অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৪
Maha Aarat
আম্মুর কাছ থেকে আবারো হতাশাজনক উত্তর পেতেই মাহের অসহিষ্ণু হলেন।আমার ওপর তাঁর এতো ঘৃণা!প্রশ্নটা মাহেরের মস্তিষ্কে ঘুরছে।আজকের মতো আবারও শূন্য হাতে ফিরে এলেন।বাসা থেকে বের হয়ে তার নাম্বারে লিখলেন, ‘আমি কি করলে তুমি আসবে বলো?’
একদম রাতের শেষে উত্তর এসেছিলো, ‘নতুন কাউকে খুঁজে নিন।’
মাহের সাথে সাথে উত্তর দিলেন , ‘তোমাকেই চাই আমার।চিন্টুর মা’কেই।’
আরহাম আজকে ফোন করলেন টানা আটচল্লিশ ঘন্টা পর।এখানে এসে উনার বারবার এটাই মনে হচ্ছে যে, প্রেম ছাড়া থাকা কঠিন।প্রেয়সীর সাক্ষাৎ ছাড়া বাঁচা কঠিন।
শাওয়ার নিয়ে মাত্র ফিরেই কল দিয়েছিলেন।আজকে প্রথমবারের মতো আবদার করে বসলেন, ‘আপনি সামনে আসুন উমায়ের।আই ওয়ান্না সী ইউ,মাই বাটারফ্লাই।’
লজ্জ্বায় হাবুডুবু খেতে খেতে হাফসা উত্তর দিলো, ‘আপনাকে চোখের সামনে দেখলে যদি…
নিজের মহামারী ইচ্ছে ছেড়ে আরহাম প্রসঙ্গে পাল্টে বললেন , ‘থাক,তারপর লাল হয়ে যাবেন তার চেয়ে বরং প্রতিদিন কথা পাচ্ছি এটাই অনেক।’
দীর্ঘ সময় নীরবতা! আরহাম মানসপটে কল্পনা করছেন,সামনে উনার লাজুক ফুল।গোল গোল চোখের ছটফটে দৃষ্টি আর দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে গিয়ে মাঝে মাঝে চোখ তুলতে চোখাচোখি হওয়ার ব্যাপারটা।নিজের অজান্তেই শব্দ করে হেসে উঠলেন আরহাম।কল্পনায়ও তো দারুণ সুখ পাওয়া যায়!
হাতঘড়িতে তাকালেন আরহাম।কেটে যায় প্রায় মিনিট বিশেক।নীরবে যেনো শ’খানেক আলাপ হয়ে গেছে মনে মনে।আরহাম বিদায় নিয়ে বললেন, ‘কালকে কথা বলবো ইন শা আল্লাহ।আমাকে যেতে হবে।রাতের যে ঘুম নষ্ট করেছি সকালে সেটা পুষিয়ে নিয়েন।’
হাফসা সম্মত হলো।আরহাম ফোন রাখার আচমকাই বলল,
‘আর শুনুন!’
‘জ্বী মিস!’
‘আমার একটা হেল্প দরকার।’
‘বলুন।’
‘এজিপ্টে আমার একজন পরিচিত মানুষ হারিয়ে গিয়েছেন।উনার সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছি না।আপনি তাকে খুঁজে এনে দিবেন?’
আরহাম ঠোঁট চেপে মুচকি হেসে ওপাশ থেকে জবাব দিলেন, ‘চেষ্টা করবো।কিন্তু আমি তাকে কীভাবে চিনতে পারি?’
‘পাশ দিয়ে যখন হেঁটে যাবেন,শুনতে পাবেন তাঁর হার্ট বিটের শব্দ।যেখানে দূটোনাম অবিরত বেজে চলছে।নাম শুনলেই বুঝতে পারবেন,ইনিই আমার হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তি।’
‘আচ্ছা আচ্ছা!কী নামে হার্টবিট শুনতে পাবো?’
হাফসা থমকায়।কি চমৎকার কন্ঠ তাঁর প্রিয়তমের।কথাগুলো কতোটা সুশীল,সম্মানীয়।
হাফসা ফিসফিস আওয়াজ তুলে বলে, ‘উমায়ের!’
কিছুটা দম নেয়।
অতপর আবার বলে, ‘উমায়ের! উমায়ের!’
আরহামও ফিসফিসিয়ে জবাব দিলেন, ‘এই নামের হার্টবিট তো আমার হৃদয়েও বাজে।তাহলে কি আমি ধরে নিব,আমিই আপনার সেই হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তি,উমায়ের?’
হাফসা খানিক অভিমান নিয়ে আওড়ায়, ‘কীভাবে হবেন?আমার উনি আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারতেন না।অথচ আপনি তো দিব্যি পারছেন দূদিনে।’
‘উনার ভুল হয়েছে।উনি ক্ষমা চাইছেন।’
‘ভেবে দেখবো।’
আরহাম হাসলেন।এবার উনাকে বেরোতে হবে।ফোন রেখে মনে মনে আওড়ালেন, ভালোবাসা জমিয়ে রাখলে বুঝি এমন ভয়ানক রূপ ধারণ করে।আমাদের সাক্ষাৎ খুব তাড়াতাড়ি হোক,আমি সব রাগ শোধ নিব ভালোবেসে।’
‘ভাইয়া, আইরার ভাইয়া তো উনার কথা রেখেছেন।তুমি বলেছিলে না তোমার বোনকে যত্নে রাখতে,এক ফোঁটা দূ:খ ও না দিতে,তিনি পেরেছেন।আমি অনেক ভালো আছি।উনি যেভাবে উনার কথা রেখেছেন তুমি কেন রাখো নি?তোমার বোনকে যেমন তুমি সুখী দেখতে চাও,উনিও তো এমন চান।অথচ তুমি কেবল দূ:খই দিয়ে যাচ্ছো।আজ আমার সাথে এমন হলে তুমি ছটফট করতে না।আমি হয়তো তোমার বুকে মুখ লুকিয়ে এসে অভিযোগ জানাতাম।সে তো পারে না।’
নাহ,কথাগুলো একেবারে বুক চিরে খাদ হয়ে লেপ্টে আছে বুকের মাঝে।কথাগুলো হাফসা যাবার দিন খুব আকুতি নিয়ে বলেছিলো।মাহের এটা স্বীকার করতে অসম্মত নয় যে, উনি আসলেই মেয়েটার অযোগ্য।যোগ্যকে পেছনে ফেলে সে অনায়াসে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে তবে উনি কেন পারছেন না তাকে আগলে নিতে।এই বাচ্চা সাইজের মেয়েটা উনার অর্ধাঙ্গিনী; ভাবতেই শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে এলো মাহেরের।সারা শরীরে যেনো এক আতঙ্কিত বিদ্যুৎ বেজে গেলো।নাহ,মন থেকে তাকে মানতেই হবে।স্ত্রী রা তো সবচেয়ে সম্মানীয়,চক্ষু শীতলকারী আর সে মাহেরের জন্য দুশ্চিন্তার উৎসকারী।
নিজের চিন্তায় একতাবদ্ধ হয়েও কেন জানি পিছপা হয়ে আসেন মাহের।এই নারী জাতিটা; উনাকে একদমই টানে না।একমাত্র হাফসা আর মা ছাড়া কোনো নারীকেই সহজভাবে নিতে পারেন না।অথচ একটা প্রবাদ আছে,পুরুষের বাম পাজরের একটা হাড় নেই।আর সেটা হচ্ছে স্ত্রী।মাহের আশ্চর্য হলেন!উনার বাম পাজরের হাড়টা নিয়ে সে পালিয়েছে!ফেরত দেওয়ার কোনা ইচ্ছেই নেই?’
প্রচন্ড খিদে লেগেছে উনার।অথচ টেবিলে খাবার সাজানো নেই।ফ্রীজেও খাবার নেই।খাবার অর্ডার দেওয়াও নেই।এখন কে রাখবে এসব খবর।যে রাখার সে তো নিঁখোজ।আর হাফসা চলে গিয়েছে আজ চারদিন।
মাহের আজকাল যেনো বড্ড অনুভব করেন তাকে।বাসায় ফিরেও দেখেন বিছানাটা অগোছালোই থেকে গেছে।রাতের এঁটো বাসন,বা এলোমেলো ফাইল-পত্রে ভর্তি হয়ে আছে টেবিল।বেলকনির দূলনাটা আর যখন তখন কারো দখলে থাকে না।গাছগুলো শুকিয়ে মরে পানির অভাবে কেউ পানি দেয় না।স্টাডি রুম অনেকদিন বদ্ধ থাকায় এক ধোঁয়াশা স্মেল আসছে।ঘড়িটা সাতটার কাঁটায় টকটক আওয়াজ তুলছে।ক্লান্ত হয়ে মাত্র বাসায় ফিরলেন।মাহের ধীরে ধীরে দরজা খুলে স্টাডিরুমে প্রবেশ করলেন।টেবিলের সামনের দেয়ালে থাকা বেবি স্টিকারগুলো যেনো উনার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।মাহের মুচকি হেসে চোখ সরিয়ে থাই গ্লাস টা খুলে দিতেই ঝুপ করে একঝাঁক জোৎস্না নেমে এলো ঘরে।বাহিরে সম্পূর্ণ চাঁদ।মাহের যেনো অনুভব করলেন আইরার উপস্থিতি।উহু,সশরীরে নয়,তাঁর গায়ের স্মেলটা একটু পাচ্ছেন তিনি।এই তুলতুলে বালিশ জড়িয়েই তো সে ঘুমাতো।আচ্ছা সে কি কখনো টের পেতো স্টাডি রুমে থাকার পর মাঝে মাঝে মাহের তাকে অনেকক্ষণ দেখে যেতেন!
তাঁর স্টাডি টেবিলে জমে আছে শ’খানেক মিনি টয়েস।কিন্ডার জয়ের খোলা প্যাকেটে ভরে আছে বিন’টা।টয়েস গুলো হাতে নিয়ে নাড়িয়ে দেখতে দেখতে ভাবলেন কিন্ডার জয় খেয়ে খেলনা জমাতো সে?
ছোট্ট ড্রয়ার খুলতে দেখা গেলো টয়েস’ পিনাট,মিল্কি চকলেট,কালারফুল গ্লিটারস পেপার জমা হয়ে আছে।মাহের একটা কিন্ডারজয় খুললেন।অল্প একটু মুখে নিয়ে টেস্ট দেখতেই খিদেয় পেটের ভেতর যেনো মোচড় দিয়ে উঠলো। অপরপাশে পেলেন একটা ছোট্ট ডায়নোসর।সেটা তিন পিস করা।একসাথে জোড়া লাগালে চমৎকার আকৃতি হয়।খারাপ না তো,মজার গেইম।কিন্তু এগুলো খেলার বয়স তো তাঁর নয় নিশ্চয়ই।
বহুদিন পর দাদূর সাথে দীর্ঘ আলাপন মাইমুনার।কথার একপর্যায়ে উঠে আসে আরহাম আর হাফসার কথা।ইনিয়েবিনিয়ে দাদূ এটাই জানতে চাচ্ছেন সে সুখী কি না।এক ঝলক মলিন হাসি খেলে গেলো অধরজোড়ায়।বুকটেনে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে হাসিমাখা স্বরে উত্তর দিলেন, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি তো।শাহ’কে আমি ভাগ করেছি জেনেশুনেই।আর হাফসা আমার ছোট বোনের মতো।সে কখনই আমার দূর্বলতার সুযোগ নেয়নি।বরং আমার সবচেয়ে বেশী টেক কেয়ার করে সে নিজেই।আমার কখন কোন বেলা কোন ওষুধ খেতে হবে সে নিজেই বুঝিয়ে দেয়।আমি অসুস্থ হলে একটু পরপর এসে খোঁজ নেয়,আমার কি খেতে ইচ্ছে করে সব ওই তৈরী করে দেয়।বিকেলে একসাথে বেরোই আমরা,গল্প হয় আড্ডা হয়।তবে আমরা আরহামকে নিয়ে বলি না।সেও জানে তাঁর মুখে শাহ এর নামটা আমার হৃদয়ে কাঁটা ফোটাবে আর আমিও জানি।
আর শাহ; উনিও দায়িত্বে কার্পণ্য করেন না।আগের মতো একসাথে সময় স্পেন্ড করা হয় না,তবে যতটুকু সময়ই একসাথে থাকি,সারাদিনের জমিয়ে রাখা দূ:খগুলো মরে যায়।
ভদ্রলোক নি:শব্দে হাসলেন।উনার হাসিতে কুঁচকানো চামড়া ডেবে গেলো হাড়ের ফাঁকে।বয়সটা শুধু একটা সংখ্যা মাত্র, মৃত্যু তো নিত্যসঙ্গী।মাইমুনা কাছে এগিয়ে এসে চামড়া বসে থাকা নড়বড়ে হাতে হাত রাখলেন।।বললেন, ‘দোয়া চাই দাদূমণি।আপনারা কয়েক জন ছাড়া আমার আপন যে কেউ নেই।’
‘তুমি আমাকে মেসেজ দিবে না।আমার সমস্যা হয়।’
ওপাশের ব্যক্তি ভারী চমকালো।মাহেরের থেকে সর্বোচ্চ কঠিন কথা সে হজম করেছে কিন্তু এই অব্দি বুঝি বাকি ছিলো সম্পর্কের ইতি টানা।
সে জানতে চাইলো, ‘কেন?’
‘বিয়ে হয়েছে।আমার স্ত্রী দেখে ভুল বুঝেন।’
‘মানে?কবে?কার সাথে?’
মাহের ফোন হাতে নিলেন।তিনি বুঝতে পারছেন সামনে বসা মানুষটা ভীষণ অবাক হয়েছেন।এখন তাঁর কৌতূহলের শেষ থাকবে না।অনাগত প্রশ্নোত্তর পর্ব গুটিয়ে আনতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াসে বললেন, ‘মাসখানিক হবে।হুট করে হয়েছে।’
‘জানালে না?’
‘সুযোগ হয়নি।’
‘এতোদিনেও হয়নি?’
‘প্রয়োজন মনে করিনি।নিজের যত্ন নাও।বাচ্চার খেয়াল রেখো।আমি উঠি।’
মাহের উঠতে গেলেই অপ্রতিরোধ্য কিছু শুনলেন, ‘তোমার এমন বদলানোর কারন নতুন স্ত্রী?’
‘খবরদার তাঁর সম্পর্কে কিছু বলবে না।সে এখনও জানে না তোমার কথা।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৫৩
‘তাহলে ডাউট করলো কেন?’
‘তোমার মেসেজ দেখেছেন।’
‘তাকে একদিন নিয়ে আসো।’
মাহের দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।ফিরে আসার আগে কেবল বললেন, ‘কিছু পরিচয়ের নাম হয় না।তুমি আমার জীবনে এমনই একজন।আমার জীবনের চ্যাপ্টার থেকে যাকে রাখাও যায় না আবার মুছে ফেলাও যায় না!’
