অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে শেষ পর্ব
সাজিয়া জাহান সুবহা
সহজ–সরল, কিছুটা বোকাসোকা অথচ ভেতরে প্রবল জেদ পুষে রাখে যে মানুষগলো, তাদের ভাঙনটা আসে হঠাৎ করেই। আবেগ যখন মন ও মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়, তখন তারা ক্ষণিকের জন্য পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। কী করছে, কী বলছে, নিজেরই আর স্পষ্ট ধারণা থাকে না। নিজের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কা তাদের ভেতরের স্থিরতা ভেঙে দেয়। আর সেই ভয়েই তারা হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রণহীন। নিজেকে সামলাতে না পেরে এক মুহূর্তে নিজের যত্নে সাজানো দুনিয়াটা তছনছ করে ফেলে; পরের মুহূর্তেই সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই আফসোসের সাগরে ভেসে যায় নীরবে, নিঃস্ব হয়ে, অনুতাপে ভারাক্রান্ত হয়ে।
যেমনটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে অষ্টাদশী রমনী সায়েরী। মিনিট খানিক পূর্বে জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করেছে সে। একটুখানি ধাতস্থ হওয়ার পরেই স্মরণে এসেছে সাফওয়ানের কথা। এরপর আচানক মস্তিষ্কে হানা দিয়েছে জ্ঞান হারানোর ক্ষণিক পূর্বে মন-মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে নিপীড়িত হয়ে সাফ্রিনকে তারই ভাইয়ের নামে কতটা বাজে কথা শুনিয়ে দিয়েছিলো সে! কিন্তু সায়েরী তো মন থেকে বলেনি সেসব। ঠিক ঐ মুহুর্তটিতে সে মানসিকভাবে কতোটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলো, সেটা কি বুঝবে সাফ্রিন? কেউই তো বুঝবে না। সায়েরী পারবে না তার অভ্যন্তরে চলতে থাকা বিধ্বংসী যুদ্ধের অনুভূতিটুকু ব্যক্ত করতে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঠান্ডা ফ্লোরে নগ্ন কদম ফেলে দুর্বলচিত্তে স্থির হয়ে দাঁড়ালো সায়েরী। পুরোপুরি দাঁড়িয়ে পড়তেই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো তার। একহাতে মাথা চেপে ধরে অন্য হাতে বিছানার হেডবোর্ড খামচে ধরলো। দুর্বল লাগছে ভীষণ। তার বাম হাতের উল্টো পিঠে ছিলে গিয়েছে। ক্যানুলা টান মারার কারণে চামড়া ছিলে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। শারীরিক কোন দুর্বলতা, ব্যথা টলাতে পারলো না মেয়েটাকে। একটুখানি স্থির হতেই কদম বাড়ালো নিজের স্টাডি টেবিলটার দিকে। ওখানটাতে অবহেলায় পড়ে আছে তার চূর্ণবিচূর্ণ মোবাইলটা। সায়েরী উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গিয়ে মোবাইল হাতে নেয়। স্ক্রিন অন হচ্ছে না দেখে বারে বারে হাতের তালুর উপর বারি দেয়। কিন্তু কিছুতেই মোবাইল চালু হলো না। দুর্বলতা, অস্থিরতা, অনুশোচনায় ডুবে ফুঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। নিয়তি যে তাকে এমন দিনের ও মোকাবিলা করাবে, তা দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি সে। বুকের ভেতরটায় চুরা ঘাতের মতো যন্ত্রণা হচ্ছে।
নিজের পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সায়েরী ঝাপসা দৃষ্টিতে ঘাড় ফিরালো। মিনহাকে দেখে ঢোক গিলে কান্নাটুকু দমিয়ে ভাঙ্গা স্বরে আওড়াল,
‘ মেহু! আম্মুর মোবাইল কোথায়? ‘
বড় বোনের বিধ্বস্ত রূপ দেখে ভীতু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো মিনহা। ফ্লোরের ফোঁটা ফোঁটা রক্ত কণিকা দেখে বাচ্চাটার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছে। সায়েরীর কথার প্রতিউত্তর করলো না সে৷ একছুটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে৷ সেকেন্ডের মাঝে ছুটে এলো পুণরায়। মায়ের মোবাইলটা বাড়িয়ে দিল বোনের দিকে। সায়েরী ছিনিয়ে নিলো সেটা। দুই গাল মুছল রক্তাক্ত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে। মুখস্থ থাকা সাফওয়ানের নাম্বারটা ডায়াল করে কল লাগাল ঝটপট। হাস্যকর বিষয়! এতকিছুর পরেও সাফওয়ানের নাম্বারে কল দিয়ে তার সন্ধান পাওয়ার প্রত্যাশা করাটাও যে বোকামি তা মেয়েটা বুঝলোই না। এবারেও নাম্বারটা সুইচড অফ দেখে সায়েরীর ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না এলো। হাত দুটো কাঁপছে অনবরত। কম্পিত হাতে নিজের মোবাইল হতে সিম কার্ড বের করে মায়ের মোবাইলে সেট করলো সে। তক্ষুনি পেছন থেকে একটি গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসলো,
‘ মোবাইল নিয়ে কি করছিস? ‘
‘ স-সাফওয়ান ভাই বলেছিল আম..আমাকে কল করবে। কিন্তু আমি কি সব করে ফেলেছি দেখো না। মোবাইল ভেঙ্গে ফেলেছি। যদি আমাকে কল দিয়ে না পায় তাহলে খুব রাগ ক..’
সায়েরীর ক্রন্দনরত, অস্বাভাবিক কন্ঠটা থমকাল হঠাৎ। ঘোরের মাঝে ঝটপট জবাব দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কন্ঠের মালিক যে কে তা ঠাহর করতে পেরে জমে গেলো মেয়েটা। পেছন ঘুরলো দ্রুত। পিঠের পেছনে লুকিয়ে নিলো মোবাইল দুটো। আতঙ্কে কেঁপে উঠলো সর্বাঙ্গ। ঝাপসা দৃষ্টিতে বড় বড় নয়ন মেলে তাকালো সে সম্মুখে। আবরার দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার সামনে। তার মুখাবয়ব দেখে সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না সে কি রেগে আছে কিনা। কিন্তু গত কালের দৃশ্য মনে পড়তেই মাথা নিচু করে ফেললো সায়েরী। তীব্র ভয়ে দুরুদুরু কাঁপছে তার অন্তস্থল।
আবরার নিরব চোখে দেখল ছোট বোনের বিধ্বস্ত হাল। চোখ, মুখ ফুলে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছে মেয়েটার। অশ্রুর কালসিটে দাগ পড়ে গিয়েছে দুই গালে। এবং তাতে রক্তের ছাপ লেগে রয়েছে। এলোমেলো চুলগুলো লেপ্টে রয়েছে ভেজা গালে। বাম হাতটা পুরোপুরি রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। কি বিধ্বংসী রূপ! অতী আদরের ছোট্ট বোনটার এহেন রূপ দেখবে বলে কখনো কল্পনা করেছিলো আবরার? এই বিধ্বস্ত অবস্থার দায়ী কিনা তারই বেস্ট ফ্রেন্ড! আবরারের রাগ জন্মাল পুণরায়। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো অজানা কোন ক্রোধে। সায়েরীর দিকে হাত বাড়ালে ভয়ে তৎক্ষনাৎ চোখমুখ খিচে স্টাডি টেবিলের সঙ্গে সিটিয়ে গেলো মেয়েটা। আতঙ্কিত হয়ে কেঁদে ফেললো। সেই অবস্থাতেই ওকে বুকে টেনে নিলো আবরার। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় আওড়াল,
‘ চুপ! শান্ত হ ‘
সায়েরী হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মাথার উপর ভাইয়ের স্নেহপূর্ণ স্পর্শ পেয়ে ওর ভেতরটা আরও ভেঙ্গে আসে। নিজেকে পুরোপুরি নিঃস্ব অনুভব করে হাউমাউ শব্দে কেঁদে ফেলে। আবরারের সহ্য হয়না সেই করুণ কান্নার স্বর। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো সে। এটুকু কান্নায় সায়েরীর দম আটকে আসলো। ব্যাপারটা লক্ষ্য করে দ্রুত তাকে চেয়ারে বসিয়ে সায়েরীর ইনহেলার টা খুঁজে আনলো আবরার। নিজেই ইনহেলার টা খুলে সায়েরীর মুখে ধরলো। পরপর দুই পাফ নিয়ে শান্ত হলো সায়েরী। শ্বাস টানলো ঘনঘন। তখনো হেঁচকি তুলছে সে। নিরবে দুই গাল ভিজে চলেছে অবিরাম অশ্রুজলে। আবরার এসে বসলো ঠিক ঠিক সায়েরীর সম্মুখে। মেয়েটাকে সময় দিলো একটুখানি ধাতস্থ হওয়ার জন্য। অতঃপর, সায়েরীর রক্তমাখা হাতটা তুলে নিলো নিজ হাতের মাঝে। হাত বাড়িয়ে ভেজা গাল জোড়া মুছে দিলো। সাথে সাথে আবারও ভিজে উঠলো সায়েরীর দুই গাল। এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আবরার। কিচ্ছুটি জানতে, বুঝতে চাইলো না সে৷ কোন কৈফিয়ত নিলো না। ভীষণ শান্ত, ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো–
‘ গতকাল সাফওয়ানের বাবা তোকে কি বলেছিলো? ‘
অশ্রু ভর্তি চোখ তুলে তাকালো সায়েরী। তার থুঁতনি কাঁপছে তখনো। মনে পড়লো অহংকারী নওশাদ খানের বলা তিক্ত বাক্যগুলো। পুণরায় বুকের ভেতরটা চুরমার হওয়ার মতো অনুভূতি হলো। ক্রন্দনরত গলায় ভাইয়ের কাছে অভিযোগ দেওয়ার মতো করেই একের পর এক কথা সব উগলে দিলো মেয়েটা। তার কান্না বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবরারের ক্রোধের মাত্রা বাড়তে লাগলো। রাগে কপালের রগ ফুলে দপদপ করছে। গতকালই তোহা বলেছিল তাকে যে নওশাদ খান অপমান করেছে ওদের। কিন্তু ঠিক কি বলেছিল তা তোহা জানায়নি দেখে সায়েরীর কাছ থেকেই জেনে নিয়েছে সে। এখন সবটা শুনে রাগ সব সাফওয়ানের উপরেই ঝাড়তে ইচ্ছে হচ্ছে আবরারের। সায়েরী কাঁদছে তখনো। হেঁচকি তুলে আবরারের দিকে তাকিয়ে সে ভঙ্গুর গলায় বলে উঠলো,
‘ উনারা এত বড় স্বীদ্ধান্ত কীভাবে কারোর উপর চাপিয়ে দিতে পারে, ভাইয়া? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না। ত-তবুও ক.. ‘
কান্নার দমকে কথাটার সমাপ্তি টানতে ব্যর্থ হলো সায়েরী। আবরার পুণরায় হাত বাড়িয়ে সায়েরীর দুই গাল মুছে দিলো। বললো,
‘ উনার কথা বিশ্বাস করেছিলি তুই? ‘
তৎক্ষনাৎ ডানে বামে মাথা নাড়াল সায়েরী। সামনে বসে থাকা মানুষটা যে স্বয়ং তার বড় ভাই সেই ব্যাপারটা ভুলে হড়বড়িয়ে জবাব দিলো,
‘ এ..একদম না। একটুও বিশ্বাস করিনি। কারোর কথাতে বিশ্বাস করিনি। স-সবাই মিলে আমাকে মিথ্যে বলছে ভাইয়া। ওরা বলছে স-সাফওয়ান ভাই সবাইকে ছেড়ে, আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছে। সে কেনো দূরে যাবে বলো? সাফওয়ান ভাই তো কখনো আমাকে মিথ্যে বলে না৷ তাহলে বাকিরা কেন মিথ্যে বলছে? সে তো বলেছিল যে সিলেটে যাবে। পৌঁছে আমাকে কল করবে.. কল! দেখো আমি আমার মোবাইলটাও ভেঙ্গে ফেলেছি ভাইয়া।সাফওয়ান ভাই হয়তো কল করেছিল। আ..আমার কি হয়ে গিয়েছিল! কেনো মোবাইলটা ভেঙ্গে ফেললাম! দেখো না, এ-এটা চালু হচ্ছেই না। আবারও কল দিলে যদি না পায় তখন সে খুব রাগ করবে। আম..আমি কেনো ওদের কথাগুলো শুনেছি! কেনো জেদ দেখিয়েছি! এ..এখন দেখো কিসব হয়ে গেল। সবটা এলোমেলো হয়ে গেলো৷ সাফওয়ান ভাই কীভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করবে ভাইয়া? ‘
আবরারের হাতজোড়া কবে যে সায়েরীর হাতের উপর হতে সরে এসেছে তা সে টের পেলো না। অবিশ্বাস্য, ভীতিকর দৃষ্টিতে সে সায়েরীকে দেখছে। এতোটা অস্বাভাবিক আচরণ করছে কেনো মেয়েটা? আবরারের ছোট্ট একটা প্রশ্নের বিপরীতে অনবরত আহাজারি করে যাচ্ছে সায়েরী। এখনো তার কন্ঠটা থেমে নেই। নিজের ভাঙ্গা মোবাইলটা হাতে নিয়ে কেঁদে চলেছে। আফসোস করছে, কেনো এটা ভেঙ্গে ফেললো। আবরারের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে অজানা কোন আতংকে। সে গতকাল রাত থেকে এই অবধি সব ধরনের চেষ্টা চালিয়েছে সাফওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করার। কিন্তু যেখানে সাফওয়ানের পরিবারের কেউই তার খোঁজ পায়নি এখনো, সেখানে আবরার খোঁজ পাবে কি করে! তবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সে। সাফওয়ানের সঙ্গে তার অনেক বোঝাপড়া বাকি।
সায়েরীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবরারের মনের মাঝে হঠাৎ কেমন এক শঙ্কা জেগে ওঠে। ভাবে, মাত্র চব্বিশ ঘন্টার ব্যবধানে সায়েরী কি থেকে কি হয়ে গেলো! সাফওয়ান যদি আর যোগাযোগ না করে? যদি নওশাদ খানের বলা বাক্য সব সত্য হয়? তখন কি হবে এই মেয়েটার?
একথা ভাবতে নিয়েও দরদরিয়ে ঘেমে উঠলো আবরারের সর্বাঙ্গ। দুহাতে বার কয়েক নিজের মুখ ঘষল সে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। লাল হয়ে গিয়েছে। সে জোর করে সায়েরীর হাত থেকে মোবাইলটা ছিনিয়ে নেয়। শান্ত সুরে কান্না থামাতে বলে। কয়েক বার বলার পরেও যখন সায়েরীর কান্না থামলো না, তখন বাধ্য হয়ে ধমকে উঠলো আবরার। অবিলম্বে সায়েরীর কান্না থেমে গেলো। গুটিয়ে গেলো ভয়ে। আবরার ফার্স্ট এইড বক্স এনে সায়েরীর হাতের রক্ত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিল। এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠতে উদ্যত হলে তৎক্ষনাৎ তার বাহু টেনে ধরলো সায়েরী। আবরার চোখ তুলে তাকাতেই দৃষ্টি মিললো সায়েরীর ছলছল দৃষ্টিতে। মেয়েটা অনবরত ঢোক গিলে উপচে পড়তে চাওয়া কান্না গুলো দমিয়ে রাখছে। এক পর্যায়ে নিজেকে আর দমাতে না পেরে সে কান্নারত গলায় মিনতি করে ওঠে–
‘ সাফওয়ান ভাইয়ের সঙ্গে একটাবার কথা বলিয়ে দাও, ভাইয়া। আ-আমার ভীষণ অস্থির লাগছে। ম..মনে হচ্ছে সে ঠিক নেই। শুধু একবার তার কন্ঠটা শুনতে দাও,প্লিজ!!! ‘
কি করুণ কন্ঠের আকুতি! আবরার বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না ক্রন্দনরত মুখশ্রীটির দিকে। সে ঢোক গিলে। কিছু বলতে নিয়ে উপলব্ধি করে তার কন্ঠ দিয়ে কথা আসছে না। সহসা সায়েরীর মাথায় হাত রাখে আশ্বাস স্বরূপ। কিছু বলে না। হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। বাহিরে এসে মেহরিন বেগমের সঙ্গে মুখোমুখি হয়। যিনি খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে বিবশ চিত্তে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ঠিক কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কে জানে! কিছু শুনেছে কিনা তা-ও জানে না আবরার। তাছাড়া সে কিছু জানাতেও ইচ্ছুক নয়। মেহরিন বেগম অবশ্য না শুনে, না জেনেও আন্দাজ করে নিয়েছেন অনেক কিছু। শত হোক, তিনি তো মা। সন্তানকে একজন মায়ের চেয়ে ভালো আর কে-ই বা বুঝে? শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে সহসা তিনি আবরারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লেন,
‘ ছেলেটা কে? কোথায় থাকে? ‘
আবরার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রশ্নগুলো সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলে উঠে,
‘ এই ব্যাপারে ওর কাছে কিছু জানতে চেয়ো না, ছোট আম্মু। ওকে একটু সময় দাও। বকো না, প্লিজ। একটু যত্ন নাও শুধু। বাদ বাকি সব আমি দেখছি। কিছু দিন গেলে সায়ু নিজেই সামলে উঠবে৷ ‘
আবরার স্থান ত্যাগ করলো। কিন্তু স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন মেহরিন বেগম। সত্যিই কি সায়েরী সামলে উঠবে? মাতৃহৃদয় যে কোন আশার আলো দেখছে না। মন কু ডাকছে। মনে হচ্ছে মেয়ের এই হাহাকার এতো তাড়াতাড়ি কমবার নয়।
সেদিন সহ পরপর দুটো দিন কেটে গেলো এভাবেই। মায়ের মোবাইলে নিজের সিম কার্ড সেট করে সায়েরী দিনরাত মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। অপেক্ষা করে সাফওয়ানের ফোনকলের। যেন সাফওয়ান ভাই কল দিলে সঙ্গে সঙ্গে সে রিসিভ করতে পারে। এখনো যে অনেক বোঝাপড়া বাকি। অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা বাকি। নওশাদ খানের বলা তিক্ত কথাগুলো নিয়ে সাফওয়ান ভাইয়ের সঙ্গে রাগ-অভিমান করা বাকি। ওই রিদিতা মেয়েটাকে নিয়ে হাজারটা অভিযোগ করা বাকি। কিন্তু তার আগে একবার সাফওয়ান ভাই কল করুক। সায়েরীকে বলুক, যে সে ঠিক আছে। দূরে নয়, কাছেই আছে। এবং সবার কথাগুলো মিথ্যে প্রমাণ করে দিক। সায়েরীর অপেক্ষার অবসান ঘটুক। দ্রুত, খুব দ্রুত..
টিকেট অনুযায়ী সাফওয়ানের যেদিন স্টকহোম আরলান্ডা এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার কথা, সেই দিনটা সহ পরের দিনটিও কেটে গেলো প্রায়। কিন্তু সাফওয়ান যোগাযোগ করলো না কারোর সঙ্গে। কেউ তার খোঁজ পেলো না। চব্বিশ ঘন্টা অতিক্রম হওয়ার পর তাহুরা খান এবং রূপমের চিন্তা বাড়লো। সাফওয়ান মোটেও কান্ড জ্ঞানহীন নয় যে, স্ব-ইচ্ছায় যোগাযোগ বন্ধ রেখে সবাইকে চিন্তায় ফেলবে। নিশ্চয় কোন না কোন কারণ রয়েছে এর পেছনে। সে কি ঠিক নেই? নাকি কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো পরিস্থিতিতে নেই? নানান রকমের চিন্তায় রূপমের প্রায় নাজেহাল অবস্থা। তাহুরা খান’কে সে কোন রকমে বুঝ দিলেও নিজেকে বুঝাতে পারছে না। বিনা কারণে এভাবে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার মতো ছেলে যে নয় সাফওয়ান। তাই তো ক্ষণে ক্ষণে চিন্তা বাড়ছে তার।
সেদিন রাত্রি বেলা রওশন খান ফোন করলো রূপমকে। জানালো, সুইডেনে উনার পরিচিত ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা হয়েছে। সাফওয়ান নিজেই যোগাযোগ করেছিলো মানুষটার সঙ্গে। রওশন খানের সঙ্গে সাফওয়ানের কথা হয়নি। তবে সে যে ঠিক আছে এটুকু ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছে রওশন খানের বন্ধু। রূপম সবটা শুনলো। দুশ্চিন্তা কমার কথা থাকলেও পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ কৌতুহলী হলো সে।সাফওয়ান যদি সুস্থ, স্বাভাবিক থেকে থাকে তবে নিজ থেকে যোগাযোগ করলো না কেনো? সে কি জানে না তার মা কেমন? বুঝে না যে বাসার সকলে চিন্তায় আছে তাকে নিয়ে? তাহলে এমন ছেলেমানুষী করার কি মানে?
গোটা একটা সপ্তাহ বদ্ধ রুমের মাঝে একগুঁয়ে ভাবে পড়ে রইলো সায়েরী। মাত্র একটা সপ্তাহের ব্যবধানে ওর বাহ্যিক রূপে, অভ্যন্তরীণ অনুভূতিতে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। মেহরিন বেগম সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখছেন মেয়েকে। এতোটা গুমসুম, এমন অমনোযোগী, এতোটা ভেঙ্গে পড়তে কখনো দেখেননি তিনি নিজের মেয়েকে। আবরার মুখ ফুটে কিছু জানাচ্ছেও না। মেহরিন বেগম নিজের মধ্যেই দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছেন৷ সায়েরীর বাবাকে বলা হয়েছে আগামী সপ্তাহে যে পরীক্ষার ফলাফল দিবে, সেই চিন্তায় মেয়েটা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু এসব বলে কতদিন পার পাওয়া যাবে? এসবের কি কোন সমাধান নেই? আবরার যে বড় মুখ করে বলেছিলো সে দেখবে, সামলে নিবে সব! তবে সে-ও কেনো গুম মেরে রয়েছে এখনো?মেহরিন বেগম আর কতদিন আদরের মেয়েটাকে এমন বিধ্বস্ত রূপে দেখবেন?
সেদিন মধ্যরাতেও স্বভাবগত ভাবে সায়েরীকে দেখার জন্য রুমে এসেছিলেন মেহরিন বেগম। ঘুটঘুটে অন্ধকারে না ঘুমিয়ে বিছানায় সায়েরীকে বসে থাকতে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন তিনি। ভয়ও পেলেন হঠাৎ করে দেখে। বাতি জ্বালিয়ে তিনি কিছু বলার পূর্বেই রক্তলাল চোখজোড়া মেলে তাকালো সায়েরী। মেহরিন বেগমের বুকের ভেতরটা ধ্ক করে উঠলো সেই দৃষ্টি দেখে। সায়েরী মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাত বাড়িয়ে মেহরিন বেগমের মোবাইলটা বাড়িয়ে দিলো। বললো,
‘ এটার কোন প্রয়োজন নেই, আম্মু। নিয়ে যাও। লাগবে না আমার। ‘
কণ্ঠটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা কিন্তু রাগান্বিত শোনাল। মেহরিন বেগম মোবাইলটা নিতেই তৎক্ষনাৎ বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে পড়লো সায়েরী। নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলল চাদরের আড়ালে। অনুভব করলো মাথার উপর মায়ের আদুরে স্পর্শ। গলায় জমে থাকা বিষাক্ত অনুভূতি সব কান্না রূপে বেরিয়ে আসতে চাইলো। যখন বুঝল, যে মেহরিন বেগম চলে গিয়েছেন। তখন পুণরায় ওঠে বসলো সে। মুষ্টিবদ্ধ হাতের মাঝে সিম কার্ডটির দিকে তাকিয়ে জেদে, অভিমানে খুব করে কাঁদল। সেই চাপা কান্নার স্বর কেউ শুনলো না। কোমলমতি’র ফুলের মতো কোমল হৃদয়টি পুড়ে ছারখার হওয়ার দৃশ্য কেউ দেখলো না। ঘুমকাতুরে মেয়েটা বর্তমান রাতগুলো ঘুমহীন, ছটফট করে পার করে দেওয়ার কথা কেউ জানলো না। সকলের আদরের, হাস্যজ্বল রমনীটি যে ধীরে ধীরে নিজের মাঝেই নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, সেই খবর কারো কাছে পৌঁছাল না।
১৫-ই সেপ্টেম্বর। এইস এস সি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন। সকাল থেকেই চতুর্দিকে রমরমা অবস্থা। বেলা বারোটা নাগাদ সায়েরীর রেজাল্ট বের করলো আবরার। GPA 4.89. সকলে ভীষণ উচ্ছ্বসিত হলো এমন চমৎকার ফলাফল দেখে। হইহট্টগোল বেড়ে দ্বিগুণ হলো। এরইমধ্যে মেহরিন বেগমের ফোন সায়েরীর বন্ধুরা সব কল করছে। সকলেই বেশ ভালো ফলাফল করেছে। কলেজে যাওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু সায়েরী যেতে রাজি নয়। দেখা গেলো বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ তোহা, আয়ান, নুহাশ এসে হাজির হয়েছে সায়েরীর বাড়িতে। সায়েরীকে জোর করে ঘরের বাহিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আস্কারা দিলো আবরার এবং মেহরিন বেগম। দুজনের সঙ্গ পেয়ে বন্ধুরা জোরজবরদস্তি নিজেদের সঙ্গে কলেজে নিয়ে গেলো সায়েরীকে। সেখানে পৌঁছে দেখা হলো সাফ্রিনের সঙ্গে। সায়েরী এক মুহুর্তের জন্য নিজের পরিস্থিতি ভুলে আশ্চর্য হয়ে দেখলো রূপবতী সাফ্রিনের ফ্যাকাসে মুখশ্রী। শুকিয়ে কেমন হয়ে গিয়েছে মেয়েটা! কি হয়েছে ওর?
সাফ্রিন নিজেও আহত দৃষ্টিতে দেখে সায়েরীর বেহাল দশা। কিচ্ছুটি জানতে চাইলো না সে। কারণ কোন কিছু সম্পর্কে অজ্ঞাত নয় সে। কলেজের ঝাঁক ঝাঁক শিক্ষার্থীদের হইহট্টগোল, চেঁচামেচি, আনন্দ উচ্ছ্বাস কিছুই ধ্যান কাড়তে পারলো না দুই বান্ধবীর। ওরা নিরবে বসে রয়েছে মাঠের মাঝে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসার স্থানে। প্রত্যাশা অনুযায়ী GPA 5.00 পেয়েও সাফ্রিন নির্বিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছে আকাঙ্খা সব মরে গিয়েছে সেই কবে! ঘরের অসুস্থ পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতে মেয়েটা নিজেও নিজের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রতিটা দিন ভাইয়ের প্রতি একটু একটু করে অভিমানের পাল্লা ভারী হয়ে উঠে। অভিযোগ জন্মে। যে, কেনো এমন দমবন্ধকর পরিবেশে তাকে একা ফেলে হারিয়ে গেলো সে?
দুপুরের লাঞ্চটুকু বাহিরেই সারলো তারা। এই চমৎকার দিনে খুব সুন্দর একটা আড্ডা জমার কথা থাকলেও, মোটেও তা হলো না। সায়েরী এবং সাফ্রিনের মুখ থেকে দুটো কথা ফুটাতেও কত কসরত পোহাতে হলো বাকিদের!
খাওয়া দাওয়া শেষে সাফ্রিন যখন ওয়াশরুমে গেলো। সায়েরী তখন সাফ্রিনের ব্যাগ, মোবাইল নিয়ে বসে রয়েছে। এমন সময় সাফ্রিনের মোবাইলের নোটিফিকেশন বেজে উঠলো। মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন ভেসে উঠেছে লক স্ক্রিনে। অনাগ্রহী দৃষ্টিতে এক পলক সেদিকে তাকিয়ে আচানক সায়েরীর দৃষ্টি থমকাল। মেসেঞ্জারে Ridita Jaman আইডি হতে ছোট্ট একটি মেসেজ এসেছে। “Congress Safah❤️”.
সায়েরীর আচমকা কি যেনো হলো নামটা দেখে। সর্বাঙ্গে তীব্র জ্বলন অনুভব করলো। ক্ষুব্ধ হলো দৃষ্টি। মোবাইলটা শক্ত হাতে চেপে সুইচড অফ করে দিলো সে। এরপর কাউকে কিচ্ছুটি বলার সুযোগ না দিয়ে হুট করে বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট হতে। এক পলকের জন্য হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো আয়ান, তোহা এবং নুহাশ। এরপর হুশ ফিরতেই আয়ান দৌড়ে গেলো সায়েরীর পিছুপিছু। কিন্তু থামাতে পারলো না মেয়েটাকে। পূর্বেই রিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসলো সায়েরী। হারিয়ে গেলো ব্যস্ত সড়কে।
বাড়ি ফিরে সায়েরী সোজা নিজের রুমে ঢুকলো। ব্যাগ ছুড়ে ফেললো বিছানায়। ওর ভেতরে উতালপাতাল ঝড় বয়ে চলেছে তখন। কষ্টের চেয়েও আজ রাগ-জেদ হচ্ছে ভীষণ। নিজের উপর, সাফওয়ানের উপর, সাফ্রিনের উপর। এবং সবচেয়ে বেশি ভাগ্যের উপর। রুমের দরজা লাগিয়ে ফুল স্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিলো সে। এরপর গোটা রুমের হাল বেহাল করে ফেললো। ড্রেসিং টেবিলের উপর হতে জিনিসপত্র সব ছুড়ে ফেলে চুরমার করলো। কাঁচ বিঁধে পায়ের তালু কেটে গেলো। কিন্তু এত কিছুতেও নিজেকে শান্ত করতে পারলো না সে। বুকের মাঝে দাবানলের মতো জ্বলতে থাকা অনুভূতি গুলো দমাতে না পেরে বাম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কব্জিতে ভয়ানক এক কামড় বসালো সে। ততক্ষণ অবধি ক্ষান্ত হলো না, যতক্ষণ না চামড়া ভেদ করে রক্তের নোনা স্বাদ জিহ্ব ছুঁয়েছে। রক্তাক্ত হাতটা কোলের উপর ঢলে পড়লো। অনামিকা আঙ্গুলের চকচকে হীরে খচিত রিংটি আজ রক্তে রঞ্জিত হতে দেখে সায়েরীর বুকের ভেতরটা ভেঙ্গেচুরে ছারখার হলো যেনো। হাতটা বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো সে। নিজেকে কেনো সামলাতে পারছে না! কেনো এতো কষ্ট হচ্ছে? কেনো এমন বোকা সে? অন্য সবার মতো আজ সে নিজেও নিজেকেই কষ্ট দিয়ে মারছে। কেনো?
সায়েরী যে কতশত পরিকল্পনা এঁটে রেখেছিলো আজকের এই দিনটা নিয়ে! এই সাফল্য, এই ফলাফল কাকে খুশি করার জন্য করলো সে? এতো পরিশ্রমের ফল হিসেবে আজ সব পেয়েও কেনো নিঃস্ব সায়েরী? ওই এক পুরুষকে ঘিরে কেনো নিজের দুনিয়া গড়ে ফেললো সায়েরী? যদি মাঝপথে ছেড়ে যাওয়ারই ছিলো, তাহলে কেনো সায়েরীর বেঁচে থাকার কারণ হয়ে উঠেছিলো সাফওয়ান ভাই? কেনো? কেনো? কেনো???
একনাগাড়ে কান্নার দরুন সায়েরীর বুক ভারী হয়ে আসে। দম বন্ধ লাগছে। আটকে আসছে নিঃশ্বাস। বুকে হাত ঘষে মুখ দিয়ে শ্বাস টানে সে। সামলাতে চায় নিজেকে। ইনহেলার খুঁজে মুখে নেয়। একটুখানি ধাতস্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন হঠাৎ নিজের প্রতিবিম্ব দেখলো সম্মুখে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ভেসে রয়েছে এক বোকা রমনীর বিধ্বস্ত রূপ। সায়েরী জ্বলজ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার চোখ, ঠোঁট, আধবোচা নাক, ঘাড়, চুল সব নিয়ে সাফওয়ানের বলা এক একটি বাক্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কানে। আদুরে স্পর্শ গুলো পুণরায় অনুভব হচ্ছে। সায়েরী চোখ খিচে। নিজেকে নিজের কাছেই অসহ্য লাগছে ভীষণ। সে কদম বাড়ায়। পায়ের নিচে কি যেন চাপা পড়ে। দৃষ্টি নামিয়ে দেখলো, একটি কাঁচি। হাতে তুলে নিলো সেটা। অন্য দিকে ছুড়ে মারতে নিয়েও মারলো না। থামলো। একপল কাঁচি টার দিকে তাকিয়ে ফের নজর দিলো আয়নায়। এলোমেলো রূপের নিজেকে দেখলো।
দেখলো খোপা খুলে কোমড়ের নিচ অবধি ছড়িয়ে থাকা দীঘল কালো এলোকেশ গুলো। সায়েরীর হঠাৎ কি জানি কি হলো। সে ভুলে গেলো নিজেকে। মনে পড়লো কেবল তাকে শূন্যে ছেড়ে দূরে হারিয়ে সাফওয়ান ভাইকে। যার অন্যতম অবসেশন ছিলো সায়েরীর এই দীঘল এলোকেশ গুলো। সায়েরীর সহ্য হলো না নিজের সঙ্গে লেপ্টে থাকা চুলগুলোকে। ভয়ানক এক জেদ চাপলো মনে। পিঠের পেছন থেকে এক মুঠো চুল টেনে এনে চোখের পলকে ঘেচঘেচ করে কেটে ফেলল। এলোমেলো ভাবে কেটে মুহুর্তের মধ্যে কাঁধ সমান করে ফেললো চুল সব। এরপর দেখলো নিজের বিশ্রী অবয়ব। দেখেই গেলো…
প্রতিবেশীদের মিষ্টি বিতরণ করে সবে মাত্র ঘরে ফিরেছেন মেহরিন বেগম। আবরারের মা তখনো ছাদে। বাহিরে সায়েরীর জোতা দেখে মেহরিন বেগম খুশিমনে বাটিতে করে সায়েরীর পছন্দের মালাবিয়া বেরে নিলেন। হাসিমুখে সায়েরীর নাম ধরে ডেকে প্রবেশ করলেন কক্ষে। কিন্তু ভেতরের তান্ডব দেখে হকচকিয়ে গেলেন তিনি। সম্পূর্ণ কক্ষে চোখ বুলিয়ে উনার দৃষ্টি গিয়ে থামলো বিছানায়। ইউনিফর্ম গায়ে সটানভাবে শুয়ে আছে সায়েরী। চোখ দুটো বুজে রয়েছে। মেহরিন বেগম বিচলিত হয়ে দ্রুত কদমে এগোলেন। কিন্তু আচানক পায়ের নিচে অদ্ভুত কিছু অনুভব করে স্থির হলেন তৎক্ষনাৎ। অনাগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আচম্বিত সর্বাঙ্গ ঝংকার দিয়ে গেলো উনার। হাত ফসকে কাঁচের বাটি উল্টে পড়লো ফ্লোরে। অন্য হাতে দ্রুত ফ্লোর হতে তুলে নিলেন লম্বা চুলের গুচ্ছ।
এক মুহুর্তের জন্য তিনি কিচ্ছুটি কল্পনাও করতে পারলেন না। কিন্তু সায়েরীর দিকে পূর্ণ নজরে তাকিয়ে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেনো। তড়িৎ কদমে এগোলেন তিনি। সায়েরীর বাহুতে এক টান মেরে উঠে বসালেন। মেয়েটা চোখ মেলে তাকানোর ফুরসত টুকু পেলো না। পূর্বেই সপাটে চড় পড়লো গালে। কেঁপে উঠলো দেহ। মাথা তুলে চাওয়ার পূর্বে আবারও দ্বিগুণ জোরে থাপ্পড় খেলো অন্য গালে। একই সঙ্গে পরপর একবার, দুইবার, তিনবার! চতুর্থ বারে হাত উঠিয়ে পরক্ষণে সায়েরীর রক্তাক্ত হাতটা দেখে নিজেকে দমিয়ে নিলেন মেহরিন বেগম। রাগে থরথর কাঁপছেন তিনি। কেঁদে ফেলেছেন মেয়ের অবস্থা দেখে। কি হাল করেছে নিজের! কি বিশ্রী ভাবে, নির্দয়ের মতো কেটে ফেলেছে এতো সুন্দর চুলগুলো! মেহরিন বেগম রাগ দমাতে পারলেন না। খামচে ধরলেন সায়েরী ছোট চুলে মুঠি। রাগান্বিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
‘ এত বড় দুঃসাহস তোর কীভাবে হয়েছে সায়ু? কে সাহস দিয়েছে চুল কাটার জন্য? তোর একটু মায়া হলোনা? কষ্ট লাগল না একবারও? ‘
ব্যথায় চোখ খিচে রেখেছিলো সায়েরী। মেহরিন বেগমের কথা শুনে চোখ মেলে তাকালো সে। এরপর আচমকা দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো মায়ের কোমর। ছোট্ট বাচ্চার মতো হাউমাউ শব্দে কেঁদে উঠলো। ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো,
‘ আমার কষ্ট হচ্ছে, আম্মু। বিশ্বাস করো, ভীষণ কষ্ট লাগছে। আ-আমার সঙ্গেই কেনো সবসময় এমন হয়, আম্মু? আমি কার কি ক্ষতি করেছি বলো? আমার কপালে কেনো সুখ সয় না? ‘
মেহরিন বেগম মূর্তির মতো স্থির হয়ে পড়লেন। মেয়ের করুণ কন্ঠের আহাজারিতে বুকের ভেতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় হলো। নিজেও কেঁদে ফেলেছেন অজান্তে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। সায়েরীকে সরিয়ে বিছানায় বসলেন। পরপরই উনার কোলে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লো সায়েরী। তখনো ডুকরে কাঁদছে মেয়েটা। মেহরিন বেগমের সহ্য হলো না এই ব্যাকুল কান্নার স্বর। অনবরত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি। কপালে চুমু দিয়ে বার কয়েক আওড়ালেন,
‘ সায়ু! কি হয়েছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে মা? আম্মুকে বল.. ‘
সায়েরীর কান্না থামলো না। মায়ের হাতটা চেপে ধরলো বুকের উপর। আবারও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ভেবে মেহরিন বেগম অনবরত সায়েরীর বুকের উপর মালিশ করে দিতে লাগলেন। হাতের ক্ষতটা দেখে বলতে লাগলেন,
‘ এখানে জ্বলছে, আম্মু? উঠ সায়ু! আমি মলম লাগিয়ে দিচ্ছি। কিচ্ছু হবে না। ব্যথা চলে যাবে। কষ্ট হবে না আর। ‘
সায়েরী উঠলো না। পুণরায় মায়ের হাতটা টেনে নিলো বুকে। হেঁচকি তুলে কাঁদল–
‘ আ-আমার বুকের ভেতর খুব কষ্ট লাগছে আম্মু। এতো ব্যথা লাগছে কেনো বলো? আম..আমার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আম্মু। আমার কাছে থাকো। আম..আমি এভাবে মরতে চাইনা, আম্মু। তুমি অন্তত আমার কাছে থাকো। তুমিও দূরে যেওনা। আমাকে ছেড়ে যেওনা আম্মু প্লিজ। দূরে যেওনা! ‘
‘ আমি কোথাও যাচ্ছি না, মা। এইতো আম্মু। কাঁদে না সায়ু। শান্ত হ। আম্মু আছি তো কাছে। সায়েরী!! ‘
ক্রন্দনরত গলায় বারবার একই কথা বলে মেয়েকে আস্বস্ত করতে লাগলেন মেহরিন বেগম। মেয়ের এই করুণ কান্না কিছুতেই সহ্য করতে পারছেন না তিনি। গুমরে মরছেন নিজের মধ্যেই। সায়েরী সেভাবেই কেঁদে গেলো দীর্ঘক্ষণ। একটা সময় ক্লান্ত হয়ে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে গেলো। মেহরিন বেগম সেই ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে নিরবে অশ্রু ঝরালেন। একাধিক চুমু খেলেন ঘুমন্ত সায়েরীর মুখজুড়ে। এরপর সায়েরীর রক্তাক্ত হাতটা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। অতঃপর, গোটা রুম পরিষ্কার করলেন নিঃশব্দে। আপনমনে চিন্তিত হলেন, কীভাবে সায়েরীকে পুণরায় স্বাভাবিক করা যায় সেই চিন্তায়। সায়েরীর বন্ধুদের কেই একমাত্র সমাধান বলে মনে হলো। ওদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। মেয়েটাকে এভাবে গুমরে মরতে দেখতে যে পারবেন না তিনি।
পরদিন নাজরাত এলো সায়েরীর বাড়িতে। মাস ছয়েকের উঁচু পেট নিয়ে সে যে এভাবে মেহরিন বেগমের এক কথায় ছুটে আসবে, তা মেহরিন বেগম নিজেও কল্পনা করেননি। নাজরাতকে পেয়ে একটুখানি আশার আলো দেখলেন যেন। সেদিন সারাটাদিন বদ্ধ রুমে কাটিয়ে দিলো দুই বোন। সায়েরী কোন উগ্রতা দেখাল না। সর্বাক্ষণ শান্ত বাচ্চার মতো পড়ে রইলো নাজরাতের বাহুতে। আজ কেবল নাজরাত বললো, সায়েরী শুনলো। নাজরাতের বাড়ন্ত পেট টাতে হাত বুলিয়ে হঠাৎ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে সায়েরী। নাজরাত তখন চুপটি মেরে দেখে ওর কান্ড। বাচ্চার কথা শুনিয়ে সায়েরী মন ভুলাতে চায়। এবং সফল ও হয় কিছুটা। কিন্তু দিনের শেষে নাজরাতের ফিরে যাওয়ার সময় হতেই মিইয়ে গেলো সায়েরী। নাজরাতের কোলে মাথা রাখলো। অসুস্থ বোনটাকে কোন ধরনের দুশ্চিন্তা দিতে চাইলো না। কাঁদতে চাইলো না। তবুও না চাইতেও ফুঁপিয়ে উঠলো সে। নাজরাতের চোখেও জল জমলো। সে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরলো বোনকে। বললো,
‘ সাফওয়ান ভাই যদি তোর হয়ে থাকে তবে অবশ্যই ফিরে আসবে, সায়ু। ‘
সায়েরীর কান্না থামলো। সোজা হয়ে বসে চোখ মুছল। শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে অনুভূতিহীন গলায় জবাব দিলো,
‘ সে যদি আমার হতো, তবে কখনো ছেড়ে যেতোনা। ‘
নাজরাত অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। সেদিন আর প্রত্যুত্তর করতে পারেনি সে। পরের সময় গুলোতে সে নিজেও বিশ্বাস করে নিলো, সাফওয়ান খান নামক মানবটা হয়তো সত্যিই সায়েরীর ভাগ্যে নেই। নয়তোবা এভাবে কেনো দূর প্রান্তে হারিয়ে গেলো সে?
দিন পেরিয়ে মাস গড়িয়েছে, মাস গড়িয়ে বৎসর।
সময়ের স্রোতের সঙ্গে সায়েরীর দুঃখগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পূর্বের মতো চিৎকার করেনি আর, শুধু নীরবে সয়ে গেছে। সে নিজের নিয়তির সঙ্গে আপস করে নিতে শিখেছে। ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছে এই শূন্যতাকে। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, কিছু দূরত্ব জন্মায় কোনো ঘোষণা ছাড়াই, অজান্তে। আবার কখনো কখনো সেগুলো মিলিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল বেঁচে থাকে।
প্রায় মাস ছয়েক সায়েরীর কান্নাকাটি অব্যহত ছিলো। শব্দহীন কান্নায় কেটে যেতো গোটা রাত। একসময় সেই কান্নাও ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল। সময়ের সাথে সাথে মেয়েটার আবেগগুলো ম্লান হলো, অনুভূতিগুলো ভেঙে পড়ল নিঃশব্দে। আচরণ বদলে গেল অচেনা নিয়মে। সে সব মেনে নিয়েছে। না চাইতেই শিখে গেছে বহু কিছু।
তবু একটি জিনিস কোনোভাবেই বদলায়নি।
অপেক্ষা। সাফওয়ান ভাইয়ের কাছ থেকে শত শত প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষা। এই অপেক্ষার কি কখনো শেষ হবে? আর কতগুলো বসন্ত ঝরে গেলে মিলবে সেই প্রণয়পুরুষের দর্শন? নাকি অপেক্ষাই তার একমাত্র প্রাপ্তি হয়ে থাকবে, আজীবন?
এই অভিশাপের মতো ভাবনাগুলো সায়েরীর ঘুম কেড়ে নেয় প্রতিটি রাতেই। অচেনা এক নিশাচর হয়ে সে জেগে থাকে, অন্ধকারের সাথে বোঝাপড়া করে। কখনো তীব্র অভিমানে ডায়েরির পাতায় ঢেলে দেয় জমে থাকা অব্যক্ত অভিযোগ,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮২
” যদি দূরেই যাওয়ার ছিলো তবে এতোটা কাছাকাছি কেনো এসেছিলেন, সাফওয়ান ভাই? আমিতো গুটিয়েই নিয়েছিলাম নিজেকে, আপনাতে আসক্ত হবার আতঙ্কে। তবে কেনো আমার আমিটাকে আপনিময় অভ্যাসে পরিণত করলেন? খুব কি প্রয়োজন ছিলো, আমার কোমল মনটাকে এমন দুমড়ে-মোচড়ে দেওয়ার!
সমাপ্ত
