Home অভিসৃতি অভিসৃতি পর্ব ১৯

অভিসৃতি পর্ব ১৯

অভিসৃতি পর্ব ১৯
নওরিন কবির তিশা

বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক এলাকায় অবস্থিত বান্দরবান সেনানিবাস; গহীন অরণ্য ছেয়ে নেমে এসেছে নিকষ কৃষ্ণপক্ষীয় নিশি। পাহাড়ি হিমেল হাওয়ায় রুক্ষ বৃক্ষপল্লবগুলো অদ্ভুত খসখসে ধ্বনি তুলছে। ক্যাম্পের সিক্রেট অপারেশন কন্ট্রোল রুমে প্রকাণ্ড কাঠের টেবিল ঘিরে উপবিষ্ট সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কতিপয় কর্মকর্তা। টেবিলে বিছানো বিস্তীর্ণ ট্র্যাকিং ম্যাপ ও গহীন জঙ্গলের স্যাটেলাইট ইমেজ। গত অপারেশনে ধৃত দুষ্কৃতকারীদের জবানবন্দি হতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই এই অতর্কিত জরুরি বৈঠকের আয়োজন।
দুর্জয় কক্ষে প্রবেশ করতেই টেবিলের চারপাশে বসা মেজরের সহকর্মী ও অধস্তন কর্মকর্তারা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সামরিক প্রথায় সালাম জানালেন। ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী গাম্ভীর্যপূর্ণ দৃষ্টিতে দুর্জয়ের পানে চেয়ে বললেন,

“টেক ইওর সিট, মেজর দুর্জয়। দীর্ঘ জার্নির পর আশা করি প্রপার ব্রিফিংয়ের জন্য তুমি রেডি?”
দুর্জয় সুদৃঢ় ভঙ্গিতে আসন গ্রহণ করে নিখুঁত মিলিটারি স্যালুট ঠুকে জবাব ছুঁড়লো ,
“ইয়েস, স্যার! আই অ্যাম রেডি। কারেন্ট সিচুয়েশন কী?”
টেবিলের এক প্রান্তে বসা স্পেশাল ওয়ারফেয়ার উইংয়ের ক্যাপ্টেন ফাহিম লেজার পয়েন্টার দিয়ে ম্যাপের একটি নির্দিষ্ট পার্বত্য অঞ্চলের ওপর আলো ফেলল। অকম্পিত প্রফেশনাল কণ্ঠে বলল,
“স্যার, বিগত অপারেশনে যে হাই-প্রোফাইল ক্রিমিনালদের আমরা গ্র্যাপ করেছিলাম, তাদের ইন্টারোগেশন থেকে অত্যন্ত সেনসিটিভ তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের অভ্যন্তরে বৃহৎ কোনো শহরের ওপর বোম ব্লাস্ট আর মারণাস্ত্র স্মাগলিংয়ের প্রিপারেশন চলছে। আর এই পুরো নেটওয়ার্কের মেইন সাপ্লাই রুট হলো রুমা আর থানচির সীমান্তবর্তী এই আন-ট্র্যাকড হিল ক্রসিংগুলো।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান প্রকাণ্ড গাম্ভীর্যে টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে বললেন,
“এক্স্যাক্টলি। বহিরাগত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কিছু লোকাল ক্যাডার পাহাড়ের গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিয়েছে। এদের দ্রুত ট্র্যাপ না করতে পারলে লোকাল জোনসহ মেইন সিটিতে মেজর ডিজাস্টার ঘটে যাবে।”
দুর্জয় প্রখর কৃষ্ণচোখে ম্যাপের পাহাড়ি রুটগুলো নিরীক্ষণ করে গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল,

“স্যার, অপোনেন্ট পার্টি কিন্তু অত্যন্ত ধূর্ত। সাধারণ পাহাড়ি অধিবাসীদের সাথে মিশে গিয়ে নিজেদের হাইড করার ট্রাই করবে। আমাদের রেগুলার কম্ব্যাট পেট্রোলিং দেখে ওরা যদি অ্যালার্ট হয়ে যায়, তবে মেইন মাস্টারমাইন্ডদের ধরা পসিবল হবে না।”
উপস্থিত সিনিয়র অফিসার আলামিন তরফদার সহমত পোষণ করে বললেন,
“মেজর দুর্জয় একদম ঠিক পয়েন্ট তুলেছেন, স্যার। সরাসরি কম্ব্যাট ড্রেসে পূর্ণ ব্যাটালিয়ন নিয়ে অপারেশনে নামলে শত্রুপক্ষ আগেভাগেই পাহাড়ের গভীর গহীনে গা ঢাকা দেবে।”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান টেবিলের ম্যাপের ওপর হালকা টোকা দিয়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন,
“দ্যাটস হোয়াই উই নিড এ টু-ওয়ে স্ট্র্যাটেজি। ক্যাপ্টেন ফাহিম, প্ল্যানটা ব্রিফ করো।”
ক্যাপ্টেন ফাহিম স্যালুট জানিয়ে বলল,,
“ইয়েস, স্যার। আমাদের প্ল্যানটা টু-লেয়ারে ডিভাইডেড। ফার্স্ট লেয়ারে আমাদের রেগুলার আর্মার্ড টিম অ্যাজ ইউজুয়াল হিল ট্র্যাকে রুটিন পেট্রোলিং চালিয়ে যাবে। এতে শত্রুপক্ষ ভাববে আমরা জাস্ট নরমাল সিকিউরিটি চেকিংয়ে আছি। আর সেকেন্ড লেয়ারে থাকবে আমাদের আন্ডারকভার ইন্টেলিজেন্স স্কোয়াড।”
দুর্জয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে শুধালো,,

“আন্ডারকভার টিমের এক্স্যাক্ট লোকেশন আর মোড অফ অপারেশন কী হবে, ক্যাপ্টেন?”
ক্যাপ্টেন ফাহিম ম্যাপের ওপর চিহ্নিত গ্রামগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
“স্যার, স্থানীয় পাহাড়ি ছদ্মবেশে আমাদের চারজন বিশেষ দক্ষ অফিসার ইতিমধ্যে রুমা বাজারের লোকাল সাপ্লাই চেইন আর আঞ্চলিক হাটে মিশে গেছে। ওরা সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করে ভেতরে ভেতরে ইনফরমারদের নেটওয়ার্ক বিল্ডআপ করছে। মূল লিডারদের এক্স্যাক্ট হাইডআউট কনফার্ম হওয়ামাত্রই আমরা স্ট্রাইক করব।”
আলামিন তরফদার চশমা সামলে দুর্জয়ের দিকে চেয়ে বললেন,
“কিন্তু মেজর, পাহাড়ের স্থানীয় ভাষা আর ভৌগোলিক বিন্যাস বেশ জটিল। আন্ডারকভার ইনফরমারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে কিন্তু তোমাকেই থাকতে হবে।”
“ডোন্ট ওরি, স্যার! আমায় শুধু কিছুটা সময় দিন । শত্রুপক্ষের প্রতিটা মুভমেন্টের সঠিক হিসেব আমরা বুঝে নেব। কোনো ভুলচুক হবে না!”
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ান চৌধুরী সন্তুষ্টচিত্তে মাথা নেড়ে দুর্জয়ের সুঠাম কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“অল দ্য বেস্ট, মেজর দুর্জয়। দেশ আর হাজারো মানুষের নিরাপত্তা এখন তোমাদের ওপর নির্ভর করছে। বি কেয়ারফুল অ্যান্ড এক্সিকিউট দ্য মিশন সাকসেসফুলি!”

মাত্র দুটো দিন! মাত্র কটা প্রহরেই মানুষটা এক অদ্ভুত মায়াজাল বুনে দিয়ে গেছে কায়রার চঞ্চল জীবনে। প্রকাণ্ড শয্যায় একাকী শুয়ে তন্দ্রাহীন নয়নে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে আছে কায়রা। দেয়ালঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর স্পর্শ করেছে বহু আগেই, অথচ ওর অক্ষিপল্লবে ঘুমের লেশমাত্র নেই।
অভ্যাস বড় বিচিত্র জিনিস! কত অল্প দিনেই না ওই উষ্ণ প্রখর বুকটাতে মুখ লুকিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাসটা রপ্ত করে ফেলেছিল ও। আজ সেই বলীয়ান বাহুর সুরক্ষাবেষ্টনী নেই, নেই প্রিয় পুরুষের গাঢ় নিঃশ্বাসের দোলা কিংবা গায়ের প্রখর মনমাতানো সুবাস। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে কেবল ছটফটই বাড়ল।
নৈশভোজের পর থেকেই মনটা বড্ড অহেতুক চঞ্চল হয়ে আছে। টেবিলের ওপর রক্ষিত মুঠোফোনটা বহুবার হাতে নিয়েছে কায়রা; দুর্জয়ের নম্বরে একটা ডায়াল করার জন্য আঙুল দুটো নিশপিশ করলেও শেষমেশ নিজেকে সংযত করেছে। মেজর সাহেব ইমার্জেন্সি অফিশিয়াল ডিউটিতে আছেন, অনাকাঙ্ক্ষিত কলে যদি ওনার কাজে ব্যাঘাত ঘটে? কিংবা যদি কোনো গুরুতর পরিস্থিতিতে থাকেন?
দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর অকারণ দুশ্চিন্তার বেড়াজালে আটকে পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কায়রা। ফোনটা পুনরায় বালিশের পাশে রেখে যেমনই পাশ ফিরতে যাবে, অমনি নীরবতার প্রাচীর চূর্ণ করে বাজতে শুরু করল মুঠোফোনটি!

চকিতে স্ক্রিনের পানে চাইতেই কায়রার ব্যাকুল হৃৎস্পন্দন নিমেষেই তোড় বাড়িয়ে দিল সহস্রগুণ। ডিসপ্লেতে উজ্জ্বল বর্ণে ভাসছে পরম কাঙ্ক্ষিত নামখানি। উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে আর এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সোজা হয়ে বসল কায়রা। রুদ্ধশ্বাসে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরতেই ওপার থেকে ভেসে এলো দুর্জয়ের সেই সুগভীর, কণ্ঠস্বর,,
“এখনো ঘুমাওনি?”
ডাগর নেত্র কার্নিশ ছাপিয়ে অবাধ্য অশ্রু কনারা গড়িয়ে পড়ল টুপটাপ। অপরপক্ষের নীরবতা ভাঙার প্রয়াসে কণ্ঠস্বর কিঞ্চিত কোমল করে দুর্জয় শুধালো,,
“কান্নাকাটি করছ নাকি? হোয়াট হ্যাপেনড?”
কায়রা ওষ্ঠাধর চেপে অশ্রু সংবরণ করার বৃথা চেষ্টা করল। তোতলে উঠে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“না… কই? কাঁদব কেন? আই অ্যাম অলরাইট!”

দুর্জয় মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্যাম্প প্রাঙ্গণের হিমশীতল পবনের মাঝে ট্রাউজারের পকেটে এক হাত পুরে, অন্য হাতে ফোনটা কানের কাছে শক্ত করে চেপে ধরল।
“মিথ্যা বলায় কিন্তু তুমি একদম পারদর্শী নও, মিসেস আহসান। ভয়েস টোন শুনেই বুঝতে পারছি ইমোশনাল হয়ে আছ। প্রমিস করেছিলে না স্ট্রং থাকবে? নিজের প্রতি এই কেয়ারলেস বিহেভিয়ার কিন্তু আমি একদম পছন্দ করি না।”
কায়রা ফোনটা আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পরম সকাতরে বলল,
“আমি তো কেয়ারলেস নই! কিন্তু আপনি তো জানেন না… আমার একা একা একদম ভালো লাগছে না। ইদানিং,আপনার প্রকাণ্ড বুকটার উষ্ণতায় মুখ না গুঁজলে আমার ঘুমই আসে না মেজর। এখন আমি কী করব বলুন তো?”
দুর্জয়ের গম্ভীর পুরুষালী হৃদয়ে কায়রার এমন বালিকা সুলভ সরল আকুতি আকস্মিক মৃদু কম্পনের সৃষ্টি করল। ও সরাসরি ভালোবাসার তোড় না ভাসিয়ে, প্রচ্ছন্ন দায়িত্বশীলতায় আশ্বস্তকারী নিচু ভরাট কণ্ঠে বলল,

“আই নো, মাই লাভ। সাডেনলি হ্যাবিট চেঞ্জ হলে সামলানো একটু টাফ হয়। বাট লিসেন, এই ডিসটেন্সটা আমাদের রেসপন্সিবিলিটির একটা পার্ট। তুমি আমার ওয়াইফ, একজন সোলজারের স্ট্রেন্থ। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমি এখানে কনসেনট্রেট করব কীভাবে, বলো? টেক আ ডিপ ব্রেথ, অ্যান্ড কুল ডাউন।”
দুর্জয়ের শান্ত,প্রজ্ঞাপূর্ণ, প্রখর ভরসার কথাগুলো কায়রার উদ্বেলিত বক্ষপিঞ্জরে সহসা মলমের ন্যায় প্রলেপ দিল। ও চোখের কোণ মুছে অস্ফুটে বলল,
“আপনি নিজের কেয়ার করবেন।আর প্লিজ… কোনো ডেঞ্জারাস সিচুয়েশনে নিজেকে পুশ করবেন না! আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করে!”
দুর্জয় ওপাশের বালিকার ব্যাকুলতায় মৃদু আলতো হাসল। সুগভীর কণ্ঠে বলল,
“ডোন্ট ওরি। আমার ফার্স্ট ডিউটি কান্ট্রি সিকিউরিটি, আর সেকেন্ড রেসপন্সিবিলিটি হলো তোমার কাছে সেফলি ব্যাক করা। আই প্রমিস, আমি নিজের প্রপার কেয়ার নেব। আর তুমি? ডিনার করেছ তো? নাকি আবার কোনো অবহেলা?”
কায়রা ঈষৎ হাস্যে মাথা ঝাঁকায়,

“না… আম্মু জোর করে খাইয়ে দিয়েছেন।”
“দ্যাটস লাইক মাই গুড গার্ল, ওকে দ্যান….”
কায়রা মুহূর্তেই অনুধাবন করলো গম্ভীর মানবের মনোভাব;তাই, ওকে কথা শেষ না করতে দিয়ে ফোনটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পরম আধিপত্যে অস্ফুটে আবদার জানালো,
“ কলটা কাটবেন না, প্লিজ! আপনি লাইনে থাকুন… আমি আপনার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাতে চাই!”
ওপারে ক্ষণকালের জন্য নীরবতা ছেয়ে, পরমুহূর্তেই ভেসে এলো যত্নবান পুরুষের পরোক্ষ আহ্লাদ প্রদানকারী কন্ঠ,
“অলরাইট, মাই ম্যাজেস্টি । আই অ্যাম হিয়ার। নাও ক্লোজ ইওর আইজ এন্ড স্লিপ… গুড নাইট,মাই হার্ট ।”

কায়রা মোবাইলটি বালিশের পাশে স্পিকারে রেখে, প্রচ্ছন্ন তৃপ্তির স্মিত হাস্যে পরম নিশ্চিন্তে অক্ষিপল্লব বুজে ফেলল।
অপর প্রান্তের, সংরক্ষিত এলাকার নিস্তব্ধতার মাঝে পুরুষালি গাম্ভীর্যে ঢাকা পড়া শূন্যতাটা একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে। যে চঞ্চল চপল মেয়েটা অল্প ক’দিনেই দুর্জয় প্রথাগত কঠোর, পরিমাপিত জীবনে এক অনাবিল ঝড়ের মতো এসে বাসা বেঁধেছিল—আজ তার অনুপস্থিতিতে চারপাশের পরিবেশটা যেন বড্ড বেশি ভারী ও নিস্তব্ধ ঠেকছে! গভীর রজনীতে যে মোলায়েম বিড়াল ছানার ন্যায় চঞ্চল মেয়েটা ওর বুকে মাথা রেখে পরম আবদারে ঘুমাত, আজ তার এই সহসা দূরত্ব দুর্জয়ের সুদৃঢ় হৃদয়েও এক অদৃশ্য মোচড় সৃষ্টি করছে।
ওপার হতে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, দুর্জয় আনমনে গাঢ় সুগভীর কণ্ঠে অস্ফুটে আওড়ালো,

“আ সেন্স অফ কমপ্লিটনেস… তুমি আসার আগে হয়তো বুঝতেই পারিনি, আমার সুশৃঙ্খল লাইফে এত প্রকাণ্ড একটা ভেকেন্সি ছিল। নিজের খেয়াল রেখো, মাই লাভ… কজ ইয়্যু ক্যারি মাই এন্টার ওয়ার্ল্ড উইথ ইউ!”
অতঃপর এক পরম নিশ্চিন্তের মায়াময় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোন সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে ধীর অকম্পিত পদক্ষেপে নিজের ব্যাটালিয়ন কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো দুর্জয়।

সায়মন রহমান একজন ঝানু ব্যারিস্টার হতে পারে, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিপক্ষের যুক্তি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যার বাঁ হাতের খেল। কিন্তু পুরুষটি যখন কোনো রমণীর অনুরাগের জালে বন্দী হয়, তখন আইনের বইয়ের প্রখর যুক্তিগুলো সব ভেসে যায় অসীম ব্যাকুলতায়।
রুমা—সায়মনের জীবনের সেই একমাত্র মানসী, যার ভালোবাসায় বিগত তিনটে বছর নিজেকে সঁপে দিয়েছে ও। অথচ সেই রমণী আজ বড্ড অচেনা। বিগত তিনদিন যাবত বারংবার ফোন করেও কোনরূপ সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ ও। শেষমেষ একপ্রকার বাধ্য হয়ে এই গভীর রাতেই ৫০৬ নম্বর কলটা করলো ও। রুমার বর্তমান আবাস লন্ডনের ‌গ্রিনউইচ শহর। যার দরুন চাইলেও এক্ষুনি সেখানে যাওয়া সম্ভব সায়মনের পক্ষে। সাত-পাঁচ ভাবনার ছেদ ঘটালো অপর প্রান্ত হতে ভেসে আসা রুক্ষ নারী কন্ঠস্বর,,

“বারবার ফোন দেওয়া কোন ধরনের অভদ্রতা? দেখছে যখন ফোন তুলছি না!”
মরুভূমির ন্যায় ধূ ধূ হৃদয়ে এক পশলা বর্ষার দেখা মিলল যেন। অতি উদ্বিগ্নতায় জলদি কন্ঠে সায়মন বললো,,
“রুমা?জান? প্লিজ টেল মি কী হয়েছে? ফেরার পর থেকেই খেয়াল করছি তোমার টোনটা এত ডিফরেন্ট কেন? এনিথিং রং, জান?”
ওপার থেকে ভেসে এলো এক অনাসক্ত, ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস। রুমা অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলল,,
“কিছুই হয়নি সায়মন। আই অ্যাম জাস্ট টায়ার্ড। অকারণ অত ড্রামা কোরো না তো!”
সায়মন হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা চেপে ধরে নিজের উদ্বেগ সামলানোর বৃথা চেষ্টা করল,
“ড্রামা? রুমা, আই নো ইউ! তিনটে বছর ধরে আমি তোমাকে চিনি। রিলেশনশিপে কোনো প্রবলেম হলে বা মন খারাপ থাকলে তুমি সোজা বলতে। কিন্তু কাল থেকে তুমি আমাকে অ্যাভয়েড করছ, মেসেজ সিন করে রিপ্লাই দিচ্ছ না… হঠাৎ এই ডিস্টেন্সের মিনিং কী?”
রুমা বিষণ্ণ কণ্ঠে জবাব দিল,

“সবকিছুরই একটা এন্ডিং থাকে সায়মন। আমরা মনে হয় একটু বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছিলাম। আমার মনে হচ্ছে দিস রিলেশনশিপ ইজ নট ওয়ার্কিং এনিমোর!”
সায়মনের যেন মাথায় বাজ পড়ল! অতিচাপ প্রয়োগ করায় হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা ঝুর ঝুর করে ভেঙে গেল। ও রুদ্ধশ্বাসে আকুল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“হোয়াট? নট ওয়ার্কিং এনিমোর মানে কী? রুমা, হ্যাভ ইউ লস্ট ইউর মাইন্ড? হঠাৎ করে কোনো রিজন ছাড়া এসব কী বলছ? আমাদের ফিউচার নিয়ে কত প্ল্যান ছিল, আমার হাতে থাকা কেসটা মিটলেই তো আমরা ম্যারেজের কথা বলতাম!”
রুমা কোনো প্রকার আবেগ না দেখিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“ফিউচার প্ল্যান চেঞ্জ হতেই পারে সাইমন। অতিরিক্ত পসেসিভনেস আর এক্সপেক্টেশনের বোঝা আমি আর ক্যারি করতে পারছি না। সো প্লিজ, ডন্ট কল মি এগেইন!”
“রুমা শোনো! জাস্ট এক মিনিট আমার কথাটা—”
সাইমনকে নিজের আকুলতা প্রকাশের ন্যূনতম সুযোগটুকুও না দিয়ে রুমা ফোনটা টুস করে কেটে দিল! হাতে বিদ্যমান ক্ষ’ত হতে গলগলিয়ে পড়ছে র-ক্তিম তরল। অথচ সেদিকে কোনো হেলদোল না দেখিয়ে, ধপ করে বিছানায় বসে র-ক্তাক্ত হাতেই চুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে চেঁচিয়ে উঠলো সায়মন। বড্ড মায়ায় পড়েছিল যে। কাটাবে কিভাবে?

আদালত প্রান্তরে প্রখর রৌদ্র রশ্মি আছড়ে পড়েছে বহুক্ষণ। আজ রিয়ার কেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল এক শুনানি। প্রতিপক্ষের চক্রান্ত চূর্ণ করে রিয়ার স্বামীকে আজই কাঠগড়ায় হাজিরা দিতে হবে। বান্ধবীকে মানসিক শক্তি জোগাতে তাই রিয়ার সাথে আদালতে এসে উপস্থিত হয়েছে পায়রা। বিচারকাজ শুরু হওয়ার পূর্বে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চূড়ান্ত পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে ওরা সোজাসুজি ব্যারিস্টার সায়মন রহমানের চেম্বারের অভিমুখে অগ্রসর হলো।
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই পায়রার চকিত দৃষ্টি আটকে গেল সায়মনের ওপর। সদা পরিহাসপ্রিয়, সুবিন্যস্ত ও আত্মবিশ্বাসী পুরুষটিকে আজ ভীষণ অচেনা বড্ড বিধ্বস্ত ঠেকছে! সুগঠিত চেহারায় একরাতের ব্যবধানেই জমেছে ক্লান্তি ও অবসাদের গাঢ় ছায়া। চশমার আড়ালে অতল অক্ষিপট দুটো রক্তাভ ও শুষ্ক। সায়মন ওদের দিকে একবার নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে চেয়ে টেবিলের ফাইল গুছিয়ে অতি সংক্ষেপে বলল,

“এসেছেন? ফাইনাল হিয়ারিংয়ের অল প্রিপারেশন কমপ্লিট। চলুন, কোর্টরুমের দিকে যাওয়া যাক।”
সায়মনের সংক্ষিপ্ত বচনে ও শীতল ব্যবহারে পায়রা চরম বিস্মিত হলো। লোকটার চপল বাকপটুতা হারালো কোথায়! তবে ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিয়েই, একসঙ্গে বের হল ওরা।
কিন্তু পাশাপাশি ‌হাঁটতে হাঁটতে অকস্মাৎ পায়রার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সায়মনের ব্যান্ডেজে মোড়ানো হাতটায় প্রবল কৌতূহল সংবরণ করতে ব্যর্থ পায়রা ঈষৎ ইতস্তত করে নিচু অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে শুধাল,
“আপনার হাতে কী হয়েছে? এনিথিং সিরিয়াস?”
সায়মন নিজের গতি থামাল না। গম্ভীর মুখমণ্ডল সম্মুখের দিকে নিবদ্ধ রেখে অত্যন্ত নিরুদ্বেগ কণ্ঠে জবাব দিল,

“নাথিং ইম্পর্টেন্ট, মিস পায়রা। এক্সিডেন্টালি গ্লাস ভেঙে কেটে গেছে। আপনি কেসের দিকে ফোকাস করুন, ডোন্ট অরি উইথ দিস।”
সায়মনের এহেন কাঠখোট্টা প্রত্যুত্তরে পায়রার স্বাভিমানে প্রবল আঘাত লাগল। যে লোকটা সামান্য অজুহাতেই ওর সাথে কথা বাড়ানোর কিংবা টিপ্পনী কাটার সুযোগ খুঁজত, তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব ও প্রখর গাম্ভীর্য পায়রাকে ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত করে দিল! ও আর কোনো প্রশ্ন না তুলে নিঃশব্দে কোর্টরুমের দিকে পা বাড়াল।

আদালতের রুদ্ধদ্বার কক্ষে সূচনা হয়েছে এক তীব্র আইনি লড়াইয়ের। প্রতিপক্ষের আইনজীবী যখন কূটযুক্তির চাতুরীতে রিয়া ও তার স্বামীকে দমানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই সায়মন শুরু করলো প্রতিপক্ষের প্রতিটি জালিয়াত যুক্তিকে ছারখার করে দেওয়ার ক্ষুরধার আক্রমণ।
সায়মনের বজ্রকণ্ঠের যুক্তি, প্রকাট প্রমাণের উপস্থাপনা এবং প্রখর আইনি প্যাঁচে প্রতিপক্ষের কৌশলী আইনজীবী সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হলো। বিজ্ঞ বিচারক সমস্ত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে রিয়া-দের ডিভোর্সের চূড়ান্ত রায় সহ নিরাপত্তা নিশ্চিতের সমস্ত দায়ভার পার্শ্ববর্তী থানায় প্রদান করলেন।
কোর্টরুম থেকে বের হয়ে রিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বিজয়ের আনন্দে কাঙ্ক্ষিত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ওর চোখে। পায়রা রিয়াকে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরে আশ্বস্ত করল, অতঃপর করিডোরের এক প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে থাকা সায়মানের দিকে ধীর কদমে এগিয়ে গেল।সন্নিকটে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ও স্নিগ্ধ কণ্ঠে বলল,

“রিয়া আর তার পরিবার আজ সত্যিই এক নতুন জীবন পেল, মিস্টার সায়মন। যেভাবে আপনি কেসটা হ্যান্ডেল করলেন… সত্যি, থ্যাংক ইউ সো মাচ!”
সাইমন একচিলতে মলিন ও প্রচ্ছন্ন হাসি ওর ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। অতি শান্ত কণ্ঠে বলল,

অভিসৃতি পর্ব ১৮

“ওয়েলকাম, মিস পায়রা। ইটস জাস্ট মাই প্রফেশনাল ডিউটি। গড ব্লেস দেম।”
পায়রা কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পদে সেখান থেকে প্রস্থান করলো সায়মন। পায়রা স্বাভাবিকভাবেই বিস্মিত হলো। তবে সেটাকে পাত্তা না দিয়ে পুনরায় ফিরে গেল রিয়ার কাছে।

অভিসৃতি পর্ব ২০