Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৮

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৮

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৮
নুরিয়া ইসলাম

পেন্টহাউসের ভিতরে অন্ধকারের একটা ঘন আবরণ ছেয়ে আছে, শুধু বিশাল গ্লাস উইন্ডো দিয়ে শহরের নিয়ন আলোর ঝলকানি ঢুকছে, যা কার্পেটে ছড়িয়ে পড়ে অদ্ভুত ছায়া তৈরি করছে। রুমটা বেশ ঠান্ডা, কোনো ভূতুড়ে প্রাসাদের মতোই নিস্তব্ধ।শুধু বাইরের রাস্তার দূরবর্তী গর্জন আর এরিকের শ্বাসের ভারী শব্দ শুনা যাচ্ছে । কালো লেদার সোফায় এরিক বসে আছে, তার পেশিবহুল শরীরটা কুঁজো হয়ে ঝুঁকে পড়েছে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে। স্ক্রিনে জ্বলছে ইনায়ার একটা ছবি—তার হাসি মুখ, সেই হরিণীর মতো চোখদুটো যা একসময় তার হৃদয়কে গলে দিয়েছিল, কিন্তু এখন সেই ছবিটাই তার রাগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে যতবার স্কিনে তাকাচ্ছে ততবার ইনায়া তাকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছে, এই একটা জিনিস তার মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছ। হাতে তার হুইস্কির গ্লাস, বরফের টুকরো ঠুকঠুক করে শব্দ করছে, আর অন্য হাতে সিগারেট, ধোঁয়া উড়ছে তার মুখ থেকে, যেন তার ভিতরের আগুনের ধোঁয়া বাইরে বেরিয়ে আসছে। চারপাশে ছড়ানো আছে খালি বোতল, ছাইদানি ভর্তি সিগারেটের টুকরো, আর টেবিলে কিছু ছড়ানো ফাইল যা তার অনুসন্ধানের অবশেষ। এরিকের পাশে ইনায়ার ওড়নাটা পড়ে আছে,তার বিধ্বস্ত দিনের সঙ্গী হয়ে। এরিকের চোখদুটো লাল হয়ে উঠেছে অসংখ্য ড্রিঙ্ক আর সিগারেটের ধোঁয়ায়, কিন্তু সে থামছে না একের পর এক চুমুক দিচ্ছে, সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়ছে, আর স্ক্রিনের ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলছে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”তোমার ভাই কী ভেবেছে, তোমাকে আমার নজর থেকে আড়াল করলে, আমি তোমাকে খুঁজে পাব না? ভুল ভেবেছে, মুনলাইট… তুমি আমার সেই আশক্তি, যার থেকে তোমার মুক্তি নেই!
আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো, আর যখন পাবো, আই সয়ার,তোমার ভাইয়ের চোখের সামনে তোমাকে টেনে নিয়ে যাবো।”
তার গলা ভারী হয়ে উঠেছে , রীতিমতো রাগে কাঁপছে সে, আর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে প্রতিটা কথায়।
হঠাৎ ল্যাপটপের স্ক্রিনে জ্যাকের ভিডিও কল কানেক্ট হয়ে উঠল। এরিক সিগারেটটা ছাইদানিতে পিষে ফেলে, হুইস্কির গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে টেবিলে ছুড়ে ফেলল।কাচের চুরমার শব্দ রুমে প্রতিধ্বনিত হলো, কিন্তু তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, শুধু মুখে
গাম্ভীর্যতা।
জ্যাক ফোনের ওপাশ থেকে বলে উঠলো

— “বস… আমি ডাটাবেসে হ্যাক করছি, কিন্তু মিস্টার তানভীরের ডিটেইলস বেশি সিকিউরড।”
জ্যাকের কথাগুলো এরিক শুনছিলো আর বাতাসে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াচ্ছিলো।
এরিকের কোনরকম জবাব না পেয়ে জ্যাক বলে উঠে,
—বস, আপনি কী শুনছেন!”
এরিক জ্যাকের কথায় কোন প্রতিউওর না করে, কোল্ড ভয়েজে বলল,
— “তুমি জানো জ্যাক,আমি কোন ‘excuse’ পছন্দ করি না। ৩০ মিনিটের মধ্যে আমি তার প্রতিটা ডিটেইল চাই-পাসপোর্ট আইডি, ফ্যামিলি কানেকশন, এমনকি শৈশবের স্কুলের নাম পর্যন্ত।”
জ্যাক একটু হতাশ সুরে বললো,

— “আন্ডারস্টুড, বস।”
হঠাৎ এরিকের সুকৌশলী মস্তিষ্ক একটা কিছু আঁচ করতে পেরে জ্যাককে বলল,
— “আচ্ছা জ্যাক, মিস্টার তানভীর তো একটা সাধারণ ম্যানেজার ছিলো, তাহলে তার ইনফরমেশন এতো সিকিউর করে কেন রাখা? তুমি কী কিছু বুঝতে পারছো জ্যাক?”
জ্যাক এরিকের কথা শুনে মাথা চুলকে বলল,
—“কী বস?”
জ্যাকের মুখ থেকে বোকার মতো কথা শুনে এরিক রেগে বলে উঠল,

—“মাথামোটা কোথাকার! কেউ ইচ্ছে করে মিস্টার তানভীরের সমস্ত ডিটেইলস হাইড করে রেখেছে যাতে আমি ইনায়ার কাছে পৌঁছাতে না পারি, and I am damn sure… এই সবের পিছনে মিস্টার রিচার্ডের হাত আছে।”
কথাটা বলতেই এরিকের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। রাগে তার পেশিবহুল হাতদুটো মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল, চোয়াল কড়মড় করে উঠল। সে গর্জে উঠল,
“শালা, বুড়োটার সাহস কত বড়! আমার বউকে আমার থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে? আমার নিজের বাবা? ফাক! আমি তাকে দেখিয়ে দেবো, এরিক অ্যাসফোর্ড কী জিনিস!” রাগে সে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল, কাচের টুকরোগুলোর ওপর দিয়ে হেঁটে গেল;পায়ে কাচ বিঁধল, কিন্তু সে পাত্তা দিল না, রক্তের ছোপ লাগল কার্পেটে। তার ঠোঁটে একটা হালকা বাঁকা হাসি খেলল, কিন্তু সেটা ছিল ভয়ঙ্কর, যেন একটা হিংস্র শিকারী।

— “জ্যাক, মিস্টার রিচার্ডের অফিসের স্টাফদের ডেটা হ্যাক কর। প্রত্যেকটার ইমেল, ফোন রেকর্ড, লোকেশন—সবকিছু। যদি কোনো স্টাফ তানভীরের সাথে কানেক্টেড হয়, বা মিস্টার রিচার্ডের কোনো সিক্রেট কম্যুনিকেশন থাকে, সব বের করে আন। আর যদি মিস্টার রিচার্ডের নিজের কোনো ফাইল পাও, সেটা প্রায়োরিটি দিয়ে হ্যাক কর। আমি জানতে চাই, সে কতদূর গিয়ে আমার পথ আটকেছে।”
জ্যাকের ভয়েস আবার স্পিকারে এলো—
— “বস, আমি মিস্টার তানভীরের পুরনো ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন ট্র্যাক করছি। পাকিস্তানে একাধিক অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে… মনে হয় ওখানেই যাচ্ছে।”

এরিক গ্লাস ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে টেবিলের কোণে রাখা ইনায়ার ব্যবহ্ত সেই ওড়নাটা তুলে নাকের কাছে চেপে ধরলো, ওড়নাটা থেকে একটা মেয়েলি সুভাষ ভেসে আসতে,এরিক মুহুর্তেই নেশাগ্রস্তের ন্যায় বলে উঠলো, —”পাকিস্তান? তাহলে খেলা ওখানেই শুরু হবে।”
বলেই রুমের কর্নারে থাকা ডাফেল ব্যাগে দ্রুত কিছু জিনিস গুছাতে লাগল—পাসপোর্ট, একাধিক ফোন, আর কালো গ্লাভস।
হঠাৎ সে থেমে গেল, উইন্ডোর বাইরে তাকিয়ে নীচের রাস্তায় শহরের গর্জন শুনল, আর দাঁত চেপে বলল,

— “জ্যাক, প্লেনে আসনের ব্যবস্থা কর… প্রাইভেট জেট। পাকিস্তানের ফ্লাইট তিন ঘণ্টার মধ্যে রেডি চাই।”
জ্যাক: — “বস, আন্ডারস্টুড।”
কল কেটে এরিক ড্রিঙ্ক টেবিল থেকে দ্বিতীয় বোতল হুইস্কি খুলল, বোতল থেকেই এক দীর্ঘ চুমুক খেল। মুখ থেকে নামল না তার সেই ভয়ংকর বাঁকা হাসি।
— “বেবিগার্ল নিজেকে প্রস্তুত রেখো,খুব শীঘ্রই আমি তোমার দুনিয়ায় এন্ট্রি করতে যাচ্ছি।”
তার গলা গম্ভীর, রাগে কাঁপছে, আর চোখদুটো জ্বলছে অন্ধকারে।

জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর,
ভোরের প্রথম আলো করাচির আকাশে নরম গোলাপি আর সোনালি রেখা এঁকে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই ইনায়াদের ফ্লাইটটি রানওয়েতে নামল। ইনায়া তার চোখে ক্লান্তি আর অব্যক্ত দুঃখে ভরাক্রান্ত মন নিয়ে বিমানের ঠান্ডা জানালায় মাথা ঠেকিয়ে রইল। পুরো যাত্রায় তার মন ঝড়ের মতো ছুটছিল এরিকের স্মৃতিতে।বার বার তার নাম ধরে ডাকার শব্দ কানে বাজতে লাগল।বুকের ভিতরটা কেমন এক অদ্ভুত ব্যথায় টনটন করতে লাগল। সেই শব্দই তাকে ছিঁড়ে ফেলছে। এরিক তার নাম ধরে ডাকত যখন, তার গলার নরম, গভীর সুরে ইনায়ার হৃদয় কেঁপে উঠত।এইগুলো মনে করতেই, ইনায়ার শ্বাস কাঁপছে, হাতের স্পর্শে শরীরের প্রতিটি কোষ জেগে উঠছে।মিস্টার তানভীর পুরো পথে একটি কথাও বলেনি। তার নীরবতা একটা দেওয়াল তৈরি করেছে,তাদের মাঝে। বিমান থেকে নামতেই করাচির গরম আর্দ্র হাওয়া তাদের জড়িয়ে ধরল। ইনায়ার হৃদয় তানভীরের টানা সুটকেসের চেয়েও ভারী মনে হচ্ছিল। মারিয়া আলতো করে ইনায়ার হাত ধরল।

— “চলো, বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে,”মারিয়ার কণ্ঠে উষ্ণতা ছিল, কিন্তু ইনায়ার ফ্যাকাশে মুখ দেখে মারিয়ার হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ইনায়া মাথা নাড়ল। ঠোঁটে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু তার মন হাজার মাইল দূরে এরিকের কাছে আটকে ছিল। এয়ারপোর্টের কাচের দরজা পেরোতেই চেনা মুখের ভিড় তাদের স্বাগত জানাল। ইনায়ার চাচাতো ভাই-বোন—রিক, আবীর, রাইসা আর ছোট্ট তুলি, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে উত্তেজনা আর কৌতূহল ঝিলমিল করছে। বড় চাচা ইরফান শেখ, মুখে বিশাল হাসি নিয়ে দুহাত ছড়িয়ে দিলেন।
— “আরে, ইনায়া মা! তোদের দেখে মন ভরে গেল!” তার কণ্ঠে মাসের পর মাসের দূরত্বের পর আকুলতা ফুটে উঠল। রাইসা পরিবারের উচ্ছ্বাসের আলো দৌড়ে এল। তার দুপাট্টা কাঁধ থেকে সরে গেল। সে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল।

— “আপি, তুমি ফিরেছ! ও মাই গড,আমেরিকা তো তোমাকে একদম হিরোইন বানিয়ে দিয়েছে!” সে হাসতে হাসতে বলল। কিন্তু ইনায়ার ফ্যাকাশে মুখ দেখে তার হাসি ম্লান হয়ে গেল। কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
—“তুমি ঠিক আছো তো আপি? রাইসার কণ্ঠের আন্তরিকতা ইনায়ার প্রতিরক্ষা ভেদ করে গেল। তার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। আবীর যে সবসময় চুপচাপ থাকে ,সে একটু এগিয়ে এল। হাত পকেটে গুঁজে রেখেছে। সে নীরবে ইনায়ার সুটকেস তুলে নিল। কিন্তু তার দৃষ্টি ইনায়ার উপর স্থির রইল।
—“আপু, সব ঠিক তো?” আবীর নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠ এয়ারপোর্টের কোলাহলে প্রায় মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার চোখে গভীর স্নেহ আর নীরব উদ্বেগ ইনায়ার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। সেই দৃষ্টি তার বুকের গভীরে একটা তীব্র বেদনা জাগালো। সে কথা বলতে পারল না, শুধু মাথা নাড়ল।
তুলি, শেখ পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য , ইনায়ার বোরখার হাতা টেনে ধরল। তার চোখে শিশুসুলভ বিস্ময় একটা নরম আলোর মতো জ্বলছিল।

— “আপু, আমি তোমার জন্য এটা বানিয়েছি!” সে উচ্ছ্বাসে বলল, পকেট থেকে একটা মুচড়ানো কাগজের স্কেচ বের করে। সেই নিষ্পাপ হাসি ইনায়ার হৃদয়ে ক্ষণিকের জন্য উষ্ণতা ছড়ালো।সবাই তাকে জড়িয়ে ধরছে।কিন্তু ইনায়ার মনে হচ্ছিল তার চারপাশের উষ্ণতায় হাত রাখলে নিজের ঠান্ডা একাকী হৃদয়ের শব্দ শোনা যাবে। বড় চাচা এগিয়ে এসে তানভীরের কাঁধে হাত রাখলেন।
—“বাবা, তোদের দেখে বুকটা ঠান্ডা হল। ইনায়া, তোর মুখটা এত ফ্যাকাশে কেন? কিছু হয়েছে?” তার কণ্ঠে উদ্বেগ ফুটে উঠলো। ইনায়া মাথা নাড়ল,
—“না, চাচা, ঠিক আছি।” কিন্তু তার গলা কাঁপছিল। তানভীরের মুখে এতক্ষণে একটা হাসি ফুটল। সে রিকের কাঁধে হাত রেখে বলল,

—“চল, বাড়ি যাই। সবাই অপেক্ষা করছে।” গাড়িতে উঠে ইনায়া জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। করাচির ভোরের রাস্তা এখনো যানজটে ভরেনি। শান্ত আর নরম আলোয় ঢাকা। ভোরের গোলাপি আকাশে সূর্যের আলো ঢুকছিল ধীরে। কিন্তু ইনায়ার মনে হচ্ছিল সেই আলো তার কাছে পৌঁছাতে পারছে না। তুলি তার পাশে বসে হাত ধরে বলল,
—“আপু, আমেরিকার ছবি দেখাবে তো? গোল্ডেন গেট ব্রিজ, হলিউড—ওয়াও!” কিন্তু ইনায়ার কানে কিছু ঢুকছিল না। তার মন বলছিল,এরিক এতক্ষণে নিশ্চয়ই জেনে গেছে আমি চলে এসেছি। সে কী করছে? রাস্তায় গাড়ি নিয়ে ছুটছে? নাকি আমাকে খুঁজতে শুরু করেছে? নাকি আমাকে না পেয়ে তার অসুস্থ শরীরে আবার সেই ভয়ংকর রেসিং শুরু করে দিয়েছে ? না, ইনায়া আর ভাবতে পারল না। মনে মনে আল্লাহর কাছে এরিকের সুস্থতা কামনা করল। গাড়ি চলতে শুরু করল। বাড়ির দিকে।ইনায়ার হৃদয় ক্যালিফোর্নিয়ার চেনা রাস্তায় আটকে ছিল,এরিকের তীব্র দৃষ্টিতে, তার স্পর্শের উষ্ণতায়। হঠাৎ তুলি তার হাতে একটা জুঁই ফুলের মালা ধরিয়ে দিল।

—“আপু, এটা আমি বাগান থেকে তুলে বানিয়েছি, তোমার জন্য রেখেছিলাম,” তার নিষ্পাপ হাসি একটা নরম আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ল। জুঁই ফুলের মিষ্টি সুবাস ইনায়ার নিঃশ্বাসে মিশতেই তার বুকের ভার যেন এক পলকের জন্য হালকা হলো। কিন্তু এরিকের স্মৃতি তাকে আঁকড়ে ধরে রইল, নিঃশব্দে। সে তুলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আর মনে মনে বলল,
—“এরিক, তুমি কি আমাকে খুঁজবে? নাকি ভুলে যাবে?” তার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এবার সে তা মুছল না।

শেখ নিওয়াস, পাকিস্তানের করাচির লায়ারী টাউনের ঠিক মাঝখানে দাঁড়ানো শেখ পরিবারের তিনতলা বাড়ি, যা প্রথম দৃষ্টিতেই সবার মন কাড়ে। পুরনো আমলের এই বাড়িতে আভিজাত্যের চাকচিক্য না থাকলেও, এর জমকালো নকশা শেখ পরিবারের গৌরব ও ঐতিহ্যের কথা বলে। ইনায়ার দাদা, এই টাউনের মিউনিসিপাল করপোরেশনের চেয়ারম্যান, তার প্রাণপ্রিয় বেগমের স্মৃতির উদ্দেশে এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। এটি শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়, বরং ভালোবাসা, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। রক্ষণশীল এই পরিবারের দরজায় লায়ারী টাউনের মানুষের আনাগোনা কখনো থামে না।

লায়ারী টাউনের বাঁকানো রাস্তাগুলো পেরিয়ে শেখ নিওয়াস ভবনের প্রধান ফটকের দিকে গাড়িটি ঢুকতেই, অন্দরমহলের সবাই যেন একযোগে ছুটে এলো। গাড়ির হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ উঠোনে ছড়িয়ে পড়তেই ভারী কাঠের দরজার কপাট সরিয়ে বেরিয়ে এলেন শেখ পরিবারের অবিসংবাদিত কর্তা, শেওনায়াজ শেখ। তাঁর লম্বা, বলিষ্ঠ দেহে বয়সের ছাপ পড়লেও, তাঁর উপস্থিতির মর্যাদা ও শক্তি এতটুকু ম্লান হয়নি। কপালে গভীর ভাঁজ, পাকা গোঁফ আর মুখে কঠোর অভিব্যক্তি এসবই তাঁর স্বভাবের নীরব প্রতিচ্ছবি। মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে তাঁর নিরীক্ষণকারী দৃষ্টি যেন সামনের মানুষের বুক ভেদ করে অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

তাঁর ডান হাতে শক্ত করে ধরা লাঠিটি কেবল ভরের জন্য নয়;এটি তাঁর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতে অদ্ভুত দৃঢ়তা; যেন প্রতি পা ফেলার সঙ্গে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রক্ষণশীল পরিবারের এই নিরঙ্কুশ কর্তা কথায় অটল, আচরণে অনমনীয়। শেওনায়াজ শেখের কাছে শৃঙ্খলা মানে নিয়মের অক্ষরে অক্ষরে পালন, আর দায়িত্ব মানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। তাঁর তেজি চাহনি একবার দেখলে মনে গেঁথে যায়; মুখে হাসি বিরল হলেও, চোখের গাম্ভীর্য আর কথার ওজনে বোঝা যায়,এই মানুষটির সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস কজনেরই বা আছে। তবু তাঁর কঠোরতার আড়ালে গভীর দায়িত্ববোধের শিকড় লুকিয়ে আছে, যা পরিবারের প্রতি তাঁর অটুট নিষ্ঠার সাক্ষ্য বহন করে।

এই পরিবারের মেজো ছেলের সন্তান, ইনায়া ও তানভীরের জীবন কখনোই সহজ ছিল না। বাবা-মায়ের অকালমৃত্যু তাদের জীবনে এক গভীর শূন্যতা এনে দিয়েছিল। তানভীর, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে, স্ত্রীকে সঙ্গে করে আমেরিকায় পাড়ি জমান। সেখানে নতুন জীবনের ভিত গড়ে, তিনি তার ছোট বোন ইনায়াকেও নিয়ে যান, একসঙ্গে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।
কিন্তু আজ, শেখ নিওয়াস ভবনের প্রাঙ্গণে ফিরে আসার এই মুহূর্তে, শেওনায়াজ শেখের দৃঢ় উপস্থিতি যেন তাদের অতীত ও বর্তমানের মাঝে এক অদৃশ্য সেতু বাঁধে। তাঁর কঠোর দৃষ্টি আর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে স্পষ্ট যে এই বাড়িতে ফিরে আসা মানে শুধু পুনর্মিলন নয়, বরং পুরনো নিয়ম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বের জালে আবার জড়িয়ে পড়া।

শেওনায়াজ শেখ লাঠিতে ঠকঠক শব্দ করতে করতে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন তাঁর প্রিয় নাতি-নাতনির দিকে। তানভীর এক পা এগিয়ে এসে দাদাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, দাদাজান! আপনি কেমন আছেন?”
শেওনায়াজ শেখ নাতির কথায় গম্ভীর কণ্ঠে, তবু একটু অভিমানের সুরে উত্তর দিলেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। এতদিন পর নিজের পরিবারের কথা মনে পড়লো তোমার?”
তানভীর দাদুর অভিমান ধরতে পেরে মৃদু হেসে তাঁকে মানানোর সুরে বলে উঠল,
“দাদাজান, আপনার কথা তো আমার সবসময় মনে পড়ে! ব্যস্ততার মাঝেও আপনার এই লাঠির শব্দটা যে কীভাবে মিস করি! এবার তো এসে পড়েছি, এখন আপনার সঙ্গে অনেক সময় কাটাবো, দেখবেন।”
তাদের দাদু-নাতির এই মধুর মুহূর্ত দেখে পিছনে দাঁড়ানো শেখ পরিবারের ছোট বউ রুখছানা বেগম মুচকি হেসে একটু ঠাট্টার সুরে বলে উঠলেন,

—“বুড়োর ঢং দেখো! নাতি-নাতনিকে পেয়ে খুশিতে যেন মাটিতে পা পড়ছে না!”
তাঁর কথার সুরে হেসে কাজের মেয়েটি সায় দিয়ে বলল,
“ঠিকই বলেছেন, বেগম! বুড়োর খুশি দেখে তো মনে হচ্ছে, নাতি-নাতনির জন্য মনটা উড়ছে!”
শেওনায়াজ শেখ তখন তাঁর ভৃত্য বাহাদুরকে ডেকে, দৃঢ় কণ্ঠে নির্দেশ দিলেন,
–“লাগেজগুলো ঘরে নিয়ে যা।”
এরপর তিনি তানভীর ও ইনায়াকে সঙ্গে নিয়ে ভারী দরজা পেরিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন, তাঁর লাঠির শব্দ যেন পুরো প্রাঙ্গণে প্রতিধ্বনিত হলো।

USC ক্যাম্পাসের ক্যানটিনে, দুপুরের হালকা রোদ্দুরে ঝলমলে পরিবেশে আদিল আর জুলি নিজেদের মধ্যে একান্ত সময় কাটানোর জন্য বসে ছিল। চারপাশে ছাত্র-ছাত্রীদের হাসি-কথা, কফির সুবাস আর হালকা গানের মেলোডি মিলে একটা নির্ঝঞ্ঝাট মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। আদিল জুলির হাত ধরে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই পিছন থেকে একটা ছায়া পড়ল তাদের টেবিলের উপর। এরিক, তার পেশিবহুল শরীর নিয়ে, কোনো সতর্কতা ছাড়াই তেড়ে এলো। তার চোখে আগুন জ্বলছে, মুখে কোনো হাসি নেই;রয়েছে শুধু , হিংস্র গাম্ভীর্য। সে এক হাতে আদিলের কলার চেপে ধরে টেনে তুলল, আর অন্য হাতে একটা শক্ত পাঞ্চ মারল তার চোয়ালে। আঘাতটা এত জোরালো যে ক্যানটিনের কয়েকজন চমকে উঠল, কয়েকটা চেয়ার উল্টে পড়ল।

—”এই ৯ ঘন্টা ১৩ মিনিট ৩ সেকেন্ড ধরে আমার বউ মিসিং,আর আমি পাগলের মতো তাকে পুরো শহর খুঁজে বেড়াচ্ছি। ” এরিকের গলা গম্ভীর, রাগে কাঁপছে, প্রতিটা শব্দ যেন দাঁত চেপে বেরিয়ে আসছে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে তার, পেশিগুলো ফুলে উঠেছে।
— “ইনায়া কোথায়? আহ্,…… মিথ্যা কথা একদম বলবি না। তুই জানিস মিস্টার তানভীর ওকে কোথায় নিয়ে গেছে।”

আদিলের মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে পড়ল, সে হাঁপাতে হাঁপাতে এরিকের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। জুলি চমকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল, তার চোখে ভয় আর উদ্বেগ ফুটে উঠল। সে ছুটে এগিয়ে এসে এরিকের হাত ধরে টেনে বলল,
—”এরিক, থাম! ও মরে যাবে। ছেড়ে দে ওকে। পাগলামি বন্ধ কর!”
এরিক জুলির কথায় কান দিল না। তার দৃষ্টি আদিলের উপর আটকে আছে, যেন সে একটা হিংস্র শিকারী এবং আদিল তার শিকার। সে জুলির দিকে একবারও না তাকিয়ে, হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে, দাঁত পিষে গর্জে উঠল,
—”ইনায়ার বাসা পাকিস্তানের কোথায়? বল, শালা! না বললে এখানেই তোর গলা টিপে মেরে ফেলব!”
আদিলের দম বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেল। সে বহু কষ্টে এরিকের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—”আমি তোকে বলতে বাধ্য নয়!”
একথা শুনতেই এরিকের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তার মুখের পেশি শক্ত হয়ে গেল, চোয়াল কড়মড় করে উঠল। রাগে তার হাতদুটো মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল, আর সে আদিলের কলার আবার চেপে ধরে, তার মুখ প্রায় আদিলের মুখের সামনে নিয়ে এসে, ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর সুরে গর্জে উঠল,
—”আজ বিকেলে রেডি থাকিস। তুই আমার সাথে পাকিস্তান যাবি। না গেলে… তোর কপালে কী আছে, তা তোর কল্পনারও বাইরে। আমি এরিক অ্যাসফোর্ড, আমার কথা অমান্য করার সাহস তোর নেই।”

এরিক আদিলের কলার ছেড়ে দিল, তার চোখে তীব্র রাগের আগুন জ্বলছে। সে ধীরে পিছু হটল, তার পেশিবহুল শরীরে উত্তেজনার কম্পন স্পষ্ট। তার চলার ভঙ্গি ছিল দৃঢ়, প্রতিটি পদক্ষেপ ভারী এবং ইচ্ছাকৃত, যা মাটিতে তার রাগের প্রতিধ্বনি তুলল। তার কাঁধ সোজা, মাথা উঁচু, চোখে হিংস্র দৃষ্টি ছিল, যা ক্যানটিনের সবাইকে নিস্তব্ধ করে দিল।এরিক চলে যেতেই জুলি দৌড়ে আদিলের কাছে এলো। আদিলের পাশে দাঁড়িয়ে তার রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকাল। জুলি আলতো করে আদিলের কাঁধে হাত রাখল, তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।আদিল জুলির দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললো,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭ (২)

—তোমার ফ্রেন্ড আসলে একটা সাইকো।
ওর মতো ঘাড়ত্যাড়াকে একমাত্র দাদাজান- ই টাইট দিতে পারবে। যাক একবার পাকিস্তানে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৯