Home অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ৮

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ৮

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ৮
Sathi

” মারুফ চৌধুরী জেহেফিলের পিছন পিছন গেটের দিকে চলে আসে।পিছন থেকে গম্ভীর গলায় ডাক দেয়।
__ মিস্টার জেহেফিল।
” এমন গম্ভীর স্বরে আপন মানুষের কন্ঠে, পিছন ফিরে ভ্রু কুঁচকে তাকায় জেহেফিল। পায়ের কদম থামিয়ে দেয়। সেতুর আব্বু সামনে এসে দাঁড়ানোর আগেই জেহেফিল নিজেই বলে ওঠে।
__ ওমা, আমার নামও জানেন দেখছি। অবশ্যই আপনার মতো মানুষের তো আমাদের নাম মুখে মুখে থাকতেই হবে।
” ভাব নিয়ে কথাটা বলে জেহেফিল। তার এমন খোঁচা মারা কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সেতুর আব্বু।রাগী স্বরে বলে ওঠে।

__ কেন আমার পিছু পড়েছো?
__ আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি কেন আপনার পিছু পড়বো? আপনাকে দিয়ে আমার কাজ কি? আপনার সাথে না বিয়ে করতে পারবো, না বাসর। আমি তো আপনার মেয়ের পিছে পড়েছি।
__ দেখো, হেঁয়ালি কম করো।
__ আপনি কথাটা এমন করে বললেন। আচ্ছা বাদ দিলাম। কী বলবেন বলুন।
” জেহেফিলের কথায় সেতুর আব্বু জোরে একটা শ্বাস নেন। ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন স্বরে বলে।
__ কেন আমার মেয়ের পিছু নিয়েছো?
__ চু*মু দিয়ে আমার বাচ্চার মা বানাবো তাই।
__ দেখো!
__ ছিঃ। আপনার থেকে আবার কী দেখব?
” নাক সিটকে জেহেফিল কথাটা বলে।মারুফ চৌধুরী কটমট চোখে তাকান।

__ মুখ সামলে কথা বলো। তোমার যে কোনো উদ্দেশ্য আছে, আমি খুব ভালো করেই জানি।
__ আছে তো উদ্দেশ্য, এই যে আপনার মেয়ের গর্ভে নিজের একটা ফুটবল টিম বানাতে চাই।
__ ফুটবল টিম কেন? ব্যাডমিন্টন টিমও তো বানাতে পারবে না। কান খুলে শুনে রাখো, আমার মেয়ের বিয়ে তোমার সাথে দিব না।
” রাগে দপদপ করতে করতে সেতুর আব্বু কথাটা বলে।জেহেফিল মুচকি হেসে উত্তর দেয়।
__ ব্যাডমিন্টন? না, দুজন হলে হবে না। আমার তো সেই ফুটবল টিম লাগবে। বাই দ্য ওয়ে, বিয়ে দিবেন নাকি দিবেন না ,সেটা রাত ৮টার পর নিজের ফোনটা চেক করে বলবেন।
” বলেই জেহেফিল আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত কদমে গাড়ির দিকে চলে যায়। পিছনে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে থাকে সেতুর আব্বু। তিনি খুব ভালো করেই চিনে জেহেফিলকে, কু*কু*রের মতো ঘ্রাণ নিয়ে মানুষের কুকর্ম ধরে ফেলার মতো লোক সে।কিন্তু বুঝতে পারছেন না,তার পেছনে কেন পড়েছে?শুধু কি সেতুর জন্য? জেহেফিলকে কখনোই বিশ্বাস করতে পারবেনা। আজ পর্যন্ত তার নামে যা শুনেছেন তাতে তো একেবারেই না।পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে ফেলেন।

“”দুই ঘণ্টা পর”
” জেহেফিল তার বাড়িতে এসেছে। যেখানে সেতুকে নিয়ে আসেনি। এখানে তার একটা সুন্দর পরিবার আছে। এই যে বাইরে থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ আসছে, মনে হচ্ছে যেন ভেতরে যুদ্ধ চলছে। ভেবেই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেহেফিল, তারপর ধীরে দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢোকে।
” ভেতরে আসতেই জেহেফিলের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এরিন আদনানের চুল টেনে ধরে আছে। জেহেরা বেগম (তার মা) ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড় দেওয়ার পাত্র না। পরিস্থিতি পুরো উত্তপ্ত, যেন আগুনে ঘি পড়েছে।জেহেফিল তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে দুইজনকে ধরে ফেলে।”
__ আমার টুনাটুনি, কি করছিস তোরা? চুল ছিঁড়ে ফেলবি নাকি। টাকলা হয়ে গেলে তোদের বিয়ে কে করবে?
” বলতে বলতে সে আদনানকে ছাড়ায়। সুযোগ পেয়ে এরিন জোরে চুল টান দেই আদনানের।

__ আহা। দেখলি জেহেফিল?
__ দেখলাম। তুই আর যাস না!
” বলেই আদনানকে শক্ত করে আটকে রাখে। বেচারা আদনান মুখ গোমড়া করে, কষ্ট অভিমানী মিশিয়ে বলে।
__ তুই তো তোর বোনের পক্ষেই নিবি।
__ সে আর বলতে।ভাগ্য ভালো বাসায় ঢুকতে দিয়েছি।
” চঞ্চল কণ্ঠে এরিন কথাটা বলে জেহেফিলকে জড়িয়ে ধরে। তার চোখে-মুখে দুষ্টু হাসি, অথচ ভালোবাসা ভরা। জেহেফিল হাসিমুখে বোনের মাথায় আলতো করে চুমু দেয়।ভার্সিটিতে থাকা এরিন আর এই ঘরের এরিন, দুইজন যেন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। ভাবতেই জেহেফিলের ঠোঁ*টে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে।
” দুইজনকে শান্ত করার জন্য জেহেফিল একটু গম্ভীর হয়ে বলে।
__ মা*রামা*রি ছাড়, তোদের একটা গুড নিউজ দিচ্ছি।
__ কি গুড নিউজ?
” একসাথে চিৎকার করে বলে ওঠে দুইজন। জেহেফিল নিজের কান চেপে ধরে।

__ আস্তে ভাই।কান ফেটে ফেলবি।
__ তাড়াতাড়ি বলো কি গুড নিউজ।
__ আমি বিয়ে করছি।
__ এটা কোনো গুড নিউজ হলো? আমরা তো জানি তুমি বিয়ে করবে, এবং কাকে করবে সেটাও জানি।
” মুখ গোমড়া করে এরিন কথাটা বলে। বিপরীতে আদনানেরও একই রিয়েকশন। দুইজনের এমন নির্লিপ্ত মুখ দেখে জেহেফিল একটু থতমত খেয়ে যায়।পাশ থেকে জেহেরা বেগম শান্ত গলায় বলে।
__ কখন কথা বলতে যাবো আমরা?
__ খুব শীঘ্রই। দাঁড়াও, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।
” বলেই জেহেফিল যেতে গেলে এরিন হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে—।
__ ভাইয়া এটা কি?
__ কি?
__ দেখো শার্টে।
” বলেই এরিন তাড়াতাড়ি মোবাইল বের করে ছবি তোলে। তারপর স্ক্রিনে দেখিয়ে দেয়। দৃশ্যটা দেখতেই জেহেফিল হা হয়ে যায়। মনে পড়ে, গাড়িতে বসে সেতু ব্যাঙের ফুটকির মতো ঠোঁ*টটা লিপস্টিক দিয়ে রাঙিয়ে, পিছনে হেলে যাওয়ার অজুহাতে এইসব কাণ্ড করেছিল তাহলে। শার্টজুড়ে লিপস্টিকের দাগ স্পষ্ট ঠোঁটের ছাপ। সব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের দিকে তাকিয়ে জেহেফিল অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথা চুলকে বলে।

__ ও… তোমার বউমা দিয়েছে। তাই কোনো সমস্যা নাই।
” বলেই সে একপ্রকার পালিয়ে যাওয়ার মতো তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। জেহেফিল চলে যেতেই ড্রয়িং রুমে থাকা তিনজন হেসে ওঠে উচ্চশব্দে। হাসির রেশ কাটতেই এরিন মায়ের দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলে।
__ আমাকে বিয়ে দিবে না আম্মু?
__ কাকে এত তাড়াতাড়ি মা*রতে চাস তুই?
__ তোমাকেই মা*রতে চাই!
” মুখ বাঁকিয়ে আদনানের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে এরিন দাঁত কেলিয়ে তাকায়। আদনান হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে।
__ তোকে বিয়ে আর আমি? অসম্ভব! শুন আমি সবার সাথে প্রেম করবো, কিন্তু বিয়ে আমি কাউকে করবো না!
__ ঘোড়ার ডিম। খুব ভুল করেছো। ৪ মাস আগে আমার সাথে এক মাস প্রেম করে এখন সারাজীবন আমার সাথে থাকতে হবে। লাস্ট ওয়ার্নিং, যদি আর একবার শিপা টিপার আশেপাশে দেখি, পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো, বলে রাখলাম।
” বলেই এরিন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উপরে নিজের রুমে চলে যায়।আদনান অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার দিকে, তারপর জেহেফিলের মায়ের দিকে ফিরে বলে।
__ দেখলেন আন্টি?
__ সব দেখেছি। খুব বড় ভুল করেছো, আমার দানব মেয়ের সাথে প্রেম করে।
” ঠাট্টার সুরে কথাটা বলে তিনিও কিচেনে চলে যান।অসহায় আদনান সোফায় বসে থাকে, মুখে হতাশা, চোখে আফসোস। বুঝতে পারছে বিশাল ভুল করেছে।

“রাত ৮টা পাঁচ”
” সেতুর রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মারুফ চৌধুরী। হাতে মোবাইল, যেখানে সেতু আর জেহেফিলের ঘনিষ্ঠ, রঙিন একটা ভিডিও। ভিডিওটা একটু আগেই কেউ পাঠিয়েছে।
“রাগে তার পুরো শ*রীর কাঁপছে, হাতের রগ গুলো ফুলে উঠেছে, চোখ র*ক্তবর্ণ, যেন যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী চলছে উনার। ভেতরে সেতু ভয়ে কাঁপছে। চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। আসার পর থেকে একবারও রুম থেকে বের হয়নি। ভেবেছিল সোজা ডিনার টেবিলে যাবে। কিন্তু হঠাৎ দরজায় এই ধাক্কায় তার বুক ধড়ফড় করছে।মনে একটাই প্রশ্ন, তবে কি জেহেফিল কিছু বলেছে আবার।

__ সেতু। দরজা খুল বলছি।নয়তো খুব খারাপ হবে বলে দিলাম।
” রাগে গর্জে ওঠে মারুফ চৌধুরী। তার কণ্ঠে এমন হিংস্রতা যে বাইরে থাকা সবাই থমকে যায়।সেতুর ভাই, মা, কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, শুধু ভয়ে জমে আছে তারা।
” বাবার এই রাগে আর থাকতে না পেরে, সেতু কাঁপতে কাঁপতে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। হাত কাঁপছে, শ্বাস আটকে আসছে। ধীরে দরজা খুলতেই , হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ে মারুফ চৌধুরী। কোনো কথা না বলে, ঠা*স! এক চ*ড় বসিয়ে দেয় সেতুর গালে।
” থা*প্প*ড়ের জোর এত বেশি ছিল যে সেতু ছিটকে পড়ে যায় মেঝেতে। ঠোঁ*ট ফেটে র*ক্ত ঝরতে থাকে।মারুফ চৌধুরী আবার এগোতে গেলে,হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। নাম্বারটা দেখে তাড়াতাড়ী করে কল ধরে ওপাশের কথা শুনে সে থেমে যায়। তারপর কোনো কথা না বলে দ্রুত সরে নিজের রুমে চলে যায়।

” নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে ওঠে সেতুর আব্বু।
__ এইসব কি জেহেফিল?
__ আহারে, ৬০ বছরের বুড়ো নাদান বাচ্চা আমার… রোমাঞ্চ চিনে না! তা আমার বউ আর সালা বাবুকে কিভাবে পয়দা করলেন?
__ মুখে লাগাম দাও, ছেলে। কেন করছো এইসব?
__ কারণ আমার বউ চাই। তাও আপনার মেয়েকে।
__ অসম্ভব।
” রাগে চিৎকার করে ওঠে মারুফ চৌধুরী। ওপাশে জেহেফিল ঠাণ্ডা মাথায় ল্যাপটপের স্ক্রিনে সেতুর কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁ*টে হালকা বাঁকা হাসি নিয়ে বলে।

__ তাহলে নিজের সম্মান হারাবেন। এই যে ভিডিওটা দেখলেন, একটু পর সারা দেশের মানুষ দেখবে। কি চান? নাকি এটা?
__ জেহেফিল।
__ হুশ। সময় দিলাম ১ ঘণ্টা। ভেবে চিন্তে বলবেন, বউ দেবেন, নাকি নিজের সম্মান নিলামে তুলবেন?
” বলেই কল কেটে দেয় জেহেফিল। মোবাইলটা বিছানায় রেখে, স্ক্রিনে থাকা সেতুর কাটা ঠোঁ*টের দিকে তাকিয়ে ধীরে একটা চু*মু দেয় ঠোঁ*টের প্রতিচ্ছবিতে।
__ আমি আসছি… চু*মুখোর বউ।
” ফিসফিস করে বলে সে। তারপর সব বন্ধ করে ছাদের দিকে হাঁটা দেয়, যেখানে আদনান আছে।

” ছাদে আসতেই দেখতে পায়,আদনান একা দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে গভীর হতাশা।
পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আদনান তাকায়। জেহেফিলকে দেখেই তার কষ্ট যেন আরও বেড়ে যায়। ভারী গলায় বলে উঠে।
আদনান: প্রেম করে আমি আবার ধোঁকা খেয়েছি।
জেহেফিল: তুই কি প্রেম করে কুমিল্লার রসগোল্লা আর টাঙ্গাইলের চমচম খেতে চেয়েছিলি? প্রেম করেই তো মানুষ বাঁশ আর ধোঁকা খাওয়ার জন্য। অন্য কিছু আশা করা তো বোকামি।

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ৭

” আদনানের আবেগের মাঝে এক বস্তা সিমেন্ট-বালু ঢেলে দিয়ে জেহেফিল নির্বিকারভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে কথাটা বলে।বিপরীত আদনান চোখ বড় বড়, রাগি চোখে তাকিয়ে থাকে।। মনে মনে ভাবছে, এটা কি বন্ধু, না শত্রু। বন্ধুর কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর বদলে মজা নিচ্ছে।আফসোস হয় ভীষণ আফসোস হয়।

অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা পর্ব ৯