অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৪
Maha Aarat
দুপুরের লম্বা ঘুম শেষে শাওয়ার নিয়ে খাবার টেবিলে আসছেন মাহের।ক্ষিদেয় পেটের ভেতর সূঁচ ফোটাচ্ছে।টেবিলে এসে সাজানো আইটেমগুলোতে চোখ বুলিয়ে লম্বা শ্বাসে ঘ্রাণ শুঁকে বললেন, ‘এতো সুঘ্রাণ কোনটা থেকে আসছে?’
হাফসা ইশারায় দেখালো, ‘চিংড়ি মাছের ঝোল।’
মাহের প্লেটে খাবার তুলতে তুলতে বললেন, ‘ওটাই দাও আগে।’
হাফসাও সেটা এগিয়ে দিলো।মাহের সেটা সার্ভ করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি খেয়েছো?’
হাফসা না বোধক মাথা নাড়ালো।মাহের আর প্রশ্ন ইকরার প্রয়োজন মনে করলেন না কারন ঘরে আরও একজন আছে।সেটা তাদের বিষয়।
‘আপু আমি খেয়ে শাওয়ার নিবো কেমন?খাবারের স্মেলে আমার খিদে বেড়ে গেছে।এখন খেতে না পারলে পেটের সব যন্ত্রপাতি অনশন করে বসবে আমি….
মাহের খাবারটা মুখে তুলেছেন কেবল অমনি আইরা বেখেয়ালে ড্রয়িং এ পা রাখলো।তাঁর হাতে টাওয়াল,অন্যহাতে স্যুপ অয়েল।পেছনে কারো উপস্থিতি বুঝলেও মাহের তাকালেন না।এক্সিডেন্টকে দৃষ্টিগোচর হতেই আইরা তৎক্ষনাৎ পালালো।
আইরার অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে মাহের মুখের খাবারটুকু পানি দিয়ে কোনোমতে গিলে হাফসার দিকে তাকালেন।সে প্লেট হাতে আইরার খাবার নিতে ব্যস্ত।
মাহের স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চিংড়ি টা টেস্ট করেছো?’
হাফসা ইশারায় বুঝালো, আইরা করতে দেয় নি।
মাহের ভ্রু কুঁচকে তাকালে হাফসা বিশদভাবে বুঝালো, ‘চিংড়ি টা আইরা রান্না করেছে।মুখে তুলেই অমৃতের স্বাদ পাবো বলে রান্নার পর টেস্ট করতে দেয়নি।’
মাহের দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললেন, ‘খাবারের সাথে আইটেম মিক্স করো না।আলাদা করে নাও।’
বলে তিনি খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
আইরা খাবার মুখে তুলেই ওয়াক করে ফেলে দেয়।হাফসার দিকে তাকাতে দেখলো, আপু চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছেন।
আইরা অবাক হলো ভীষণ।কৌতূহলবশত আপুর থেকে এক লোকমা খাবার তুলে দেখলো সেই বিচ্ছিরি স্বাদ।লবণের পট একদম ঢেলে দেওয়া হয়েছে এমন।আইরা আহত হলো।
মলিনসুরে বলল, ‘আপনি কীভাবে খেয়েছেন এত বাজে টেস্ট নিয়ে?’
হাফসা তাকে আশ্বস্ত করে ইশারায় বুঝালো, শুধু লবণ টা খানিক বেশী হয়েছে।নয়তো দারুন হয়েছে।’
আইরা হাফসার থেকে প্লেট সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘আমি বাচ্চা নই আপু যে আপনি আমাকে স্বান্তনা দিবেন।এতো এতো লাফাচ্ছিলাম রান্না করার জন্য অথচ লবন দেওয়ার সময় একবারও আপনাকে জিজ্ঞেস করিনি।ঠিক এইসব কারনে আমি আম্মুর হাতের গালি খাই।বারেবারে শাস্তি পেয়েও আমার শায়েস্তা হয় না।’
হাফসা আইরার গাল টেনে আদূরে ভঙ্গিতে বুঝালো, ‘মন খারাপ করো না।পরেরবার থেকে ভালো পারবে।’
‘আপনার ভাইয়াকে এটা দেননি তো তাই না?’
হাফসা অসহায় দৃষ্টিতে তাকাতেই আইরার চোখ বড় বড় হয়ে এলো।হাফসাকে লাগাতার জিজ্ঞেস করতেই বলল,
‘আমি তো টেবিলে সার্ভ করে রেখেছিলাম।স্মেল শুঁকে ভাইয়া নিজেই টেস্ট করেছেন।’
‘বমি করে ফেলে দিয়েছেন নিশ্চয়ই।’
‘উহু।’
‘তাহলে?’
‘খেয়ে নিয়েছেন।ভাইয়া খাবার অপচয় করেন না।’
আইরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লো।এক্সিডেন্টের আজকে পেট খারাপ হবে নিশ্চয়ই।আর?তাকে কী ভাববেন?ছিহহহ!লাইফের ফার্স্ট কুরুচিপূর্ণ খাবার হয়তো আজকেই গলাধঃকরণ করেছেন।
পরের দিন~
মসজিদ থেকে আগত ফজরের সুমধুর ধ্বনি কানে আসতে আড়মোড়া ভেঙে উঠতে নিলেই হাফসা অনুভব করে কোনোকিছুর সাথে আটকানো সে।চোখ খুলতে দেখলো আইরা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমুচ্ছে।হাফসা মুচকি হেসে তাকে ছাড়িয়ে উঠলো।কথায় কথায় বলছিলো,সে এখনো তাঁর আম্মুর সাথে ঘুমায়।আম্মুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে তাঁর ঘুম আসে না।
হালকা শীত শীত ভাব।আবহাওয়া একেবারে শীতল।বেলকনির স্লাইড ডোর খুলে হেঁটে আসলো হাফসা।চারিদিকে ঘোর অন্ধকার।অযু করে এসে আইরাকে ডাকতেই দেরি করলো না সে।একসাথে দূজন সালাতে দাড়িয়ে গেলো।
মোনাজাত শেষে আইরা কুরআন নিয়ে বেলকনিতে চলে গেলো।হাফসা জায়নামাজে বসেই অপেক্ষা করছিলো সূর্য উঠার।তাহমিদ তাহলীল শেষে এশরাক পড়েই উঠা তাঁর অভ্যেস।
তাঁর মন যিকিরে সিক্ত।প্রতিটা শব্দ যেনো নি:শব্দে হৃদয়ে প্রশান্তির ফোয়ারা বইয়ে দিচ্ছে।আনমনে চোখ যায় হাতে।শুভ্র হাতে মাঝারি সাইজের ঘন বালা চিকচিক করছে।হাফসাকে খালি হাতে বরণ করতে নারাজ ভদ্রমহিলা।তাই নিজের হাতের বালা খুলে পরিয়ে দিয়েছিলেন।হাফসার হঠাৎ মনে হলো,এখন সে বিবাহিত।বিষয়টা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলো সে।ভুলে গিয়েছিলো গতকালকের বীভৎস রাত-দিন।তাঁর জীবনে ধেঁয়ে আসা ঘন অন্ধকার অমানিশা ভেদ করে এক টুকরো আলো ফুটার দৃশ্য।একদম নব দিন, যে দিন তাকে অতীত ভুলিয়ে দিতে বাধ্য করছে।
দূপুরবেলা হাফসা কেবল শাওয়ার নিয়ে ফিরছিলো। করিডোর পেরোতে গেলে সিটিংরুম এর সাইড দিয়ে পেরোতে হয়।ছাদের উদ্দেশ্যে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াবে অমনি শ্রবনে আসে কোনো পুরুষের কন্ঠস্বর।দরজার একটু ফাঁক দিয়ে তাঁর পেছনদিকে দেখা যাচ্ছে।কালো শার্টে,টুপি মাথার পুরুষটা কে চিনতে পারলো না হাফসা।সেদিকে কর্ণপাত না করেই নিকাবে মুখ ঢেকে ছাদে গেলো সে।কাপড় শুকাতে দিয়ে ফিরে আসার সময় উঠোনে গাড়ি দেখতেই বিষয়টা আন্দাজ করতে পারে সে।কোনো এক অজানা কারনে তাঁর পুরো শরীর হিম হয়ে যায়।হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি ধুকপুকানি শব্দ বাড়তে থাকে।এই লোকটার সামনাসামনি কি, ধরা ছোঁয়ার নাগালের বাইরে থাকতে হবে।লোকটা সামনাসামনি হলে সে স্বাভাবিক থাকতে পারে না।মনে হয়,এই সে মারা পড়বে জড়তায়।যেমন আক্বদের দিনে লোকটার এক পলক গাঢ় দৃষ্টি এখনো তাঁর চোখের পর্দায় আটকে আছে।রাতে ঘুমোতে গেলেই সেই দৃশ্য সামনে ভাসে।এমনকি তাদের শেষবার যখন কথা হয়েছিলো সেটাও হয়েছিলো আড়াল থেকেই।ধর্মীয় শরীয়ত মোতাবেক,হাফসা এখন আরহামের স্ত্রী।তবুও তিনি হাফসাকে নিজ চক্ষে প্রত্যক্ষ করেননি।এ পর্যন্ত তাঁর চেহারা ঢাকা ছিলো নিকাবে।
নিশাচর পায়ে চুপিচুপি রুমে ফিরতেই দেখে আইরা বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে বেশ ক’খান শাড়ি।
হাফসা ভাবুক হয়ে জানতে চাইলো, ‘শাড়ি কেন?’
সে হাফসাকে টান দিয়ে লং মিররের সামনে দাঁড় করিয়ে হাফসার গায়ে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে চতুর চোখে তাকিয়ে বলল, ‘নাহ এটায় কম মানাচ্ছে।’
হাফসার প্রশ্নের কোনোরুপ জবাব না দিয়েই সে একের পর এক শাড়ি তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেখছে কিন্তু কোনোটাই তাঁর মন:পূত হচ্ছে না।
অবশেষে কমলা রঙের একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়েই সে স্বস্তির হাসলো।এতক্ষণে হাফসার প্রশ্নের উপর দিয়ে সে অভিজ্ঞ গলায় বলল, ‘ভাইয়ার সামনে প্রথমবার যাবে তুমি।একদম ‘টুকটুকে বউ’ এর লুক চাই।’
হাফসার চক্ষু চড়কগাছ।সে তৎক্ষনাৎ শাড়িখানা কাবার্ডে ডুকিয়ে তালা দিয়েই বুঝালো, সে কারো সামনে যেতে পারবে না।
‘কেন কেন?’
হাফসাকে নতমুখে নিরুত্তর দেখে আইরা হেসে বলল, ‘ইসস আর লজ্জ্বা পেতে হবে না।এখন মিট করা বৈধ আছে।বুঝলেন?’
হাফসা মাথা নেড়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো।
আইরা একরোখা কন্ঠে বলল, ‘উহু ভাবিপু এরকম বললে হবে না।জানেন আমার ভাই ব্ল্যাক শার্ট পড়ে আসছেন।আমিও চাইছিলাম আপনি ব্ল্যাক শাড়ি পড়ুন।কিন্তু প্রথমবার মিটে ব্ল্যাক শাড়ি পানসে হয়ে যায়।তাই কমলা রঙের শাড়িতে আপনাকে টুকটুকে বউ সাজিয়ে ভাইয়ার সামনে হাজির করবো।
কিন্তু ভাইয়া ব্ল্যাক শার্ট কেন পড়লেন?আজকে অন্তত উনার কমলা রঙের একটা শার্ট পড়ে আসা উচিত ছিলো।’
‘আন্টি ভালো আছেন?’
‘আলহামদুলিল্লাহ।’
মাহের ফুড কাস্টার এর বাটিটা আরহামের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে খাচ্ছ না কেন?খাও।’
‘খেয়েছি।’
‘এত কম খেলে চলবে না।তুমি এখন আমাদের ঘরের জামাই হোও।আমার দাদূ বলতেন, ঘরের জামাইদের ছাগলের গোশত আর গরুর কলিজা বোনা না খাইয়ে ফিরতি না পাঠাতে।’
আরহাম শুধু সৌজন্যমূলক হাসলেন।
মাহের আরহামের চোখেমুখে লজ্জ্বার আভা দেখে তাকে ক্ষেপাতে আরেকটু সিরিয়াস ভাব নিয়ে বললেন, ‘ওহো আরহাম কেনো খাচ্ছো না?এই খাবারগুলো তোমাকেই শেষ করতে হবে।আই রিপিট, তুমি এখন আর এমনি এমনি গেস্ট নও।আমার একমাএ সমন্ধিক,এ ঘরের একমাত্র জামাই।’
আরহাম তাকে সর্তক করে ধীরসুরে বললেন, ‘আর রিপিট করো না।’
মাহের হেসে বললেন, ‘কেনো?তুমি কি লজ্জ্বা পাচ্ছো?’
আরহাম সাইনেস গোপন রেখে মাহেরের উদ্দেশ্যে সিরিয়াস হয়ে বলার চেষ্টা করলেন, ‘অস্বস্তি লাগছে।বারবার বলো না দয়া করে।আমার সাথে রিভেন্জের কোনো সুযোগ ছাড়ছো না।তুমি একটাবার নিকাহ করো শুধু।তোমার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তোমার নাস্তানাবুদ অবস্থা করে ছাড়বো।’
মাহের হাসলেন।উঠতে উঠতে বললেন, ‘বেচারা জামাই লজ্জ্বা পাচ্ছে।আচ্ছা হাফসার সাথে দেখা করে আসো।আমি ওকে গেস্টরুমে পাঠাচ্ছি।তারপর লাঞ্চ করবো।ওদিকে সব রেডি।’
আরহাম মাহেরের এ প্রস্তাব একবাক্যে অগ্রাহ্য করে বললেন, ‘উহু।কোনো প্রয়োজন নেই।আইরা রেডি হলে আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে সন্ধ্যের আগে।’
মাহের গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আজকে তুমি ফিরবে ভাবছো?এসব চিন্তা ঝেড়ে দাও।’
‘মানে?’
‘প্রথমবার জামাই এসেছে বাসায়।একদিন তো থেকে যেতে হবে।’
আরহাম তাকে শাসানোর সুরে বললেন, ‘বলেছো তো আর কত।সুযোগ আমারও আসবে।
তবে আর কোনো বায়না না। আমাকে সত্যি ফিরতে হবে।আম্মু টেনশন করবেন।’
‘ছেলে শ্বশুরবাড়ি আসলে মায়েরা টেনশন করে?’
‘উহু আইরাকে নিয়ে যাবো তো তাই।”
‘দেখা যাবে।আচ্ছা গেস্টরুমে আসো তো।’
আরহাম এক চুল ও নড়লেন না।বরং সোফায় আটসাট হয়ে বসে জবাব দিলেন, ‘উহু।এটা ঠিক নয়।প্রয়োজন নেই।’
‘কি ঠিক নয়?’
‘মাহের এমন করো না।’
‘আরহাম তুমি নার্ভাস ফিল করছো কেন?তোমরা দূজন দেখা করতেই পারো এটা স্বাভাবিক।’
‘অনুষ্ঠান হোক আগে।’
মাহের খানিক চুপ থেকে বললেন, ‘বুঝেছি।তবে চলো লাঞ্চ করে নিই।’
পাশাপাশি বসেছে দূজন।হাফসার দৃষ্টি নত।আরহামও বেশ ইতস্ততবোধ করছেন।মাহেরের প্রতি রাগ হচ্ছে।কি করলো ছেলেটা।লাঞ্চ শেষে ❝তুমি সামনের রুমে যাও আমি আসছি❞ বলেই আরহামকে পাঠিয়ে সে উদাও।এদিকে রুমে এসে হাফসাকে দেখে আরহাম ইগনোর করতেও পারলেন না তবে এটা বুঝা হয়ে গেছে এটা মাহেরের প্রি প্ল্যান।
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৩
মেয়েদের মতো এতো লাজুক না হয়েও এখানে আরহামের সাইনেস কমছেই না।তিনি মেয়েটার দিকে একবার চোখ তুলে তাকাতেও পারছেন না।কি কারনে পারছেন না সেটা উনার নিজেরও অজানা।অথচ পেরিয়েছে মিনিট দশেক।আরহামের পক্ষ থেকে কথা শুরু করা প্রয়োজন।অথচ উনি বলার মতো কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছেন না।সত্যি বলতে উনার অস্বস্তি হচ্ছে।জড়তা ঘিরে ধরেছে।গলা শুকিয়ে যেনো মরুভূমি।আরহাম ওতো দ্বিধাদ্বন্দে না ভোগে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, ‘আপনার মনে হয় একটু পানি খাওয়া প্রয়োজন।’
বলেই নিজেকে ধিক্কার দিলেন তিনি।মাথাটা এভাবে গেছে?সাথে সাথে শুধরে নিয়ে বললেন, ‘আমার একটু পানি খাওয়া প্রয়োজন।’
