অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৩
রিদিতা চৌধুরী
সকাল থেকেই আকাশটা থমথমে, যেন কোনো এক অজানা বিষাদে নীল আকাশটা আজ ধূসর হয়ে আছে। রিদির মনের অবস্থাটাও ঠিক আকাশের মতোই ভারাক্রান্ত। গতকাল রাতের ঘটনাটা এখনো তার স্মৃতিতে দগদগে ক্ষতের মতো লেগে আছে। সৌহার্দ্যের সেই অপ্রত্যাশিত আচরণ আর নিজের ভেতরের এই অবর্ণনীয় অস্থিরতা—সব মিলিয়ে রিদি এক গভীর দোটানায় দিন কাটাচ্ছে।
সৌহার্দ্যর এই বৈপরীত্য তাকে সবচেয়ে বেশি পোড়ায়। একদিকে তাকে স্ত্রী হিসেবে পুরোপুরি স্বীকার করে না নেওয়ার জেদ, অন্যদিকে তার ওপর এই তীব্র অধিকারবোধ—সব মিলিয়ে রিদি যেন ধাঁধায় পড়ে গেছে। সৌহার্দ্যর মনের অলিগলি সে কোনোভাবেই মেলাতে পারছে না। অথচ, গতকালের ভয় পাওয়ার মুহূর্তে যখন রিদি কান্নায় ভেঙে পড়ে সৌহার্দ্যর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তার বুকের ভেতরকার সেই ধুকপুকানি, সেই ব্যাকুলতা রিদি স্পষ্ট টের পেয়েছিল।
রিদি যখন নিজের ভাবনায় বিভোর ঠিক তখনি রিভার ডাকে তার ঘোর ভাঙ্গল, “ভাবী,! কী ভাবছো এভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে?”
রিদি নিজের জগত থেকে বেরিয়ে রিভার দিকে তাকাল। মুখে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, “তেমন কিছু না! চলো ছাঁদে যাবে?”
রিভার ছাদে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে থাকলেও সে রাজি হতে পারল না। কারণ, সে কোনোভাবেই চায় না ফারিসের সাথে তার দেখা হয়ে যাক। গতকাল থেকে সে কয়েকবার ছাদে উঠতে গিয়েও ফারিসকে ছাদে দেখে পিছিয়ে এসেছে। রিভা মিনমিনিয়ে বলল, “এখন ছাঁদে যাবো না, ভাবী!”
রিদি আর তাকে জোর করল না। সে বুঝতে পারে, ইদানীং রিভার মনটা ভীষণ খারাপ থাকে। তবে রিভা যেহেতু নিজে থেকে কিছু বলছে না, তাই রিদিও আর জানতে চাইল না।
সকাল প্রায় দশটা ,ফারিস আজ ঢাকা চলে যাবে। সকাল থেকেই তার মনটা ভীষণ অস্থির, যেন কোনো এক অদৃশ্য বাঁধন তাকে আটকে রেখেছে। অন্তত একবারের জন্য হলেও মেয়েটাকে না দেখলে যেন তার শান্তি নেই। নিজের অবাধ্য মনকে কোনোভাবেই মানাতে পারছিল না সে। তাই আর কোনো দ্বিধা না করে সোজা চলে এল রায়েদা শেখের ফ্ল্যাটের সামনে।
কয়েকবার কলিংবেল বাজানোর পর দরজা খুলল রিভা। কিন্তু ফারিসকে দরজার সামনে দেখেই তার চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দরজাটা ঝপ করে লাগিয়ে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ফারিস হাত দিয়ে আটকে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ফারিসের চোখ-মুখ রাগে যেন দাউদাউ করে জ্বলছে, যেকোনো সময় ফেটে পড়বে সে। রিভা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার আগেই ফারিস রিভার কবজি চেপে ধরল। রিভাকে নিজের দিকে টেনে এনে হিসহিসে গলায় বলল, “শশুরের বেয়াদব মেয়ে! চড় দিয়ে ফোকলা দাঁত ফেলে দেব! একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক!”
ফারিসের ধমকে রিভার শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। সে নড়াচড়া বন্ধ করে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর, ফারিসের জ্বলন্ত চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রিভা কাঁপা গলায় বলল, “ছাড়ুন আমাকে ফারিস ভাই, আমি আপনার সাথে একদমই কথা বলতে চাই না।”
কথাটা বলেই সে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই ফারিস তাকে নিজের বুকের একদম কাছে টেনে নিয়ে। কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু আর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোকে দেখার তৃষ্ণায় আমি তৃষ্ণার্ত, বেবি ডল। কেন নিজেকে আড়াল করে আমাকে এতটা কষ্ট দিচ্ছিস?” মাপ করে দেওয়া যায় না? সরি তো আমি?
রিভা চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল—যেন কোনো অনুভূতিহীন জীবন্ত পুতুল। ফারিসের এসব কথা যেন তার কাছে মুল্যহীন, তার এই মুখভঙ্গিতে ভালোবাসার চেয়ে অস্পষ্ট ঘৃণা আর বিতৃষ্ণাই যেন বেশি ফুটে উঠছে। রিভার সেই শূন্য চোখের দিকে তাকাতেই ফারিসের হৃদপিণ্ডটা যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে পরিষ্কার দেখতে পেল, রিভার এই মুখাবয়বে তার জন্য এক ফোঁটা ভালোবাসাও অবশিষ্ট নেই।
ফারিস ধীরে ধীরে রিভার হাতটা ছেড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই তার সমস্ত জেদ যেন বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। আজ কেন জানি তার মনে হচ্ছে, সে বড় কোনো ভুল করে ফেলেছে—ভালোবাসা আর যাই হোক, জোর করে কখনো আদায় করা যায় না। রিভার উদাসীনতা দেখে মনে হচ্ছে, সে ফারিসের ছায়া মাড়াতেও নারাজ।
ফারিস চোখ বন্ধ করে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনো কথা না বলে, ঠিক যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই নিঃশব্দে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল।
ফারিস চলে যেতেই রিভা দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিল। বালিশে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে ফেলল সে। অস্ফুট কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “আপনাকে আমি ঘৃণা করি ফারিস ভাই। আপনি ভীষণ স্বার্থপর, শুধু নিজের কথাটাই ভাবেন!”
আপনার যদি আমার প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা থাকত, তবে আপনি আমাকে জোর করে নয়, ভালোবেসে আগলে রাখতেন।”—রিভার শব্দহীন কান্না যেন ঘরের প্রতিটি দেয়ালের সাক্ষী
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে, কিন্তু সৌহার্দ্যর যেন জ্ঞান ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই। জ্বরের তীব্রতায় তার চোখ মেলে তাকানোর মতো শারীরিক ক্ষমতাটুকুও যেন লোপ পেয়েছে। কাল রায়েদা শেখের বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই তার ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো রাগ ধিকিধিকি জ্বলছিল। সেই ক্রোধের আগুন নিভাতে গিয়েই সে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই জেদ আর হঠকারিতার মাশুল গুণতে হচ্ছে এখন তাকে!
বাড়িতে এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। ফারিস আর সুজন সকালেই বেরিয়ে গেছে। সুজনের একটা ইমার্জেন্সি ওটি (OT) থাকায় তাকে তড়িঘড়ি করেই ঢাকার পথ ধরতে হয়েছে। যাওয়ার আগে সুজন সৌহার্দ্যকে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল, যদিও তখন জ্বরের তীব্রতা খুব একটা ছিল না। তাই পরিস্থিতির গুরুত্ব ততটা আঁচ করতে না পেরে, রায়েদা শেখকে ফোনে সবটা জানিয়ে তারা নিশ্চিন্ত মনেই বেরিয়ে গিয়েছিল।
দুপুর প্রায় দুটো। সৌহার্দ্যের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিদি। রায়েদা শেখই তাকে পাঠিয়েছেন। সৌহার্দ্যের জ্বরের কথা শোনার পর থেকে ওনার অস্থিরতা কমছিল না, কিন্তু নিজে আসার চেয়ে রিদিকে পাঠানোকেই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন তিনি। রায়েদা শেখের মতে, এই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর একসাথে থাকাটাই প্রয়োজন।
তিনি সৌহার্দ্যকে খুব ভালো করেই চেনেন। রায়েদা শেখ জানেন, রিদিকে সৌহার্দ্যর থেকে দূরে রেখে কখনো সৌহার্দ্যর অনুভূতি বুঝা যাবেনা। সৌহার্দ্য অন্য ধাঁচের ছেলে; বুক ফেটে গেলেও সে মুখ দিয়ে টু-শব্দও করবে না। তার থেকে বড় কথা, ছোটবেলা থেকেই সৌহার্দ্য ভীষণ জেদি এবং একগুঁয়ে স্বভাবের। তাকে দিয়ে জোর করে কিছু করানো প্রায় অসম্ভব।
সৌহার্দ্য যে রিদিকে কতটা ভালোবাসে, সেই সত্যটা এখন আর কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়। সে যদি রিদিকে ভালো না-ই বাসত,সৌহার্দ্যের মতো একজন মানুষ ঢাকার নিজের সবকিছু ফেলে চট্টগ্রাম এসে কখনো পড়ে থাকত না!
রায়েদা শেখের কাছ থেকে সৌহার্দ্যের অসুস্থতার খবরটা শোনার পর থেকেই রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করছিল। টেনশনে হাত-পা হিম হয়ে আসছিল তার। সৌহার্দ্যর জ্বরের কথা শুনে রিদি এক মুহূর্তও দেরি করেনি। কিছু প্রয়োজনীয় বইপত্র ব্যাগে পুরে দ্রুত তার বাসায় ছুটে এসেছে।
রিদি সেই কখন থেকে একের পর এক কলিংবেল বাজাতে লাগল। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। রিদির কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হলো, বুকটা ধক করে উঠল কোনো অঘটন ঘটল না তো? কাঁপা কাঁপা হাতে আবারও কলিংবেলের বোতামে চাপ দিতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজাটা খুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে সৌহার্দ্য। তার চোখ দুটো ঘুমে আচ্ছন্ন, শরীরজুড়ে ক্লান্তির ছাপ, আর জ্বরের তীব্রতায় মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে। রিদিকে দেখে সে কোনো কথা বলল না, শুধু দরজা থেকে এক পা সরে দাঁড়াল। রিদি তাকে এভাবে দেখে স্থির থাকতে পারল না। সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যর কপালে হাত রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু উচ্চতায় খানিকটা খাটো হওয়ায় নাগাল পাচ্ছিল না। সৌহার্দ্য তা বুঝে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়াল।রিদির হাতের তালু সৌহার্দ্যর কপালে ঠেকতেই আঁতকে উঠল সে। আগুনের মতো পুড়ছে শরীরটা! রিদি উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল”এত জ্বর নিয়ে আপনি এখনো দাঁড়িয়ে আছেন কীভাবে?”—রিদির কণ্ঠটা কেঁপে উঠল আতঙ্কে।
রিদির এই বিচলিত ভাব দেখে সৌহার্দ্য খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করল না। দরজাটা লাগিয়ে সে ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে এগোতে এগোতে নিরাসক্ত গলায় বলল, “এত প্যানিক হওয়ার কিছু নেই। আমার খুব খিদে পেয়েছে, কিছু বানিয়ে দাও তো। কাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি।”
সৌহার্দ্যর কথাগুলো রিদির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। এত অসুস্থ, অথচ তার কণ্ঠের ওই উদাসীনতা যেন রিদির হৃদয়ে সূঁচের মতো বিঁধল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল। বিশাল রান্নাঘর, পরিপাটি করে সাজানো সবকিছু। রায়েদা শেখের গৃহকর্মী প্রতিদিন সকালে এসে ঘর গুছিয়ে দিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু রান্নাটা তিনি নিজেই করে পাঠান। সৌহার্দ্য বাইরের কারো হাতের খাবার মুখে তোলে না। আজ সকালেও রায়েদা শেখ খিচুড়ি রান্না করে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা এখনো একপাশে অবহেলায় পড়ে আছে।
রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খিচুড়ির বাটিটা হাতে নিয়ে দেখল, খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে গেছে, কেমন একটা গন্ধ বের হচ্ছে।সেটার দিকে আর না তাকিয়ে রিদি দ্রুত চুলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দুটো সুপের প্যাকেট ছিড়ে চুলায় বসিয়ে দিল।
হাতে সুপের বাটি নিয়ে সৌহার্দ্যর ঘরে ঢুকতেই রিদির পা যেন মেঝেতে স্থির হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখের পলক পড়ছে না। পুরো রুমটা যেন একটা গ্যালারি! চারপাশে সব তার ছবি, কোথাও কলেজ করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মুহূর্ত, কোথাও ফুচকা খাওয়ার তন্ময় দৃশ্য—ছবিগুলো একেকটা একেক জায়গা থেকে তোলা। কিন্তু দেখলে মনেই হবে না যে এগুলো হঠাৎ তোলা; প্রতিটি ফ্রেমে যেন এক নিপুণ শিল্পীর গভীর মনোযোগ ও ভালোবাসা মিশে আছে।
থমকে দাঁড়িয়ে আছে রিদি। রিদির অমন স্থবিরতা দেখে সৌহার্দ্য বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। পরক্ষণেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে গম্ভীর, গমগমে স্বরে বলল, “স্টুপিড মহিলা! আজ কি সারা দিন ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকার প্ল্যান করছ?”
রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে সৌহার্দ্যর পাশে বসল। আলতো করে চামচে সুপ তুলে তার মুখে দিতে দিতে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “আমার এত ছবি… আপনি কখন তুললেন ডাক্তার সাহেব?”
সৌহার্দ্য কোনো উত্তর দিল না। তার সেই চিরচেনা গম্ভীর মুখ। রিদি তার উত্তরের আশায় তাকিয়ে থাকলেও সে নির্বিকার। রিদি বুঝে গেছে, এই মানুষটির মুখ থেকে কথা বের করা সাধ্যের অতীত। যতক্ষন না সে নিজ থেকে বলছে! খাওয়ানো শেষে রিদি যখন বাটিটা নিয়ে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের শান্ত কিন্তু ভারি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “শরীরটা মুছে দিতে পারবে?”
সৌহার্দ্যের মুখে কথাটা শুনে রিদির হৃৎপিণ্ড যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এক অজানা লজ্জা আর আড়ষ্টতায় তার আঙুলগুলো কাঁপতে শুরু করেছে। এর আগে একবার সে সৌহার্দ্যকে ঘুমন্ত অবস্থায় এভাবে সামলেছিল ঠিকই, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা—নিভৃত এই ঘরে সৌহার্দ্যের সজাগ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে সে! রিদি কোন রকম নিজেকে সামলে মাথা নেড়ে সায় জানালো, তারপর, সুপের বাটিটা পাশে সরিয়ে রেখে রিদি ধীরপায়ে আরও একটু এগিয়ে এসে। কাঁপা কাঁপা আঙুলের সাহায্যে সৌহার্দ্যের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে লাগল সে। সৌহার্দ্য কোনো কথা বলছেন, পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে আছে। কিন্তু তার সেই গম্ভীর, কৃষ্ণনয়ন দুটি নিবিষ্ট মনে রিদির প্রতিটি ছোটখাটো নড়াচড়া, তার আঙুলের কম্পন পর্যবেক্ষণ করছে।
সেই চাউনিতে যেন রিদির ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। তবুও নিজেকে সামালে নিয়ে বাথরুম থেকে ভেজা নরম কাপড়টা নিয়ে এসে অতি সাবধানে, আলতো ছোঁয়ায় সৌহার্দ্যের শরীরটা মুছে দিয়ে একটা টি-শার্ট কোনোমতে তাকে পরিয়ে দিলো! রিদি যখনই একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলে যেতে উদ্যত হলো, তখনই আবার ও সৌহার্দ্য গম্ভীর স্বরে বলল, “মাথায় হাত বুলিয়ে দাও জান প্লিজ।”
কথাটা বলেই সৌহার্দ্য বিছানায় গা এলিয়ে দিল। রিদি দ্রুত ভেজা কাপড়টা মেলে দিয়ে রান্নাঘর বাটিটা রেখে ফিরে এসে সৌহার্দ্যর পাশে বসতেই ঘটল এক অভাবনীয় কাণ্ড।কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই সৌহার্দ্য আচমকা রিদির কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ে রিদির হাতটা টেনে নিয়ে নিজের ঘন সিল্কি চুলের ভাঁজে গুঁজে দিল।
রিদির শরীরের ভেতর দিয়ে যেন বিদ্যুতের এক তীব্র ঝলক খেলে গেল। তার হাতটা থমকে আছে সৌহার্দ্যের চুলের গভীরে, সে যেন স্তব্ধ! রিদিকে এমন পাথর হয়ে বসে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য তার চিরচেনা গম্ভীর গলায়, কিছুটা বিরক্তির সুরেই বলল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
সৌহার্দ্যর কণ্ঠস্বরের রেশ কাটতে না কাটতেই রিদি যেন বাস্তবে ফিরে এল। নিজেকে সামলে নিয়ে তার কাঁপাকাঁপা আলতো আঙুলগুলো সৌহার্দ্যের রেশমি চুলে বিলি কাটতে শুরু করল। রিদির আঙুলের সেই কোমল স্পর্শে সৌহার্দ্যের সারাদিনের পুঞ্জীভূত ক্লান্তি যেন নিমেষেই উবে গেল। সে পরম আবেশে, নিজের মুখটা রিদির পেটে আরও গভীরভাবে গুঁজে দিল।
এবার যেন রিদি নিশ্বাস নিতেই ভুলে গেছে। তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে এখন এক ঘোরের মতো অনুভূতি। সৌহার্দ্যের সেই তপ্ত, এলোমেলো নিশ্বাস রিদির পোশাক ভেদ করে সরাসরি তার ত্বকে এসে লাগছে, আর প্রতিবার সেই উত্তাপে রিদির শরীরে শিহরণের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। ঘরের নিস্তব্ধতা আর সৌহার্দ্যের সেই ধীর, গভীর নিশ্বাসের ছন্দ জানান দিচ্ছে—এই কঠিন মানুষটি এখন রিদির আশ্রয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত ঘুমের অতল সাগরে হারিয়ে গেছে।
রাত প্রায় এগারোটা। ঘরের মৃদু আলোয় সৌহার্দ্য বিছানায় আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে কী যেন করছে। তার ঠিক পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে রিদি, মন দিয়ে পড়ছে। সৌহার্দ্যর জ্বরটা এখন আর নেই, শরীরটাও বেশ ফুরফুরে। ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই সৌহার্দ্য গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করল, “তোমাদের একটা ক্লাস টেস্ট নেওয়া হবে। ভালো করে চ্যাপ্টারগুলো রিভিশন দাও।”
কথাটা কানে যেতেই রিদি যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ঝটপট সরে এসে একেবারে সৌহার্দ্যর শরীর ঘেঁষে বসল। রিদির এই হঠাৎ নৈকট্যে সৌহার্দ্যর কপালে ভাঁজ পড়ল। এই মেয়েটার স্বভাব তার জানা—একটু কাছে গেলেই যে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে দূরে সরে যায়, সে কি না আজ নিজে থেকেই এমন গায়ের ওপর এসে পড়ছে! বিরক্তি আর সন্দেহের একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে সৌহার্দ্য ধমক দিয়ে উঠল, “স্টুপিড মহিলা, এমন ঘেঁষাঘেঁষি করছো কেন? সরে বসো! ব্যাড ফিল হচ্ছে আমার!”
কিন্তু রিদি যেন আজ কসম খেয়ে এসেছে—সৌহার্দ্যর ধমক তার গায়েই লাগল না। উল্টো সে আরও একটু এগিয়ে এসে একদম লেপ্টে বসল। নিজের ছোট্ট হাতটা সৌহার্দ্যর শক্ত হাতের খাঁজে সাবধানে গুঁজে দিয়ে, একদম মিনমিনে আর আদুরে গলায় বলল, “ডাক্তার সাহেব, আপনি না গতবার আমার থেকে কেটে নেওয়া ছয় নাম্বার বাড়িয়ে দেবেন বলেছিলেন? উল্টো আরও দুই নাম্বার কেটে নিয়েছেন!” বলেই সে মনটা খারাপ করে এমনভাবে ঠোঁট ফুলিয়ে তাকাল, যেন কত বড় এক অবিচার করা হয়েছে তার ওপর।
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে রিদিকে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। সে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে, রিদির এই মিষ্টি ব্যবহারের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর মতলব আছে। কারণ, যে মেয়ে তাকে সারাক্ষণ ‘অসভ্য লোক’, ‘বেয়াদব লোক’ বলে গালি দিয়ে মুখ ফেনা তুলে ফেলে, সে যখনই কোনো দরকার পড়ে, তখনই একদম মাখনের মতো মিষ্টি ভাষায় ‘ডাক্তার সাহেব’ বলে ডাকতে শুরু করে।—ব্যাপারটা মোটেও সুবিধের নয়। সৌহার্দ্য শরীরটা একটু পিছিয়ে নিয়ে, গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করল, “মতলবটা কী আপনার, ম্যাডাম? কী চাই?”
রিদি এক মুহূর্ত দেরি না করে সৌহার্দ্যর সাথে গড়ে ওঠা দূরত্বটুকু নিমেষেই ঘুচিয়ে দিল। সৌহার্দ্যর দিকে মুখ ফিরিয়ে, দুই হাতে তার টি-শার্টের কোণা আলতো করে টানতে টানতে লাজুক চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “প্লিজ ডাক্তার সাহেব, কালকের ক্লাস টেস্টের প্রশ্নগুলো আমাকে একটু বলে দিন না? তাহলে আমি আপনাকে দুটো চুমু দেব!”
সৌহার্দ্যর বুঝতে বাকি রইল না তার ধড়িবাজ বউয়ের আসল উদ্দেশ্য। বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে সে ধমক দিয়ে উঠল, “তোমার থেকে আমি অযথা নাম্বার কাটি না। তোমার লেখার টপিকগুলোতে ভুল থাকে। এই মোটা মাথা নিয়ে কে বলেছে তোমাকে ডাক্তারি পড়তে? অপারেশন টেবিলে রোগী তোমার হাতে পটল তুলবে, স্টুপিড!”
বলেই সৌহার্দ্য মুখ ঘুরিয়ে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিতে যাবে, ঠিক তখনই রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এমনভাবে হতাশ হওয়ার ভান করল যেন পৃথিবীটাই শেষ হয়ে গেছে। করুণ সুরে বলল, “ভেবেছিলাম দুটো চুমু দেব, আপনি যেহেতু চাচ্ছেন না—তাহলে থাক!”
কথাটা বলেই রিদি সরে যেতে চাইলো। অমনি সৌহার্দ্য গলা খাঁকারি দিয়ে একটু নড়েচড়ে বসল। নিজের গম্ভীরতাকে কোনোমতে বজায় রেখে বলল, “ওকে, দিচ্ছি। চুমু দাও!” বলেই সে রিদির দিকে গাল এগিয়ে দিল।
রিদি খানিকটা দূরে সরে গিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আপনাকে আমি চিনি! চুমু নিয়ে আপনি নিশ্চয়ই পাল্টি খাবেন। আগে প্রশ্ন দেন, তারপর চুমু পাবেন!”
সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত ভেবে ড্রয়ার খুলে একটা প্রশ্নপত্র বের করে রিদির দিকে এগিয়ে দিল। রিদি প্রশ্নটা হাতে পেয়ে খুশিতে ডগমগ হয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সৌহার্দ্যর দুই গালে টপটপ করে দুটো চুমু খেয়ে সরে আসতে যাবে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য ক্ষিপ্র গতিতে তাকে নিজের কোলে টেনে নিল। রিদির কোমর জড়িয়ে ধরে, তার ঠোঁটের দিকে নেশাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, উহু “আমার মন ভরেনি। চুমু দিয়েছো, নাকি কারেন্টের শক দিয়েছো?”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩২
বলেই রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৌহার্দ্য তাকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই সে রিদির সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে নিজের ওষ্ঠজোড়া ডুবিয়ে দিল তার নরম ওষ্ঠের ভাঁজে। সেই আকস্মিকতায় রিদি যেন মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল; থমকে গেল তার হৃদস্পন্দন, নিশ্বাস নেওয়ার কথাও ভুলে গেল সে। ঘোর কাটতেই হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যকে সরিয়ে দেওয়ার এক নিষ্ফল চেষ্টা করল রিদি, কিন্তু সৌহার্দ্যর সুঠাম শরীরের নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী থেকে মুক্তি পাওয়ার সাধ্য কার? রিদির দম যেন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, তবুও সৌহার্দ্যর অবিচল নির্লিপ্ততা কিছুতে ছাড়বেনা না তাকে!প্রায় দীর্ঘ দশ মিনিট পর সৌহার্দ্য রিদকে ছেড়ে দিয়ে নিজের ঠোঁট আলতো করে মুছে বাঁকা হেসে সে ফিসফিস করে বলল, “ইট’স ডেলিশাস! বাট সুইটহার্ট, এই সপ্তাহে আমি আর পরীক্ষা নিচ্ছি না। পরের সপ্তাহে নতুন করে ট্রাই করো, ওকে গুড গার্ল!” বলেই গালটা টেনে দিল!
এদিকে রিদি তখনো ঘোরগ্রস্ত। আটকে থাকা নিশ্বাসটা কোনোমতে ছেড়ে দিয়ে সে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যর দিকে। বুকের ভেতরটা তখনো উত্তাল, হৃদস্পন্দনের সেই তীব্র ছন্দ কোনোভাবেই স্বাভাবিক হয়ে আসছে না।
