অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২২
ফাহিমা ইসলাম
প্রভাতের অরুণাভ আভা ধীরে ধীরে রাত্রির অবসানরেখাকে বিলীন করে, যখন আকাশপটে নিজস্ব আধিপত্য বিস্তার করে, তখন যেন সৃষ্টির প্রতিটি অনু-পরমাণু নবজাগরণের নিঃশব্দ ঘোষণায় শিহরিত হয়ে ওঠে। পূর্বাকাশে রক্তিম আলো ছড়িয়ে পড়েছে এক অলৌকিক মায়াজাল বিস্তার করে, যেন সূর্য নিজের কোমল আঙুলের স্পর্শে নিদ্রিত পৃথিবীকে সস্নেহে জাগিয়ে তুলছে। শিশিরসিক্ত ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা ক্ষুদ্র জলবিন্দুগুলো প্রভাতরশ্মির স্পর্শে হীরকখণ্ডের ন্যায় দীপ্তিমান হয়ে ওঠছে। আর মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে আসচ্ছে এক অপার্থিব সতেজতার সুগন্ধ। যা মানবমনের গভীরে প্রশান্তির এক নিঃশব্দ তরঙ্গ সঞ্চার করে।
এই অনিন্দ্য প্রভাতেই সিকদার বাড়ি যেন এক ভিন্ন উন্মাদনায় সজীব হয়ে উঠেছে। অন্দরমহলের প্রতিটি কোণে ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট, কেউ রঙিন ফিতা ঝুলাচ্ছে, কেউবা ফুলের মালা গেঁথে সাজিয়ে তুলছে প্রবেশদ্বার। কারণ আজ এক বিশেষ দিন রোদেলার তৃতীয় জন্মদিন। জন্মদিন আর পাঁচটা দিনের মতোই কিন্তু এই দিনে ধরণীর কোল জুড়ে আসা মানুষটার জন্য এত আয়োজন। তিন বছরের ক্ষুদ্র জীবনের পরিধি যদিও অতি সামান্য, তবুও এই অল্প সময়েই সে সিকদার পরিবারের প্রতিটি হৃদয়ে নিজের জন্য এক অমোচনীয় আসন নির্মাণ করে নিয়েছে। তার অট্টহাসি, অস্পষ্ট উচ্চারণে বলা ভাঙা ভাঙা শব্দগুলো যেন এই বিশাল বাড়ির নীরবতা ভেঙে সুরের মূর্ছনা হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। বাড়ির বড় ছেলের একমাত্র রতন। একমাত্র আদুরে ছানাও বলা যায়, বহুবছর পর রোদেলার বাচ্চাসুলভ সরের মূর্ছনায় ভড়ে উঠেছে সিকদার বাড়ি। তাই না চাইতেও সকলের চোখে মণি সে, আর তার এই বিশেষ দিনে আয়োজন হবে না সেটা কি করে হয়। বিত্তশালী মানুষ বলে কথা, বাড়ির একমাত্র রাজকন্যার এই বিশেষ দিনে এই আয়োজনও যেনো সামান্য!
রোদেলা আজ পরেছে হালকা গোলাপি রঙের একটি ফ্রক, তার প্রতিটি ভাঁজে শিশুসুলভ নিষ্পাপতার কোমল ছোঁয়া লুকিয়ে আছে। তার ক্ষুদ্র , আর এলোমেলো কেশগুচ্ছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া উজ্জ্বল চোখদুটি সব মিলিয়ে সে যেন জীবন্ত এক পুতুল। মায়া ভরা চোখে এত এত আয়োজন দেখছে, তারও ছোট্ট মস্তিষ্ক এতটুকু বুঝে গেছে এই আয়োজন শুধুই তার জন্য। এত এত আয়োজনের মধ্যেও রোদেলা তার সামনে দাঁড়ানো গম্ভীর পাপার দিকে চেয়ে আছে। মেয়েকে নিজে তৈরি করেছে, অজানা কারণে রৌদ্রিকের হৃদয় ভার হয়ে আছে। পিতা মন কেমন আবেগপূর্ণ হয়ে উঠছে, হয়তো সন্তান বড় হওয়াতে এই আবেগের কারণ। সন্তানরা বড় হলেই পিতা-মার ছায়া তল থেকে দূরে ছোটে। চাইলেও আগের মত করে আদর করা সম্ভব নয়, শাসন করা সম্ভব নয়। প্রতিটা পিতা-মাতারই সন্তান বড় হওয়ায় নিয়ে তাদের মধ্যে এক অকানা জ্বালাতন সৃষ্টি হয়। রৌদ্রিকেও ব্যতিক্রম নয়, বাবা-মার কাছে সন্তান কোনোদিন বড় হয় না। তবে সন্তানরা বড় হয়ে যায়।
“ পাপা…!”
কোমল স্বরে উচ্চারিত সেই একটিমাত্র শব্দ যেন রৌদ্রিকের সমস্ত সত্তাকে আলোড়িত করে তুললো। শীতল, নম্র দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে চাইলো। ঠিক যেনো কোনো পুতুল তার মায়া ভড়া, আদুরে চক্ষু মেয়ে চেয়ে আছে রৌদ্রিকের পানে। রৌদ্রিক, যার কঠোরতা ও গম্ভীরতায় সকলের কাছে ভীতির কারণ , সেই মানুষটিই আজ এক ক্ষুদ্র কন্যাশিশুর আহ্বানে সম্পূর্ণরূপে গলে যাওয়া মোমের ন্যায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রোদেলাকে কোলে তুলে নিল। ক্ষুদ্র দু’হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে রোদেলা অকারণেই হাসতে লাগলো। সেই হাসির মধ্যে কোনো জটিলতা নেই, নেই কোনো হিসাব শুধুই নির্মল ভালোবাসার অমলিন প্রকাশ। রৌদ্রিকের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো তার কন্যার মুখে। এই ছোট্ট প্রাণটাই যেন তার সমস্ত অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলোকবর্তিকা।
সে কণ্ঠ নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলল-
“তুমি জানো, তুমি না থাকলে এই পৃথিবীটা আমার কাছে কতটা শূন্য হয়ে যেত?”
রোদেলা কিছুই বুঝলো না, তবুও বাবার গালে নিজের নরম ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। একটি চুম্বন, যা সমস্ত ভাষার ঊর্ধ্বে। রৌদ্রিক মেয়ের ছোট্ট মাথাটা নিজের বক্ষস্থলে চেপে ধরলো আলতো করে, প্রাণভরে এই সময়টা উপভোগ করতে চায় রৌদ্রিক। কারণ ভবিষ্যতে চাইলেও মেয়েকে এইভাবে নিজের বক্ষস্থলে চে’পে ধরতে পারবেনা। কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুম পারাতে পারবে না, চাইলেও মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাত্রি জাপন করতে পারবে না। এসব ভাবলেই এক আকাশ সমান শূন্যতায় খাঁ খাঁ করে উঠলো রৌদ্রিকের অন্তস্তল! ইচ্ছে করলো নিজের এই ছোট্ট অংশটুকুকে আজীবনের জন্য এতটুকু রেখে দিতে। তবে সেটা সম্ভব নয়, সময় পার হবে, দূরত্ব বাড়বে! মেয়েকে তো বিয়েও দিতে হবে। এতদূর ভাবতেই রৌদ্রিকের হৃদয়টা আড়ষ্ট হয়ে এলো। ইচ্ছে করলো আর এইসব ভাবতে, হুট করেই তার নজরে এলো দূরে কম্পিত পায়ে হেঁটে আসা তূর্ণার দিকে।
শুভ্রতার বিপরীতে আজ তার পরিধান ছিল আজ গাঢ় লাল আভায় মোড়ানো এক শাড়ি, যার প্রতিটি ভাঁজে যেন রক্তিম সূর্যাস্তের শেষ চুম্বন লেগে আছে। আঁচলটি কাঁধ ছুঁয়ে ধীরে নেমে এসেছে, মেঝের সাথে মিশে গিয়ে সৃষ্টি করেছে এক প্রবাহমান আবরণ। যেন নীরব নদী,যা ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কোমল দেহাবয়বের প্রতিটি বাঁকে শাড়ির বয়ন যেন নিজেই শিখে নিয়েছে কীভাবে সৌন্দর্যকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। দীঘল কুচবরণ কেশ আজ যত্নে বাঁধা, তবুও কিছু অবাধ্য গোছা কপালের পাশে নেমে এসে মুখশ্রীকে করছে আরও মায়াবী। কপালের মাঝ বরাবর ক্ষুদ্র রক্তিম টিপ, যেন এক বিন্দু অগ্নিশিখা। আঁখিপল্লবে কাজলের নিবিড় পরশ, যার গভীরতায় ডুবে গেলে ফেরার পথ থাকবে না।
তূর্ণার অধরযুগলে মৃদু আভা, এক প্রাণবন্ত হাসি। রৌদ্রিক নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ মনে হচ্ছে যেন সময় থমকে গেছে তার চারপাশে। রৌদ্রিকের দৃষ্টি যা সচরাচর শীতল, সংযত, অবিচল। আজ যেন সেই চোখ জোড়াও সীমা লঙ্ঘন করে বসেছে। প্রথম দৃষ্টিতেই সে স্থির হয়ে গেছে। বুকের ভেতর এক অচেনা আলোড়ন, যা সে কোনো যুক্তি দিয়েই সংজ্ঞায়িত করতে পারছে না। এ কি কেবল বিস্ময়? না কি সেই অনুভূতি, যাকে সে এতদিন নিষ্ঠুরভাবে অস্বীকার করে এসেছে?তার অন্তর যেন নিজেকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে-
“এই যে দৃষ্টির অবাধ্যতা, এই যে হৃদস্পন্দনের অযাচিত তীব্রতা এগুলো কি কেবলই মুহূর্তের ভ্রম নাকি অন্যকিছু?”
তার অন্তর হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে উঠলো।
এক অবাধ্য স্রোত বয়ে যেতে লাগলো শিরা-উপশিরায়
যা সে অস্বীকার করতে চায়, উপেক্ষা করতে চায়, অথচ সম্পূর্ণভাবে দমন করতে পারছে না।
“অসম্ভব…”
নিজের মনে ফিসফিসিয়ে উঠলো রৌদ্রিক।
এই অনুভূতির কোনো স্থান নেই তার জীবনে। এই কোমলতা, এই আকর্ষণ সবই দুর্বলতা। আর দুর্বলতা মানেই পতন। তখনই তূর্ণা হঠাৎ করেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে বলে উঠলো-
“পুতুল.. আলো… আমার আলো…!!”
সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো, আর বিনা অনুমতিতেই রোদেলাকে নিজের বুকে টেনে নিল। তার আলিঙ্গনে ছিল এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা জোরে আঁকড়ে ধরা, আবার হঠাৎই আলগা করে দেওয়া তবুও সেই স্পর্শে ছিল এক নির্মল, অকৃত্রিম স্নেহের প্রবাহ। রোদেলা প্রথমে বিস্মিত হলো, তারপর হেসে উঠলো। তার ক্ষুদ্র হাত তূর্ণার গাল ছুঁয়ে দিল, যেন সে কোনো অজানা ভাষায় তাকে গ্রহণ করে নিচ্ছে। এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রৌদ্রিকের ভেতরে কিছু একটার ভাঙন অনুভূত হলো। তূর্ণার গাঁ থেকে ভেসে আসা মাদকতা ভরা বেলিফুলের মত সুভাষ নাসারন্ধ্রে এসে বারি খেলো। ফুল জিনিসটা তার বরাবরই অপছন্দ। কেনো অপছন্দ সেটাও জানা নেই তার, হয়তো ভুল মানে ভালোবাসার প্রতিক।
রৌদ্রিক এক মুহূর্তের দ্বিধায় পরলো, তারপর নিজের অজান্তেই সে হাত বাড়িয়ে রোদেলার মাথায় রাখলো, আর অন্য হাতটি ছুঁয়ে গেল তূর্ণার কাঁধ। স্পর্শটি ছিল ক্ষণিকের কিন্তু তার অভিঘাত ছিল গভীর। তূর্ণা থমকে গেলো। তার অসংলগ্ন দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো রৌদ্রিকের মুখে। সেই দৃষ্টিতে কোনো সুস্পষ্ট বোধ নেই, তবুও যেন এক অদ্ভুত স্বীকৃতি লুকিয়ে আছে যেন সে অনুভব করছে, যদিও সে বুঝতে পারছে না। রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠলো, দু’জনের মাঝখানে নিজেকে গুঁজে দিয়ে বলল-
“পাপা, মা…!”
তার জড়ানো উচ্চারণ যেন এই জটিল মুহূর্তটিকে সরল করে দিলো। তূর্ণার রোদেলার আদুরে মুখপানে চেয়ে বলে-
“ আমার পুতুলকে আজকে আরও সুন্দর লাগছে। আমার পুতুল, আমার আলো!”
তূর্ণার কথা শোনা মাত্রই রোদেলা আদুরে বিড়াল ছানার মত আরও জড়িয়ে গেলো তূর্ণার সঙ্গে। ছোট ছোট আদুরে স্পর্শে ভড়িয়ে দিচ্ছে তূর্ণা কপোল ভড়িয়ে দিচ্ছে। রৌদ্রিক নীরবে দেখলো সবটা, তার মেয়েটা জড়িয়ে যাচ্ছে তূর্ণা নামক মেয়েটার উপর। মেয়েটাও একই ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে তার অংশের সঙ্গে। দেখলে কেউ বলতেই পারবে না, এদের মধ্যে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। রক্ত ছাড়াও সম্পর্ক হয়, সেগুলো হয়তো রক্তের সম্পর্কের চেয়েও অধিক মূল্যবান কিছু হয়ে থাকে।
বিশাল ঝাড়বাতির দীপ্তি সোনালি আভায় রাঙিয়ে তুলেছিল সমগ্র বাড়ি। সুদৃশ্য মার্বেলখচিত মেঝেতে প্রতিফলিত হচ্ছে অতিথিদের চলমান ছায়া, যেন প্রতিটি পদচারণাই একেকটি অভিজাত ছন্দে বাঁধা। বহিরাঙ্গনে রঙিন আলোকমালার ঝলকানিতে গাছপালাও যেন নিজেদের সজ্জিত করে তুলেছিল এই আয়োজনের অংশীদার হতে। দূরদেশীয় সুগন্ধির মৃদুমন্দ সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছিল বাতাসে, এক অদৃশ্য মোহজাল বিস্তার করে সকলের ইন্দ্রিয় জুড়ে।
উচ্চবিত্ত সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, শিল্পপতি, কূটনীতিক, নামকরা ব্যবসায়ী সকলেই উপস্থিত আজকে, প্রত্যেকে নিজস্ব ঐশ্বর্যের অহমিকা নিয়ে। এই সমগ্র জাঁকজমকের কেন্দ্রবিন্দুতে হচ্ছে রোদেলা তূর্ণার রিনি হাত ধরে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে। জীবনে প্রথমবারের মত এত বড় অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণ করেছে সে। তাই তার মধ্যখানি বিরাজমান বিস্ময়টা যেনো বেড়েই চলেছে। তারউপর এত এত মানুষ দেখে কিছুটা আতঙ্কিত সেও, তারপরও আলাদা এক ভালো লাগা কাজ করছে। তার জন্মদিন কবে সেটাও জানা তার, রিনির হাত ধরে হলরুমে আসতেই বিশাল আকৃতির ডিজনি কেক দেখতে পেলো। তূর্ণাট না চাইতেও সেদিকে তাকিয়ে রইলো, দেখতে যতটা সুন্দর খেয়ে হয়তো আরও সুস্বাদু হবে।
“ রিনি এই কেকটা খেতে খুব মজা হবে তাই না?”
“ হুম, রোদ সোনা কেক কাটলেই খাবো আমরা। কেক কাটার পর যত ইচ্ছে খেতে পারবে।”
“ আচ্ছা জন্মদিন আসলে কি এত বড় কেক আনা হয়? আচ্ছা রিনি আমার জন্মদিন কবে? আমিও কেক কাটতে চাই পুতুলের মত।”
বাচ্চাসুলভ, নিষ্পাপ স্বরে বলে ওঠে তূর্ণা। তূর্ণার কথা শুনে রিনির কিছুটা খারাপ লাগে, জন্মের পর থেকেই তাদের পরিবারের প্রতিটা সদস্যেরই জন্মদিন বেশ ধুমধামে পালন করা হয়। ধুমধাম বললেও ভুল হবে বেশ বড়সড় আয়োজন হয় প্রতিবছরই। রৌদ্রিক পছন্দ করে না বিধায় তার জন্মদিন ঘরোয়া ভাবেই করা হয়।
“ আচ্ছা এরপর আমরা সবাই তোমার জন্মদিন পালন করবো। এবার থেকে প্রতিবার পালন করবো, কিন্তু তার আগে তো জানতে হবে তোমার জন্ম তারিখ কবে। সেটা না জানলে করবে কিভাবে?”
জন্ম তারিখের কথা আসতেই তূর্ণার মনটা অনেকটাই খারাপ হয়ে যায়। সে তো জানে না তার জন্ম তারিখ কবে। তূর্ণার বিষাদগ্রস্ত মুখশ্রীর পানে চেয়ে রিনি বলে
“ সমস্যা নেই, কালকেই তোমার জন্ম তারিখ বের করবো।”
রিনির কথায় তূর্ণা খুশি হয়ে গেলো। কপোল ভর্তি হাসি মুখে টুপ করে রিনির কপোলে চুমু একে দিলো। রিনি হেসে দিলো।
কেক কাটার মুহূর্তে সারা ড্রইংরুম জুড়ে করতালির ঢেউ উঠলো। রৌদ্রিকের কোলে রোদেলা আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণার, তিন জন একসঙ্গেই কেক কে’টেছে। তূর্ণার তো ভাবতেই পারেনি সেও কেক কা’টবে। রোদেলা তার ছোট্ট হাতে এক টুকরো কেক তুলে, একবার রৌদ্রিকে খাওয়ালো আবার তূর্ণাকেও। একে একে ছোট হাত দ্বারা বাড়ির সবার মুখেই কেক তুলে দিয়েছে সে।
তূর্ণা রোদেলাকে নিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় বসে আছে। সে আর রোদেলা তাদের নিজস্ব জগতে মেতে আছে। দু’জনই কিছু বলছে আর হেসে উঠছে। তূর্ণা র রোদেলা সবসময়ই তাদের হাসিতে অকারণ উচ্ছ্বাস মিশে থাকে। দূর থেকে তাদের এই দৃশ্য দেখে অতিথিদের মধ্যে ফিসফাস শুরু হলো।
“ওই মেয়েটা… মানসিক ভারসাম্যহীন, তাই না?”
“এমন একটা অনুষ্ঠানে ওকে রাখার মানে কি?”
“বড়লোকদেরও অদ্ভুত শখ থাকে, দেখছি…”
কথাগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল চাপা স্বরে, কিন্তু বিষের মতো তীক্ষ্ণতা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। কটাক্ষের সূক্ষ্ম দংশন তূর্ণার অচেতন জগতে হয়তো পৌঁছাচ্ছিল না, কিন্তু সেই শব্দগুলো বাতাস চিরে পৌঁছে গেলো আরেকজনের কর্ণগহ্বরে। খাবার নিয়ে এইদিকেই আসচ্ছিলো, অনেকটা সময় না তূর্ণার খেয়েছে আর না রোদেলা। তাই তাদের খাওয়ানোর জন্যই এখানে বসিয়ে রেখে গেছে। রৌদ্রিকের কর্ণগহ্বরে সকল কথাই এসেছে কিন্তু সে স্থির ছিল। তার দৃষ্টি শীতল, নিরাবেগে ভরপুর । কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন তার অন্তরের কোথাও গিয়ে আঘাত করছিল ধারালো অস্ত্রের মতো। না চাইতেও চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো, মুঠোবদ্ধ হলো হাত। তার চারপাশের বায়ুমণ্ডল যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো, এক অদৃশ্য ক্রোধের ঘনত্বে পূর্ণ। হাসাহাসির মাঝেই একজনের চোখ রৌদ্রিকের দিকে যেতেই, তার হাসি বন্ধ হয়ে আসে। রৌদ্রিক যে তাদের পিছনে কতক্ষণ ধরে ছিলো সপটা হয়তো তাদের জানা নেই। আদৌও রৌদ্রিক কি কিছু শুনেছে? মহিলাটা হালকা হাসার চেষ্টা করে, সেটা দেখে
রৌদ্রিক ধীর পদক্ষেপে সে এগিয়ে এলো। কথাটুকু জিজ্ঞেস করলেও সেটা শুনতে বেশ ভয়ানক লাগছে। একজন হাসার চেষ্টা করে বলে-
“ কিছু বলছিলেন..??”
“ তেমন কিছু না বাবা।”
“যাকে নিয়ে আপনারা হাস্যরস করছেন সে আমার স্ত্রী আর আমার স্ত্রীকে অসম্মান করার মূল্য সবাই দিতে পারে না। আসা করছি এমন কোনো কথা আমার কানে আবার আসবে না। আপনারা আমাদের গেস্ট, তাই ততটুকু সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিজেদের রাখুন। আসছি ভালো থাকবেন।”
রৌদ্রিক অতি শান্ত স্বরে বাক্যগুলো উচ্চারণ করলেও। তার নেত্রদ্বয়ে ফুটে উঠেছে এক দাবালনের অগ্নিশিখা। এমন এক শীতল হুমকি মিশে ছিল কিছুটা একটা, যা উপস্থিত সকলের শরীরে শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছে।
চারপাশে নীরবতা নেমে এসেছে। কেউ আর কিছু বলার সাহস পেল না। চোখ নামিয়ে নিলো সবাই, যেন হঠাৎ করেই তারা নিজেদের অবস্থান উপলব্ধি করেছে। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি এবার খুঁজে নিলো তূর্ণাকে। যে এখনও নিজের জগতে হারিয়ে আছে, নির্বিকার, অচেতন সেই সমস্ত বিষাক্ত শব্দের প্রতি। তার চোখের কঠোরতা এক মুহূর্তে নরম হয়ে এলো।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২১
ধীর পায়ে তাদোর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজ খাইয়ে দিতে থাকে। আজকাল তূর্ণার তার হাতে ছাড়া খেতে চায় না, রৌদ্রিক না করে না তূর্ণার এই সামান্য সখগুলোকে। খুব যত্ন নিয়েই সে তূর্ণার প্রতিটা ইচ্ছে পূর্ণ করার চেষ্টা করে। রোদেলা আর তূর্ণার বেশ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। আশেপাশে অনেকেই তাকিয়ে আছে এদিকটায়, রৌদ্রিকের এমব রূপ সকলের কাছেই আজানা। তারপরও সকলের দৃষ্টি বার বার সেদিকেই যাচ্ছে। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে তারা তিনজন খুবই সুখী একটা পরিবার। যাদের চারিপাশ জুড়ে সুখের হাতছানির ছাড়াছাড়ি!
