অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২১
নুসাইবা ইভানা
হসপিটালের বারান্দার এক কোণে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছে জাহিন। এই পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে নিজেকে। এত ক্ষমতা, এত টাকা—হঠাৎ করেই যেন সব কিছু মূল্যহীন মনে হচ্ছে। এই টাকা দিয়ে কী হবে, যে টাকা প্রিয়জনকে বাঁচাতে পারে না! এই টাকার জন্য জীবনে এত জঘন্য কাজ করেছি! অথচ এই টাকা মূল্যহীন।
জাহিন হাঁটু থেকে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তারা-ভরা আকাশে ঝলমল করছে এক ফালি চাঁদ। শূন্য আকাশের পানে তাকিয়ে বলে, “এ জীবনে আমি যা চেয়েছি, যেভাবেই হোক সেটা নিজের করে নিয়েছি। আমি এ জীবনে যা পাইনি, তা হচ্ছে ভালোবাসা। নিজের পিতার বাজে ব্যবহার। সব কাজে, সব সময় বাবা আমাকেই দোষী ভাবতেন। তাঁর চোখে জগতের সবচেয়ে জঘন্য সন্তান ছিলাম আমি। সিঙ্গার হতে চেয়েছিলাম, কত কটু কথা শুনিয়েছেন। আচ্ছা, আমার মধ্যে কি কোনো গুণ ছিল না, যেটা বাবার মন স্পর্শ করত? যে কাজের জন্য বাবা আমাকে একটু ভালোবাসতে পারতেন?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আমি যাদের কাছে ভালোবাসা চেয়েছি, তারা কেউ আমাকে ভালোবাসেনি। শুধু মা… আমার মা, এই মানুষটা আমাকে ভালোবাসতেন। আমার সব ভুল-ত্রুটি, সব কিছুর ঊর্ধ্বে ছিল আমার মায়ের ভালোবাসা। এই পৃথিবীতে এই একমাত্র মানুষ, যিনি আমাকে ভালোবাসতেন। আল্লাহ, তুমি আমার কাছ থেকে আমার মাকে কেড়ে নিয়ো না। আল্লাহ, আমার উপর দয়া করো।”
জাহিন চোখ মুছে আনমনে বলে, “এমন কত চাঁদনি রাতে আম্মু ছাদে আমার পাশে বসে আমার গাওয়া গান শুনতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, ‘তোর কণ্ঠে জাদু আছে বাবা। একদম হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দেখিস, একদিন তোর গান সবার মুখে মুখে থাকবে।’
আমি এমন ছিলাম না। আমাকে এই পরিবেশ, এই সমাজ এমন হতে বাধ্য করেছে। আমার এমন হওয়ার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবার।” কাঁদতে কাঁদতে একা মনে কথাগুলো বলছিল জাহিন। অবশেষে দু’হাত তুলে ধরল। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে, “আল্লাহ, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে নি”কৃষ্ট মানুষ। আমার পা”পের সব শাস্তি আমাকে দাও। আমার মায়ের জীবনটা ভিক্ষা দাও, আল্লাহ। আমার পাপের শাস্তি তুমি আমার মাকে দিয়ো না। আমার জীবনের বিনিময়ে তুমি আমার মায়ের জীবন ফিরিয়ে দাও।”
মেহনুর বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে জাহিনের আকুতি দেখছিল। মেহনুরের চোখ জোড়াও ভিজে উঠেছে। নিজের পেটের উপর হাত রেখে বলে, “তোরা বাবা, আমাদের কাছে ফিরবে। এবার সব ঠিক হলেই তোর আগমনের সংবাদ জানাবো তোর বাবাকে। দেখবি, তোর আগমনে আমাদের সুন্দর একটা সুখী পরিবার হবে। আমার মতো তুই বাবার ভালোবাসা ছাড়া বড় হবি না। তুই সবার ভালোবাসায় বড় হবি।”
জিয়ান নাজিম চৌধুরীর পাশে বসে আছে। দু’জনেই চুপচাপ। মনে হাজার কথা, সান্ত্বনার বাণী, অথচ শব্দের সংকটে তা বেরোচ্ছে না মুখ ফুটে।
এর মধ্যেই ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন, “পেশেন্টের অবস্থা ক্রি”টিক্যাল। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যা কিছু হওয়ার, তাই হবে। পেশেন্টকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।”
নাজিম চৌধুরী জিয়ানের হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
জিয়ান নাজিম চৌধুরীর হাতটা আঁকড়ে ধরে বলল, “বাবা, আমি আছি তো। কিছু হবে না মায়ের। তুমি ভেঙে পড়ো না বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“কিছু ঠিক হবে না। ওই কু”লা”ঙ্গা”রটা সব শেষ করে দিল। আমার মিতাকে আমার কাছ থেকে কে”ড়ে নিল। মিতার কিছু হলে আমি ছাড়ব না ওকে। ভুলে যাব, ও আমার নিজের ঔরসজাত সন্তান।”
“শান্ত হও বাবা। জাহিন এই মুহূর্তে সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। মাকে হারানোর শোক ও মেনে নিতে পারবে না। আমাদের চেয়ে ওর কষ্ট কোনো অংশে কম নয়। ওর জন্য হলেও আল্লাহ তা’আলা মাকে সুস্থ করে দিক।”
“ওই পা”পীর নাম নিবি না। এই নাম ধ্বং”সের নাম।” কথা বলতে বলতে নাজিম চৌধুরী সেন্সলেস হয়ে ঢলে পড়লেন জিয়ানের ওপর।
মেহনুর জাহিনের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “আম্মিকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। আম্মির অবস্থা ক্রিটিক্যাল। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কিছু বলতে পারছে না ডাক্তাররা।”
জাহিন মেহনুরকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি বাঁচব না, আমার মায়ের কিছু হলে। নিজেকে আমি কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না। সব ছেড়েছুড়ে ভালো হয়ে যাব আমি। আমার মাকে সুস্থ করে দাও প্লিজ। যা কিছু করতে হয় করতে বলো। ডাক্তারকে দরকার হলে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেব, তবুও আমার মায়ের কিছু হতে দেব না।”
“এখন এসব বলে কী হবে? এখন নামাজ পড়ো, আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করো। ভুল করার আগে ভাবতে হয়। একটা ভুল সারা জীবনের কান্না। সব ভুল শোধরানোর অপশন থাকে না। কিছু ভুল বুলেটের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় জীবনকে। তাই ভুল করার আগে তার পরিণতি ভেবে নিতে হয়। তোমার জন্য কতগুলো মানুষের জীবনে ঝড় চলছে। এই মানুষগুলো কী অ”ন্যায় করেছিল, বলতে পারো? এদের সবার অপরাধী তুমি।”
মেহনুর সরে এল। জাহিনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে। এই মুহূর্তে এত কঠিন কথা সে বলতে চায়নি। কিন্তু মাঝে মাঝে শক্ত হতে হয়। বোঝাতে হয়—একটা ভুল সারা জীবনের কান্না। কান্না করেও সেই ভুলের মাশুল শোধ করা যায় না।
জাহিন সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। আসলেই তো, কত মানুষের জীবন সে শেষ করেছে। সে জানত সামনের মানুষটার কোনো দোষ নেই, তবুও কত নিরীহ মানুষকে হ”ত্যা করেছে, গু”ম করেছে। দু’হাতে মাথা খামচে ধরে সে বসে পড়ল ফ্লোরে। ওই সব মানুষগুলোর আকুতিভরা মুখ ভেসে উঠতে লাগল চোখের সামনে। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সে। এত কিছুর মধ্যেও সে ভুলে বসেছিল তুষির কথা। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে। জীবনের আয়ু যেন ফুরিয়ে আসছে। চোখের সামনে চারদিক ঝাপসা হয়ে এল। মুহূর্তেই “মা!” বলে চিৎকার করে লুটিয়ে পড়ল ফ্লোরে।
অন্তর পাগলের মতো তুষিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কোথাও কোনো ক্লু পাচ্ছে না। হুট করে কীভাবে একটা মানুষ গায়েব হয়ে যেতে পারে? একবার জাহিনের প্রতি সন্দেহ হলো, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানতে পারল জাহিন বাসায়। তুষির বাবা-মা সবাই পেরেশান। সকালে থানায় মিসিং ডায়েরি করেছে।
জাহিন চলে যাওয়ার পর তুষি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে আঁধার গভীর হচ্ছিল। তুষি চিৎকার করতে লাগল,
“কে আছো? বাঁচাও আমাকে!” এভাবে চিৎকার করতে করতে তৃষ্ণায় গলা দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল। রাত পেরিয়ে দিন, দিন পেরিয়ে আবার রাত—এভাবে ভয় আর তৃষ্ণায় এক সময় তুষির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, একবার যদি বাবা-মাকে ছুঁয়ে দিতে পারত! একবার যদি অন্তরের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে পারত! চোখের জলের পরিবর্তে চোখের কোণ বেয়ে রক্ত ঝরছে। নয়নার মুখটাও ভেসে উঠছে। নয়নার কাছে ক্ষমা চাওয়া বাকি।
নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তুষি চিৎকার করে বলল, “আমি বাঁচতে চাই। একদিনের জন্য, এক ঘণ্টার জন্য হলেও প্রিয় মানুষগুলোর সাথে বাঁচতে চাই।” ধীরে ধীরে তার শ্বাস ভারী হতে লাগল। “আল্লাহ…” বলে ডাকল। পরের কথাটুকু আর মুখ থেকে বেরোনোর আগেই এ পৃথিবী থেকে মুহূর্তেই তুষির আত্মা বিদায় নিল।
তুষির নিথর দেহ, রক্তে ভেজা জামা—সেভাবে চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায় পড়ে রইল। কেউ কি খুঁজে পাবে তুষির লাশ? নাকি এভাবেই পচে-গলে পোকামাকড়ের খাবার হবে তুষির দেহ? লাশটার কপালে কি কাফন আর দাফন জুটবে? তার প্রিয় মানুষেরা কি জানতে পারবে সে আর পৃথিবীতে নেই? তুষির লাল-নীল ভালোবাসার সংসার গড়া হলো না অন্তরের সাথে।
নয়না সেই কখন থেকে জিয়ানকে কল করছে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। নয়না ড্রেস চেঞ্জ করে সুতির থ্রি-পিস পরে নিল। রান্নাঘরে ঢুকে প্লেটে একটু খাবার নিয়ে টেবিলে এলো। খাবার আর মুখে তোলার রুচি হলো না। খাবার রেখে এক গ্লাস পানি খেয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল বাসা থেকে।
রাস্তায় বেরোতেই দেখা হলো ঈশানের সাথে।
ঈশান বলল, “কোথায় যাচ্ছ? দাওয়াত করে পালিয়ে যাচ্ছ নাকি?”
অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২০
“আমার শাশুড়ি আম্মু অসুস্থ। সেখানে যাচ্ছি।”
“ওহ, সরি। কিছু মনে না করলে আমার সাথে চলো। কী হয়েছে উনার?”
“চলুন, যেতে যেতে বলছি।”
