অভিসৃতি পর্ব ১৪
নওরিন কবির তিশা
ঘনিয়ে আসছে রিক্ততার প্রহর; যান্ত্রিক শহরের ইটের পাঁজরে লেগেছে শীতের আমেজ। তপ্ত রৌদ্রের দাপট কমেছে বহুদিন হলো। বৃক্ষশাখা হতে ঝরে পড়া শুষ্ক পত্ররাজি বাতাসে অলস ঘূর্ণি তুলেছে ক্ষণে ক্ষণে। ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যাহ্নের দুটো ছুঁইছুঁই।
শিক্ষার্থীর কলতানে মুখর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। জনাকীর্ণ উদ্যান পেরিয়ে, সম্মুখে এদিকে চলেছে বুন্ধমহল। আজকের দিনের শেষ লেকচারটির সমাপ্তির মধ্য দিয়েই আসন্ন দীর্ঘ ছুটির তোড়জোর শুরু হয়েছে। মেধা আর ইভানের খুনসুটি শুনতে শুনতেই আলস্যভরে ফটকের সীমানায় চাইতেই চঞ্চল গতি রুদ্ধ হলো কায়রার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারের একপাশে স্থির গাড়িটির বনেটে, হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুঠাম,অনমনীয় অবয়ব! দুর্জয়! পরিহিত ছাই রঙা সুবিন্যস্ত শার্টের হাতাটা কনুই অবধি গুটিয়ে রাখা। সঙ্গে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আড়াল করতে নাসিকাগ্রে মানানসই একজোড়া রোদচশমা চড়িয়ে নিতেও ভোলেনি। আপাতত, নিবিষ্ট চিত্তে সম্পূর্ণ মনোযোগ হাতে রাখা ফোনটায় নিবদ্ধ রেখেছে সে।
লোকটাকে এই অসময়ে এখানে দেখে বিস্মিত কায়রার বুকজুড়ে যেন সহসা আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল! সমস্ত কোলাহল উপেক্ষা করে, কোনোদিকে না তাকিয়ে কেবল দুর্জয়ের পানেই এক আকুল ব্যাকুলতায় ধাবিত হতে লাগল ও। কিন্তু ঠিক তক্ষুণি, চরম বিঘ্ন ঘটিয়ে আচমকা পাশ থেকে কেউ অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় কায়রার হাতখানা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল!
চট করে থমকে গিয়ে তীব্র ক্ষোভে ঘাড় ঘোরাতেই কায়রার চোখে পড়ল দিহানের উদ্ধত মুখচ্ছবি। দিহান মেকি উদ্বেগের সুর তুলে চড়া গলায় বলল,
“ এভাবে দৌড়ে কোথায় যাচ্ছ? অ্যাক্সিডেন্ট করবে তো!”
কায়রা এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করল; কিন্তু দিহানের মুষ্টি আলগা হওয়ার বদলে আরও অমার্জিত ও দৃঢ় হলো। সীমাহীন স্পর্ধা এই ছেলের। এদিকে,হঠাৎ অনতিদূরে গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে থাকা দুর্জয়ের তীক্ষ্ণ নজর একপলকেই আটকে গেল এই অনাহূত দৃশ্যে।
মুহূর্তেই ওর সুঠাম, অনমনীয় চোয়াল পাথরসম শক্ত হয়ে এল; কপালের রগ ফুলে উঠল স্পষ্ট। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটার ওপর আঙুলের চাপ এতটাই হিংস্র ও প্রচণ্ড হলো যে, মৃদু মড়মড় শব্দে স্ক্রিনের ওপর সূক্ষ্ম ফাটল ধরে গেল! রোদচশমার ওপাশের অতল কৃষ্ণনেত্রে সাক্ষাৎ মৃ’ত্যুর পূর্বাভাস; পলকহীন, শাণিত এক দৃষ্টি সোজা বিঁধল দিহানের উদ্ধত অবয়বে।
দূর থেকে দুর্জয়ের প্রলয়ংকরী রূপ দৃষ্টিগোচর হতেই কায়রার বুক কেঁপে উঠল এক লহমায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভয় আর সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে, অন্য কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই ও মুক্ত ডান হাতখানা বাতাসে তুলল। সপাটে এক চড় বসল দিহানের গালে! চড়ের আকস্মিক তীব্রতায় হতভম্ব দিহানের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। অপমান ও বিস্ময়ে সে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ার আগেই কায়রা নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
বিন্দুমাত্র কালবিলম্ব না করে, চঞ্চল পায়ে ছুটে এল সোজা দুর্জয়ের কাছাকাছি। ঠিক সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়াল ও। দুর্জয় ধীর গতিতে হাতের ফাটল ধরা ফোনটা পকেটে পুরে নিল; গাড়ির দিকে ইশারা করে ধাতব কণ্ঠে শুধু বলল,
“গেট ইন।”
ভয়ার্ত কায়রা প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখালো না। গুটি গুটি পায়ে ভেতরে ঢুকেই শান্তভাবে বসে পড়ল। দুর্জয় ভেতরে ঢুকেই ঝড় বেগে দরজাটা লাগিয়ে দিল। অতঃপর, তীব্রগতিতে গাড়ি ছুটিয়ে এগিয়ে গেল অজানা গন্তব্যে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রকাশ্যে কায়রার হাতের শাণিত চড়ে দিহানের ফর্সা গাল ততক্ষণে ক্রোধে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। অপমানের তীব্র জ্বালায়, বিস্ফোরিত আগ্নেয়গিরির ন্যায় আঁখিযুগল। বন্ধুদের সামনে এমন প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হয়ে দিহান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চড়া গলায় বলে উঠল,
“দেখে নেব তোকে আর তোর ওই মেজরকে! কত দূর দৌড়াতে পারিস তোরা!”
শ্ম-শা-নসম-নসম নীরবতা বিদ্যমান গাড়ির ভেতর। গতি নিয়ন্ত্রক হাত দুটো শক্তভাবে আঁকড়ে আছে স্টিয়ারিং। প্রস্তুরীভূত চোয়াল,অনমনীয় চিবুকে গম্ভীর থমথমে ভাব। পার্শ্ববর্তী সিটে বসা কায়রা হৃদযন্ত্রের প্রকাণ্ড দাপাদাপি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। লাজুক, চঞ্চল চোখের কোণে খানিক ভয়ের ছায়া,দুর্জয়ের এই প্রলয়ংকরী নীরবতা সহ্য করা দায়!
বেশি দূরবর্তী এক নির্জন রাস্তার পাশে গাড়ি থামাল দুর্জয়। ঝড় বেঁকে চলমান গাড়ি স্থির হতেই কায়রা দ্বিধা কাটিয়ে নিচু স্বরে মুখ খুলতে গেল,
“শুনুন… ইয়ে, আমি কিছু—”
দুর্জয় ঘাড় না ঘুরিয়েই ধাতব কণ্ঠে বাঁধা দিয়ে, হিমশীতল কাঠিন্যে শুধালো,
“লাভ কেস?”
কথাটা শোনামাত্র কায়রা চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হয়ে চট করে ওর দিকে ঘুরল,
“কী বলছেন আপনি! আই মিন… আপনি যা ভাবছেন তেমনটা একদমই না! ছেলেটা হুট করে—”
দুর্জয় এবার সানগ্লাসটা খুলে ড্যাশবোর্ডে রাখল। অতল কৃষ্ণচোখের প্রখর দৃষ্টি সোজা নিবদ্ধ করল কায়রার ভয়ার্ত, আকুল মুখশ্রীতে। প্রচ্ছন্ন গাম্ভীর্যে পুনরায় শুধালো,
“ডু ইয়্যু লাইক হিম?”
কায়রা বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে, দুই পাশে সজোড়ে মাথা নেড়ে স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
“একদম না! আই জাস্ট হেইট হিম!”
“শিওর?”
“থাউজেন্ড পার্সেন্ট!”
জবাবটা শ্রবণগোচর হতেই দুর্জয়ের সুগঠিত ওষ্ঠাধরের কোণে দুর্লভ, একচিলতে শাণিত বক্র হাসির দেখা মিললো। শীতল কণ্ঠে বলল,
“দেন, লেট মি হ্যান্ডেল দিস।”
নিম্ন স্বরে আনমনে আওড়ানো সংক্ষিপ্ত বাক্যটা শ্রবণান্দ্রেয়ে তীব্র বেগে আঘাত করলো কায়রার। ভয়ার্ত হরিণী ডাগর চক্ষুদ্বয় প্রসারিত করে শুধাল,
“কী করবেন আপনি?”
দুর্জয় বাঁ হাত দিয়ে অনাবৃত কবজির সেই রেশমি বিনুনিটায় আলতো ছোঁয়া দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“নাথিং। জাস্ট নিজের অধিকার সীমানা সিকিউর করব।”
“মানে?”
বলতে বলতে হঠাৎ ওর দৃষ্টিগোচর হলো দূর্জয়ের হাতে থাকা প্রায় অর্ধভঙ্গুর ফোনটার দিকে। ডিসপ্লে ইতিমধ্যেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আছে। কিঞ্চিৎ কম্পিত নারী কায়া। কোনো অঘটন ঘটেছে কিনা জানতে কৌতুহলী হয়ে শঙ্কিত কন্ঠস্বর ঝেড়ে স্পষ্ট স্বরে বলল,,
“ফ-ফোন অমন হলো কি করে? কোনো অ্যাক্সিডেন্ট?”
“কোল্যাটেরাল ড্যামেজ অফ টেস্টিং মাই পেশেন্স টুডে”
বিড়বিড়িয়ে বলা কথাটা স্পষ্ট বোধগম্য না হলেও, পুনরায় শুধাবার সাহস করল না কায়রা। চুপিসারে গুটি মেরে বসে থাকলো পার্শ্ববর্তী সিটের এক প্রান্তে। আবারো চলতে শুরু করানো গাড়িটা। গন্তব্য,এখনও অজানা ।
“প্লিজ ভাই, আজকে আর কোনো ঝামেলা করিস না। এমনিতেই মেন্টালি কিচ্ছু ভালো লাগছে না আমার। তার ওপর..!”
রিয়ার আকুল কাকুতি-মিনতি সত্ত্বেও পায়রার তেজস্বী ভাবমূর্তি একবিন্দু দমল না। জজ কোর্টের লালচে দালানের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ও ওড়নার আঁচল সামলে আত্মপক্ষ সমর্থনে ঝাঁজালো গলায় বললো
“তুই ফালতু আমাকে ব্লেম দিচ্ছিস কেন, রিয়া?ক্যাওস কি আমি স্টার্ট করি, নাকি তোর ওই ভাব মারা ব্যারিস্টার সাহেব অপমানের এক্সিবিশন খোলে? কমন সেন্স শেখাতে আসেন উনি!আজও যদি কোনো আননেসেসারি মাতব্বরি দেখায়, দেন আই ওয়ন্ট হোল্ড ব্যাক—মুখে যা আসবে, কড়া শুনিয়ে দেব!”
রিয়া গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,,
“তোকে জবাব দিতে হবে না, বোন! কেসটা উনার টেবিলে সঠিক ট্র্যাকে ওঠা পর্যন্ত প্লিজ একটু মুখটা বন্ধ রাখবি? আমার পুরো লাইফটা এই কেসের জাজমেন্টের ওপর ডিপেন্ড করছে।”
রিয়ার কাতর স্বরে বাধ্য হয়েই নিজের ফুঁসে ওঠা ক্ষোভটুকু আপাতত সংবরণ করল পায়রা। দুজন ধীর পায়ে ব্যারিস্টার সায়মন রহমানের সংরক্ষিত চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়াল। কাঠের দরজায় আলতো করাঘাত করে অনুমতি মিলতেই ভেতরে প্রবেশ করল ওরা।
ভেতরের সুবিশাল কাঠের টেবিলের পেছনে হেলান দিয়ে বসে আছেন ব্যারিস্টার সায়মন। চোখে সেই পরিচিত ধাতব ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদা শার্টের ওপর গাঢ় ছাই রঙা স্যুট। টেবিলে ছড়িয়ে রাখা রিয়ার ফাইলপত্রের ওপর সূক্ষ্ম নথিপত্র পর্যালোচনা করছিলেন তিনি। ওদের পদশব্দে ধীর গতিতে চশমার ওপর দিয়ে চোখ তুলে তাকালেন।
সায়মনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একমুহূর্তের জন্য পায়রার অবয়বে স্থির হলো। তবে পেশাদারি গাম্ভীর্য বজায় রেখে তিনি রিয়ার দিকে চেয়ে শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“সিট ডাউন, মিসেস রিয়া।”
পায়রা এবার কথা না বাড়িয়ে ঠোঁট চেপে নিশব্দে রিয়ার পাশাপাশি চেয়ারে বসল। সায়মন কলমটা ডেস্কে রেখে বেশ প্রাজ্ঞ ভঙ্গিতে বললো,
“আপনাদের দেওয়ানি মামলা ও দেনমোহর সংক্রান্ত কেস ডাফট প্রস্তুত। ফ্যামিলি কোর্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী হিন্দু বা মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনি প্রসেসের যে ধারাগুলো থাকে—বিশেষ করে সেকশন ৭ এর নোটিশ এবং নোটারিয়াল হলফনামার কাজ আমরা অলরেডি কমপ্লিট করেছি। রেসপন্ডেন্ট সাইড থেকে যদি কোনো ফলস এলিগেশন আনা হয়, তবে আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আমরা কাউন্টার পিটিশন ফাইল করব।”
আইনের এমন স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ব্যাখায় রিয়া আশ্বস্ত হয়ে মৃদু হেসে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, স্যার! সত্যি বলতে, আমরা খুব ডিপ্রেশনে ছিলাম।”
সায়মন একটা নথিতে সই করতে করতে অলস ভঙ্গিতে বললো,,
“ইটস মাই জব। কেসের মেরিট ভালো, সো প্যানিক হওয়ার কিছু নেই। উই হ্যাভ আ সলিড কেস।”
কথাটা শেষ করেই সাইমন টেবিল থেকে চশমাটা খুলে পাশে রেখে, সরাসরি পায়রার দিকে চাইলেন। প্রখর কণ্ঠে বলে উঠলেন,,
“তবে কেসের গ্রাউন্ড যতই স্ট্রং হোক না কেন… কোর্টে ইমোশনাল ড্রামা বা অহেতুক চিল-চিৎকার কিন্তু কেসের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। সো, উই নিড কমপ্লিট সাইলেন্স অ্যান্ড প্রপার প্রফেশনালিজম। হোপফুলি, আপনার লিগ্যাল অ্যাডভাইজার কাম ফ্রেন্ড বিষয়টা মাথায় রাখবেন, মিস অ্যর মিসেস পায়রা!”
পায়রা একলহমায় সোজা হয়ে বসল! লোকটার এই পরোক্ষ তবে সু-তীক্ষ্ণ খোঁচাটা সোজাসুজি ওর ক্ষুণ্ন অহংবোধে গিয়ে বিঁধল। অনমনীয় চোয়ালে চোখ দুটো সামান্য ছোট করে, তীব্র শ্লেষ ঢেলে ও বলল,,
“মিস পায়রা ইয়াসির!আর, আমাদের কোর্ট ম্যানার আর প্রফেশনালিজম শেখাতে আসবেন না, মি. ব্যারিস্টার! কার কোথায় মুখ বন্ধ রাখতে হবে, সেটা সময় হলেই প্রুভ হয়ে যাবে। আপনি জাস্ট নিজের ফি আর পেপারওয়ার্কে ফোকাস করুন, বাদবাকি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন!”
সায়মনের সুগঠিত চিবুকে অলস হাত রেখে এক দুর্লভ, গভীর অমায়িক হাসির রেখা ফুটে উঠল; শান্ত কণ্ঠে বললো,
“আই লাইক ইওর কনফিডেন্স, মিস। লেটস সি, কোর্টরুমে এই তেজ কতটা ধরে রাখতে পারেন!”
দু’জনের এহেন সুপ্রচ্ছন্ন দ্বৈরথ ও প্রখর বাক্যবাণে চেম্বারের মাঝে উত্তপ্ততার পরিমাণ ভারি হচ্ছে বুঝেই রিয়া চট জলদি অনুমতিক্রমে বেরিয়ে গেল পায়রার হাত ধরে।
প্রায় মিনিট দশকের নীরব যাত্রার পর গাড়ি এসে থামল খুলনার ঐতিহ্যবাহী উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে। গাড়ির গতি স্তব্ধ হতেই দুর্জয় বরাবরের ন্যায় গম্ভীর, সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“নামুন।”
কায়রা কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত হয়ে শুধাল,
“কোথায় এটা?”
কথাটা বলেই কৌতুহলী নেত্রে জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকাল ও। পড়ন্ত মধ্যাহ্নের স্বর্ণাভ রশ্মি লাইব্রেরির সুবিশাল পুরোনো দালান ও প্রাঙ্গণে আধিপত্য বিস্তার করছে। প্রাঙ্গণজুড়ে থরে থরে সাজানো রঙের বাহারি স্টল, ওপরে রঙিন পতাকার সজ্জা। তোরণের গায়ে সুবিন্যস্ত অক্ষরে লেখা বার্ষিক গ্রন্থমেলা। পড়ন্ত বেলায় বইপ্রেমী তরুণ-তরুণী ও বিদগ্ধ পাঠকদের উপচে পড়া ভিড়ে পুরো চত্বর যেন এক প্রাণবন্ত উৎসবে মুখরিত। বাতাসে তাজা ছাপার হরফ আর পুরোনো বইয়ের সুবাসিত আকুলতা।
দৃশ্যটা দেখেই কায়রার ডাগর চোখ দুটি বিস্ময়ে ও আনন্দে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল! উচ্ছ্বসিত হয়ে দুর্জয়ের দিকে চেয়ে বলে উঠল,
“আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন? থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! ইউ নো, আমি কতদিন ধরে আসতে চাচ্ছি! শুধু ফ্যামিলির প্রেশারে আসতে পারিনি। আর কিছুদিন পরেই তো মেলা শেষ হয়ে যেত, এবার হয়ত আসাই হতো না! অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে!”
আনন্দের অতিশয্যে ও উচ্ছ্বল ভঙ্গিতে দুর্জয়কে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেল। ক্ষণিকের জন্য আত্মসংবরণ করে, আরক্ত গালে চোখ জোড়া নিচু করে ফেলল কায়রা। এরপর চটজলদি গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ল বাইরে। দুর্জয়ও সুঠাম ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নেমে ওর পাশে এসে দাঁড়াল।
ওরা দুজন প্রাঙ্গণের জনাকীর্ণ চত্বরে প্রবেশ করতেই কায়রার দৃষ্টি ঘুরে বেড়াতে লাগল চতুর্দিকের বইয়ের সমুদ্রে। বিভিন্ন পাবলিকেশনের রঙিন স্টল ঘুরে ঘুরে ও নতুন ও পুরোনো বই নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। চোখের সামনে পছন্দের বই পেলেই বালিকার মতো চঞ্চল হয়ে সেগুলো হাতে তুলে নিচ্ছিল ও। কথা সাহিত্যিকদের উপন্যাস থেকে শুরু করে অনুবাদের দুর্লভ সম্ভার—যা যা ওর উইশলিস্টে দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল, আনন্দের তোড়ে তার সিংহভাগই একে একে কাউন্টারে জমা করতে লাগল।
কিন্তু বিপত্তিটা বাধল টাকা পরিশোধের সময়। পছন্দের ঝুড়ি পূর্ণ করে হঠাৎ ব্যাগের ভেতরের ছোট পার্সটায় চোখ পড়তেই কায়রার উচ্ছ্বসিত চেহারায় আষাঢ়ে মেঘ জমলো। ক্যাম্পাসে সাধারণ দিনের মতো অল্প কিছু টাকাই সঙ্গে এনেছিল ও; এতগুলো বইয়ের বিশাল বিল মেটানোর পর্যাপ্ত অর্থ তো ওর কাছে এখন নেই!
নিমেষেই বিষাদগ্রস্ত মুখে ও কাউন্টারের দিকে চেয়ে কয়েকটি প্রিয় বই আলাদা করে সরিয়ে রাখল। ভারী গলায় সেলসম্যানকে বলল,
“ভাইয়া, এই বইগুলো এখন থাক… আমি পরে এসে নিয়ে যাব।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল এক সুগভীর, সুদৃঢ় পৌরুষ কণ্ঠস্বর,,
“ওগুলোর সাথে পছন্দের যত বই আছে সব নিয়ে নিন। পেমেন্ট আমি করব।”
কায়রা চট করে পেছনে ঘুরে তাকাল। সুঠাম দেহে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে দুর্জয়। কায়রা প্রসারিত নেত্রে ওর দিকে চেয়ে মৃদু আপত্তির সুরে বলল,
“আরে না না! আপনি পেমেন্ট করবেন কেন? এটা একদম ঠিক না, আমি পরে এসে কিনে নেব—”
দুর্জয় ওর অনুনয়-বিনয়কে একবিন্দু তোয়াক্কা করল না। কেবল চোখের শাণিত ইশারায় ওকে চুপ থাকতে নির্দেশ দিল। তারপর স্বহস্তে সরিয়ে রাখা বইগুলো সহ বাকি সেরা কিছু সংগ্রহের প্যাকেটে পুরে ক্যাশ কাউন্টারে দ্রুত কিউআর কোড স্ক্যান করে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করে দিল এক নিমেষে।
অতঃপর ঘাড় ঘুরিয়ে হতভম্ব কায়রার দিকে ফিরে বলল,,
“আর কিছু পছন্দের আছে?”
“উম?”
“ডু ইউ ওয়ান্ট এনি আদার নোবেলস?”
দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে কায়রা বললো,,“নাহ!”
সত্যিই আর প্রয়োজন নেই। পছন্দের যতগুলো ছিল সব ইতিমধ্যেই বাসায় আছে। নতুন করে সংযোজন হওয়া বইগুলোই নিতে এসেছিল, লিস্ট অতিমাত্রায় বড় হওয়ায় যা পেয়েছে তাই তুলেছে। বরঞ্চ এখানে উইশ লিস্টের চেয়েও বেশি বই রয়েছে। সেলসম্যান বই গুলো কায়রার দিকে এগিয়ে দিতেই, দুর্জয় বলল,,
“নিতে পারবেন?”
কায়রা সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বলল, “হুম!”
অগোচরে লুকায়িত মৃদু হাস্যে দুর্জয় বলল,,“নিন!”
কায়রা হাত বাড়িয়ে বইগুলো গ্রহণ করতেই, কিঞ্চিৎ ভারসাম্যহীন হলো। প্রচন্ড ভারী হওয়ায় দু’তিন কদম পিছিয়ে যেতেই দুর্জয় দ্রুত সামনে এগিয়ে এলো। অত্যন্ত সহজ সাবলীলতায় ভারী প্যাকেটটি নিজের বলিষ্ঠ হাতে তুলে নিয়ে অনায়াসে কায়রার ভার লাঘব করল সে।
এই আকস্মিক সান্নিধ্যে ওদের হাত ছুঁয়ে গেল মায়াবী ক্ষণে। দুর্জয়ের সুগভীর, অনমনীয় ব্যক্তিত্বের এমন নীরব আশ্রয় পেয়ে লজ্জার রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে উঠল কায়রার দু’গাল; নত নেত্রে মৃদু হেসে সে এক অপার্থিব স্পন্দনে ওর পাশাপাশি ধীর পায়ে এগিয়ে চলল।
হঠাৎ, পরিস্থিতি চূড়ান্ত বেগতিক করে আকাশ ভেঙে নামলো ভারী বর্ষণ। আকস্মিকতায় ব্যাপারটা বোধগম্য হলো না কারোরই। কিছুক্ষণ আগে ও মেঘেদের মন ভালো ছিল, হঠাৎ এমন অকাল ক্রন্দনের কারন বুঝলো না কেউ। এদিক ওদিক ছুটে শক্ত ছাউনির নিচে আশ্রয় নিলো সকলে।
এহেন প্রখর ধারাপাতে কায়রার পরিহিত সফেদ রেশমি কামিজ মুহূর্তেই ভিজে ওর শরীরে লেপ্টে গেল। ক্ষণিকের অসাবধানতায় ওর সুগঠিত অবয়বের অনাবৃত অংশ ও অন্তরঙ্গ ভাঁজগুলো অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠল স্পষ্ট।
চোখের এক পলকেই দৃশ্যটা দৃষ্টিগোচর হলো দুর্জয়ের। নিমেষেই ওর অতল কৃষ্ণচক্ষু কঠিন সংবরতায় আচ্ছন্ন হলো। একমুহূর্ত বিলম্ব না করে, দুর্জয় নিজের বলিষ্ঠ অবয়ব দিয়ে কায়রাকে আড়াল করে দাঁড়াল। কোনোপ্রকার অযাচিত স্পর্শ ছাড়াই, কেবল নিজের বিস্তীর্ণ ছায়ায় ওকে আগলে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলে কায়রাকে ভেতরে বসিয়ে দিয়ে দুর্জয় চরম গতিতে গাড়ি চালিয়ে প্রাঙ্গণ ত্যাগ করল। গাড়ির ভেতর থমথমে নীরবতা। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর, কোনোদিকে না চেয়ে দুর্জয় গম্ভীর প্রখর কণ্ঠে বলে উঠল,
“পেছনের সিটে গিয়ে বসুন।”
কথাটার আকস্মিকতায় কায়রা বিভ্রান্ত নেত্রে চাইলো,
“হঠাৎ? কেন?”
দুর্জয় কঠোরভাবে দৃষ্টি সামনের রাস্তায় নিবদ্ধ রেখে ধাতব কণ্ঠে শুধালো,
“যা বলছি, জাস্ট ডু ইট। পিছনের সিটে যান।”
কায়রা ওর এই কঠোরতায় আর দ্বিরুক্তি না করে ধীর পদে পেছনের আসনে গিয়ে বসল। দুর্জয় গাড়ি ছুটিয়ে এনে থামাল এক সুবিশাল আধুনিক শপিং মলের সম্মুখে।একমুহূর্ত দাঁড়াল না ও। দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে চলে গেল এবং মিনিট পাঁচেকের মাঝেই ফিরে এল একখানা সুদৃশ্য, ঘন চাদরের মতো সুতি সিঙ্গেল ওড়না হাতে। পেছনের দরজা আলতো খুলে, কায়রার দিকে মোটেও চোখ না তুলে ওড়নাটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
“এটা জড়িয়ে নিন।”
কায়রা অবাক হয়ে হাত বাড়িয়ে ওড়নাটা নিল। অতঃপর আনমনে নিজের দিকে তাকাতেই লজ্জায় ওর সারা শরীর শিউরে উঠল! অকাল বৃষ্টিতে ওর সফেদ কামিজ ভিজে অন্তর্বাসের গাঢ় ছাপ আর কাঁধের অনাবৃত অংশ স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। চরম লজ্জায় ও কুণ্ঠায় ওর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম রূপ ধারণ করল।
হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল ওর। চটজলদি সেই সুবাসিত ওড়নাটা নিজের গায়ে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে ও নিজেকে সযত্নে আড়াল করে ফেলল। দুর্জয় ড্রাইভিং সিটে ফিরে এসে শান্ত ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি সচল করল। লাজুক অনুভূতির সাগরে নিমজ্জিত হয়ে কায়রা পিছনের ছিটে বসে রইল চুপচাপ। দুর্জয় কঠোর সংযত দৃষ্টির সম্মুখে নিবদ্ধ রাখলো। আশেপাশে চাইলো না আর।
বরাবরের ন্যায় গাড়ি এসে থামলো বাড়ি থেকে কিঞ্চিৎ দূরত্বে। লজ্জা-আড়ষ্টতায় অসাড় হওয়া শরীরটা সামান্য সঞ্চালন করে দ্রুত পদে গাড়ি থেকে নামলো কায়রা। দুর্জয়, ডোর খুলে বইগুলো ওর হাতে সন্তর্পণে দিয়ে সম্মুখে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই শীতল কণ্ঠে বলল,,
“আজকের ভুল যেন দ্বিতীয়বার না হয়। নেক্সট টাইম থেকে ট্রান্সপারেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন কালার এভোয়েড করবেন। ইভেন পরলেও, এক্সট্রা সিকিউরিটি নিশ্চিত করে বের হবেন। দ্যাটস অল, যান।”
কায়রা সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে কিছু বলার আগেই সো সো গতিতে স্থান ত্যাগ করল দূর্জয়ের গাড়ি।
সদ্য শাওয়ার সেরে অনাড়ম্বর সিক্ত চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে কক্ষের মাঝে এসে দাঁড়াল কায়রা। পরিহিত সুতি পোশাকের স্নিগ্ধতায় গা ধুয়ে যাওয়া এক অনাবিল স্বস্তি। ঠিক তখনই ওর ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটি চঞ্চল আওয়াজে বেজে উঠল। পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে ডিসপ্লের পানে চাইতেই ওষ্ঠাধরের কোণে প্রচ্ছন্ন আলোর রেখা ভেসে উঠল কায়রার।
একমুহূর্ত বিলম্ব না করে চটপট সবুজ বোতামে স্পর্শ করে কানে ফোনটা ঠেকালো ও,
“আসসালামু আলাইকুম, আন্টি!”
অপরপ্রান্ত হতে এক পরম সুবাসিত ও স্নিগ্ধ নারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, বাবুই! শরীর কেমন তোমার? বৃষ্টিতে ভিজে আবার ঠান্ডা লাগিয়ে বসোনি তো?”
সাজেদা চৌধুরীর এই অতি পরিচিত, সুগভীর স্নেহমাখা সম্ভাষণে কায়রার মনখানা এক নিমেষে প্রফুল্লতায় ভরে উঠল। লাজুক হাসিতে গা ভাসালেও সহসা ওর মনে পরম এক বিস্ময়ের উদয় হলো। কায়রা ইতস্তত করে নিচু স্বরে শুধাল,
“না আন্টি, আমি একদম ঠিক আছি। আসলে… উনি যে আজ হুট করে এভাবে এসে আমাকে মেলায় নিয়ে গেলেন… আন্টি, আপনি পাঠিয়েছেন ওনাকে?”
ওপার থেকে সাজেদা চৌধুরীর মৃদু, চপল হাসির শব্দ ভেসে এল। প্রচ্ছন্ন তামাশা মিশিয়ে তিনি বললেন,
“কেন? মনে নেই কাল রাতের কথা? খুব তো বললেই যে তোমার ওই ‘গম্ভীর লোকটা’ তোমাকে কখনো ঘুরতে নিয়ে যাবে না! তাই ভাবলাম, দেখা যাক ব্যাডা কত বড় গম্ভীর!”
কথাটা শোনামাত্র কায়রা চরম লজ্জিত ও সংকুচিত হয়ে এল! ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের আরক্তিম গাল দুটো দেখে চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল ও। ব্যাকুল গলায় অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“আরে আন্টি! আপনি সত্যিই কথাটা মনে রেখে ওকে পাঠিয়ে দিলেন? আমি তো জাস্ট ফান করে বলেছিলাম!”
সাজেদা চৌধুরী অমায়িক কণ্ঠে বললেন,
“বুঝি বুঝি! তা বলো তো, কেমন লাগল আমার সেই গম্ভীর ছেলেকে?”
কায়রা আনমনে হাতে থাকা সুবাসিত ওড়নাটার ভাঁজে আঙুল বুলাতে বুলাতে সুকোমল স্বরে বলে উঠল,
“প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো !”
কথাটা নিজের অজান্তেই বলে ফেলে কায়রা নিমেষে ওষ্ঠাধর চেপে ধরল! ঠিক তখনই ওপার থেকে সাজেদা চৌধুরী একটু মেকি কাশি দিয়ে কৌতুকপূর্ণ গাম্ভীর্য ঢেলে বললেন,
“হুমম! আমি কিন্তু তোমার ভবিষ্যৎ শাশুড়ি, মিস টুনি পাখি! মানে তোমার হবু বরের মা! এত নির্দ্বিধায় সবকিছু শেয়ার করলে আমি দজ্জাল শাশুড়ি হবো কিভাবে?”
অভিসৃতি পর্ব ১৩
কায়রা লজ্জায় একেবারে কাচুমাচু হয়ে নিশব্দে হেসে ফেলল। এর পর সাজেদা চৌধুরীর সাথে আরও খানিকটা টুকিটাকি মিষ্ট্যালাপ সেরে, পরম এক মিষ্টি অনুভূতির আবেশ হৃদয়ে মেখে ফোনটা রেখে দিল সে।
অতঃপর বিছানায় অতি যত্নে পড়ে থাকা ওড়নাটা হাতে তুলে পরম আবেশে তাতে মুখ গুঁজে, দুর্জয়ের কথা স্মরণ করতে করতে আনমনে কায়রা বলে উঠলো,,
“আপনার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল, মেজর।কিন্তু ব্যক্তিত্ব আমার হৃদয় হরণ করে প্রেম নামক চিরন্তন সর্বনাশ ডেকে এনেছে!”
