অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৭
ফাহিমা ইসলাম
রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে যখন প্রথম আলোর সূক্ষ্ম তীর ধরণীর বুকে এসে বিঁধেছে। তখন যেন নিস্তব্ধ পৃথিবী ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পায় আবারও। আকাশ এখন মৃদু সোনালি রঙে রঞ্জিত, যেন প্রকৃতি নিজেই ধীরে ধীরে খুলে দিচ্ছে তার ঘুমন্ত আঁচল। সারা রুম জুড়ে আলোয় ছড়াছড়ি। তূর্ণা রোদেলাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। রোদেলা তার কোলে বসে তার পুতুল দিয়ে খেলা করছে; তূর্ণাও একটু পর পর কথা বলছে। দুনিয়ার যত গল্প আছে দু’জন শুরু করে দিয়েছি। সারাদিন তাদের এইভাবেই কাটে, তূর্ণা এখন রৌদ্রিক আর রোদেলার সঙ্গে একদম ভরে উঠে পরে। রুমা সিকদার তাকে নামাজের নিয়ম গুলো শিখিয়ে দিয়েছে, পুরোপুরি ভাবে না পারলেও তূর্ণা শিখছে সবকিছু আস্তে আস্তে। রুমা সিকদার প্রতিদিন একটা করে সূরা শিখায় তাকে, সঙ্গে রোদেলাও শেখার চেষ্টা করে। একসঙ্গে তূর্ণা আর রোদেলা দু’জনই সূরা আর দোয়া শিখছে।
রৌদ্রিক হসপিটালে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। হুট করেই কিছু মাথায় আসতে সে তূর্ণা দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ মেডিসিন নাওনি কেনে এখনো? বলেছিনা খাওয়া শেষ হলে নিয়ম করে মেডিসিন নিবে।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা মুখটা কুঁচকিয়ে ফেলে বাচ্চাসুলভ বিরক্তিতে। এরমানে সে খেতে চায় না এইসব তিঁতা মেডিসিন; তূর্ণা নাক কুঁচকিয়ে বলে-
“ ওইগুলো অনেক পঁচা খেতে, আমাকে মিষ্টি ঔষধ এনে দাও না বর। ওইযে একটা গোলাপি গোলাপি মিষ্টি মধুর মত,ওইগুলো এনে দাও। ওইগুলো খেতে মজা অনেক!”
“ পঁচা হলেও খেতে হবে, এক মাসের মধ্যে নিয়ম করে এইসব খেতে হবে। আর ওইটা জ্বরের সিরাপ, ওইটা খেলে জ্বর যাবে।”
“ তাহলে আমি ওইটা খাবো, ওইটা খেতে ইয়ামি ইয়ামি অনেক!”
রৌদ্রিক গম্ভীর ভাবে তূর্ণাকে দেখে নিলো। সকালে রৌদ্রিক খাইয়ে দিয়ে যায় মেডিসিন, বাকি সময় রুমা সিকদার খাইয়ে দেয়। তূর্ণাকে মেডিসিন খাওয়াতে বেশ বেগ পোওয়াতে হয়।
“ ওইটা খেলে তো তুমি সুস্থ হবে না, উল্টো অসুস্থ হবে। কারণ ছাড়া কোনোকিছুই ভালো না। এখন খেয়ে নাও গুড গার্লের মত!”
ওদের কথার মাঝেই রোদেলা নজরকাঁড়া হাসি দিয়ে বলে ওঠে-
“ আনি তুত দাল..আনি তুত দাল পাপা।”
“ আই নো মাই প্রিন্সেস, কিন্তু একজন গুড গার্ল না তোমার মতো।”
বাবা-মেয়ের কথা শুনে তূর্ণা মন খারাপ হয়ে যায়। সেও গুড গার্ল, সে তো সব কথা শোনে। খালি একটু মেডিসিন খেতে চায় না, তূর্ণা মুখ গোমড়া করে বলে-
“ আমিও গুড গার্ল পুতুল। আমি তো সব কথা শুনি।”
রোদেলা আবারও বলে-
“ হু..পাপা তলে তুনি তুত দাল না।”
তূর্ণা মুখ গোমড়া করে রৌদ্রিকের দিকে তাকায়। বর তাকে এইভাবে পঁচা মেয়ে বলতে পারলো? সে তো সব কথা শোনে, তূর্ণা মুখ ফুলিয়েই রোদেলাকে এক সাইডে নামিয়ে দিয়ে পাশ থেকে একে একে সব মেডিসিন বেডের উপর রাখলো। রৌদ্রিক সবকিছু দেখিয়ে দিয়েছে, কোনটা কোনটা খেতে হয়। তাই সেইভাবেই একটা একটা করে মেডিসিন নিয়ে নিলো। তারপর নাক-মুখ কুঁচকিয়ে সেটা পানি দিয়ে খেয়ে নিলো। রৌদ্রিক নীরবে সবটা দেখলো, ওষ্ঠপুটে ক্ষীণ হাসির রেখার দেখা মিললো। তূর্ণা মেডিসিন খেয়ে রোদেলা আর রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে মুখ গোমড়া করে বলে-
“ আমিও গুড গার্ল বর, পুতুল দেখ আমিও তোমার মত গুড গার্ল। তূর্ণা একদমই পঁচা মেয়ে না,তূর্ণাও তার পুতুলের মত গুড গার্ল!”
রৌদ্রিক হাতে ঘড়ি পরতে পরতে শান্ত ভাবে বলে-
“ এইভাবে সব কথা শুনলেই তুমি ভালো মেয়ে। কিছু খাবে? আইসক্রিম বা অন্যকিছু?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রোদেলার মন খুশিতে নেচে ওঠে। সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলে-
“ আনি খাবু,আনি খাবু আইততিলিম আইতিলিম!”
রৌদ্রিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে শাসনের স্বরে বলে-
“ একদমই না, তোমার ঠান্ডার সমস্যা আছে। যা খেতে চাও দিদুনদের বলবে তাহলে বানিয়ে দিবে।”
রোদেলা ঠোঁট উল্টালো। রৌদ্রিকের দিকে ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলে-
“ এত্তু থাই পাপা?’ এরপর হাতের সাহায্য অল্প একটু দেখিয়ে মায়া মায়া চোখ করে বলে-
“ এত্তুই থাবু পাপা!”
“ না একটুও না এখন। পরশুদিন খেও, অনেকগুলো আনবো সেদিন।”
রোদেলা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল। এই একটা জিনিস যেটার সঙ্গে বাবা-মেয়ের প্যাঁচ লেগেই থাকবে। রোদেলাকে বাহিরের তেমন কিছুই খেতে দেওয়া হয় না; যতটুকু খায় সবই বাড়ির বানানো খাবার। রোদেলা আইসক্রিম খেতে বেশ পছন্দ করে। রোদেলা জন্য রুমে ছোট্ট একটা ফ্রিজও আছে। ফ্রিজে বিভিন্ন ধরনের চকলেট থেকে শুরু করে প্রায় সব খাবারই আছে। যেগুলো রোদেলা খেতে পছন্দ করে, তবে সেটাও নিয়ম করে দেয়। রোদেলার কোল্ডের সমস্যা আছে, তাই হিসাব করে সবকিছু দেয়। তূর্ণা এতক্ষণ বাবা-মেয়ের কথা শুনছিল চুপ করে।
“ আইসক্রিম খাবো, এইটা কি খেতে মজা খুব বর?”
“ মজা তবে হেলদি না। ট্রাই করবে?”
তূর্ণা চোখ-মুখ জ্বলে উঠলো। তার এতটা দূর্ভাগ্য যে কয়েক মুঠ ভাত ছাড়া তার কপালে আর কিছু জুটেনি। দূর থেকে অন্যদের খেতে দেখেছে শুধু। একবার সাজিদের জন্মদিনের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রতিবারই করা হয় রূপা আর সাজিদের জন্মদিন বেশ আয়োজন করেই। শুধু তার বাদে বাড়ির বাকি দু’জনেরই জন্মদিন ঘরোয়া ভাবে বেশ জাঁকজমক ভাবেই করা হয়। ওইবারও বাদ পরেনি, সেদিন সারাদিন তূর্ণা না খাওয়া। বাড়ির কাজের উপরেই তার দিন কেটেছে, খুদায় পেটে তার ইঁদুর দৌড়চ্ছিল। আয়োজনে বেশ ভালো ভালো খাবার রান্না করা হয়েনি। রাতে সবাই যাওয়ার পর তূর্ণা নিজের খিদেকে আর ধরে না রাখতে পেরে; নিজেই খাবার তুলে খেতে শুরু করে দিয়েছিল। মাংস তার খাওয়াই পরে না, তাই অনেকদিন পর মাংস দেখে তূর্ণা লোভ সামলাতে না পেরে এক পিস মাংসের টুকরো নিয়েছিল।
সেটাই যেনো তূর্ণার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সেলিমা খাতুন রান্না ঘরে এসে যখন দেখলেন তাকে না বলেই তূর্ণা খাবার খাচ্ছে। তখন যেনো তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়, ক্ষোপে ফেঁপে ওঠেন তিনি। তূর্ণার মুখের সামনে থেকে খাবারের প্লেটটা কেড়ে দিয়ে গর্জে ওঠেন তিনি-
“ তোর সাহস কি করে হয় মুখপুরি আমাকে না বলে খাবার খাওয়ার? আবারও মাংসও নিয়েছি তুই! জিহ্বা দিন দিন বড় হচ্ছে তোর।”
সেলিমা খাতুনের আগমনে হকচকিয়ে যায় তূর্ণা। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সেলিমা খাতুনের দিকে তাকায় সে। মাত্র দু’নলা মুখে দিয়েছি ভাত, তূর্ণা ভয়ে ভয়ে কোনো রকমে বলে ওঠে-
“ আ..আমায় মে*রো না! আ..আমার খুব খিদে পেয়েছে। আমায় মে*রো না, খুব ব্যথা লাগে আমার!”
সেলিমা খাতুন আরও গর্জে উঠলেন। তিনি খাবারের প্লেটটা ছুঁড়ে মে’রে তূর্ণার চুলের মুঠি শক্ত করে টেনে ধরে; দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ তোর সাহস দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, এই নোংরা হাতে কোন আক্কেলে খাবারে হাত দিয়েছি তুই? এত খাস তাও পেট ভরে না তোর রাক্ষস! আজকে তোকে দেখাবো মাংস খাওয়ার ফল। খুব সখ না ভালো ভালো খাওয়ার।”
বলেই টানতে টানতে তূর্ণাকে বাহিরে টেনে নিয়ে যায়। একেই বর্ষা কাল, নিস্তব্ধ নিশীথ বাহিরে ঝড়বাতাস বইছে। বৃষ্টি নামবে বলে মনে হচ্ছে, একটু পর পর মেঘ গর্জে উঠছে। সেলিমা খাতুন তূর্ণাকে বাহিরে এনে মাটিতে ছুঁড়ে মে’রে দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ আজকের রাতটা তুই এখানেই থাকবি। তোর শাস্তি এটা, খুব সখ না টোব্বা টোব্বা খাওয়ার।”
সেলিমা খাতুনের কথা শুনে আঁতকে উঠলো তূর্ণা। কাঁদতে কাঁদতে সেলিমা খাতুনের পা আঁকড়ে ধরে রিনরিন করে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“ আ..আমি আর না বলে খাবো না। আমি মাংস খাবো না আর! তাও আমাকে এখানে একা রেখো না! দেখ আকাশ কেমন করে ডাকছে! আমার খুব ভয় লাগছে। তূর্ণা আর মাংস খাবে না, আমায় একা রেখে যেও না!”
সেলিমা খাতুন কি শুনলো তূর্ণা এই আর্তনাদ? তূর্ণাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাড়ির ভিতর চলে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। তূর্ণা পাগলের মত কান্না করতে করতে দরজায় কড়া নাড়তে থাকে; তবে ভিতরে থাকা মানুষগুলো কান অব্দি তার এই আর্তচিৎকার পৌঁচ্ছালো না। ধীরে ধীরে কৃষ্ণবর্ণ নীলিমার জুড়ে বৃষ্টি নামলো মুষলধারে। আকাশ যেনো চিৎকার দিয়ে জানাচ্ছে তার ভয়ংকর উপস্থিতি। বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার তূর্ণা! অসহায়ের মতো কান্না করতে করতে দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলে ওঠেছিল-
“ ও বাবা আমাকে ভিতরে আসতে দাও না! আমার অনেক ঠান্ডা লাগছে। এখানে মেঘগুলো কেমন করে ডাকছে, ও বাবা আমি আর মাংস খাবো না। আমাকে ভিতরে নাও না! আমার খুব ঠান্ডা লাগছে
এখানে।”
তবে কেউ শুনলো না তার এই আর্তচিৎকার! সকলেই যেনো বধির হয়ে গেছে। লুকমান হোসেন অব্দি একটি বারের জন্য কাছে আসেনি তার। বাবারা বুঝি এতটাই নিষ্টুর হয়? অসহায়ের মত বৃষ্টিতে সারারাত সেখানেই কাটাতে হলো তাকে। পরদিন ১০৮° জ্বরের বিছানায় পরেছিল; সেই সময়টাতেও কেউ তার পাশে এসে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি৷ সামান্য নাপা এনে খাইয়ে দিয়ে গেছে, যেনো তূর্ণা রাস্তার কোনো কীটপতঙ্গ। সেখানে এইসব মনে পরতেই তূর্ণার নেত্রজোড়া ভিজে উঠলো। এত সুখ তার ভাগ্যে ছিল, সেটা হয়তো সে কল্পনাও করেনি। জীবন বড়ই বিচিত্রময়। কখন, কাকে কোথায় এনে দাঁড় করাবে সেটার কুল-কিনারা কেউই বলতে পারে না।
“ এই তূর্ণা কি হয়েছে? এনিথিং ইজ রং?”
তূর্ণা কিছু বললো না, রৌদ্রিক আর ঘাটলো না বিষয়টা। ফ্রিজ থেকে একটা চকলেট আইসক্রিম বের করে চামুচ সহ তূর্ণা দিকে এগিয়ে দিলো। তূর্ণা নিবে কি-না প্রথমে বেশ দ্বিধায় পরলো। রৌদ্রিক ইশারা খেতে বললো, তূর্ণা কাঁপা কাঁপা হাতে তুলে নিলো। মুখে দিতেই কেমন মিশে গেলো সবটা, প্রথমবার নতুন সাধের কিছু খাওয়াতে বেশ ভালো লাগলো তূর্ণার। এইদিকে রোদেলা খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠলো, সেও খাবে। রৌদ্রিক মেয়েকে কোলে নিয়ে, নরমাল একরা চকলেট খুলে সেটা খেতে দেয়। তূর্ণা খেতে খেতে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে সরল মনে বলে-
“ এটা খেতে খুব মজা বর! আপনি অনেক ভালো বর।”
“ যখন খেতে মন চাইবে ওখান থেকে ভাবে তবে বেশি না। বেশি খেলে শরীর খারাপ হবে, আর রোদেলা চাইলে দিবে না। ওর নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
তূর্ণা নীরবে সবটা মেনে নিলো, মনের আনন্দে আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত। রোদেলা চকলেট পেয়ে সেটা খাওয়াতে ব্যস্ত।
দুপুরের প্রখরতা ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে যখন নতজানু হয়েছে, তখন বিকেল এসে ছড়িয়ে দিয়েছে এক বিষণ্ণ সোনালি আবরণ। সূর্যের আলো আর ততটা তীক্ষ্ণ নয়, তবে চারপাশে নেমে আসে এক অদ্ভুত ভেপসা গরম। পাখিরা ফিরে যাচ্ছে তাদের আশ্রয়ে, রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে আছে ইরা, ঘেমে একাকার সে। দিন যাচ্ছে গরমের পরিমাণটা বেড়ে যাচ্ছে, বৃষ্টি হলেও গরমটা যেনো তারচেয়ে বেশি। বাসায় যেতে আজকে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাবে, ক্লাস শেষ করে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিল। নতুন জায়গায় কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন বন্ধু হয়েছে; রাস্তায় সব ভর্তি রিক্সা। ইরা বিরক্ত হয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিলো, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে সামনে এগোলে তাও যদি রিক্সা বা সিএনজি পাওয়া যায়। বাসা থেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে-পরে লেগেছে তার মা। যার জন্য বাসায় থাকাটা মুসকিল হয়ে গেছে তার, এমনটা নয় যে এখনি তাকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুড়বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে। সবাই চাচ্ছে তার সঙ্গে কাবিন করিয়ে রাখতে; কিন্তু ইরা এইসবে এখন নেই। জীবনে তার প্রেম নামক ব্যস্তুর দেখা এখনো পায়নি সে, আর তার ইচ্ছে যে জীবনে প্রেম করেই বিয়ে করবে। মানে যার সঙ্গে তার মনের মিল পাবে তাকেই বিয়ে করে নিবে তারপর প্রেম! কিন্তু তার জীবনে প্রেম নাম রোগের আগমনের নাম নেই।
আনমনেই হাঁটতে হাঁটতে কখন যে রাস্তার মাঝে চলে এসেছে সেটার দিলে হুস নেই ইরার। হুট করেই ভীষণ জোরে হর্নের শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই চমকে ওঠে ইরা! নিজের কল্পনার জগৎ থেকে ছিটকে বের হয়ে আসে। পিছনে ফিরতে নিবে তার আগেই খুব জোরে তার অতি নিকট এসে ব্রেক কষলো কেউ।
ইরা ভয়ে দু-চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে নেয় সে। মুহুর্তের জন্য মনে হলো এই বুঝি যে শেষ! চারপাশের মানুষ এইদিকেই তাকিয়ে আছে। কিছু সময় পর পুরুষালী এক গম্ভীর, রুক্ষ স্বর ভেসে এলো তার কর্ণকুহরে।
“ চোখ কোথায় রেখে হাঁটেন? রাস্তায় হাঁটতে আসেন নাকি ভাবতে?”
ইরা চট করে চোখ মেলে তাকায়। সামনেই হেলমেট পর একটা ছেলেকে দেখতে পায়। হেলমেট পরে থাকার কারণে লোকটা গাম্ভীর্যের ঠাসা নেত্রজোড়া ছাড়া আর কিছুই দেখা গেলো না। ইরা বুকে থু থু দিয়ে কোনো রকমে ঢোক গিলে বলে-
“ আপনিও কোথায় চোখ রেখে বাইক চালান হ্যাঁ? দেখছেন তো আমি হাঁটছি তাহলে এইদিক দিয়ে কেনো আসলেন?”
ইরার কথায় বেশ বিরক্ত হলো শ্রাবণ। একেই তার মাথা গরম তারউপর, ইরার এমন বেহুদা কাজে বেশ চটে আসে সে। সে আর একটু দেরি করে ব্রেক করলেই বড় কিছু হয়ে যেতো। শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে রাগী স্বরে বলে ওঠে-
“ আপনি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মিস ওর মিসেস। রাস্তার মাঝখানে হাঁটলে যেকেউ এসে উড়িয়ে দিবে।”
শ্রাবণের কথা শুনে ইরা ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলো, সে সত্যিই হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার মাঝে চলে এসেছে। কিন্তু এখন নিজের দোষ শিকার করলে চলবে না; ইরা আমতা আমতা করে বলে ওঠে-
“ত..তো কি হয়েছে রাস্তা কি আপনার বাবার যে হাঁটতে পারবো না।”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে হয়ে গেলো ইরার কথা শুনে। নিজের রাগটাকে দমিয়ে দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ আমার বাবার না হলেও, জনগণের আর এইভাবে হাঁটলে জনগণের হাতে গণধোলাই খাওয়ার জন্য রেডি হয়ে থাকবেন। এবার রাস্তা থেকে শুরুন মিস ওর মিসের।”
ইরা মুখ ভেংচি কেটে সামনে থেকে সরে গেলো। শ্রাবণ আর দেরি না করে বাইক আবারও স্টার্ট দিলো। শ্রাবণ কিছু দূর যেতেই তার স্মৃতিচারণে কিছুটা একটা মনে আসতেই চমকে ওঠে সে! একটু আগের মেয়েটাই তো সেদিনের বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা মেয়েটা। তখন সে মেয়েটাকে ঠিক মতো দেখেনি, কিন্তু যতটুকু স্মরণে আছে ততটুকু আবারও স্মৃতির পাতায় ভাসতেই সে বাইক চালানো বন্ধ করে পিছনে তাকালো। অনেকটা দূরে চলে এসেছে সে, ইরার চিহ্নও দেখতে পেলো না সে। শ্রাবণ কি কিছু খুঁজে পেয়েও হারিয়ে ফেললো? ভাবতে পারলো না আর।
দিনের আলো ফুরিয়ে ধরণীতে রাত্রির আবির্ভাব ঘটেছে অনেকক্ষণ আগেই। চারিদিকে ছড়িয়ে পরেছে, কৃষ্ণবর্ণ এক ছায়া। রোমানা সিকদারের সঙ্গে বসে আছে তূর্ণা। টিভিতে চোখ তূর্ণার, রোমানা সিকদার তূর্ণার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন। রান্না ঘরে রুমা সিকদার আর জবা সিকদার রাতের রান্নার কাজে ব্যস্ত। কিছু সময় পর পুরুষেরা সব বাড়িতে আসবে, রোদেলা ঘরের ঘুমাচ্ছে।
“ মেঝ মা, তুমিও না খুব ভালো। কিন্তু পঁচা শ্বাশুড়ি আমায় কেনো পছন্দ করে না? আমি কি খুব পঁচা? ”
হঠাৎ তূর্ণার এমন কথা শুনে রোমানা সিকদার হাত চালানো বন্ধ করে হালকা হেসে বলে-
“ না তোমার পঁচা শ্বাশুড়িও খুব ভালো। তোমার উপর একটু রাগ করে আছে, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও দেখবে আর বকা দিবে না।”
তূর্ণার মনটা হালকা ভালো হয়ে উঠলো। সে হালকা হেসে আবারও জিজ্ঞেস করে-
“ শ্রাবণ ভাইয়ারা কখন আসবে? রিনি বাড়িতে নেই কেনো? রিনিকে অনেক মনে পরছে আমার! ওরা খুব ভালো জানো। আমার সঙ্গে সবাই মিশে ওরা!”
“ একটু পরই আসবে ওরা, আর রিনির পরীক্ষা চলছে পরীক্ষা শেষ হলে আসবে আবার।”
“ রিনি আমাদের সঙ্গে কেনো থাকে না মেঝ মা? পরীক্ষা কেনো দিচ্ছে সে?”
“ ওর কলেজ অনেক দূরে তাই ওইখানে থাকে। আর পরীক্ষা না দিলে কিভাবে বুঝবে সে ভালো করে পড়া-লোকা করছে কিনা।”
কলেজের কথা শুনে তূর্ণার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।
“ কলেজে অনেক অনেক বন্ধু আছে তাই না? আমিও পড়া-লেখা করতে চাই।”
“ আচ্ছা বাবা করিও, আগে ঠিক হও তারপর নাহয় সব করবে।”
তূর্ণা আরও কথা বললো কিছু সময়। তখনই সেখানে সকলের সঙ্গে রৌদ্রিকও প্রবেশ করলো বাড়িতে। আজকে সবাই তাড়াতাড়িই ফিরেছে, রৌদ্রিকের হাত ভর্তি বেশ অনেকগুলো খাবার। বিভিন্ন ধরনের চিপ্স সহ আরও অন্যান্য ড্রায় খাবার। এইগুলো সব তূর্ণা আর অর্ধেক রিনির জন্য এনেছে। কালকে ড্রাইভার দিয়ে রিনির কলেজে পাঠাবে অর্ধেক, আর বাকিগুলো তূর্ণা। সবার সঙ্গে কথা বলে রৌদ্রিক উপরে চলে যায়, রোমানা সিকদার তূর্ণাকেও রৌদ্রিকের পিছনে পাঠিয়ে দেয়। রুমে আসতেই রৌদ্রিক আগে মেয়ের কাছে চলে যায়; গভীর নিদ্রায় মগ্ন রোদেলা, গাল ফুলিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তূর্ণা চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে; রৌদ্রিকের দৃষ্টি তূর্ণার দিকে যেতেই শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে-
“ দুপুরে খাওয়ার পর মেডিসিন নিয়েছিলে?”
তূর্ণা মুখ গোমড়া করে বলে-
“ হুম নিয়েছি, আমি গুড গার্ল আর গুড গার্লরা সব কথা শোনে।”
রৌদ্রিক ক্ষীণ হাসে, হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৬
“ হুম যত কথা শুনবে ততো ভালো। এইসব তোমার বাট অতিরিক্ত এইগুলো খাবে না, মাঝেমধ্যে খাবে। নাহলো শরীর খারাপ লাগবে, আর কি খেতে ইচ্ছে করে সেটাও বলবে।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা খুশি হয়ে যায়। হাসি মুখে বলে-
“ সত্যি সব আমার বর?”
“ হুম তোমার সব।”
