Home অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৬

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৬

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৬
নুসাইবা ইভানা

সময় বড় অদ্ভুত। কখনো সে মানুষের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেয়, আবার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া সবকিছু দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দেয়।
হুট করেই জিয়ানের অর্ধাঙ্গিনী হওয়া, এরপর জীবনের এত কঠিন কঠিন ধাপ পেরিয়ে এই জায়গায় আসাটা মোটেও সহজ ছিল না৷ কিন্তু সব দুঃখ-কষ্ট, ঝড়-ঝাপটা পাড়ি দিয়ে অবশেষে তারা সুখী দম্পতি। নয়না এসব ভাবনাতেই বিভোর।
হৃদয় একগাদা শপিং ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “কিরে, তোর কি কানে সমস্যা? দুলাভাই তোকে চড়-টড় দেয়নি তো কানে?”
নয়না সামনে তাকিয়ে বলল, “তুই কখন আসলি?”

“যখন আপনি স্বপ্নে বিভোর, তখন আসলাম৷ কী ভাবছিস এত?”
“কিছু না। এত ব্যাগ কেন তোর হাতে?”
হৃদয় ব্যাগগুলো সোফার পাশে রেখে বলল, “হতে চেয়েছিলাম বাবা, তুই আর তোর বর আমায় বানিয়ে দিলি মামা! জীবনটা বেদনার৷”
নয়না হেসে বলল, “কী, এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবি? অনার্স শেষ কর, এরপর আমার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে খুঁজে দেবো৷”
হৃদয় একটু কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, “তোর কোনো ছোট বোনটোন নেই?”
“আছে একজন, কিন্তু তার তেজের সাথে তুই পেরে উঠবি না। বাদ দে, বস, আমি তোর জন্য নাস্তা আনি।”
“শোন, তোর নামে একটা চিঠি এসেছে। অদ্ভুত বিষয় হলো, চিঠিটা তোর ঠিকানায় না এসে ভার্সিটির ঠিকানায় আসলো কেন? তোর কি কোনো গোপন প্রেম-ট্রেম আছে নাকি?”
“এক থাপ্পড় খাবি ফাউল কথাবার্তা বললে! আমাকে দেখে কি তোর বাজে মেয়ে মনে হয়? আমি সুনয়না তালুকদার, পাইলট জিয়ান রেজা চৌধুরীর অর্ধাঙ্গিনী। যতদিন বেঁচে আছি, আমি শুধু আমার প্লেন ড্রাইভারের।”
হৃদয় চিঠির খামটা নয়নার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এখন আমি যাই, নয়তো তোর পাইলট এসে আমাকে দেখলে মা না ডাকিয়ে ছাড়বে না৷ অন্যদিন আসবো আবার। নিজের আর বেবিদের খেয়াল রাখিস৷”
নয়না কিছু বলবে, তার আগেই তড়িঘড়ি করে বের হয়ে গেল হৃদয়। জীবন বড্ড বিচিত্র! হৃদয় সুনয়নাকে ভীষণ পছন্দ করত। হৃদয় মনে মনে বলল, ‘তোমার মতো মেয়েকে পছন্দ না করে থাকা যায় না। একটা মানুষ এত ভালো কী করে হতে পারে, তোমাকে না দেখলে জানা হতো না। সব সময় ভালো থেকো সুনয়না৷’
নয়না চিঠির খামটা খুলে চিঠি বের করল। কোথাও কোনো নাম-ঠিকানা দেওয়া নেই৷ চিঠি মেলে ধরে পড়া শুরু করল

“অপ্রিয় সুনয়না,
যে ভালোবাসা আমি পাইনি, সে ভালোবাসাকে যত্নে রাখবে আশা করি। আচ্ছা সুনয়না, এত ভালোবাসা পেতে কতটা ভাগ্যবতী হতে হয়? তুমি কি জানো, আমার না তোমাকে দেখলে ভীষণ হিংসে হয়! তোমাকে দেখলে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। অথচ শিক্ষাগত যোগ্যতা, সৌন্দর্য—সবদিক থেকে আমি তোমার থেকে কত এগিয়ে! আর তুমি এগিয়ে ভাগ্যের দিক থেকে। মেয়েদের ভাগ্য ভালো হতে হয়। সুন্দর তো প্রিন্সেস ডায়নাও ছিল৷
আমার একটা কথা রাখবে সুনয়না? চিরসুখী মানুষ তুমি, আমার মতো অভাগীর প্রতি এইটুকু দয়া করবে? করুণা করো আমার প্রতি, আমি আমার সন্তানকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। দয়া করে আমার ভালো থাকাটুকু কেড়ে নিয়ো না৷ আমার আর আমার সন্তানকে বাদ দিয়ে তোমরা ভালো থাকো, আমাকেও ভালো থাকতে দাও৷ আমাকে আর বাংলাদেশে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে নিয়ে এসে দুঃখের সমুদ্রে তলিয়ে দিয়ো না। এইটুকু করুণা করো আমার প্রতি৷ আমার ভালো থাকা কেড়ে নেবে না আশা করি।”
ইতি,
তোমাদের কেউ না হওয়া কেউ একজন।
নয়নার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো৷ জারিফ ছেলেটাকে সে বড্ড ভালোবাসে। এত মিষ্টি একটা ছেলেকে ছেড়ে থাকতে হবে! সবাই মিলে একসাথে থাকলে বাকি জীবনটা আনন্দে কেটে যেত, অথচ এখন সব আনন্দের মধ্যে কাঁটা হয়ে থাকবে জারিফের অনুপস্থিতি।

অন্তর আর নীলাঞ্জনা বসে আছে ডাক্তারের চেম্বারে।
“মিস্টার অন্তর দেওয়ান, আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন। কনগ্রাচুলেশনস!”
অন্তর স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। শব্দটা যেন তার কানে বারকয়েক বাড়ি খেলো৷ ভালো লাগার সাথে সাথে মনের কোনো এক কোণে খারাপ লাগাও ছেয়ে গেল৷ তুষী বলেছিল—’তোমাকে আমার সন্তান বাবা বলে ডাকবে, এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই জীবনে। শোনো, আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখব তৃষ্ণা। আমি সারাজীবন তোমার ভালোবাসার তৃষ্ণায় বিতৃষ্ণ থাকব৷’
নীলাঞ্জনা চুপ হয়ে রইল৷ সে কেন যেন আর কোনো সন্তান চায়নি৷ হয়তো নাবিলের জন্য। নীলাঞ্জনার মনে হতো, এখন সন্তান হলে নাবিলের প্রতি অন্তরের ভালোবাসা কমে যাবে।
অন্তর ডাক্তারের সাথে সব মিটমাট করে নীলাঞ্জনাকে নিয়ে গাড়িতে বসল৷ নীলাঞ্জনার হাতের উপর হাত রেখে বলল, “তুমি হুট করে আমার ভাঙাচোরা জীবনটাকে কেমন গুছিয়ে দিচ্ছো নীলু৷ আমি তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ।”
নীলাঞ্জনা নিজের দুহাত দিয়ে অন্তরের দুই গাল আলতোভাবে ধরে বলল, “তুমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে কেন? আমি তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমার মতো ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করে সমাজে নাম, পরিচয় দিয়েছ, এত ভালোবাসা দিয়েছ, এত সম্মান দিচ্ছো।”

অন্তরের চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
নীলাঞ্জনা অন্তরের ঠোঁটে আলতো চুমু দিয়ে বলল, “আমি কি কোনোদিন তোমার কষ্ট দূর করার মানুষ হতে পারব না? আমাকে একটু ভালোবেসে নিজের হৃদয়ে জায়গা দেওয়া যায় না?”
অন্তর নীলাঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তোমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি নীলু৷ আমার কষ্টের একমাত্র প্রশান্তি তুমি। এত সুখের অশ্রু নীলু৷”
নীলাঞ্জনার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল৷ অবশেষে অন্তর তাকে ভালোবেসেছে৷ সে পেরেছে অন্তরের পূর্ণাঙ্গ অর্ধাঙ্গিনী হয়ে উঠতে৷
হয়তো এ জন্মে আর কোনোদিন নীলাঞ্জনা জানবে না—অন্তরের হৃদয় থেকে তুষীকে কোনোদিন মুছে ফেলা যাবে না। যতদিন অন্তর বেঁচে আছে, তুষীর প্রতি তার ভালোবাসা বিন্দুপরিমাণও কমবে না৷

অনিকেত সায়নার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে৷ একটু পরপর মাথা উঠিয়ে সায়নার ঠোঁটে চুমু দিচ্ছে।
“তা ডাক্তার সাহেব, এত প্রেম দেখানোর কারণ কী?”
অনিকেত দ্রুত উঠে বসে বলল, “কারণ তো একটাই। তোমার কি মনে হয় না এই বাড়িতে আরেকটা বেবি আসা দরকার?”
সায়না নিজের হাসি আটকে বলল, “নাহ, আমার তো মনে হয় না৷ তাছাড়া নয়নার তো বেবি আছে, যখন ইচ্ছে হবে ওদেরকে আদর করবেন।”
অনিকেত সায়নার গলায় হাত দিয়ে বলল, “আরেহ, সুন্দরী বউ আমার, বোঝো না কেন! ওই বাসায় যাবো, আদর করব। আর নিজের বেবি হবে, চব্বিশ ঘণ্টা চোখের সামনে থাকবে—ব্যাপারটা কত জোস না! তাছাড়া মামা হওয়া আর বাবা হওয়া কি এক? এই বউ, আর ‘না’ ‘না’ কোরো না, আসো একটা কিউট বেবি আনার ব্যবস্থা করি৷” বলেই সায়নার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁট দিয়ে আঁকড়ে ধরল।

ঈশান স্টাডি রুমে বসে একটা বই পড়ছে৷ ঈশান চলে যাবে আমেরিকা, উচ্চ ডিগ্রি নিতে৷ রাত বাজে এখন সাড়ে বারোটা।
সূচনা চুপিচুপি স্টাডি রুমে এসে পেছন থেকে চিৎকার করল।
ঈশান পেছনে ফিরে বলল, “জানতাম, এই শেওড়া গাছের পেত্নী ছাড়া কেউ হবে না৷ তা তুই এত রাতে এখানে কী করছিস?”
“শুনলাম আপনি নাকি চলে যাবেন বিদেশে?”
“তাতে তোর কী?”
“এমন জঙ্গলের মতো কথা বলছেন কেন? এই যে আপনি এক সপ্তাহ ধরে আমাদের বাসায় থাকছেন, আপনাকে কিছু বলেছি? কোনো বাঁদরামো করেছি?”
“আচ্ছা বল কী বলবি, এত জ্ঞান দিতে হবে না৷”
“আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যাবেন ঈশান ভাই? আর হ্যাঁ, আপনি আমেরিকা না গিয়ে কোরিয়া চলুন৷ ওখানে যেয়ে আপনি আমার প্রেমে সাহায্য করবেন, আমি আপনার জন্য কোরিয়ান মেয়ে খুঁজে দেবো৷”
ঈশান চোখের চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে বলল, “তোর কি আর কোনো কাজ নেই? ওই ছেলের বয়স আমার চেয়েও বেশি, কী যেন নাম—জিওন জাংকুক! তাছাড়া ওই ছেলে তোকে পছন্দ করবে কোন দুঃখে?”
“শুনেন ঈশান ভাই, ধরুন আপনার সাথে আমার বিয়ে ঠিক। আপনার-আমার বয়সের পার্থক্য কতটুকু? সেম ওইটুকু পার্থক্যই তো।”

“কানের নিচে ঠাটিয়ে এক চড় বসিয়ে দেবো! যাহ, নিজের রুমে যা৷ ওই ছেলের বয়স আমার চেয়ে তিন বছর বেশি৷ দিবা স্বপ্ন না দেখে পড়াশোনা কর৷ যাহ, বের হ আমার রুম থেকে।”
“জীবনেও বউ পাবেন না, বদদোয়া দিলাম৷ ঈশাইন্নার বাচ্চা!”
“এই শোন সূচনা, আর কোনোদিন এভাবে আমার সামনে আসলে সোজা কাজী অফিসে নিয়ে ‘কবুল’ বলিয়ে আনব৷ বড় হচ্ছিস যে, সে খেয়াল আছে?”
সূচনা এক দৌড় দিয়ে বের হয়ে গেল রুম থেকে৷ কপাল কুঁচকে বলল, “সূচনা, ওই বদলোক যতদিন পর্যন্ত দেশ না ছাড়ছে, ওড়না পরার অভ্যাস কর।”
জাহানারা বেগম সূচনার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “তোর ওই রুমে কি কাজ? এত রাতে কেন গিয়েছিলি?”
“বড় আম্মু, প্লিজ বকো না৷ আমি ঈশান ভাইয়াকে ভয় দেখাতে গিয়েছিলাম।”
“সূচনা, তুই এখন যথেষ্ট বড় হয়ে গিয়েছিস৷ এসব বাচ্চামো এখন একদম বেমানান। আর হ্যাঁ, ঈশানকে পছন্দ করিস?”
“নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা! তওবা, তওবা! জীবনেও না, আমি শুধু আমার কুকিকে পছন্দ করি। এক্সামের পর আমাকে কোরিয়ায় কোনো ভালো কলেজে ভর্তি করে দিয়ো। এসব ইশাইন্না-মিশাইন্নাকে পছন্দ করার টাইম সূচনার নেই৷”

বাচ্চাদের একপাশে রেখে আরেক পাশে জিয়ান ও নয়না শুয়ে আছে৷ একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে৷ জিয়ান নয়নার পিঠে চুমু দিচ্ছে, দুষ্টুমি করছে৷
নয়না বলল, “জান, একটা কথা বলি৷”
জিয়ান সাথে সাথে নয়নাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, “বাটার মাশরুম, কাহিনি কী বলো তো?”
“বাবা-মাকে কয়েকদিনের জন্য লন্ডন পাঠিয়ে দিয়ো৷ আর মেহনুরকে বাংলাদেশে ফিরতে চাপ দিয়ো না৷ দেখো, মানুষ যেভাবে ভালো থাকতে চায়, তাকে সেভাবে ভালো থাকতে দেওয়া উচিত, তাই না? যদি কোনোদিন সে নিজের ইচ্ছেতে ফিরে আসতে চায়, তাহলে আসবে৷ চৌধুরী বাড়ি যতটুকু আমার, ততটুকু তারও৷”

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৫

“কিছু হয়েছে?”
“আমি যা বললাম শুনবে তো? বাচ্চারা একটু বড় হলে আমরাও না হয় একবার ঘুরে আসলাম৷”
“ওকে বাটার মাশরুম, ঠিক আছে। বুকে আসো তো, তোমাকে একটু আদর করি। শুনছো নিহান আর জায়নার আম্মু… জায়নার বাবা তোমাকে তার বক্ষে ডাকছে।”
নয়না জিয়ানের বুকে চুমু দিয়ে বলল, “নিহানের আম্মু সদা প্রস্তুত জায়নার বাবার বুকে মিশে যেতে৷”

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here