Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৬

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৬

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৬
রুপা

দিনের শেষ আলোটুকু অনেক আগেই মুছে গিয়ে ধরণীর বুক চিরে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার। আজকের আকাশে রুপালি চাঁদের কোনো স্নিগ্ধ উপস্থিতি নেই; তার বদলে চারপাশ ঢেকে আছে জমাট বাঁধা কালো চাদরে। তবে প্রকৃতির সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজত্ব করছে মানুষের ছোঁয়া দেওয়া কৃত্রিম আলোর ঝলকানি।

চারপাশের স্টেডিয়ামের তীব্র আলোয় চারদিক যেন দিনের মতো স্পষ্ট, থমকে যায়নি এই মহানগরীর স্পন্দন। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ঠিক দশটা—ঢাকার মতো চিরব্যস্ত নগরীর বুকে এই দৃশ্য তো এক চেনা নিয়মের মতো, যেখানে ব্যস্ততার কোলাহল আর ক্লান্তিহীন মানুষের মেলা এখনো একটুও ফুরিয়ে যায়নি।
রাত দশটা বাজলেও সরকার বাড়িতে যেন আজ আর রাত বাড়ছেই না। ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁলেও কারোর ঘুমানোর খবর নেই, সবাই গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে ড্রয়িংরুমে। স্নিগ্ধ দুপুরে না গেলেও এশার আজানের পরে চলে গেছে, তার অনেক নোট বাকি আছে সেগুলো লিখতে হবে বলে। এখন ড্রয়িংরুমে বাড়ির ছোটরা এককোণে আড্ডা দিচ্ছে—আহনাফ, সিমরান আর শিফা; অন্যদিকে বড়রা নেই, শুধু মিনারা বেগম আর নিশি। ওনারা সবাই কালকে চলে যাবেন, তাই মূলত সবাই রাত জেগে আড্ডা দিচ্ছে। নিশি পুষ্পর ওপর নজর রেখেছিল, সেটা নিয়ে বাড়িতে আর কেউ কিছু বলেনি। পুষ্পকে পেয়ে যেন সবকিছু ভুলে বসেছে; কিন্তু আসলেই কি ভুলেছে, নাকি কিছু বলছে না?

শেহনাজ সরকার নিশিকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রেশমা ওনাকে অনেক অনুরোধ করে এই বারের মতো ক্ষমা করে দিতে বলেন। এরপর নিশিকে নিয়ে কোনোদিন এই বাড়িতে আসবে না এবং পুষ্পর আশেপাশেও আসবে না বলে কথা দিয়েছে রেশমা। স্নিগ্ধ আর নিশিকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন, সেই মমতা থেকেই বড় ভাবির কাছে শেষবার সুযোগ চেয়েছেন। শেহনাজ সরকারও ননদের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে শেষ সুযোগ দিয়েছেন। তবে সাবধানও করেছেন, যেন নিশির দ্বারা পুষ্পর কোনো ক্ষতি না হয়।
পুষ্প এখন শেহনাজ সরকারের পাশে বসে আছে, শেহনাজ সরকারের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে। পুষ্পর আর বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না, তাই সে শেহনাজ সরকারকে বলে যে সে ঘুমাবে। শেহনাজ সরকারও না করেন না, তিনি নিজে পুষ্পকে নিয়ে ওপরে চলে যান। এদিকে ভাই-বোন তিনজনের যেন কথার ঝুড়ি আর শেষ হচ্ছে না!

এর মধ্যে সেখানে হাজির হয় নিশি। মূলত রুমে পানি শেষ হয়ে গেছিল, তাই পানি খেতে নিচে নেমেছে। সবাই একপলক নিশির দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। বিষয়টি নিশি খেয়াল করে, তবে এতে তার ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে বলে মনে হয় না। সে চুপচাপ পানি খেয়ে যেই না ওপরে চলে যাবে, অমনি সদর দরজা দিয়ে আর্যকে প্রবেশ করতে দেখা গেল। আর্যকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, কোনো কারণে সে বেশ রেগে আছে। সে স্নিগ্ধর কাছে সব শুনেছিল—কীভাবে পুষ্পকে কিডন্যাপ করেছে এবং স্নিগ্ধ কীভাবে বাঁচিয়ে নিজের সাথে নিয়ে গেছিল। তখন থেকেই আর্য মরিয়া হয়ে উঠেছে এটা জানার জন্য—কে তার ফ্লাওয়ারকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল! তাই সন্ধ্যায় থানায় গিয়েছিল কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না দেখতে।
আর্য নিশির ব্যাপারে কিছুই জানত না, কিন্তু থানায় যাওয়ার পরে পুলিশদের কাছ থেকে জানতে পারে নিশি পুষ্পর পেছনে লোক লাগিয়েছিল। সেটা জানার পর থেকে আর্যর মাথায় যেন আগুন জ্বলছে! রাগে চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে আছে, মুখের আদলে চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে আছে। কিন্তু সে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাড়িতে ঢুকে নিশিকে দেখেই যেন তার সংযম ভেঙে গেল। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল নিশির দিকে—সেই দৃষ্টি দেখেই সহসাই ভড়কে গেল নিশি। অজানা কারণে আবারও ভয় হতে শুরু করল, ভয়ে যেন বুক কাঁপছে। আর্য একবার পুরো ড্রয়িংরুমে চোখ বুলিয়ে দেখে নিল পুষ্প আছে কি না। পুষ্পকে না দেখে সহসাই এগিয়ে গিয়ে—
ঠাসস! ঠাসস! ঠাসস!

কোনো সতর্কতা ছাড়াই নিশির গালে একের পর এক চড় মারতে লাগল আর্য। পুরুষালি শক্ত হাতের একের পর এক চড় খেয়ে নিশি যেন জ্ঞান হারানোর উপক্রম! এদিকে বাড়ির বড়রা সবাই গল্পে এতটা বিভোর ছিল যে আর্যকে খেয়াল পর্যন্ত করেনি; কিন্তু আচমকা চড়ের তীব্র শব্দে পেছনে ফিরে আর্যকে নিশিকে মারতে দেখে অবাক হয়ে যায়। আর্য কেন নিশিকে মারছে, কেউ বুঝতে পারছে না; তবে আমজাদ সরকার হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন, থানায় ছেলের যেই নতুন রূপ দেখেছেন তিনি, তা থেকেই হয়তো বুঝতে পারছেন।
এদিকে চড় মেরেও যেন শান্ত হতে পারল না আর্য। তীব্র রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিশির গলা চেপে ধরে হুংকার ছাড়ল—
– “এই, কোন সাহসে তুই আমার ফ্লাওয়ারের পেছনে লোক লাগিয়েছিলি? বলেছিলাম তো, ওর থেকে দূরে থাকবি; তাহলে এত সাহস পেলি কী করে তুই ওর ক্ষতি করার চিন্তা করিস? এই, বল, এত সাহস পেলি কী করে তুই?”

এদিকে আর্য নিশির গলা এতটাই শক্ত করে চেপে ধরেছে যে নিশি নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, চোখ যেন উল্টে আসছে। এদিকে বাড়ির সবাই আর্যর রাগ দেখে ভয় পেয়ে গেল। আমজাদ সরকার নিজেও অবাক হন, উনি জানেন ওনার ছেলে রেগে গেলে মানুষ খুন করতেও দুবার ভাবে না; কিন্তু সেই রাগের কারণ যে শুধু পুষ্পর পেছনে লোক লাগানো হবে, সেটা ভাবতে পারছেন না। যেই ছেলে বিয়ের পর থেকে দুচোখে সহ্য করতে পারত না, সে এতটা উন্মাদ কবে থেকে হলো এই মেয়েটার জন্য?
এদিকে নিজের মেয়ের মতো নিশিকে মারতে দেখে রেশমা আর সহ্য করতে পারল না। সে এবার এগিয়ে গিয়ে আর্যর হাত থেকে নিশিকে ছাড়াতে চাইল, কিন্তু আর্যকে এক চুলও নাড়াতে পারল না। আমজাদ সরকার নিজে এগিয়ে এসে ছেলের হাত থেকে নিশিকে ছাড়িয়ে নিলেন। নিশি ছাড়া পেয়ে হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপাতে হাঁপাতে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে লাগল, আর একটু হলে নিঃশ্বাসের অভাবে বোধহয় মারা যেত! আমজাদ সরকার এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—

– “মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার? করছিলেটা কী? আর একটু হলে মেয়েটা নিঃশ্বাস আটকে মারা যেত!”
– “মরে যাক! মরে গেলেই ভালো হবে। এই মেয়ে বেঁচে থাকলে আবারও আমার ফ্লাওয়ারের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।”
আমজাদ সরকারের কথা শেষ হওয়ার আগেই আর্য বলে উঠল। ছেলের কথা শুনে আমজাদ সরকার কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। এরকম চলতে থাকলে এই ছেলে পুষ্পর জন্যই ক্ষতিকর হয়ে উঠবে! উনি এবার শান্ত কণ্ঠে বললেন—
– “নিশি লোক লাগিয়েছিল, কিন্তু সেই লোক পুষ্পামাকে কিডন্যাপ করেনি। কিডন্যাপের সাথে নিশির লোক জড়িত ছিল না।”
– “না থাকলেই ভালো! আমি যদি পরে জানতে পারি, যেই লোক কিডন্যাপ করেছে ওই লোকের সাথে ওর কোনো যোগাযোগ আছে, কসম, ওকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরিয়ে আনব আমি! কান খুলে শুনে রাখ, আমার ফ্লাওয়ারের দিকে যেই চোখ তুলে তাকাবে, সেই চোখ তুলে নিতেও দুবার ভাববে না এই আর্য!”

কথাগুলো বলে যেই না সিঁড়ির দিকে যেতে নেবে, অমনি আর্যর চোখ পড়ে—সিঁড়ির ওপরে শেহনাজ সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পুষ্প। আর্যকে তাকাতে দেখেই পুষ্প শেহনাজ সরকারের পেছনে লুকিয়ে যায়। আর্যর এমন রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেছে পুষ্প; সে এমনিতেই আর্যকে একটু বেশি ভয় পায়, কারণ যতবার আর্য রেগেছে, ততবারই পুষ্পকে আর্যর রাগের শিকার হতে হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই সে এখনো ভয় পাচ্ছে।
পুষ্পকে ভয় পেয়ে নিজের মায়ের পিছনে লুকাতে দেখে আর্যর বুক ধক করে উঠল। তার ফ্লাওয়ার আবারও তাকে ভয় পেয়ে দূরে সরে যাবে! নো, নো, সে তো এটা চায়নি! তাই তো সে বাড়িতে আসার আগে থেকেই নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করছিল, যাতে তার ফ্লাওয়ালের মন থেকে তার প্রতি ভয়টা কমে যায়; কিন্তু বাড়িতে এসে এই নিশিকে দেখে রাগ কন্ট্রোল করতে পারেনি, তবুও চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়েছিল পুষ্পকে না দেখে নিশির ওপর চড়াও হয়েছিল। কিন্তু এখন আবারও তাকে ভয় পাচ্ছে তার ফ্লাওয়ার।

এদিকে শেহনাজ সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনি ভেবেছিলেন, পুষ্পর প্রতি আর্যর যেটা আছে সেটা সাময়িক মোহ; কিন্তু ছেলের এই রূপ দেখে উনি খুশি হতে পারলেন না। ভালোবাসা সুন্দর, কিন্তু পুষ্পর জন্য ছেলের মধ্যে যেটা দেখতে পারছেন উনি, সেটা অন্ধ আসক্তি, যা সব ক্ষেত্রে সুখের হয় না। এই ছেলে দেখা যাবে কোনো একদিন পুষ্পর দিকে তাকানো নিয়ে কহতব্য নয় এমন ভয়ংকর কিছু করে ফেলবে! কত হাজারো কেস ওনার হাতে এসেছে এমন, কিন্তু উনি তো এরকম কিছুই চাননি। উনি চেয়েছিলেন পুষ্পকে একটা সুন্দর-সুস্থ জীবন দিতে। ছেলেকে নিয়ে মেয়েটাকে হাসিখুশিভাবে, সুখে দেখতে চেয়েছিলেন। ছেলের আসক্তির মাত্রা ছাড়ালে কোনোদিন দেখা যাবে পুষ্পকে… নাহ, আর কিছু ভাবতে পারলেন না তিনি।
আর্য পুষ্পর কাছে এগোতে চাইল। এতে পুষ্প ভয় পেয়ে শাশুড়ির শাড়ির আঁচল খামচে ধরল। আর্য পুষ্পর কাছে আসার আগেই শেহনাজ সরকার পুষ্পকে নিয়ে সিমরানের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। এতে আর্য আরও রেগে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত নিশির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। সব হয়েছে এই মেয়ের জন্য! যদি এই মেয়ে তার সামনে না আসত, না তার রাগ কন্ট্রোল হারাতো আর, না তার ফ্লাওয়ার তাকে আবার ভয় পেত। ইচ্ছে তো করছে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিতে!
নাহ, এখন রাগ দেখালে চলবে না। এখন আগে তার সহজ-সরল বউটাকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে হবে, নাহলে দেখা যাবে তার মা বউকে সহজ-সরল পেয়ে তার নামে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে আরও দূরে করে দেবে। সে এবার সিমরানের রুমের দরজার সামনে গিয়ে ডাকল—

– “আম্মু, দরজা খোলো।”
ভিতর থেকে না খোলে দরজা, না আসে কোনো উত্তর। আর্য আবারও বলল—
– “দেখো আম্মু, আমি জানি তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, তাই বলছি ভালোই ভালো দরজা খুলে আমার বউকে দিয়ে দাও। তুমি আমার সহজ-সরল বউকে একদম আমার নামে উল্টাপাল্টা বোঝাবে না।”
শেহনাজ সরকার শুনেও না শোনার মতো করে থাকলেন। আর্য আরও কয়েকবার ডেকে কোনো উত্তর না পেয়ে রেগে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এদিকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই অবাক হচ্ছে আর্যর এই রূপ দেখে।
নিশি ভয় পেয়ে আছে, এখনো তার কানে বাজছে আর্যর শেষ কথাগুলো—কিডন্যাপের সাথে তার যোগাযোগ পেলেই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ঘুরিয়ে আনবে আর্য! যদি জানতে পারে নিশি এসবের সাথে জড়িত ছিল, তাহলে কী করবে তার সাথে? ভাবতেই ঘামতে শুরু করে নিশি। সে এবার তড়িৎগতিতে ওপরে গেস্টরুমে চলে গেল।

আর্য রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিল। কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা খেয়াল করতেই ভ্রু কুঁচকে গেল—পুষ্পর কাপড়ের ব্যাগ নেই, শু-র্যাকে পুষ্পর কোনো জুতো নেই, ড্রেসিং টেবিলে পুষ্পর হেয়ার অয়েল, ক্লিপ, রাবার ব্যান্ড—কিচ্ছু নেই! আর্যর বুঝতে বাকি রইল না, তার মা সত্যি সত্যি তার ফ্লাওয়ারকে তার থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছেন, রুম পর্যন্ত আলাদা করে দিয়েছেন! তার ফ্লাওয়ারের একটা জিনিসও তাঁর রুমে রাখেনি। এমনিতেই তার ফ্লাওয়ার তার সাথে সহজ হচ্ছে না, ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে—যদিও তার নিজের ব্যবহারের কারণেই তার মনে ভয় বাসা বেঁধেছে। কিন্তু এখন যদি তার মন থেকে ভয় না কমে, বউ তো সারাজীবন ভয় পেয়ে তার থেকে দূরে থাকবে! তার ওপর তার মা যেভাবে দূরে সরিয়ে রাখছে, কে জানে কী বলে আরও ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। আর্যর রাগ হচ্ছে নিজের ওপর—কেন সে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না!

এদিকে সিমরানের রুমে পুষ্প শুয়ে আছে, আর তার পাশে বসে শেহনাজ সরকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। উনি পুষ্পকে জিজ্ঞেস করলেন—
– “তখন আর্যকে দেখে ভয় পেয়েছিলি কেন?”
পুষ্প শাশুড়ির কথা শুনে চুপ করে রইল। সে তো ফুফুমণির কথা মতো সাহসী হওয়ার চেষ্টা করে, নিজের মনকে বোঝায় যে কাউকে ভয় পাবে না; কিন্তু সবার ক্ষেত্রে মনকে মানাতে পারলেও সরকার সাহেবের সামনে গেলেই মন আর তার কথা শোনে না, মন নিজেই ভয়ে পালাতে চায়! আর যখন সরকার সাহেব রেগে থাকেন, তখন তো সে না চাইতেও ভয়ে কেঁপে ওঠে, ইচ্ছে করে সরকার সাহেবের সামনে অদৃশ্য হয়ে যেতে। রেগে গেলে উনি শুধু তাকে কষ্ট দেন, চোয়াল চেপে ধরে—মনে হয় চোয়ালের হাড় ভেঙে ফেলতে চাইছেন, নয়তো চড় মারেন। তাই তো সে না চাইতেও গুটিয়ে লুকিয়ে যায়। সে এবার মিনমিন করে বলল—
– “উনি রেগে ছিলেন, দেখোনি নিশি আপুকে কীভাবে মারছিলেন?”
– “নিশি দোষ করেছে, তাই মেরেছে! আমিও তো মেরেছি। এতে ভয় পাওয়ার কী আছে? নিজের মন থেকে ভয়টা কমা এবার!”

পুষ্পর কথা শেষ হওয়ার আগেই শেহনাজ সরকার বললেন। পুষ্প এবার বলল—
– “আমি তো চেষ্টা করি যাতে ভয় না পাই, কিন্তু ওনাকে দেখলেই ভয়েরা আবার হানা দেয়—এই বুঝি আবার রেগে যাবেন, আমাকে আজেবাজে কথা বলবেন, নয়তো মারবেন।”
– “তুই না আর্যর সাথে সংসার করবি?”
পুষ্প এবার শাশুড়ির দিকে তাকাল, যেন বলছে—সংসার করার সাথে ভয় পাওয়ার কী সম্পর্ক? সেই চাহনির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন—
– “তো যার সাথে সংসার করবি, তাকে এত ভয় পেলে সংসার করবি কী করে? তোর কিছু প্রয়োজন হলে তাকে বলবি কী করে?”
– “আমার কিছু প্রয়োজন হলে তোমাকে বলব! ওনাকে কেন বলব?”
পুষ্পর এমন কথা শুনে হাসলেন শেহনাজ সরকার। তিনি এবার শান্ত কণ্ঠে বলতে লাগলেন—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৫

– “আমি তোর সাথে আছি, থাকবো; কিন্তু সেটা মায়ের মতো। কিন্তু আর্য তোর সাথে থাকবে তোর জীবনসঙ্গী হয়ে। আর জীবনসঙ্গী কীরকম হয় জানিস? যাকে তুই তোর সব প্রয়োজন নির্দ্বিধায় বলতে পারবি, যার সামনে তোর কোনো ভয়, সংকোচ বা জড়তা থাকবে না; তোর ছোট ছোট সমস্যা জানাতে পারবি, নিঃসংকোচে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সবকিছু নির্দ্বিধায় আবদার করতে পারবি। এত সহজ হতে হবে তোকে আর্যর সাথে! সেখানে তুই যদি ভয় পেয়ে তোর সমস্যার কথা, প্রয়োজনের কথা আর্যকে কিছু না জানিয়ে অন্য কাউকে বলিস, তাহলে সেটা আর্যর কাছে কতটা লজ্জার হবে? তার বউ নিজের সমস্যার কথা তাকে না জানিয়ে অন্য কাউকে বলছে! সে তো নিজেকে ছোট মনে করবে যে, সে এখনো তোর বিশ্বাসের জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি, তাই তুই তাকে কিছু না জানিয়ে অন্য কাউকে জানিয়েছিস। সে অন্য কেউটা আমি হই না কেন—বুঝতে পেরেছিস?”

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here