Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৯

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৯

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৯
রুপা

আর্য এতবার জিজ্ঞেস করার পরেও পুষ্প কিছু না বলায় আর্য এবার রেগে ধমক দিয়ে উঠল—
– “স্টুপিড, চুপ করে আছ কেন? কাঁদছ কেন, ড্যামইট?”
আর্যর চিৎকার শুনে পুষ্প ভয় পেয়ে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল! সেটা দেখে আর্য এবার আরও অস্থির হয়ে উঠল। সে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টা করে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় কিছু একটা খেয়াল করতেই সে পুষ্পকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজেই রুম থেকে বের হয়ে গেল! আর পুষ্প, সে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল।
পুষ্প রুমে এসে দেখল আর্য কোথাও নেই। সে এবার গিয়ে সোফায় বসে নিজের কাঁধ থেকে জামাটা একটু নামাতেই দেখতে পেল ক্ষত, যেটা আর্যর নখের দংশনে হয়েছে; রক্ত পড়ছে। ক্ষতগুলো দেখে পুষ্প আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কেন হচ্ছে তার সাথে এসব? সে তো লোকটার থেকে দূরে থাকে সবসময়, নিজেই কাছে এসে আবার নিজেই আঘাত করে দূরে থাকতে বলে!

শেহনাজ সরকার নিচে পানি নিতে এসেছিলেন। যাওয়ার সময় হঠাৎ কারো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ পেয়ে পা জোড়া থেমে যায়। খেয়াল করে দেখলেন শব্দটা আর্যর রুম থেকে আসছে। তাকিয়ে দেখলেন দরজা খোলা। দরজার সামনে দাঁড়াতেই দেখলেন সোফায় বসে কাঁধের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে পুষ্প। মুহূর্তেই অস্থির হয়ে এগিয়ে গেলেন শেহনাজ সরকার। পাশে বসে পুষ্পর আদুরে মুখটা নিজের হাতের আজলায় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
– “কী হয়েছে পুষ্প, কাঁদছিস কেন?”
বিষয়টা হঠাৎ হওয়ায় পুষ্পর বুঝতে একটু সময় লাগল, কিন্তু বুঝতে পেরেই নিজের ক্ষত লুকাতে চাইল সে। কিন্তু তার আগেই শেহনাজ সরকারের চোখে পড়ে যায় সেটা, আর তা দেখেই চোখ-মুখ শক্ত হয়ে যায় তাঁর।
– “আর্য করেছে এসব?”
শেহনাজ সরকারের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে পুষ্প ভয় পেয়ে যায়। এখন যদি ফুফুমণি জানেন এসব সরকার সাহেব করেছেন, তাহলে আবার মা-ছেলের মধ্যে ঝামেলা হবে; এমনিতেই সে আসার পর থেকেই দুজনের মধ্যে ঝামেলার শেষ নেই! পুষ্প মিনমিন করে বলল—

– “ফুফুমণি, আসলে উনি…”
– “এক কথায় উত্তর দে পুষ্প, হ্যাঁ বা না?”
– “উনি ইচ্ছে করে করেননি ফুফুমণি!”
শেহনাজ সরকার আর কিছু শুনলেন না। খুঁজে ফার্স্ট এইড বক্স এনে পুষ্পর ক্ষত জায়গায় মলম লাগিয়ে দিলেন। বক্সটা আবার জায়গায় রেখে দিয়ে পুষ্পকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন—
– “পুষ্প মা, তোর বয়স অনেক ছোট, এখনো অবুঝ; কিন্তু তুই এই বয়সে অনেক কিছু সহ্য করেছিস! তাই তোকে আর্যর সাথে বিয়ে দিয়ে একটা সুন্দর জীবন দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে আমি ব্যর্থ হচ্ছি; মনে হচ্ছে তোকে এক নরক থেকে তুলে এনে আরেক নরকে রেখেছি আমি। এখন যদি আমি তোদের বিয়ে বাতিল করে তোকে আলাদা করে দিই, তাহলে তোর ওপর একটা দাগ পড়ে যাবে—‘ডিভোর্সি’। সমাজের মানুষের কটু কথার তীর বাঁকা চোখের চাহনি বৃদ্ধ করবে, যেটা আমি চাইনি। তাই তোকে সবসময় আর্যর আশেপাশে রেখে তোর প্রতি আর্যর একটু মায়া বাড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আর না, আর্য শুধরানোর নয়! এই ছেলে কোনোদিন ঠিক হবে না। তাই এখন আমি তোর মতামত চাই, তুই আর্যর সাথে থাকতে চাস নাকি মুক্তি চাস? আমাকে বল, আমি সব ব্যবস্থা করব। চিন্তা করিস না, আর্যর সাথে আলাদা হলেও তোর দায়িত্ব আমার, আমি তোকে নিজের হাতে তৈরি করব; তুই এই বাড়িতেই থাকবি!”

শেহনাজ সরকারের সব কথা মন দিয়ে শুনল পুষ্প। সে বুঝতে পারছে ফুফুমণি সরকার সাহেবের ওপর থেকে ভালো হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন সে কী করবে, কী বলবে—কিছুই বুঝতে পারছে না। সে কিছু বলবে, তার আগেই রুমে প্রবেশ করে আর্য। তাকে দেখে শেহনাজ সরকার উঠে দাঁড়ান। যেতে যেতে আর্যকে বললেন—
– “পুষ্পর গায়ে যদি আর একটা ফুলের টোকাও পড়ে, তাহলে মনে রেখো এই বাড়িতে তোমার জায়গা হবে না! আর তুমি খুব ভালো করে জানো, আমি যা বলি তা করেই ছাড়ি!”
কথাগুলো বলে চলে গেলেন শেহনাজ সরকার। আর্য একপলক পুষ্পর দিকে তাকিয়ে দেখল, কান্নার ফলে ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে। আর্য গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। এদিকে পুষ্প মাথা নিচু করে সোফায় বসে থাকে, পুষ্প ঠান্ডা মেঝের দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে আর্য বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে গেছে। পুষ্প আর কিছু না ভেবে এগিয়ে গিয়ে বিছানা থেকে একটা বালিশ নিয়ে ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে পড়ে। ঠান্ডা লাগলেও তার এখানে শোয়া ছাড়া উপায় নেই। ঠান্ডা মেঝেতে শরীর এলিয়ে দিতেই পুষ্প কুঁকড়ে যায়; ওড়না দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে, হাত দুটো আড়াআড়িভাবে জড়িয়ে ধরে। একসময় ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘুমপরীরা এসে হানা দেয় পুষ্পর চোখে!

পুষ্প ঘুমিয়ে যেতেই আর্য উঠে বসে। সে ঘুমায়নি; সে এতক্ষণ পুষ্প কী করে, সব লক্ষ্য করছিল। সে এবার গিয়ে পুষ্পর পাশে মেঝেতে শুয়ে পড়ে, নিজের হাতের ওপর মাথা দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পুষ্পর মায়াবী মুখের দিকে। বাচ্চাদের মতো মুখটা কান্নার ফলে লাল হয়ে গেছে, যা দেখে আর্যর চেহারায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না। সে বিড়বিড় করে বলল—
– “আম্মু ঠিক কথাই বলেছে, ছেড়ে দাও আমাকে। আমি তোমাকে টলারেট করতে পারি না! একদম সহ্য হয় না তোমাকে, আই জাস্ট হেট ইউ!”
আর্য একটু থেমে আবার বলল—

– “তুমি আমাকে না ছাড়লে আমি বাধ্য করব তোমাকে আমায় ছাড়তে। কতদিন সহ্য করতে পারো, আমিও দেখব! আমার জীবনে কোনো মেয়ের অস্তিত্ব রাখব না আমি। তোমরা মেয়েরা হচ্ছ পুরুষের ধ্বংসের কারণ, ছলনাময়ী নারী! নিজেরা ছলনা করে ভালোবাসতে বাধ্য করো, মাঝপথে ছেড়ে চলে যাও; তারপর বিপরীত দিকের মানুষটা তিল তিল করে মরে, তোমরা দেখেও না দেখার ভান করো। অনেক পুরুষ সেটা সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।”
কথাগুলো বলতে বলতে আর্যর গলা বুজে আসে। সে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। পুষ্পকে কুঁকড়ে থাকতে দেখে বিছানা থেকে কমফোর্টারটা নিয়ে পুষ্পর গায়ে ছুড়ে মারে। হঠাৎ কিছু গায়ে পড়ায় পুষ্প হকচকিয়ে ঘুম ভেঙে গেল। সে কিছু বোঝার আগেই আর্য কর্কশ গলায় বলল—
– “এই মেয়ে, যাও গিয়ে সোফায় ঘুমাও। মেঝেতে শুয়ে ঠান্ডা লেগে জ্বর উঠলে তোমার ফুফুমণি বলবে আমি করেছি সব, আমার কারণে তোমার জ্বর হয়েছে।”
পুষ্প অবাক হয়ে তাকায় আর্যর দিকে। সরকার সাহেব কখন থেকে ফুফুমণিকে ভয় পেতে শুরু করল? তবুও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হলো না, গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে। এদিকে আর্য আবার বারান্দায় গিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া ওড়াতে লাগল।

সকালে উঠে নাস্তা খেয়ে যে যার কাজে চলে গেল। শেহনাজ সরকার পুষ্পকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। পুষ্পকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে নিজে ল’ ফার্মে চলে যান। পুষ্প কলেজের গেট দিয়ে ঢুকতেই সারা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল—
– “জানিস, তোকে অনেক মিস করছি আমি!”
পুষ্প হেসে ওঠে সারার কথায়। হ্যাঁ, পুষ্প মন খুলে হাসতে শিখেছে শুধু সারা আর সিমরানের সাথে; এই হাসির পেছনে ভয় লুকিয়ে থাকে না, মন থেকে হাসে। সে বিনিময়ে বলল—
– “আমারও তোর কথা খুব মনে পড়ছিল। জানিস, গতকাল আমি সিমরান আপু, আহনাফ ভাইয়া ঘুরতে গেছিলাম। নৌকায় চড়েছি।”

– “আর কী কী করলি?”
এভাবে দুজনে গল্প করতে লাগল। একটা কথা আছে না— ‘সঙ্গদোষে লোহা ভাসে’, ঠিক যেন সেরকম। সারার অতিরিক্ত কথা বলা পুষ্পর সাথে মিশে গেছে, আর পুষ্প তার জবাবে উত্তর দিতে দিতে সে নিজেও বেশ কথা বলে। বাড়িতে থাকা পুষ্প আর কলেজে থাকা পুষ্পকে অচেনা কেউ দেখলে মনে করবে দুটো আলাদা মানুষ, শুধু চেহারাটা একই! কথার মধ্যেই সারা বলে ওঠে—
– “জানিস, আজকে আর্টসের নতুন টিচার আসবে। শুনেছি লোকটা খুব সুন্দর, স্মার্ট!”
– “তুঁই কীভাবে জানলি?”
– “আরে, ক্লাসের মেয়েরা বলাবলি করছিল! সেখান থেকে জানতে পেরেছি।”
পুষ্প আর কিছু বলল না, দুজনে ক্লাসে ঢুকে গেল। দুটি ক্লাস শেষ করে বসে আছে পুষ্প আর সারা। এর মধ্যে ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেন একজন সুদর্শন পুরুষ, বয়স হবে হয়তো আটাশের কাছাকাছি। পুরুষের হাতে আছে ‘যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র’ বই। সে এগিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে, টেবিলের ওপর বইটা রেখে সবার উদ্দেশ্যে বলল—

– “হ্যালো স্টুডেন্টস, কেমন আছো সবাই?”
সবাই একসাথে বলে উঠল—
– “ভালো আছি আমরা, আপনি কেমন আছেন স্যার!”
– “আলহামদুলিল্লাহ, আমিও ভালো আছি। আমি স্নিগ্ধ সায়ান, তোমাদের নতুন স্যার। আজকে থেকে যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র ক্লাসটা নেব আমি। আশা করি তোমরা কো-অপারেট করবে!”
স্নিগ্ধকে দেখে মেয়েরা ফিসফাস শুরু করেছে। এদিকে নতুন স্যারকে দেখে সারা পুষ্পর কানে কানে বলল—

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ৮

– “পুষ্প, এই লোক এখানে কেন?”
পুষ্প-ও ফিসফিস করে বলল—
– “ তুই চিনিস ওনাকে?”
সারা কিছু না বলে চুপ করে থাকে।
এদিকে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দেখা যায় স্নিগ্ধর ঠোঁটে!

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here