Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৭

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৭
Maha Aarat

আরহাম বরের গাড়ি থেকে নামতেই মাহের এসে মুআ’নাকা করলেন।সবার আড়ালে আরহাম তাকে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘বর তো আমাকে নয় তোমাকে লাগছে।’
‘এটাও একটা রিভেঞ্জ ভাবো।তোমার হেয়াইট কালার পছন্দ তাই হোয়াইট দেওয়া হয়েছে।তাই বলে আমি আদারস কালার পড়বো না?’
‘পড়বে সঠিক সময়ে।সিঙ্গেল স্ট্যাটাসে লুকটা মানাচ্ছে না।’
‘আরে একমাত্র বোনের বিয়ে।একটু ব্যতিক্রম লুক নিবো না?’
আরহাম কেবল মুচকি হাসলেন।

হালকা সাজের বধূ বেশের রূপ তাঁর।আম্মু ঘরে প্রবেশ করেই চমৎকার হাসলেন টুকটুকে লাল বউকে দেখে।নিজ হাতে অলংকারে মুড়িয়ে দিলেন তাঁর দেহ।রাজকীয় সাজে সে যেনো কোনো অজ্ঞাত রাণী।সত্যিই তো সে রাণীই,রাজার হৃদয়ের দ্বিতীয় রাণী।
বাড়িতে এসেই প্রস্ততি নেওয়া হলো যোহরের সালাতের।মসজিদ একেবারে পাশেই থাকায় মসজিদের উদ্দেশ্যে এগোলেন পুরুষরা।নামাজ পড়বেন বলে আরহাম পাগড়ি খুলে টুপি পড়লেন।মাহের ঠিকই তার মাথায় আবার পাগড়ি বসিয়ে দিলেন।আরহাম পুনরায় খুললেন মাহের আবার পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বর বরের মতো থাকো।হোয়াইট কালার শেরওয়ানিতে তোমাকে বর বুঝাই যাচ্ছে না।দেখো,তোমার চেয়ে তোমার আঙ্কেলের লুকটাও গর্জিয়াস।’
আরহাম অসহায় মুখ করে বললেন, ‘তুমি এতো জ্বালাবে জানলে আমি বিয়ের গর্জিয়াস শেরওয়ানিই পড়ে আসতাম।’
‘ভুল করেছো,সাফার করো।’

বরযাত্রীবযতক্ষণে নামাজ থেকে এসে পৌঁছলেন বাড়ি জুড়ে আলাদা এক আমেজ।একপাশে ছোটাছুটি করছে এতিমখানা থেকে ছাড়া পাওয়া বাচ্চাদের দল।অন্যপাশে অল্ড হোম থেকে বিশেষ আমন্ত্রণে আনানো মেহমান।ড্রয়িং রুমই পুরুষদের জন্য সীমাবদ্ধ।
বিবাহের সম্পূর্ণ কার্যক্রম তো সেদিনই সম্পন্ন হয়েছে।আজ শুধু আংটি বদল।
হাফসার নিকাবে ঢাকা শরীরের ওপর দূই পাল্লার সোনালি ওরনা জড়ানো।আইরা, আম্মু হাফসার পাশাপাশি বসে আছেন।
রুমে শুধু মাহের আর আরহাম প্রবেশ করলেন।রুমের মধ্যেখানে ফুলের ঝালর দিয়ে দূইপাশে পর্দার ন্যায় আলগা করা।আরহাম রুমে প্রবেশ করে চুপ হয়ে গেলেন।উনার ভেতরটা ধুকধুক করছে।যদিও নিকাহ শেষ।এখন শুধু সাথে নেওয়া বাকি তবুও ভেতরটা কেমন কেমন করছে।
মাহের তাঁর কাঁধে হালকা ধাক্কা দিতেই আরহামের হুষ ফিরে।পর্দা সরিয়ে হাফসার সামনাসামনি এসে দাঁড়িয়ে উসখুস করতে লাগলেন।আম্মু উঠে আরহামের হাতে রিং এর বক্স দিলেও তিনি স্ট্যাচুর ন্যায় তখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে।

আম্মু দ্বিতীয়বার ইশারা দিতেই আরহাম সামনাসামনি এসে বসলেন।দ্বিধা নিয়েই ঝুঁকে হাফসার সোনালি ওরনা সরালেন।এখন অন্তত চোখ দেখা যাচ্ছে।
হাফসা হাত এগিয়ে দিলে আরহাম প্রথমবারের মতো স্পর্শ করতেই তিনি নিজেই যেনো খানিক কেঁপে উঠেন।দূ পক্ষের রিং পড়ানো সম্পূর্ণ হতেই আরহাম স্বহস্তে তাকে দেনমোহর বুঝিয়ে দিলেন।
রুমের বাকি সদস্যরা বেরিয়ে যান।আরহাম এখনো স্বাভাবিক হতে পারছেন না।টুপি খুলে এলোমেলো অবস্থা চুলগুলো আবার ঢেকে নিয়ে জড়তা নিয়ে বলতে লাগলেন, ‘আপনার চোখ বন্ধ করুন।’
হাফসা তখনো নতমুখে।সে চোখ তুলে তাকালো না যখন আরহাম রিং পড়ালেন,বা যখন আরহামকে পড়ানো হলো।উনার হাতের মধ্যমায় আটকে থাকা রিং স্পষ্ট ইশারায় বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছে, এ পুরুষ আগে থেকেই আরেকজনের অধীনস্থ।
‘চোখটা বন্ধ করুন প্লিজ।’
হাফসার সারা শরীরে যেনো শিহরন বয়ে গেলো।এ লোকটা কাছাকাছি থাকলেই তাঁর অস্বস্তি হয়।বুকের ভেতর আটকে থাকা ছোট সাইজের হৃদপিণ্ড টা দ্রীম দ্রীম আওয়াজে কাঁপতে থাকে।
হাফসা চোখ বন্ধ করার কয়েক সেকেন্ড পরেই কপালে কোনো হালকা স্পর্শ পায়।তরাক করে হৃদয়ে বাজ পড়ে তাঁর।পরিস্থিতি বুঝে উঠতে সে যতক্ষণে চোখ খুললো আরহাম এখানের ধারেকাছেও নেই।লোকটার হ্যাংকারচিফ পড়ে রইলো পাশেই।এতোই লজ্জ্বা পাচ্ছিলেন?

আইরা হাফসার রুমে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে খুব সতর্কে চোখে সুরমা লাগাতে ব্যস্ত।শেষ হলেই সে চুপিচুপি গাইছে,
“আমি গয়া গিয়ে মাথায় চুল লাগিয়ে,
আগের বরের নামে এসেছি মামলা দিয়ে
সামনের ভাদ্র মাসে ছাঁদনা তলায় বসে,
English-এ মন্ত্র পড়ে চিন্টুকে করবো বিয়ে।”
এতটুক আওড়ে সে ব্যস্ত দৃষ্টিতে সুরমার ঢাকনা লাগাতে লাগাতে মনে মনে আওড়ালো, ‘আমার চিন্টুটা এতো দেরি করছে কেন?’

বিদায়ের সময় সন্নিকটে।আরহাম এখানে এসে মাহেরকে যেমন একটু খোশমেজাজে দেখেছিলেন সময় গড়াতেই আস্তে আস্তে তাঁর চেহারায় মলিনতা জায়গা করে নিয়েছে।আর মাত্র কিছুক্ষণ!তারপর উনার ছোট্ট পুতুলের বিদায়।
যাওয়ার কথা ছিলো সাড়ে তিনটার দিকে।তবে আরহাম বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘দিন ছোট হয়ে গেছে।আমার বাসাও অনেক দূর।যাবার সময় পাহাড়ি দূর্গম রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয়।যত তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিবো,তত তাড়াতাড়ি পৌঁছাবো।দেরি করাটা ঠিক হবে না।’

আহমাদ আর মাহেরও সম্মতি দিলেন।তাঁর প্রয়োজনীয় লাগেজ নিয়ে গাড়ীতে তোলা হলো।মাহের নিজেকে শক্তপোক্ত করে শেষবারের মতো হাফসার ঘরে গেলেন।অনুমতি নিয়ে ঢুকতেই আইরা বেরিয়ে গেলো চুপচাপ।মাহের দরজা খেলিয়ে হাফসার কাছাকাছি এসে বললেন, ‘অবশেষে তোমার নতুন জীবনে পা রাখছো।আমি জানি,আরহাম কখনোই তোমাকে নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ পাবে না।আমার বোন তো খাঁটি রত্ন।তবুও বলছি,সবার সাথে সুন্দরভাবে চলবে।আর আরেকটা প্রমিস করো, তোমার যদি কক্ষনো মনে হয়,তুমি ভালো থাকতে পারছো না বা আরহামের সাথে তোমার বন্ডিং হচ্ছে না তুমি আমাকে শেয়ার করবে হাফসা।মোটেও কিছু লুকাবে না।মনে করো,তোমার মনের একভাগ আমার কাছে আমানত দিচ্ছো।সুতরাং তোমার মন ভালো রাখার দায়িত্ব তোমার।কখনো সেটা আঘাতপ্রাপ্ত হলে আমাকে দেওয়া আমানত নষ্ট হবে।এভাবে বলছি কারন,তুমি অনেক ধৈর্যশীল।সহজে কিছু বলতে চাও না।’

হাফসা কাঁদলো না।তাঁর চক্ষু ছলছল।চোখের পানিতে যেনো ভাটা পড়েছে।গতরাত টা তাঁর জীবনের প্রথম রাত,যে রাতে তাঁর চোখের অশ্রু একবারের জন্যও বিরাম নেয়নি।
বেশ গুছিয়ে ভাইকে বুঝালো সে খুব তাড়াতাড়ি যেনো তাকে নিয়ে আসে।রেগুলার যেনো তাকে দেখতে যান।আর নিজের যত্ন নিতে কার্পন্য যেনো না করেন।অফিস থেকে ক্লান্ত শরীরে ফিরে পরনের শার্ট যেনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে না রেখে জমা করে লন্ড্রিতে দেন।রাতে বাসায় এসে খাবার গরম পাবে না বলে যেনো না খেয়ে না ঘুমান।পরনের ঘড়ি,টাই বা এপ্রোন হাতের কাছে না পেলে যেনো মাথা গরম না করা হয়।সবকিছু যেনো গুছিয়ে রাখার অভ্যাস করেন।একসাথে জুস বানিয়ে যেনো লো আঁচে নরমালে রেখে যান যেনো ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে কষ্ট করে বানিয়ে খেতে না হয়।মাথার লম্বা চুলগুলো যেনো প্রতিমাসে নিয়ম করে কাটা হয়।খাবারে যেনো অনিয়ম করা না হয়।হাফসা থাকবে না কে থাকে নিয়ম করে এটা সেটা খাবার বানিয়ে দিবে বা প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের কাছে গুছিয়ে রাখবে?

মাহের হালকা হেসে বললেন, ‘আচ্ছা বেশ।সবকিছু ঠিকঠাক করবো।’
শুধু এতটুকুতেই শেষ নয়।সে জোর দিয়ে বুঝালো,খুব তাড়াতাড়ি যেনো ঘরে নতুন মানুষ আনা হয়।ভাইয়ের জন্য না হোক,অন্তত তাঁর জন্য হলেও।
মাহের সবকিছু মাথা নেড়ে মেনে নিলেন।বোনকে কিছুক্ষণ নীরবে বুকে জড়িয়ে ধরে রইলেন।ইসস বুকটা যেনো শূন্যে ভাসছে।এতো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন?
প্রিয়জন থেকে বিদায় নিয়ে হাফসাকে গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হলো।তাড়াতাড়ি যাওয়ার প্রস্ততি হলেও বেলা বেশ পড়তে শুরু করেছে।

কাকামণির সাথে মুআনাকা শেষে আরহাম মাহেরের থেকে বিদায় নিতে আসলেন।বুকে জড়িয়ে ধরতেই অনুভব করলেন, মাহেরের বুকের ক্রমাগত ধুকপুকানি।হুট করেই মাহেরের পেটের ভেতর প্যাকেট করা কান্নাগুলো ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো।মাহের শেষবারের মতো বোনকে হাসিমুখে বিদায় দিয়ে এসে আরহামের কাছে আসলেন।আরহাম একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে।
মাহের আরহামের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে কিছু কথা বলার প্রস্তুতি নিলেন।কিন্তু বলতে গিয়েই উনার চোখফেঁটে অশ্রু গড়িয়েই পড়লো।আরহাম সেটা মুছে দিয়ে বললেন, ‘আরে বোকা কাঁদছো কেন?তোমার বোন তোমার কাছে যখন তখন আসবেন,থাকবেন আমি কি বাঁধা দিব?’
মাহের আড়াল থেকে চোখমুখ মুছে এসে বললেন, ‘আরহাম শুধু একটা কথা বলবো হাফসা অনেক ধৈর্যশীল।ও কখনো কষ্ট পেলে,আঘাত পেলেও কোনোদিন কক্ষনো তোমাকে বুঝতে দিবে না।এটা আমি সিওর করছি।তুমি আমার বোনকে বোঝার চেষ্টা করো।কখনো কষ্ট পাবে এমন আচরণ করো না।কিছু ভুল করলে বুঝিয়ে দিয়ো তবুও কঠিন আচরণ করো না।আর কখনো যদি এমন কোনো ভুল করেও ফেলে যার জন্য তুমি শাস্তি দিতে চাও,সেই শাস্তি আমাকে দিয়ে দিও ওকে দিয়ো না।
মাহেরের চোখের কয়েকফোঁটা জল আরহামের পিঠ বেয়ে পড়ে গেলো।মাহের আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ওর সিকনেস এর জন্য কখনো কিছু বলবে না।ও কষ্ট পাবে।ওর কথা বলতে না পারা নিয়ে কিছু বলার আগে আমার বোন আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়ো।আমার বোন সারাজীবন আমার খেয়ে থাকলেও,কক্ষনো ওকে বোঝা মনে করবো না।এতিম বলে মনে করো না,ওর কেউ নেই।আমি তো আছি,আমার দরজা সারাজীবনের জন্য আমার বোনের জন্য খোলা….

আরহাম তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।বললেন, ‘কি বলছো তুমি মাহের?উনার সামান্য একটা ইস্যু নিয়ে আমার সমস্যা কেন থাকবে?প্রশ্নই আসে না।আমার পক্ষ থেকে কোনো কষ্ট পাবেন না ইন শা আল্লাহ।আমি উনার জন্য এ পৃথিবীর সেরা বিশ্বস্ত বন্ধু হবো আগে,তারপর স্বামী।ভরসা রাখো।দোয়া করো।আর কাল ঘুম থেকে উঠে তোমার বোনের চেহারা দেখার আগে যেনো আমি তোমাকে দেখি।দেরি করো না।’
আরহাম বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠার আগ অব্দি মাহেরকে আশ্বস্ত করলেন।বোনের গাড়ি গাড়ির গেট পেরোনো পর্যন্ত চোখের জল কিছুটা হলেও বাঁধা মানছিলো।আড়াল হতেই চোখ ছাপিয়ে বাঁধ ভাঙ্গা ঢেউয়ের জন্য মাহের নিজেই প্রস্তুত ছিলেন না।

গাড়িতে উঠার পর থেকেই হাফসা মুখচেপে কেঁদেই ভাসাচ্ছে।বরের গাড়িতে শুধু আরহাম আর সে।আম্মু, আইরা অনেকক্ষণ আগেই ফিরে গিয়েছেন।আরহাম টিস্যুর বক্স কোলে নিয়ে বসে আছেন।এ পর্যন্ত অনেকবার বলেছেন, ‘আর কান্না করবেন না প্লিজ আপনি চাইলে কালই আপনাকে আপনার ভাইয়া নিয়ে আসবেন।আজ তো সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।’
হাফসার কাঁপা আরো বাড়ে।কালো পর্দায় ঘেরা তাঁর পুরো শরীর।তাঁর কাঁপার মাএা বাড়তেই আরহাম বুঝলেন মেয়েটার কান্নাও বেড়েছে।আরহাম কি করবেব বুঝে উঠতে পারছেন না।উনার খারাপ লাগছে কান্না কমানোর বদলে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।
আরহাম আর কোনো উপায় না পেয়ে সাহস করে কাছাকাছি এসে বসলেন।নিকাবের ওপরের ভিজে যাওয়া পাতলা পর্দা সরাতেই দেখলেন, লাল ছোট এক চোখজোড়া।দ্বিধা সরিয়ে নিজেই চোখমুখ মুছে দিয়ে কোমল কন্ঠে বললেন, ‘আমি কিছু কথা বলি।কান্না বন্ধ করে শুনুন।’

‘বিয়ে হলেই মেয়েরা পর হয়ে যায় এটা সবাই ভাবে।আসলেই কিছুক্ষেএে।তবে আপনার ভাইয়া বলেছেন, আপনার যখন ইচ্ছে তখন উনার কাছে যেতে।এ নিয়ে আমার বিন্দুমাএ আপত্তি থাকবেন না।আপনার যতদিন ইচ্ছা আপনার বাসায় এসে থাকবেন কোনোদিন আমি এ নিয়ে অবজেকশন দিবো না।আর বিয়ে করলেই যে একদম স্বামীর দাস হয়ে থাকতে হয়,যদি এটা ভেবে থাকেন তবে সম্পূর্ণ ভুল।আপনি না চাইলে আমি আপনার পাশে এসে বসবোও না।বিলিভ মি,আমি জানি আপনি লাজুক আর ভীরু।সো আমার সাথে খুব সহজে ইজিও হতে পারবেন না কথাও বলতে পারবেন না ইটস ওকে।সংসার মানেই নিয়মের বেড়াজাল,দায়িত্ব,আলাদা রুটিন এগুলো কিছুই মেইনটেইন করতে হবে না আমার বাসায়।আপনি অবশ্যই আপনার নিজের বাড়ির মতো থাকবেন।কোনো অস্বস্তি বা জড়তা রাখবেন না বা আমার বোন,আম্মু আর উনিও অমন টাইপ না যে আপনার ইচ্ছেমতো চললে তাঁরা কিছু বলবে।আই সুয়ার,তাঁরা কোনো প্রশ্নও করবে না।আপনি একদম আপনার নিজের মতো থাকবেন।আমি কখনো আপনাকে আপনার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবো না।আই প্রমিস,একটু ভরসা রাখুন।তারপর যদি মনে হয় আমি আপনার মনমতো নই,তাহলে বাকিটা আপনার কথায় হবে।এখন দয়া করে কান্না বন্ধ করুন।আপনার ভাইয়া আপনার চোখ থেকে পড়া প্রতি ফোঁটা চোখের পানির জন্য আমাকে শাস্তি দিবে।’
হাফসা কি বুঝ পেলো আরহামের জানা নেই।তবে এর পর থেকে তাঁর কান্না সে সামলে নিয়েছে।আরহাম গোপনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

বাড়িতে ফিরতে ফিরতে আসরের শেষক্ষণ হলো।গাড়িতেই সালাত আদায় করা হয়েছে।বাড়িতে যতক্ষণে প্রবেশ করলেন,হাফসা ততক্ষণে বাইরের দৃশ্যে মন ডুবিয়ে রেখেছে।
গাড়ি থেকে নামতেই আম্মু এগিয়ে এলেন।সালাম বিনিময় শেষে রুমে গিয়ে বোরকা নিকাব খুলতে সাহায্য করলো আইরা।আরহাম আর আসেননি।
মাগরিবের সালাত আদায় করে আম্মু ঘরে এসে দেখলেন তাঁর চোখেমুখে ক্লান্তি ভর করেছে।হাফসার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার মধ্যেই আরহাম আসলেন।হাফসার মুখে নিকাব নেই।মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে দেখলো, লোকটা আয়নায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।হাফসার অস্বস্তি আরও গাঢ় হলো।আম্মু চলে গেলেন তাঁর জন্য জুস আনতে।আম্মু যেতেই আরহাম তাঁর আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘চেইন্জ করে নিতেন।এটা তো ভীষণ ভারী।’
আইরা রুমে আসলো।তাঁর হাতে জুসের গ্লাস।সাথে স্যান্ডউইচ।হাফসাকে খাইয়ে দিতে চাইলে সে বাঁধা দিয়ে বলে,আমি দিচ্ছি তো।
খাবার খাইয়ে সে ফিরে গেলে আরহাম এতক্ষণে চেপে রাখা কথা মুখ ফুটে বলেই ফেললেন, ‘মাশাআল্লাহ।তবে আপনাকে সাধারণ লুকেই পুতুলের মতো লাগে।ফ্রেশ হয়ে নিন।’

ল্যাম্পপোস্টের নিচে হালকা আলোতে চুপচাপ বসে আছে সে।যদিও ক্ষণিকের পরিচয় তবুও মেয়েটার প্রত্যাখান তাকে পোড়াচ্ছে।কি হলো মেনে নিলে।মরীচিকা পিছনে ছুটে কী লাভ।তার চেয়ে বরং একটা সুযোগ দেওয়া যেতো না?
রাত সাড়ে নয়’টার দিকে রায়ানের ফোন আসে।বাবা তাকে হুট করেই এশা’দের বাসায় যেতে বললেন।রায়ান কিছু আন্দাজ করতে পারলেন না।বাবার কথামতো তাড়াতাড়ি পৌঁছলেন সেখানে।ড্রয়িংরুমের পিনপতন নীরবতা মাড়িয়ে নিহাল সাহেব বলে উঠলেন, ‘বিয়ে এ সপ্তাহেই হোক আমি চাই।আমার মেয়েটা একটু জেদী কিন্তু মন ভালো।আপাতত বড় অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই,সেটা পরে দেখা যাবে।আপনাদের কোনো আপত্তি আছে?’
রায়ানের বাবা মিনহাজ মাহমুদ বললেন, ‘আমাদের কোনো সমস্যা নেই।আমরা তো আপনাদের পক্ষের মতামতেরই অপেক্ষায় ছিলাম।’

রায়ান কিছু বলতে চাইলেও তাকে সে সুযোগ দেয়া হলো না।এমনকি ফেরার আগ পর্যন্ত এশার ছায়াটা অব্দিও দেখেননি।সিদ্ধান্ত রইলো,কাল তাঁরা গার্ডিয়ানসহ এসে বিয়ের ডেট ফাইনাল করে যাবেন।
রায়ান সহ উনার বাবা চলে গেলে এশা বাসায় তুলকালাম কান্ড করলো।তাঁর মতামতের কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করেই নিহাল সাহেব উনার শেষ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।একলা ঘরে অন্ধকারে কেবল তাঁর গুঙ্গিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনলেও,মায়ের এক্ষেএে কিছু করার সাহস হলো না।মেয়েটার জন্য মন থেকে দোয়া করে দিলেন তিনি।এই বার যেনো তাঁর দূ:খগুলো ঘুচে যায়।

রাতের ডিনারে আম্মু অল্প খওয়ানোর পরেই হাফসা বাঁধা দিলো।আম্মু ওর টায়ার্ডনেস বুঝে তাকে তাড়াতাড়ি ঘুমোনের আদেশ দিয়ে বললেন,
‘আমি যাচ্ছি।তোমার যদি কিছু প্রয়োজন হয়,আরহামকে বলবে।নাহলে আমাকে বলো কেমন?’
আম্মু উঠার জন্য উদ্ধত হলেন।আম্মুর সাথে হাফসাও তড়িঘড়ি করে উঠলো।এহেন আচরণে আম্মু স্নেহসুলভ হাসি হেসে বললেন, ‘কিছু কি বলবে?’
হাফসা নতমুখে ধীরে ধীরে আম্মুর হাত জড়িয়ে ধরে।ওর এমন আচরণে আরহামের কপালেও ভাঁজপড়ে।তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে আছেন হাফসার দিকে।আম্মুও চমৎকার হেসে প্রত্যুত্তর করলেন, ‘কিছু বলতে চাইলে নির্দিধায় বলো।’

হাফসা প্রস্তত হচ্ছিল কিছু বুঝানোর।তাঁর আগেই আড়চোখে আরহামের সাথে চোখাচোখি হলে আরও ভয় জমা হলো চোখে।আম্মু কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেন ওর ভীত দৃষ্টি।বললেন, ‘আরহামকে কি তুমি ভয় পাচ্ছো?’
হাফসা তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।আম্মু আরহামের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি অমন কঠিন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছো কেন?ও তো ভয় পাবেই।’
আরহাম ভ্যাবাচেকা খেয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন।হাফসা আম্মুর চোখে চোখ রেখে সামনে এগোতে বলল।অথচ আম্মুর হাতজোড়া জাপটে ধরে আছে সে।আম্মু বুঝে ফেললেন ওর ইশারা।জানতে চাইলেন, ‘তুমি আমার সাথে ঘুমাতে চাইছো?’
হাফসা চটপট হ্যাঁ বোধক সম্মতি দিতেই আরহামের ভ্রুজোড়া কুঁচকে আসে।মেয়েটা এত কেন ভয় পাচ্ছে আমাকে?
আম্মু হাফসার মাথায় মমতাময়ী স্পর্শ এঁকে আরহামের উদ্দেশ্য বললেন, ‘আমি বুঝতে পারছি ও ভয় পাচ্ছে।কি করব?’
‘আপনার সাথে নিয়ে যান আম্মু।’
‘ওর ভয় দূর করে ওর সাথে স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন তোমার।তাই দূজন একসাথে থাকা উচিত।’
‘এটা সময়ের ব্যাপার আম্মু।আপনি উনাকে সাথে নিয়ে যান।’
আম্মু আরও কিছু বলতে চাইলেন তার আগেই আরহাম উনাকে বিদায় দিলেন।মা ছেলের বাকবিতন্ডায় গোলগাল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল সে।সেই চোখে ঘুমের তৃষ্ণা বুঝে আরহাম মাকে আর কোনোরূপ প্রশ্নের সুযোগ দিলেন না।

স্নিগ্ধ ভোরের বাতাস।হিম শীতল হাওয়ার সাথে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ যেনো সকালের পরিবেশ টা আরো দারুন করে তুলেছে।শহরের মধ্যখানে থাকলেও বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে আরহামের বাগানবাড়ি।মেইন রোড থেকে বাড়ির দূরত্ব হাঁটলে পনেরো মিনিটের রাস্তা।দোতলার বড় বারান্দা থেকে চোখ রাখলে দেখা যায়,বড় পুকুর,একপাশে বিশাল জায়গা জুড়ে বাগান,অন্যপাশে সবজির ক্ষেত।বড় বড় সুপারি গাছ দাঁড়িয়ে আছে সগর্বে,প্রতিটা কোণায় কোণায় বসানো আছে নারিকেল গাছ।হাফসার সব থেকে যে জিনিসটাতে বেশী চোখ আটকালে সেটা হলো গেটের পাশের মাঝারি আকাররে শিউলি গাছটায়।শিউলি ফুল তাঁর ভীষণ পছন্দের।সবুজ ঘাসে পেখম তুলে যেনো ছড়িয়ে আছে সেগুলো।দূর থেকে তাদের দেখতে লাগছে,শুভ্র কুয়াশার বিন্দুজল।

আম্মু এসে তাকে খুঁজতে গেলে দেখলেন সে বারান্দায়।আইরা এখনো ঘুমাচ্ছে।এখন চেঁচিয়ে ডাকলেও সে উঠবে না তাই হাফসাকে নিয়েই নিচে নামলেন তিনি।
টেবিলে খাবারের আইটেম সাজিয়ে রাখা।আম্মু তাঁর পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘অবাক হচ্ছো নিশ্চয়ই বাসায় মেহমান নেই যে?
হাফসা নিরুত্তর রইলো।এর কারন সে আগেই আন্দাজ করে নিয়েছিলো।খাবার টেবিলে তাঁরা একা নাস্তা করছে অথচ লোকটা নেই?দেরিতে ঘুম ভাঙে নাকি চিন্তা করতে করতে সে খাবারে কামড় বসাচ্ছিলো এমন সময় কলিংবেল বাজে।আম্মু গিয়ে দরজা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলেন, এতো সকাল সকাল চলে আসলে যে?’
আরহাম হাফসার দিকে একপলক তাকিয়ে ধীরসুরে বললেন, ‘খাবার দিন।আমি আসছি।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৬

হাফসা খাবারে ব্যস্ত।কিন্তু তার মনের প্রশ্নটা সে চাপা দিতে পারছেই না।এতো সকাল তিনি কোথা থেকে ফিরলেন? এতো সকালে?একটু আগেই তো ভোরের আলো ফুটলো সবে?
আরহাম রুমে আসতে আসতে মাহেরের ফোনে কল দিয়ে উঠানোমাএই বললেন, ‘এটা ঠিক নয় তোমাকে বারবার কি বলে আসছিলাম মাহের?’
মাহের এখনো ঘুমের ঘোরে।হাই তুলতেই আরহাম কড়া আওয়াজে বললেন, ‘এখনি তৈরী হয়ে আসো।বাহানা করবে না।তোমার বোনের মন খারাপ।’
মাহের দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে ঘুমজড়ানো কন্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আসছি।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৮