Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১০ (২)

অভিসৃতি পর্ব ১০ (২)

অভিসৃতি পর্ব ১০ (২)
নওরিন কবির তিশা

দূর অজানায় ছুটে চলেছে গাড়ি। স্টিয়ারিংয়ে কার্যত হাত, অন্তরালে দৃষ্টি নিবদ্ধ পার্শ্ববর্তী চঞ্চল নারীকায়াতে। মেয়েটি পুনরায় উশখুশ করছে। আকস্মিক চঞ্চলতা, পরক্ষণেই নিস্তব্ধতার কারণ অনুধাবন করতে পারে না দুর্জয়। তবুও ব্যক্তিত্বের ভারিক্কি বজায় রেখে, বসে থাকে চুপিসারে।
দীর্ঘক্ষণিক স্তব্ধতা বিদীর্ণ করলো কায়রা নিজেই। দূর্জয়ের দিকে কৌতুহলে দৃষ্টিতে চেয়ে শুধাল,,
“আচ্ছা, আপনি কি আমার নামটাও জানেন না? সেই কখন থেকে শুধু ‘মিস’, ‘মিস’ করে ডেকে যাচ্ছেন!”
দুর্জয় স্টিয়ারিংয়ে একহাতে সামান্য চাপ দিয়ে গাড়িটাকে মসৃণভাবে লেনে ফিরিয়ে আনল। সামনের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখেই রাশভারী কণ্ঠে বলল,

“আপনি তো নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করার কোনো সুযোগই দেননি, মিস। একনাগাড়ে বলে যাওয়া আপনার স্বভাব হলে, ধৈর্য ধরে শুনে যাওয়াটা আমার হ্যাবিট।”
কায়রা সাময়িক অপ্রস্তুত হয়ে চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ক্ষোভের সুরে বলল,
“বাহ্‌! তাই বলে আপনার নিজের তো জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো না? একটা মানুষের নামই যদি না জানা থাকে, তবে কীভাবে কী!”
দুর্জয় এবার অলস ভঙ্গিতে ডান পাশের ভ্রু সামান্য উঁচালো; শান্ত কণ্ঠে বলল,
“সেম রুল অ্যাপ্লাইস টু ইয়্যু অলসো। নামের স্পেসিফিকেশনটা প্রথম মিটে আপনার নিজেরও তো বলা উচিত ছিল। নাকি ভুল বললাম?”
দুর্জয়ের এমন শাণিত, যুক্তিপূর্ণ পাল্টা জবাবে কায়রা এক মুহূর্তের জন্য একদম থমকে গেল। বাকপটুতার সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে আসতেই, প্রসারিত বোকা হাস্যে, কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললো,
“ওকে ওকে, ফাইন! টেকনিক্যাল এরর এগেইন!ইয়ে, আই অ্যাম কায়রা। কায়রা ইয়াসির। এবার অন্তত নাম ধরে ডাকার অনুমতি দেওয়া হলো!”

পরিচয় পর্বের পরমুহূর্তেই,অকস্মাৎ কি হলো কে জানে?দুর্জয়ের গতিময় হাত দুটি স্থির হলো ‌মুহূর্তের তরে। গাড়ির গতি মন্থর হয়ে এল চটজলদি। ও ধীর গতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে সোজাসুজি কায়রার ডাগর,হরিণীতুল্য নেত্র দুটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। গাঢ় নীল শার্টের কাটছাঁট আর চওড়া চিবুকের কঠোরতা ভেদ করে ওর মনের গহিনে চকিতে ভেসে কিছু হয়তো! ভরাট কণ্ঠস্বরের অনমনীয়তা দূরীভূত হলো হঠাৎ,
“মিস কায়রা ইয়াসির?”
আচানক, গম্ভীর পুরুষের মুখে নিজের পূর্ণাঙ্গ নাম শুনে হকচকিয়ে উঠল কায়রা, দু-গালে র”ক্তজবার র”ক্তা”ভ ছোঁয়া লেগে গেল ওর। একটু ইতস্তত করে আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল,
“জ-জ্বী?”
“সো, আনইজি ফিল করছেন, মিস কায়রা ইয়াসির?”
“এমন ড্যাশিং, সিংহমার্কা লোক পাশে বসে থাকলে ফিলিং আনইজি তো হওয়ারই কথা! শুধু আমি কেন, পৃথিবীর যেকোনো নরমাল মেয়েরই হার্টবিট থমকে যাবে!”
অস্ফুট স্বরে আনমনে কথাগুলো বিড়বিড়ানোর,পরেই কায়রা অনুধাবন করল-কথাটা মনে মনে ভাবার বদলে ও স্পষ্ট মুখ ফুটিয়েই বলে ফেলেছে! চকিতে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে তড়িঘড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে হাত দুটি বাতাসে নেড়ে বলল,

“আরেহ্‌ না না! আই মিন… ওসব কিচ্ছু না! একদম নরমাল! ওই একটু এমনি আর কি!”
“নামুন।”
প্রশ্নের জবাবে এমন কথা বিন্দুমাত্র আশা করে নি কায়রা।মস্তিষ্কে হানা দিলো সহস্র প্রশ্নের ঝাঁক। এখন আবার ওকে,বাংলা সিরিয়ালের মতো মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দিবে না তো? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে ও বললো,,
“কেন?”
“আমরা এসে গিয়েছি।”
দুর্জয়ের কথায় জমাটবদ্ধ সংশয়ের অবসান ঘটলো ওর। আশেপাশে দৃষ্টি বোলালো একপল। ওরা,ইতিমধ্যেই সোনাডাঙ্গার গণ্ডি পেরিয়ে রূপসা সেতুতে এসে পৌঁছেছে। মধ্যাহ্নের বিদায় ঘটেছে মুহূর্ত খানেক আগে। অপরাহ্নের ম্রিয়মাণ রৌদ্র শিখায় আশপাশটা গল্পপুরি হিসেবে ঠাওর হচ্ছে। জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষমেষ সিট ছাড়লো কায়রা।
প্রকাণ্ড নদ ভূ-মাতৃকার বুক চিরে বয়ে চলেছে দূর সীমানার দিকে, আর ওপরের মুক্ত আকাশজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে ফুরফুরে হিমেল হাওয়া। আর তাতেই কায়রার সুতি ওড়নার আঁচলখানা থেকে থেকে উড়ছে। গাড়িটা নিরাপদে এক পাশে পার্ক করে দুর্জয় ধীর পদক্ষেপে ব্রিজের ফুটপাত ধরে এগোতে লাগল। আর ওর ঠিক দুই কদম পেছনে কায়রা! দুর্জয় যেখানে পা ফেলছে, কায়রাও ঠিক সেখানেই সাবধানে পা বসিয়ে এগোচ্ছে।
হঠাৎ দুর্জয় চলা থামিয়ে নিঃশব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। কায়রা চট করে থমকে গিয়ে সামলে নিল নিজেকে, নইলে সোজা গিয়ে দুর্জয়ের চওড়া পিঠের ওপর আছড়ে পড়ত! ভেসে এলো দূর্জয়ের ভারী কন্ঠস্বর,,

“পিছু পিছু হাঁটছেন কেন? পাশাপাশি আসুন।”
কায়রা একটু লজ্জিত হয়ে বোকা হাসি উপহার দিল। ওড়নার আঁচল সামলাতে সামলাতে চটপট এগিয়ে গিয়ে দুর্জয়ের একদম পাশে, রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ব্রিজের ওপর দিয়ে ধেয়ে আসা মাতাল হাওয়ারা নির্লজ্জ বেগে ছুঁয়ে গেল ওদের। কায়রা এবার পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি নিবদ্ধ করল দুর্জয়ের দিকে। দুর্জয়ের ব্যক্তিত্ব অনুসারে ও যতটুকু বুঝেছে,কারণ ছাড়া ওকে নিয়ে ঘুরতে আসার মত লোক দুর্জয় মোটেও নয়।
সাহসের সঞ্চয় করে শেষমেষ ও জিজ্ঞাসা করেই ফেলল,,
“আমরা এখানে কেন এলাম?”
হিমেল হাওয়া’রা তটিনীর বুকে ছোট ছোট তরঙ্গ তুলে দূরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কায়রার প্রশ্নের উত্তরে দুর্জয় তৎক্ষণাৎ কোনো প্রত্যুত্তর করল না। ব্রিজের রেলিংয়ে দুই হাত রেখে প্রকাণ্ড রূপসা নদীর জলরাশির দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। কায়রাও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে ওর মুখের পানে চেয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্ত পর দুর্জয় ধীর গতিতে মুখ ফেরাল। অনাবৃত কৃষ্ণচোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সোজা নিবদ্ধ করল কায়রার ওপর। মন্থর অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
“মিস কায়রা, আপনাকে এখানে নিয়ে আসার একটা স্পেসিফিক পারপাস আছে। উই নিড টু টক-ফরমালি অ্যান্ড ক্লিয়ারলি।”
কায়রা একটু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“কথা? কী কথা?”
দুর্জয় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত পুরে নিল। ‌অটল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“গতকাল আপনার ফ্যামিলির সামনে ডিসিশনটা জানালেন…আপনি কি সত্যিই জেনেশুনে, ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিয়েতে রাজি হয়েছেন? আই মিন, কোনো ফ্যামিলি প্রেসার বা হুট করে নেওয়া ইমোশনাল ডিসিশন নয় তো?”
কায়রা মৃদু চমকালো। তারপর চটপট মাথা নেড়ে স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
“আরেহ্‌ না! একদমই না! কোনো প্রেসার নেই আর কোনো ইমোশনাল ড্রামাও না। আই অ্যাম হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর। বাট, হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?”
দুর্জয় প্রলম্বিত শ্বাস টেনে বাস্তববাদী কণ্ঠে বললো,,

“বিকজ ইয়্যু নিড টু নো দ্য রিয়েলিটি ফার্স্ট, মিস কায়রা। একজন আর্মির অফিসারের লাইফ বাইরের থেকে যতটা গ্ল্যামারাস বা থ্রিলিং মনে হয়, প্র্যাকটিক্যালি তার চেয়ে থাউজেন্ড টাইমস বেশি টাফ আর ইনসিকিউরড। ডিফেন্স পার্সোনেলের লাইফের কোনো সার্টেনিটি থাকে না। আজ আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কাল হয়তো কোনো ইমার্জেন্সি অপারেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সীমান্তের কোনো রিমোট এলাকায় পোস্টেড হয়ে যাব।”
কায়রা একদম চুপ হয়ে মন দিয়ে ওর কথাগুলো শুনছিল। দুর্জয় থামল না, কঠোর গাম্ভীর্যে বলে চলল,,
“আমাদের কোনো ফিক্সড হলিডে নেই, লাক্সারিয়াস রুটিন নেই। মোস্ট অফ দ্য টাইম আপনাকে একা থাকতে হবে, ওয়েট করতে হবে। হয়তো আজ আমাদের এনগেজমেন্ট বা বিয়ের আকদ হলো, আর নেক্সট মোমেন্টেই কল এল-আমাকে ডিউটিতে রিপোর্ট করতে হবে। আই মে হ্যাভ টু লিভ রাইট অন দ্যাট মোমেন্ট, উইদাউট এনি হেজিটেশন। প্র্যাকটিক্যাল লাইফে এই সিচুয়েশনগুলো হ্যান্ডেল করা অত্যন্ত ডিফিকাল্ট। কোনো কাল্পনিক গ্ল্যামার বা রোমান্টিসিজম দিয়ে এই রিয়েলিটি ফেস করা যায় না। আর ইউ রিয়েলি প্রিপেয়ার্ড ফর দ্যাট কাইন্ড অফ লাইফস্টাইল?”

দুর্জয়ের প্রতিটা শাণিত, বাস্তবসম্মত বাক্য রূপসার মাতাল হাওয়ায় ভেসে কায়রার হৃদয়তন্ত্রীতে গিয়ে আঘাত করল। কায়রা অনুধাবন করতে পারল-লোকটা শুধু সুদর্শন নয়, সৎ দায়িত্ববান একজন। আনমনে‌ মৃদু হাস্যে কোনরূপ দ্বিধা ছাড়াই ও বলল,,
“আমি রাজি আছি!”
দুর্জয়ের কথা শেষ হয়নি তখনও।
“নো, মিস কায়রা। এক বাক্যে ‘রাজি আছি’ বলে দেওয়াটা বড্ড ইজি, কিন্তু ফেস করাটা ততটাই কঠিন। ইয়্যু আর ফ্রম জেন-জি। আপনাদের জেনারেশনের মেয়েদের আকাঙ্ক্ষিত প্রাইওরিটি, এক্সপেক্টেশন আর লাইফস্টাইল একেবারেই আলাদা। একটা স্বাভাবিক বয়সের রিলেশনশিপে যে প্রতিদিনকার অ্যাটেনশন, কিংবা উইকেন্ডে ডেটিংয়ের যে কালচার থাকে—আমার সাথে যুক্ত হলে তার টেন পার্সেন্টও আপনি পাবেন না। এই জেনারেশনের প্রেমিক পুরুষের মতো প্রতিদিন আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া তো দূরের কথা, আমাদের দেখাই হবে দু-তিন মাস অন্তর। আর এতদিন বাদে, সাথে থাকতে পারব বড়জোড়ে দু সপ্তাহ। আর মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি,আমি আপনাকে এই প্রজন্মের তরুণ প্রেমিকের মত লোক দেখানো ভালবাসতে পারব না। আমার কাছে ভালোবাসা মানে দায়িত্ববোধ, সারা জীবন পাশাপাশি থাকা, লোক দেখিয়ে গোলাপের তোড়া দেওয়া নয়। আমাদের এজ গ্যাপটাও কম নয়। আপনার রঙিন বয়সের সাথে আমার এই রুটিনবাঁধা, ডিসিপ্লিন্ড মিলিটারির লাইফ মেলাতে গেলে পদে পদে ফ্রাস্ট্রেশন আসবে। এরপরেও কি আপনি মনে করেন, কোনোরূপ মোহে না পড়ে এই চরম বাস্তবতাকে আপনি এক্সেপ্ট করতে পারবেন?”

রূপসা নদীর কোল ঘেঁষে ছুটে আসা দুরন্ত বাতাস কায়রার এলোমেলো চুলগুলোকে আরও অবাধ্য করে তুলছে। তবে,দুর্জয়ের প্রখর যুক্তি আর সামরিক বাস্তবতার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কায়রা কিন্তু এতটুকু নড়বড়ে হলো না।
ও নদীর দিকে একপলক চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর দুর্জয়ের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর অতল কৃষ্ণচোখে নিজের অনাবৃত, স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। ওষ্ঠাধরে ফুটালো এক অদ্ভুত, পরিপক্ব হাস্য রেখা,,
“এবার তবে আমি বলি?”
দুর্জয় নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই,ও বলতে শুরু করল,,
“আপনি বয়সের পার্থক্য, জেনারেশন গ্যাপ দেখাচ্ছেন। অথচ, আমি আমার স্বপ্নের পুরুষটাকে দেখছি। এই জেনারেশন এর লোক দেখানো ভালোবাসার প্রতি অ্যাট্রাকটশন কোনো কালেই আমার ছিলো না। আমি চেয়েছিলাম, এই জেন-জি’র হাজারো পাগলাটে প্রেমিকের ভিড়ে এক গম্ভীর ৯০ দশকের প্রেমিক আসুক আমার জীবনে। যার কাছে ভালোবাসা মানে, দায়িত্ববোধ লোক দেখানো কিছু নয়। তারা অন্তত ছেড়ে যায় না! আর রইলো বাকি অপেক্ষার কথা? অপেক্ষা না করলে প্রাপ্তির সুখ পাবো কিভাবে? খুব বেশি কাছে থাকলে ভালোবাসার গভীরত্ব উপলব্ধি করা যায় না।সো , স্টপ উইথ অল দিস ওয়ার্নিংস। কায়রা ইয়াসির যা বলে, জেনেশুনেই বলে।”
বৃহৎ প্রশ্নের সুনিপুণ যুক্তিখণ্ডনকারী সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তর কল্পনাতীত। কায়রার মতন চঞ্চল মেয়েটির এমন রূপে দুর্জয় ক্ষণিকের তরে স্তব্ধ হলো। চোয়ালের কঠোরতা আলগা হয়ে ওর অতল কৃষ্ণচোখে ফুটল,এক দুর্লভ প্রচ্ছন্ন সন্তুষ্টি।ও কায়রার দিকে তাকিয়ে ওষ্ঠাধরের কোণে অতি অলক্ষ্যে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বলল,

“ইমপ্রেসিব, মিস কায়রা। লেটস সি, হাউ ইয়্যু হ্যান্ডেল দিস।”
“দেখবেন তো অবশ্যই! সারা জীবন দেখার সুযোগ তো হাতেই আছে!”
দুর্জয় হাতঘড়িটার দিকে একপলক চোখ বুলিয়ে পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বের করল। রাশভারী গলায় বলল,
“ওকে দেন। অনেকটা সময় নিলাম আপনার, এবার ফ্যামিলির কাছে ড্রপ করার টাইম। যাও যাক?”
তটে রূপসার হাওয়া তখন আরও উথাল-পাথাল, দুর্জয়ের অকম্পিত পদবিক্ষেপে গাড়ির পানে ফিরে যাওয়ার বার্তা স্পষ্ট। কায়রাও চটপট পা বাড়াতে গিয়েছিল; কিন্তু আচমকা এক পা এগিয়েই ও থমকে দাঁড়াল।
রেলিংয়ের কোল ঘেঁষে কিছু দূরেই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে একটা কাঠের ফুচকার ভ্যান। ঘুগনি আর তেঁতুল জলের অম্লমধুর চেনা সুবাস মৃদু বাতাসে ভেসে এসে কায়রার নাসারন্ধ্রে আঘাত হানতেই মেয়েটির চঞ্চলতা মুহূর্তেই দ্বিগুণ হলো। ডাগর চোখ দুটি লোভে চকচক করে উঠল, জিভে জল সামলানো দায়! রূপকথার গাম্ভীর্য আর মিলিটারি বাস্তবতার মেঘ ততক্ষণে ফুচকার তেঁতুল জলে নিমেষেই বিলীন।
কায়রা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে উঠল,

“আরে—আরে! দাঁড়ান দাঁড়ান! হোল্ড অন আ সেকেন্ড!”
দুর্জয় ধীর পদক্ষেপে কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিল। আচমকা এই জরুরি আহ্বানে ও সচকিত হয়ে পেছনে ফিরল। মৃদু বিস্ময় ফুটিয়ে ভাবল, কোনো বিপত্তি ঘটল নাকি? কিন্তু পরক্ষণেই কায়রার দৃষ্টির পথ অনুসরণ করে ফুটপাতের ফুচকার ভ্যানটার দিকে নজর যেতেই, ওর কঠিন পুরুষালি চিবুক আলগা হয়ে এলো সামান্য। কায়রা ততক্ষণে চঞ্চল পায়ে সোজা ভ্যানের দিকে এগোতে শুরু করেছে। দূর্জয় রাশভারী গলায় পিছন থেকে গম্ভীর হাঁক দিল,
“হ্যেই! কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
কায়রা মাঝপথে থমকে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্জয়ের অতল দীপ্তমান চোখে চেয়ে ইতস্তত গলায় বলল,
“কেন, ফুচকা খেতে! হাজার হোক মাই অল-টাইম ফেভরিট! উইথ অল ডিউ রেসপেক্ট স্যার… এবার কি আপনি ফুচকা খাওয়াতেও রেস্ট্রিকশন দেবেন নাকি? আই মিন, এতেও মানা করবেন?”
কথাটা বলেই কায়রা থামলো।লোকটার প্রখর ব্যক্তিত্ব, কড়া মেজাজের সামনে এতক্ষণ এত প্রাজ্ঞ ভাষণ দিয়ে এখন ফুচকার জন্য বায়না ধরাটা কেমন যেন বোকামো শোনালো! একরাশ হতাশা নিয়ে ও ক্ষুণ্ন মনে দু-পা পিছিয়ে আসতে চাইল। ভাবল, থাক, দরকার নেই এত আবেগ দেখানোর। কায়রাকে হঠাৎ পিছিয়ে আসতে দেখে দুর্জয়ের ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত অলক্ষ্যে এক চিলতে প্রশ্রয়ের অমায়িক হাসি খেলে গেল। গভীর দৃষ্টিতে কায়রার দিকে চেয়ে অলস ভঙ্গিতে বলল,

“ইটস অলরাইট, মিস কায়রা। আজ ফার্স্ট, তাই নো রেস্ট্রিকশনস!”
হতাশার মেঘ চিরে কায়রার মুখটা একমুহূর্তে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। শ্রবনান্ত্রেয়কে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকলো না! ডাগর নেত্রে বিস্ময় ফুটিয়ে চকিতে শুধাল,
“রিয়েলি? সত্যি বলছেন?”
দুর্জয় ধীর গতিতে শুধু নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় দিল।অনুমতি পাওয়া মাত্রই কায়রা একরাশ বালিকসুলভ আনন্দ নিয়ে ছুটে গেল ভ্যানটির কাছে। ঝাল-টক মেশানো মুচমুচে ফুচকা মুখে পুরে তৃপ্তির এক প্রকাণ্ড নিঃশ্বাস ফেলল ও। ফুচকার পাত্র হাতে নিয়ে ও পাশ ফিরে চাইল দুর্জয়ের পানে।
একটু দূরে প্রকাণ্ড নদীর সীমানায় হেলান দিয়ে হাত দুটি পকেটে পুরে দাঁড়িয়ে আছে দুর্জয়। অপরাহ্ণের শেষ রোদ্দুরটুকু ম্লান রুপে এসে পড়েছে ওর চওড়া কাঁধ আর গাঢ় নীল শার্টে। এক অনাসক্ত চোখে ও নিঃশব্দে কায়রার এই চঞ্চলতা প্রত্যক্ষ করছে। তবে,কায়রা চাইতেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো ও।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যেই গাড়িতে উঠবে অমনি দেখা মিললো হাওয়াই মিঠাই ভর্তি এক ঝাঞ্জা। বলা বাহুল্য, ফুচকায় মাত্রাতিরক্ত ঝাল খাওয়ায় আপাতত, জিভ ও মুখ প্রায় অসাড় কায়রার। মিষ্টি কিছুর তীব্র আকুলতা জাগলেও দুর্জয়ের সামনে মুখ ফুটে চাইতে দ্বিধা হলো ওর। একটু আগেই তো লোকটা ফুচকার পুরো বিলটা চুকিয়েছে! এখন আবার এক বাচ্চাদের মতো হাওয়াই মিঠাইয়ের জন্য বায়না ধরাটা বড় বেখাপ্পা দেখায়। কায়রা একপলক সেই রঙিন মেঘের তোড়ার দিকে চেয়ে লজ্জিত মুখে চোখ ফিরিয়ে নিল।
কিন্তু দুর্জয়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ানো এত সহজ নয়। চঞ্চল মেয়েটির আড়চোখের আকুলতা নিমেষেই ধরা পড়ল ওর চোখে। দুর্জয় মৃদু থমকে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় শুধাল,
“হাওয়াই মিঠাই খাবেন?”
কায়রা সাময়িক অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি মাথা নাড়ল,
“না না! একদম না! ওসব বাচ্চাদের জিনিস, আমার লাগবে না!”

দুর্জয় জবাব দিল না। অলস পদক্ষেপে হেঁটে গিয়ে ক্ষণিকের মধ্যেই দুটো হাওয়াই মিঠাই কিনে আনল-একখানা শুভ্র ধবধবে, অন্যখানা হালকা রঙিন। কায়রা অবাক লোচনে চেয়ে রইল; সে তো সরাসরি না করল, তবুও লোকটা আনল কেন! দুর্জয় কায়রার প্রসারিত হাতের তালুতে মোড়ানো হাওয়াই মিঠাই দুটো তুলে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“টেক দিস। তবে মাইন্ড ইট, দিস ইজ দ্য ভেরি লাস্ট টাইম! পরবর্তীতে আমার সাথে বের হলে এই ধরনের আনহাইজেনিক স্ট্রিট ফুড খাওয়া যাবে না! আন্ডারস্ট্যান্ড?”
শেষে জুড়ে দেওয়া প্রশ্নের জবাবে,কায়রা লজ্জিত হেসে কেবল মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর দুজনে গিয়ে বসলো গাড়িতে। রূপসা সেতু পার হয়ে সুদূর গন্তব্যের পানে ছুটে চলল সেটি।

“ছিনতাইকারী!”
“কোথায়?”
পায়রার শঙ্কিত প্রশ্নে, বৃদ্ধিটি সম্মুখে আঙ্গুল উঁচিয়ে ইশারা করে বলল,,
“ঐতো।”
ইশারা অনুসরণ করে ঘাড় ঘোরাতেই পায়রার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়, কিঞ্চিৎ দূরত্বে দৌড়ে চলা শার্ট-কোট পরিহিত বেশ ভদ্র-সভ্য হিসেবে ঠাওর হওয়া ব্যাক্তিটির উপর। হাতে থাকা ব্যাগগুলো বৃদ্ধার হাতে সন্তর্পনে গুঁজে কোনো মতে বললো,,
“এগুলো ধরুন!”
বলেই লোকটার পিছু পিছু দৌড় লাগালো ও। ভিড়ের আড়ালে লোকটা ততক্ষণে গতি কমিয়ে এনেছে। হয়তো,ভেবেছে এই জনসমুদ্রে তাকে আর আলাদা করে চেনা যাবে না। কিন্তু বাজপাখির তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে অলক্ষ্যে থাকা কি অতই সহজ? একটানা কিছুটা দৌড়ে এসে তড়িঘড়ি ভিড় ঠেলে লোকটার ঠিক পেছনটিতে এসে থামল পায়রা। মুহূর্ত মাত্র বিলম্ব না করে, অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় পিছন দিক থেকে শক্ত হাতে লোকটার কলারটা চেপে ধরল সে। অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,

“এই যে মিস্টার!”
হঠাৎ অঘোষিত আক্রমণে চমকে উঠে চট করে ঘাড় ফেরাল লোকটা। আলো-আঁধারির মাঝে তার অনাবৃত অবয়বখানা স্পষ্ট দৃশ্যমান হতেই পায়রা ক্ষণিকের তরে বাক্‌রুদ্ধ হলো। সুগঠিত তীক্ষ্ণ নাসিকা, মেদহীন চিবুক আর গাঢ় বাদামী নেত্র সব মিলিয়ে কোনো অভিজাত রুচিশীল পুরুষের কাঠামোর সঙ্গে বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় নেই। বেশভূষায় কোনো অসংগতি নেই, শার্ট আর কোটের পরিচ্ছন্ন কায়দা দেখে কোনো সাধারণ অপরাধী বলে মনে হওয়া দুষ্কর।
পায়রা তার রূপের এই ক্ষণিক ঝলক অবলোকন করে ভেতরে ভেতরে বেশ অবাক হলো বটে, তবে মুখচ্ছবিতে সেই বিস্ময় প্রকাশ পেতে দিল না। ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে, কণ্ঠে তীব্র শ্লেষ ঢেলে বলল,
“চেহারা দেখে তো বেশ শোধরালে ভালো ঘরের সন্তান বলেই মনে হচ্ছে! তা এমন চুরি-চামারি কোত্থেকে শিখলেন, শুনি?”
লোকটার গম্ভীর নয়নে তীব্র বিস্ময় ফুটে উঠল। নিজের কলারটা পায়রার বাঁধন থেকে মুক্ত করার নিষ্ফল চেষ্টা চালিয়ে, শীতল কণ্ঠে বলল,

“কী সব আজেবাজে বকছেন? মেক সেন্স!”
“আমি আজেবাজে বলছি? আসুন আমার সাথে!”
পায়রা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে লোকটার জামা আঁকড়ে ধরেই জোর জবরদস্তি তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। লোকটা রীতিমত ক্ষোভে ফুঁসছে। তবুও,ভদ্রতার খাতিরে একটা মেয়েকে বলতে পারছে না কিছুই। এই সুযোগে পায়রা ওকে টানতে টানতে নিয়ে এলো সেই বৃদ্ধার সম্মুখে। প্রবীণ নারীটি ততক্ষণে কৌতূহলী,শঙ্কিত চিত্তে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। পায়রা লোকটার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বেশ দাপটের সঙ্গেই বলে উঠল,
“অস্বীকার করার চেষ্টা একদম করবেন না! একজন প্রবীণ, অসহায় মহিলার হাত থেকে জিনিসপত্র ছিনতাই করতে আপনার সামান্যতম লজ্জা হলো না?”

পায়রার এই চরম অভিযোগে লোকটার দৃষ্টিতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত তখন। তবে সে মুখে কিছু না বলে,হাত বাড়িয়ে নিজের প্রবীণ মহিলার সেই হারিয়ে যাওয়া টাকার বান্ডিলটা সোজাসুজি বৃদ্ধার হাতে গুঁজে দিল। বৃদ্ধা নিজের টাকাগুলো ফেরত পেয়ে বেশ আশ্চর্য হয়েই লোকটার পানে চাইলো।
পায়রা বক্র হাস্যে, কন্ঠে তীব্র শ্লেষের সুর ছড়িয়ে লোকটার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“কী হলো মিস্টার? চুরির মাল ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে এখন সাধু সাজার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাই তো? চুরি করার সময় এই আক্কেলটা কোথায় ছিল, শুনি?”
বৃদ্ধা ততক্ষণে পায়রার হাতা ধরে মৃদু টান মেরে লজ্জিত মুখে বলে উঠলেন,
“আহা রে খুকি! তুই ভুল বুঝছিস! লোকটা তো চোর নয়! ভিড়ের মধ্যে যে ছেলেটা আমার ব্যাগ মেরে পালিয়েছিল, এই বাবুটাই তো তার পিছু ধাওয়া করে ব্যাগটা উদ্ধার করে আনল! আমি তো ভাবলাম বাবুটাই হয়তো আবার হারিয়ে গেল, তাই তোর সাথে খুঁজতে বের হয়েছিলাম!”
বৃদ্ধার মুখের সত্যবাণী শোনামাত্র পায়রা সম্পূর্ণ স্তব্ধ, বাক্যহারা হয়ে ও দাঁড়িয়ে রইল এক ঠাঁই। মূহুর্তেই,নিজের ভুল অনুধাবন করে অপরাধবোধে মুখখানা ওর ছোট হয়ে এল। চোখের সামনে দাঁড়ানো লোকটি যে কোনো দুষ্কৃতকারী নয়, বরং এক পরম উপকারী ব্যক্তি এ কথা ভেবে লজ্জায়, কুণ্ঠায় একদম মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল তার।
পায়রা লজ্জিত মুখে, অপরাধীর ভঙ্গিতে আমতা আমতা করে কোনোমতে বলতে গেল,

“ইয়ে… মানে… আই অ্যাম রিয়েলি স‌্যরি… আমি আসলে না বুঝে..”
কিন্তু লোকটি পায়রাকে আর কথা শেষ করার বিন্দুমাত্র অবকাশ দিল না। সুগঠিত তীক্ষ্ণ নাসিকা আর অলস চিবুকে একরাশ অবহেলা ফুটিয়ে, অতল বাদামী নেত্রের অতিশয় শীতল্ এক দৃষ্টি নিবদ্ধ করল পায়রার ওপর। প্রচন্ড গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“অ্যাট লিস্ট মেক শিউর ইয়্যু হ্যাভ সাম বেসিক কমন সেন্স বিফোর জাম্পিং টু কনক্লুশনস, মিস। শুধু বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে ভুলভাল জাজমেন্ট না চালিয়ে, ব্রেনটা একটু প্রপারলি ইউজ করা প্র্যাকটিস করুন।”
লোকটার এমন নির্দয়, শাণিত প্রহার শুনে পায়রার মুখের স্যরিটুকু নিমেষেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! ওর কুণ্ঠাবোধ আর অনুশোচনা একলহমায় উবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল একরাশ রাগ আর তেজ। ও যে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মনে মনে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত হচ্ছিল, লোকটার এই অহংকারী, রুক্ষ বাক্যে তা একমুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। পায়রা নিজের ক্ষুণ্ন অহংবোধ চেপে রেখে, ওষ্ঠাধর সামান্য বাঁকিয়ে বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করে বলে উঠল,

“হুহ্‌! আসছে আমার এক মস্ত বড় বড় বুদ্ধিমান সাহেব! তা অবয়বটা তো একদম চোরের মতো বানিয়েই ধাওয়া করছিলেন! ওমন করে ঝড়ের বেগে ছুটলে কেউ কি আর আপনাকে মহাপুরুষ বলে পুজো করবে? চোরই তো ভাববে!”
লোকটি আর একটি বাক্যও ব্যয় করল না। পায়রার এই অবাধ্য বিড়বিড়ানোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের কোটের কলারটা পরম অলস ভঙ্গিতে সোজা করে নিল। ধীর, অকম্পিত পদক্ষেপে জনসমুদ্রের মাঝে হারিয়ে গেল সে। আর পেছনে দাঁড়িয়ে রেশমি চুলগুলো বাতাসে উড়িয়ে, ক্ষোভে-লজ্জায় দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে একদৃষ্টিতে তার চলে যাওয়ার পানে চেয়ে রইল লোকটা হতে পরক্ষভাবে গর্দভ খেতাবভুক্ত পায়রা!

গোধূলির বিদায় লগ্নে সাঝের আঁধার ঘনিয়ে আসছে। রূপসা সেতু পেরিয়ে সোনাডাঙ্গা বাইপাস ধরে পুরো পথটা কেটেছে এক প্রগাঢ় নিস্তব্ধতায়। মাঝে কেবল ঘটেছে,দুটো অলস নেত্রের নিঃশব্দ আদান-প্রদান। কায়রা যখনই কৌতুহলী চোখে তাকাচ্ছিল, দুর্জয় অতি কৌশলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিচ্ছিল; আর দুর্জয় তাকালে কায়রা লজ্জিত ভঙ্গিতে বাইরের ঝাপসা আলো-ছায়ায় চোখ রেখে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল।
অবশেষে ওদের গাড়ি এসে থামল কায়রাদের বাড়ির সড়কটার বেশ কিছুটা দূরে। ব্যক্তিত্বের ভারিক্কি বজায় রাখতে দুর্জয় সরাসরি দরজায় না গিয়ে খানিকটা তফাতে পার্ক করল গাড়িটা। পুরোটা পথ আসতে আসতে কায়রা চটপটে হাতে হাওয়াই মিঠাইয়ের রঙিন মেঘটুকু অল্প অল্প করে ঠোঁটে পুরে উপভোগ করছিল।
গাড়ি থামতেই কায়রা ওড়না সামলে নামার জন্য দরজার হ্যান্ডেলে হাত রাখল। দুর্জয় অনমনীয় ভঙ্গিতে সিটে হেলান দিয়ে অলসভাবে চোখ ফেরাল ওর দিকে। ঠিক তখনই নজর আটকালো কায়রার ঠোঁটের ঠিক বাঁ পাশের কোণে লেগে থাকা গোলাপি হাওয়াই মিঠাইয়ের গুঁড়োতে।দুর্জয় নামার মুখে গম্ভীর, তবে সামান্য সহাস্য কণ্ঠে ডাকল,

“মিস কায়রা।”
কায়রা হ্যান্ডেল ছেড়ে চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে শুধাল,
“জ-জ্বী?”
দুর্জয় নিজের বাঁ গালের কোণে একটা আঙুল ছুঁইয়ে সংক্ষিপ্ত ইশারায় বলল,
“ফেসটা ক্লিয়ার করুন। মিষ্টি লেগে আছে।”
কায়রা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দ্রুত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ডান গালে ঘষে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“উমম… মুছেছে?”
দুর্জয় নিঃশব্দে অতি ম্লান হাসলো। অতঃপর কোনো কথা না বাড়িয়ে সামনের রিয়ার-ভিউ মিররটার গতিপথ আলতো হাতে ঘুরিয়ে কায়রার মুখের দিকে করে দিল। আয়নায় নিজের মুখের বাঁ পাশে সেই বালিকা সুলভ, গোলাপি চিহ্নে চোখ পড়তেই কায়রার পুরো মুখমণ্ডল লজ্জায় রক্তা’ভ হয়ে উঠল! ইস, লোকটার সামনে নিজেকে আর কতবার বোকা বানাবে ও! তড়িঘড়ি আঁচল দিয়ে ঠোঁটের কোণটুকু মুছে নিয়ে, লজ্জিত-চঞ্চল গলায় বলল,,
“ইয়ে… থ্যাঙ্ক ইউ! আমি আসছি!”

কথাটা শেষ করেই কায়রা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে চটপট গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। আঁধার ততক্ষণে বেশ ভালোভাবেই ঘিরে ধরেছে পুরো গলিটাকে। কায়রা চটপটে পায়ে বাড়ির গেটের দিকে কয়েক পা এগোতেই, হঠাৎ পেছনের অন্ধকার ফুঁড়ে এক তীব্র আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়ল পুরো পথটায়।
দুর্জয় গাড়ির জোরালো হেডলাইট দুটো অন করে দিয়েছে, যাতে এই টিমটিমে আঁধারে কায়রার ফুটপাতে পা ফেলতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা না হয়। হঠাৎ আঁধার কাটিয়ে ছড়িয়ে পড়া উষ্ণ আলোর দিকে ফিরে তাকাতেই কায়রা থমকে গেল।

অভিসৃতি পর্ব ১০

হৃদ-গহীনে এক অনন্য ভালোলাগা ও প্রশান্তি অনুভব করল ও। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক স্নিগ্ধ, মায়াবী হাসি। আলোর পথ ধরে দোলায়িত পায়ে হেঁটে নিজের বাড়ির গেটের ভেতরে মিলিয়ে গেল সে। আর অনতিদূরে বসে থাকা মিলিটারির সেই কঠোর পুরুষটি, আয়নায় কায়রার নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করে, পরম স্বস্তিতে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গাড়িটা আবার শহরের মূল সড়কে নামিয়ে আনল।

অভিসৃতি পর্ব ১১