মজা করছেন তাইনা? ‘
নৈঃশব্দ্য! তিন জনই আহত দৃষ্টিতে দেখছে মেয়েটাকে। সায়েরীকে কান্না চোখে এমন অস্বাভাবিক রূপে হাসতে দেখে সাফ্রিন ফুঁপিয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে আবার ঠোঁট কামড়ে সামলায় নিজেকে। এগিয়ে এসে সায়েরীর গাল ছুঁয়। ক্রন্দনরত গলায় বলে,
‘ সায়ু! একটু শান্ত হয়ে বোস। লেট মি এক্সপ্লে.. ‘
সায়েরী এক ঝটকায় সাফ্রিনের হাত ছুড়ে ফেলে। রাগান্বিত গলায় চেঁচিয়ে উঠে,

‘ আশ্চর্য! কিসের এক্সপ্লেনেশন শুনবো আমি? কান্নাকাটি করে তুই আমাকে কি বিশ্বাস করাতে চাইছিস সাফা? এসব জঘন্য মজা করবি আমার সঙ্গে। ত-তোর ভাইয়া কোথায়? কল দে, কল দে উনাকে। আমি মোটেও মজার মুডে নেই। কল কর। তোর বাবার বলা কথাগুলোর কৈফিয়ত চাই আমি তার কাছে। এক্ষুনি আসতে বল! ‘
সাফ্রিনকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা গেলো না। নিরবে কেবল কেঁদেই যাচ্ছে। সায়েরীর বুকের ভেতরটা ক্ষণে ক্ষণে ভারী হয়ে আসছে। সে এক বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস করেনি কারো কথায়৷ তবুও বেগতিক গতিতে ছুটছে হৃদস্পন্দন। সকলের এমন আচরণ আর সহ্য করতে পারলো না সে। বড্ড বিরক্ত, অস্থির হয়ে বেরিয়ে গেলো রুম হতে। পেছন হতে শুনল সাফ্রিনের ডুকরে উঠা কান্নার শব্দ। রূপম সান্ত্বনা দিলে বিপরীতে মেয়েটা ক্রন্দনরত গলায় বলে উঠলো,
‘ ভাইয়া এমনটা কীভাবে করতে পারে? ওর কি দরকার ছিলো আমাদের ছেড়ে যাওয়ার? ‘

সায়েরীর কদম থমকায় তৎক্ষনাৎ। ডায়াল করতে থাকা রূপসার নাম্বারটা আর চোখে দেখছে না সে। দৃষ্টি ঝাপসা ঠেকছে। ভনভন করছে মাথার ভেতরেটা। সাফওয়ান ভাই সত্যিই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে! সায়েরীকে ছেড়ে! আদৌও সম্ভব এটা? এরপর তার মনে পড়ে নওশাদ খানের বলা কথা সব। মুহুর্তে প্যানিক করে বসে মেয়েটা। মাত্রাতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় তার শ্বাস আটকে এসেছে। শরীরের ভারসাম্য রাখতে দেয়াল খামচে ধরে। সিড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে সে। একটু এদিক সেদিক হলে নিশ্চিত গড়িয়ে পড়বে। মুখ হা করে নিঃশ্বাস টানছে। হাত ফসকে ফ্লোরে পড়েছে মোবাইলটা। সেই হাত দ্বারা অনবরত ঘষছে বুকের উপর। কোনভাবেই শ্বাস নিতে পারছে না৷ ভেজা চোখ জোড়া উল্টে এলো এবারে। মনে হচ্ছে জগৎ ঘুরছে। এক পর্যায়ে দেয়াল খামচে ধরা হাতটাও ছুটে গেলো। দৃষ্টির সম্মুখের সব অন্ধকারে তলিয়ে গেলো। মাথা ঘুরে গোটা শরীর হেলে পড়লো সিড়ির দিকে। অতঃপর, অঘটন যা ঘটার তা-ই ঘটলো। অপ্রত্যাশিত সত্যটার সম্মুখীন হয়ে জ্ঞান হারালো মেয়েটা। লুটিয়ে পড়লো সিড়ির উপর। কোমল দেহটি গড়িয়ে গিয়ে পড়লো সিড়ির শেষ ধাপে। ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজায় দেখা মিললো একটি পুরুষালি অবয়বের। তার ব্যস্ত কদম আচানক থমকে গিয়েছে সায়েরীকে গড়িয়ে পড়তে দেখে। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে পর মুহূর্তে ছুটে এলো সে। বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
‘ সায়ু!!! ‘

লিভিং রুমের সোফার উপর অচেতন হয়ে শুয়ে রয়েছে সায়েরী। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে আবরার,তোহা, রূপম এবং রায়ান-নীতি। আবরারই ফোন করে নিজের বন্ধুদের ডেকেছে গ্রিন ভ্যালিতে। তার গম্ভীর কন্ঠের আদেশ এবং হঠাৎ তলবে ওরা আসতে বাধ্য হয়েছে। এই মুহুর্তে এসে হাজির হয়েছে জিমন। এসেই অচেতন সায়েরী এবং সকলের গুমোট নিরবতা দেখে অবাক হলো সে। নীতি এবং তোহা সায়েরীর পাশ ঘেঁষে বসেছে। হাত-পা ঘষে দিচ্ছে। আবরার এবং তার বন্ধুদের হঠাৎ আগমনে তোহা, সাফ্রিন এবং রূপমের মাথায় আকাশ ভেঙ্গেছে যেনো। আবরার গম্ভীর সুরে একবার মাত্র কৈফিয়ত চাইতেই তোহা হড়বড়িয়ে বলে দিয়েছে নওশাদ খানের বলা কথা সব, এবং সাফওয়ানের চলে যাওয়ার ব্যাপারে। সেই থেকে আবরারের চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।

সকলে যখন নিচ তলায় সায়েরীকে নিয়ে ব্যস্ত। তখন দ্বিতীয় তলায় সাফওয়ানের কক্ষ উলোটপালোট করে নিজের মনে জমা শত শত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে সাফ্রিন। তার ভাই দেশ ছেড়েছে একথা ব্যাতিত অন্য কিছু সে জানে না। রূপম কিংবা অন্য কেউ তাকে বলছে না কিছুই। সে জানে না সাফওয়ানের দেশ ছাড়ার কারণ। কোন কারণে সাফওয়ান বাধ্য হলো এতো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য? পাঁচ পাঁচটা টিকেট কেটে রাখার পরেও কেনো যায়নি তখন? কোন পিছুটান আটকাচ্ছিলো তাকে? সায়েরী নামক পিছুটান? যদি তা-ই হয়ে থাকে তবে এবারে কেনো গেলো? যদি ছেড়ে যাওয়ার-ই ছিলো তবে এই পাগলাটে, অবুঝ মেয়েটাকে কেনো জানিয়ে গেলো না? সাফওয়ান ব্যাতিত অন্য কারো পক্ষে কি আদৌও সায়েরীকে বুঝানো সম্ভব? কেউ পারবে মেয়েটাকে সামলাতে? সবটা জেনে বুঝেও এতো বড় ভুলটা কেনো করলো সাফওয়ান? কি এমন কারণ যা সাফ্রিন এবং সায়েরীর কাছ থেকেও লুকিয়ে যেতে হলো তার?

গোটা রুম তছনছ করে ডাস্টবিন এবং তার আশেপাশে দুমড়েমুচড়ে ফেলা কিছু কাগজ পেলো সাফ্রিন। সব গুলোতে অল্প দুয়েক বাক্য লিখা। এর উপর কাটাছেঁড়া। যেনো মন মতো লিখতে পারেনি। সুক্ষ্ম চোখে পরখ করে সাফ্রিন বুঝতে পারলো, এগুলো সায়েরীর উদ্দেশ্যেই লিখতে চেয়েছিলো সাফওয়ান। কারণ দুই এক যায়গায় সায়েরীর নামের সম্মোধন লক্ষ্য করেছে সে। এছাড়াও কিছু শেষ হওয়া স্লিপিং পিলের পাতা পড়ে রয়েছে সেখানে। সেসব দেখে সাফ্রিন আশ্চর্য হয়ে কুল পেলো না। বেড সাইড টেবিলটার ড্রয়ারে তল্লাশি চালালো। এবং আশানুরূপ, স্লিপিং পিলের পাতা দেখে থম মেরে গেলো সে। এটাতেও মাত্র তিনটা অবশিষ্ট রয়েছে।

সেই ছোট্ট বেলা থেকে নিজের ভাইকে দেখে আসছে যে মেডিসিনের প্রতি কতোটা অনাস্থা তার। যত যা-ই হোক, মেডিসিন নিলে ভালো হবে এই থিওরি কক্ষনো মানতে চাইতো না সাফওয়ান। সেই ছেলেটা কিনা রোজ রোজ স্লিপিং পিল খেয়ে দিন পার করছিলো! কেনো? সাফ্রিন ভাবতে পারলো না কিছু। বিছানা ঘেঁষে বসে পড়লো ফ্লোরে। ক্ষণিক পূর্ব অবধি সায়েরীর জন্য যত চিন্তা হচ্ছিলো, সেসব সরে গিয়ে এখন কেবল ভাইয়ের চিন্তায় দিশেহারা অনুভব করতে লাগলো সে। ছোট থেকেই তো সাফ্রিন জানতো তার ভাই একজন সুপারম্যান। যাকে হারানোর, দমানোর সাহস কারো নেই। স্ব-ইচ্ছায় পিছু না হাঁটা অবধি কোন ঝড়, তুফান যাকে নাড়াতে পারে না। তবে এখন কেনো দমে গেলো সাফওয়ান ভাই? কার দিক চেয়ে বিসর্জন দিলো নিজের অহমিকা?

তৃতীয় বারের মতো চোখে,মুখে পানি ছিটিয়ে পড়লে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল সায়েরী। ধাতস্থ হতে সময় নিলো কয়েক সেকেন্ড। কপাল,কোমড় এবং হাতে – পায়ের কিছু যায়গায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হলো। পরিপূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালে উপস্থিত এতগুলো মানুষকে দেখে এক মুহুর্তের জন্য কিচ্ছুটি ঠাহর করে উঠতে পারলো না সে। তারপর, হঠাৎই সাফওয়ানের কথা স্মরণে এলে লাফিয়ে উঠে বসলো। এখনো সে গ্রিন ভ্যালিতে! সবাই আছে। কিন্তু সাফওয়ান ভাই! সাফওয়ান ভাই কোথায়? রূপমের দিকে নজর গেলে উপস্থিত বাকিদের অগ্রাহ্য করে সায়েরী সোজা রূপমের দিকে এগিয়ে গেলো। ক্লান্ত সুরে জানতে চাইলো,

‘ ভাইয়া! সাফওয়ান ভাই আসেনি এখনো? আ-আপনি কল করেননি তাকে? কথা বলছেন না কেনো? ওখানে আর কেউ কি নেই যাকে কল করে কথা বলে যাবে? ‘
রূপম ঢোক গিলে। বিব্রত দৃষ্টিতে একবার সায়েরীর দিকে তাকায়, পরক্ষণে তাকায় সায়েরীর পেছনে আশ্চর্য, গাম্ভীর্য চিত্তে দন্ডায়মান আবরারের দিকে। জবাব দেয় না কোন। উপস্থিত অন্যরাও শঙ্কিত। আবরারের কঠোর চোয়াল, রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে রায়ান-জিমন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তাদের সকলের নিরবতায় মাঝে কেবল সায়েরীর কন্ঠটায় বেজে চলেছে। মেয়েটা অধৈর্য কন্ঠে বারবার একটায় বাণী আওড়াচ্ছে, সাফওয়ান ভাইকে কল দাও।
এই পর্যায়ে আবরার এগিয়ে আসে। সায়েরীর বাহু টেনে নিজের দিকে ফেরায়। সে কিছু বলবে, পূর্বেই সায়েরী আবরারের মুখ দেখে ভেঙ্গে পড়ে। ডুকরে কেঁদে উঠে আচমকা। লুটিয়ে পড়ে বড় ভাইয়ের বুকের উপর। আবরার সহ সকলকে অবাক করে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। ভাঙ্গা গলায় মিনতির স্বরে বলে উঠে,

‘ সাফওয়ান ভাইকে ফিরে আসতে বলো, ভাইয়া। প্লিজ একটাবার কথা বলিয়ে দাও আমার সঙ্গে। ও-ওরা সবাই কিসব বলছে আমাকে। সাফওয়ান ভাই আমাকে ছেড়ে অতো দূরে যেতে পারে না। কেনো মিথ্যে বলছে সবাই মিলে? ওদের বলো না সাফওয়ান ভাইকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে! একটাবার সাফওয়ান ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে কথা বলিয়ে দাও,ভাইয়া!!! ‘
আবরার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। কঠোর চোয়াল, রক্তিম আঁখি। অন্যরা সায়েরীর উন্মাদনা দেখে হা করে রইলো। আবরারের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে এই ভেবেই হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ বেড়েছে। সায়েরী কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার কি যেন ভেবে মাথা তুললো। ঝাপসা চোখে আশেপাশে তাকিয়ে বলে উঠলো,

‘ আ-আমার মোবাইল! মোবাইল কোথায়? ‘
বলতে না বলতেই তোহা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিলো মোবাইলটা। সায়েরী দ্রুত ছিনিয়ে নিলো সেটা। সাফওয়ানের নাম্বারে ডায়াল করতে করতে অস্বাভাবিক ভাবে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,
‘ সবাই মিথ্যা বলছে। সাফওয়ান ভাই আমাকে বলেছিলো সিলেট থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে। সে বলেছিলো আজ ফোন ক…. ‘
‘ ঠাশ!!!! ‘

থাপ্পড়ের তীব্র ধাক্কায় সায়েরীর মাথাটা হেলে পড়লো বাম কাঁধের দিকে। ভনভন করে উঠলো মাথা। সুখ নীড়ের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো শব্দটি। ভয়ে, বিষ্ময়ে মুখে হাত চাপলো তোহা। সিড়ি বেয়ে নামতে থাকা সাফ্রিন সেখানেই থমকে গেলো। রণমুর্তি ধারন করা আবরারকে দেখে সাকলের দেহের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো। সায়েরীর সর্বাঙ্গ ঝিমঝিম করে উঠেছে। জ্বলে যাচ্ছে গালটা। পরপর আবারও আবরারের হাত সায়েরীর বাহু টেনে ধরতে উদ্যত হলে তক্ষুনি নীতি এসে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিলো বুকে। রায়ান এবং জিমন মিলে আবরারকে টেনে সরিয়ে নিলো। নীতি আগুন চোখে আবরারের দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলো,

‘ ওর গায়ে হাত তুলেছিস কেনো? ভালোই তো বেসেছে, দোষের কিছু করেনি। ও কোন ভুল মানুষকে ভালো বাসেনি যে এভাবে শাসন করতে হবে। বরং সায়েরীর চেয়েও বেশি সাফওয়ান সায়েরীকে ভালোবাসে। তাহলে তোর এতে আপত্তি কিসের? ‘
তীব্র রাগে ফুঁসছে আবরার। তার রাগের কারণ সকলেরই অজানা। সাফওয়ানকে পার্টনার হিসেবে এতোটাই অপছন্দ করে আবরার, যে সকলের সামনে সায়েরীর গায়ে হাত তুললো! নীতির কথা শুনে ক্রন্দনরত সায়েরীকে কঠোর দৃষ্টিতে অবলোকন করলো আবরার৷ তাচ্ছিল্য কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ানের ভালোবাসার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি।’

তার একথায় মর্মার্থ বুঝে উঠতে পারলো না কেউ। সেই সুযোগ টুকু ও পেলো না তারা। আবরার এক থাবায় সায়েরীর কব্জি টেনে ধরতেই সকলে চমকে উঠলো। ভয়ে মিইয়ে গেলো সায়েরী। খামচে ধরলো নীতিকে। কিন্তু ওদের কারোর তোয়াক্কা করলো না আবরার। একপ্রকার টেনে- হিঁচড়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলো সায়েরীকে। পেছনে তখনো বাকিরা আতঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। আপনমনে সাফওয়ানকে বেশ গালিগালাজ ও করেছে। আচানক এতো বড় একটা পদক্ষেপ নিলো। অথচ কাউকে জানালো না ছেলেটা! তার প্রেমে উন্মাদ প্রেয়সীর কি হবে সেই খেয়ালও কি আসেনি মনে? মেয়েটা এখনো সত্য মানতে নারাজ। মেনে নিলে আদৌও কি সামলে উঠতে পারবে ধাক্কাটা?

বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সায়েরীকে প্রায় ছুড়ে ফেললো আবরার। মেয়েটা পড়তে পড়তে সামলে নিলো নিজেকে। আবরারের উচ্চ বাক্য শুনে তার মা এবং সায়েরীর মা ছুটে এসেছেন রান্নাঘর থেকে। কান্নাকাটি করে বেহাল অবস্থা করা সায়ের‍রীকে দেখে দুজনের আশ্চর্যের সীমা রইলো না। তন্মধ্যে আবরার রেগেমেগে বোম হয়ে আছে দেখে নিজেরাও ভয় পেয়ে গেলেন। কি হয়েছে জানতে চাওয়ার পরেও ছেলেটা বললো না কিছু। আগুন চোখে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে আবার বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। যেতে যেতে দরজায় এক লাত্থি বসালো। সেই শব্দে সায়েরী সহ তার মা, চাচিও কেঁপে উঠেছে। আবরার যেতেই সায়েরীও ছুটে গেলো নিজের রুমে। দরজা আটকে দিলো। মেহরিন বেগম অনেক ধাক্কাধাক্কি করেও লাভ হলো না। চিন্তায় চিন্তায় গোটা দিন কেটে গেলো। আবরার ও সেই যে গেলো। আর ফিরার নাম নেই। কারোর কল ও রিসিভ করছে না। এদিকে দুই কর্তা-ও নেই বাড়িতে। ব্যবসার কাজে গত কালই শহরের বাহিরে গিয়েছেন দুজনে। ছেলে মেয়ের ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞাত তারা। দুশ্চিন্তায় আবরারের মায়ের প্রেশার বেড়ে গিয়েছে।

দুপুর গড়িয়ে বেলা চারটা বেজেছে তখন। খান ভিলায় নিজ রুমে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে রূপম। সাফওয়ানের চিন্তায় চিন্তায় তার মাথা ফেটে যাওয়ার যোগাড়। দুবাই হতে সকাল ৮টায় সাফওয়ানের নেক্সট ফ্লাইট ছিলো সুইডেনের উদ্দেশ্যে। হিসেব অনুযায়ী বেলা ১ টার পরপর ফ্লাইট ল্যান্ড করার কথা। সাফওয়ান কথা দিয়েছিল ল্যান্ড করার পর সর্বপ্রথম সে রূপমের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। যেমন দুবাই পৌঁছে তৎক্ষনাৎ অনলাইনে কল করেছিলো। তাহলে এখন কেনো যোগাযোগ করলো না? নানান রকমের দুশ্চিন্তায় গলা শুকিয়ে এলো তার। এদিকে তার বাবাও কল রিসিভ করছে না ঘন্টা খানিক যাবত। আবার কল দিলো সে। রওশন খান মিটিংয়ে ছিলেন। ফ্রি হতেই কল ব্যাক করলেন। সাফওয়ানের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি তৎক্ষনাৎ কল দিলেন সুইডেনে উনার পরিচিত একজনকে। যাকে বলেছিলেন এয়ারপোর্ট হতে সাফওয়ানকে রিসিভ করার জন্য। কল করার পূর্বে দেখলেন ইতোমধ্যে উক্ত ব্যক্তি অসংখ্য বার কল দিয়েছে রওশন খানকে। যা দেখে রওশন খান চিন্তিত হলেন। কল ব্যাক করার সঙ্গে সঙ্গে অপর ব্যক্তি রিসিভ করলো। জানালো, দীর্ঘ দেড় ঘন্টা এয়ারপোর্টে খোঁজ করার পরেও রওশন খানের ভাতিজার সাক্ষাৎ পায়নি সে। অনেক খুঁজেও যখন পায়নি তখন বাধ্য হয়ে ফিরে এসেছে। রওশন খান স্তব্ধ হয়ে পড়লেন একথা শুনে। পায়নি মানে কি? জলজ্যান্ত একটা ছেলে এভাবে নাই হয়ে যেতে পারে? তাছাড়া সাফওয়ান তো ছোট্ট কোন শিশু নয় যে এভাবেই হারিয়ে যাবে। তবে কি কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে? সুস্থ আছে তো সে?

আবরার বাড়ি ফিরেছে প্রায় মাঝরাতে। তার মায়েরা তখনও না খেয়ে ছিলো। বাড়ির ছেলে, মেয়ে যেখানে না খেয়ে রয়েছে সেখানে উনাদের গলা দিয়ে খাবার নামবে কীভাবে? বাড়ি ফিরে আবরার কিচ্ছুটি বললো না। ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বসলো, যেনো কিছুই হয়নি। এরপর চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেলো। মেহরিন বেগম প্রশ্ন করতে চাইলেন। কিন্তু আবরারের গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে সেই সাহস হলো না উনার। আবার গেলেন মেয়ের কক্ষের সামনে। দরজায় করাঘাত করলে এবার গিয়ে সায়েরীর কন্ঠ ভেসে এলো,

‘ মাথা ব্যথা করছে। একটু ঘুমাতে দাও, আম্মু। ‘
এটুকু বাক্যে মেহরিন বেগম আর কোন কথা বললেন না। নিজেও না খেয়ে ফিরে এলেন নিজের রুমে। ঘুমন্ত মিনহার পাশে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু এক ফোঁটা ঘুম ধরা দিলো না চোখে।
নিজের রুমের ফ্লোরে কাত হয়ে, হাত পা গুটিয়ে শুয়ে রয়েছে সায়েরী। পাশেই তার মোবাইলটা। সেটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে অপলক। মাথার উপর ভনভন করে ফ্যান ঘুরছে। ঘুরছে সায়েরীর সমস্ত জগৎ। মেয়েটা এখনো সাফওয়ানের ফোন কলের অপেক্ষায়। সাফওয়ান ভাই যে কথা দিয়েছিলো আজ কল দিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে। শীঘ্রই সিলেট থেকে ফিরেও আসবে। সেসব কথা এখনো মনে পুষে রেখেছে সে। রাখবে না-ই বা কেনো? সাফওয়ান ভাই যে কখনো কথার খেলাফ করে না। তবে সায়েরীর কি প্রয়োজন অন্যদের বেহুদা কথায় বিশ্বাস করার? সে মোটেও ওসব কথা বিশ্বাস করেনি। একমাত্র সাফওয়ান ভাই ব্যাতিত অন্য কিছুতে তার বিশ্বাস নেই।

সকাল ন’টা। মোবাইলের রিংটোন শুনে সায়েরীর ঘুম ছুটে যায়। চমকে গিয়ে লাফিয়ে উঠে বসলো সে। সারা রাত জেগে থেকেছে ফোন কলের আশায় আশায়। ভোর রাতের দিকে কীভাবে যে ঘুমিয়ে গিয়েছে নিজেও টের পেলো না সে। গোটা রাত কেটে গেলো! চোখ ডলে দ্রুত মোবাইল চেক করলো সে। সাফওয়ান ভাই নিশ্চয় কল করেছিল! ইশ..কেনো ঘুমিয়ে গেলো সে? কি হতো আরেকটু জেগে থাক.. এক মিনিট! কোথায় কল? কোথায় সাফওয়ান ভাইয়ের কল? কোথায় মেসেজ? সায়েরী রুম জুড়ে পায়চারি করতে করতে বারে বারে কল হিস্ট্রি চেক করে দেখে। হোয়াটসঅ্যাপে সাফওয়ানের আইডিও চেক করে। কোন কল নেই। তার দেওয়া মেসেজ গুলো এখনো ডেলিভার অবধি হয়নি। এবারে সায়েরীর হৃদস্পন্দন থমকাল যেনো। কাল থেকে সকলের বলা কথা সব কানের কাছে প্রতিধ্বনি হতে লাগলো। চোখে ভাসলো টিকেটের দৃশ্য। ঘন ঘন ঢোক গিলে সে। আবার কল দেয় সাফওয়ানের নাম্বারে। এবারেও সুইচড অফ! সায়েরীর সর্বাঙ্গ কাঁপছে। গলায় দলা পাকিয়ে উঠে বিষাক্ত কিছু অনুভূতি। আবার সাফ্রিনের কল এলো। সায়েরী যন্ত্রের মতোন রিসিভ করে কানে ধরলো। সাফ্রিন কিছু বলার পূর্বেই সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলো,

‘ ত-তোর ভাইয়া সত্যিই সব ছেড়ে চলে গিয়েছে সাফা? ‘
‘ সায়ু! প্লিজ আমার কথাটা শু.. ‘
‘ আমি কি জিজ্ঞেস করেছি? সাফওয়ান ভাই আমাকে ছেড়ে গিয়েছে? হ্যাঁ নাকি না? জবাব দে সাফ্রিন!!! ‘ চিৎকার করে উঠলো সায়েরী।
‘ হ-হ্যাঁ, হ্যাঁ। কিন্তু ভাইয়া তোকে… ‘
সায়েরী আর কিচ্ছুটি শুনলো না। দেহের ভারসাম্য হারালো যেন। হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়লো জমিনে। তার কানে অনবরত বেজে চলেছে গতকাল সকলের বলা সব অবিশ্বাস্য বাক্য..

‘ ভাইয়া সিলেটে যায়নি, সায়েরী। ‘
‘ ভাইয়া নেক্সট টিকেটটা সেপ্টেম্বর ৩ তারিখের জন্য বুকিং দিয়েছিলো। সে এখন ফ্লাইটে। ‘
‘ পছন্দ, অপছন্দ যা ছিলো সব ছেলেমানুষী পেছন ফেলে এখন নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়েছে সে। ‘
‘ আমাদের স্বীদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে বলেই ওসব মোহ ছেড়ে দূরের পথ বেঁচে নিয়েছে। ‘
‘ রিদিতার ব্যাপারে তোমার ভাই সব জানে, এবং মেনেও নিয়েছে। ‘
‘ সব জানে, মেনেও নিয়েছে। ভাইয়ের বউ হয়ে এলেও কি তার সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারবে? ভাইয়ের বউ হয়ে এলে… রিদিতার ব্যাপারে জানে, মেনেও নিয়েছে… সাফওয়ান কতোটা মা ভক্ত জানোনা? মা বললে সব মেনে নিবে। রিদিতার ব্যাপারে সে সব জানে এবং মেনেও নিয়েছে.. ওসব ছেলেমানুষী পেছন ফেলে এখন নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সে….. ওসব ছেলেমানুষী.. ছেলেমানুষী! সব জানে, মেনেও নিয়েছে… মেনে নিয়েছেএএএ!!

দুহাতে কান চেপে ধরে বোবা চিৎকার করে উঠলো সায়েরী। মাথার চুল টেনে ডুকরে কেঁদে উঠলো। চোখে ভাসলো তার এক্সিডেন্টের দিনের দৃশ্য। সুখ নীড়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিয়ে নিয়ে আলাপ করছিলো রিদিতা এবং সাফওয়ান। সেই সুখ নীড় যেটাকে সায়েরী নিজের বলে মানতো। সেই মানুষটা অন্য একজনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাচ্ছিল যাকে সায়েরী সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে ভালোবেসে এসেছে। অন্ধের মতো ভরসা করেছে। সাফওয়ান বলেছিলো রিদিতা এই বিয়েতে রাজি নেই। কিন্তু কাল সায়েরী স্পষ্ট দেখলো মেয়েটা এখন থেকেই নিজেকে ও বাড়ির বউয়ের স্থানে বসিয়ে ফেলেছে। সাফওয়ানের মায়ের স্বীদ্ধান্ত যেহেতু, সাফওয়ান নিশ্চয় না করবে না। কেনো করবে? সায়েরী জানে সাফওয়ান কতোটা মা ভক্ত।

তার মানে নওশাদ খানের কথামতো সাফওয়ান কি সত্যিই রিদিতাকে মেনে নিয়েছে? এজন্যেই দূরে চলে গিয়েছে সায়েরীকে ছেড়ে? তবে এতগুলো দিন সায়েরী সঙ্গে এতসব… কি ছিলো এগুলো! সায়েরী বোকা বলেই কি এত সহজে তার অনুভূতি নিয়ে খেলেছে সাফওয়ান ভাই? একথা ভাবতেও বুকে ছুরাঘাতের মতো যন্ত্রণা হচ্ছে। সর্বশক্তি দিয়ে চুখ খামচে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে সে।
আবার মোবাইল বেজে উঠলো। সেই শব্দে সায়েরীর দেহের রক্ত কণিকা টগবগিয়ে উঠেছে। সাফ্রিনের কোন মন ভুলানো কথা শোনার ইচ্ছে নেই তার। একবার বাজতে বাজতে কেটে যাওয়ার পর পুণরায় রিং বেজে উঠেছে। তীব্র ক্রোধে জর্জরিত হয়ে সায়েরী আগপিছ না দেখেই কল রিসিভ করে কানে ধরলো। অপর প্রান্ত হতে কোন কথা ভেসে আসার পূর্বেই আক্রোশে ফেটে পড়লো সে,

‘ বারবার আমাকে কল দিয়ে কি শোনাতে চাইছিস সাফা? তোর ভাইয়ের হয়ে কোনো সাফাই শুনাতে আসবি না। আমারই ভুল হয়েছে নিজের ক্লাস, নিজের যোগ্যতা ভুলে তোর ভাইকে ভালোবেসেছি। আ-আমিই বোকা ছিলাম যে সাফওয়ান ভাই কে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে এসেছি। যদি নিজের বাবা মায়ের পছন্দকেই মেনে নেওয়ার ছিলো তাহলে আমার সঙ্গে ক-কেনোওও…. ‘
পুণরায় ডুকরে কেঁদে উঠলো সায়েরী। মোবাইলটা আরও একটু চেপে ধরে ভঙ্গুর গলায় বলে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই কেনো আমার সঙ্গে এমন করলো, সাফা? এমন স্বার্থপরতা কেনো করলো বল? আ-আমি সহ্য করতে পারছি না। আমাকে কেনো এভাবে মাঝপথে ছেড়ে গেলো? আমাকে এমন ভাবে ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলতে পারলো কি করে? ‘

অপর পাশে পিনপতন নীরবতা। সায়েরী হাউমাউ করে কাঁদছে। এলোমেলো সুরে আওড়াচ্ছে,
‘ আমি তাকে কক্ষনো ক্ষমা করবো না, সাফা। আমি আর কিচ্ছু জানতে চাই না। কিছু শুনতে চাই না। আ-আমার নিজের উপরেই ঘেন্না লাগছে। আ- আমি কতোটা বোকা! সব দেখেও তাকে বিশ্বাস করেছিলাম৷ ‘
আর সে আমাকে শুধু ব্যবহার করে গেলো! ‘

আবারও ডুকরে উঠলো সায়েরী। কাঁদতে কাঁদতে রাগে, জেদে মোবাইলটা ছুড়ে মারলো দেয়ালে। স্ক্রিন ফেটে জমিনে লুটিয়ে পড়লো মোবাইলটা। সায়েরী তীব্র জেদে নিজেই নিজের হাত খামচে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললো। কাঁদতে কাঁদতে নিঃশ্বাস আটকে এলো। প্যানিক অ্যাটাক হলো পুণরায়। অন্যদিকে মেহরিন বেগম দরজা ধাক্কাচ্ছেন। এই পর্যায়ে আবরারের স্বরও শোনা গেল।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮১

সায়েরীর চোখ বুজে আসে। শরীরের শক্তি সব ফুরিয়ে এসেছে যেন। মেয়েটা জানলো না দরজার অপর প্রান্তে কতগুলো মানুষ তার চিন্তায় উন্মাদ হয়ে পড়েছে। সে দেখলো না জমিনে অবহেলায় পড়ে থাকা চূর্ণবিচূর্ণ মোবাইলটার স্ক্রিনে সাফ্রিনের নাম্বার নয়, বরং এক অচেনা বিদেশি নাম্বার ভেসে রয়েছে। কলটি তখনো ডিসকানেক্ট হয়নি। ততক্ষণ অবধি লাইনে ছিলো, যতক্ষণ না আধভাঙ্গা মোবাইলটার স্ক্রিন কাঁপতে কাঁপতে একটা সময় ডিসপ্লে অফ হয়ে গেলো।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে শেষ পর্ব