অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৮
রিদিতা চৌধুরী
ফারিসের সেই গম্ভীর ধমকটা যেন রিভানের জমে যাওয়া শিরদাঁড়ায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না; রিভার ঠান্ডা হাতের মুঠোটা নিজের হাতের ভেতর শক্ত করে চেপে ধরে ছুট লাগাল। রিভার তখন যেন এক জীবন্ত পুতুল—কোনো বোধশক্তি অবশিষ্ট নেই তার মধ্যে। তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, চোখের জল চোখের কোণেই শুকিয়ে পাথরের মতো জমে গেছে। মনে হচ্ছে, ফারিসের সেই শীতল রিভলভারের স্পর্শ আর ওর বিস্ফোরিত চাহনি এখনো রিভার বুকের ওপর দগদগ করছে, ঠিক যেন একটা দগদগে ক্ষত।
ফ্ল্যাশব্যাক
সেদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডার ছলে ‘বিয়ন্ড বুফে’তে গিয়েছিল ফারিস। খাবার টেবিলে হাসাহাসির মাঝখানেই হঠাৎ পরিচিত এক কান্নার শব্দ ওর কানে এসে ধাক্কা খেল। চমকে পেছনে ফিরে তাকাতেই ফারিসের হৃদপিণ্ডটা যেন একমুহূর্তের জন্য ধক করে থেমে গেল। দেখল, রিভা গালে হাত দিয়ে অবুঝের মতো দাঁড়িয়ে আছে, আর সামনে থেকে শাহবীর আঙুল উঁচিয়ে শাসাতে শাসাতে দাপট দেখিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। শাহবীরের সঙ্গে রিভাকে এই অবস্থায় দেখাটা ফারিসের কাছে যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো—এমনটা সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
নিজের ভেতরকার জ্বালাটুকু চেপে ধরে সে একজন ওয়েটারকে ডেকে কারণ জানতে চাইল। ওয়েটার তাকে রেস্টুরেন্ট বুক করার কারণটা জানালো! ঘটনাটা শোনার পর ফারিস স্থবির হয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। তার এই মেয়ের প্রতি টানটা কোনো ক্ষণিকের মোহ ছিল না। সেই চৌদ্দ বছর বয়সের চঞ্চল রিভাকে লন্ডনের এক বিকেলে দেখার পর থেকেই ফারিসের হৃদয়ের গহীনে এক অদ্ভুত ভালোলাগার জন্ম হয়েছিল। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত, হাজার মাইলের দূরত্বে থেকেও সে রিভাকে সব বিপদ থেকে আগলে রেখেছে। বারবার নিজেকে বুঝিয়েছে, নিজের মনকে শাসন করেছে—একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের এই তীব্র আবেগ একটা কিশোরীর জন্য মানায় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ব্যর্থ হয়ে ,একদিন রায়েদা শেখের সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি রিভাকে চেয়ে বসল ফারিস। তিনি প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু ভাতিজার চোখে সেই অমোঘ পাগলামি আর জেদ দেখে শেষ পর্যন্ত কথা দিয়েছিলেন—রিভার আঠারো বছর পূর্ণ হলেই তাকে ফারিসের হাতে তুলে দেবেন।
এই পুরো ঘটনাটা রিভা ছাড়া বাড়ির সবাই জানত! কিন্তু ফারিসের কাছে রিভা মানে তার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে মেয়েটিকে সে বছরের পর বছর আগলে রেখেছে, তাকে চোখের সামনে অন্য কারো হতে দেখা—তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। ফারিস একটু অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ; তার নিজের জিনিসকে সে প্রয়োজনে ছিনিয়ে নিতে জানে, তবুও অন্যের হতে দেওয়ার মতো দুর্বলতা তার নেই। সে জানে, রিভা শুধু তার—
রাত তখন প্রায় বারোটার কাঁটা ছুঁইছুঁই। পুকুরঘাটের নিস্তব্ধতাকে চিরে বসে আছে সৌহার্দ্য আর ফারিস। মাঝখানের বাতাসে যেন আগুনের হলকা। পুকুরের হিমশীতল জলে বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিভান; শীত আর ভয়ে তার শরীর কাঁপছে, দুই কান ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে চরম অসহায়ত্বের এক প্রতিচ্ছবি হয়ে। সৌহার্দ্যর দুচোখ দিয়ে যেন আগুনের হল্কা বেরিয়ে আসছে, আর ফারিস? সে ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলেও মুখে তার পাথরের মতো কঠিন ভাব।
অনেকক্ষণ পর সেই জমাট বাঁধা নীরবতা চিরে সৌহার্দ্যর গমগমে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যা রাতের নিস্তব্ধতায় বজ্রপাতের মতো শোনাল— “কেন করলি এমন? আনসার মি, ড্যাম ইট!”
ফারিস শান্ত, অথচ তীব্র কণ্ঠে জবাব দিল, “আই লাভ হার!”
সৌহার্দ্যর চোখে তখন রাগের আগ্নেয়গিরি। সে জ্বলে উঠে বলল, “ভালোবাসার মানে বুঝিস তুই? ওই বাচ্চা মেয়েটার ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে, একবার ভেবে দেখেছিস? ওর মানসিক অবস্থা কী, তা কি তোর ধারনা আছে?”
ফারিসের চোখের কোণে ক্রোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল, “এত নাটক না করে সরাসরি বল না—বন্ধুর জন্য তোর জান চলে যাচ্ছে!”
সৌহার্দ্য হতাশায় মাথা নাড়ল। বিরক্তির সাথে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল, “এভরি টাইম ওকে নিয়ে জেলাস হওয়ার কারণটা বলবি?”
ফারিস আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। তার সমস্ত শরীর রাগে আর বিরক্তিতে থরথর করছিল। সৌহার্দ্যর সামনে থেকে উঠে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে গেল।
ওদিকে রিভান তখনও পুকুরের জলে অর্ধেক ডুবে সৌহার্দ্যর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার মুখ দিয়ে একটা কথাও বের হচ্ছে না, যেন আতঙ্কে তার কন্ঠনালী শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। সৌহার্দ্য এবার বিরক্তিতে চোখ নামিয়ে রিভানের দিকে তাকাল। ধমকের সুরে গর্জে উঠল সে— “আউট, ইডিয়ট!”
ওই একটা ধমক যেন রিভানের জন্য মুক্তির পরোয়ানা হয়ে এল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সে। আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, টলমলে পায়ে জল থেকে উঠে কোনোমতে নিজের প্রাণ নিয়ে দৌড়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় দুটোর কাছাকাছি। ঘুমের রেশ রিদির চোখে নেই, বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। শেষমেশ ফোনটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পুকুরপাড়ে আসতেই থমকে গেল সে—পুকুরঘাটের খুঁটিতে হেলান দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে সিগারেট ফুঁকছে সৌহার্দ্য। রিদি স্থবির হয়ে তাকিয়ে রইল, সৌহার্দ্যকে কোনোদিন সিগারেট খেতে দেখেনি সে। এই গম্ভীর মানুষটার মধ্যে এমন এক অন্ধকার নেশার ছোঁয়া আছে—ভাবতেই রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
ঠিক তখনই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে ভেসে এল সৌহার্দ্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “এত রাতে কি চাই এখানে?”
রিদি এক পা এগিয়ে এসে কিছুটা ইতস্তত পায়ে সৌহার্দ্যর পাশেই বসল। জ্বলন্ত সিগারেটের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ছিঃ, অসভ্য লোক! আপনার এত বাজে অভ্যাসও আছে?”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে রিদির দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক যন্ত্রণা আর তীব্র আর্তি। সে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছেড়ে ধীর স্বরে বলল, “তো, বিয়ে করলাম চার বছর হলো। এখনো পর্যন্ত বউয়ের কাছে যাওয়া তো দূর, একটা চুমু পর্যন্ত খেতে পারলাম না। তাই বিকল্প হিসেবে সিগারেট খাচ্ছি।”
রিদি নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “অসভ্য লুচ্চা ডাক্তার! আপনার সাথে কথা বলা বেকার।
বলে সে উঠে চলে যেতেই নিল, ঠিক তখনই সৌহার্দ্যর হাতের এক হেঁচকা টানে রিদি তার কোলে আছড়ে পড়ল। সৌহার্দ্যর শক্ত বাহু রিদির কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। দুজনের ঠোঁটের মাঝে এখন আর কোনো ব্যবধান নেই—হালকা একটা দূরত্ব, যা আগুনের শিখার মতো উত্তপ্ত। রিদির সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে, ভয়ে আর তীব্র লজ্জায় সে থরথর করে কাঁপছে। চোখ-মুখ খিঁচে মিনমিনে গলায় তোতলাতে তোতলাতে সে বলল, “ক, কি করছেন? ছাড়ুন!”
সৌহার্দ্য যেন কোনো এক ঘোরলাগা নেশায় ডুবে আছে। রিদির আরও কাছে মুখ নিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে নেশালো কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠল, “আই ক্যান কিস ইয়োর স্ট্রবেরি লিপস?”
রিদি শিউরে উঠল। সে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, “লুচ্চা ডাক্তার, আপনি একটু আগে সিগারেট খেয়েছেন। আমি জীবনেও সিগারেট পোড়া ঠোঁটে চুমু খাব না!”
সৌহার্দ্য সে কথায় ভ্রূক্ষেপই করল না। বরং আরও তীব্রভাবে রিদিকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “প্লিজ জান, লেট মি গিভ ইউ আ কিস, মাই প্রিন্সেস’স মম।”
’প্রিন্সেস’স মম’ সম্বোধনটা কানে যেতেই বিকালের কথাটা রিদির মাথায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। রাগে গজগজ করে রিদি বলে উঠল, “ধান্দাবাজ লোক! বাকি সময় আলু-পটলের আম্মু, আর চুমু খাওয়ার সময় প্রিন্সেসের আম্মু! সরেন অসভ্য ডাক্তার!” বলেই রিদি দুই হাতে সৌহার্দ্যর বুকে জোর দিয়ে নিজেকে ঠেলে সরিয়ে দিল।
এমন একটা তীব্র রোমান্টিক মুহূর্ত রিদির এই ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সৌহার্দ্যর চোখ-মুখ রাগে রক্তিম হয়ে উঠল। সে অবজ্ঞার সাথে রিদিকে সরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! তোমার কি জন্মই হয়েছে আমার মুডের বারোটা বাজানোর জন্য? গেট আউট অব মাই সাইট!”
বলেই নিজেই দুপদাপ পায়ে অন্ধকারের দিকে চলে গেল। রিদি তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রাগে গাল ফুলিয়ে ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে উঠল, “লুচ্চা লোক! শুধু ধান্দাবাজি!”
ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ঝরে গেছে তিনটি দীর্ঘ মাস। কিন্তু সময়ের এই স্রোত কারোর জীবনেই কোনো শান্তি বা পরিবর্তন নিয়ে আসেনি; বরং ফারিস-রিভা এবং সৌহার্দ্য-রিদির সম্পর্কের দূরত্বটা বেড়েছে কয়েক গুণ। যেন দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভ আর অভিমান পাহাড়সম দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রিদি সোজা গিয়ে দাঁড়াল সারহান চৌধুরী আর শাহেদা চৌধুরীর সামনে। স্থির, শান্ত গলায় সে জানিয়ে দিল, সে সৌহার্দ্যর সাথে থাকতে চাই না, বিচ্ছেদ চাই।”
কথাটা শোনার পর পুরো ঘর যেন জমে বরফ হয়ে গেল। সারহান চৌধুরী আর শাহেদা চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এমনটা তারা কল্পনাও করেননি। এর আগে কত ঝড় বয়ে গেছে তাদের জীবনে, তখন তো রিদি কখনো এমন কথা বলেনি! বরং সারহান চৌধুরী যখন এক সময় নিজ থেকে বিচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, রিদি তখন সায় দেয়নি। অথচ আজ, যখন সৌহার্দ্য কিছুটা হলেও নিজের আচরণে সংযত হওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই রিদির এই হঠাৎ সিদ্ধান্তে তারা কেউই কোনো কুলকিনারা খুঁজে পেল না। রায়েদা শেখ অনেক সাধ্যসাধনা করলেন, বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু রিদির একটাই কথা—” সে সৌহার্দ্যর সাথে কিছুতেই থাকব না, ডিভোর্স দিবে।”
সারহান চৌধুরী এক প্রকার অসহায় হয়েই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হোক, তারপর দেখবে বলল” কিন্তু রিদির কণ্ঠ ছিল অটল ও পাথরের মতো কঠোর, সে কিছুতে সৌহার্দ্যর সাথে থাকবেনা!
এদিকে সকাল থেকে রিভার কান্না আর চিৎকারে যেন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারও একই জিদ, এই বাড়িতে সে আর থাকবে না। পরিস্থিতির চাপে রায়েদা শেখ অনেকটা বিরক্ত হয়েই দুই মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামের নিজের শ্বশুরবাড়িতে ফিরে গেলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরও রিদির মন গলল না। তাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে না পেরে, শেষমেশ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রিদির ট্রান্সফার করিয়ে নেওয়া হলো। ভাগ্য ভালো যে, একটা পদ খালি ছিল।
ফ্ল্যাশব্যাক
সৌহার্দ্য রাগে গজগজ করতে করতে চলে যাওয়ার পর রিদি হঠাৎ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল। যেন বুকের ভেতর জমানো সব মেঘ সরে গিয়ে একমুঠো রোদ এসে পড়েছে। সৌহার্দ্যর রাগি মুখভঙ্গি নকল করে সে নিজেকেই বলল, “স্টুপিড মহিলা!”—তারপর মুখটা বাঁকিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু অদ্ভুত এক অনুভূতি; বুকের ভেতরটা কেন জানি শান্ত হয়ে আসছে। অকারণে গালে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছে, বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ঠিক কয়েক মিনিট আগের সেই মুহূর্তগুলো। সৌহার্দ্যর ওই উত্তপ্ত স্পর্শ আর নিবিড় চাহনি—সব মিলিয়ে রিদির মুখটা যেন টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় নিজের দুই হাতে মুখ ঢেকে সে কখন যে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল, নিজেও জানে না।
সকাল প্রায় নয়টা। বিয়ের বাড়ির এলাহি কাণ্ডকারখানা আর হইচইয়ের শব্দে রিদির ঘুম ভাঙল। প্রতিদিনের অভ্যাসবশত বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করতেই তার হাত যেন অবশ হয়ে এল। যা দেখল, তাতে রিদি মুহূর্তের মধ্যে পাথর হয়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল, দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে। সে যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। বিছানায় রিদি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, শরীরটা কাঁপছে। একরাশ ঘৃণা আর তীব্র অভিমানে সে মোবাইলটা থেকে চোখ সরিয়ে নিল। চোখের পানি মুছে, কোনোমতে টলমলে পায়ে উঠে সে সারহান চৌধুরীর ঘরের দিকে পা বাড়াল।
দরজায় আলতো টোকা দিতেই সারহান চৌধুরী দরজা খুললেন। রিদির ফ্যাকাশে আর বিধ্বস্ত মুখ দেখে তিনি চিন্তিত হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “এত সকালে মামুনি? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
রিদি শশুরের চোখের দিকে তাকাতেই তার কণ্ঠস্বর কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এল। সে মিনমিনে গলায় বলল, “আব্বু, আপনার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।”
রিদির বিধ্বস্ত চেহারা দেখে সারহান চৌধুরীর ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি চিন্তিত মুখে মেয়েকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। ঠিক সেই মুহূর্তে নাস্তা খাওয়ার জন্য ডাকতে এসে রায়েদা শেখ রিদির অবস্থা দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “কী হয়েছে? আমার মেয়ের মুখটা এত মলিন কেন? কী হয়েছে বল তো খালামনিকে?”
রিদি ওনাদের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছিল না। কোনোমতে আমতা আমতা করে, কাঁপাকাঁপা গলায় সে বলে উঠল, “আমি ওনার সাথে আর থাকতে চাই না… প্লিজ, আমার ডিভোর্স চাই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে শাহেদা চৌধুরী দরজার কাছেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। রিদির মুখে এই আকস্মিক বিচ্ছেদের কথা শুনে তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
শাহেদা চৌধুরী প্রায় দৌড়ে এসে রিদির পাশে বসল। রিদির ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা দুশ্চিন্তায় মোচড় দিয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “রিদি, কী বলছিস এসব মা? তোর মাথা ঠিক আছে তো? কী হয়েছে আম্মুকে খুলে বল তো?”
ওনার কণ্ঠের সেই মমতাটুকু সহ্য করতে পারল না রিদি। তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, আর পরক্ষণেই কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। হেঁচকি তুলে, শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে অস্ফুট স্বরে বলল, “প্লিজ আব্বু… আমি আর ওনার সাথে থাকতে চাই না!”
ঘরের বাতাস যেন এক নিমেষে ভারী হয়ে গেল। রায়েদা শেখ আর শাহেদা চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সারহান চৌধুরী নির্বাক দৃষ্টিতে রিদির অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সিওর তো মা? নিজের আবেগের বশে ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছ না তো?”
রিদি কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতাই জানিয়ে দিল—তার সিদ্ধান্তে সে অটল। সৌহার্দ্যর সাথে কোনো অবস্থাতেই সে আর সংসার করবে না।
সারহান চৌধুরী আর কোনো কথা বাড়ালেন না। কঠিন স্বরে বললেন, “ঠিক আছে। বিয়েটা শেষ হোক, আমি উকিলের সাথে কথা বলছি।” রিদি শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল, কিন্তু তার চোখেমুখে ঘৃনা। সে সৌহার্দ্যর ছায়াটুকুও আর সহ্য করতে পারছে না।
রায়েদা শেখ রিদিকে সান্ত্বনা দিয়ে নিজের রুমে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকল রিভা। রায়েদা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকালেন, “তোর আবার কী হলো রিভা?”
রিভা নাক টেনে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “আমি এখনই এই বাড়ি থেকে চলে যাব আম্মু! এক মুহূর্তও এই বাড়িতে থাকব না। আমি এই শহরেই থাকব না!”
রায়েদা শেখ যেন পাথরের মূর্তির মতো জমে গেলেন। একই সাথে দুই মেয়ের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে তিনি দিশেহারা। দুজনকে শান্ত করার শত চেষ্টা করেও যখন রিভার জেদ ভাঙল না, তখন রায়েদা চৌধুরী হার মানলেন। ক্লান্ত কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে! যদি থাকতেই না চাস, তবে জামাকাপড় গুছিয়ে নে। বিকেলে আমরা চট্টগ্রাম চলে যাব। আমি ভাইজানের সাথে কথা বলে আসছি।”
সকাল পেরিয়ে তখন ভরদুপুর। সৌহার্দ্য রাতে হাসপাতাল চলে গিয়েছিল ইমারজেন্সি ঢাক আসায়, সবে মাত্র খন্দকার বাড়ি ফিরল। বউটাকে এদিক-সেদিক খুঁজছে, অথচ কোথাও সেই স্টুপিড মেয়েটার দেখা নেই। এক প্রকার বিরক্ত হয়েই সে রিদির রুমে গেল। ঢুকতেই দেখল, তার বউ কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে কাত হয়ে শুয়ে আছে।
সৌহার্দ্য সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলল, “স্টুপিডটাকে এখনো নিজের বুকে নিয়ে ঘুমাতে পারলাম না, আরেক স্টুপিড কোল বালিশ এসে ভাগ বসাল!”
বলেই সে রিদির দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল। ঝুকে যেই না তার হাতটা ধরতে যাবে, অমনি রিদি ঝাড়া দিয়ে হাত সরিয়ে উঠে বসল। রিদির সারা শরীর রাগে যেন জ্বলে যাচ্ছে, চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। সৌহার্দ্যর দিকে তাকিয়ে সে গর্জে উঠে বলল, “ছুবেন না আমায়, দূরে সরুন!”
সৌহার্দ্য রিদির কথাকে পাত্তা না দিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড? রেগে আছো কেন?”
বলেই সে আবার রিদিকে কাছে টেনে নিতে গেল। রিদি তখন রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সৌহার্দ্যর গালে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। কাঁপতে কাঁপতে সে চিৎকার করে উঠল, “ডোন্ট টাচ মি, একদম ছুবেন না আমায়, চরিত্রহীন পুরুষ!”
সৌহার্দ্যর চোখ-মুখ রাগে রক্তবর্ণ হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে সামনের টেবিলটাতে লাথি মারল। বিকট শব্দে কেঁপে উঠল ঘরটা। সে গর্জে উঠে বলল, “কি মনে করিস তুই নিজেকে? তোকে স্পর্শ না করলে সৌহার্দ্য চৌধুরীর বাল ছিঁড়া যাবে? একটা কিস করতে চেয়েছি বলে চরিত্রহীন হয়ে গেলাম? স্টুপিড মহিলা, লাগবেনা আমার তোকে!”
বলেই সে রাগে হনহন করে বেরিয়ে গেল। রিদি শুধু সেই দিকে তাকিয়ে রইল, তার চোখে তখন কান্নার চেয়েও বড় এক তীব্র ঘৃণা।
সেদিন রুম থেকে বের হয়ে সৌহার্দ্য সোজা খন্দকার বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এরপর কেটে গেছে তিন দীর্ঘ মাস। সৌহার্দ্য সেদিন কোন একটা জরুরি প্রয়োজনে লন্ডনে গিয়েছিল । যদিও যাওয়ার কথা আগে থেকেই ছিল এবং ফ্লাইটও তৈরি ছিল, রাগে কাওকে বলে যায়নি!
গভীর রাতে বাড়ি ফিরল সৌহার্দ্য। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি শরীরে ভর করেছিল, তাই বাড়ি ফিরেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু পরের দিন সকালে যখন তার ঘুম ভাঙল, তার চোখ দুটি যেন অস্থির হয়ে সারা বাড়িতে রিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু পুরুষালি ইগো—তার সেই চিরাচরিত জেদ—তাকে বাধা দিল কারো কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে।
সারাদিন সে পুরো বাড়িতে রিদির ছায়া খুঁজছে। খাওয়ার টেবিল থেকে শুরু করে বারান্দা, প্রতিটি কোণে তার তীক্ষ্ণ নজর, রিদির রুমে ও গিয়ে না পেয়ে ফিরে এসেছে, অপেক্ষায় বসে যেন কেউ ডাকলে সে তৎক্ষণাৎ সেখানে ছুটে যাবে। অথচ যার টানে সে আজ এতটা ব্যাকুল হয়ে ফিরেছে, তাকে কোথাও দেখা গেল না। রিদি যেন বাড়ির বাতাস থেকে মুছে গেছে। ড্রয়িং রুমে বসে অসহ্য দুই ঘণ্টা কাটল তার। বাড়ির কেউ যে নিজে থেকে তাকে কিছু বলবে, সেই সৌজন্যও যেন আজ কারো নেই। অবশেষে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল সৌহার্দ্যর। রাগে গজগজ করতে করতে সে সোজা উঠে গেল সারহান চৌধুরীর রুমে।
সারহান চৌধুরী তখন রকিং চেয়ারে বসে বই পড়ায় মগ্ন। ছেলের উপস্থিতিতে চশমার ফাঁক দিয়ে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন, পরক্ষণেই কোনো হেলদোল ছাড়াই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন বইয়ের পাতায়। বাবার এমন শীতল আচরণে সৌহার্দ্যর রাগ যেন দ্বিগুণ হয়ে জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে, কাঁপা গলায় সে প্রশ্ন করল, “আমার বউ কোথায়?”
সারহান চৌধুরী শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “তোমার বউ কোথায়, সেটা আমার জানার কথা নয়।”
এই নির্লিপ্ত উত্তর যেন আগুনে ঘি ঢালল। সৌহার্দ্য কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তুমি এগুলো সব ওকে দিয়ে করাচ্ছো, তাই না? ওকে যা ইচ্ছে করতে বলো, “আই ডোন্ট কেয়ার”। ওকে ফিরিয়ে আনতে আমি আর শিকদার বাড়িতে যাব না। ওর যেখানে খুশি, যতদিন ইচ্ছা থাকুক!”
কথাটা বলেই সে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যেতে চাইল। ঠিক তখনই পেছন থেকে সারহান চৌধুরীর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ও ঢাকার বাইরে আছে। আর শোনো, তোমার জন্য একটা উপহার রেখে গেছে ও। তোমার ড্রয়ারে রাখা আছে, দেখে নিও, তোমার পছন্দ হবে আশা করি।”
কথাটা বলেই ওনি পুনরায় বইয়ের পাতায় চোখ ডুবিয়ে দিলেন। সৌহার্দ্য বাবার দিকে এক মুহূর্ত বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়েই হনহন করে বেরিয়ে গেল।
বাবার রুম থেকে বেরিয়ে সৌহার্দ্য আর কোনো দিকে তাকাল না। ঝড়ের বেগে নিজের রুমে ঢুকে সে সজোরে ড্রয়ারটা টান দিয়ে খুলল। ড্রয়ারের ভেতর রাখা একটা সাদা খাম তার চোখে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে, অদ্ভুত এক অস্বস্তি নিয়ে সে খামটা হাতে নিল।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২৭
খামটা খোলার সময় তার আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল, কিন্তু ভেতরে চোখ পড়তেই তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার, কপালের রগ ফুলে উঠল রাগে। খামের ভেতরে থাকা ডিভোর্স পেপারটার দিকে তাকিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। নিচের দিকে চোখ যেতেই দেখল, সেখানে অত্যন্ত পরিপাটি আর গুটি গুটি অক্ষরে রিদিতা খানে নামে স্বাক্ষর জ্বলজ্বল করছে।
নিজের অস্তিত্ব যেন এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল সৌহার্দ্যর। এতদিনের অভিমান, জেদ আর ইগো মুহূর্তের মধ্যে ঘৃণায় রূপ নিল। ডিভোর্স পেপারটা শক্ত করে মুচড়ে ধরে সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, “ওকে ফাইন মিসেস রিদিতা খান অ্যাজ ইউর উইশ! আমার জীবন থেকে বিদায় নেওয়ার এতই যখন শখ , তবে তাই হোক!”
