Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৮
রিদিতা চৌধুরী

ফারিসের গম্ভীরা কণ্ঠস্বর বাতাসের স্তব্ধতা চিরে রিদির কানে আসতেই তার পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে দিশেহারা হয়ে পড়ল—কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কী ঘটছে, সবটাই যেন ঝাপসা। ফারিসের চোখেমুখে বিরক্তির চেয়েও এক অদ্ভুত, গভীর কৌতূহল। সে রিদির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাতের ঘড়িটা দেখল। তারপর গম্ভীর গলায় শীতল স্বরে বলল, “মেয়ে ফাঁসানোর জন্য কাউকে খুঁজে পেলে না বুঝি? এমপি ফারিস খন্দকারকে পেতে হলো? নাম কী তোমার?”
​রিদির মেজাজ এমনিতে ভালো ছিল না, তার ওপর এই লোকটির নাটকীয়তা যেন বারুদে আগুন হয়ে জ্বলে উঠল। রিদি বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ঝাঝালো গলায় বলল, “ভাই, আমার নাম দাম দিয়ে আপনার কাজ নাই। দয়া করে রাস্তা ছাড়েন!”

​রিদির স্পষ্ট উত্তর শুনে ফারিস অবাক হয়ে তাকাল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বলল, “এই মেয়ে, মুখে মুখে তর্ক করছো? আমি কে, সেটা জানো তুমি?”
​রিদি এবার ধৈর্যের শেষ সীমানায়, নিজের রাগ আর বিরক্ত নিয়ে সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আপনি রাজা-মহারাজা যেই হোন, সেটা জেনে আমার কাজ নেই। দয়া করে হাবলার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে আমাকে যেতে দিন!”
​ফারিস যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে মানুষটির সামনে বড় বড় নেতারা ভয়ে তটস্থ থাকে, সেই মানুষটির সাথে এমন অবলীলায় তর্ক করার সাহস এই পুঁচকে মেয়েটি পেল কোথায়?
ফারিস গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের দাপট বজায় রেখে বলল, “ভয় করছে না তোমার? এমপি ফারিস খন্দকারের সাথে মুখে মুখে তর্ক করছো?”

​নিজের জ্বালাতেই রিদি তখন অস্থির। তার ওপর ফারিস পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকায় সে রাগে-বিরক্তিতে ঝনঝনিয়ে উঠে বলল, “তো আপনি এমপি, আমি কী করবো? গিয়ে জনগণের সেবা করুন না ভাই! আপনি মনে হয় রাস্তাঘাটে মেয়েদের সেবা বেশি করেন, এইজন্যই রাস্তার অবস্থা এমন খারাপ! ওই যে দেখুন, রাস্তা ভেঙে আছে, আমাকে বিরক্ত না করে ওটা ঠিক করেন!”
​রিদির এই তীক্ষ্ণ খোঁচায় ফারিস যেন এক মুহূর্তের জন্য থমথম খেয়ে গেল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, “এ তো আস্ত একটা দানি লঙ্কা!” তারপর বাইরেটা পাথরের মতো শক্ত রেখে বলল, “গাড়িতে ওঠো, আমি পৌঁছে দিচ্ছি। এই ভরসন্ধ্যায় একা যাওয়া ঠিক হবে না।”
​রিদি এবার কিছুটা শান্ত, কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “ধন্যবাদ ভাইয়া, আমি যেতে পারবো! আপনার আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।” বলেই সে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে ফারিস গম্ভীর কণ্ঠে পিছু ডাকল, “এই মেয়ে, আমি কি তোমার মায়ের পেট থেকে জন্মেছি? এমন ভাই-ভাই করছো কেন?”
​রিদি পেছনে ফিরে তাকাল, তার মুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। সে তিক্ত স্বরে বলল, “এক অসভ্যের জ্বালায় জীবন তছনছ হয়ে গেছে, আরেকটা আসছে নাটক মারতে! গাউরা কতগুলো!” বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সামনে থামানো রিকশাটিতে উঠে পড়ল।

​রিদি চলে যাওয়ার পর ফারিস সেখানে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ তখনও রিকশাটার দিকে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর সে হালকা হেসে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “তেজ ভালোই আছে পারফেক্ট ফর হিম!” বলেই সে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল।
রাত আটটার ঘড়িতে যখন কাঁটাটা স্থির হলো, রিদি তখন একা ছাদের এক কোণে বসে আকাশের বিশালতার দিকে তাকিয়ে। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আজ বিষাদের রূপ নিয়ে তাকে ঘিরে ধরেছে। নিজেকে আজ বড় বেশি একা, বড় বেশি মূল্যহীন মনে হচ্ছে। পরিবার, মা-বাবা, ভাই-বোন—যাঁদের ছায়ায় মানুষ পরম নিশ্চিন্তে বাঁচে, তাঁদের শূন্যতা আজ রিদির বুকের ভেতরটা কুরে কুরে খাচ্ছে। অবহেলা আর অনাদরে একজন মানুষ কতটা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে, রিদি তা হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছে।
​হঠাৎ করেই সপ্তপর্ণীর গন্ধে ভারী হয়ে আসা বাতাসে রিদি নিজের অজান্তেই চোখের পানি মুছে নিল। ঠোঁট কামড়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বলল, “আপনার জীবনে আমি যেহেতু এত গুরুত্বহীন, থাকলাম না আর আর জীবনে ,ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরী, একটা সময় আসবে যখন আপনি চাইলেও আমাকে আর পাবেন না। আপনি আমাকে খুব সস্তা ভেবে নিয়েছেন, তাই না? আপনার এই অবহেলাগুলোই আজ আমার পৃথিবীটা বিষিয়ে দিল।”
​দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে রিদি যখন অতীতের স্মৃতিতে ডুব দিতে যাচ্ছিল, তখনই পাশে কারোর ছায়া অনুভব করল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল শাহাবীর দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টিতে শাহাবীর বেশ কিছুক্ষণ রিদির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আলতো করে নিজের হাতটা রিদির মাথায় রাখল। মায়াভরা স্বরে বলল, “কাঁদছে কেন আমার পাখিটা? ভাইয়াকে বলবি?”

​রিদি দ্রুত নিজের চোখের পানি আড়াল করে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে একটা মলিন হাসির চেষ্টা করল। কণ্ঠটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল, “কই কাঁদছি না তো! চোখে কিছু একটা পড়েছিল, তাই হয়তো…” বলেই সে মাথা নিচু করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
​শাহাবীর রিদির প্রতিটি অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে দেখল। তার শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠস্বর রাতের বাতাসে ভেসে এল, “একটা কথা সত্যি করে বল তো—সৌহার্দ্যকে ভালোবাসিস? সত্যিই কি ওর সাথে থাকতে চাস? আমাকে বল রিদি, তুই যেটা চাইবি, ঠিক সেটাই হবে। ভাই কথা দিলাম তোকে।”
​রিদির সব বাঁধ ভেঙে গেল। নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারল না সে, হুহু করে কাঁদতে শুরু করল। শাহাবীরের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল, “না ভাইয়া, আমি ওনাকে আর চাই না। যে পুরুষ শুধু কষ্টই দিয়ে গেল, তাকে পাওয়ার জন্য কেন আমি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেব? থাকুক সে তার মতো।”
​শাহাবীর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পরম মমতায় রিদির চোখের পানি মুছে দিল। সান্ত্বনার স্বরে বলল, “কাঁদিস না আমার কলিজা। ওকে তোর প্রতি ফোঁটা চোখের পানির মূল্য দিতে হবে। আমি খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্স পেপার রেডি করছি। নিজেকে একা ভাবার কোনো কারণ নেই, আমার শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত আমি তোকে কোনো কষ্ট পেতে দেব না।”
​রিদি এক চিলতে ম্লান হাসি উপহার দিল ভাইকে। শাহাবীর আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর দার্শনিকতা নিয়ে বলল, “আমরা ততখন মানুষের গুরুত্ব বুঝি না, যতক্ষণ সে আমাদের পিছু পিছু ঘুরে। যখন বুঝতে পারি সে কতটা দামী, ততক্ষণে সে হারিয়ে যায়। এটাই প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়ম।” তারপর রিদির দিকে তাকিয়ে কিছুটা শাসনের ভঙ্গিতে বলল, “এখন সোজা নিচে গিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি পরীক্ষার সামনে, ডাক্তারি পড়া কি অত সহজ? শরীর খারাপ করলে চলবে না।”

​রিদি আর কিছু বলল না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার সময় তার পা দুটো যেন কিছুটা হালকা মনে হলো।
​রিদি চলে যাওয়ার পর শাহাবীর শূন্যতার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বিড়বিড় করে বলল, “মিঃ আকরাম খান, জানি না আমি ওকে শেষ পর্যন্ত কতটা আগলে রাখতে পারব, আমার এই নরকের জীবেনে। তবে আপনার শেষ স্মৃতি হিসেবে আমার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব, যাতে পৃথিবীর কোনো কষ্ট ওকে ছুঁতে না পারে।”
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা সরিয়ে আলতো করে রিদির মুখে এসে পড়ল। আলোর ঝিলিক আর রোদের উত্তাপে ঘুম ভাঙল তার। চোখ মেলতেই একরাশ ক্লান্তি আর বিরক্তি যেন তাকে ঘিরে ধরল। রাতে মোবাইলটা চার্জ দেওয়া হয়নি, তাই সেটি এখন মৃতপ্রায়। আলসেমি ঝেড়ে উঠে মোবাইলটা চার্জে বসিয়ে সে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। ফ্রেশ হয়ে এসে কিছুক্ষণ বই-পত্রের ওপর চোখ বোলালেও মন বসল না।
​এরই মধ্যে মোবাইলটা চালু হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই পরিচিত কিন্তু নামহীন নম্বর থেকে আসা কয়েকটি মেসেজ। প্রথমে শুধু কয়েকটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন, তারপর নিচে লেখা—”ভুলে গেলেন ম্যাডাম?”
​রিদির মেজাজ মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ে বসল। বিরক্তির চোটে ভ্রু কুঁচকে গেল তার। “কী অদ্ভুত মানুষ! একটা মেসেজ দিয়ে হাওয়া হয়ে যায়, আর রিপ্লাই দিলেও তা আসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর।” সে কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে গালি দিল, “আমার জীবনে সব আওড়া-জাউড়া আর পাগলগুলোরই কি আনাগোনা? শান্তি নেই এক মুহূর্ত!”

​নিজের ঝাঝালো মেজাজটা কোনোমতে চেপে রিদি কলেজের জন্য তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। খাবার টেবিলে সবাই তখন ব্যস্ত। রিদিকে বিষণ্নমুখে ঢুকতে দেখে সাহান দুষ্টুমির স্বরে বলল, “কিরে, সকাল সকাল এমন দেবদাসিনী সেজে আছিস কেন?”
​রিদি সাহানের দিকে ফিরেও তাকাল না। বরং তার পিঠে হালকা একটা চাপড় মেরে বিরক্তির সুরে বলল, “আজব তো! বিরক্ত না করে চুপচাপ খা তো ভাই, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
​খাবার শেষ করে রিদি যখন দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি, তখনই শাহাবীরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বাইরে একটু ওয়েট কর, আমি আসছি।”
​রিদি থেমে গেল। তার চঞ্চল মনটা মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল!

শাহাবীর রিদিকে কলেজের গেটের সামনে নামিয়ে দিয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে চলে যেতে ,রিদি দ্রুত পায়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকতেই দেখল, বারান্দার এক কোণে সুমি আর পৃথা দাঁড়িয়ে আছে। তবে সুমির মুখের দিকে তাকিয়ে রিদি থমকে গেল—ওভাবে ঝুলে থাকা বিষণ্ন মুখখানা ওর বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল।
​চিন্তিত হয়ে রিদি সুমির কাছে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে কাঁধে হাত রেখে বলল, “কী হয়েছে রে তোর? এভাবে পেঁচা মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কারো সাথে ঝগড়া করেছিস?”
​সুমি কোনো কথাই বলল না, শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। পাশে থাকা পৃথা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল, “ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, রিদি। বেচারী কত স্বপ্ন দেখেছিল নিজে পছন্দ করে জীবনসঙ্গী বেছে নেবে, আর এখন দেখ আঙ্কেল-আন্টি কোথাকার কোন হতচ্ছাড়া এক ছেলের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে!”
​পৃথার কথা শুনে রিদির মনে হলো ওর নিজের বুকের ভেতরটাও যেন এক অদ্ভুত বেদনায় ভারী হয়ে এল। সে সুমির পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনার স্বরে বলল, “মন খারাপ করিস না তো। এখনো তো বিয়ে হয়নি, কথা বলে দেখ না! আঙ্কেল-আন্টিকে বললেই তো হয় যে তুই ছেলেটাকে আগে একটু দেখতে চাস?”
​সুমি এবার বিরক্তি আর অসহায়ত্বের মিশ্রণে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সবই বলেছি রে! কিন্তু লাভ কী? আব্বুর ছোটবেলার এক বন্ধুর ছেলেকে কথা দিয়ে ফেলেছেন। এখন ছেলে যেমনই হোক, আমাকেই মানতে হবে। আমার ইচ্ছের কোনো দামই নেই!”

​রিদি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সুমির এই অসহায়ত্বে তার নিজের জীবনের তিক্ততা যেন আবার নতুন করে জেগে উঠল। সে আফসোসের সুরে বলল, “বাপেরা যে কেন তাদের বন্ধুর জন্য মেয়েদের জীবনটাকে বাজি রেখে কথা দিতে যাই, কে জানে! এসব বন্ধুর ছেলের চক্করে পড়ে কতো মেয়ের জীবন যে তেজপাতা হয়ে যায়, তার কি কোনো হিসাব আছে?”
​রিদির কথায় সম্মতি জানিয়ে পৃথা একটু উপহাসের ভঙ্গিতে বলল, “উফ, আমি বেঁচে গেছি বাবা! আমার আব্বুর এমন কোনো বন্ধুর ছেলে নেই, এটা ভেবেই এখন স্বস্তি পাচ্ছি।”
​তিন বান্ধবী মিলে নিজেদের জীবনের এই অমোঘ বাস্তবতা আর হাহাকার নিয়ে নানারকম কথা বলতে বলতে ক্লাসের দিকে এগিয়ে চলল।
তারা ক্লাসের পেছনের সারিতে গিয়ে বসতেই ক্লাসে সৌহার্দ্যের প্রবেশ করলো। আজ তাকে দেখে খুব সাধারণ মনে হচ্ছে—গায়ে একটা কালো টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট, তার ওপর জড়ানো ধবধবে সাদা এপ্রোন। গলায় ঝোলানো স্টেথোস্কোপ জানান দিচ্ছে, মাত্রই কোনো রোগীর ভিড় সামলে সরাসরি ক্লাসে ঢুকেছে সে। চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিতে চোখ গুলো অসম্ভব লাল হয়ে আছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই সাদামাটা বেশেও তার ব্যক্তিত্বের দীপ্তি এক বিন্দু ম্লান হয়নি, বরং এক ধরনের পরিশ্রান্ত সৌন্দর্যে সে যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।

​ক্লাসে ঢুকেই সৌহার্দ্যের নজর গিয়ে পড়ল রিদির ওপর। এক পলক তাকাল সে, দৃষ্টিতে ছিল গভীর । কিন্তু রিদি মাথা নিচু করে রইল, যেন আশেপাশে কী ঘটছে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। সৌহার্দ্যও আর দেরি করল না, দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে প্রজেক্টরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
​প্রতিদিনের অভ্যাসের বাইরে গিয়ে আজ সে কাউকে বিন্দুমাত্র খোঁচা দিল না, কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলল না। শুধু শান্তভাবে হাত নেড়ে নেড়ে বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিল। তার কণ্ঠে আজ কোনো বাড়তি আমেজ ছিল না, ছিল কেবল এক নিস্তব্ধ গাম্ভীর্য। ক্লাস শেষ করে সে যখন বেরিয়ে গেল!
​সুমি খানিকটা ভাবুক হয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ স্যারকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে, তাই না? মনে হচ্ছে খুব বড় কোনো টেনশন বা ঝামেলায় আছে মানুষটা।”

​রিদি বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে সুমিকে থামিয়ে দিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল, “মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে গসিপ করা বাদ দে তো! চল, পড়াশোনায় মনোযোগ দে।” রিদির কথায় পৃথা ও সায় জানালো!
ক্লাস থেকে বের হয়ে সৌহার্দ্য যখন করিডোর পার হচ্ছিল, মাঠের দিক থেকে আসা সোরগোল তার কানে এল। বিরক্তি নিয়ে সে এগিয়ে যেতেই দেখল, ভিড়ের মাঝে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি থেকে নামা মানুষটাকে দেখেই সৌহার্দ্যের কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো—ফারিস খন্দকার। ফারিস দূর থেকেই ভাইকে দেখে উজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতে চাইল। সৌহার্দ্য নিমিষেই নাক-মুখ কুঁচকে শরীর সরিয়ে নিয়ে বলল, “সর তো! মেয়েদের মতো যখন-তখন জড়িয়ে ধরিস কেন?”
​ফারিস কিছুটা থমকে গিয়ে আহত গলায় বলল, “ছিঃ! এভাবে বলিস? অন্তত এমপি হিসেবে আমার মান-সম্মানটা একটু রাখ, ফালুদা করিস না ভাই!”
​সৌহার্দ্য কোনো ভাবান্তর না দেখিয়ে শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ এখানে?”
​ফারিস তার পাঞ্জাবির কলারটা একটু ঠিক করে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল, “এই তো, একটু পরিদর্শন করতে এলাম। তোর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।” বলেই সে কোনো অনুমতি না নিয়েই সৌহার্দ্যের কেবিনের দিকে পা বাড়াল।

​প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে ফারিস কেবিনে অপেক্ষা করছে। সৌহার্দ্য একটা ইমার্জেন্সি রোগী দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরল। এপ্রোনটা খুলে চেয়ারে বসে ক্লান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলল, হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?
​ফারিস এবার তার হাসিখুশি ভাবটা ঝেড়ে ফেলে চিন্তিত মুখে বসল, “হাসপাতালের কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ জমা পড়ছে। তুই কি জানিস?”
​সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “হুম। আমি জানি। এবং আমি শতভাগ নিশ্চিত, এর সাথে শিকদার পরিবার সরাসরি জড়িত।”
​ফারিস মাথা নাড়ল, “আমারও সন্দেহ অনেক আগে থেকেই। বেশ কিছু প্রমাণও হাতে এসেছে, তবে মূল হোতা কে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সৌহার্দ্য, তোকে সাবধান থাকতে হবে। আমার কানে এসেছে, তোকে ফাঁসানোর জন্য একটা বড়সড় নাটক সাজানো হচ্ছে। বি কেয়ারফুল, ভাই।”
​সৌহার্দ্যের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, যেন এই বিপদের কথাগুলো তার কাছে খুব সাধারণ কোনো বিষয়। সে নির্বিকারভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল।

​ফারিস উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে গলায় খানিকটা কৃত্রিম জড়তা এনে বলল, “আরেকটা কথা। কাল একটা মেয়েকে মনে ধরেছে, ভীষণভাবে! খবর নিয়ে জানলাম এই কলেজেরই ছাত্রী। ভাবছি বিয়েটা করে ফেলি, কয়েকটা ছানা-পোনা নিয়ে সংসারটা জমিয়ে তুলব। তোকে দিয়ে তো হবে, সৌহার্দ্যর আগা গোড়া পর্যবেক্ষণ করে বলল, তোর মনে হয় ইয়েতে সমস্য, তাই আমিই দায়িত্ব নিচ্ছি, কি আর করা?”
​সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইল। বিরক্তিতে নাঁক মুখ কুঁচকে নিলো, তারপর তার শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল, “সেটা আমাকে শোনাচ্ছিস কেন? যা করার কর। তবে মনে রাখিস—দুষ্টামির ছলে ও যদি তোর নজরটা আমার বউয়ের দিকে যায়, তবে ছানা ফুটানোর মেশিন আর ওই চোখ দুটো—দুটোই হারাবি। মাইন্ড ইট!”
​ফারিস হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সৌহার্দ্য বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজার কাছে একটু থামল। ফিরে না তাকিয়েই বলল, “আর শোন, এই কথা জন্য তুই কখনোই আমার বোনকে পাবি না।” বলেই লম্বা লম্বা পায়ে করিডোর দিয়ে মিলিয়ে গেল সে।

​সৌহার্দ্য চলে যাওয়ার পর ফারিস একাই কেবিনে দাঁড়িয়ে বিরক্তি ঝাড়ল, “শালা! নিজে বউকে মানবেনা , আবার অন্যকে তাকাতেও দেবে না! উল্টো আমাকেই হুমকি দিচ্ছে? ফুফিকে দেওয়া কথা তো আমাকে রাখতেই হবে, মাই ডিয়ার ব্রাদার! ​দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারিসও বেরিয়ে এল।
বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে সময় যে কতটা গড়িয়েছে, রিদি খেয়ালই করেনি তারা গিয়েছিল কলেজের পাশে একটা পার্কে। সেখান থেকে বের হয়ে, সুমি আর পৃথাকে বিদায় দিয়ে একা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসার সময় মুহূর্তের মধ্যে একটি কালো গাড়ি সামনে এসে ব্রেক কষে দাঁড়াল। চাকা ঘষটে যাওয়ার বিকট শব্দে রিদি চমকে উঠল। কাঁচ নামতেই যখন সৌহার্দ্যের গম্ভীর মুখটা চোখে পড়ল, রিদির মনের ভেতরটা বিরক্তির জ্বালায় ভরে উঠল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু সৌহার্দ্য দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে রিদির কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। শান্ত, কিন্তু শক্ত গলায় বলল, “গাড়িতে ওঠো।”

​রিদি ঘৃণা আর রাগে ঝটকা দিয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু সৌহার্দ্যের হাতের বাঁধন আলগা হলো না। বরং তার রক্তাভ চোখদুটো যেন রিদিকে যেন পুড়িয়ে মারবে সে দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলল, “মাথা গরম করবে না আমার ,দেড় ব্যাটারি। চুপচাপ গাড়িতে ওঠো।”
​পরিস্থিতি বুঝে রিদি হঠাৎ করেই যা করল, তা সৌহার্দ্যের কল্পনাতীত থমথম খেয়ে গেল বেচারা। রিদি হঠাৎ জোরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল, “আমাকে ছাড়ুন! আপনি কে? আমি আপনাকে চিনি না!” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
​তার এই আকস্মিক আর্তনাদে সৌহার্দ্য এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল, বুঝে ওঠতে পারলো না এই মেয়ে এমন করছে কেন, সৌহার্দ্যের স্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে রিদি আবার গলা ফটিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “আমাকে জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করছে! বাঁচান! প্লিজ কেউ আমাকে বাঁচান!”
​রাস্তার লোকজন মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ ঘিরে ফেলল। একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বললেন, “কী হয়েছে মা? এই ছেলে, তুমি কে? রাস্তাঘাটে একটা মেয়ের সাথে এমন টানাটানি করছো কেন?”
​সৌহার্দ্য রাগে-অপমানে কাঠ হয়ে গেল। সে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠে বলল, “জাস্ট সেটাপ! শি ইজ মাই ওয়াইফ!”
​রিদি যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠল। দুই পাশে মাথা নেড়ে সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “চাচা, একদম বিশ্বাস করবেন না ওকে! আমি একে চিনি না। ও আমাকে পথ আটকে কুরুচিপূর্ণ কুপ্রস্তাব দিচ্ছিল। আমি রাজি না হওয়ায় জোর করে গাড়িতে ঢোকানোর চেষ্টা করছে!”

​রিদির অভিনয় এতই নিখুঁত ছিল যে উপস্থিত জনতা সৌহার্দ্যের দিকে তেড়ে এল। সৌহার্দ্য যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না—তার সামনে দাঁড়িয়ে এই মেয়ে কি সুন্দর অবলীলায় মিথ্যা বলছে! সে রিদির ঠিক কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, “আজ বাড়ি নিয়ে কুপ্রস্তাব কাকে বলে, কত প্রকার তা যদি তোমাকে না বুঝিয়েছি, তবে আমি ডাক্তার সৌহার্দ্য চৌধুরী নই!”
​রিদিও এক মুহূর্ত দেরি না করে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে উত্তর দিল, “আগে তো নিয়ে যান, বেয়াদব লোক!”
​রিদি আবার তার সেই মাসুম, অসহায় মুখখানা বানিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “প্লিজ চাচা, আমাকে ওনার হাত থেকে বাঁচান! দয়া করে আমার ইজ্জত টা বাঁচন চাচা!

​রিদির ওই নিষ্পাপ অথচ করুণ চাহনি দেখে ভদ্রলোকটি প্রচণ্ড রাগে সৌহার্দ্যের দিকে তেড়ে এলেন, “ওর হাত ছাড়ো বলছি! ভদ্রতার মুখোশ পরে এসব নষ্টামি? বড় লোকের ছেলে বলে যা খুশি করতে পারবে?
জনতার ভিড় বাড়ছে দেখে সৌহার্দ্যর চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল। রাগে-বিরক্তিতে তার সারা শরীর কাঁপছে, তবু সে নিজেকে সংযত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করল। রিদির হাতটা ছেড়ে দিয়ে সে নিজের গাড়ির দিকে এগোতে চেয়েছিল, কিন্তু উত্তেজিত জনতা তাকে ঘিরে ফেলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। ভিড় ঠেলে পুলিশের গাড়ি কাছে আসতেই লোকজন কিছুটা পিছু হটল।
​পুলিশ অফিসার গাড়ি থেকে নেমে সৌহার্দ্যকে দেখেই সালাম দিয়ে সবিনয়ে সাথে বলল, “সরি স্যার, আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।”
​সৌহার্দ্যের ঠান্ডা চোখে তখন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ। সে রিদির দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকাল, তার দৃষ্টিতে ছিল এক গভীর হুমকি। তারপর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে পুলিশ অফিসারকে বলল, “সাথে কি কোনো মহিলা পুলিশ আছে?”

​সৌহার্দ্যের এই প্রশ্ন শুনে রিদির হৃদপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার ভেতরে হঠাৎ করেই এক দলা ভয় দানা বাঁধল—এই লোকটা আসলে কী চাইছে? রিদি যখন নিজের ভাবনা আর ভয়ের দোলাচলে অস্থির, ঠিক তখনই একজন মহিলা পুলিশ এগিয়ে এল। সৌহার্দ্য তার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “ওটাকে সাবধানে পৌঁছে দিন। কোনো সমস্যা যেন না হয়—কথাটা মাথায় রাখবেন।”
​নির্দেশ দিয়েই সৌহার্দ্য আর কোনো কথা না বলে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির দরজা খোলার সময় তার পিঠের দিকে তাকিয়ে রিদি বিড়বিড় করে রাগে ফুঁসতে লাগল, “তুই আমাকে কী ভেবেছিস? অসভ্য ডাক্তার! ঘরে বউ মানবি না, আবার বাইরে এসে নাটক মারাবি?
​রিদির গালি আর রাগের মাঝেই সেই মহিলা পুলিশ অফিসার খুব বিনয়ের সাথে তাকে সম্বোধন করলেন, “চলুন ম্যাডাম, আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”
​সন্ধ্যাটা অনেক আগেই গড়িয়েছে, চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। এই নির্জন রাস্তায় একা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করাটা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা রিদি ভালো করেই জানে। তাই আর কোনো কথা বাড়াল না সে। পুলিশের গাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে নিজের হার না মানা জেদটাকে আপাতত চাপা দিল রিদি।

রিদি চলে যাওয়ার পর আড়াল থেকে ফারিস হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল। এতক্ষণ সে আড়ালে দাঁড়িয়ে এই পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করছিল। পুলিশ অনেক আগেই এসেছিল, কিন্তু ফারিস ইচ্ছা করেই তাদের পাঠায়নি। গম্ভীর দাপুটে ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরীকে তার নিজেরই স্ত্রীর হাতে এমন নাজেহাল হতে দেখে সে যে অসীম আনন্দ পাচ্ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পরিস্থিতি যখন চরম উত্তেজনার দিকে মোড় নিল, তখনই সে পুলিশ পাঠাতে বাধ্য হলো।
​ফারিস ধীরে ধীরে সৌহার্দ্যের কাছে গিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। তার চোখের কোণে দুষ্টুমির ঝিলিক। সে ব্যঙ্গ করে বলল, “আমার তো ভেতর বাহির শীতল হয়ে গেল ভাই, তোর এই দশা দেখে! ভাবা যায়? ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরী, যার ভয়ে পুরো মেডিকেল টিম তটস্থ থাকে, তাকেই আজ তার পুঁচকে বউটা পাত্তা দিচ্ছে না? সৌহার্দ্যর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ভালোবাসিস?

​ফারিসের প্রশ্নে সৌহার্দ্যের চেহারা মুহূর্তে বিরক্তিতে ভরে উঠল। নাক-মুখ কুঁচকে, চোখেমুখে বিরক্তির এক চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সে শীতল ও শান্ত স্বরে বলল, “নো, আই ডোন্ট লাভ হার!”
​ফারিস এক মুহূর্ত সৌহার্দ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একদম সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, “ওহ, আই সি! তাহলে একটা কাজ কর ভাই, দেরি করছিস কেন? তাড়াতাড়ি ডিভোর্সটা দিয়ে দে ভাই। আমিই ওকে বিয়ে করে নেব। তুই একদম চিন্তা করিস না, রিদির দায়িত্ব আমি খুব ভালোভা…”
​কথাটা শেষ করতে পারল না ফারিস। তার আগেই সৌহার্দ্যের রক্তলাল চোখ জোড়া তার দিকে এমনভাবে তাকাল যে, মুহূর্তের জন্য বাতাসের তাপমাত্রা যেন বেড়ে গেল। কিন্তু ফারিস মোটেও দমল না। সে জানত, এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা মানেই বিপদ। সে দ্রুত গাড়ির দিকে যেতে যেতে পিছন ফিরে চিৎকার করে বলল, “বাচ্চাদের নাম কিন্তু তোকে ঠিক করে দিতে হবে! না হলে কিন্তু আমি একদম মানবো না! আমি কিন্তু একদম সিরিয়াস সৌহার্দ্য ঘরের জানিস ঘরে রাখা সুন্নত” বলেই সে দ্রুত গাড়ির দরজা লাগিয়ে দিল।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৭

​সৌহার্দ্য রাগে-ক্ষোভে তখন ফুঁসছে। সে চিৎকার করে বলল, “দাঁড়া তুই ফারিস! আজ তোর হৃদপিণ্ডটা বের করে টুকরো টুকরো না করলে আমার নামও সৌহার্দ্য চৌধুরী না, ইডিয়ট বের হ তুই!”
বলেই রাগের চোটে নিজের পা দিয়ে গাড়ির দরজায় সে এক বিকট জোরে ধাক্কা দিয়ে ​শূন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে সৌহার্দ্য ফোসফাস করতে লাগল। তার মনের ভেতরটা এখন কোনো ল্যাবরেটরির চেয়েও বেশি উত্তপ্ত। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
“উফ, ছেঁড়া জিন্দেগি বালের দেড় ব্যাটারি হাতের কাছে পাই শুধু একবার!

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here