Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৩
ফাহিমা ইসলাম

গোধূলি বেলা কেটে গিয়ে রাত্রি নেমে এসেছে ধরণীতে। চারদিকে শীতল হাওয়া বয়ে চলছে, রাতের সমুদ্র একদম শান্ত হয়ে গেছে। পানি নেমে গিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে, দূর থেকে ঢেউয়ের গর্জ শোনা চাচ্ছে। রাতের বেলা সি বিচের সৌন্দর্য আর একরকম। চারিদিকে ঝলমলে আলো দিয়ে সাজানো, বিভিন্ন ফাস্টফুডের দোকান রমরমা হয়ে আছে। সমুদ্রের ঠিক কাছেই খোলা রেস্টুরেন্টের একসাইডে বসে আছে তূর্ণা আর রোদেলা। সামনে বিভিন্ন রকমে সি-ফুড আইটেম। রৌদ্রিক সব ধরনের সি-ফুড আইটেম রেখেছে; তূর্ণা আর রোদেলা এটা-ওটা খাচ্ছে। সবকিছু খেলেও তূর্ণা ভুলেও অক্টোপাস ছুঁয়ে দেখছেনা। দেখতেই কেমন সাপ সাপ লাগছে! রৌদ্রিক অক্টোপাস কেটে তূর্ণার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে-

“ এটা ট্রাই কর, এটাও অনেক মজা।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা নাক-মুখ কুঁচকিয়ে ফেলো। নাক-মুখ ফিটিয়ে বলে-
“ ইসস ছ্যাহ! এইটা কি সাপের মত! এইটা খাবো না আমি।”
“ খেয়ে দেখো মজা। আমার তো বেশ মজা লাগে।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণার চোখ বড় বড় হয়ে এলো।
“ কিহহ! এই সাপটা খেয়েছেন আপনি? আবার বলছেন মজা!”
“ এটা সাপ না এটা অক্টোপাস। সি, রোদেলাও খাচ্ছে।”
তূর্ণা সত্যিই দেখলো রোদেলা খুব মজা করে অক্টোপাসটা খাচ্ছে। সেটা দেখে তূর্ণার মাথা ঘুরে উঠলো, সে তাড়াতাড়ি করে রোদেলার কাছ থেকে প্লেটটা কেড়ে নিয়ে বলে-
“ ইসস! পুতুল এইসব খেও না। পঁচা এইগুলো!”
রোদেলা ঘোর বিরোধিতা করে বলে-
“ না! না! অনেত মজা। ইয়ামি ইয়ামি!”
“ বাপ-মেয়ে দু’টোই দেখছি ছ্যাহ মার্কা জিনিস খাচ্ছেন।”
“ তুমিও ট্রায় কর, দেখবে মজা মজা করবে।”
তূর্ণা মুখ বাঁকালো সে কিছুতেই খাবে না। রৌদ্রিক আর জোর করলো না, খাবার শেষে রেস্টুরেন্টে থেকে বের হয়ে। হাঁটতে হাঁটতে এইদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরে যায় তিনজন।

সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাত্রিও গভীর হতে শুরু করেছে। নিস্তব্ধতায় ঘিরে ধরেছে চারিদিক। বাহিরে থেকে শুধু উত্তাল ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাদের রুম থেকে সরাসরি সমুদ্র দেখা যাচ্ছে, বাহিরে চলা দমকা হওয়ায় রুমের পর্দাগুলো এলোমেলো ভাবে উড়িয়ে দিচ্ছে। সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে কান্ত হয়ে রোদেলা আর তূর্ণা গভীর নিদ্রায় মগ্ন। রৌদ্রিক সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছে। হঠাৎই তূর্ণার ঘুম ছুটে যায়। ঘুম জড়ানো নেত্রদ্বয় খোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো কিছুখন। বেশকিছু সময় যাওয়ার তূর্ণা আস্তে করে উঠে বসলো। রৌদ্রিকের দিকে কিছুসময় তাকিয়ে রইলো। রৌদ্রিক কাজের ফাঁকে তূর্ণার দিকে তাকাতেই, তূর্ণাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে জিজ্ঞেস করে-
“ উঠলে কেনো? খিদে পেয়েছে? খাবে কিছু?”
তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে না জানায়।
“ তাহলে উঠলে কেনো? ভালো লাগছে না?”
“ এমনি ঘুম ছুটে গেছে।”

রৌদ্রিক আর কিছু বললো না। তূর্ণা উঠে আস্তে করে ব্যাগ থেকে রিনির দেওয়া জামাটা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। দরজা বন্ধ করে বুকে হাত দিয়ে বড় বড় কয়েকটা নিশ্বাস টেনে নিলো সে! ভীষণ লজ্জা লাগছে তার! সে কিভাবে এটা পরবে?
বেশকিছু সময় নিয়ে তূর্ণা ভয়ে ভয়ে বের হয়ে এলো; গায়ে জড়ানো তার লাল রঙের বডিকোঙ ড্রেড। পিছনটা সম্পূর্ণ ব্যাকলেস, যার কারণে আরও লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরেছে তূর্ণা। কোমড় সমান কেশরাশিগুলো ছেড়ে দিয়েছে। যার কারণে সম্পূর্ণ না ঢাকা গেলো অনেকটা ঢেকেছে পিছনটা, তূর্ণার সারা শরীরে কম্পন বয়ে যাচ্ছে৷ মনে হচ্ছে তার পা দু’টো হাঁটার মত শক্তি নেই। রৌদ্রিকের দৃষ্টি এখনো ল্যাপটপের মধ্যে সীমাবদ্ধ। রিনির শিখিয়ে দেওয়া বুলি মেনে, অতি লজ্জা নিয়ে এগিয়ে গেলো রৌদ্রিকের দিকে।
নিজের সামনে কারো উপস্থিতি টের পেতেই রৌদ্রিক চোখ তুলে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণা, এমনি তূর্ণা দাঁড়িয়ে থাকলে সে অবাক হতো না। যতটা না তূর্ণা নতুন বেশে হয়েছে। ফর্সা শরীরের লাল রঙটা বেশ ফুটে উঠেছে, শরীরের সঙ্গে জামাটা একদম মিশে আছে।

“ এটা কে দিয়েছে তোমায়?”
রৌদ্রিকের গম্ভীর মাখা কণ্ঠস্বরের প্রশ্ন শুনে জমে গেলো তূর্ণার। বুকটা কেমন ধুকপুক করছে তার! মনে হচ্ছে এই বুঝি তার হৃদপিণ্ডটা হাতে চলে আসবে। তূর্ণা লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছে না। তূর্ণার অবস্থা দেখে রৌদ্রিক চাপা হাসলো, কণ্ঠে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলে-
“ কোথায় পেলে এটা?”
“ র..রিনির দি.দিয়েছে!”
“ আচ্ছা ঠিক আছে, পরেছো বেশ। কিন্তু এখন কেনো?”
“ অ..আমি..আমার আদর চাই!”
অনেক কষ্টে কথাগুলো শেষ করলো তূর্ণা। খিঁচিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে, রৌদ্রিকের তূর্ণা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে থাকা মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রৌদ্রিক হাসলো হালকা।
“ তাই! আদর চাও! কিন্তু আদর দিয়ে তুমি কি করবে।”
তূর্ণা হালকা চোখ খুলে রৌদ্রিকে দেখে নিলো। এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। তূর্ণা ইচ্ছে করছে লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে। তূর্ণা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে-
“ আ..আমি তো আপনার বউ! ত..তাই আমাকে আদর করবেন। সব বরই তার বউকে আদর করে। ক..কিন্তু আপনি আমায় করেন না কেনো?”

তূর্ণার কথা শুনে রৌদ্রিক উঠে এগিয়ে এলো তূর্ণা নিকট। তূর্ণা পিছিয়ে যেতে চাইলো, তবে তার আগেই রৌদ্রিক শক্ত হাতে তূর্ণার কোমড় আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এলো। তূর্ণা ঠিক রৌদ্রিকের বুক বরাবর! রৌদ্রিকের বক্ষপট পেতেই সেখানে নুইয়ে পরলো তূর্ণা। সেটা দেখে রৌদ্রিক শান্ত স্বরে বলে-
“ আদর চাও, অথচ লজ্জায় ঠিক মত তাকাতেও পারছো না।”
“ আ..আমি কি করবো..আমার অনেক লজ্জা লাগছে।”
“ আমার চোখে চোখ রাখ তাহলে আর লজ্জা লাগবে না।”
তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে না জানালো। সে তাকাবে না, তার ভীষণ রকমের লজ্জা লাগছে, সেটা দেখে রৌদ্রিক হেসে ফেললো আবারও।
“ তূর্ণা তাকাও আমার দিকে।”
কয়েকবার বলার পর তূর্ণা ধীরে চোখ মেলে মাথা তুলে তাকাতেই রৌদ্রিকের শান্ত মুখশ্রীটা নজরে এলো। তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

“ আমার জন্য সেজে এইভাবে?”
“ হ..হুম!”
“ আমি আদর করি না তোমায়?”
“ না,করেন না। আপনি আমার কাছ থেকে সবসময় পালাই পালাই করেন কেনো? আমায় আদর করেন, আমার একটা বেবি চাই। আমায় একটা চু’মু দিন তো বর। তাহলেই বেবি এসে পরবে।”
তূর্ণার এমন কথায় হালকা শব্দ করে হেসে ফেললো রৌদ্রিক।
”তোমার আদর খাওয়ার বয়স হয়েছে? আর একটু বড় হলে আদর করে দিতাম। তাই আগে বড় হয়ে নাও মেয়ে। পিচ্চিদের আমি আদর করি না।”
রৌদ্রিকের কথায় রাগ লাগলো তূর্ণার। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে-
“ না আমি আর পিচ্চি নেই। রিনি বলেছে আমি আঠারো বছরের হয়ে গেছি। আর আঠারো বছরের সবাই বড় হয়ে যায়। তাহলে আমায় আদর করে দিচ্ছেন না কেনো?”

“ বড় হয়ে গেছো বুঝি?”
“ হুম হয়েছি তো! দেখুন, কত্ত বড় হয়েছি আমি।”
“ আদর করলে কান্না করবে না তো?”
“ ওমা কান্না কেনো করবো? চু’মু দিলে কেউ কান্না করে নাকি বোকা!”
রৌদ্রিক সত্যি হেসে শব্দ করে। তূর্ণার মুখের উপর আসা ছোট ছোট চুল গুলো যত্নসহকারে কানে গুঁজে দিলো রৌদ্রিক। অধর জোড়ায় লাল টকটকে লিপস্টিকের উপস্থিত। রৌদ্রিক শুকানো একটা ঢোক গিলে নিলো। তূর্ণাকে আবাক করে দিয়ে তূর্ণার ললাটে পর পর বেশ কয়েকটা চু’ম্বন একে দিলো রৌদ্রিক। তারপর একে একে দুই কপোলেও চু’মু দিলো। তূর্ণা সম্পর্ক জমে গেছে, নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। না চাইতেও হৃদপিণ্ডের ওঠা-নামা বেড়ে চলেছে। তূর্ণার নাকে আস্তে করে চু’মু দিয়ে দিলো। সর্বশেষে তূর্ণার কম্পিত অধরজোড়ায় পর পর তিনটা চু’মু দিয়ে তূর্ণার ধমকে যাওয়া লজ্জা মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে-

“ আরও লাগবে?”
তূর্ণা কি বলবে খুঁজে পেলো না, লজ্জায় কেমন কেঁপে উঠলো সে। তূর্ণা তার সম্পূর্ণ মুখ গুঁজে দিলো রৌদ্রিকে প্রস্তর বুকে। বেশকিছু সময় সেভাবেই সময়টা কে’টে গেলো। তূর্ণার বুকের মাঝেই মুখ গুঁজে রেখে বলে-
“ আমার বেবি আসবে কবে বর?”
“ যেদিন তুমি বড় হবে।”
তূর্ণা রৌদ্রিকের বুক থেকে মাথা তুললো। ভ্র কুঁচকিয়ে বলে-
“ আপনি না আমায় চু’মু দিলেন। এখন তো আমার বেবি হবে, তাহলে এটা বলছেন কেনো?”
“ বেবি হওয়ার আদর তো এটা না।”
“ তাহলে সেই আদর করে দিন, আমি সেই আদর চাই।”
“ শোনো মেয়ে আমাকে সহ্য করার মত বড় তুমি হওনি।তাই দূরত্বই ঠিক আছে।”
তূর্ণার মানলো না। মানতে নারাজ সে।
“ না! না! আমার ওই আদরই চাই। আমি সব সহ্য করে নিবো।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩২

রৌদ্রিক ধীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তূর্ণার মুখপানে। কিছু বললো না, হুট করে তূর্ণাকে কোলে তুলে নিলো। তূর্ণা হঠাৎ এমন কিছু হবে বুঝতে পারলো না। তাই শক্ত করে রৌদ্রিকের গলা আঁকড়ে ধরলো। রৌদ্রিক তূর্ণাকে একাসাইডে শুইয়ে দিয়ে নিজেও শুইয়ে পরলো। প্রথমবারের মত শক্ত করে তূর্ণাকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো, অন্যহাত দিয়ে মেয়েকেও কাছে টেনে নিলো। তূর্ণার কপালে আবারও ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলে বলে-
“ ঘুমিয়ে পরো। সময় আসলে সব আদরই তোমায় দিবো।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৪