অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১
ফাহিমা ইসলাম
সিকদার বাড়ির বড় বউ পাগল খবরটা মুহুর্তের মধ্যে বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পরেছে সারা মহল্লায়। বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত প্রতিটা লোকের মাঝে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পরেছে। বিয়ের বাড়ির হৈ-হুল্লোড়ের ভড়া মুহুর্ত কেটে গিয়ে ফিসফিসের শব্দ ভেসে আসচ্ছে। সিকদার বাড়ির বড় ছেলে রৌদ্রিকের আজকে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল এই বাড়ির বড় মেয়ে রূপা হোসাইনের সঙ্গে। কিন্তু তার বদলে বিয়ে হয়েছে এই বাড়ির মানসিক ভাবে অসুস্থ তূর্ণার! ব্যাপারটা কিছুক্ষণ আগেই জানা-জানি হয়েছে। যার বিয়ে হয়েছে সে কবুল বলেই নিজের গন্তব্যস্থলে চলে গিয়েছে। পরে রয়েছে শুধু তার পরিবার আর তার নববধূ!
সিকদার বাড়ির সকলেরই থমথমে হয়ে আছে। কেউই এমনটা হবে আশা করেনি তারা, তারা কি করবে বুঝে উঠতে পারছেন না। এদিকে লুকমান হোসেন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, এছাড়া তাদের হাতে অন্য উপায় ছিলো না তাদের। তার দুই মেয়ে আর এক ছেলে; রূপা ওনার বড় মেয়ে আজকে তারই বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো এই আসরে। তবে ভাগ্যে আজ অন্যকিছু লেখা ছিল হয়তো তাই সবকিছু কেমন উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে মুহুর্তের মাঝেই! রাশেদুল সিকদারের রাগে কপালের রগগুলো ফুলে উঠেছে, পাশ থেকে তার ভাই রশিদ সিকদার এগিয়ে এলেন।
“ ভাইজান কি করবেন এবার? এই মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে গেলো ভাবি তো মানবে না। জানেনই তো উনি কেমন, তারউপর রৌদ্রিকের জীবন নিয়ে কথা। এনাদের কি এমনি এমনি ছেড়ে দিবেন?”
রশিদ সিকদারের কথায় রাশেদুল সিকদার চিন্তায় পরে গেলেন বেশ! কি করবেন বুঝতে পারছে না, এদিকে রৌদ্রিকও এখানে উপস্থিত নেই। তার জীবনে এতো বড় ঝড় বয়ে যাচ্ছে অথচ সে নিজেই অনুপস্থিত! রাশেদুল লুকমান হোসেনর দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলে ওঠে-
“ আপনি এটা একদম ঠিক করেননি লুকমান সাহেব। আপনার মেয়ে যদি এই বিয়ে করবেই না তাহলে এই বিয়ে দিতাম না, তারপরও এতোগুলো মানুষের সামনে অপমান না করলেও পারতেন!”
লুকমান হোসেনের মাথাটা আরও একটু নুইয়ে গেলো৷ তারাও কেউই জানতো না যে রূপা এমনটা করে বসবে শেষ মুহুর্তের। বিয়ের জন্য এই মেয়েই সবচেয়ে খুশি ছিলো; অথচ শেষ মুহূর্তে এসে এইভাবে সমাজের মানে চুনকালি মাখিয়ে পালিয়ে গেলো। লুকমান হোসেন অপরাধী কণ্ঠে বলেন-
“ আমরাও জানতাম না এমন কিছু হবে, মেয়েটা হুট করে এমন কিছু করবে সেটা একবারও ভাবতে পারিনি। ও এই বিয়েতে রাজি ছিল হুট করে কি হলো জানি না!”
“ হুট করে হয়ে গেলো সব আর আপনারাও কিভাবে পারলেন অসুস্থ মেয়েটার সঙ্গে আমার ছেলেটার জীবন জুড়ে দিতে? সুস্থ থাকলে একটা কথা ছিল, তখন মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু এখন বিষয়টা কেমন হয়ে দাঁড়িয়েছে! তাছাড়া আমার ছেলে বিয়েটা মানবে কিনা জানি না।”
লুকমান হোসেন কি বলবেন ভেবে পেলো না। নিজের প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেছে রূপা। রূপা পালিয়ে যাওয়ার খবরটা প্রথম জানতে পারে তূর্ণার সৎ মা সেলিমা খাতুন। মেয়ের এহেন কান্ডে বেশ কষ্ট পেয়েছে সেলিমা খাতুন আর লুকমান হোসেন। রূপার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টা কয়েকজন ছাড়া কেউই তখনো জানে না। এদিকে বরযাত্রীও এসে পরেছে, তাদের সঙ্গে এতো বড় পরিবারের সম্মানও জুড়ে রয়েছে। বিয়ের আগেই বউ পালিয়ে গেছে খবরটা ছড়াছড়ি হলে লুকমান হোসেন এই সমাজে ঠিকতে কারতো না। এই সমাজের কাজই একটাই কোনো খুঁত পেলে সেটা দ্বারা মানুষকে প্রতিনিয়তই বিষধর সাপের মত ছোবল দিয়ে মে*রে ফেলা। তাই বাধ্য হয়ে সকলের অগোচরে তূর্ণাকে রূপার জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে। কাবিন পরানোর আগ অব্দি মাথায় একহাত ঘোমটা থাকার কারণে কেউ জানতেই পারেনি রূপার জায়গায় তূর্ণার স্থান হয়েছে সেখানে।
লুকমান হোসেনের তখন একটি বারের জন্যও মনে হয়নি রূপার জায়গায় তূর্ণার বিয়ে হলে কি হতে পারে। বিয়ের হয়ে যাওয়ার পর পরই বরযাত্রী নতুন বউয়ের মুখ দেখার পর সারা অনুষ্ঠানে বউ পালিয়ে যাওয়ার খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পরে। বউ আদল-বদল হওয়া নিয়ে বরপক্ষ আর কন্যাপক্ষে বেশ তুলকালাম লেগে যায়। কেউই তূর্ণাকে মেনে নিতে রাজি নয়, বিয়ে ঠিক হয়েছে একজনের সঙ্গে আর বিয়ে হয়ে গেলো আর একজনের সঙ্গে। এটা কেউই মেনে নিবে না,তার উপর মেয়ে যদি হয় এমন তাহলে তো আরও আগে নয়। তবে ধর্মীভাবে ও আইনি ভাবে বিয়েটা সম্পূর্ণ হওয়ার কারণে কারো হাতেই কিছুই করার নেই। লুকমান হোসেন রাশেদুন সিকদার আর রশিদ সিকদারের সামনে হাত জোড় করে, অপরাধী স্বরে বলে ওঠে-
“ দেখুন আমরা যা করেছি সেটা ঠিক হয়নি জানি। কিন্তু ওই মুহুর্তে এতকিছু ভাবার পরিস্থিতি ছিল না, যা ঠিক মনে হয়েছে সেটাই করেছি। জানি এটা ঠিক নয়, তারপর বাবা হিসেবে বলছি আমার মেয়েটাকে ফেলে দিবেন না। এমনিই ওকে এই সমাজ মেনে নেয়নি তারউপর যদি আপনারাও মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে, মেয়েটার মৃত্যু ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কথাগুলো খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে, কিন্তু আজকে আপনার কাছে নিজের মেয়ের জন্য ভিক্ষা চাইছি। ওকে মেনে নিন, এমনিও ওর চিকিৎসা চলছে। হয়তো একদিন স্বাভাবিক হয়ে যাবে আমাদের মতো!”
রাশেদুল সিকদার কি করবেন ভেবে পেলেন না। বিয়ের সকল কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, তাদের সকল আত্মীয় সহ ব্যবসায়িকদের বউভাতের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনিও নাক কাটা গেছে এমন আকস্মিক বিয়ের কারণে, এখন যদি বউ না নিয়ে ফেরা হয় তাহলে যতটুকু সম্মান আছে সেগুলোও ধুলোয় মিশে যাবে। সিকদার পরিবারের তেমন কিছু না হলেও এই পরিবারটা একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে! রাশেদুল সিকদার, লুকমান হোসেনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলেন-
“ আপনারা যা করেছে সেটা ক্ষমার অযোগ্য! বিয়েটা যেহেতু হয়েছে, তাই এত তাড়াতাড়ি ছাড়াছাড়ি করাতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কথা জীবনটা আমার ছেলের, ও যদি আপনার মেয়েকে না চায় তাহলে আমাদের হাতে কিছুই থাকবে না। ছেলেটা আমার এমনিই এই বিয়ে করতে চায়নি, পরিবারের চাপে পরে করেছে। আর এটাই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে সেটা কল্পনা করিনি!”
দূরে ক্রন্দনরত অবস্থায় তূর্ণা বধু বেসে বসে আছে। সকলেই তাকে নানা কথা বলতে ব্যস্ত। কেউ কেউ তো মুখের উপর যা ইচ্ছে তাই শুনিয়ে চলে যাচ্ছে! তূর্ণার কষ্টটা যেনো দিগুণ হয়ে এসেছে আজকে! বার বার ‘পাগল’ শব্দটা তার কর্ণকুহরে বাদ্যযন্ত্রের শব্দের মত বেজে উঠছে। সে পাগল! হ্যাঁ সে পাগল, আসলেই কি সে পাগল? ছোট থেকে পাগল শব্দটা শুনতে শুনতে বড় হয়ে উঠেছে সে। এই ‘পাগল’ নামক শব্দটার জন্য জীবনে বাবা নামক মানুষটা কোনোদিন তার মাথায় স্নেহের স্পর্শ এঁকে দেয়নি। ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়নি, আর না মায়া করে দু’টো কথা বলেছে। আর আজকেও এই ‘পাগল’ নামক শব্দটার কারণে এত তিক্ততার শিকার তাকে হতে হচ্ছে। হয়তো আজীবন এমনটাই চলবে, আজকে তার সৎ বোন রূপার বিয়ে ছিলো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে, সেলিমা খাতুন তো তাকে বলেছি তার পুতুলের মত তারও বর হবে। কই তার বর কে তো সে পেলো না, উল্টো সকলেই তাকে কত কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে!
তূর্ণা এখনো নীরবে মাথা নুইয়ে এখনো অশ্রুবিসর্জন দিচ্ছি। জীবনে সবসময় সবাই তাকে দূরছাই করে আসচ্ছে। কেউ কোনোদিন তূর্ণাকে বোঝার চেষ্টা করেনি; আর না দিয়েছে ভালোবাসা। জীবনে প্রথমবার লুকমান হোসনে তূর্ণার মাথায় হাত রেখেছিলো তাও তাকে রূপার জায়গায় তাকে বসার জন্য। তূর্ণার ছোট্ট মন সবসময়ই ভালোবাসা খুঁজে বেরায়। কেউ তাকে একটু ডাকুক, তার মাথায় হাত রাখুক, কেউ তাকে স্নেহ করুন এইসবই তার চাওয়া। আচ্ছা তূর্ণার এইসব চাওয়া কি খুব বেশি দামি? যে কেউ তাকে এইসব দেয় না। তাই বাবা যখন বললো তাকে বিয়ে করতে হবে তূর্ণা অবুঝ শিশু মত রাজি হয়ে গেলো, কারণ সে মাঝে মাঝেই পুতুল বিয়ে খেলে। আর আজকে পুতুলের জায়গায় শুধু সে বসবে, তাই খুশি মনেই সে সেজেছিলো। প্রথমবারের মত শাড়ি পরেছিলো সে, তাকে লালটুকটুকে বউ সাজিয়ে দিয়েছিলো। কেউ তাকে কেনো ভালোবাসে না? সবাই কেনো তাকে কষ্ট দেয়? সে কি কারো ভালোবাসা কোনোদিন পাবে না?
এইসব ভাবছে নিজের মনে মনে তূর্ণা আর কান্না করছে।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত্রির গভীর হয়ে এসেছে। আশেপাশে আর আগের মতো গিজগিজে মানুষ দেখা যাচ্ছে না। সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে, আর ভোর হওয়ার প্রহর গুণছে কখন সূর্য উঠবে। সিকদার বাড়ির সকলেই উপস্থিতি ড্রইংরুমে, সকলের মুখশ্রীতে গাম্ভীর্যের ঠাসা। একপাশে মাথা নিচু করে এখনো বসে আছে তূর্ণা, সকলেই এখন এখানে উপস্থিত। বউ আদল-বদলের খবরটা জানার পর থেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে আছে জবা সিকদার। নতুন বউকে বাড়িতে আনার পর থেকে সে কিছুতেই তূর্ণাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিবেন না। মেয়েটা যদি সুস্থ থাকতো তাহলে জবা সিকদারেরর কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু এখানে কাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন! একটা পাগল মেয়ের সঙ্গে তার ছেলের জীবনটা এইভাবে জুড়ে যাবে সেটা মা হিসেবে কি করে মেনে নিবে?
রাশেদুল সিকদারের কারণে মেয়েটাকে বাড়ির ভিতরে আনা হয়েছে। জবা সিকদার একটু পর পর অগ্নি দৃষ্টিতে দূরে বসা তূর্ণাকে দেখছে। তার সহ্য হচ্ছে না তূর্ণাকে একদমই। সকলের নিরবতার প্রহর ভেঙে রাশেদুল সিকদার গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠেন-
“ জবা মেয়েটাকে রৌদ্রিকের ঘরে রেখে আসো, হুট করেই মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারবো না। আর রৌদ্রিক যদি এই বিয়ে না মানতে চায় তাহলে অন্য ব্যবস্থা নিবো। তাই রৌদ্রিক কিছু না বলা অব্দি ও এই বাড়িতেই থাকবে ও, আর ওর যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেটাও খেয়াল রাখবে। মেয়েটার মানসিক ভাবে এমনি অসুস্থ, এখন যদি তোমরা সকলে ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার কর ওটা ওর মানসিক অবস্থার উপর আরও খারাপ ভাবে কাজ করবে।”
স্বামীর কথাগুলো শুনে জবা সিকদার তেতে উঠলেন এবার। এতক্ষণ বহু কষ্ট রাগটাকে দমিয়ে রেখেছিলেন এই ভেবে সে রাশেদুল সিকদার হয়তো কিছু একটা করবে। কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে এই মেয়েকে তার ছেলেটার উপর গুচিয়ে দিতে বলছে। জবা সিকদার তেতে উঠে বলেন-
“ আমার ছেলের জীবন নিয়ে তোমরা সকলে এমনটা না করলেও পারতে। ছেলেটা আমার বহু কষ্টে এই বিয়ের জন্য রাজি করিয়েছিলাম, এই ভেবে সব ভুলে নতুন করে নিজের জীবনটা সাজাবে। কিন্তু তোমরা কি করলে, এই পাগল মেয়েকে আমার ছেলেটার উপর চাপিয়ে দিচ্ছো! তোমরা মেনে নিলেও আমি এই মেয়েকে কিছুতেই মেনে নিবো না।”
রাশেদুল সিকদার গাম্ভীর্যের ঠাসা নেত্রযুগল নিজের স্ত্রীর দিকে তাক করলেন। যতই হোক মায়ের মন, তাই কোনো মায়ই মেনে নিবে না এমনটা। কিন্তু পরিস্থিতির শিকারে তারা সকলেই বাঁধা পরেছে, চাইলেই এখন সব সম্ভব নয়। হুট করে সবকিছু হয়ে গেলেও, এই হুট করে হওয়া সবকিছু পরিবর্তন করা এত সহজ নয়। রাশেদুল সিকদার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আবারও একই ভঙ্গিতে বলে-
“ জবা আমি তোমাকে এখন মেনে নিতে বলিনি, বলেছি ওকে রৌদ্রিরের ঘরে দিয়ে আসতে। রাত অনেক হয়েছে, রুমা তুমিই বরং ওকে নিয়ে যাও। ওর একটু খেয়াল রেখ যত যাই হোক ভাগ্যক্রমে এই বাড়ির বউ সে। যতদিন আছে ওর যাতে অযত্ন না হয়! মানসিক ভাবে ও সুস্থ না তাই ওর দিকটা তুমিই দেখো। সকলেই এবার ঘরে যাও, এত কিছু ভাবতে হবে না। কালকে বউভাতের অনুষ্ঠানে আছে তাই ঘুমাতে যাও। সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে সবার উপর।”
বলেই তিনি উঠে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলেন। জবা সিকদার অশ্রুসিক্ত চোখে স্বামীর যাওয়ার পানে চেয়ে থাকলেন। এরপর তীব্র ক্ষোপ নিয়ে তিনি এগিয়ে এলেন তূর্ণার দিকে। তূর্ণা এমনিই এইসবে ভয় পেয়ে আছে, তারউপর জবা সিকদারকে একটু বেশি ভয় লাগছে তার। জবা সিকদার তূর্ণার হাতের কব্জি শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরে রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে বলতে থাকে-
“ পাগল কোথাকার! আমার ছেলেটার জীবন শেষ করার জন্য এসেছিস। আমার পরিবারের মাথাটাও গিলে নিয়েছিস, তোকে ছাড়বো না পাগল কোথাকার। ছাড়বো না আমি!”
বলেই সজোরে তূর্ণার নরম গায়ে চড় বসিয়ে দিলেন। হুট করে এমনটা করায় তূর্ণার সহ রুমা সিকদার অবাক হয়ে যান। এত কিছু আশা করেনি কেউই, রুমা সিকদার ছুটে এসে তূর্ণাকে আগলে নিলেন। জবা সিকদার রাগে হিসহিস করতে করতে বলে-
“ তোকে আমি কিছুতেই মেনে নিবো। আজ হোক বা কাল এই বাড়ি থেকে বের করবোই!”
কথাটুকু বলেই রাগে উপরের দিকে চলে যায়। সারা ড্রইংরুম জুড়ে নিস্তব্ধতা গ্যাস করে নিলো। তূর্ণা হেঁচকি তুলে কান্না করছে, এতোক্ষণের বোবা কান্নাটা শব্দ আকাড়ে ঝড়ছে। রুমা সিকদারের মায়া হলো বেশ! তিনি তূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলে-
“ কিছু মনে করিও না, উনি অনেক ভালো এখন একটু রেগে আছে। রাগ কমলে তোমাকে আদর করে দিবে!”
এতোক্ষণে তূর্ণা হয়তো কারো কাছ থেকে এতো নরম স্বর শুনতে পেলো। অশ্রুসিক্ত চোখে রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আমি তো ইচ্ছে করে পাগল হইনি, আল্লাহ আমাকে পাগল বানিয়েছে। সবাই আমাকে কষ্ট দেয়! কেনো আমায় ভালোবাসে না কেউ?”
তূর্ণার কথা শুনে বেশ মায়া হলো রুমা সিকদারের। তার কোনো সন্তান নেই, সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। তূর্ণাকে দেখে কেনো জানি তার খুব মায়া লাগলো, ইচ্ছে করলো মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখতে। রুমা সিকদার তূর্ণার মাথা স্নেহের স্পর্শ এঁকে দিয়ে বলে-
“ সবাই ভালোবাসবে তোমায়, একটু অপেক্ষা কর! এখানের সবাই অনেক ভালো। কান্না করে না, চল রুমে দিয়ে আসি তোমায়।”
বলেই তূর্ণাকে নিয়ে রৌদ্রিকে রুমের দিকে পা বাড়ায়। ফর্সা গালটা লালচে হয়ে আছে, তূর্ণার গায়ে কম্পন বয়ে যাচ্ছে। ভীষণ রকমে মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে তার! সবাই তাকে এইভাবেই দূরছাই করে, হয়তো এটাই তার নিয়তী ছিল যার জন্য এমনটাই হয়ে আসচ্ছে জন্মের পর থেকে। জন্মের পর না মায়ের ভালোবাসা পেয়েছে আর না বাবার, মা নামক মানুষটা কেমন এটা আজ অব্দি জানা নেই তার। মায়ের গায়ের গন্ধ কেমন হয় সেটাও জানে না সে!
তূর্ণাকে ঘরে বসিয়ে রুমা সিকদার চলে আসে। তূর্ণা চুপচাপ বিশাল বড় বেডের উপর বসে আছে, মাঝে মাঝে দৃষ্টি ঘুরিয়ে রুমটা দেখে নিলো। এত বড় রুমে এর আগে কোনোদিন সে আসেনি, বাড়িতে তার জন্য রান্না ঘরের পাশে থাকা সবচেয়ে ছোট্ট রুমটা ছিলো তার। রুম বললেও ভুল হবে ওখানে বাসার যাবতীয় পুরোনো জিনিসপত্র রাখে। সেখানে ছোট একটা খাটে তার স্থান হয়েছিলো, বাবা নামক মানুষটা কোনোদিন এই নিয়ে কিছুই বলেনি। সারাদিনের এতো এতো ধকল গিয়েছে তারউপর টানা কয়েক ঘন্টা যাবৎ কান্নার ফলে ভীষণ রকমে মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে এখন। চোখ দু’টো খুলে আসবে এমনটা মনে হচ্ছে!
তূর্ণা হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরলো, এই যন্ত্রণা তাকে রোজই সহ্য করতে হয়। তবে আজকের পরিমাণটা সবচেয়ে বেশি, মনে হচ্ছে তূর্ণার সমগ্র পৃথিবীর ঘুরছে। হুট করেই নাক দিয়ে গল গল করে গরম জাতীয় কিছু গড়িয়ে ওষ্ঠপুটে এসে নামলো। তূর্ণা হাত ছোঁয়াতেই দেখতে পেলো রক্ত! তূর্ণার ছোট্ট মস্তিষ্ক আর নিতে পারলো না এত এত মানসিক যন্ত্রণা। যখন মানসিক ভাবে বেশি চাপ পরে তখন এমনটা হয় তূর্ণার সঙ্গে, আর এখন এমনটাই হলো। দূর্বল শরীরটা নেতি পরলো, আঁখিপল্লব জোড়া আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এলো।
বাচ্চার কান্নার স্বরে পিটপিট করে চোখ খুলে উঠে বসলো তূর্ণা। মাথা ব্যথার কারণে চোখ দু’টো মেলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে! হালকা চোখ মেলে সামনে তাকাতেই সবকিছু কেমন অস্পষ্ট দেখালো। অস্পষ্ট ভাবেই শুধু এতটুকু দেখতে পেলো একজন লোক একটা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। কিছু সময় অতিবাহিত হতেই তূর্ণা সম্পূর্ণ চোখ মেলে তাকাতেই চোখের সামনে এক সুদর্শন পুরুষকে দেখতে পেলো। কলপ একটা ফুটফুটে বাচ্চা, ঠোঁট উঠিয়ে লোকটার কোলে কান্না করছে। তূর্ণার কিছু বোধগম্য হলো না এই মুহুর্তে; সে শুধু চেয়ে রইলো সেদিকে। কিছু সময় যেতেই বাচ্চাটার কান্নার স্বর আর শোনা গেলো না, কেমন নিস্তব্ধতা ঘিরে গিলো গোটা রুম জুড়ে।
তূর্ণা এতোক্ষণ ধরে শুধু চেয়েই আছে, সে বুঝলো না লোকটা কে? হুট করেই লোকটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকে তাক করতেই তূর্ণা কেঁপে উঠলো খানিকটা! কি ভয়ংকর চাহনি তার! এগিয়ে এলো বিছানার কাছে। তূর্ণা দৃষ্টি সীমানা জোড়া লোকটাকে দেখতে ব্যস্ত। লোকটার তীক্ষ্ণ নয়নযুগল দুটি এমনই প্রখর যে, মনে হচ্ছে বহু অজানা উপাখ্যান আর নীরব ঝড় সেখানে ঘুমিয়ে আছে। লোকটার সুগঠিত দেহাবয়বটি শিল্পীর নিপুণ ছেনির স্পর্শে গড়া কোনো জীবন্ত ভাস্কর্য; প্রশস্ত কাঁধ, দৃঢ় চোয়াল আর গম্ভীর উপস্থিতি তাকে সাধারণ পুরুষদের ভিড় থেকে অনায়াসেই আলাদা করে তোলে।
তূর্ণা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো, হুট করেই সামনে থাকা লোকটার গাম্ভীর্যের ঠাসা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-
“ একপাশে সরে বস!”
লোকটা কথাটুকু বললো নাকি আদেশ করলো জানা নেই তূর্ণার। তবে নীরবে লোকটার কথা মেনে নিলো সে, আস্তে করে সরে বসলো কিছুটা দূরে। লোকটা আস্তে করে বাচ্চাটাকে শুইয়ে দিলো। তূর্ণা বাচ্চাটাকে এখন নিয়ে দেখলো, কি মিষ্টি দেখতে বাচ্চাটা! তূর্ণা ইচ্ছে জাগলো হাত বাড়িয়ে পুতুলের মত বাচ্চাকে কোলে নিতে। বাসায় তার পুরাতন একটা এমনই পুতুল আছে, হয়তো পুতুলের চেয়েও নিদ্রায় মগ্ন বাচ্চাটা বেশি সুন্দর নিঃসন্দেহে! তূর্ণা অবাক নেত্র মেলে শুধু চেয়ে রইলো বাচ্চাটার দিকে। লোকটা ভালো ভাবে বাচ্চাকে শুয়ে দিয়ে ঠিক হয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে আবারও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো। তূর্ণা আবারও কেঁপে উঠলো খানিকটা, রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-
“ নাম কি?”
তূর্ণা কি জবাব দিবে বুঝলো না, আমতা আমতা করে সামনে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে নিলো। তূর্ণাকে চুপ থাকতে দেখে রৌদ্রিক আবারও হালকা ধমকের স্বরে জিজ্ঞেস করে ওঠে-
“ নাম কি তোমার মেয়ে?”
তূর্ণা এবার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে ওঠে-
“ তূ…তূর্ণা..!!”
“ তোমার নাম রিপা বাকি রূপা কি জানি ছিল! তাহলে তূর্ণা বলছো কেনো?”, ‘কিছুটা ধমকের স্বরে বলে’
“ রূপা তো বড় আপু, আমি তো তূর্ণা সবাই তূর্ণা পাগলী বলে ডাকে। আচ্ছা আপনি কি আমার বর হন? সবাই বলছে আমার নাকি সত্যি সত্যি বিয়ে হয়ে গেছে! আপনিই কি আমার বর হন?”
এতোক্ষণে তূর্ণা হয়তো ভালো ভাবে কথা বললো। কথাগুলো বেশ ভয়ে ভয়েই বলেছে সে! সামনে থাকা মানুষটাকে বেশ ভয় লাগছে তার। কেমন করে তাকিয়ে আছে! এদিকে তূর্ণার কথা শুনে রৌদ্রকে ভ্রুযুগল কুঁচকিয়ে আসে। সামনে থাকা মেয়েটার কথাগুলো অন্যরকম শোনাল, কেমন বাচ্চা টাইপ!
