অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩১
ফাহিমা ইসলাম
“ এমনটা করিস না রূপা, ছেলেটা তো বেশ ভালো। তোকে কত ভালোবাসে, অথচ তুই এমন করিস কেনো?’
মায়ের কথায় চটে গেলো রূপা, রাগের সহিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আমি তো বলেছিলাম এই লোককে বিয়ে করবো না। যখন বিয়ে দিয়েছো,তাই এখন আমি যা চাইবো সেটাই করবো।”
রূপার বিয়ে হয়েছে গত চার মাস হলো। ছেলে ভার্সিটির লেকচারার, দেখতে-শুনতে সব দিক দিয়েই ভালো। কিন্তু রূপা কোনো এক কারণে বিয়েটা করতে চায়নি, কিন্তু লোকমান হোসেনের কথায় বিয়েটা করে নিয়েছি। কিন্তু চার মাস বিয়ে হয়েছে একমাসও ঠিক মত শ্বশুর বাড়িতে থাকেনি রূপা। কলিং বেলের শব্দ শুনে রূপার মা রূপা দিকে তাকিয়ে শাসিয়ে বলে-
“ ছেলেটা আসচ্ছে, দয়া করে ওর সঙ্গে চলে যাস। মানুষেরা নানা কথা বলছে তোর এতদিন এই বাড়িতে থাকা নিয়ে।”
বলেই উঠে গেলেন দরজা খুলতে। এইদিকে রূপার হাব-ভাবের কোনো পরিবর্তন হলো না। বরং সে একরোখা হয়ে বসে রইলো। দরজা খুলে দিতেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা তূর্য গম্ভীর মুখে হালকা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে সালাম দিয়ে বলে ওঠে-
“ আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন আন্টি?”
“ ওয়ালাইকুম আসসালামু বাবা! এইতো আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। ভিতরে আসো, বাহিরে অনেক গরম না!”
তূর্য শান্ত পায়ে ভিতরে ঢুকতেই রূপাকে অন্যদিকে মুখ করে বসে থাকতে দেখতে পেলো। তূর্য আগ বাড়িয়ে রূপাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলো না। রূপার মা তাদের বসিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন, জামাই আদরের ব্যবস্থা করতে। তূর্য গম্ভীর ভাবে তার ফোনে কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে। গম্ভীর স্বরেই রূপার উদ্দেশ্যে বলে-
“ রেডি হন, বাসায় যেতে হবে। আম্মা-আব্বা রাতে আসবেন।”
তূর্যের কথায় রূপার হালকা রাগ লাগলো। নিতে এসেছে নিজেই, আবার কথাি বলছে এমন ভাবে যেনো কি না কি! রূপা ঝাঁঝালো গলায় জবাব দেয়-
“ আমি যাবো না।”
“ আপনি যাবেন কিনা যাবেন না সেটা জানতে আসিনি আমি। আই সেই’ড ইয়্যু হ্যাভ টু গো!” ‘ অন্তত রাশভারি স্বরে বলে তূর্য।
“ অর্ডার দিচ্ছেন? যাবো না আপনার সঙ্গে কি করবেন আপনি?”
তূর্যের কথা শুনে রূপা এবার একপ্রকার জেদ ধরে বসলো। রূপার কথায় তূর্যের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা দিলো না। অন্তত শান্ত, সাবলীল স্বরে বলে-
“ তুলে নিয়ে যাবো।”
” হোয়াট! আমাকে হুমকি দিচ্ছেন আপনি?” ‘ রাগে কিরমির করে ওঠে রূপা।
রূপার কথায় তূর্য ফোনের মাঝেই চোখ নিবন্ধন রেখে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ অর্ডার মানলে অর্ডার, আর হুমকি মানলে হুমকি। ব্যাক প্যাক করার থাকলে করে নিন, পরে সময় দিতে পারবো না।”
রূপারর রাগে হাত মুঠোবন্দী হয়ে এলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ আপনার মত মানুষের সঙ্গে সংসার করবো না আমি। এত ঘাড়ত্যাড়া কেনো আপনি? ডিভোর্স চাই আমার।”
” সংসার করা বা না করা আমার মাথা ব্যথা নয়। বাট ইউ হ্যাভ টু স্টে উইথ মি নো ম্যাটার হোয়াট। বিকজ দ্যা ওয়ার্ড ‘ডিভোর্স’ হ্যাজ নো প্লেস ইন মাই লাইফ।”
তূর্যের এমন কথায় রূপার রাগ যেনো আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে-
“ জোর খাটাচ্ছেন?”
“ খাটাতেই পারি, আফটার অল আ’ম ইয়্যু’র হাসবেন্ড!”
” হাসবেন্ড মাই ফু’ট। করবো আপনার সংসার কি করবেন আপনি?”
“ ওয়ানা সি, হোয়াট আই ক্যান ডু?
তীক্ষ্ণ ধূসর দুই জোড়া নেত্র রূপার চোখে চোখ রেখে গম্ভীর স্বরে কথাটুকু, রূপার কর্ণকুহরে যেতেই শিরদাঁড়া বয়ে শীতল বাতাস বয়ে গেলো। ধূসর সেই নেত্রজোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না, সরিয়ে ফেললো। বিয়ের এই প্রথম হয়তো তারা দুইজন এত দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলছে। লাস্ট কবে কথা হয়েছিল সেটাও রূপার মনে নেই। এই বাড়িতে আসারা পর একটি বারের জন্যও তূর্য তার খবর নেয়নি। না দিয়েছে কোনো ফোনকল। রূপার তূর্যের বিবাহিত স্ত্রী হয়েও এখন অব্দি তূর্যের ফোন নাম্বার নেই তার নিকট। যার কারণে রূপা আরও ক্ষেপে আছে, কিছুতেই যাবে না বলে জেদ ধরেছে। এরমাঝেই রূপার মা যেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবারের ট্রে নিয়ে হাজির হলেন। খাবারের ট্রে তূর্যের সামনে রেখে হাসি মুখে বলে ওঠে-
“ আজকে এই বাড়িতে থেকে যাও। বিয়ের পর তো এই বাড়িতে আসোইনি। আজকে আর ছাড়ছিনা।”
“ থ্যাঙ্কিউ আন্টি, বাট রাতে বাবা-মা আসবে। তাই রিনিকে নিতে এলাম। অন্যদিন থাকবো ইনশাআল্লাহ!”
“ সেকি বেয়াইন-বেয়াই আসবে। তাহলে এখানেই আসতে বলো, ওনাদের সঙ্গেও তো দেখা হয় না অনেকদিন হলো।”
“ চিন্তা করবেন না, আসবে ইনশাআল্লাহ! আজকে তাহলে উঠি আন্টি। আমার ক্লাস বাকি আছে।”
তূর্যের কথা শুনে রূপার মা তাড়াহুড়ো করে বলে-
“ কিছু একটু খাও বাবা। প্রথমবার এলে, আর এইভাবে খালি মুখে যাবে।”
“ লাঞ্চ করেছি তাই পেটে আর জায়গা নেই। ওনার কিছু নেওয়ার থাকলে দিয়ে দিন। আমরা বের হবো।”
“ আমি কোথাও যাবো না।”
তূর্যের কথার কাঠ কাঠ কণ্ঠে জবাব দেয় রূপার। মেয়ের কথায় চোখ পাকায় তার মা, দ্রুত রুমে ছুটে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র প্যাক করে দিয়ে দেয়।
“ তোমার বাবা-মা আসলে, অবশ্যই আমাদের এখানে আসতে বলবে। আর ওর কথায় কিছু মনে কর না বাবা।”
একপ্রকার বাধ্য হয়ে রূপার তূর্যের সঙ্গে যাচ্ছে। যাকে বলে ধরে-বেঁধে পাঠানো হচ্ছে, রূপার যাবেই না। লোকমনা হোসেনের ফোন আসায় আর না করার সাহস হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে তূর্যের বাইলের পিছনে বসে পরেছে। তূর্য বাইক স্টাট দেওয়ার আগে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ ধরে বসুন, পরে গেলে আমার দোষ থাকবে না।”
রূপা জেদ দেখিয়ে কিছুই করলো না। বরং অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো, তূর্য একনজর বাইকের মিররে রূপার রাগান্বিত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে। জোরে বাইক স্টাট দিতেই, ঝরের গতিতে হেলে পরে তূর্যের পিঠে সঙ্গে। দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে বাইক, কি করবে বুঝতে না পেরে কোনো রকমে তূর্যের শার্টের এককোণ আঁকড়ে ধরে শক্ত করে। যেটা বাঁকা চোখে তূর্য দেখে বাঁকা হাসলো, আবারও গাম্ভীর্যের ঢেকে গেলো তার সারা মুখশ্রী। যেনো কিছুই হয়নি।
দিবাভাগ আজ কেমন যেন নিস্তেজ। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধূসর মেঘরাশি সূর্যালোককে ;সম্পূর্ণ গ্রাস না করেও পৃথিবীর উপর এক বিষণ্ন আবরণ বিস্তার করেছে। বাতাসে হাসপাতালের জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে আছে। করিডোরজুড়ে ছুটে চলা সাদা অ্যাপ্রোনধারীদের ব্যস্ত পদচারণা। হসপিটালের ব্যক্তিগত কেবিনটাও নিস্তব্ধতার রাজত্ব করছে। বিশাল কাঁচঘেরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্রিক। শুভ্র অ্যাপ্রনের উপর পড়ে থাকা ম্লান আলোকচ্ছটা তার ব্যক্তিত্বকে আরও শীতল, আরও দুর্বোধ্য করে তুলেছে। দৃষ্টিতে সেই চিরচেনা কঠোরতা যেখানে অনুভূতির চিহ্নমাত্র নেই, আছে শুধু অভ্যাসগত সংযম। কিছু সময় পর বাড়িতে চলে যাবে, আজকে আর কোনো সার্জারী নেই। তাই দ্রুতই চলে যাবে, হঠাৎই কেবিনে কেউ নক করে। রৌদ্রিক পিছন না ফিরেই ভিতরে আসার অনুমতি দিতেই, মেয়েলী পরিচিত একখান কণ্ঠস্বর ভেসে আসে-
“ রৌদ্রিক!”
রৌদ্রিক পিছন ফিরে তাকাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। প্রীয়তি! তার সামনে প্রীয়তি দাঁড়িয়ে আছে, হুট করে আবারও এতদিন পর প্রীয়তিকে আশা করেনি সে। সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে অনেক কিছু। অথচ এই নারীকে দেখামাত্রই অতীতের বহু সমাধিস্থ স্মৃতি যেন কফিন ভেঙে পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠতে চাইল। কিন্তু রৌদ্রিকের দৃষ্টি নির্বিকার। যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার জীবনের কেউ নয়, কেবলই এক অনাহূত উপস্থিতি।
“ রৌদ্রিক…!!”
“ কেন এসেছো?”
শীতল, অনুভূতিহীন। এমন এক স্বর, যা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে এই মানুষটার উপস্থিতিতে সে বেশ বিরক্ত প্রীয়তি কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বললো-
“ আমি… রোদেলার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।”
কথাটা শুনে রৌদ্রিকের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠলো। তার চোখে এমন এক নির্মম স্থিরতা ফুটে উঠলো, যা দেখে যে কেউ শীতল আতঙ্কে জমে যেতে বাধ্য।
“ তোমার সেই অধিকার বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।”
প্রীয়তির চোখ ছলছল করে উঠলো। সে এক পা এগিয়ে এলো।
“ প্লিজ রৌদ্রিক! শুধু একবার। আমি একবারই দেখেই চলে যাবো।”
রৌদ্রিক ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন জমাট বরফের শব্দ।
“ যেদিন রোদেলার বয়স মাত্র দুই মাস ছিল, সেদিনও কি একবার ভেবেছিলে তাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে?”
প্রীয়তি থমকে গেলো। বলার মত কিছু খুঁজে পেলো না, সত্যি সে সেই সময়টাতে বড্ড নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছি। একবারও মনে বাঁধা সাধেনি তার। রৌদ্রিকের কণ্ঠ এবার আরও নিচু, আরও ভয়ংকর শান্ত হয়ে কণ্ঠে বলে-
“ আমার রোদ রাতের পর রাত মায়ের জন্য কেঁদেছে। আর আমি তাকে বুকে নিয়ে বুঝিয়েছি,তার মা আর ফিরবে না। তার সব আমি, এখন হঠাৎ কোন অধিকারে তুমি তাকে দেখতে চাও?”
প্রীয়তির অশ্রু গড়িয়ে পড়লো না চাইতেও। অথচ রৌদ্রিকের দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র কোমলতা এলো না। যেন অনুভূতি নামক সমস্ত মানবিক দুর্বলতাকে বহু আগেই নিজের জীবন থেকে নির্বাসিত করেছে সে।
“ মানুষ মাত্রই ভুল করে রৌদ্রিক।”
“ ঠিক মানুষ মাত্রই ভুল। আর সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। কিন্তু তুমি তো ভুলের সঙ্গে অতীতও, আর আমি অতীতকে দ্বিতীয়বার জীবনে প্রবেশ করতে দেই না।”
বাক্যগুলো ছুরির ফেলার মতো কেটে গেলো চারপাশের নীরবতা। প্রীয়তি অসহায় কণ্ঠে বললো-
“ আমি শুধু আমার মেয়েকে একবার দেখতে চাই…”
রৌদ্রিক কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর অত্যন্ত ধীরস্বরে বললো-
“ রোদেলার মা তার দুই মাস বয়সেই মা’রা গেছে। অন্তত আমার পৃথিবীতে।”
রৌদ্রিকের প্রতিটা কথা তীরের মতো বিঁধলো প্রীয়তির অন্তঃকরণে। গড়িয়ে পরলো অশ্রু ফোঁটা।
“ আমি পার্মানেন্টলি আমেরিকার চলে যাচ্ছি রৌদ্রিক৷ আর ফিরবো না তোমার জীবনে, তাই লাস্ট বার অন্তত আমাকে ওর সঙ্গে দেখা করতে দাও!”
রৌদ্রিকের কোনো পরিবর্তন হলো না, যেনো সে কিছুই শোনেনি, আর না কিছু অনুভব করেছে৷ প্রীয়তি শেষবারের মত হাত জোর করে বলে ওঠে-
“ প্লীজ রৌদ্রিক! শত খারাপ হলেও জন্ম দিয়েছি ওকে। এতটুকু অধিকার তো দাও, লাস্ট বার! প্লীজ!”
দিগন্ত জুড়ে কেমন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। চারিপাশ কেমন শুনশান হয়ে এসেছে, শীতের দিন হওয়ায় এমনটা হয় আজকাল। রোদেলাকে নিয়ে বাগানের একপাশে রিনি, তূর্ণা,ইরা বসে আছে। অন্যদিকে বাড়ির তিন কর্তীরাও বসে গল্প করছে। বিকেলের এই সময়টাতে বাড়ির সব মেয়েরা বাগানে এসে কাটায়। রোদেলা মাটির হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে কিছু একটা করছে। কিছু সময় পর ছোট্ট একটা পাতি এগিয়ে এনে তিনজনের উদ্দেশ্যে বলে-
“ লান্না হয়ে গেতে মা! তল খেতে দেই।”
রোদেলার কথা শুনে সবাই তাকালো সেই দিকে। ছোট পাতিলের মধ্যে বেশ অনেক ধরনের লতা-পাতা রয়েছে। রিনি রোদেলার গালে চুমু দিয়ে বলে-
“ ওরে বাবা! এত তাড়াতাড়ি রান্না। গন্ধে সারা বাগান মোঁ মোঁ করছে তো।”
রোদেলা খুশি হয়ে গেলো, ইরা রোদেলার পাতিলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ তা কি কি রান্না করেছো রোদ সোনা?”
রোদেলা প্রাণভড়া হাসি দিয়ে বলে-
“ অনেত কিতু, তুনি খাবে মিনি মা?”
“ খেতেই হবে দেখছি। দাও দেখি।”
রোদেলা এবার তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ তুনিও আতো মা! তবাই খেয়ে নিতে তো।”
“ হুম হুম আসচ্ছি।
চারজন নিজেদের মত করে আনন্দ-উল্লাসে মেতে আছে। ইরা এখন পুরোপুরি এই বাড়ির সদস্য হয়ে উঠেছে, তার পরিবারও আগের মত রেগে নেই। নতুন জীবনে বেশ ভালোই আছে তারা।
“ রোদেলা!”
অপরিচিত কারো কণ্ঠস্বর পেতেই সকলেই সেইদিকে তাকাতেই অশ্রুসিক্ত চোখে প্রীয়তিকে এগিয়ে আসতে দেখতে পায়। হঠাৎ করে প্রীয়তিকে এইখানে দেখে সকলেই অবাক হয়ে যায়। প্রীয়তি ছুটে এসে রোদেলাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। ঘটনাটা এত দ্রুতই ঘটল যে কেউ কিছু বোঝার সময় পেল না। জবা সিকদার তাড়াতাড়ি করে এদিকে এগিয়ে এলেন। প্রীয়তির দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলে ওঠে-
“ তুমি? তুমি এখানে কি করছো?”
প্রীয়তি কারো কথা শুনছে না। নিজের মত করে রোদেলাকে আদর করছে, রোদেলা কিছুই বুঝতে পারছে না। বিস্মিত নয়নে শুধু চেয়ে দেখছে।
“ আমার সোনা! আমার মেয়ে! মাম্মাকে মাফ করে দিও। মাম্মা তোমাকে ওইভাবে ছেড়ে যাওয়ার জন্য, সবকিছুর জন্য মাম্মা অনেক সরি সোনা!”
রৌদ্রিকও সেখানে উপস্থিত হলো, গাম্ভীর্যের ঠাসা তার মুখশ্রী। রৌদ্রিকে দেখে জবা সিকদার প্রশ্ন করেন-
“ ও এখানে কেনো রৌদ্রিক? আর তুমি কিছু বলছো বা কেনো?”
“ আমি নিয়ে এসেছি, ফাস্ট এন্ডা লাস্ট এটা তার আমার রোদকে স্পর্শ করার সুযোগ।” গম্ভীর,শান্ত স্বরে বলে ওঠে রৌদ্রিক
” মানে? কি বলতে চাইছো?”
“ মানে ও আমেরিকার চলে যাবে। তাই লাস্ট বার দেখা করতে চেয়েছে।”
জবা সিকদার আর কিছু বললেন না। সত্যি ভরা চোখে প্রীয়তি আর রোদেলা কে দেখে নিল। এই দিকে তূর্ণা স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে রোদেলা আর প্রীয়তির দিকে। খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখতে পেলো, রোদেলা খানিকটা প্রীয়তির মতোই, ঠোঁট দু’টো অবিকল প্রীয়তির মত দেখতে। না চাইতেও তার ভিতরটা কেমন কেঁপে উঠলো, দানা পেকে এলো কিছু অদৃশ্য ব্যথা! প্রীয়তি আদরমাখা অনেক কথা বলছে রোদেলাকে। যেটা তূর্ণাকে আরও কষ্ট দিচ্ছে, এটাই তো তার বরের আগের বউ। কি সুন্দর দেখতে! তূর্ণার সহ্য হচ্ছে না প্রীয়তিকে। মনে হচ্ছে প্রীয়তি তার সব কেড়ে নিচ্ছে।
“ মাম্মামকে মাফ করে দিও সোনা৷ মাম্মাম খুব সরি, যদি পারতাম তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতাম।”
তূর্ণার আর সহ্য হলো। এগিয়ে এসে এক ঝটকায় রোদেলাকে নিজের কাছে টেনে নিলো। প্রীয়তিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে রাগী স্বরে বলে-
“ আমার বাচ্চা কোথাও যাবে না। পঁচা মেয়ে ওকে বার বার সোনা কেনো ডাকছো? ওর মাম্মা, মা সব আমি। তুমি কেউ না!”
রোদেলাও ছিটিয়ে রইলো তূর্ণার বুকের সঙ্গে। প্রীয়তি উঠে হালকা হেসে বলে-
“ এইভাবেই আগলে রেখো ওকে। আমি তো মা হয়েও মা হতে পারিনি। কিন্তু তুমি তো ওর মা, তাই ওকে মায়ের মতোই এইভাবে রেখো। আমি আর আসবো না তোমাদের জীবনে। ভালো থেকো তূর্ণা।
বলেই শেষবারের মতো রোদেলার ছোট্ট হাতে চুমু খেলো প্রীয়তি। সেটা দেখে ছিটিয়ে সরে গেলো তূর্ণার, প্রীয়তির বলা কথাগুলোও বিষের মত লাগছে তার নিকট। তূর্ণার আর কিছু না বলে রোদেলাকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলো, প্রীয়তি সেইদিকে তাকিয়ে রইলো। রৌদ্রিক এগিয়ে এসে গম্ভীর স্বরে বলে-
“ এবার আসতে পারো তুমি। আশা করি আমাদের আর দেখা হবে না এই জীবনে।”
“ আমায় খুব বেশি ঘৃণা কর তাই না রৌদ্রিক? আর বিরক্ত করবো না তোমাদের। সুখ হও তোমরা, দোয়া রইলো অনেক।”
রৌদ্রিক কোনো উত্তর দিলো না। প্রীয়তি রিনির সঙ্গে কিছু কথা বলে চলে গেলো। রৌদ্রিক ভিতরে চলে গেলো তূর্ণার পিছনে।
বিছানার একসাইডে রোদেলাকে নিজের বুকের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বসে আছে তূর্ণা। তার শরীর কেমন কেঁপে উঠছে বার বার! হয়তো কিছু হারানোর ভয় তাকে এইভাবে নাড়িয়ে তুলছে। রোদেলা চুপটি করে রয়েছে, হয়তো বুঝতে পারছে তূর্ণা লর অস্থিরতা। তূর্ণার রোদেলাকে জড়িয়ে অতি শান্ত,কাতর স্বরে বলে-
“ আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি পুতুল। আমায় ছেড়ে কোনোদিন ওর কাছে যেও না, তোমায় ছাড়া মা একদম থাকতে পারবো না। তুমি আমার বাচ্চা! শুধু আমার!”
“ আনি তো তোমাল মা! তোদেলা তো তুন্না মায়েল।”
তূর্ণার জড়িয়ে রাখলো শক্ত ভাবে। রৌদ্রিক আস্তে করে তূর্ণার সামনে এসে দাঁড়ালো, তূর্ণা রৌদ্রিকের দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালো। রৌদ্রিক ফোঁস নিশ্বাস ছেড়ে বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩০
“ ভয় পেয়েছো?”
তূর্ণা কথা না বলে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায়। রৌদ্রিক শান্ত স্বরে আশ্বস্ত করে বলে-
“ ভয় পেয়ো না, আমি থাকতে তোমার পুতুলকে তোমার থেকে কেউ কেঁড়ে নিবে না। ও তোমারই থাকবে।”
