Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪০ (২)

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪০ (২)

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪০ (২)
রিদিতা চৌধুরী

গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে সৌহার্দ্য একদম স্থির হয়ে আছে, চোখের পলকহীন দৃষ্টি সামনের নিঝুম শিকদার বাড়ির বিশাল লোহার গেটটার দিকে। ইঞ্জিনের মৃদু, একঘেয়ে আওয়াজটাও এই থমথমে নীরবতায় আজ যেন খুব বেশি জোরালো, খুব বেশি চড়া মনে হচ্ছে। হাতের মুঠোয় থাকা স্টিয়ারিং হুইলটা সে অবচেতনভাবেই শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে; যেন এই চাকাটা আলগা হয়ে গেলেই সে নিজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে।
গাড়ির ভেতরটা একদম নিস্পন্দ, যেন একটা খাঁ খাঁ করা শূন্যতা জেঁকে বসেছে। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের ম্লান হলুদ আলোটা জানালার কাঁচ চুইয়ে ওর বিষণ্ণ চোখের ওপর এসে পড়েছে। সেই আলো-ছায়ার খেলায় ওর চেহার গম্ভীরতা আর ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে ধরা দিচ্ছে। রিদির নাম্বারে এই নিয়ে পরপর কয়েকবার ফোন করা শেষ, কিন্তু তার স্টুপিড বউটা কিছুতেই ফোনটা ধরছে না। চরম এক নিঃসঙ্গতা আর অভিমানে সৌহার্দ্য হঠাৎ অনমনে, খুব নিচু গলায় গেয়ে উঠলো—

“পাখি আমার নিঠুর বড়, মন বোঝে না…
আমার ভাঙা খাঁচা পড়ে আছে, সে তো আসে না….”
হাসপাতালে সুজনের কাছে যখন সে শুনল, রিদিকে চারতলার সিঁড়ি বেয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিচে নেমে যেতে দেখা গেছে, তখন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল সৌহার্দ্যের। কারণটা তার কাছে পরিষ্কার, জলের মতো স্পষ্ট। তবুও সে ভেবেছিল—ভুল বোঝাবুঝি হলেও রিদি হয়তো এবার অন্তত বাড়িটা ছেড়ে যাবে না। যদিও সে নিজে এমন কোনো ভুল করেনি যার জন্য রিদি এত বড় কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারে।
মায়ের কাছে ফোন দিয়ে যখন নিশ্চিত হলো যে রিদি বাড়িতেও ফেরেনি, তখন একটা তীব্র রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল। মনে ভেবেছিল, ‘থাক না, কয়েকদিন থাকলেই বুঝতে পারবে! প্রতিদিনের এই অশান্তি আর ভালো লাগে না।’ কিন্তু পরক্ষণেই এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। এই স্টুপিড মেয়েটাকে ছাড়া যে তার রাতে দুচোখের পাতা এক করা অসম্ভব, সেটা এখন সে হাড়েমজ্জায় টের পায়। তাই হাসপাতাল থেকে বের হয়েই, গভীর রাতে সে সরাসরি গাড়ি নিয়ে শিকদার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ সেই বেয়াদব মেয়েটা ফোন তো ধরছেই না, উল্টো কল কেটে দিয়ে দুটো গাল ফোলা ইমোজি পাঠিয়ে দিয়েছে! সেই ইমোজিতে তার রাগ বাড়ার বদলে বুকের ভেতরটা যেন আরও বেশি করে দমে গেল।

আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারল না সে। ফোনটা হাতে নিয়ে কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে আঙুল থামাল এক চিরচেনা নামে—বীর। কত বছর এই নামটায় কল দেওয়া হয়নি! আজ ফোনটা কানে নিতেই সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুত তোলপাড় করে উঠল। যার সাথে কথা না বললে একসময় সৌহার্দ্যের রাতই কাটত না, আজ তাদের মাঝে এত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান! রিদির খুঁজ পাওয়ার উত্তেজনার চেয়েও এখন তার বেশি অস্বস্তি হচ্ছে—শাহবীরের সাথে কী বলবে, কীভাবে শুরু করবে তা নিয়ে। এটাই বুঝি বন্ধুত্ব? সব অভিমান আর দূরত্ব ছাপিয়ে যে টান আজও অটুট।
সৌহার্দ্যের ভাবনার জাল ছিঁড়ে ওপারের ফোনটা রিসিভ হলো। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল শাহবীরের সেই পরিচিত, কিন্তু এখনকার জন্য বেশ অপরিচিত, ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর—
“কী চাই এত রাতে আমার কাছে, চৌধুরী সাহেব?”
শাহাবীরের ঠাট্টা সৌহার্দ্যের বিরক্তির মাত্রা যেন বাড়িয়ে দিল। ভ্রু কুঁচকে, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সে বলে উঠল, “বউ চাই! পাঠা ওকে!”

সৌহার্দ্যের এই উদ্ধত আচরণে শাহাবীরের বুকের ভেতরটা তেতে উঠল। মনে সে এক চোট গালি দিয়ে ভাবল, ‘কুত্তার লেজ যে বারো বছরেও সোজা হয় না, তা আজ আবার প্রমাণ হলো।’ তবুও বাইরে বিরক্তির আড়াল টেনে সে শ্লেষের সুরে বলল, “নিজের বউ তুই সামলাতে পারিস না, তার দায় কি আমার? আমার কাছে ফোন না দিয়ে তোর বউকে ফোন দে না!”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠে এবার ফুটে উঠল একরাশ অসহায় আর জেদি ক্ষোভ। সে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে জবাব দিল, “তোর ওই স্টুপিড বোন আমার ফোন ধরছে না? ধরলে কোন দুঃখে তোর কাছে ফোন দিতাম! আমার বউকে তাড়াতাড়ি পাঠা, তোর সাথে বকবক করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই আমার।”
ফোনটা ধরে রেখেও শাহাবীরের কাটতে ইচ্ছে করছিল না। কত বছর পর প্রাণের বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছে! পুরনো স্মৃতিগুলো হঠাৎ করেই যেন ভিড় করে এল। তবু রিদির কথা ভেবে শাহাবীরের রাগটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তেতে উঠে সে চিৎকার করে উঠল, “অন্যের বউয়ের চোখ পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজের বউয়ের হাতে কট খাচ্ছিস—সেম অন ইউ, ব্রো! তোর জন্য মায়া হয় ঠিকই, কিন্তু এর বেশি উপকার করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি ঘুমাচ্ছি, তুই বরং বাড়িতে গিয়ে ঘুমা!”

ওপাশ থেকে সৌহার্দ্য যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠল। রাগে গজগজ করতে সে বলল, “বাজে কথা বলবি না তো! আমার বউ ছাড়া এক মুহূর্ত ঘুম হয় না। আর সত্যি বলতে, এখন বউকে চুমু না খেলে আমার শান্তি নেই, চুমুর ক্রেভিং হচ্ছে! হয় ওকে পাঠা, না হয় দরজা খোল!”
এমন নির্লজ্জ কথা শুনে শাহাবীর খুক খুক করে কাশতে শুরু করল। সৌহার্দ্য বন্ধু হলেও রিদি তো ওর বোন। রাগে-বিরক্তিতে ফেটে পড়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, “নির্লজ্জ বেয়াদব! ফোন রাখ। দরজা খোলা আছে, তোর বউকে নিয়ে জলদি আমার বাড়ি থেকে বিদায় হ!”
সৌহার্দ্যের ঠোঁটে তখন এক চিলতে বাঁকা হাসি। সে শান্ত গলায় খোঁচা দিয়ে বলল, “একটা মাত্র বোন তোর, তার জামাইকে দুই দিন মেহমানদারি করতে পারবি না? এত আগে থেকেই বিদায় দিচ্ছিস কেন? কী ব্যাপার, বীর সাহেব? পকেটে কি টান পড়েছে?”

‘বীর’ ডাকনামটা কানে আসতেই শাহাবীরের বুকটা অজানা এক আবেগে কেঁপে উঠল। কতদিন পর বন্ধুর মুখে নিজের এই আদুরে ডাকনামটা শুনল সে! মুহূর্তের জন্য শাহাবীরের চোখজোড়া বুজে এল, বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “বাজে বকা বন্ধ কর। থাকতে চাইলে থাক, না হলে দূর হ এখান থেকে!” বলেই সে ফোনটা কেটে দিল।
ওদিকে ফোনটা কাটতেই সৌহার্দ্য চোখ বুজে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল। বুকের ভেতরটায় কেমন যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলল শিকদার বাড়ির অন্দরমহলের দিকে।
রিদির রুমে ঢুকতেই সৌহার্দ্য দেখল, তার বউ গাল দুটো একদম ফটকা মাছের মতো ফুলিয়ে বসে আছে। যেন তার আসার অপেক্ষায়ই পথ চেয়ে বসে ছিল মেয়েটা! সৌহার্দ্য কোনো দ্বিধা না করেই গিয়ে ঠাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

রিদি রাগী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই সৌহার্দ্য যেন আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত দুটো উপরে তুলে দিল। মুখে এক চিলতে দুষ্টুমি হাসি ফুটিয়ে সে বলল, “এভাবে রিনা খানের মতো তাকিয়ে আছ কেন? খেতে চাও আমাকে? ওকে, ইউ ক্যান টেস্ট মি ইফ ইউ ওয়ান্ট। আই উডন্ট মাইন্ড অ্যাট অল।”
সৌহার্দ্যের এই রসিকতায় রিদির শরীর রাগে যেন আরও জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে কঠোর স্বরে বলল, “কেন এসেছেন আপনি? যান এখান থেকে!”
রিদির এই প্রত্যাখ্যান সৌহার্দ্যের ভালো লাগল না। সে ভ্রু কুঁচকে, কণ্ঠে কিছুটা গভীরতা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বিশ্বাস করো না?”
রিদি কোনো রকম আবেগ ছাড়াই নিরস কণ্ঠে ছোট করে বলল, “হুম, করি।”
সৌহার্দ্যের বিরক্তি আর অভিমান যেন এবার বাঁধ মানল না। সে উঠে বসে রিদির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “তাহলে এভাবে এখনে চলে আসার কারণ? আমার ফোন না রিসিভ করার করন? রাগ দেখানোর কারন? আনসার মি?”

রিদি এবার আগুনের মতো রাগী দৃষ্টিতে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “আপনার কি মনে হয় না, আমার রাগ দেখানো জায়েজ আছে? আমার চলে আসার কারণ আমি আপনার কাছে এক্সপ্লেইন চাই? আমি বাচ্চা না ডাক্তার সাহেব, আমার যথেষ্ট বোঝার বয়স হয়েছে! আমি খুব বুঝতে পারছি আমাদের কেউ আলাদা করতে চাচ্ছে, কিন্তু গতবার আমি আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার পরও আপনি সব জেনেও আমার কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে চাননি। এমনকি আমি ছেড়ে যাওয়ার কারণটা পর্যন্ত জানতে চাননি কেন? আমি যদি ফারিস…”

রিদির কথার মাঝপথেই সৌহার্দ্যের চোখেমুখে আগুনের হলকা দেখা দিল। এতক্ষণ সে মনোযোগ দিয়ে বউয়ের সব অভিযোগ শুনছিল, কিন্তু ‘ফারিস’-এর নামটা কানে যেতেই তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সৌহার্দ্য রিদির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলল, “আমার নাম ছাড়া তোমার মুখে কোনো পরপুরুষের নাম শুনতে চাই না, ক্লিয়ার? এবার কন্টিনিউ করতে পারো, মাই প্যারট?”
সৌহার্দ্যের এমন রাম ধমকে রিদি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কী বলতে চেয়েছিল তা যেন নিমেষেই ভুলে গেল সে, তাল গোল পাকিয়ে ফেলল মেয়েটা। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে রিদি আবারও বলল, “আজও কত সুন্দর করে আপনার মতো একজনকে সাজিয়ে আমাকে বোকা বানাতে চাইল! আপনার থেকে আলাদা করতে চাইল! ভাগ্যিস আমি গতবারের ধাক্কায় এবার বুঝে নিয়েছিলাম, না হলে কী হতো? বুঝতে পারছেন আপনি? তবুও বলবেন না, এগুলোর কারণ কী? আমাকে এক্সপ্লেইন না করলে আমি এখান থেকে এক পা-ও দেব না!” আমি জানি আপনি সব জানেন?

সৌহার্দ্য রিদির কথাকে পাত্তা না দিয়ে বিরক্তির চরম সীমায় গিয়ে বলল, “না হলে গাধার ডিম হতো, ইডিয়ট! তোমার যতদিন ইচ্ছা থাকো, বাট আমি কোনো এক্সপ্লেইন করতে পারব না! তুমি এমনিতে স্টুপিড, আর আজকে যেটা দেখছো ওটা আমিই ছিলাম। এটা কি বাংলা সিনেমা পেয়েছো, যে আমার মতো কাউকে সাজিয়ে দেবে?” তোমার মাথায় আদো কিছু আছে? নাকি আকরাম খান পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে পারেনি বলে এই অবস্থা? তোমার বাবার তো টাকার অভাব ছিলনা তবুও এত কৃপণতা করলো কেন? আমার জীবনের বারোটা বাজানের জন্য?

সৌহার্দ্যের কথা শুনে রিদি যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। চমকে তাকালো সৌহার্দ্যের দিকে; সে তো ভেবেছিল, মেসেজটা যে পাঠিয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই কারো সাজানো কোনো চাল! রিদি অতিরিক্ত রাগ, বিরক্তি আর টেনশন নিয়ে শিকদার বাড়ি চলে এলেও, ঠান্ডা মাথায় সবকিছু ভেবে আগের ও পরের কাহিনী মিলিয়ে নিচ্ছিল। সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, এখানে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে—যার পুরোটা জুড়ে সে আর সৌহার্দ্য। তাদের আলাদা করাই মূল লক্ষ্য। যদি তাই না হবে, তবে সৌহার্দ্যের ওই ভিডিওই বা কেন করল? আর আজকেই বা এমন করার মানে কী?

​সব মিলিয়ে রিদির মনে হচ্ছিল, সৌহার্দ্য আসলে সবকিছুই জানে। সে এতদিন বুঝে গেছে যে, ওকে বাড়িতে না পেলে সৌহার্দ্য ঠিকই এখানে আসবে। কিন্তু ওই বাড়িতে রাগ দেখালেও সৌহার্দ্যর মুখ থেকে কথা বের করা সম্ভব হতো না, ওখানে সৌহার্দ্য ওর রাগকে পাত্তাই দিতো না, এই লোককে তো তার কম চেনা হয়নি এই কয়েক মাসে? তাই সে মনস্থির করেছিল, এখানেই সৌহার্দ্যের কাছে সব কৈফিয়ত চাইবে; যতক্ষন না সব তাকে বলবে ততক্ষন এই বাড়িতেই থাকবে। কিন্তু এখন সৌহার্দ্য নিজেই যখন বলছে হাসপাতালে যা সে দেখেছে তা ভুল ছিল না, তখন রিদির ভেতরটা রাগে আর অভিমানে যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। চোখে জল চিকচিক করে উঠলেও সে তা আপ্রাণ চেষ্টায় আটকে রেখে, তীব্র আর্তনাদ মিশিয়ে গর্জে উঠে বলল, “তাহলে আমি আপনাকে বিশ্বাস করে ভুল করলাম? আপনি…”
রিদি আর কিছু বলতে পারল না, তার আগেই সৌহার্দ্য বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, “স্টুপিড মহিলা! ওটা ডাঃ সিরাত ছিল, আমার মেডিকেল কলেজের সিনিয়র আপু। আমি ওনাকে বড় বোনের মত সম্মান করি; তোমার মনে আছে, আমি দেশে আসার সাত দিন পর বাড়ি যাওয়া নিয়ে বাবার সাথে আমার ঝামেলার কথা?”

রিদি আলতো করে উপরে-নিচে মাথা দোলাল—মানে, হ্যাঁ, তার মনে আছে।
সৌহার্দ্য এবার বেশ গমগমে স্বরে বলতে লাগল, “দেশে আসার দিনই আমার একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল। তখন ওনার হাসবেন্ড আমাকে বাঁচিয়েছে, আর ওই সাত দিন আমি ওদের বাড়িতেই ছিলাম, সুস্থ হওয়া পর্যন্ত!”
রিদি পুরো কথা শোনার মতো ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। বিরক্তি আর রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সে তেতে উঠে বলল, “আরে ভাই, এসব হিস্ট্রি রেখে চু…”
রিদি কথা শেষ করার আগেই সৌহার্দ্যের রাগী দৃষ্টি দেখে থমকে গেল। সৌহার্দ্য রাগে ফেটে পড়ছে—কত বড় বেয়াদব এই মেয়ে! তাকে কিনা শেষ পর্যন্ত ‘ভাই’ বানিয়ে দিচ্ছে? সে এত দিন ভাবত এই মেয়ে আধ পাগল, এখন দেখছে পুরো পাগল, সৌহার্দ্য দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তির স্বরে বলল, “এখনও বাসর পর্যন্ত করতে পারলাম না, তার আগেই তুমি আমাকে ভাই বানিয়ে দিচ্ছ? স্টুপিড মহিলা! ওটা চুমু ছিল না, ওনার চোখে কিছু পড়েছিল, আমি সেটা বের করছিলাম! যেহেতু ওনার দিকে ঝুঁকে ছিলাম, ব্যাপারটা দূর থেকে নেগেটিভ লাগা স্বাভাবিক। আর ওনি আমার সিনিয়র, স্টুপিড ওনার বেবি অলরেডি ক্লাস থার্টিন ইয়ার্স !”
সৌহার্দ্য রাগে অগ্নিশর্মা নিজের মনে বিরবির করে বলল, এটাকে কাজে লাগিয়েছে ইডিয়ট তাজওয়ানের বাচ্চা! কুত্তার বাচ্চাকে জ্যান্ত ফুতে ফেলবো;

আসলে সুজনের কাছে রিদির কেঁদে বাড়ি ফেরার কথা শোনার পরই সৌহার্দ্য হাসপাতালের সিসি ফুটেজ চেক করেছিল। সেখানে রিদির পাশাপাশি দূরে একপাশে তাজওয়ানকেও দেখা গিয়েছিল। সৌহার্দ্য যখন ডাঃ সিরাতের কাছাকাছি ছিল, তখন দূর থেকে দৃশ্যটি যে কারও কাছেই আপত্তিকর মনে হওয়া স্বাভাবিক ছিল। তাজওয়ানও সেই সুযোগটাই হাতছাড়া করেনি।
রিদি সৌহার্দ্যের এসব কথায় তেমন পাত্তা না দিয়ে জেদের সুরে বলল, “তাহলে লিপস্টিক কোথা থেকে…”
কথা শেষ হতেই সৌহার্দ্যের শরীর রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। এই মেয়ে তাকে এত বড় একটা সন্দেহ করছে? সৌহার্দ্য এক ঝটকায় রিদির মুখটা নিজের ঘাড়ের কাছে এনে বলল, “স্টুপিড মহিলা, শুঁকে দেখ! রক্তকে লিপস্টিক বানিয়ে দিয়েছিস? এই মাথা নিয়ে ডাক্তারি পড়তে কে বলেছে তোকে? তখন আমি মাত্র অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েছি, বোকা মহিলা! এখনো নিজের বউয়ের লিপস্টিকের দাগই ঠিকমতো লাগাতে পারলাম না, অন্য মহিলার লিপস্টিক কীভাবে লাগবে?”
রিদি বিরক্তি ও লজ্জায় নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “সে যাই হোক, আপনাকে ফাঁসাতে চাইছে সেটা তো মিথ্যা না! আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করতে চাচ্ছে সেটাও মিথ্যা না। আর আপনি তো এসব জানেন! আমাকে এক্সপ্লেইন করতে হবে, এসব কেন হচ্ছে?” আমি সব জানতে চাই!

সৌহার্দ্য আর কোনো কথা বাড়াল না। এই মাথা মোটা মেয়ের সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই,, মুহূর্তের ব্যবধানে সে তার দীর্ঘদেহী অবয়ব নিয়ে রিদির দিকে ঝুঁকে এল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৌহার্দ্য তাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের শরীরের ভার রিদির ওপর ন্যস্ত করে তাকে বন্দি করে ফেলল। দুজনের মাঝে এখন আর কোনো দূরত্ব নেই, শুধু উষ্ণ নিশ্বাসের আনাগোনা।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪০

সৌহার্দ্য রিদির মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে এল; তার চোখের গভীর চাহনিতে তখন এক অদ্ভুত অধিকারবোধ আর ভালোবাসার তীব্রতা। রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিচু স্বরে, অনেকটা ফিসফিস করে বলল, “এখন ওসব এক্সপ্লেনেশন দেওয়ার মুড নাই বেবি। আমি তোমাকে এখন ‘বেবি কীভাবে আনে’—তার হাতে-কলমে এক্সপ্লেনেশন দেব। লেটস গো, সুইটহার্ট!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here